কৌতূহলী কনের কাঁটা – ১৮

আঠার

রাত্রে ডাইনিং-টেবিলে ওঁরা ‘চারজন’ খেতে বসেছিলেন। আহার পর্ব শেষ হয়েছে। এখন খোশগল্প চলেছে। রানু আদালতে যান না। যেতে পারেন না। অথচ তাঁর কৌতূহল অনন্ত। বাকি তিনজনের কাছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কিছু শোনেন।

কৌশিক বলল, মামু প্রায় জাল শুটিয়ে এনেছেন। বাদীপক্ষের দু’দুজন সাক্ষী স্বীকার করেছে যে, তারা রাত একটা বেজে তিন মিনিটে কমলেশের ঘরে অ্যালার্ম-ক্লকটা বাজতে শুনছে। কমলেশ সেটা হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দেয়নি। তার মানে, তার আগেই সে আহত হয়ে অজ্ঞান অবস্থায় ভূতলশায়ী! রানু জানতে চান, তাতেই বা কী সুবিধা হল?

– তাতে প্রমাণ হল: রাত একটা বেজে তিন মিনিটের আগে কমলেশের মাথায় আঘাতটা লেগেছিল। অথচ পেট্রোল-পাম্পের ম্যানেজার মাথুরের জবানবন্দী অনুসারে ছন্দা রাত একটা পর্যন্ত ওঁর দোকানে ছিল। মাত্র তিন মিনিটের ভিতর ছন্দার পক্ষে এক কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে, গাড়ি পার্ক করে, দ্বিতলে উঠে কমলেশের সঙ্গে ঝগড়া শেষ করে তাকে হত্যা করা অসম্ভব। ফলে হত্যাকারী ছন্দা ছাড়া আর কেউ!

বাসু বললেন, অত তাড়াহুড়া কর না, কৌশিক। এখনো নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়নি যে, ডোরবেল কেউ বাজায়নি। ডাক্তার ব্যানার্জি ধরা পড়লেই তাকে স্বীকার করতে হবে যে, ডোরবেলটা সেই বাজিয়েছিল। ওদিকে ছন্দা এজাহার দিয়ে বসে আছে যে সে নিজে ঐ ঘরে ঢোকেনি। কলিংবেলটা বাজিয়েছিল সে নিজেই…

– তা বটে।

বাসু বলেন, সুজাতা, হোটেল তাজ-বেঙ্গলে একটা ফোন কর তো? মিস্টার ত্রিবিক্রম রাও অব নাসিককে তাঁর ঘরে পাও কি না দেখ। রুম সেভেন হান্ড্রেড অ্যান্ড ফিফ্টটিন।

অচিরেই যোগাযোগ হল। রাশভারী গলায় ত্রিবিক্রম ইংরেজিতে জানতে চাইলেন, কে কথা বলছেন?

সুজাতা বললে, প্লীজ হোল্ড অন, স্যার! মিস্টার পি.কে. বাসু, বার অ্যাট-ল, আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।

– অল রাইট!

বাসু টেলিফোনটা নিয়ে বললেন, গুড-ইভনিং মিস্টার রাও।

– হ্যাঁ, শুভ-সন্ধ্যা। বলুন? কীভাবে আপনার খিদমৎ করতে পারি?

– আপনি আদালতে ছিলেন লক্ষ্য করেছি। কখন উঠে গেলেন টের পাইনি।

– এটা তো ভূমিকা। মূল বক্তব্য? সেটায় সরাসরি এলে দুজনেরই সময় সংক্ষেপ হয়।

– অল রাইট! শুনুন। আমার মক্কেল আদালতে বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন পেশ করতে ইচ্ছুক।

– করুক না! এতো ভাল কথা। তবে সে-কথা আমাকে কেন?

– তার স্বামী বর্তমানে কোথায় আছে তা আমরা জানি না, তাই নোটিস্টা সার্ভ করা যাচ্ছে না।

– ভা-রি দুখের কথা। আমি এ বিষয়ে আপনাকে বা আপনার মক্কেলকে সাহায্য করতে পারি এ-কথা কেন ধরে নিলেন?

– এই কারণে যে, আমার বিশ্বাস: আপনি আপনার পুত্রের বর্তমান ঠিকানা জানেন, এবং বিবাহবিচ্ছেদটা চাইছেন। আমার ধারণাটা ভুল হলে আমি মক্কেলের তরফে কলকাতা-দিল্লি-বোম্বাইয়ের সব খানদানি খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেব। সেটাও ‘লীগ্যালি ভ্যালিড নোটিস্’। পরের ঘরের কেচ্ছা খবরের কাগজে বিস্তারিত ছাপতে আমার প্রচুর খরচ পড়বে– তবে সেটা আমার লোকসান নয়, ‘অ্যালিমনি’র ভিতর সে খরচও না হয় ধরে দেওয়া যাবে; কিন্তু আপনার খানদান যেভাবে খানখান হয়ে ‘যাবে তা আর জোড়া লাগবে না, রাও-সাহেব।

– কী পরিমাণ ‘অ্যালিমনি’ চেয়েছে আপনার মক্কেল?

