সাত
মেয়েটাকে বোধহয় বাঁচানো যাবে না। একের পর এক বাধা। ভবানীপুর উড়িয়াপাড়ার নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিরিধারী রাউতকে পাওয়া গেল না। ঠিকানা মোতাবেক বাড়ি খুঁজে পেতে ইনস্পেক্টার নিখিল দাশের সময় লাগেনি। কলকাতা শহর তার নখদর্পণে। দেখা গেল, ঐ ঠিকানায় একটা জীর্ণপ্রায় বাড়িতে বিশ-ত্রিশজন উৎকলের বাসিন্দা থাকে। তারা অধিকাংশই প্লাম্বিং-এর কাজ করে। একমাত্র গিরিধারীই ‘অড-ম্যানআউট’ – বক মধ্যে হংস। সে রেস্তোরাঁর বেয়ারা।
প্রতিবেশীরা তাকে একডাকে চিনল, কিন্তু দুঃসংবাদ পাওয়া গেল। গিরিধারী তার কয়েকজন ইয়ারদোস্তের সঙ্গে সন্ধ্যার শো-তে কোথায় সিনেমা দেখতে গেছে। কোন ‘হল’-এ তা ওরা বলতে পারল না। আন্দাজ সাড়ে নয়টার সে বাড়ি ফিরে আসবে।
বাসু-সাহেব একটা দোকান থেকে বাড়িতে ফোন করলেন। রানুকে জানালেন যে, সাড়ে নয়টার অ্যাপয়েন্টমেন্টটা রাখতে পারছেন না। কাকলি এলে তাকে যেন অপেক্ষা করতে বলা হয়, নবনীতার ঠিকানাটা যেন জেনে নেওয়া হয়।
রানু বলেন, নবনীতার ফোন-এর কথা ওকে বলব না?
– না। ও যদি আসে বা ফোন করে, তাহলে নবনীতার বাড়ির ঠিকানাটা শুধু জেনে নিও। খুব সম্ভবত তার আগেই আমি নবনীতার ঠিকানাটা জোগাড় করতে পারব।
রানু জানালেন, কৌশিক আর সুজাতা ফিরেছে। তারা জানতে চাইছে, কিছু করণীয় আছে কি না।
– হ্যাঁ, ওদের বল, রাত না করে খেয়ে-দেয়ে নিতে। লাইনটা কেটে দিলেন বাসু।
গিরিধারীকে পাকড়াও করা গেল নটা বেজে বত্রিশ মিনিটে। ওকে জীপে উঠিয়ে নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে গাড়ি চালালো নিখিল। গিরিধারীর নির্দেশ মতো এলিয়ট রোডে একটা তিনতলা বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হল। গিরিধারী বললে, সেই বাড়িটা, আইজ্ঞা।
ওঁরা তিনজনে নামলেন। বাসু গিরিধারীকে প্রশ্ন করেন, নবনীতা কোন তলায় থাকে? কোনটা তার সদর দরজা?
গিরিধারী সবিনয়ে তার অক্ষমতা জানালো। বলল, একবারই মাত্র সে এ বাড়িতে এসেনীতা-দিদিকে পৌঁছে দিয়েছে। তখন আঁধার রাত। লোডশেডিং চলছিল। ট্যাক্সি থেকে নেমে নীতা ট্যাক্সি-ফেয়ার মিটিয়ে দেয়। কারণ গিরিধারী বলেছিল, সে হেঁটে ভবানীপুরে চলে যাবে। ফলে দিদি এই গেট দিয়ে বাড়ির ভিতরে চলে যায়। কোন তলায়, কোন ‘ফেলাট’-এ তা সে জানে না।
পুলিসের জীপ দেখে উপর থেকে একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে নিচে নেমে এলেন।
– কাকে খুঁজছেন আপনারা?
