উনিশ
কৌশিক ড্রাইভ করছে। পাশের সীটে তার মামু। পিছনের আসনে বসে আছে কাকলি আর সুজাতা। কৌশিক গাড়ি চালাতে চালাতে রিয়ার-ভিযু আরশিতে দেখতে পায় পিছন পিছন আসছে নিখিলের জীপ।
সুজাতা পিছনের সীট থেকে প্রশ্ন করে, আপনি তো আজ নবনীতাকে জেরা করলেন না?
– ওতো আদালতে ছিল না। ওকে সমনই ধরাইনি আমি।
– কিন্তু কেন?
– নবনীতাকে ক্রস্করতে হবে জীবন হালদার হত্যা মামলায়। এখনো ওকে ডাকবার মতো অবস্থা হয়নি। আজ সকালেও আমি জানতাম না, নবনীতাকে কে, কেন ঐ চকলেটের প্যাকেটটা পাঠিয়েছিল।
কাকলি বলে, কে পাঠিয়েছে তা জানি না, কিন্তু কেন পাঠিয়েছে তা তো বোঝাই যাচ্ছে। ওকে হত্যা করতে।
বাসু ঘাড় ঘুড়িয়ে এদিকে ফিরে বললেন, না কাকলি, সমস্যাটা অত সহজ নয়। হত্যার উদ্দেশ্য থাকলে আরও তীব্র কোন বিষ চকলেটের ভিতর ঢুকিয়ে দিত লোকটা। প্রতিটি চকলেট-এ মাত্র পাঁচ গ্রেন করে ভেরোনাল মেশাতা না। ভেবে দেখ, নবনীতা আধঘণ্টার মধ্যে ছয়টা চকলেট ওভাবে খেয়েছিল বলেই মরতে বসেছিল। কিন্তু যে লোকটা ওকে খুন করতে চায় সে কেমন করে জানবে – নবনীতা কত তাড়াতাড়ি চকলেটগুলো খাবে? ও যদি চার-পাঁচ দিন ধরে রোজ দুটো-তিনটে করে খেত তাহলে একটু ঘুম ঘুম লেগে থাকত ক’দিন, আদৌ টের পেত না যে এই ক’দিনে সে ষাট গ্রেন ভেরোনাল খেয়েছে।
সুজাতা বলে, তাহলে লোকটার উদ্দেশ্য কী? ওকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা? তারও তো কোন অর্থ হয় না। কারণ ও কখন চকলেট খাবে তা আততায়ী জানে না।
বাসু বললেন, কারেক্ট। ঠিক লাইনেই চিন্তা করছ। এভাবেই সমাধানে পৌঁছাবে।
কাকলি বলে, আপনি সমাধানে পৌঁছেছেন? জানেন কে কেন ওকে ওই বিষাক্ত চকলেটগুলো পাঠিয়েছিল?
বাসু নির্লিপ্তের মতো বলেন, হ্যাঁ, কাকলি, এখন আমি তা সন্দেহাতীতভাবে জানি।
কৌশিক গাড়ি চালাতে চালাতে আলোচনায় যোগ দেয়, আর জীবন হালদারকে কে কাকলি দেবীর রিভলভার দিয়ে গুলিটা করেছে তাও বোধহয় আপনি ইতিমধ্যে সন্দেহাতীতভাবে জেনে ফেলেছেন?
– না কৌশিক, সেটা নিশ্চিতভাবে এখনো জানি না, কিন্তু কোন্ হতভাগ্য ব্যক্তিটি সেটা সন্দেহাতীতভাবে জানে, সেটুকু অন্তত আমি জানি– যদি সে নিজেই খুনটা না করে থাকে।
বাসু-সাহেবের নির্দেশ মতো আগুপিছু দুখানি গাড়ি এসে দাঁড়াল ইলিয়ট রোডে, নবনীতার বাড়ির সামনে। আজ তিনতলাটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। ওঁরা কি সপরিবারে কোথাও গেছেন? দোতলায় একটা জানলা থেকে আলোর আভাস আসছে।
সবাই গাড়ি থেকে নামলেন। বাসু বলেন, কাকলি, তুমি দোতলায় উঠে গিয়ে কলবেলটা বাজাও। আমরা মিনিটখানেক পরে উঠছি। নবনীতা দোর খুলে দিলে তুমি ভিতরে থাকবে। ফলে মিনিটখানেক পরে আমরা ডোরবেল দিলে তুমি দরজা খুলে দিতে পারবে। তখন আমি আর সুজাতা ঢুকব। সব শেষে কৌশিক আর নিখিল এসে কলবেল বাজাবে, তখন আমরা ভিতর থেকে দরজা খুলে দেব।
ইন্সপেক্টর দাশ বলে, এভাবে ‘বাই ব্যাচেস’ কেন? আপনার স্ট্র্য্যাটেজিটা কী?