– সে-কথা তো আপনার কপর্দকহীন পুত্রের ঙ্গে। আপনি তো লীগ্যালি থার্ড-পার্টি। তাই নয়?

– অল রাইট! কাল সকাল দশটায় এই হোটেলে, এই ঘরে যেন আদালতের লোক নোটিসটা সার্ভ করে যায়। আপনার মক্কেলের স্বামী তখন এখানে থাকবে।

– থ্যাঙ্কু অ্যান্ড গুড নাইট!

হত্যা-মামলার দিন পড়েছে পনের দিন পরে। কিন্তু বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলার দিন আগামী সপ্তাহেই। ছন্দা জামিন পায়নি। এদিকে ডক্টর ব্যানার্জি এখনো নিরুদ্দেশ। জবা হয় সত্য কথা বলছে, অথবা অত্যন্ত দৃঢ় চরিত্রের মেয়ে। সে স্বীকার করেনি– এমনকি জনান্তিকেও, বাসু-সাহেবের কাছে যে, ঐ ‘অপারেশন অ্যাবডাকশন’টা বাস্তবে অলীক– ডাক্তার-নার্সের যৌথ পরিকল্পনা।

বিবাহ-বিচ্ছেদের নোটিস্টা ত্রিদিবকে সার্ভ করা গেছে। নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে সে উপস্থিতছিল। স্বাক্ষর করে নোটিস্টা সে গ্রহণ করেছে। দেখা গেল, বাপ-বেটা দু’ জনাই এটা চাইছেন। বাপ

তো বটেই – ঐ ‘নি-খানদানী’ নার্স-মেয়েটি, যে অন্যপূর্বা, যে বাড়ি-থেকে পালিয়ে একজনের সঙ্গে বস্তিতে বাস করেছে, ফলস্ ডেথ-সার্টিফিকেটের জোরে ইনসিওরেন্স-এর টাকা আদায় করেছে এবং সম্ভবত প্রথম স্বামীকে হত্যা করেছে– তাকে তাঁর হাভেলীতে কোন মতেই প্রবেশ করতে দিতে পারেন না। অপরপক্ষে বর্তমান অবস্থায় বিবাহ-বিচ্ছেদটা মঞ্জুর হয়ে গেলে, ছন্দার ফাঁসিই হোক অথবা যাবজ্জীবন – তাঁর শক্তাবৎ খানদান অক্ষত থাকবে। এজন্য তিনি এক কথায় দশ লক্ষ টাকা খরচ করতে প্রস্তুত।

দুটো অসুবিধা ছিল। এক নম্বর: ত্রিদিব বেঁকে বসতে পারত। ত্রিবিক্রম ভাগ্যবান। তা হল না। যেকোন কারণেই হোক, ত্রিদিব ‘প্রডিগাল সান’-এর চরিত্রটা অভিনয় করতে আগ্রহী। ছন্দার মোহমুক্ত হয়ে নে বাপের কক্ষপুটে ফিরে যেতে চায়। দ্বিতীয় আপত্তি:বাসু-সাহেব যে-কারণে বিবাহ-বিচ্ছেদটা চাইছেন– ‘নিষ্ঠুরতা’। ওটা মেনে নেওয়া চলে না। সংগ্রামসিংহের আমল থেকে কোন শক্তাবৎ রাজপুরুষ ধর্মপত্নীর প্রতি নিষ্ঠুর হয়নি।

সুতরাং ত্রিবিক্রম বোম্বাই থেকে উড়িয়ে আনলেন একজন ব্যারিস্টারকে– এল.জি. নটরাজন, বার-অ্যাট-ল। ত্রিবিক্রম জানতেন, ওঁরা দুজন– নটরাজন এবং বাসু – একই বছরে ব্যারিস্টার হয়েছিলেন, চল্লিশ বছর আগে। একই বছরে একই চেম্বার থেকে।

নটরাজনকে উনি বললেন, আপনি বাসু-সাহেবের সঙ্গে দরাদরি করুন। উনি আপনার ক্লাস-ফ্রেন্ড। পারলে, আপনিই পারবেন।

নটরাজন জানতে চান, আপনি ম্যাক্সিমাম কত অ্যালিমনি দেবেন?

