কৌতূহলী কনের কাঁটা – ১৪

চৌদ্দ

আদালত থেকে ফিরে এসে সান্ধ্য চায়ের আসরে বাসু-সাহেব তাঁর স্ত্রীকে শোনাচ্ছিলেন সেদিন কোর্টে কেসটা কী ভাবে মোড় নিল।

সুজাতা বলে, একটা কথা, মামু। আইনের প্যাঁচে আপনি ছন্দার সঙ্গে ত্রিদিবনারায়ণের বিয়েটা নাকচ হতে দিলেন না। কিন্তু ত্রিবিক্রম কি কোনদিন ওকে পুত্রবধূ বলে স্বীকার করে নেবে?

বাসু বলেন, খুব সম্ভবত, না। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা ত্রিদিবের অ্যাটিচুড: আমি কাল জেল-হাজতে যাব। ছন্দাকে দিয়ে বিবাহ-বিচ্ছেদ দরখাস্তে সই করিয়ে আনব। ছন্দা ‘হেভি ড্যামেজ’ আর ‘অ্যালিমনি’ দাবী করবে। দশ লক্ষ টাকা।

– দশ লক্ষ! কী হেতু দেখাবে?

– নিষ্ঠুরতা। ত্রিদিব চরম বিপদের সময় স্ত্রীকে শুধু ফেলে পালিয়েই যায়নি। পুলিসের কাছে গিয়ে মিথ্যে এজাহার দিয়েছে। খবরের কাগজে তার স্টেটমেন্ট ছাপানো হয়েছে। তাছাড়া আজ প্রকাশ্যে-আদালত প্রাঙ্গণে স্ত্রীকে দ্বিচারিণী বলে ভর্ৎসনা করেছে। সে কারণেই বিবাহ-বিচ্ছেদ এবং খেশারদ।

রানু বললেন, আমার ধারণা: ত্রিবিক্রম দশ লক্ষ টাকার চেক লিখে দিয়ে বিবাহ-বিচ্ছেদটা এক কথায় মেনে নেবেন। কারণ ছয় মাসের মধ্যেই নিজের সমাজের কোন এক কোটিপতির মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেবেন। দশ লাখ টাকার উপর ‘সুদ টুকু কষে দহেজ দাবী করবেন। আদায়ও করবেন।

বাসু বললেন, আমি রানুর সঙ্গে একমত। দহেজ হিসাবে দশলাখ টাকা আদায় করতে পারুক-না-পারুক ছন্দার মতো একটি মেয়েকে তার ‘হাভেলি’তে সে কিছুতেই ঢুকতে দেবে না। ছন্দা যে কী পরিমাণ বিপদজনক তা ত্রিবিক্রম বুঝেছে। মাত্র সাতদিনে সে ত্রিদিবকে বাবার দুর্ভেদ্য দুর্গ থেকে বার করে এনেছিল।

কৌশিক বলে, কোথায়? নিজের চোখেই তো আদালতে দেখলেন, সে স্ত্রীকে ত্যাগ করে বাবার বগলের তলায় ফিরে গেল…

– সেটাই একমাত্র সত্য নয়, কৌশিক। এ-কথা তুমি অস্বীকার করতে পার না যে, ছন্দার প্রভাবে ত্রিদিব বাবাকে না জানিয়ে একজন সাধারণ নার্সকে রেজিস্ট্রি-বিয়ে করেছিল। হয়তো জীবনে প্রথম সে এ-ভাবে বাবার বিরুদ্ধে রুখে ওঠে। বিদ্রোহী হবার হিম্মৎ হয় তার!

হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠল। রানু ধরলেন, ফোন করছেন ডক্টর ব্যানার্জি।রিসিভারটা স্ত্রীর হাত থেকে নিয়ে বাসু বললেন, কী ব্যাপার? তোমার না আজ সকালে কলকাতার বাইরে যাবার কথা? কোথায় যেন টিকিট কেটেছ, হোটেল রিজার্ভ করেছ…

– সব ভেস্তে গেছে, স্যার! কাল লালবাজারে আমাকে ওরা পেড়ে ফেলবার নানান চেষ্টা করে। আমি কিছুই স্বীকার করিনি। মানে, শনিবার রাত্রের…

– থাক, থাক। তোমার টেলিফোনটা ‘বাগ’ হয়ে থাকতে পারে!