– টেম্পোটা ধীরে ধীরে তোলা। একের পর এক মানুষজনকে এভাবে আসতে দেখলে ও ঘাবড়ে যাবে, যদি ও সত্যিই গিণ্টট-কনশাস হয়। কাকলি, তোমার সঙ্গে নবনীতার তো আজ সারাদিনে দেখা হয়নি, তাই নয়? মানে ও নার্সিংহোম থেকে ফিরে আসার পরে?
– না স্যার, হয়েছে। নবনীতা নিজের থেকেই আমার দোকানে এসেছিল।আজ সকালে। এগারোটা নাগাদ।
– ও! তা সে যাই হোক, এবার তুমি উপরে যাও।
কাকলি দোতালায় উঠে এল। ঘরের ভিতরে যে লোক আছে তা বোঝা যায়।আলো জ্বলছে। কাকলি ডোরবেল বাজালো। ম্যাজিক আইয়ের ভিতর দিয়ে নবনীতা দেখে নিয়ে দরজার লক খুলে বলল, কী ব্যাপার? কাকলি যে!
– কিছু কথা আছে তোমার সঙ্গে
– ও, এস। ভিতরে এসে বস।
কাকলি ঘরের ভিতরে ঢুকতেই নবনীতা ঠেলে দরজাটা বন্ধ করে দিল। বললে, চা খাবে? অথবা কফি?
– না. নীতা। তুমি কি লেটেস্ট খবরটা পেয়েছ?
– কী বিষয়ে?
– আমার! দিদি আর জামাইবাবুকে পুলিসে গ্রেফতার করেছে।
– না শুনিনি। কী অপরাধে?
– সকালে তোমাকে যে কথা বলেছিলাম: জীবন হালদারের খুনের মামলায়।
নবনীতা নয়ন নত করল।
কাকলি জানতে চায়, জীবন হালদারের মৃত্যুতে তোমার মনে….
নবনীতা ওকে কথাটা শেষ করতে দেয় না। মাঝপথেই বলে ওঠে, না! এককালে ওকে ভালোবেসেছিলাম এটা যেমন সত্য, তেমনি তার ইদানিংকালের দুর্ব্যবহারে আমি তাকে যে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম, সেটাও মিথ্যা নয়।
– তোমার বাড়িওয়ালা তো জানেন তুমি মিসেস হালদার। ফলে….
– জানি। নার্সিং হোম থেকে ফিরে এসে দেখি তিনতলার ওঁরা সদলবলে দুর্গাপুরে গেছেন একটা বিয়ে উপলক্ষে। জানি না, ওঁরা খবরের কাগজে অমন খবরটা দেখেছেন কিনা। না হলেও দু-একদিনের মধ্যে টের পাবেন। এখানে থাকলে আমাকে বিধবা সাজতে হবে। সেজন্যই আজ সকালে তোমার কাছে গিয়েছিলাম জানতে যে এই বিবর্তিত পরিস্থিতিতে তুমি কি আমাকে তোমার দোকানে কাজটা দেবে? রাতে তোমার মেজানাইন ঘরে থাকতে….
– কিন্তু কই সে সব কথা তো তুমি তখন বললে না।
নবনীতা নতনেত্রে বললে, না, বলিনি।
– কিন্তু কেন?
– তোমার কাউন্টারে-বসা মেয়েটিকে দেখে আমার সব গুলিয়ে গেল।
– কেন বল তো? ও কী দোষ করল?
