দুই
বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল একটা ট্যাক্সি। পাড়ারই। বাসু এগিয়ে এসে বললেন, কী যেন নাম তোমার?
– রসিদ আলি, স্যার।
– ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। রসিদ! তা তুমি বেণীমাধব সরকার লেন চেন?
– জী হাঁ, নজদিগই। কেতনা নম্বর?
একুশের-এক। বাড়িটার থেকে কিছু দূরে ট্যাক্সিটা থামিও। অপেক্ষা করতে হবে। আমি ওদের জানাতে চাই না যে ট্যাক্সি করে এসেছি। বুঝলে? নাও এটা ধরো, এটা তোমার মিটারের উপর।
প্রয়োজন ছিল না। পাড়ার ট্যাক্সি। বাসু-সাহেবকে ট্যাক্সি-ড্রাইভার ভালো করেই চেনে। সে কোনও উচ্চবাচ্য করল না। নোটখানা নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে পকেটে রাখল।
মিটারে দশ টাকাও ওঠেনি– ঘ্যাঁচ করে কার্ব-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গেল ট্যাক্সিটা।ড্রাইভার বললে, বাঁয়ে তরফ বিশ নম্বর কোঠি, সা’ব!
বাসু নেমে গেলেন। একুশ নম্বর একটা গম ভাঙানোর কল। তার পাশেই একটা একতলা পুরনো বাড়ি। নম্বর-প্লেট বসানো: একুশের-এক। কল-বেল-এর বালাই নেই। অগত্যা সদর দরজার কড়া ধরে জোরে-জোরে নাড়লেন বারকয়েক।
দরজা খুলে মুখ বাড়ালেন একটি মহিলা।
বছর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ। সাদা থান নয় – তবু বিধবা বলেই মনে হল ওঁর। অম্লানবদনে বাসু-সাহেব হাঁকাড় পাড়েন: টেলিগ্রাম! সি. রায়। এ বাড়িই?
ভদ্রমহিলা ঝুঁকে পড়ে দেখলেন খামের উপর লেখা নাম-ঠিকানা।
বললেন, হ্যাঁ, দাও।
– এখানে একটা সই দিন আগে। – পকেট থেকে নোটবই আর ডটপেন বার করে মহিলার দিকে বাড়িয়ে ধরেন।
এতক্ষণে মহিলাটি ভালো করে টেলিগ্রাফ-পিয়নের দিকে তাকিয়ে দেখেন। বলেন, আপনাকে তো আগে কখনও দেখিনি টেলিগ্রাম নিয়ে আসতে?
একটু আগে মহিলা ওঁর দিকে না তাকিয়েই ‘তুমি’ সম্বোধন করেছিলেন।
অভ্যাসবশত। ‘টেলিগ্রাম’ হাঁক শুনে, প্রতিবর্তী প্রেরণায়। এখন উনি একটু ঘাবড়ে গেলেন মনে হল। স্যুটেড-বুটেড টেলিগ্রাম-পিয়ন ইতিপূর্বে দেখেননি বলে।
বাসুর চট জলদি জবাব: আমি পোস্ট-মাস্টার। এদিকেই আসছিলাম, তাই; নিন, সই করুন।
এমন পোস্ট-মাস্টার মশাইও বোধ করি ওঁর দেখা নেই। যিনি ডাক-পিয়নের কাজ স্কন্ধে তুলে নেন ‘এদিকেই আসার’ সুবাদে। কিন্তু টেলিগ্রামটা নিতে হলে খাতায় সই দিতে হয় – স্যুটেড ভদ্রলোক অন্যায় কিছু দাবি করেননি। ফলে ভদ্রমহিলা ওঁর হাত থেকে পকেট বুকটা নিয়ে সই দিলেন: সি.রায়।
বাসু কুঞ্চিত ভ্রূভঙ্গে বললেন, আপনিই ‘সি. রায়’?
– না, তবে ওর টেলিগ্রাম আমিই বরাবর নিয়ে থাকি।
– ও! তাহলে আপনি ওই ‘সি. রায়’ কথাটার উপর লিখে দিন ‘ফর অ্যান্ড অন বিহাফ অফ’, আর নিচে আপনার সই দিন।
– আগে তো কখনও তা করিনি।
– টেলিগ্রাফ পিয়নগুলো সব অকর্মার ধাড়ি। কেবল কাজে ফাঁকি দেয়। সেটাই পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের নিয়ম।
ভদ্রমহিলা যুক্তির সারবত্তা অনুধাবন করেন। নোটবইটা নিয়ে নির্দেশ মতো লিখে ফেরত দিলেন। বাসু দেখলেন লেখা আছে ‘সি. রায়’-এর তরফে শুভ্রা চৌধুরি।’ এবার মহিলা টেলিগ্রামখানা গ্রহণ করতে হাতটা বাড়িয়ে দেন।
বাসু তার আগেই নোটবুক আর টেলিগ্রামখানা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এবার বললেন, আপনার সঙ্গে কয়েকটা কথা ছিল শুভ্রা দেবী। ঘরে চলুন। রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে এসব কথা আলোচনা করা ঠিক নয়।
গটগট করে গলিপথটা অতিক্রম করে তিনি সামনের বৈঠকখানায় ঢুকে একখানা চেয়ার দখল করে জমিয়ে বসলেন। যেন গৃহকর্তা, অম্লানবদনে বলেন, আসুন, ভিতরে এসে ওইখানে বসুন।আমি আপনার কাছ থেকে ‘সি. রায়’-এর বিষয়ে কিছু তথ্য জানতে এসেছি।
ভদ্রমহিলা ওঁর পিছন পিছন ঘরে ঢুকেছেন বটে, তবে বসেননি। তাঁর বিস্ময়ের ঘোরটা কাটেনি। বলেন, আপনি…আপনি আসলে কে?