ত্রিবিক্রম মাথা নেড়ে বলেন, আপনি আমার প্রস্তাবটা কিছুই বুঝতে পারেননি! টাকার প্রশ্ন আদৌ উঠছে না। দশ লক্ষ পুরোই দেব। প্রয়োজনে ওটা বেড়ে পনের হলেও ক্ষতি নেই; কিন্তু ঐ কারণটা দেখানো চলবে না:নিষ্ঠুরতা! হেতুটা হোক দুজনের মতের মিল হচ্চে না-জীবনদর্শনে ফারাক!

– এই গ্রাউন্ডে কি বিবাহবিচ্ছেদ মঞ্জুর হবে?

– হবে। সে দায়িত্ব আমার। তবে পি. কে. বাসু বাগড়া দিলে হবে না।

– আচ্ছা, দেখি আমি কী করতে পারি!

নটরাজন টেলিফোন করলেন বাসুকে। বাসু উচ্ছ্বসিত। দুই বন্ধুতে অনেক-অনেকদিন পর সাক্ষাৎ হল। প্রায় ত্রিশ বছর। বাসু এককথায় রাজি। ত্রিদিব যদি ‘অপোজিশন’ না দেয়, তাহলে বিচারককে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা যাবে। সত্যিই তো। দুজনের জীবনদর্শনে আসমান-জমিন ফারাক! মিউচুয়াল ডিভোর্স হলেও হতে পারে।

বাসু নটরাজনকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করলেন। নটরাজন বললেন, ভালয় ভালয় বিবাহ-বিচ্ছেদটা মিটে গেলে নিশ্চয় ডিনারে আসব। এখন ওটা দৃষ্টিকটু দেখাবে।

বাসু জানতে চান, ছন্দা রাওয়ের মামলায় তোমার কোনও ভূমিকা নেই?

– তুমি ভুল করছ, বাসু। মামলার আসামী আগামী সপ্তাহ থেকে আর ছন্দা ‘রাও’ থাকবে না। বিশ্বাস কর, ওটা ‘বিশ্বাস’ হয়ে যাবে!

নটরাজন জানতে চান, শুনেছি তুমি কোন মক্কেলের কেস নাও না যতক্ষণ না তুমি নিজে বিশ্বাস কর যে, সে নির্দোষ। কথাটা সত্যি?

– এ বদনাম বোম্বাইয়েও রটেছে?

– তার মানে অভিযোগটা তুমি মেনে নিচ্ছ। এবং তার মানে তোমার বিশ্বাস: ঐ কমলেশ বিশ্বাসকে ছন্দা হত্যা করেনি।

– হ্যাঁ, তাই!

– কী যুক্তিতে?

– একটি মাত্র যুক্তি। ‘কে’ হত্যা করেছে, ‘কেন’ হত্যা করেছে, ‘কী করে’ হত্যা করেছে তা আমি জানি। প্রমাণ করতে পারছিলাম না।

– ‘পারছিলাম না’। মানে অতীতকাল। এখন পার?

– এখন পারি। যদি তুমি আমাকে সাহায্য কর।

– আমি? আমি কী ভাবে সাহায্য করব?

– পরামর্শ দিয়ে। বাধা না দিয়ে।

– আমার ‘প্রফেশনাল এথিক্সে’ না আটকালে আমি নিশ্চয় সাহায্য করব। বল, কী করতে হবে?

– পরশু, শুক্রবার, আমি তোমার মক্কেলের একটা ‘ডিপজিশন’ নিতে চাই। এই বিবাহ-বিচ্ছেদ মামলার বিষয়েই। তার ভিতর থেকেই অপরাধী চিহ্নিত হবে। তুমি জান কি জান-না আমার জানা নেই, ত্রিদিব প্রথমে আমার কাছেই এসেছিল, তার স্ত্রীর তরফে আমাকে ‘রিটেইন’ করতে।

– হ্যাঁ, আমি শুনেছি সে-কথা।

তখন সে আমাকে কতকগুলো ‘ক্লু’ দিয়ে যায়। যার সাহায্যে আমি কেসটার সমাধানে পৌঁছেছি, আসল হত্যাকারীকে চিহ্নিত করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করলেও আমি অকাট্য প্রমাণগুলি সংগ্রহ করতে পারিনি। সে সুযোগলাভের আগেই পুলিস ত্রিদিবকে আমার নাগালের বাইরে নিয়ে যায়। আর তার দেখা পাইনি।

– অল রাইট। কোথায় তুমি ডিপজিশনটা নিতে চাও?

– তুমি কোথায় উঠেছ?

