যাদু এ তো বড় রঙ্গ-র কাঁটা – ১৬

ষোলো

– আপনি স্বীকার করছেন যে, পুলিস মিসেস জয়া সেনকে হত্যাপরাধে খুঁজছে এই কথা জেনেও আপনি তাঁকে ছদ্মনামে কোনও হোটেলে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করেছেন?

– না, নিখিল, বরং তুমিই স্বীকার করছ না যে, তুমি আমাকে এসে বলেছিলে যে, মিসেস সেনকে নয়, তাঁর স্বামী যাদুগোপালকে পুলিশ হত্যাপরাধে খুঁজছে।

নিখিল আগুনঝড়া চোখে দশ-সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল বাসুসাহেবের দিকে। তারপর বললে, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করিনি যে, আপনি কি কাল রাত্রে মিসেস সেনের গাড়িতে তাঁকে সরিয়ে দিয়েছেন? আর আপনি তা অস্বীকার করলেন?

– না। কথোপকথন আমার পরিষ্কার মনে আছে। তুমি জিজ্ঞাসা করলে: ‘আপনি কি জয়া সেনের গাড়ির আওয়াজ পেয়ে নেমে এসেছিলেন? না হলে বাড়ি ফিরলেন কী করে? অত রাতে ট্যাকসি পেলেন?’ আর আমি জবাবে বললাম, ‘তুমি খেয়াল করনি, নিখিল, কৌশিক আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। একটু দুরে গাড়িটা পার্ক করেছিল, তাই তোমার নজরে পড়েনি।’

নিখিল গর্জে ওঠে, তারপর আমি জানতে চাইনি, ‘আপনি জয়া সেনকে কোথাও নামিয়ে দেননি?’ আর আপনি পয়েন্ট-ব্ল‍্যাঙ্ক বললেন: না।

– ইয়েস, তাই বলেছি আমি। আমি তো জয়াকে কোথাও নামিয়ে দিইনি। শুধু নিজের গাড়িতে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। আমার নির্দেশে কৌশিকই মিসেস সেনকে ঐ হোটেলে পৌঁছে দেয়। ছদ্মনামে হোটেলে উঠিয়ে দেয়।

– এটা সজ্ঞানে অপরাধীকে আড়াল করা নয়?

– আদৌ নয়। কারণ প্রথম কথা, তার আগে তুমি আমাকে জানাওনি যে, মিসেস জয়া সেনকে কোনও হত্যাপরাধে পুলিস খুঁজছে। দ্বিতীয় কথা, আমি একজন নাম-করা ডাক্তারের পরামর্শমতো আমার মক্কেলকে পুলিসের জেরার সম্মুখীন করতে চাইনি। তোমাকে আমি জানিয়ে রেখেছিলাম যে, মিসেস সেন আমার মক্কেল। তাঁর সম্বন্ধে তুমি আমার কাছে কিছু জানতে চাওনি।

– চাইনি? বারে বারে জানতে চাইনি, জয়া সেন কোথায়?

– না, চাওনি, নিখিল। তোমার প্রতিটি প্রশ্নের জবাব আমি দিয়েছি। একবারও মিথ্যা কথা বলিনি। কিংবা একবারও বলিনি, আমি জবাব দেব না। তুমি ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখ।

নিখিল প্রতিটি শব্দ কেটে কেটে বললে, মিস্টার বাসু, এখন আবার আমি জানতে চাইছি: আপনার মক্কেল মিসেস জয়া সেন বর্তমানে কোথায়?

বাসুও প্রতিটি শব্দ কেটে কেটে বললেন, আমি যা জানি তা আমি তোমাকে বলেছি। এই দোকানে আধঘণ্টা আগে যখন আমি ঢুকি, তখন আমার ধারণা ছিল: মিসেস জয়া সেন ‘পান্থজনসখা’ হোটেলে মীনাক্ষী মজুমদারের ছদ্মনামে রয়েছেন। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন তা আমি জানি না।

ঠিক তখনই বাইরের দরজা দিয়ে একজন লোক দোকানে প্রবেশ করল। কাচের দরজাটা খুলে জানতে চাইল, মাপ করবেন, মিস্টার ভৈরব দাশ কি এখানে..এ তো আপনি…

ভৈরব তার হাত থেকে একগোছা কাগজ নিয়ে ছত্রধারী প্রৌঢ় ভদ্রলোকটির হাতে দিল। তাকে বলল, ব্যারিস্টার পি. কে. বাসুর সঙ্গে ইতিপূর্বেই আপনার পরিচয় হয়েছে। আদালতের ‘সমনটা’ ওঁকে পড়ে শোনান।