– না, না, দোষ কিছু করেনি। আমার মনে হল, আমি বুঝি ওর চাকরিটা খাচ্ছি, ওকে পথে বসাচ্ছি…..
– কেন? তোমাকে তো আমি সেদিন বলে রেখেছিলাম যে, সুপর্ণাও একটা ভাল চাকরির অফার পেয়েছে। ও চলে যাবে পরের মাসে। বলিনি?
নবনীতা একটু ভেবে নিয়ে বললে, কী জানি বলে থাকলেও তা আমার তখন মনে পড়েনি।
ঠিক তখনই আবার কল-বেল বেজে উঠল। নীতা বলল, তুমি বস, আমি গিয়ে দেখছি।
এগিয়ে এসে ম্যাজিক-আইতে চোখ লাগিয়ে বলল, মিস্টার বাসু। তোমরা…মানে? তুমি কি ওঁরই গাড়িতে এসেছ?
কাকলি জবাব দিল না। নিঃশব্দে দরজাটা ভিতর থেকে খুলে দিল।
বাসু আর সুজাতা ঘরে ঢুকলেন। বাসু নবনীতাকে এড়িয়ে কাকলিকে বললেন, কাকলি যে। কতক্ষণ এসেছ?
কাকলি বোধহয় জলজ্যান্ত মিথ্যায় অভ্যস্ত নয়। শুধু বলল, এই তো কিছুক্ষণ।
নবনীতা পর্যায়ক্রমে তিনজনকে দেখতে থাকে। তার চোখে সন্দেহ। বাসু বললেন, এর সঙ্গে তোমার পরিচয় নেই নবনীতা, এ আমার ভাগ্নী – সুজাতা। ‘সুকৌশলী’ ডিটেক্টিভ এজেন্সির পার্টনার।
নবনীতা কুঞ্চিত ভ্রভঙ্গে বললে, আপনি একেবারে ডিটেটিভ সঙ্গেকরে আমার বাসায় এসে হাজির হয়েছেন যে? কিছু বিশেষ বক্তব্য আছে?
– তা আছে। চরম বিপদে পড়ে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তুমি এত লোক থাকতে আমাকেই টেলিফোন করেছিলে! আমি কি তোমাকে এত সহজে ছাড়তে পারি?
নবনীতা জবাব দিল না। বাসু নিজেই একটা বেতের চেয়ারে বসলেন। বললেন, তোমরা সবাই বস। কিছু কথা আছে।
বাকি তিনজনও বসল। নবনীতা বলে, এবার বলুন?
– আমি তোমার কাছে ছুটে এসেছি এ কথা বলতে যে তোমাকে বিশেষভাবে সাবধান হতে হবে। হয়তো অতর্কিতে আবার তোমাকে চরম বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।
নবনীতা জানতে চায়, হঠাৎ এমন ধারণা হল কেন আপনার?
– একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবে। মাত্র দুদিন আগে তোমাকে কোন একজন অজ্ঞাত আততায়ী বিষ মেশানো চকলেট পাঠিয়েছিল– নিঃসন্দেহে তোমাকে হত্যা করতে। তুমি ঘটনাচক্রে বেঁচে গেলে। জীবন হালদারের মৃত্যু ছাড়া পরিস্থিতির আর কোনও পরিবর্তন তো হয়নি। জীবন তোমাকে ওভাবে চকলেট পাঠাবেনা। তাহলে আততায়ী জীবিত। সে তোমাকে দ্বিতীয়বার হত্যা করতে চাইবে না, এটাই বা ধরে নিচ্ছ কেন?
নবনীতা একটু ইতস্তত করে বললে, কথাটা আমি ওভাবে দেখিনি।
– আর যে প্রশ্নের উত্তরটা সময়মত ভেবে রাখতে বলেছিলাম, সেটা? তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবার পর অন্য চাবি দিয়ে দরজা খুলে কে ভিতরে আসতে পারে?
– না, সে সমস্যার সমাধান হয়নি। আসলে আমি সে বিষয়ে আর চিন্তা-ভাবনাই করিনি। এত সমস্যা চারিদিকে–
– কিন্তু ওটাই তোমার সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা নয়?
– কোনটা?