– ঐ তাজ বেঙ্গলেই। পাঁচশ-একুশ নম্বর ঘরে।

– তাহলে ঐ ঘরেই হতে পারে। পরশু, শুক্রবার, বেলা দুটোয়। একটি শর্ত– ঘরে আমরা মাত্র চারজন থাকব: তুমি, আমি, ত্রিদিব আর স্টেনোগ্রাফার।

– আল রাইট। কিন্তু ত্রিবিক্রম কেন থাকবেন না?

– ত্রিদিব ওর দাম্পত্যজীবনের জটিলতা সম্বন্ধে এমন কিছু বলেছিল যেকথা ত্রিবিক্রমের না শোনাই মঙ্গল। এটিকেটে বাধে। তুমি তাঁকে বুঝিয়ে বল।

– বলব।

শুক্রবার, রাত আটটা। বাসু-সাহেব তাঁর চেম্বারে বসে কী-যেন করছিলেন। ইন্টারকমটা বেজে উঠল। তুলে নিয়ে বললেন, বল রানু?

– উনি এসে গেছেন।

– ঠিক আছে। তাঁকে পাঠিয়ে দাও।

একটু পরেই ঘরের ফ্লাশ-পাল্লাটা খুলে গেল। নিখুঁত থ্রিপিস্ স্যুটধারী ত্রিবিক্রমনারায়ণ রাও প্রবেশ করলেন ঘরে। সামনে দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে বললেন, গুড ইভনিং! ব্যারিস্টার সাহেব।

– ওয়েলকাম, স্যার। বসুন ঐ ডিভানটায়; কিন্তু আপনি একা যে? আমি তো নটরাজনকেও প্রত্যাশা করছিলাম।

– না। তিনি বোম্বাই ফিরে গেছেন, ইভনিং ফ্লাইটে।

– সে কী! বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলার ফয়শালা না হতেই?

ত্রিবিক্রম ইতিমধ্যে আসন গ্রহণ করেছেন। বললেন, মিস্টার নটরাজন তো যাবার আগে বলে গেলেন আপনি আর আপনার মক্কেল রাজি হয়েছেন হেতুটা পরিবর্তন করতে, অর্থাৎ ‘নিষ্ঠুরতা’-র পরিবর্তে’ ‘ম্যাল্অ্যাডজাস্টমেন্ট’– বাকিটা তো জাস্ট ফর্মালিটি।

বাসু তাঁর ড্রয়ার খুলে একটা সিগার-এর বাক্স বার করে এগিয়ে দিলেন: চলবে?

– নো, থ্যাংকস্। আই স্টিক টু মাই ওন ব্রান্ড।

বাসু পাইপ ধরালেন। ত্রিবিক্রমও ধরালেন নিজের ব্র্যান্ডের সিগার।

বাসু বলেন, বিবাহ-বিচ্ছেদের সঙ্গে এ ক্ষেত্রে আরও একটা জিনিস যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকবে সে-কথা নটরাজন আপনাকে কিছু বলে যায়নি?

– বলে গেছেন। অ্যালিমনি। তার অ্যামাউন্টটা অবশ্য বলে যাননি। সেটা আমাকে সেট্ল করতে পরামর্শ দিয়ে গেছেন। জোকিংলি বললেন – ‘ওটা নেহাৎই দরাদরি। আপনি ব্যবসায়ী মানুষ, ওটা নিজেই ম্যানেজ করে নেবেন।’ তো বলুন স্যার, আপনার মক্কেল কী পরিমাণ ড্যামেজ চাইছেন?

– ‘ড্যামেজ’ কেন বলছেন? ‘ড্যামেজ’ ক্লেম করে এয়ী। নিগৃহীত প্রতিবেশী। অন্যায়ভাবে আহত ব্যক্তি। এটা তো শুধু ‘ড্যামেজ’ নয়। মানি সেট্লন্ট। স্বামী-স্ত্রীর যৌথ সম্পত্তির বিভাজন।

– সেক্ষেত্রে আপনার মক্কেলকে তো খালি হাতে ফিরে যেতে হবে মিস্টার বাসু। আপনি তো ভালভাবেই জানেন যে, আপনার মক্কেলের স্বামী কপর্দকশূন্য। আপনার ভাষায়: ওয়াইফকে খাওয়া-পরার যোগান দিতে আপনার মক্কেলের হাজবেন্ড তার বাপের কাছে হাত পাতে। আর আমি লোকটা তো থার্ড পার্টি! কী বলেন?