নিখিল দাশ বললে, নবনীতা রায়। বছর ত্রিশেক বয়স–
– আজ্ঞে না, ঐ নামে এ বাড়িতে কেউ তো থাকে না।
– আপনি কি এই বাড়িতে থাকেন?
– আজ্ঞে, হ্যাঁ। আমিই বাড়ির মালিক, কেন?
নিখিল গিরিধারীকে দেখিয়ে বলে, দেখুন, এ লোকটা চৌরঙ্গী এলাকায় একটা রেস্তোরাঁয় কাজ করে। ঐ একই রেস্তোরাঁয় কাজ করে নবনীতা রায়। এ লোকটা বলছে, এই বাড়িতেই সে নবনীতাকে একদিন নামিয়ে দিয়েছিল–
ভদ্রলোক বাধা দিয়ে বলেন, চৌরঙ্গী এলাকার সেই রেস্টুরেন্টের নামটা বলুন তো?
– ‘সোনালি স্বপন’।
– তাই বলুন। হ্যাঁ, এই বাড়িই। তবে নামটা উল্টোপাল্টা বললেন কেন? এ বাড়ির দোতলায় ভাড়া থাকেন মিস্টার অ্যান্ড মিসেস হালদার। ঐ সোনালি স্বপন’ রেস্টুরেন্ট ওঁদেরই। আপনারা বোধহয় মিসেস হালদারকে খুঁজছেন।
গিরিধারী প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল নিখিল তার বাহুমূল বজ্রমুষ্টিতে ধরে বাধা দেয়। বলে, তবে তাই হবে। আচ্ছা, বলুন তো সেই ফ্ল্যাটে কি টেলিফোন কানেকশন আছে?
– হ্যাঁ, তা আছে। জীবন হালদারের নামে।
– তবে আপনি ঠিকই আন্দাজ করেছেন। আমরা ঐ মিসেস হালদারকেই খুঁজছি। শুনুন স্যার, ঐ টেলিফোন ব্যবহার করে নবনীতা রায় নামে একটি মেয়ে রাত আটটা-নাগাদ পুলিসের সাহায্য চায়। আমরা একবার মিসেস হালদারের সঙ্গে কথা বলতে চাই–
– এ যে অবিশ্বাস্য কথা শোনালেন, মশাই। মিস্টার হালদারের টেলিফোন ব্যবহার করে কে-এক নাম-না-জানা নবনীতা রায়–
নিখিল এবার নিজমূর্তি ধারণ করতে বাধ্য হল। বললে, লুক হিয়ার মিস্টার বাড়িয়ালা। আপনি কি এই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত তর্কই করে যাবেন, না আপনার ভাড়াটের সদর দরজাটা দেখিয়ে দেবেন? ইতিমধ্যে কিছু ভালমন্দ হয়ে গেলে আমি কিন্তু এ বাড়ির সবাইকে মাজায় দড়ি বেঁধে চালান দেব।
ভদ্রলোকের পরিবর্তনটা লক্ষণীয়। ওঁর গলকণ্ঠটা বার দুই ওঠা-নামা করল। কোনক্রমে ঢোক গিলে বললেন, আসুন, এই দোতলায় পশ্চিমদিকের ফ্ল্যাট।
ওঁরা দ্বিতলে উঠে এলেন। নির্দিষ্ট দরজাটি বন্ধ। ফ্লাশ-পাল্লায় গোদরেজের ‘ইয়েল-লক’। ফলে বোঝার উপায় নেই ভিতর থেকে বন্ধ, না গৃহবাসীরা বাইরে। বারকতক ডোরবেল বাজানোতে কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। নিখিল দৃঢ়মুষ্টিতে দুমদুম করে পাল্লায় কিল মারল। তাতেও ভিতর থেকে কেউ সাড়া দিল না। কিন্তু দুটি ব্যাপার সন্দেহজনক। প্রথমত চাবির গর্তে চোখ লাগিয়ে দেখা গেল ঘরে আলো জ্বলছে। দ্বিতীয়ত ঘরের ভিতর – সম্ভবত বাথরুমে – একটা জলের কল খোলা আছে। নিরবচ্ছিন্ন ধারায় বালতিতে জল পড়ে যাচ্ছে। নিখিল বলে, দরজা বন্ধ করে বাইরে গেলে লোকে সচরাচর আলোটা নিবিয়ে দিয়ে যায়, কলটাও বন্ধ করে যায়। আমার মনে হচ্ছে ঘরে লোক আছে –
গৃহস্বামী বলেন, তাহলে সে সাড়া দিচ্ছে না কেন?