– ওই তোমার মরণ-বাঁচন সমস্যাটা। আমি তো হিসাব কষে দেখছি-যে লোকটা আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে তোমাকে খুন করতে চেয়েছিল তার মানসিক পরিবর্তন ঘটাবার মতো কোনও ঘটনা ইতিমধ্যে ঘটেনি।
নবনীতা একটু হাসবার চেষ্টা করল। বলল, কিছু মনে করবেন না স্যার, আমার বিপদের কথা আপনি কিন্তু আমার চেয়ে বেশি বেশি ভাবছেন!
– হয়তো তাই। দুটো কারণে। প্রথমত, আমার বিশ্বাস, যে-লোকটা তোমাকে বিষমাখানো চকলেটের বাক্স পাঠিয়েছিল, সেই লোকটাই জীবন হালদারকে খুন করেছে।
নবনীতা বাসুসাহেবের চোখে-চোখে তাকালো। একটু ভেবে নিয়ে বললে, দুটো হেতুর কথা আপনি বলেছিলেন। দ্বিতীয়টা?
– দ্বিতীয়টার কথা আমি বলব না।কারণ ঘরে উপস্থিত আমাদের চারজনের মধ্যে দু-জন সেটা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল– তুমি আর তুমি।
নবনীতা জবাবে কী একটা কথা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই দরজার কলবেলটা বেজে উঠল। রীতিমত চমকে উঠল নীতা। বলল, বসুন আপনারা, আমিই দেখছি।
উঠে গিয়ে ম্যাজিক-আইতে চোখ লাগিয়ে সে এদিকে ফিরল। বাসু-সাহেবকে বলে, আপনারা কি দল বেঁধে এসেছেন? সেই পুলিশ অফিসারটি।
– কোন্ পুলিস অফিসারটি?
– নার্সিং হোমে জ্ঞান হবার পর যিনি আমাকে জেরা করেছিলেন।
এবার বাসু-সাহেব জবাব দেওয়ার আগে আবার ডোরবেলটা বেজে উঠল।
বাসু বলেন, ইন্সপেক্টর দাশ? দরজাটা খুলে দাও নীতা। পুলিস রুদ্ধদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে অভ্যস্ত নয়।
নবনীতা ভিতর থেকে দরজার লকটা খুলে দিল। পাল্লাটা খুলতেই ঘরে প্রবেশ করল নিখিল আর কৌশিক। নিখিলের হাতে টুপিটা। বললে, গুড ইভনিং মিসেস চৌধুরী। কয়েকটা কথা জানতে এলাম, কিন্তু এখানে একটা কনফারেন্স হচ্ছে দেখছি।
নবনীতা বললে, আমার নাম আপনাকে আগেই বলেছি– মিস নবনীতা রায়, মিসেস চৌধুরী নয়।
– অলরাইট। অ্যাজ য়ু প্লীজ। আমরা দু’জন কি বসতে পারি?
প্রশ্নটা বাহুল্য, কারণ জবাব দেবার আগেই দু’জনে ওর সোফা-কাম-বেডে ঠাশাঠাশি করে বসেছে। ইন্সপেক্টর দাশ বললে, আপনারা কী একটা বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। আমরা এসে পড়ায় সেটায় বাধা পড়ে গেল বোধহয়…
বাসু আবার খেইটা ধরিয়ে দেন। বলেন, আমি নবনীতাকে বলছিলাম, আমার ধারণায় যে লোকটা নবনীতাকে চকলেটের বাক্সটা পাঠিয়েছিল– সে যেই হোক – সেই লোকটাই জীবন হালদারকে খুন করেছে।
নিখিল দাশ প্রশ্ন করে, এমন কথা মনে করার কী যুক্তি আপনি দেখাবেন?