কারেক্ট! ভেরি কারেক্ট! ওর স্বামীর যদি নিজস্ব বলতে কিছু না থাকে তাহলে অ্যালিমানির প্রশ্নই ওঠে না। বাই দ্য ওয়ে, নটরাজন কি আপনাকে জানিয়ে গেছে, আজ দুপুরে তার মক্কেল – আই মীন, আমার মক্কেলের স্বামী – কী জাতের ডিপজিশন দিয়েছে?

– না। নটরাজন বললেন, প্রথমত আমি তাঁর মক্কেল নই, থার্ড পার্টি। দ্বিতীয়ত, আমার পুত্র ও পুত্রবধূর মনোমালিন্যের হেতু নির্ধারণে আপনারা দুই ব্যারিস্টার মিলে ত্রিদিবের যে জবানবন্দি নিয়েছেন তার ‘ডিটেইল্সজানা আমার পক্ষে অশোভন, এটিকেটে বারণ।

– নটরাজন ঠিক কথাই বলেছে। তার মক্কেলের গোপন কথা সে কাউকে জানাতে পারে না, এমনকি মক্কেলের বাবাকেও নয়। কিন্তু আমি পারি। কারণ ত্রিদিব আমার মক্কেল নয়। ইন ফ্যাক্ট, আমি আপনাকে তা জানাব বলেই এই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছি।

ত্রিবিক্রম সহাস্যে বলেন, সরি স্যার! আপনি জানাতে রাজি হলেই তো চলবে না। আমি জানতে রাজি কিনা সেটাও বিচার্য! ইন ফ্যাক্ট আয়াম নট ইন্টারেস্টেড।

বাসু শ্রাগ করলেন: ইট্স্ য়োর প্রিভিলেজ! না শুনতে চাইলে আমিই বা কেন জোর করে তা শোনাব? তবে আমার অবস্থাটা হয়েছে সেই ‘প্রভার্বিয়াল ভবম হাজাম’-এর মতো! একজনকে না শোনানো পর্যন্ত আমার ফাঁপা-পেট স্বাভাবিক হবে না। আপনি শুনতে না চাইলে আমাকে কাল একটি প্রেস-কনারেন্স ডেকে সব খবরের কাগজকে এই মুখরোচক কিস্সাটি শোনাতে হবে!

ত্রিবিক্রমের ভ্রূকুঞ্চন হল।

– ‘মুখরোচক কিস্সা’ মানে?

– বলতেই তো চাই, কিন্তু আপনি যে আবার নন-ইন্টারেস্টেড!

ত্রিবিক্রম পাঁচ-সেকেন্ড কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, লেট্স বি সিরিয়াস, ব্যারিস্টার-সাহেব। আপনি কী কারণে আমাকে জোর করে ওদের দাম্পত্যজীবনের কথা শোনাতে চাইছেন?

বাসু গম্ভীর হয়ে বললেন, প্রথম কথা:আপনার পুত্র ও পুত্রবধূর যৌন-জীবনের কথা এর মধ্যে আদৌ নেই। দ্বিতীয় কথা, ওদের দাম্পত্য জীবনের জটিলতার যে আলোচনা হয়েছে তা শ্বশুর হিসাবে আপনার শোনার মধ্যে কোনও অশোভনতা নেই। তৃতীয় কথা, এই ‘ডিপজিশন-‘এর কথাটা জানাতে না পারলে, আমি আমার মক্কেলের তরফে টাকাটা আদায় করতে পারব না।

– টাকা! কোন টাকা? কিসের টাকা?

– ‘ঘুষ’ নয়, ন্যায্য পাওনা – তাকে ড্যামেজ, অ্যালিমনি, মানি-সেটলমেন্ট আপনি যে নামে ইচ্ছা অভিহিত করুন।

আপনি এখনো আশা করেন, আমি আপনাকে অথবা আপনার মক্কেলকে একটা নয়া পয়সাও দেব?

– ইয়েস্স্যার! আমি তো ইতিপূর্বেই আপনাকে বলেছিলাম, এ কেস হারলে সান্ত্বনা থাকবে যে, বিনা পারিশ্রমিকে এক নিষ্ঠুর ধনকুবেরের বিরুদ্ধে তাঁর অসহায়া পুত্রবধূর পক্ষ নিয়ে লড়েছি; আর এ কেস জিতলে আপনি ঐ চেয়ারে বসে আমার দাবীমতো টাকাটা মিটিয়ে দেবেন! আমার ফী, আর আমার মক্কেলের খেশারত!

ত্রিবিক্রম হাসলেন। বললেন, তর্কের খাতিরে ধরা যাক, আমি আপনার মক্কেলকে ‘হাফ-আ-মিলিয়ান’ দিলাম– কিন্তু সেটা নিয়ে সেকী করবে? ফাঁসি না হলেও ওর দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড হবেই।

– আপনি তাই আশা করেন?