প্রৌঢ় যথারীতি পাঠ করে গেলেন ‘মিস্টার পি কে.বাসু, বার অ্যাট-ল, পিতা ঈশ্বর ইত্যাদি ইত্যাদি, আপনাকে নিম্নবর্ণিত আদালতের নির্দেশনামা-মোতাবেক এই subpoena duces tecum হস্তান্তরিত করিয়া আদেশ জারি করিতেছি যে, আগামীকাল বেলা দুইটার সময় নির্ধারিত নিম্নবর্ণিত সিবিল সুট মামলায় – যাহা’শ্রী ভৈরবচন্দ্র দাশ বনাম মেসার্স সুজাতা ফটোগ্রাফিক স্টোর্স’ নামে চিহ্নিত – স্বয়ং উপস্থিত থাকিবেন। প্রকাশ থাকে যে, অত্র আদেশনামা মোতাবেক আপনি আপনার নিকট গচ্ছিৎ অথবা আপনার এক্তিয়ারভুক্ত, অথবা আপনার জ্ঞাতসারে লুক্কায়িত নিম্নবর্ণিত শেয়ারগুলি আদালতে উপস্থাপিত করিবেন। আরও প্রকাশ থাকে যে, এই শেয়ারসমূহ উক্ত কোম্পানি প্রথমে শ্রীমতী জয়া দত্তকে ইস্যু করে এবং পরে বিবাহান্তে তাহা শ্রীমতী জয়া সেনের নামে বিধিবদ্ধ ট্রান্সফার করা হয়।’

নিখিল দাশের মুখের হাসি ধীরে ধীরে আকর্ণবিস্তৃত হয়ে গেল। বলল, এবার আমরা সবাই ঐ অর্কেস্ট্রায় যোগ দিতে পারি: নরুনের বদলে নাক পেলাম টাক-ডুমাডুম-ডুম!

হঠাৎ টেবিলের ও-প্রান্তে গিয়ে নিখিল টেলিফোন রিসিভারটা ক্র্যাডল থেকে তুলে নিয়ে পর পর ছয়টা নাম্বার ডায়াল করল। ওপ্রান্ত সরব হতেইনিখিল বলল: হোমিসাইড-ইন্সপেক্টার নিখিল দাশ বলছি, ডিউটিতে এখন কে আছে?…ও আচ্ছা, দাও তাকে…শোন, মুস্তাক, একটা জীপ নিয়ে এখনি চলে যাও সাউথ ক্যালকাটায় – আনোয়ার শাহ রোডের ‘পান্থজনসখা’ হোটেলে। সেটা চেন? টিভি স্টেশনের কাছাকাছি, স্টেট ব্যাঙ্ক…ও আচ্ছা, তুমি চেন! ভেরি গুড! হোটেলে মিসেস জয়া সেন আছেন। তাঁকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে আসবে। উনি ওখানে ছদ্মনামে রেজিস্টার করে লুকিয়ে আছেন…মিসেস মীনাক্ষী মজুমদার নামে। গট ইট?…অ্যান্ড মেক ইট স্ন্যাপি–

টেলিফোনটা ধারক-যন্ত্রে নামিয়ে দিয়ে বলে, আচ্ছা চলি। উইশ য়ু অল বেস্ট অব ল্যকা

দরজা খুলে বাইরে যাবার উপক্রম করতেই পিছন থেকে কাকলি ডেকে ওঠে; ইন্সপেক্টর দাশ!

নিখিল ঘুরে দাঁড়ায়। বলে, ইয়েস, ম্যাডাম–

– বিনা অনুমতিতে আমার টেলিফোনটা ব্যবহার করেছেন, এজন্য আমি কিছু মনে করিনি, কারণ বহু পুলিসের যে ভদ্রতা বা সৌজন্যজ্ঞান থাকে না এটা ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশে’ স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু টেলিফোন কোম্পানি প্রতি ‘কল’-এর জন্য আমার দোকানকে চার্জ করেন। আপনি একটা টাকা দিয়ে যাবেন।

নিখিল মানিব্যাগ খুলে একটা টাকা বার করল। কোন কথা বলল না। ঠং করে টাকাটা নামিয়ে দিল টেবিলে। কাকলি তার ব্যাগ খুলে টাকা ভরে রাখল। আর একটি দশ নয়া পয়সার মুদ্রা বার করে একই কায়দায় ঠং করে নামিয়ে দিল ভৈরব দাশের সামনে।

ভৈরব অবাক হয়ে বলে, এটার মানে?

– বুঝলেন না? আপনার দশ পার্সেন্টের হিস্যা! ওটা উঠিয়ে নিয়ে এবার বিদায় হোন!

ফোটোগ্রাফিক স্টোর্স থেকে বেরিয়ে এসে সুজাতা বলে, ইন্সপেক্টর দাশ কী করে আন্দাজ করল আমিই জয়া সেনের ট্রাভলার্স চেক ভাঙাচ্ছি?

বাসু বললেন, ছোকরা খুবই সেয়ানা। আমিই যে জয়াকে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে গেছি এটা ও আন্দাজ করেছে। তবে ‘সওয়াল-জবাব’ ব্যাপারটায় রপ্ত হতে পারেনি। তাই আমার চালাকিটা ধরতে পারেনি।

– কী চালাকি?

– ও বারে বারে জানতে চেয়েছে, ‘জয়া সেন কোথায়, আর আমি সরাসরি মিথ্যা কথা না বলেও ধানাই-পানাই জবাব দিয়ে ওকে বারে বারে বিপথে নিয়ে গেছি। বেচারি ‘পান্থজনসখা’য় গিয়ে যখন দেখবে খাঁচা খালি-পাখি উড়ে গেছে, তখন আর একবার মনে মনে আমাকে গালমন্দ করবে।

– কিন্তু জয়া সেন কোথায়?