– সম্ভবত তিনি অজ্ঞান হয়ে গেছেন, তাই। টেলিফোনে উনি বলেছিলেন কেউ ওঁকে বিষ খাইয়েছে–
গৃহস্বামী রীতিমতো চমকে ওঠেন, বলেন কি! কে ঐ নবনীতা রায়? আচ্ছা দাঁড়ান, এই সদর-দরজার একটা ডুপলিকেট চাবি আমার কাছে আছে। ওরা সেটা আমার কাছেই গচ্ছিত রেখেছিল, ঐ মিস্টার অ্যান্ড মিসেস হালদার। দাঁড়ান আপনারা, আমি চাবি নিয়ে আসছি।
একটু পরে ডুপলিকেট চাবি দিয়ে ঘরটা সহজেই খোলা গেল। নিখিল দাশ ঘরে পা দিয়েই ঘুরে দাঁড়ালো। বলল, আপনারা কেউ ভিতরে আসবেন না। কোন কিছুস্পর্শ করবেন না। কী ঘটেছে দেখতেই পাচ্ছেন – সেজন্যই বারণ করছি। তারপর বাসু-সাহেবকে বললে, আপনি, স্যার, ভিতরে আসুন। কিন্তু কোন কিছু ছোঁবেন না।
খোলা দরজা দিয়ে আলোকিত বৈঠকখানা ঘরটা দেখা যাচ্ছে। সোফা-সেট দিয়ে সাজানো। মেঝেতে একটা কার্পেট পাতা। কার্পেটের উপর বেকায়দায় লুটিয়ে পড়ে আছে বছর ত্রিশ-বত্রিশের একটি মহিলা। তার এক পায়ে চটি, অপর পায়ের চটিটা খুলে গছে পতন মুহূর্তে। পরনে স্টীল-গ্রে রঙের একটা মুর্শিদাবাদী। পাশেই তার হাত-ব্যাগ এবং একটি পলিথিনের ঝোলা ব্যাগ। টেলিফোনটা ওর নাগালের মধ্যেই পড়ে আছে কার্পেটের উপর।
দরজার বাইরে থেকে দুজনে একই সঙ্গে আর্তনাদ করে উঠলেন– বাড়িওয়ালা আর গিরিধারী। নিখিল গৃহস্বামীকে বললে, এই টেলিফোনটায় ফিঙ্গার-প্রিন্ট আছে, এখন ব্যবহার করা যাবে না। কাছাকাছি টেলিফোন কোথায় পাব?
গৃহস্বামী জানালেন, আমার নিজেরই ফোন আছে।
– তাহলে আপনি এক্ষনি 20-0100-তে ফোন করুন। ওটা ‘লালবাজার’। হোমিসাইড সেকশনে আব্দুল কাদেরকে চাইবেন– অথবা যে-আছে ডিউটিতে। তাকে বলবেন, আমি ইন্সপেক্টার নিখিল দাশ খবর পাঠাচ্ছি– নবনীতা রায়কে পাওয়া গেছে। এখানকার ঠিকানা, আপনার টেলিফোন নাম্বার সব জানাবেন। বলবেন, অ্যাম্বুলেন্স, ক্যামেরাম্যান আর ফিঙ্গার-প্রিন্ট এক্সপার্টদের পাঠিয়ে দিতে। বুঝলেন?