– করি। কারণ আপনার এবং মিস্টার মাইতির ধারণাটা ভুল। ত্রিদিব এবং আপনার মক্কেলের বিবাহ ‘নাল্-অ্যান্ড-ভয়েড’ না হওয়া সত্ত্বেও ত্রিদিব আদালতে উঠে সাক্ষী দিতে পারবে!

– এভিডেন্স অ্যাক্ট-এর সেকশান 122-তে যে প্রভিশন্স আছে তৎসত্ত্বেও?

– ইয়েস স্যার! তা সত্ত্বেও। আইন বলছে, স্বামী বা স্ত্রী তার ‘স্পাউস’-এরবিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে পারবে regarding any act made by one party or the other during their valid married life.”

বাসু-সাহেব স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন তাঁর প্রতিপক্ষের দিকে। তারপর জানতে চাইলেন, একথা কে বলেছে আপনাকে? নটরাজন?

– ইয়েস্ স্যার!

হাসলেন বাসু। বলেন, নটরাজন ইজ এ জুয়েল অব এ সলিসিটার। রেফারেন্সটা আপনাকে দিয়ে যায়নি? ‘রাম ভরোসে ভার্সেস স্টেট’?

ভ্রূকুঞ্চন হল ত্রিবিক্রমের। বললেন, সেটা কী?

– ডায়েরিতে লিখে নিন বরং ‘রামভরোসে ভার্সেস স্টেট – A. I. R. 1954, S. C. 704’। সুপ্রীম কোর্ট-এর ডিভিশন বেঞ্চ বলেছেন “The Protection under Sec.122 applies only to communications between the partners and not to facts.” তার মানে: ত্রিদিব আদালতে বলতে পারবে না এমন কোন গোপন কথা, যা বিশ্বাস করে ছন্দা তার স্বামীকে বলেছিল, যদি আদৌ কিছু বলে থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তো সব কিছুই ‘facts ত্রিদিবের হট-চকলেটে স্লিপিং ট্যাবলেট মেশানো, রাত্রে ‘গৃহত্যাগ’ করা, ইত্যাদি, প্রভৃতি। সব কিছুই ত্রিদিবের প্রত্যক্ষ জ্ঞানে। শোনা কথা নয়। তাই নয়?

ত্রিবিক্রম কী বলবেন ভেবে পেলেন না।

বাসুই পুনরায় বলেন, শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত হল রাও-সাহেব? আপনার পুত্রের ‘ডিপজিশন’টা আপনাকে শোনাব, না প্রেস-কনফারেন্স ডেকে?

ত্রিবিক্রম মনস্থির করলেন, অল রাইট। আমাকেই শোনান।

ইন্টারকমের মাউথপীসটা তুলে নিয়ে বাসু বললেন, রানু, তুমি ঐ ডিপজিশনের টাইপ করা কাগজগুলো নিয়ে কাইন্ডলি এ-ঘরে আসবে?

একটু পরেই ইনভ্যালিড-চেয়ারে পাক মেরে রানু এঘরে এলেন। বাসু তাঁকে বললেন, আজ আফটারনুনে মিস্টার ত্রিদিবনারায়ণ রাও যে ডিপজিশন দিয়েছেন তা ওঁকে পড়ে শোনাও। প্রশ্ন এবং উত্তর।

রানু চশমাজোড়া নাকে চড়ালেন। টাইপ করা কাগজগুলো তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করেন –

প্রশ্ন: আপনার নাম শ্রীত্রিদিবনারায়ণ রাও?

উত্তর: ইয়েস, স্যার।

প্রশ্ন: আপনার স্ত্রীর নাম শ্রীমতী ছন্দা রাও?

উত্তর: ইয়েস!

প্রশ্ন: আপনি কি জানেন যে, আপনার স্ত্রী আপনার বিরুদ্ধে বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন, যার শুনানী হবে আগামী সোমবার?

উত্তর: হ্যাঁ, শুনেছি সে-কথা।

প্রশ্ন: এবং জানেন যে, আপনার স্ত্রীর অভিযোগের মূল বক্তব্য হচ্ছে স্বামী হিসাবে আপনার নিষ্ঠুরতা?

উত্তর : নিষ্ঠুরতা! কই সে-কথা তো কেউ বলেনি?

প্রশ্ন: ‘বলার’ কী আছে? ‘ডিভোর্স পিটিশনটা’ তো আপনিই সই করে নিয়েছিলেন। পড়ে দেখেননি?