বাসু-সাহেব হিপ পকেট থেকে টেলিগ্রামখানা আবার বার করলেন। সেটা শুভ্রা দেবীর নাকের ডগায় মেলে ধরে বলেন, লুক হিয়ার, শুভ্রা দেবী, এটা একটা পুরনো টেলিগ্রাম। গতকাল সকালে এটা এইঠিকানাতেই বিলি করা হয়। কেউ একজন ‘সি. রায়’-এর নাম দিয়ে সেটা গ্রহণ করেছে। এখন মিসেসরায় অভিযোগ করছেন– তাঁর নাম ভাঁড়িয়ে কেউ তাঁর টেলিগ্রাম হাতিয়ে নিচ্ছে। সেজন্যইএায়ারিতে এসেছি আমি। টেলিগ্রাম পিয়নের কাজ ভাগ করে নিতে নয়।..এখন বলুন, কাল সকালেকি আপনি এই টেলিগ্রামখানা ‘সি. রায়’-এর তরফে নেননি?
– নিয়েছিলাম। তারই অনুরোধে – আর তাকেই দিয়েছিলাম।
– কিন্তু টেলিগ্রাম পিয়নের খাতায় আপনি তো নিজের নাম লেখেননি। তাছাড়া আপনি তাঁকেটেলিগ্রামখানা দিলে তিনি আপনার নামে কমপ্লেন করবেন কেন?
– ছন্দা তা করতেই পারে না!
– তাহলে আমার পকেটে এ টেলিগ্রামখানা কী করে এল, বলুন?
– তাই তো ভাবছি আমি!
– ভাবাভাবির দরকার নেই, আপনি মিসেস ছন্দা রায়কে ডাকুন।
– সে এখানে থাকে না।
– কোথায় থাকে? তার ঠিকানা কী?
– আমি জানি না।
– এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? ছন্দা কোথায় থাকে তা আপনি জানেন না, অথচ তার সই জাল করে তার টেলিগ্রাম আপনি হাতিয়ে নিচ্ছেন?
– সই জাল করে হাতিয়ে নিচ্ছি?
– নয়? এর আগে কি আপনি পোস্টাল-প্রিয়নের খাতায় লিখেছিলেন ‘ফর অ্যান্ড অন বিহাফ অব ছন্দা রায়’? নিজের নামটাও তো সই করেননি। আমি সব কাগজপত্র দেখে নিয়ে তারপর এন্কায়ারিতেএসেছি। ‘আ-য়াম’ সরি। আপনি তৈরি হয়ে নিন। আমার সঙ্গে একবার আপনাকে থানায় যেতে হবে।
– থানায়! বাঃ! কেন? কী আমার অপরাধ?
– বাঃ! অপরাধ নয়? আপনি মিসেস ছন্দা রায়ের সই জাল করেছেন। সে এখানে থাকে না, তবু আপনি তার টেলিগ্রাম রিসিভ করেছেন।
– কিন্তু আমার কী দোষ? সে তো ছন্দারই অনুরোধে। ও বললে, ও একজনকে এ বাড়ির ঠিকানাদিয়েছে। তার চিঠিপত্র এলে বা টেলিগ্রাম এলে আমি যেন রেখে দিই। ও সময় মতো এসে নিয়ে যাবে।
– এই টেলিগ্রামখানা আপনি কাল কখন পেয়েছেন? আর কখন মিসেস রায়কে হস্তান্তরিত করেছিলেন?
– গতকাল সকাল ন’টা নাগাদ ওটা পাই! আমি হাসপাতালে যাই এগারোটা নাগাদ। তার আগেই ছন্দা ফোন করে জানতে চায়, তার কোনও চিঠিপত্র এসেছে কিনা। আমি বলি, একখানা টেলিগ্রামএসেছে। সে হাসপাতালে এসে দুপুরবেলা আমার সঙ্গে দেখা করে আর ওটা নিয়ে নেয়।
– কোন্ হাসপাতালে?
– শরৎ বোস রোডের শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম হাসপাতালে।
– আপনি নার্স?
– হ্যাঁ।
– ট্রেইনড নার্স?
– হ্যাঁ, দু’জনেই পাস করা নার্স।
– ছন্দা তার নিজের ঠিকানায় টেলিগ্রাম নেয় না কেন?