– নিশ্চয় সে আমার নির্দেশটা মানেনি। দু-চার জায়গায় ফোন করে যাদুগোপালের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আর তখনই যাদুগোপাল শুরু করেছে তার নতুন রঙ্গের ভেল্কি। হোটেলে এসে জয়াকে নিয়ে আমার নাগালের বাইরে সরিয়ে ফেলেছে।

কৌশিক দূর থেকে ওঁদের দেখতে পেয়ে গাড়ি নিয়ে এগিয়ে আসে। জানতে চায়, এখন কোথায় যাবেন?

– ব্যানার্জির নার্সিং হোমে। নবনীতার জ্ঞান হয়েছে কিনা জানতে।

নার্সিং হোমে যাওয়ার পথে বাসু বললেন, আমাকে নামিয়ে দিয়ে তোমরা গাড়িটা নিয়ে চলে যাও। ‘পান্থজনসখা’ থেকে ওরা দু’জন কোথায় যেতে পারে তার সন্ধান নেবার চেষ্টা কর। আমি দেখি, নবনীতার জ্ঞান হয়েছে কিনা। তারপর ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাব।

তারপর হঠাৎ কী ভেবে বললেন, না থাক। তোমরা আমাকে এখানেই নামিয়ে দিয়ে যাও। আমি ট্যাক্সি নিয়েই ডাক্তারের কাছে যাব।

কৌশিক জানতে চায়, হঠাৎ আপনার এই মতের পরিবর্তন?

– আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোরসের ধারে কাছে কোন প্লেন ড্রেস গোয়েন্দা পাহারায় আছেন; পুলিসের লোক। অথবা ভৈরব দাশের। আমরা ওখান থেকে রওনা হয়েছি তো, সেও ঠিক আমাদের পিছন পিছন রওনা হয়েছে। পিছনের কোন গাড়িটায় সে আছে চেনা মুশকিল। সে জানতে চায় আমি এখান থেকে কোথায় যাচ্ছি। তুমি এক কাজ কর: বাঁদিকের লেনটা নাও। লাইন পেলেই নেক্সট ক্রসিংএ বাঁ-দিকে ঘুরে গাড়িটা দাঁড় করাবে। আমি টুক করে নেমে গেলেই তুমি স্টার্ট দেবে। যে লোকটা দু-তিনখানা গাড়ি পিছনে থেকে আমাদের ফলো করছে সে তোমাকেই ফলো করে চলে যাবে। টের পাবে না আমি নেমে গেছি। যখন পাবে তখন বোকা হবে। ও তোমাদের দু’জনকে ফলো করছে না।

কৌশিক গাড়ি চালানোর বিদ্যায় পারদর্শী। পরের মোড়ে বাঁক নিয়েই একটা স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো মিনিবাসের সামনে গিয়ে দাঁড় করালো গাড়িটা। বাসু-সাহেব অত্যন্ত দ্রুতগতিতে গাড়ি থেকে নেমে উঠে বসলেন মিনিবাসে। বাসটা কোথায় যাচ্ছে না জেনেই। কৌশিক গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসালো।

বাসু-সাহেব দুস্টপ গিয়ে ভাড়া দিয়ে নেমে পড়লেন। কারণ গন্তব্যস্থলের বিপরীত দিকে বাহিত হচ্ছিলেন তিনি। নেমেই একটি পাবলিক বুথ পেলেন। টেলিফোন করলেন সানি-সাইড নার্সিং হোমে। রিসেপশনিস্ট জানালো ডাক্তার ব্যানার্জি আছেন। অচিরেই যোগাযোগ হল।

বাসু জানতে চাইলেন, আমার রোগিণী কেমন আছে গো?

– এক নম্বর না দু নম্বর?

– না, না, পান্থজনসখার পেসেন্ট নয়, তোমর নার্সিং হোমে যে মেয়েটি আছে, নবনীতা?

– ভালই। কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে। জেগে আছে এখন।

– মেয়েটি তোমার ওখান থেকে চুপিসাড়ে কেটে পড়তে পারবে না তো?

– অসম্ভব! এখানকার নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র। তিন শিফটে পাহারার ব্যবস্থা।

– ঠিক আছে। আমি আধঘণ্টার মধ্যে নার্সিং হোমে পৌঁছে যাব। তখন নবনীতার সঙ্গে কথা বলা যাবে।

ডক্টর ব্যানার্জি তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করে ওঠেন, সরি, স্যার! পুলিসের ইন্সট্রাকশন আছে রোগিণীর জ্ঞান হলে সবার আগে তাদের খবর দিতে হবে। হোমিসাইডের আফিসার এসে সবার আগে ঐ নবনীতার সঙ্গে কথা বলবে।

বাসু-সাহেব বলেন, তা তুমি পুলিসকে জানিয়েছ যে, রোগিণীর জ্ঞান হয়েছে?

– না। রোগিণী যতক্ষণ নার্সিং হোমে আছে ততক্ষণ সে কখন বাইরের লোকের সঙ্গে কথা বলবে সেটা নির্ধারণ করব আমি। নার্স আমাকে জানিয়েছে যে, নবনীতার ঘুম ভেঙেছে। এবার আমি তাকে পরীক্ষা করব। তারপর হোমিসাইড সেকশনকে জানানো হবে।

– কিন্তু যতদূর মনে পড়ছে, তুমি বলেছিলে যে, আমরা ব্র্যাকেটে ফার্স্ট। দু পক্ষকেই একসঙ্গে জানানো হবে? তার কী?