– বুঝেছি। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে লালবাজার থেকে আমার উপর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোন প্রয়োজন কলকাতার বাইরে গেলে আমার ঠিকানা যেন নার্সিংহোমে রেখে যাই। এবং ঠিকানা বদলালে তা যেন আমার কফিডেশিয়াল নার্সকে টেলিফোনে বারে বারে জানাই এসব বিষয়ে আপনার সঙ্গে কিছু পরামর্শ করতে চাই। মানে সামনাসামনি বসে। টেলিফোনে নয়। কখন আসব?

বাসু বললেন, এ বিষয়ে আলোচনার কিছু নেই, ডাক্তার। তোমার মতো বিখ্যাত ডাক্তারের পক্ষে তোমার গতিবিধি নার্সিংহোম-এর কফিডেনশিয়াল নার্সের জানা থাকা আবশ্যিক। তারপর এ বিষয়ে যদি লালবাজার থেকে বিশেষ নির্দেশ এসে থাকে তবে আর আলোচনার কী আছে? তুমি কলকাতার বাইরে যাচ্ছিলে স্বাস্থ্যের কারণে। ফলে আমার সঙ্গে পরামর্শের কিছু নেই। তোমার ফিজিশিয়ানের সঙ্গে পরামর্শ কর।

টেলিফোনটা নামিয়ে রাখলেন বাসু।

পরদিন দেখা করতে এল বটুক দত্ত। তারাতলার সেই পানওয়ালা। বাসু-সাহেব বললেন, তোমার আবার কী হল?

– বিপদে না পড়লে কে আর ডাক্তার-উকিলের কাছে দরবার করতে আসে? বলুন, স্যার?

– বল?

বটুক হাতদুটি জোড় করে গরুড়পক্ষীর ভঙ্গিতে বললে, আপনারে ট্যাকা পয়সা দিতে পারব না হুজুর, তবে হ্যাঁ, উগ্নারের বদলে উগ্নার কিছু করতে পারি।

– – আগে শুনি, তুমি কী কারণে আমার দ্বারস্থ হয়েছ, তারপর ওসব কথা হবে। সাধারণ মানুষ আইনের প্যাঁচে বিপদগ্রস্ত হলে আমি বিনা পারিশ্রমিকেও আইনের পরামর্শ দিয়ে থাকি। তুমি সঙ্কোচ কর না। তুমি আমাকে পান খাওয়াওনি বটে, তার কারণ বাঁধানো দাঁতে পান আমি চিবুতে পারি না। নাও শুরু কর–

– আপনি তো নিজের চোখেই দেখেছেন হুজুর, আমার পরিবার বড় এক-বঙ্গা। আমার শশুর ভীমা কৈবর্ত-মশাই ছিলেন একজন ডাকসাইটে ‘ইয়ে’ আর কি। পাঁচ-গাঁয়ের মানুষ তেনারে একডাকে চিনত। সদু আর কিছু পাক-না-পাক বাপের সেই একরোখা জিদ্দিবাজিটা পেয়েছে।

– ভূমিকা তো হল, এবার আসল কথাটা বল।

– পুলিশ-ইন্সপেক্টার-সাহেবকে আমরা যে জবানবন্দি সেদিন দিছিলাম, তার মধ্যে কিছু গড়বড় ছিল। মানে, আমাদের তিনজনের এজাহার তিন রকম হয়ে যাচ্ছে…

– তৃতীয়জন আবার কোত্থেকে এল? সৌদামিনীর পেটের সেই বাচ্চাটা?

– আজ্ঞে না হুজুর, সে তো মায়ের পেটে ঘুমুচ্ছে। সে শুনবে কেমন করে?