– তার…মানে, কিছু অসুবিধা আছে!
– ‘অসুবিধা’ মানে তো তার স্বামী? এরইমধ্যে স্বামীর কাছ থেকে লুকোবারমতো ব্যাপার ঘটেছে?
– ‘এরই মধ্যে’ মানে?
– কেন, তা আপনি জানেন না – ওদের বিয়ে হয়েছে এই সেদিন?
– আপনি কেমন করে জানলেন?
– ছন্দা দেবী নিজেই এসেছিলেন পোস্ট-অফিসে। কমপ্লেন করতে। দেখেই মনে হল ও এখনও সদ্য বিয়ের কনে। কদ্দিন বিয়ে হয়েছে ওর?
– দিন দশেক।
– ওর স্বামীর নাম কী?
– আমি জানি না।
– ঠিক আছে, ঠিক আছে। ছন্দা রায় কোথায় থাকে তা আপনি জানেন না, তার স্বামীর নাম কীতা জানেন না, অথচ তার সই জাল করতে জানেন। তা আমার অত কথায় কী দরকার? যা বলার থানায় গিয়ে বলবেন। মিসেস রায় কমপ্লেন করেছেন বলেই…
– ছন্দা আমার নামে কমপ্লেন করতেই পারে না।
– পারে না? তাহলে আমি কেন এসেছি?
– সেটাই তো তখন থেকে ভাবছি আমি। আমার মনে হয়, আপনি পোস্ট-অফিস থেকে আদৌ আসেননি। কায়দা করে ছন্দার সম্বন্ধে কিছু খোঁজ-খবর নিতে এসেছেন। তাই নয়?
– আপনি ঠিকই ধরেছেন, শুভ্রা দেবী। আমি ডাক-বিভাগের কেউ নই। আমি ছন্দার একজন শুভানুধ্যায়ী, কিন্তু ছন্দা নিজেই সে কথা জানে না। আমি জানতে পেরেছি, ছন্দার একটা ভীষণ বিপদঘনিয়ে আসছে কিন্তু সেকথা ওকে জানাতে পারছি না। ওর বর্তমান ঠিকানাটা জানি না বলে। আপনিআমাকে সাহায্য করবেন?
জবাবে ভদ্রমহিলা যা বললেন তা একেবারে ভিন্ন খাতে।
– আপনাকে আমার ভীষণ চেনা চেনা লাগছে। আপনার ছবি আমি কোথাও দেখেছি। আপনিকি টি. ভি. সিরিয়ালে অভিনয় করেন?
– না! সম্ভবত আপনি খবরের কাগজে আমার ছবি দেখেছেন।
হঠাৎ শুভ্রা বলে ওঠেন, এতক্ষণে চিনতে পেরেছি! আপনি ব্যারিস্টার পি.কে. বাসু?
– ঠিকই চিনেছেন। এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে, আমি ছন্দার শুভাকাঙ্ক্ষী। সব কথা খুলে বলুন এবার।
– বলব। সব কথাই বলব। কিন্তু তার আগে বলুন কী খাবেন? চা, না কফি?
– কী আশ্চর্য! আমি ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে এসেছি। আমার নানান জরুরি কাজও আছে। সংক্ষেপে বলুন, ছন্দা রায় সম্বন্ধে আপনি কতটুকু কী জানেন? কেমন করে তার সন্ধান পেতে পারি?
শুভ্রা দেবী আর কোনও সংকোচ করলেন না। সব কথাই খুলে বলেন:না, ছন্দা রায়ের ঠিকানা উনি সত্যিই জানেন না। এমনকি তার স্বামীর নামটাও ওঁর অজানা। না, বিয়েতে শুভ্রা দেবীর আমন্ত্রণ ছিল না। সম্ভবত রেজিস্ট্রি-বিয়ে হয়েছে, কলকাতাতেই। অথচ ছন্দা আর শুভ্রা দু’জন দু’জনকে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন। এই বাড়িতে শুভ্রার সঙ্গে বিয়ের আগে ছন্দা বিশ্বাস – হ্যাঁ, বিয়ের আগে কুমারী অবস্থায় ওর পদবি ছিল বিশ্বাস – চার-পাঁচ বছর বাস করে গেছে। দু’জনেই পাস করা নার্স, যদিও বয়সে ছন্দা দশ-বারো বছরের ছোটো। অবশ্য দু’জনের কর্মস্থল ছিল ভিন্ন। ছন্দা কাজ করত একটা প্রাইভেট নার্সিংহোমে, বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছাকাছি। সব কিছুই সে গোপন করতে চাইত। তার অতীত ইতিহাসে এমন কিছু আছে যাতে সে নিজের কথা কিছুই বলতে চাইত না। এমন কী, সে যে ঠিক কোন নার্সিং হোমে চাকরি করত – চার পাঁচ বছর একই ছাদের তলায় বাস করেও – শুভ্রা তা জানতে পারেননি। হঠাৎই সে একদিন এসে জানায় যে, সে একজনকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। কাকে, কী বৃত্তান্ত কিছুই স্বীকার করেনি। তীব্র অভিমানে শুভ্রাও বিস্তারিত জানতে চাননি। প্রায় মাসখানেক আগে ওর জিনিসপত্র নিয়ে ছন্দা এ বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। দিন-সাতেক আগে আবার হঠাৎ এসে জানায় যে সে ইতিমধ্যে জনৈক মিস্টাররা য়কে বিবাহ করেছে। আরও জানায় যে, তার কিছু চিঠি অথবা টেলিগ্রাম এই ঠিকানায় আসবে। শুভ্রা যেন তা সংগ্রহ কয়ে রাখেন। সময় মতো ছন্দা তা নিয়ে যাবে। এরপর প্রত্যেকদিন সকালেই ছন্দা একবার করে ফোনে জেনে নিত তার কোনও চিঠিপত্র এসেছে কিনা। গতকালও সে ফোন করেছিল।
বাসু বললেন, আবার যদি সে ফোন করে তাহলে তাকে বলবেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। আজ সকালেই সে এসেছিল আমার চেম্বারে। আর যাবার সময় ভুল করে একটা হ্যান্ডব্যাগ ফেলে গেছে। ওই ব্যাগের ভিতর অত্যন্ত দামি কিছু আছে…
– অত্যন্ত দামি কিছু? কী তা?