– তাই তো হল। আপনাকে তো জানালাম রোগিণীর জ্ঞান ফিরে এসেছে।

লাইন কেটে দিলেন ডক্টর ব্যানার্জি।

আধঘণ্টাখানেক পর ট্যাক্সি নিয়ে বাসুসাহেব এসে হাজির হলেন সানি-সাইড নার্সিং হোমে। ডাক্তার ব্যানার্জি ঘরেই ছিলেন। বাসু জানতে চাইলেন, নবনীতার জ্ঞান হয়েছে এ খবর হোমিসাইডকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছ?

– হয়েছ। রোগিণীকে আমি পরীক্ষা করে দেখেছি। ওর পূর্ণ জ্ঞান হয়েছে। একটু দুর্বল, হয়তো মাথার মধ্যে ঘুমের জড়তাটা সম্পূর্ণ কাটেনি। তবে প্রশ্নোত্তরের ক্ষমতা সে ইতিমধ্যেই লাভ করেছে। আমি ওকে একটু চিকেন অ্যাসপ্যারাগাস সুপ খাওয়াতে বলেছি। বোধহয় এখন সে তাই খাচ্ছে।

– পুলিসকে কতক্ষণ আগে জানানো হয়েছে?

– মিনিট-পাঁচেক। লালবাজার হোমিসাইডের ইন্সপেক্টর দাশকে।

– তার মানে আরও আধঘণ্টা সময় আছে। তার আগে আমি কি নবনীতার সঙ্গে একটু –

কথাটা শেষ করার সুযোগ পেলেন না। ডাক্তার ব্যানার্জি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন, বাই নো মীনস্!

একটু ভেবে নিয়ে বাসু বলেন, তোমার অবস্থাটা বুঝতে পারছি। পুলিসের ইনস্ট্রাকশন তোমাকে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে। কিন্তু পুলিস ওকে জেরা করার আগে আমার যে নবনীতার কাছ থেকে দু-চারটে কথা জেনে নেওয়া দরকার!

ব্যানার্জি জবাব দিলেন না। একটা রিপোর্টের দিকে তীক্ষ্ণ অভিনিবেশসহ কী যেন দেখতে থাকেন।

বাসু আবার প্রশ্ন করে, এ নার্সিং হোমের ব্যবস্থাপনা আমার জানা নেই। তুমি সাজেস্ট কর। তোমাকে না ফাঁসিয়ে আমি কী ভাবে নবনীতার সঙ্গে দেখা করতে পারি?

– আমাকে না জানিয়ে।

– সেটা কী ভাবে সম্ভব?

– তা আমি জানি না।

বলেই উনি কলিংবেল বাজালেন। একটি অল্পবয়সী নার্স এসে বললে, ডাকছিলেন, স্যার?

– হ্যাঁ, শোন, তুমি নবনীতার কেবিনে চলে যাও। দুশ তিন নম্বর কেবিনে। সন্ধ্যা এখন ও ঘরে ডিউটিতে আছে। তাকে বল, রোগিণীর রিপোর্টটা নিয়ে আমার সঙ্গে এক্ষুনি দেখা করতে।

– ইয়েস, স্যার। – দ্রুতপদে নার্সটি নিষ্ক্রান্ত হয়ে যায়।

ব্যানার্জি বলেন, সন্ধ্যার হেপাজতেই নবনীতা বর্তমানে আছে। সন্ধ্যা এখানে এলে আমি ওকে একটা প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দেব। ও আমাদের ডিস্পেনসারি থেকে ওষুধটা বানিয়ে আনতে যাবে। তা মিনিট পনের লেগে যাবে। নবনীতা দোতলার তিন নম্বর কেবিনে একাই আছে। কিন্তু পুলিস এসে পড়ার আগে তার ঘরে কেউ যেতে পারবে না! এটা আমার স্ট্রি অর্ডার।

বাসু-সাহেব বলেন, বুঝলাম।

একটু পরেই নার্স সন্ধ্যা একটা চার্ট হাতে এসে উপস্থিত হল। ডাক্তার ব্যানার্জি তাকে দু একটা প্রশ্ন করলেন রোগিণীর সম্বন্ধে। টেম্পারেচার, ব্লাডপ্রেশারের রির্পোট দেখলেন। তারপর সন্ধ্যার হাতে প্রেসক্রিপশনটা ধরিয়ে দিতে দিতে বাসু-সাহেবকে বললেন, আয়াম এক্সট্রিমলি সরি, স্যার। পুলিসের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত মিস নবনীতা রায় কোনও ভিজিটরের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। আপনি আসুন…

বাসু-সাহেব ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। একটু পরেই দেখতে পেলেন সন্ধ্যা ডিস্লেল্পনসারির দিকে চলে গেল। উনি গুটিগুটি এগিয়ে এসে ঢুকে পড়লেন লিফটের গর্ভে।

দু মিনিট পরে বাসু উপস্থিত হলেন দু শো তিন নম্বর কেবিনের সামনে। পর্দা সরিয়ে দেখলেন, ঘরে রোগিণী ছাড়া আর কেউ নেই। নবনীতা আধশোয়া অবস্থায় বসে আছে– পিঠে বালিশের ঠেকা। ওর সামনে বিছানার দু’দিকে দুটি করে পায়া রেখে বসানো আছে একটা হালকা অ্যালুমিনিয়ামের টেবিল। তার উপর চীনামাটির পাত্রে সৃপ। নবনীতা একমনে সৃপ খাচ্ছিল। বাসু-সাহেবকে দেখে হাসল। বলল, কখন আমাকে ছুটি দিচ্ছেন ডাক্তারবাবু?