ভদ্রলোক বললেন, কিন্তু উনি নবনীতা রায় নন, মিসেস হালদার। নিখিল নির্বিকারভাবে বললে, হ্যাঁ তাই। তবে ওরা তাকে ঐ নবনীতা নামেই চেনে।
ভদ্রলোক দ্রুতগতিতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করেন। নিখিল ভূলুণ্ঠিতার মণিবন্ধ স্পর্শ করে দেখল। বাসু বলেন, বেঁচে আছে?
– আছে। শরীর এখনো গরম, নিশ্বাস পড়ছে–
নিতান্ত বাহুল্য, তবু বাসু-সাহেব গিরিধারীকে প্রশ্ন করেন, নীতা দিদিমণি?
গিরিধারী শিরশ্চালনে স্বীকার করে।
বাসু বলেন, জুতো-জোড়া বাইরে খুলে তুমি সাবধানে ভিতরে এস। এ-ঘরের কোন কিছু ছোঁবে না। ভিতরে চলে যাও। দেখ, রান্নাঘরটা কোনদিকে। গ্যাস, ইলেকট্রিক হিটার বা স্টোভ কোন কিছু আছে কিনা। আমাদের এক কেটলি গরম জল লাগবে। ঠাণ্ডা জলও এক বালতি। আর দেখ বাথরুমে তোয়ালে বা গামছা পাও কি না।
গিরিধারী সামলে নিয়েছে নিজেকে। সে ভিতরে চলে যায়। জলের কলটা বন্ধ করে। রান্নাঘর খুঁজে পেয়ে গরম জল বসায়।
নিখিল বলে, আমারও আন্দাজ ঐ রকম। বিষ নয়, খুব কড়া ঘুমের ওষুধ। ওর পেটে ঠাণ্ডা-গরম জলের সেঁক অল্টার্নেটিভলি দিতে হরে। আসুন, ভদ্রমহিলাকে ধরাধরি করে উবুড় করে শুইয়ে দিই। দেখি, যদি বমি করানো যায়।
একটু পরে গিরিধারী গরম ও ঠাণ্ডা জল নিয়ে এল। একটি তোয়ালে আর একটি গামছাও। পর্যায়ক্রমে গরম ও ঠাণ্ডা তোয়ালে দিয়ে মেয়েটির উদর ও পৃষ্ঠদেশে ‘ফোমেন্ট’ করা হল– কিন্তু কোন সাড়া জাগল না। গভীর ঘুমে সে অচেতন।
নীতার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে পড়ছে। হাত-পা হিম হতে শুরু করেনি। নাড়ির গতিতেও খুব কিছু উল্লেখজনক পরিবর্তন বোঝা যাচ্ছে না। নিখিল গিরিধারীকে বললে, তুমি তিনতলায় গিয়ে ঐ ভদ্রলোকের কাছ থেকে জেনে এস যে, লালবাজারে উনি যোগাযোগ করতে পেরেছেন কি না। আর কাছাকাছি কোনও ডাক্তার আছেন কি না।
গিরিধারী সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। এখন আর কিছু করার নেই। দুজনে মোটামুটি ঘরটা তল্লাসী করে দেখলেন। পলিথিনের ব্যাগের ভিতর পাওয়া গেল একটা ডায়েরি। আনকোরা নতুন। যার ডায়েরি তার নামটা পর্যন্ত লেখা নেই। এছাড়া কার্পেটের উপর পড়ে আছে একটা নামকরা ‘কনফেকশনারির’ ক্যাণ্ডি বক্স। খোলা অবস্থায়। ঐ পিসবোর্ডের বাক্সটায় কাগজের ছোট ছোট খোপে ছয়টা ক্যান্ডি। চকোলেট-ক্যান্ডি নিশ্চয় দুই সারিতে সাজানো ছিল। নিচের সারিতে ছয়টা ক্যান্ডি রয়েছে ; কিন্তু উপরের সারিতে ছয়টা শূন্যস্থান। তা-থেকেই