উত্তর : না, ড্যাডি বললেন, ও তোমাকে দেখতে হবে না। বলে, তিনি কাগজখানা কেড়ে নিলেন। নিষ্ঠুরতা? ছন্দা বলেছে: আমি নিষ্ঠুর?

রানু দেবী টাইপ করা পাতা-ওল্টাবার অবকাশে তাকিয়ে দেখলেন বাণিজ্য-চুম্বকটির দিকে। তিনি প্রস্তরমূর্তির মতো নির্বাক-নিষ্পন্দ বসে আছেন ডিভান-এ। যেন একটা ঐতিহাসিক নাটকের ডায়ালগ শুনছেন। রানু আবার শুরু করেন–

প্রশ্ন: হ্যাঁ, আপনার বিরুদ্ধে আপনার স্ত্রীর অভিযোগ: নিষ্ঠুরতার। আপনি পড়ে দেখেননি, তাই জানেন না– আপনার নিষ্ঠুরতার অনেকগুলি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। যেমন ধরুন, ‘কমলেশ হত্যা’– কেস-এ আপনি পুলিসের কাছে গিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন…

উত্তর: কিন্তু মিথ্যা অভিযোগ তো আমি করিনি। সত্যি কথাই বলেছি।

প্রশ্ন: এ কথা জেনেও যে, সেজন্য আপনার স্ত্রীর ফাঁসি হয়ে যেতে পারে?

উত্তর: তার আমরা কী করতে পারি? সে তার কৃতকর্মের ফলভোগ করবে। কোন শক্তাবৎ রাজপুত স্ত্রীকে বাঁচাতে মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারে না। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস তাই বলে।

প্রশ্ন: তার মানে, আপনি এখনো ঐ মত পোষণ করেন? ঐ হত্যা মামলার আসামী ছন্দা রাও দোষী?

উত্তর: নিশ্চয় করি।

প্রশ্ন: কোন্ যুক্তিতে? কেন আপনার মতে ছন্দা রাও হত্যাকারী?

উত্তর: অসংখ্য যুক্তিতে। ও আমাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিল। আমি ঘুমিয়ে পড়েছি ভেবে সে মধ্যরাত্রে তার প্রথম স্বামীর কাছে যায়। তাকে হত্যা করে! না-হলে সে আমার স্ত্রী থাকতে পারে না। আমার ড্যাডির কোটি-কোটি টাকার সম্পত্তির ওয়ারিশ হতে পারে না। তাই সে কমলেশকে খুন করে নিঃশব্দে পালিয়ে আসে। জামা-কাপড় পাল্ট গুটিগুটি আমার পাশে খাটে উঠে শুয়ে পড়ে। এসব মিথ্যা কথা?

প্রশ্ন: মিস্টার রাও, আমি প্রশ্ন করব। আপনি শুধু জবাব দেবেন। ‘ডিপজিশন’-এ সেটাই কানুন।

উত্তর: আর কী জানতে চান?

প্রশ্ন: আপনি পরদিন সকালে যখন আমার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ করতে আসেন তখন আমি জানতে চেয়েছিলাম, ‘তুমি কি আমার বাড়ি চিনতে?’ জবাবে আপনি বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, চিনতাম।’ তখন আমি জানতে চেয়েছিলাম, ‘কী ভাবে?’ তার জবাবে আপনি কী বলেছিলেন তা আপনার মনে আছে?

উত্তর: না নেই। কী বলেছিলাম? তাছাড়া আপনি এখন আমাকে ‘আপনি’ বলে কথা বলছেন কেন? আগে তো ‘তুমি’ই বলতেন?

প্রশ্ন: বেশ, আবার না হয় ‘তুমি’ই বলছি। আমার ঐ প্রশ্নের জবাবে তুমি বলেছিলে “সরি, স্যার! ঠিক বলতে পারব না। স্বীকারই করি – আমি ডক্টর ব্যানার্জির নার্সিং-হোমে ভর্তি হয়েছিলাম মানসিক রোগী হিসাবে। সব সময় সব কথা আমি মনে করতে পারি না।”

উত্তর: হ্যাঁ, মনে পড়েছে বটে। আজ্ঞে হ্যাঁ, ঐ কথাই আমি বলেছিলাম বটে।

প্রশ্ন: এখন কি মনে পড়েছে? কীভাবে ঘটনার পরদিন সাত সকালে ঠিকানা জানা না-থাকা সত্ত্বেও তুমি আমার বাড়িতে গাড়ি ড্রাইভ করে চলে আসতে পেরেছিলে?