বাসু বুঝতে পারেন ও ভুল করেছে। বাসু-সাহেবকে নার্সিং হোমের কোন ডাক্তার হিসাবে ধরে নিয়েছে। জবাবে উনি বললেন, তুমি একটু সুস্থ হলেই– এত তাড়া কিসের? হাতে-পায়ে আর একটু বল হোক। এখন ঘুমটা একেবারে ছুটে গেছে তো?

– বিলকুল!

– কাল সন্ধ্যার কথা সব মনে পড়ছে?

নবনীতা এবার ভাল করে তাকিয়ে দেখল। বলল, আপনি তো ডাক্তারবাবু নন।

– না, আমি এ নার্সিং হোমের ডাক্তার নই। আমার নাম পি. কে. বাসু–

– ব্যারিস্টার পি. কে. বাসু?

– তা বলতে পার।

– ডাক্তারবাবু বলেছেন আপনিই আমাকে কাল উদ্ধার করেছিলেন–

– হ্যাঁ, কারণ তুমি আমাকেই ফোন করেছিলে।

– হ্যাঁ, তার কারণ আপনার সঙ্গে রাত সাড়ে নটায় আমার দেখা করার কথা ছিল। যখন বুঝলাম যে আমার পক্ষে সেটা হবে না তখন আপনাকে টেলিফোনে…

– কী করে বুঝলে যে, সাড়ে নটায় তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না?

– বাঃ তখন যে বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে…

– আই সী! রাত তখন কটা হবে মনে হয়?

– রাত ঠিক আটটায় আপনাকে ফোন করেছিলাম।

– তুমি তোমার ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছ ক’টা নাগাদ?

– ধরুন সাড়ে সাত।

– আমি তোমার ঘরে যখন উপস্থিত হই তখন তুমি কার্পেটের উপর লুটিয়ে পড়েছিলে। টেলিফোন যন্ত্রটা মাটিতে নামানো। তোমার একপায়ে চটি ছিল, এক পায়ে ছিল না। তুমি কি টেবিলে বসে টেলিফোনে কথা বলতে বলতে টেলিফোনসহ পড়ে গেছিলে?

– কী জানি স্যার, কিছু মনে নেই। এটুকু মনে আছে যে, আমার প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম ঐ চকলেটের মধ্যে ঘুমের ওষুধ মেশানো আছে। কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার। কোনক্রমে আমার ঠিকানাটা বলতে পেরেছিলাম। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল। বলেছিলাম, একজন ডাক্তার ডাকতে।

– ঠিক তাই। তুমি চকলেটগুলো কোথায় পেলে?

– একটা পলিথিনের ব্যাগে। কাকলি আমাকে পাঠিয়েছিল – ঐ চকলেটের প্যাকেট আর একটা শাদা ডায়েরি।

– কাকলিই যে পাঠিয়েছে তা বুঝলে কী করে?

– একটা চিরকুটে তাই লেখা ছিল।

– তুমি প্যাকেটটা পেলে কোথায়? কার কাছে?

– ‘সোনালি স্বপন’ রেস্তোরাঁয়। আমার নাম করে কেউ দিয়ে গিয়েছিল। দারোয়োনের হাতে দারোয়ান কাউন্টারে জমা দেয়। দারোয়ানকে কে দিয়েছে তা আমি জানি না। তবে কাকলি আমাকে আগেই জানিয়েছিল যে, সে দোকানে ফিরেই আমাকে একটা শাদা ডায়েরি পাঠিয়ে দেবে। তার সঙ্গে এক প্যাকেট অত দামী চকলেটও যে পাঠাবে তা আমি ভাবতেই পারিনি।

– ওটা তোমার ভুল ধারণা নবনীতা চকলেটের প্যাকেটটা কাকলি তোমাকে পাঠায়নি। অন্য কেউ পাঠিয়েছিল – যে তোমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল– কাকলির কোনও ‘মোটিভ’ নেই, কোনও উদ্দেশ্য নেই তোমাকে হত্যা করার! তাই নয়?

নবনীতার সৃপ খাওয়া শেষ হয়েছে। বাসু-সাহেব সূপের বাটিটা খাটের নিচে নামিয়ে রাখলেন। অ্যালুমিনিয়ামের টেবিলটাও

নবনীতা বললে, আপনি যখন বলছেন, তখন তাই। আর সে-কথাও সত্যি। কাকলি খামোকা আমাকে বিষ-মেশানো চকলেট খাওয়াতে চাইবে কেন? তার কী স্বার্থ?

বাসু সেকথার জবাব না দিয়ে বলেন, চকলেটগুলো তুমি কখন খেতে শুরু করেছিলে? সোনালী স্বপনে বসেই, নাকি বাসে আসতে আসতে?