– এমন কাণ্ডও হয়, বটুক। তুমি শোননি? অভিমন্যু মায়ের পেটের ভিতর থেকেই চক্রব্যূহে ঢোকার পথটা চিনে নিয়েছিল।

– সে সব সত্য-ত্রেতা যুগে হত, স্যার। কলিযুগে হয় না। তিন নম্বর মনিষ্যি, দোতলার ডাক্তারবাবু – ডাক্তার নবীন দত্ত-সাহেব। তাঁরেও তো সে-রাত্রে ডেকে এনেছিলাম। তিনিও টর্চের আলোয় খোলা জানলা দিয়ে ও-বাড়ির ভিতরটা দেখেছিলেন। তাঁর টেলিফোনেই…

– হ্যাঁ, বুঝেছি। তা তোমাদের কী-বিষয়ে মত-পার্থক্যটা হচ্ছে?

আমাদের তিন জনের জবানবন্দিতে আর কোন ফারাক নেই। ঝামেলা বাধছে মাত্র একটা বিষয়ে। ঐ কলিং-বেলটা নিয়ে।…

– ‘কলিংবেল’টা মানে?

– ডাক্তারবাবুর মতে ঐ একটানা শব্দটা রেল-ইঞ্জিনের হুইসিল।

– রেল-ইঞ্জিন তারাতলা রোডে কেমন করে আসবে?

– আসে, হুজুর। রেল-ইঞ্জিন আসে না, তার বাঁশির শব্দ আসে। নিষুতি রাতে মাঝের-হাট ব্রিজের তলা দিয়ে যদি কোনও ইঞ্জিন একটানা হুইসিল বাজাতে-বাজাতে না থেমে চলে যায় তাহলে তার শব্দ আমাদের পাড়া থেকে শোনা যায়।

– বুঝলাম। ডাক্তারবাবুর মতে, ঘটনার সময়– মানে কমলেশ যখন খুন হচ্ছে– তখন বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ ‘কল বেল’ বাজাচ্ছিল না – ঐ সময় মাঝের-হাট ব্রিজের তলা দিয়ে একটা এঞ্জিন হুইসিল বাজিয়ে চলে যাচ্ছিল। তা, তোমার ঘরওয়ালী কী বলছে?

– তার মতে ঐ সময় পাশের বাড়িতে টেলিফোন বাজছিল – মানে ঐ কমলবাবুর ঘরেই।

– আর তোমার কী মনে আছে?

– আমার স্পষ্ট মনে আছে হুজুর, ওটা কমলবাবুর বাড়ির কলিংবেলের শব্দ। প্রথম কথা, টেলিফোনের শব্দ কখনো একটানা বাজে না, থেমে-থেমে বাজে। আমার একার নয়, ডাক্তারবাবুরও স্পষ্ট মনে আছে শব্দটা ছিল একটানা। সদু– মানে আমার পরিবার, কিছুতেই মানবে না। মেয়েটা এমনিতেই একরোখা, জেদী, পোয়াতি হয়ে যেন মাথা কিনেছেন– জিদ্দিবাজি আরও বেড়ে গেছে।

– সদুর কথা থাক; কিন্তু তুমি আর ডাক্তারবাবু কেন একমত হতে পারছ না?

– ডাক্তারবাবু একটা কথা খেয়াল করছেন না। রেল ইঞ্জিনের শব্দে বেশ কিটুটা চন্দবিন্দুর ভেজাল থাকে…

– কী ভেজাল থাকে?

– আজ্ঞে ঐ ‘চন্দরবিন্দু’ আর কি! ঙ-ঞ জাতীয় শব্দে যা থাকে।

– বুঝেছি। আনুনাসিক শব্দ।

– আজ্ঞে তাই হবে হয়তো। ঐ আওয়াজে চন্দরবিন্দুর কোন ভেজাল ছিল না। ওটা তাই ইঞ্জিনের হুইসেল নয়। কলিং বেল।

– বেশ তো। তা আমার কাছে কী পরামর্শ চাইতে এসেছ?

– ডাক্তারবাবুর কথা ছাড়ান দ্যান। আমরা মাগ্-ভাতারে যদি দু-জনে দু-রকম কথা বলি, তাহলে কি আমাদের ধরে চালান দেবে না?