– সেটা আমি আপনাকে জানাতে পারছি না, শুভ্রা দেবী। প্রফেশনাল এথিক্সক্সে বাধছে। তবে ছন্দা নিশ্চয় এতক্ষণে সেটা টের পেয়েছে। হয়তো সে মনে করতে পারছে না– ব্যাগটা ঠিক কোথায় খুইয়েছে। আপনি বললেই ওর মনে পড়ে যাবে। ও বুঝতে পারবে অথবা…
– অথবা?
– অথবা হয়তো ওর মনে পড়েছে সব কথা। কিন্তু দুরন্ত অভিমানী মেয়েটা জেদ করে ফিরে আসছে না। কারণ সে জানে, আমার হেফাজতে ও জিনিস নিরাপদেই আছে।
শুভ্রা বললেন, তাও হতে পারে। ছন্দা অত্যন্ত অভিমানী।
– আপনি ওকে বলবেন তো?
– নিশ্চয় বলব। তবে একটা শর্ত আছে।
– শর্ত! কী শর্ত?
– আপনার ব্লাড শুগার আছে? ড়ায়াবেটিস?
– গুড গড! না! কিন্তু সে কথা কেন?
– তাহলে আপনি একটু বসুন। পাঁচ মিনিট। আমি সামনের দোকান থেকে দুটো কড়াপাক সন্দেশ নিয়ে আসি। খুব ভালো বানায়। আপনি একটা কিছু মুখে না দিলে আমার…
– অল রাইট! যান, নিয়ে আসুন।
– শুভ্রা ড্রয়ার খুলে একটা নোট নিয়ে চটিটা পায়ে গলিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
বাসু তৎক্ষণাৎ টেলিফোনটা তুলে নিয়ে ওঁর বাড়িতে ডায়াল করলেন। ধরলেন রানী দেবী: কী খবর?
– সুজাতা ফিরেছে?
– না।
– সুজাতা ফিরে এলেই বলবে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি অঞ্চলে চলে যেতে। কাছে-পিঠে প্রতিটি নার্সিংহোমে গিয়ে সে যেন খোঁজ নেয়: নার্স ছন্দা বিশ্বাস সেখানে কাজ করে কি না। ইন ফ্যাক্ট– ছন্দা রায় মাসখানেক আগে ‘বিশ্বাস’ পদবিতে ওই অঞ্চলের কোনও নার্সিং হোমে কাজ করত, এখন করে না। তবে প্রশ্নটা ওইভাবে পেশ করাই শোভন। যদি কেউ বলে, আগে এখানে কাজ করত, এখন করে না, তখন তার বর্তমান ঠিকানা সংগ্রহের নানান চেষ্টা যেন করে। বুঝলে?
– বুঝলাম। কিন্তু নার্স ছন্দা রায়টি কে?
– যার হাত থেকে একখানা একশো টাকার নোট হাতিয়ে তুমি আমাকে দ’য়ে মজিয়েছ!
– আমি? না তুমি নিজে ওকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে…
– সারেন্ডার! সারেন্ডার! হ্যাঁ, সব দোষ আমার। আরও নোট করে নাও – আমি ফোন করছি একুশের-এক বেণীমাধব সরকার লেন থেকে। এই নম্বরটা হচ্ছে ৪৬-৫৩২২। মিনিট দশেক পরে এখানে রিং কর। যিনি ধরবেন তাঁর নাম শুভ্রা চৌধুরি। তাঁকে বলবে– তুমি যা হয় একটা নাম বলে নিজের পরিচয় দিও -শুভ্রা দেবীকে বলবে, তুমি কমলেশের বান্ধবী। ছন্দা রায়ের জন্য একটা জরুরি খবর দিতে চাও। ছন্দা যেন তোমাকে ফোন করে। তোমার নাম্বারটা শুভ্রাকে দিয়ো।
– তারপর ছন্দা যখন ফোন করবে?