– না, না, বাড়ি এসে তারপর আমি প্যাকেটের দড়িটা খুলে দেখি ওতে ডায়েরির সঙ্গে এক প্যাকেট চকলেটও আছে। তখনি খেতে শুরু করি।

– সে কী! তুমি সাড়ে সাতটায় বাড়িতে এসেছিলে, আর আমাকে ফোন করেছিলে রাত আটটায়। মাত্র আধঘণ্টায় ছ-ছটা পেপার কাপের অত বড় চকলেট খেয়ে ফেললে তুমি?

খিলখিল করে হেসে ওঠে নবনীতা। বলে, ছটা সন্দেশ বা ছটা রসগোল্লা খেতে আপনার কতক্ষণ সময় লাগে?

– ছটা মিষ্টি আমি একসঙ্গে খেতেই পারি না নীতা; কিন্তু আমার কথা তো হচ্ছে না–

– ঠিক কথা! হচ্ছে আমার কথা! জানেন, এক সময় আমি চকলেট তৈরির কারখানায় কাজ করতাম। মালিকের সঙ্গে বা আমাদের সুপারভাইজারের সঙ্গে মন কষাকষি হলে আমি টপাটপ্ চকলেট খেয়ে শোধ তুলতাম।

বাসু বললেন, একটা কথা বুঝিয়ে বল তো নীতা। তুমি যখন আমাকে ফোন করতে করতে থেমে গেলে তখন আমি একটা শব্দ শুনেছিলাম– চেয়ার থেকে কেউ উল্টে পড়ে গেল। সেটা নিশ্চয় তুমি। কারণ তোমাকে যখন আমি আবিষ্কার করি তখন তুমি কার্পেটের উপর লুটাচ্ছ। তোমার একপায়ে স্লিপার, অপর পায়ের চটিটা ছিটকে দূরে পড়েছে। তোমার স্নানঘরে কলের জলটা পড়ে যাচ্ছে…

– হতে পারে। সবই হতে পারে। সে সময়ের কথা আমার কিছু মনে নেই।

– স্বাভাবিক। তুমি তখন ঘুমে ঢলে পড়ছ। কিন্তু একটা জিনিসের অর্থ আমি বুঝতে পারিনি। তুমি উল্টে পড়ার পর তোমার হাত থেকে টেলিফোনটা নিশ্চয় ছিটকে পড়ে যায়। তাই সেটা ডেড হয়ে যায়। কিন্তু মিনিটখানেক পরে আবার আমি ডায়াল টোন শুনতে পেলাম। এটা কেমন করে হল?

নবনীতা সবিস্ময়ে প্রতিপ্রশ্ন করে, আপনার প্রশ্নটা আমি বুঝতে পারছি না, স্যার!

– তোমার টেলিফোনে ডায়াল-টোন ফিরে আসা– যা আমি মিনিটখানেক পরে শুনতে পাই– তার একমাত্র অর্থ হতে পারে; কেউ ওই টেলিফোনের জঙ্গম অংশটাকে তার স্থাবর ধারক অঙ্গে স্বস্থানে বসিয়ে দিয়েছিল। তুমি পড়ে যাবার মিনিটখানেক পরে। এটা কী করে হল?

– নবনীতা বলে, আপনি টানা একমিনিট আপনার যন্ত্রটা কানে লাগিয়ে বসেছিলেন?

– হ্যাঁ, ছিলাম। আমি শুনতে চেয়েছিলাম কোনও কুকুরের ডাক, কোনও টিভির প্রোগ্রাম, কোনও মন্দিরের কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ ওই মাটিতে পড়ে থাকা জঙ্গম অংশটার ‘কথামুখ’ থেকে ভেসে আসে কিনা। কারণ তোমার ঠিকানা আমার জানা ছিল নাণ একটা ক্লু খুঁজছিলাম। পুরো এক মিনিট!

নবনীতা নতমস্তকে কী যেন চিন্তা করল কিছুক্ষণ। তারপর বললে, কোনও ‘ক্লু’ পেলেন না?

– পেলাম তো! ওই ‘ডায়াল-টোন’। তোমার টেলিফোন-নাম্বার জানা থাকলে আমি সেই নম্বর ডায়াল করে দেখতাম ডায়াল টোনটা রিঙিং টোনে পরিবর্তিত হয়ে যায় কি না।

নবনীতা বললে, ওতে কিছুই প্রমাণ হয় না। আমি ইয়েল-লক লাগানো ঘরের ভিতর কার্পেটের ওপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছি। এ নিশ্চয় কোন গণ্ডগোল। যান্ত্রিক গোলযোগ। সে ক্ষেত্রে টেলিফোনটা কী করে স্বস্থানে ফিরে আসবে? অসম্ভব!

– তুমি নিজেই রাখনি তো?

– কী বলছেন! নিশ্চয় না!

– কী করে জানলে? তোমার তো সে সময়ের কোন কথাই মনে পড়ছে না। এমনকি চেয়ারে বসে টেলিফোনে কথা বলতে বলতে তুমি যে পড়ে গিয়েছিলে সে কথাও তো তোমার মনে নেই। তাহলে, কী করে জানলে যে, তুমি নিজেই টেলিফোনটা ধারকযন্ত্রে বসিয়ে দাওনি?