– তা কেন দেবে? দু-জনের অভিজ্ঞতা দু-রকম তো হতেই পারে। হলপ নিয়ে সাক্ষীর কাঠগড়ায় নিছক সত্যি কথাই তো বলতে হবে।

– অ্যাই দেখুন! তাই নয়? অথচ মুখুজ্জে-সাহেব বলছেন…

– কোন মুখার্জি-সাহেব?

বটুক দু-হাতে নিজের কান স্পর্শ করে জিব বার করল। বলল, মুখ-‘ফকসে’ বলে ফেলেছি, হুজুর। পুলিশ সাহেব পই-পই করে বারণ করেছেন। শাসিয়ে রেখেছেন– কথাটা পাঁচকান হলে আমার জিব উপড়ে নেবেন।

– ও বুঝেছি! ইন্সপেক্টর অসীম মুখার্জী! সে বুঝি তোমাকে তালিম দিতে গেছিল। কাঠগড়ায় উঠে কী বলতে হবে। তাই নয়?

– আজ্ঞে হ্যাঁ, হুজুর। কথাটা গোপন রাখবেন স্যার। পুলিশের কাছে একবার যে এজাহার দিয়েছি, কাঠগড়ায় ডাঁইরে তার একটি কথা কি বদলাতে পারি? তাইলে জেল হয়ে যাবে না?

– না, বটুক। তা যাবে না। পুলিসের কাছে প্রথম যে জবানবন্দি দিয়েছ তার কিছুটা পরিবর্তন তুমি অনায়াসে করতে পার সাক্ষী দিতে উঠে। বলতে পার, পরে ভেবে দেখেছ আগেকার দেওয়া এজাহারটা ভুল। শপথ নিয়ে তুমি একবারই সাক্ষী দিচ্ছ আদালতে, – প্রথমবার পুলিসের কাছে যে এজাহার দিয়েছ, তা তো শপথ নিয়ে নয়!

বটুক এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে একটু ঝুঁকে সামনের দিকে এগিয়ে এল। নিচু গলায় প্রায় ফিস্-ফিস করে বলল, তাইলে এট্টা কথা বলব, হুজুর? ভয়ে বলব না নিভ্যয়ে বলব?

– ভনিতা করছ কেন? যা বলবে বল না। আমি কাউকে জানাতে যাব না।

– মুখুজ্জে-সাহেব বলছেন আমারে কবুল করতে হবে যে, আমি টর্চের আলোয় দেখতে পেয়েছিলাম যে লোকটা ফুটপাতে দাঁইড়ে ‘কলিং বেল’ বাজাচ্ছিল সে পুরুষ মানুষ। মুখ দেখতে পাইনি, কিন্তু তার পরনে ছিল প্যান্ট-শার্ট! এ নাকি নিয্যস স্বচক্ষে দেখিচি।

বাসু পাইপে বার দুই টান দিয়ে বললেন: হুঁ! অথচ আসলে তা তুমি দেখনি?

– আজ্ঞে না, হুজুর। আমি ও-বাগে টর্চ ফোকাসই করিনি।

– করলে, মানে ওদিকে টর্চের আলো ফেললে, তুমি তোমার ঘরের জানলা থেকে দেখতে পেতে: কে বেলটা বাজাচ্ছে?

– আজ্ঞে, হ্যাঁ। তা দেখা যায়। কিন্তু হক্কথা বলব: ও-বাগে আমি টর্চের আলো একবারো ফেলিনি। মানে আমার যদ্দুর মনে পড়ে…

– ডাক্তারবাবুর কদ্দূর মনে পড়ে? মানে টর্চের আলো ফেলার বিষয়ে?

– না, হুজুর। ডাক্তারবাবুকে আমি যখন ডাকতে যাই তখন তো কলিং বেল বাজানো বন্ধ হয়ে গেছে।

– তবে যে ডাক্তারবাবু বললেন, এঞ্জিনের শব্দ?