– তখন তাকে নিজের সত্য পরিচয় দিয়ে বলবে সে যেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। জানিয়ো, নিজের ব্যবহারের জন্য আমি দুঃখিত।
– বুঝলাম। আর কিছু?
– রিভলভারের লাইসেন্সির পাত্তা পাওয়া গেছে?
– এখনও না। কৌশিক কোনও ফোন করেনি এখনও।
– আপাতত এই পর্যন্ত। জানলা দিয়ে দেখছি এক জোড়া কড়াপাকের সন্দেশ এগিয়ে আসছে।
– একজোড়া কড়াপাকের সন্দেশ! তার মানে?
বাসু নিঃশব্দে ধারকযন্ত্রে টেলিফোনটা নামিয়ে রাখলেন। পরমূহূর্তেই সন্দেশের প্যাকেট হাতে শুভ্রা ফিরে এলেন।
ট্যাক্সিতে উঠে বললেন, এবার চল রাজা রামমোহন রায় সরগ্রীতে। শেয়ালদা ফ্লাইওভার হয়ে। ভিড় কম হবে।
আমহার্স্ট স্ট্রিট আর হ্যারিসন রোডের জংশনে নেমে ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিলেন। ওঁর গন্তব্যস্থল থেকে বেশ কিছুটা দূরে। কারণ ছিল। এবার উনি যে কাজটা করতে চলেছেন সেটা বে-আইনি! এমন ক্রিয়াকাণ্ডে উনি অভ্যস্ত। ওঁর মতে ‘এন্ড জাসটিফাইজ দ্য মীনস’ – অর্থাৎ মূল লক্ষ্যটা যদি ‘সত্যশিব-সুন্দর’-মুখী হয়, তাহলে প্রতিটি পন্থাই নীতিধর্মের অনুসারে। প্রতিপক্ষদল – অর্থাৎ সমাজবিরোধীরা – কোমরের নিচে ক্রমাগত আঘাত হানবে আর শান্তিকামী ব্যক্তিরা যে-কোনওভাবে ওদের মোকাবিলা করতে পারবে না ওটা কোনও যুক্তি নয় তাই উনি ট্যাক্সি-চালককে জানাতে চান না ওঁর গন্তব্যস্থলটা।
ছোট্ট একটা প্রেসের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সামনে বসে একজন কম্পজিটার টেবিল-ল্যাম্পের আলোয় কাজ করছিলেন। চোখের উপর চশমা তুলে বললেন, কাকে খুঁজছেন স্যার?
– গোরা আছে? গৌরাঙ্গ জানা?
– আজ্ঞে না। গোরা কন্টাই গেছে। মানে, দেশের বাড়িতে। ছাপাখানার কাজ করাতে চান কিছু?
– তা তো চাই, কিন্তু গোরা না হলে তো তা হবে না!
– কেন স্যার? গোরাকে বাদ দিয়েই তো ছাপাখানা দিব্যি চলছে।
বাসু জবাব দিলেন না। হঠাৎ ভিতর থেকে এক বৃদ্ধ হস্তদন্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। খেটো ধুতি, গলায় কণ্ঠি, ফতুয়া গায়ে, চোখে নিকেলের চশমা। হাত জোড় করে বলেন, স্যার! আপনি?
– আমাকে আপনি চেনেন?
– বিলক্ষণ! আপনাকে চিনব না? আপনি না থাকলে সেবার যে গোরার মেয়াদ হয়ে যেত। আমি গোরা, মানে গৌরাঙ্গের বাপ, প্রভুচরণ জানা, আজ্ঞে। আসুন, ভিতরে আসুন –
নিজের চেয়ারটা কোঁচার খুঁট দিয়ে মুছে নিয়ে বসতে বললেন। বাসু-সাহেবের নজর হল, অনেকগুলি কৌতূহলী চোখ ওঁদের লক্ষ্য করছে। বললেন, জানামশাই, কিছু গোপন কথা ছিল। কোথায় বসে হতে পারে?
প্রভুচরণের কোনও ভাববৈকল্য হল না। যেন নিত্যি ত্রিশদিন তিনি এমন গোপন কথা শুনে থাকেন। বলেন, তাহলে, স্যার, ওপরে চলুন। দোতলায় আমার বাসা!
কাঠের নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে দু’জনে দ্বিতলে উঠে আসেন। নিম্নমধ্যবিত্তের অভাবের সংসার।
একজন অবগুণ্ঠনবতী – বোধকরি গৌরাঙ্গের গর্ভধারিণী– একটি বেতের মোড়া পেতে দিয়ে গেলেন। প্রভুচরণ ভিতর থেকে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বলেন, এবার বলুন। গৌরাঙ্গ দেশে গেছে। তাতে আটকাবে না। কী কাজ, বলুন?