নবনীতার ভ্রূকুটি হল। বললে, আপনি এমনভাবে জেরা করছেন যেন আমি কাঠগড়ায় উঠেছি। একটা লোক যদি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে থাকে তাহলে সেই অজ্ঞান অবস্থায় সে টেলিফোনটা স্বস্থানে বসাতে পারে? অবাস্তব কথা বলছেন কেন?

বাসু বললেন, কিন্তু একটা কথা, নীতা। আমরা যখন তোমাকে আবিষ্কার করি, তখন তালা খুলে ঘরে ঢুকে–

– তালা খুললেন কী ভাবে?

– বাড়িওয়ালার কাছে একটা ডুপলিকেট চাবি ছিল–

– হ্যাঁ, ঠিক কথা। ওটার কথা আমার মনেই ছিল না। যদি পথে-ঘাটে দরজার চাবিটা হারিয়ে ফেলি তাই ডুপলিকেট চাবিটা ওঁর কাছে রাখা ছিল বটে। আপনি ক’টার সময় আমাকে উদ্ধার করেন?

– পৌনে দশটায়। তালা খুলে ঘরে ঢুকে দেখি তুমি কার্পেটের উপর উপুড় হয়ে পড়ে আছ। কিন্তু আশ্চর্যের কথা – টেলিফোনটা টেবিলে নয়। কার্পেটের উপর। আর টেলিফোনের রিসিভারটা মাটিতে পড়ে নেই– সাবধানে ক্র্যাডরে উপর বসানো। তার মানে, ঘণ্টাখানেক আগে আমি যেডায়াল টোন শুনেছি তা ভুল নয়।

নবনীতা অনেকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল।

তারপর অবাক হয়ে বলল, কিন্তু সেটা কী ভাবে হতে পারে? অজ্ঞান অবস্থায় আমি নিশ্চয় হাত বাড়িয়ে টেলিফোনটা ক্র্যারে উপর স্বস্থানে বসিয়ে দিইনি। অথবা টেলিফোনটা টেবিল থেকেকার্পেটে নামাইনি।

– না, দাওনি। এটা থেকে প্রমাণ হয় যে, তুমি অজ্ঞান হয়ে চেয়ার থেকে উল্টে পড়ার পরে এবং আমি ও-ঘরে ঢোকার আগে, অর্থাৎ রাত আটটা বেজে দুই মিনিটের পরে এবং নয়টা পঁচিশের আগে কেউ-একজন তালা খুলে তোমার ঘরে ঢুকেছিল। খুব সম্ভব আটটা পাঁচের আগে, যে সময় আমি তোমার ডেড-টেলিফোনে আবার ডায়াল-টোন শুনতে পাই।

– এসব কী বলছেন আপনি?

বাসু-সাহেব এক নিঃশ্বাসে বলে চলেন, লোকটা হয়তো ঘরের ভিতরেই ছিল, ঠিক যখন তুমি পড়ে যাও।

– আজ্ঞে না। ঘরের ভিতর কেউ ছিল না। ইয়েক-লক লাগানো তালা-বন্ধ ঘরে আমি একাই ছিলাম।

– সে ক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে লোকটা তোমার দরজার সামনে অপেক্ষা করছিল। চেয়ারসমেত তোমার উল্টে পড়ার শব্দ পেয়ে সে ডুপলিকেট চারি দিয়ে তালা খুলে ঢোকে। বাথরুমের কলটা বন্ধ করে না, তোমাকে বাঁচাবার কোন চেষ্টা করে না, ডাক্তারকে বা পুলিসে ফোন করে না, বাতির সুইচটাও অফ করে দেয় না। শুধু, হাতে রুমাল জড়িয়ে টেলিফোনটা ক্র্যাডলে যন্ত্রে বসিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে চলে যায়। যাবার সময় দরজাটা আবার টেনে লক করে দেয়।

নবনীতা রুখে ওঠে, এটা কি কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব?

– না। শতকরা নিরানবুই জনের পক্ষে অসম্ভব; কিন্তু ওই ব্যতিক্রমটির পক্ষে সম্ভব।

– ব্যতিক্রম! ব্যতিক্রমটি আবার কে?

– যে তোমাকে বিষ-মেশানো চকলেট পাঠিয়েছিল। সে লোকটা যে কে, আমি তা জানি না, আন্দাজ করতেও পারি না। কিন্তু তুমি হয়তো আন্দাজ করতে পার: সে হয়তো তোমার চরম শত্রু। তোমার মৃত্যু কামনা করছে–

নবনীতা ধীরে ধীরে দু’দিকে মাথা নাড়ল।

– বুঝলাম। এমন চরম শত্রুর কথা তুমি চিন্তাই করতে পারছ না। তাহলে আমাকে অন্যদিক থেকে প্রবলেমটা ট্যাক্স করতে হবে। তোমার ডুপলিকেট চাবি ছিল বাড়িওয়ালার কাছে। তার পক্ষে কী এ কাজ সম্ভব?