বোঝা যায় মেয়েটি ছ’টা চকোলেট-ক্যান্ডি খেয়েছে। বাসু-সাহেব ঘরের অন্যান্য স্থানও মোটামুটি খুঁজে দেখলেন। সন্দেহজনক কিছু নজরে পড়ল না। একটা ওয়েস্ট-পেপার বাক্সেট কোনায় রাখা আছে, তাতে কিছু নেই। টেবিলের উপর অ্যাশট্রে – সেটাও পরিষ্কার। ভিতরে সিগ্রেটের স্টাম্প নেই। নিখিল পলিথিনের ব্যাগটার পাশে একটা ছোট্ট চিরকুট খুঁজে পেল। তাতে মেয়েলী হস্তাক্ষরে লেখা ‘নীতাকে – প্রীতি ও শুভেচ্ছাসহ– কাকলি।’
নিখিল নিঃশব্দে কাগজের টুকরোটা বাসু-সাহেবের দিকে বাড়িয়ে ধরে। তিনিও দেখে নিয়ে নিঃশব্দে সেটা ফেরৎ দেন। নিখিল সেটা সযত্বে তার পকেট-ডায়েরিতে ভরে নিয়ে জানতে চাইল, আপনি তখন বলেছিলেন এই নবনীতা রায় মেয়েটির সঙ্গে আপনার আজ রাত্রে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল, তাই নয়? কটার সময়?
– রাত সাড়ে নয়টায়।
– আরও বলেছিলেন এই নবনীতা আপনার ক্লায়েন্ট নয়, তাই না?
– হ্যাঁ। এ আমার ক্লায়েন্টের তরফে একজন জোরদার সাক্ষী। অন্তত ক্লায়েন্ট তাই আমাকে বলেছিল টেলিফোনে।
নিখিল ওঁর চোখে-চোখে তাকিয়ে বললে, কেসটা কী তা আমি জানতে চাইছি না; কিন্তু ক্লায়েন্টের নামটা আপনি এখনো জানাননি। সেটা জানাতে কি অসুবিধা আছে, স্যার?
– না। তার নাম কাকলি দত্ত। কিন্তু একটা কথা ভেবে দেখ, নিখিল। কেউ যদি কাউকে বিষ মেশানো মিঠাই পাঠিয়ে হত্যা করতে চায় তাহলে সে কি একটা চিরকুটে সে কথা লিখে জানায়?
নিখিল জবাব দেবার আগেই গিরিধারী উপর থেকে নেমে এল। তার পিছন পিছন গৃহস্বামী। খবর পাওয়া গেল যে, লালবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেছে। অ্যাম্বুলেন্স, ক্যামেরাম্যান ইত্যাদিরা রওনা হয়ে গেছে। যে কোন মুহূর্তে ওরা এসে পড়তে পারে। গিরিধারী নিজে থেকেই জানতে চায়, সে নিচে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবে কি না? কারণ তাহলে অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারকে নম্বর মিলিয়ে বাড়ি খুঁজতে হবে না। নিখিল তার বুদ্ধিকে তারিফ করে নিচে পাঠিয়ে দিল। বাসু-সাহেব জানতে চান, অ্যাম্বুলেন্সে তুমি একে কোথায় পাঠাতে চাইছ, নিখিল?
– কোন সরকারি হাসপাতালে। মেডিকেল কলেজ কিংবা এন. আর. এস. অথবা–
– বুঝেছি। তুমি কি আমার ইচ্ছামতো কোনও একটা নার্সিংহোমে ওকে নিয়ে যেতে রাজি আছ, নিখিল?
– নার্সিংহোমে! খরচ দেবে কে?
– আমি।
– কেন? আপনার কী স্বার্থ? মেয়েটি তো আপনার অচেনা!