বাসু মোড়ায় বসে একটু ভূমিকা করতে গেলেন, জানামশাই, সেবার গোরা যেমন বিনা অপরাধে জেল খাটতে যাচ্ছিল এবার তেমনি এক নিরপরাধীকে বাঁচাতে আমি একটু বেআইনি…
প্রভুচরণ দু’হাত দু’কানে চাপা দিয়ে বলে ওঠেন, আপনি দেবতুল্য মনিষ্যি। আমারে কোনও কৈফিয়ৎ দিতে যাবেন না। কী করতে হবে – শুধু সেইটুকু বলুন।
– আমাকে খানকতক – ধরুন পাঁচখানা – ভিজিটিং কার্ড বানিয়ে দিতে হবে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে।
– এ আর কী এমন শক্ত কাজ। গোরা নেই তো নেতাই আছে – ওই গোরারই ছোটো ভাই। প্রেসের সব কাজই জানে। কম্পোজ করে নিজেই ছাপিয়ে আনবে। আপনি শুধু কী লিখতে হবে বলেন।
বাসু তাঁর পকেট নোটবুক থেকে একটা পৃষ্ঠা ছিঁড়ে নিয়ে ইংরেজি হরফে লিখে দিলেন:
Charu Chandra Roy, B. Sc.
Real Estate Agent & Govt.
Authorised Agent of N.S.C.,
C.T.D., Unit Trust, R.D.
21/4 Benimadhab Naskar Lane
Calcutta 700026
প্রভুচরণ বললেন– ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হবে, স্যার।
– তাহলে আমি একটু ঘুরে আসি।
– আজ্ঞে না, ইঞ্জিরি হরফ, প্রুফটা আপনাকেই দেখে দিতে হবে। আমি বরং আপনার জন্য কিছু চা-মিষ্টির যোগাড় দেখি–
আগেই বলেছি, উদ্দেশ্য সৎ হলে মিথ্যা বলতে ওঁর বাধে না। আপাতত ওঁর উদ্দেশ্য নিজের উদর এবং অপরের আত্মাভিমানকে বাঁচানো। অম্লানবদনে বললেন, না, জানামশাই, একটু অ্যাসিডিটি মতো হয়েছে – ওই অম্বল আর কী। বরং দেখুন, কাছে-পিছে ঠাণ্ডা ‘লিম্বা’ পাওয়া যায় কিনা, অথবা ডাব।
ডাবই পাওয়া গেল। ঘণ্টাখানেক পরে ওই সদ্যমুদ্রিত ভিজিটিং-কার্ডগুলি নিয়ে বাসু-সাহেব রওনা দিলেন।
বাসু-সাহেবের কর্মপদ্ধতি ছকবাঁধা।
পরবর্তী দৃশ্য মধ্য কলকাতার একটি বড়ো ডাক ও তার ঘর।
কমলেশ নামধারী এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি দু’দিন আগে এই ডাকঘর থেকে একটি তারবার্তা পাঠিয়েছিল জনৈক সি. রায়কে: ‘শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা হচ্ছে সময়ের শেষ সীমা।’
আজই সেই শুক্রবার। নির্দিষ্ট সময়ের শেষ সীমান্তে উপনীত হতে আরও ঘণ্টাছয়েক বাকি। উনি নিজে এই মর্মান্তিক বার্তাটা জেনেছেন ঘণ্টাতিনেক আগে। এই তিন ঘণ্টার মধ্যে জানতে পেরেছেন ‘সি. রায়’ হচ্ছে ছন্দা রায়। একটি আতঙ্কতাড়িতা সদ্যো-বিবাহিতা। বোধকরি যৌবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলি – দীর্ঘ সাত বছর– সে ছিল বিধবা। এখন সে তার মনের মানুষখুঁজে পেয়েছে।আর সেই শুভ মুহূর্তেই অজ্ঞাতবাস থেকে এসে উপস্থিত হয়েছে ওই কমলেশ। তার পুরো নামটা জানেন না– কিন্তু আন্দাজ করেছেন, ওই ভিরু কপোতীর দৃষ্টিভঙ্গিতে সে এক হিংস্র শ্যেনপক্ষী! হয়তো – হ্যাঁ, এমনও হতে পারে – সাত-সাতটি বছর সে স্বেচ্ছায় অজ্ঞাতবাসে ছিল: কখন তার পত্নী নতুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়! তখনই শুরু হবে তার খেলা:ব্ল্যাকমেলিং!