– সে তো উনি নিজের খাটে শুয়ে শুয়ে শুনেছেন। তখনও আমি ওঁরে ডাকিনি। উনি যখন এসে দেখেন তখন ওই যে-লোকটা কলিং বেল বাজাচ্ছিল সে চলে গেছে।

বাসু বললেন, বুঝলাম। তা সৌদামিনী কী বলছে? ওই টর্চের আলো ফেলার বিষয়ে?

– ওই তো আমারে এখানে পাঠাল। আপনার কাছে জেনে যেতে যে, ওর আগেকার দেওয়া জবানবন্দিটা ও বদল করতে পারে কি না। নতুন করে বলতে পারে কি না যে, ও কিছুই দেখেনি, কিছুইশোনেনি। জানলার বাগে ও প্রথমটায় যায়নি।

– তাতে কী লাভ?

– তাহলে আমি বলতে পারি যে, আমি একাই জানলা দিয়ে টর্চের আলো ফোকাস করে মেঝেতে একটা লোকের নিথর ঠ্যাং দেখতে পাই; আর টর্চের আলোটা ওই সদর-দরজার বাগে ফোকাস করে দেকিচি ফুটপাথে ডাঁইড়ে কলিং বেলের বোতামের গলা কে টিপে ধরেছিল। তারপর আমি সদুরে ডাকি। সে জানলার বাগে সরে আসে। দেখে, শুধু ওই নিথর ঠ্যাংখানা। ততক্ষণে ফুটপাথে ডাঁইড়ে যে কলিংবেল বাজাচ্ছিল, সে ভাগলবা।

– এ ভাবে মিথ্যে সাক্ষী দেওয়ায় লাভ?

বটুক মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে থাকে। নীরব।

– বুঝলাম। তাতে তোমার কিছু আর্থিক লাভ হবে। তা মিথ্যে সাক্ষীই যদি দেবে তাহলে দু-জনেই তা দিচ্ছ না কেন? তোমরা স্বামী-স্ত্রীতে তো একই কথা বলতে পারো–

– কী কথা?

– ঐ মুখার্জি-সাহেব যে কথা বলতে বলছে। যে, তোমার পরিবার যখন জানলার কাছে সরে আসে তখনই তুমি টর্চের আলোটা রাস্তার দিকে ফেলেছিলে। তোমরা দু-জনেই দেখতে পাও যে, ফুটপাথে ‘ডাঁইড়ে’ যে মানুষটা ‘কল-বেল’বাজাচ্ছে তার পরনে শার্ট-প্যান্ট! তাহলে কি মুখার্জি সাহেব তোমাকে যত টাকা দেবে বলেছে তার ডবল-টাকা দেবে না? দু-জন সাক্ষী একই কথা বললে তো ওদের কেসটা আরও জোরদার হয়।

– তা হয় হুজুর। ডবল না দিলেও আমারে যত ট্যাকা বশিস্ দেবে বলেছে, তার দেড়া দেবে নিশ্চয় – মানে ঠিক মতো দরাদরি করতে পারলে। কিন্তু মুঙ্কিল কী হয়েছে জানেন হুজুর? সদু সাহস পাচ্ছে না।

– সে কী! এই যে বললে, সে খুব ডাকাবুকো। তার বাপ ভীমা ডাকাতের মতো?

– না, হুজুর ‘ডাকাত’ কথাটা আমি বলিনি। ব্যাপারটা কী জানেন? সদূর সব বীরত্ব শুধু আমার উপর। পুলিশকে ও ভীষণ ডরায়। এটাও ওর বাপের কাছ থেকে পাওয়া। ভীমা কৈবর্ত কি কম ঠ্যাঙানি খেয়েছে পুলিশের হাতে। সদুর আদালত অভিজ্ঞতাও আছে। বাপের কেস শুনতে গেছিল। সাক্ষীর কাঠগড়ায় উকিলবাবুরা যে কীভাবে নাকাল করে তা ও জানে। তাই ও এখন এজাহার দিতে চায় যে, সে বিশেষ কিছু দেকেনি।

– বুঝলাম। তা মুখার্জি-সাহেব কত টাকা দেবে বলেছে?