– প্রথমত, নবনীতাকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ওর জীবনে এমন কোনও প্রবল শত্রু আছে কিনা যে, ওর মৃত্যু কামনা করে। তা সে যে কারণেই হোক। কোনও গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাবার আশঙ্কায়, অর্থনৈতিক কারণে, ব্যর্থপ্রেমিকের উন্মাদনার তির্যক প্রকাশ – তা নবনীতা বলল, তেমন কোনও লোকের কথা ও মনে করতে পারছে না। অথচ আমাদের সন্দেহের গণ্ডিটা খুবই ছোট্ট -ঐ ‘সোনালি স্বপন’ রেস্তোরাঁর চৌহদ্দির ভিতর। যে ‘সোনালি স্বপন’-এর মালিক ছিলেন জীবন হালদার।
নবনীতা দেরাজ খুলে একটা সিগারেটের প্যাকেট বার করে। কাউকে বিশেষভাবে অফার করে না। সামনে টিপয়ে রাখে। নিজে একটি স্টিক তুলে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললে, কেন? ‘সোনালি স্বপন’-এর বাইরের কোন মানুষ আমাকে চকলেটের প্যাকেটটা প্রেজেন্ট করতে পারে না কেন?
বাসু বলেন, নিখিল, তুমি ওকে বুঝিয়ে দাও ব্যাপারটা। কারণ আবিষ্কারটা তোমাদের।
নিখিল নবনীতার প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট তুলে নিল। পকেট থেকে লাইটার বার করে বাসু–সাহেবকে বললে, উইথ য়োর পারমিশন, স্যার।
নিজে সিগারেটটা ধরালো, নবনীতার লিপ্সস্টকরঞ্জিত ওষ্ঠাধরে ধৃত সিগারেটের সামনে অগ্নিশিখাটা ধরে দিল। নবনীতার আঙুলদুটো কাঁপছে। নার্ভাস আঙুলে সে সিগারেটটা ধরালো। একমুখ ধোঁয়া টেনে নিয়ে নাকমুখ দিয়ে ছাড়ল। বলল, বলুন, মিস্টার দাশ?
– চকলেট ক্যান্ডির প্যাকেটটার মোড়কের উপর আপনার নামটা লেখা ছিল আলাদা আঠা দিয়ে সাঁটা একটা কাগজে, টাইপ করা অবস্থায়। হাতের লেখায় নয়। আমরা পরীক্ষা করে বুঝেছি যে, আপনার নামটা টাইপ করা হয়েছে ‘সোনালি স্বপন’-এর দোতলায় ম্যানেজারের ঘরে টেবিলে রাখা টাইপরাইটারে।
– তা কি আবার বোঝা যায় নাকি?
– যায়, মিস রায়। হস্তরেখাবিদ যতটা সন্দেহাতীত ভাবে বলতে পারেন দুটি হস্তাক্ষর একই ব্যক্তির কিনা, তার চেয়ে সুনিশ্চিতভাবে টাইপ-রাইটার স্পেশালিস্ট আজকাল বলে দিতে পারেন যে দুটি টাইপ করা কাগজ একই টাইপ-রাইটারে টাইপ করা কিনা। যদি না অবশ্য টাইপ-রাইটার দুটি আনকোরা নতুন হয়।
নবনীতা সিগারেটে আবার একটা মোক্ষম টান দিয়ে বললে, এমন অদ্ভুত কথা শুনিনি।
কৌশিক হঠাৎ বলে ওঠে, আপনি না শুনলেও এটা অপরাধবিজ্ঞানীরা সারা পৃথিবীতে মেনে নিয়েছেন। মানুষের হস্তাক্ষরের সঙ্গে হুবহু মিল দেখা গেলেও দেখা যেতে পারে, কিন্তু অন্তত ছ’মাস ব্যবহৃত হয়েছে এমন দুটি টাইপ-রাইটার কোন বিশেষজ্ঞকে ঠকাতে পারে না।ছাব্বিশটা অক্ষরের মধ্যে দু-একটা একটু অস্পষ্ট হয়ে যায়, কোনও আখর লাইনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিমাণ ওপরে উঠে যায়, কেউ নিচে নেমে আসে। কোন কোন অক্ষরের-যেমন ধরুন d, b, o, e প্রভৃতির ঘেরা জমিটা ভরাট হয়ে যায়, হয়তো ক্যাপিটাল T. L.1 প্রভৃতির মাথার টুপি বা পায়ের জুতো ক্ষয়িত হয়ে যায়…
নবনীতা ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলে, আপনি ব্যক্তিটি কে?