প্রথম স্বামী জীবিত থাকাকালে তার সঙ্গে ডিভোর্স না হলে– দ্বিতীয় বিবাহ অসিদ্ধ। অর্থাৎ ওই অজ্ঞাত পরিচয় ‘কমলেশ’ যে মুহূর্তে জনবহুল ট্রাম রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে হাঁকাড় পাড়বে ‘অয়ম অহম্ ভো’ – তৎক্ষণাৎ ওই সদ্যোবিবাহিতার সাতমহলা স্বপ্নের প্রাসাদ হাড়গোড় ভেঙে হুড়মুড়িয়ে উল্টে পড়বে। এই হচ্ছে আইনের অনিবার্য নির্দেশ! সেই দুর্দৈব ঠেকাবার শুভ উদ্দেশ্য নিয়ে বাড়ি থেকে বার হয়েছেন অভুক্ত প্রৌঢ় মানুষটি। প্রথামতো যাঁর কাজ আদালত চৌহদ্দি থেকে ল’লাইব্রেরির ভিতর সীমিত হবার কথা।
ডাকঘরে ঢুকেই নজরে পড়ল এনকোয়ারির পাশেই খাম-পোস্টকার্ড আর ডাকটিকিট বিক্রি হচ্ছে। সেদিকটায় চাপ ভিড়। বাসু সেদিকে গেলেন না। এক ফাঁকামতো কাউন্টারে গিয়ে কর্মরত করণিককে বললেন, শুনছেন? কিছু এন. এস. সি. কিনব। কার কাছে যাব?
মন্ত্রের মত কাজ হল তাতে। ইউনিট ট্রাস্টের নানান সুবিধাজনক স্কিমের চাপে লোকে আজকাল আর ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট কিনতে উৎসাহী নয়। অথচ এগুলি বিক্রয় করতে নানান কারণে পোস্টাল কর্মচারীরা উৎসাহী। ছেলেটি বললে, গলিপথে একটা দরজা আছে– ওইদিকে। তাই দিয়ে ভিতরে চলে আসুন। ওই কোণায় যে টাকমাথা ভদ্রলোক বসে আছেন, ওঁর সঙ্গে কথা বলুন। ওঁর নাম: অরিন্দমচন্দ্র ঘোষাল।
গলিপথে খিড়কি-দরজা দিয়ে বাসু ওই বৃদ্ধের কাছে উপস্থিত হয়ে দেখলেন ভিতরের গলিপথে ছেলেটি ইতিপূর্বেই ঘোষাল-মশাইকে তাঁর উদ্দেশ্যের কথাটা জানিয়ে দিয়েছে। একটি টুলও কোথা থেকে যোগাড় করে এনেছে।
অনুরুদ্ধ হয়ে বাসু টুলে বসলেন। অরিন্দম প্রশ্ন করেন, এন. এস.সি. কিনবেন? কত হাজার?
বাসু সেকথার জবাব না দিয়ে বললেন, আপনাকে কোথায় দেখেছি বলুন তো, ঘোষালমশাই? আপনি কি কখনও প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তেন?
হা হা করে হেসে ওঠেন অরিন্দম। বলেন, আরে না মশাই! কলেজে আর পড়ার সুযোগ পেলাম কোথায়? বাবামশাই ছিলেন পোস্ট-মাস্টার। ম্যাটুিকটা পাশ করার পর একটা টুলে বসিয়ে দিয়েছিলেন। সে আমলে সেসব সুবিধে ছিল। তেত্রিশ বছরে ঘষতে ঘষতে এতদূরে এসে পৌঁছেছি। ডিসেম্বরে রিটায়ার করব।
– কিন্তু আপনাকে এত চেনা চেনা লাগছে কেন? আপনারও তাই লাগছে না কি?
অরিন্দম বাসু-সাহেবকে আর একবার ভালো করে দেখে নিয়ে বললেন, আজ্ঞে না। তবে আমার চেহারাটা টিপিক্যাল কেরানির। আপনি হয়তো অন্য কোনও করণিকের সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলেছেন।
ইতিমধ্যে ও পাশের আর একটি মহিলা করণিক একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললে, ঘোষালদা, এইখানে একটা সই দিন।
নির্দেশিত স্থানে স্বাক্ষর দিয়ে অরিন্দম আবার বাসু-সাহেবের দিকে মন দিলেন, খগেন বলছিল, আপনি নাকি কিছু এন. এস.সি. কিনতে এসেছেন।
খগেন তার সিটে ফিরে গেছে। বাসু ইতিমধ্যে গোটা পোস্ট-অফিসটা দেখে নিয়েছেন। না, কেউ ওঁর দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে নেই। পি. কে. বাসু-হিসাবে কেউ তাঁকে চিহ্নিত করেনি। তাই হাসতে হাসতে বললেন, না ঘোষালমশাই। আমি জাতে ময়রা। সন্দেশ খাই না।
– ময়রা? সন্দেশ খান না? মানে? কিন্তু খগেন যে বলল…
বাসু-সাহেব সদ্যলব্ধ ভিজিটিং-কার্ড একখানা নামিয়ে রাখলেন ঘোষাল মশায়ের টেবিলে। উনি সেটা পড়তে যখন ব্যস্ত তখন বাসু বলতে থাকেন, আমার কাজ কারবার ছিল এতদিন দক্ষিণ কলকাতায়। কিন্তু আমার ছেলে অফিস থেকে এ পাড়ায় কোয়ার্টার্স পেয়েছে। তাই বেণীমাধব নস্কর লেন ছেড়ে সামনের মাসে এ-পাড়ায় উঠে আসছি। তা সিজনে পাঁচ-সাত লাখ টাকার বিজনেসও পাই। আপনি তো জানেনই যে, কোন পোস্ট-অফিসে এন. এস. সি. জমা পড়ল তা নিয়ে ক্লায়েন্টের কোনও পক্ষপাতিত্ব থাকে না– কিন্তু এজেন্টদের থাকে।
বলে, ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বাম চক্ষুটি নিমীলিত করলেন।
ঘোষাল অনুচ্চকণ্ঠে বলে ওঠেন, ও-পাড়ায় যেসব ফেসিলিটি পেতেন, এখানেও তাই-তাই পাবেন। মাসে পাঁচ-সাত লাখ?