বটুক ঘাড় চুলকে বললে, পুলিশে আবারট্যাকা বকশিস্দ্যায় নাকি? এ ট্যাকা তো ওই রাও-সাহেব দিচ্ছে।

– রাও সাহেব? ত্রিবিক্রমনারায়ণ রাও?

– আজ্ঞে তিনি তো আর নিজে আমার কাছে আসেননি। আন্ডাদ করছি।

বাসু নীরবে কিছুক্ষণ ধূমপান করে বললেন, তা আমার কাছে ঠিক কী জানতে এসেছ, বটুক? আমার মনে হচ্ছে মন খুলে তুমি সব কথা এখনও বলতে সাহস পাচ্ছ না, তাই না?

– আজ্ঞে, তাই! আপনি ঠিকই আন্দাজ করছেন।

– কথাটা কী?

– আমরা মাগ-ভাতারে চাই না ওই নার্স-মেয়েটার – ওই আপনার মক্কেল আর কী– তার ফাঁসি হয়ে যাক।

ফাঁসিই যে হবে তা ধরে নিচ্ছ কেন?

– না হয়, মেয়াদই হল। ট্যাকার জোরে ওই অবাঙালি কোটিপতি লোকটা একটা খেটে-খাওয়া বাঙালি মেয়েকে এ ভাবে হেনস্তা করবে এটা আমাদের ভালো লাগছে না!

– মানলাম। তাহলে তোমরা কী করতে চাও?

– ধরুন হুজুর আমি যদি বলি যে, সদরের দিকে টর্চ-ফোকাস করে আমি যাঁরে দেখতে পাই তাঁর পরনে ছিল শাড়ি-বেলাউজ?

– তাহলে রাও-সাহেবের ‘বশিশ’ তোমরা পাবে না।

– কিন্তু আপনার মক্কেল কি…

– না বটুক, টাকার প্রতিযোগিতায় আমার মক্কেল ওই রাও-সাহেবের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। আর শোন– যদি পারতও তাহলেও আমি তোমাকে দিয়ে মিথ্যে সাক্ষী দেওয়াতাম না। আমার এখন মনে হচ্ছে ইন্সপেক্টর মুখার্জিও তোমার কাছে যায়নি। তুমি সব বানিয়ে বানিয়ে বলছ। জানতে এসেছ, আমি টাকা দেব কি না। সে যা হোক, তুমি খুবই ভুল করলে বটুক। আমাকে সব কথা বলে ফেলে। তোমার গোপন-কথা আমি কাউকে বলব না বটে, কিন্তু কাঠগড়ায় ডাঁইরে তুমি বা তোমার পরিবার যদি একচুল মিছে-কথা বল, তাহলে তোমাদের আমি ছিঁড়ে খাব! মিথ্যে সাক্ষী দেবার দায়েতোমাদের জেল খাটাব! বুঝেছ?

– না, মানে…

– আর একটি কথা নয়! তুমি ওঠ। তুমি আমার কাছে পরামর্শ চাইতে এসেছিলে। আমার পরামর্শ হল: কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে, ‘যাহা বলিবে সত্য বলিবে, সত্য বই মিথ্যা বলিবে না’। ‘বলিলে’ তোমার গলায় আমি নম্বরি তক্ত ঝোলাইব। ওই ধুতি খুলে ডোরাকাটা হাফপ্যান্ট পরাইব, বুঝেছ? পান-সাজা ছেড়ে মাটি কোপাতে হবে তোমাকে। নাউ জাস্ট ক্লিয়ার আউট।

লোকটা দু-হাত জোড় করে বললে, স্যার…

– আই সে: গেট আউট!

ওঁর কণ্ঠস্বরে কৌশিক পাশের ঘর থেকে উঠে আসে। বটুকের দিকে ফিরে বলে, তুমি কে? কী চাও?

– আজ্ঞে না, কিছু চাই না।

– সাহেব তোমাকে চলে যেতে বলছেন, যাচ্ছ না কেন?

– যাচ্ছি, যাচ্ছি স্যার–

বটুক পালাবার পথ খুঁজে পায় না।