বাসু তৎক্ষণাৎ বলেন, ওর নাম কৌশিক মিত্র, ‘সুকৌশলী’ গোয়েন্দা-সংস্থার সিনিয়র পার্টনার। টাইপ-রাইটারের ওই ব্যাপারটা নিয়ে ও একটা স্পেশাল কোর্সও করেছে। বলা যায়, ও এ বিষয়ে একজন এক্সপার্ট!
কৌশিক তার পকেট থেকে ওর নামাঙ্কিত একটা কার্ড বার করে সিগারেটের প্যাকেটের উপর রাখল। নবনীতা ভ্রূক্ষেপ করেও দেখল না। নীরবে ধূমপান করতে থাকে। নিখিল বলে, দ্বিতীয় কথা, যে কাগজটা দিয়ে ওই চকলেটের বাক্সটা জড়ানো ছিল সেই কাগজটা…
– সেই কাগজটা কী?
– বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা করে বলেছেন, চকলেট ক্যান্ডিগুলি কোন নামকরা দোকান থেকে কেনা– ফ্লুরি, ক্যাথলিন বা সমপর্যায়ের কোনও খানদানী দোকান থেকে চকলেট ক্যান্ডিণ্ডেলো কেনা হয়েছে। ওই সব নামকরা দোকানে নিজস্ব র্যাপিং পেপার থাকে, দোকানের নামছাপা কাগজ। আপনার ওই খানদানী চকলেটগুলো খানদানী দোকানের, কিন্তু বাক্সটা জড়ানো ছিল যে কাগজে সেই র্যাপারটা বিলকুল সফেদ…
নবনীতা বলে, সেটাই তো প্রত্যাশিত। যে লোকটা প্রতিটি চকলেটে ওই কী যেন বিষ মিশিয়েছে সে র্যাপারটা খুলতে বাধ্য হয়েছে। হয়তো খুলতে গিয়ে সেটা ছিঁড়ে গেছে। তাই তাকে বাজার থেকে শাদা কাগজ কিনে ফের মুড়তে হয়েছে।
বাসু বিচিত্র হেসে বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ নীতা, তবে সবটা ঠিক নয়। অর্থাৎ চকলেট-এ বিষ মেশানোর প্রয়োজনে আততায়ী র্যাপারটা ছিঁড়ে ফেলতে বাধ্য হয়। কিন্তু শাদা-কাগজ সে বাজার থেকে কেনে না। ‘সোনালি স্বপন’-এর গুদাম ঘরে যে র্যাপিং কাগজের বান্ডিল রাখা আছে, তার মাথার দিকের অংশটা ছিঁড়ে বাকি কাগজটা সে ব্যবহার করেছে।
নবনীতা বলে ওঠে, সেটা কিভাবে আন্দাজ করেছেন?
– না, না, আন্দাজ নয়, নীতা। আদালতে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে। প্রতিটি কাগজের র্যাগ্-কন্টেন্ট, প্রতি বর্গমিটার ক্ষেত্রফলের ওজন, কেমিক্যাল কম্পোজিশন এবং ট্রেড-মার্ক পৃথক। ট্রেড-মার্কটাকে ওয়াটার-মার্কও বলা হয়। এইসব পরীক্ষা করে বোঝা গেছে যে, আততায়ী ‘সোনালী স্বপন’-এর ম্যানেজারের ঘরের টাইপ-রাইটারই শুধু ব্যবহার করে থামেনি, গুদাম থেকে র্যাপিং কাগজও সংগ্রহ করেছিল।
– আর কিছু?
– হ্যাঁ, র্যাপারটা যে আঠা দিয়ে জোড়া হয় তার কেমিক্যাল ‘সোনালি স্বপন’-এর ম্যানেজারের ঘরে টেবিলে রাখা আঠার শিশির রাসায়নিক কম্পোজিশনের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
– তা থেকে কী প্রমাণিত হয়?
– প্রমাণিত হয়, যে তোমাকে বিষমেশানো চকলেটগুলো পাঠায় সে তোমার অত্যন্ত কাছের লোক। সে ছায়ার মতো ‘সোনালি স্বপন’-এর বিভিন্ন অংশে তোমাকে অনুসরণ করে। কী? আন্দাজ করতে পার লোকটা কে?