– না, মাসে বলিনি। সিজন টাইমে মাসে আট লাখও হয়েছে ইয়ার বিফোর লাস্ট। যাহোক, এ পাড়ায় এসে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব! ..ও ভালো কথা, আর একটি কাজ আছে ঘোষাল-মশাই। আমার একটা উপকার করতে হবে।
– অত সংকোচ করছেন কেন? বলুন বলুন?
– আমার এক মক্কেল – কমলেশবাবু – কলকাতায় একটা অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে চায়। ও দর দিচ্ছে সাড়ে সাত, আর মালিক হাঁকছে আট লাখ…
অরিন্দম বাধা দিয়ে বলে ওঠেন, আদার ব্যাপারিকে ওইসব জাহাজের গল্পো কেন শোনাচ্ছেন চারুবাবু?
বাসু পকেট থেকে একটা টেলিগ্রাম বার করে বললেন, দিন-তিনেক আগে কমলেশবাবু এই ডাকঘর থেকেই আমাকে টেলিগ্রাম করেছিলেন। আজ সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে শেষ দর জানাবার কথা। কিন্তু ওঁর ঠিকানা লেখা ভিজিটিং কার্ডখানা আমি হারিয়ে ফেলেছি। এই টেলিগ্রামের মাথায় যেসব সাঙ্কেতিক নম্বর-টম্বর লেখা আছে তা থেকে কি জানা যায়, কমলেশবাবুর ঠিকানাটা?
– নিশ্চয় যায়। টেলিগ্রামের ফর্মে প্রেরক নাম-ঠিকানা লিখে দেয়। স্বাক্ষরও করে। এ তো মাত্র তিনদিন আগেকার। এখনি দেখে বলে দিচ্ছি। বি-কা-শ! একটু শোনো তো ইদিকে।
বিকাশ, অর্থাৎ টেলিগ্রাফ-প্রেরক করণিক এগিয়ে আসে।
অনতিবিলম্বেই শ্যেনপক্ষীর নীড়ের সন্ধান পাওয়া গেল; কমলেশ ঘোষ, মা সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্টস, ১৩ বি, তারাতলা রোড।
বাসু বলেন, অ্যাপার্টমেন্টস্মানে তো মস্ত বাড়ি। অথচ নম্বর-টম্বর তো কিছু নেই।
– তাই তো দেখছি।
বাসু জানতে চান, আর্জেন্ট টেলিগ্রামে জবাব পাঠালে আজ সন্ধ্যা ছয়টার আগে সেটা তারাতলা পৌঁছাবে?
বিকাশের চট জলদি জবাব, অসম্ভব। পরশুর আগে নয়। গোটা পঞ্চাশ আর্জেন্ট টেলিগ্রাম জমা হয়ে আছে।
বিকাশকে বিদায় করে ঘোষালমশাই নিম্নকণ্ঠে বাসু-সাহেবকে বলেন, সাত-আট লাখ টাকার বিজনেস! আপনার কমিশন কোন্ না দশ-বিশ হাজার টাকা হবে? আপনি মশাই একশ’টি মুদ্রা খরচ করতে পারবেন? তাহলে একঘণ্টার মধ্যে টেলিগ্রাফ তারাতলায় বিলি হয়ে যাবে।
– কী ভাবে?
– আমাদের টেলিগ্রাফ-পিয়ন যদুনাথ ট্যাক্সি করে যাবে, বাসে করে ফিরবে। টেলিফোনে তারাতলা পোস্ট-অফিসে আমি জানিয়ে দিচ্ছি। ট্যাক্সি আর বাসভাড়া বাবদ ত্রিশ টাকা, বাকি সত্তর নানান লোককে খুশি করতে – সোজা হিসাব।
বাসু এককথায় রাজি। টেলিগ্রাফে লিখে দিলেন: ইম্পর্টেন্ট ডেভেলপমেন্ট নেসেসিটেট্স ইনডেফিনিট পোস্টপোনমেন্ট এএএ কলিং ইন পার্সন টু এক্সপ্লেন [অনিবার্য ঘটনাচক্রে অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্যাপারটা মুলতুবি রাখতে বাধ্য হচ্ছি। সাক্ষাতে সব কথা বুঝিয়ে বলব] – সি. রায়।