নবনীতা অবাক হয়ে বলে, মেসোমশাই? তিনি আমাকে মেয়ের মতো স্নেহ করেন।

– মেয়ের মতো। না পুত্রবধূর মতো? তাঁর কাছে তো তোমার পরিচয় মিসেস হালদার।

নবনীতা চমকে ওঠে। বলে, আপনি কেমন করে জানলেন?

বাসু বলেন, সে প্রশ্ন অবান্তর। কিন্তু মেসোমশাই কি ‘ভাড়াটে উচ্ছেদ মানসে’ ওই কাজটা করতে পারেন?

– বিষ-মেশানো চকলেট পাঠানো?

– না। তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবার মিনিটখানেক পরে ঘরে ঢোকা? তোমাকে মরণোন্মুখ দেখে আশ্বস্ত হয়ে নিঃশব্দে কেটে পড়া?

– আমি স্বচক্ষে দেখলেও বিশ্বাস করতাম না। মেসোমশাই দেবতুল্য মানুষ।

– সে ক্ষেত্রে এই বাড়ির কোন যুবক? বাড়িওয়ালার ছেলে, ভাইপো, ভাগ্নে, জামাই, বাড়ির চাকর? যে তোমার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিল?

– না, না। এসব আপনার উদ্ভট কল্পনা।

– তাহলে এবার ট্রিপলিকেট চাবির প্রসঙ্গে আসতে হয়।

– ট্রিপলিকেট চাবি! মানে?

– জীবন হালদারের কাছে নিশ্চয় এ-ঘরের ট্রিপলিকেট চাবিটা আছে। মানে, সে সময়ে ছিল।

– না নেই। সে আজ মাসখানেকের ভিতর এ বাড়িতে আসেনি। আমার সঙ্গে তার দেখাই হয় না।

– তাহলে ট্রিপলিকেট চাবিটা কার কাছে আছে?

– তিন নম্বর চাবি যে আছেই এটা ধরে নিচ্ছেন কেন?

– যেহেতু এটা ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবার পর – সম্ভবত আটটা তিন বা চার মিনিটে – কেউ একজন তালা খুলে ঘরে ঢুকেছিল–

– সেটাই আপনার ভুল ধারণা। ট্রিপলিকেট চাবি নেই। কারও কাছেই নেই।

– বেশ। সে ক্ষেত্রে আমাকে বুঝিয়ে বল, কীভাবে তোমার হাত থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ে যাওয়া টেলিফোনের মাউথ-কাম-ইয়ার পীসটা ওই রিসিভারযন্ত্রের স্বস্থানে ফিরে গেল?

নীতা ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ে দু-হাতে রগদুটো চেপে ধরে। বলে, মাফ করবেন স্যার। আমি এখনো বেশ দুর্বল। বেশি কথা বলতে, চিন্তা করতে কষ্ট হচ্ছে আমার।

বাসু ঘড়ি দেখলেন। চট করে উঠে দাঁড়ালেন। বলেন, অলরাইট, প্রশ্নটা আপাতত মুলতুবি থাক। দুর্বলতাটা কমে গেলে তুমি বরং এ প্রশ্নের সমাধানটা ভেবে বার করার চেষ্টা কর। আর পুলিসের কাছে কী জবানবন্দি দেবে, কতটা স্বীকার করবে সেটাও ভেবে রেখ।

নীতা জবাব দিল না। বাসু দরজার কাছ থেকে আবার বললেন, আর একটা কথা:তোমার জ্ঞান হবার পর তোমাতে-আমাতে যা কিছু কথাবার্তা হয়েছে এ কথা কাউকে বল না।

নীতা জানতে চায়, কেন?

– তাহলে এ নার্সিং হোমের ডাক্তারবাবুর ক্ষতি হবে। আমি লুকিয়ে এসে তোমার সঙ্গে দেখা করেছি।

হঠাৎ কী যেন খেয়াল হয় নবনীতার। সে চারিদিকে একবার দেখে নিয়ে বলে: তাই তো। এটা তো একটা কেবিন। নার্সিং-হোম। সে কী! আমার তো যে কোন সরকারি হাসপাতালের ফিমেল-ওয়ার্ডে জ্ঞান হবার কথা।

– তাই হত। আমিই তোমাকে এই নার্সিংহোমে নিয়ে এসেছি।

– সে কী! খরচ দেবে কে? আমি তো…

– সে চিন্তা করতে হবে না। খরচ আমার…

– কিন্তু কেন? আপনিই বা অপরিচিত মানুষের জন্য এত টাকা খরচ করবেন কেন?

– তার আগে তুমি বল, কলকাতা শহরে এত এত টেলিফোনওয়ালা পরিচিত লোক থাকতে জ্ঞান হারাবার মুহূর্তে তুমি এই অপরিচিত আমাকেই বা ফোন করেছিলে কেন?

নীতা একটু বিহ্বল হয়ে পড়ে। বলে, আমি এতটা আশা করিনি। আপনি আমার জীবনদাতা। আমি কৃতজ্ঞ।

বাসু বললেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পুলিস এসে তোমাকে জেরা করবে। আমি চলি। দুটো কথা আপাতত মনে রেখ। এক নম্বর, তোমাতে-আমাতে কখনো দেখা হয়নি। দুনম্বর, চকলেটগুলো কাকলি তোমাকে পাঠায়নি। ও. কে.?

নীতা স্বীকার করে গ্রীবা সঞ্চালন করল।