– তাতে কী হল? মেয়েটি নিশ্চয় কলকাতা শহরে কয়েক ডজন লোককে চেনে, যাদের টেলিফোন আছে, তাই নয়? অথচ জ্ঞান হারাবার পূর্বমুহূর্তে সে তো এই অচেনা বুড়ো মানুষটাকেই ফোন করেছিল।
– শুধু সেই কারণে আপনি–
– কারণটা নিয়ে অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, নিখিল? আমার প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করার কি বিশেষ কোনও হেতু আছে?
– আদৌ না। আপনি খরচ দিলে আমার আর কী আপত্তি?
বাসু-সাহেব গৃহস্বামীর দিকে ফিরে বললেন, তাহলে আপনাকে আর একটু কষ্ট দেব। চলুন, উপরে যাই। একবার ডাক্তারবাবুকে টেলিফোন করে বলে দিই–
– বিলক্ষণ! এ আবার কষ্ট কিসের! মিসেস হালদার শুধু আমাদের ভাড়াটেই নয়, আমার মেয়ের মতো।
দ্বিতলে উঠে এসে দেখলেন অনেকগুলি কৌতূহলী মুখ। দোতলায় কী একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে এটা তারা জানে, তবে বিস্তারিত জানে না। গৃহস্বামী তাদের শাসিয়ে রেখেছেন, পরে সব বিস্তারিত জানানো হবে, কিন্তু এখন যদি কেউ দোতলায় উঁকি দেয় তবে থানা-পুলিশ-কোর্ট-কাছারিতে তার জেরবার হয়ে যাবে।
গৃহস্বামী বাসু-সাহেবকে টেলিফোন যন্ত্রটা দেখিয়ে দিয়ে পাশেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। বাসু তাই ফোন করলেন নিজের বাড়িতে। রিঙিং টোন শুনতে শুনতে বাম মণিবন্ধে তাকিয়ে দেখলেন রাত দশটা বাজতে বারো।
রানুর সাড়া পেয়েই বাসু জানালেন যে, মেয়েটিকে পাওয়া গেছে। বেঁচে আছে। তাকে সানিসাইড নার্সিংহোমে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রানু যেন সেই নার্সিংহোমে ফোন করে জানিয়ে রাখেন ডক্টর ব্যানার্জিকে। তাঁকে না পেলে নার্স জবাকে। জানতে চাইলেন, সাড়ে নয়টায় যার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল সে কি এসেছে?
রানু প্রতিপ্রশ্ন করেন, কাকলির নামটা পর্যন্ত এড়িয়ে কথা বলছ দেখছি! মনে হচ্ছে তোমার পাশেই কোনও অবাঞ্ছনীয় শ্রোতা দাঁড়িয়ে? তাই কি?
– ঠিক তাই।
তাহলে একতরফা শুনে যাও। কাকলি আসেনি, কিন্তু মিনিট-দশেক আগে ফোন করে জানিয়েছিল, একটা এমার্জেন্সিতে সে আটকে গেছে। সাড়ে-দশটার আগে আসতে পারবে না। সে জানতে চেয়েছিল অত রাতে আসবে, না কাল সকালে। আমি তাকে সাড়ে দশটাতেই আসতে বলেছি। দ্বিতীয় কথা, আমি ওকে নবনীতার ব্যাপারটা কিছু বলিনি। তৃতীয়ত, সুজাতা আর কৌশিক জানতে চাইছে ওদের কিছু করণীয় আছে কিনা।
– সে তো আগেই বলেছি – ওরা খাওয়া-দাওয়া মিটিয়ে নিক।
– কেন? তোমার কি ফিরতে দেরী হবে?
– না। সাড়ে দশটার অ্যাপয়েন্টমেন্টটা আমি রাখব। রাখছি।
ঐ সময়েই অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা গেল।
ওঁরা নিচে নেমে আসতে শুরু করেন। সিঁড়ির মধ্যেই দেখা হয়ে গেল গিরিধারীর সঙ্গে। দুজন স্ট্রেচার-বাহককে সঙ্গে নিয়ে সে দ্বিতলে উঠছে।