উত্তর: না, মনে পড়ছে না।

প্রশ্ন: আমি তোমাকে একটু সাহায্য করি, কেমন? দেখ, মনে পড়ে কিনা। তার আগে দু-একটা কথা বলি। প্রথম কথা: তোমার ড্যাডি চাইছেন যে, এই বিবাহবিচ্ছেদটা যত শীঘ্র সম্ভব অনুমোদিত হয়ে যাক। তুমিও তাই চাইছ, শুনেছি। কিন্তু তোমার স্বনামধন্য পিতৃদেব ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন যে, বিবাহবিচ্ছেদের হেতুটা যেন ‘নিষ্ঠুরতা’না হয়। হেতুটা যেন ‘সমঝোতার অভাব’ বলে খাতাপত্রে লেখা থাকে। তাহলে তোমাদের শক্তাবৎ খানদান অক্ষত থাকবে। সেজন্যই এই ‘ডিপজিশন’ নেওয়া হচ্ছে। তোমার স্বার্থ দেখবার জন্য তোমার ড্যাডি এই ব্যারিস্টার নটরাজনকে নিয়োগ করছেন। তুমি যদি এখন আমার কাছে সব সত্যি কথা স্বীকার কর – তোমার নিজের ক্ষতি না করে– তাহলে আমি চেষ্টা করব যাতে হেতুটা ‘নিষ্ঠুরতা’র পরিবর্তে ‘দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য’হিসাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। আমি কী বলছি তুমি বুঝতে পারছ?

উত্তর: না-বোঝার কী আছে? বুঝছি।

প্রশ্ন: এবার বলি: তুমি সেই সাত-সকালে আমার বাড়ি চিনে আসতে পেরেছিলে এই কারণে যে, তার পূর্বদিন শুক্রবার তোমার স্ত্রী যখন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে তখন তুমি তাকে অনুসরণ করে এসেছিলে। তুমি নিজের গাড়িতে আসনি– যাতে ছন্দা গাড়ির নম্বর দেখে চিনতে না পারে, বুঝে ফেলতে পারে। তাই এসেছিলে একটা ভাড়া করা জীপ চেপে। তোমার চোখে ছিল সানগ্লাস, মুখে ফল্দাড়ি, ঝোলায় একটা বাইনোকুলার…তাই নয়?

উত্তর: আপনি কেমন করে জানলেন?

প্রশ্ন : আমি জানি। জানি যে, তোমার মূল উদ্দেশ্য ছিল তদন্ত করে দেখা: তোমার স্ত্রী দ্বিচারিণী কিনা। কারণ হাজার-বছর ধরে কোনও শক্তাবৎ রাঠোর রাজপুত্র কখনো কোনও দ্বিচারিণীকে সহ্য করেনি। স্বহম্ভে সেই অসতীর শিরশ্ছেদ করেছে। তাই নয়?

উত্তর: হ্যাঁ, তাই। আপনি ঠিকই বলছেন!

বাসু: এবং ঐ একই উদ্দেশ্যে তুমি তোমার সদ্য-পরিণীতা ধর্মপত্নীর হাত-বটুয়া হাতড়ে..

ত্রিদিব: কোন্ উদ্দেশ্যের কথা বলছেন, স্যার?

বাসু: তোমার তো একটাই উদ্দেশ্য ছিল, ত্রিদিব। সাচ্চা রাঠোর রাজপুতের যা লক্ষ্য: স্ত্রীদ্বিচারিণী কি না সমঝে নেওয়া! ..সেই উদ্দেশ্যেই তুমি তোমার সহধর্মিণীর হাতব্যাগ হাৎড়ে কমলেশ বিশ্বাসের টেলিগ্রামখানা দেখতে পেয়েছিলে। আন্দাজ করেছিলে: সে হচ্ছে ছন্দার প্রথমপক্ষের স্বামী।

ত্রিদিব: কিন্তু আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি যে, ওদের ডিভোর্স হয়ে যায়নি। ওরা এখনো স্বামী-স্ত্রী। বিশ্বাস করুন, স্যার!

বাসু: তা তুমি কেমন করে আন্দাজ করবে, ত্রিদিব? এক স্বামী জীবিত থাকতে কেউ দ্বিতীয়বার বিবাহ করে?

ত্রিদিব: আপনিই বলুন, স্যার!

বাসু: আর সেই জন্যেই যখন সেই শনিবাররাত বারোটা পঁয়ত্রিশে ছন্দা তার মারুতি-সুজুকি গাড়িটা নিয়ে রওনা হয়, তখন তুমি তাকে অনুসরণ করেছিলে। তোমার অ্যাম্বাসাডারে… তাই নয়?

ত্রিদিব: আজ্ঞে না, আমি তো তখন ডক্টর ব্যানার্জির বাড়িতে ফোন করেছিলাম।

বাসু: আমার মনে আছে। গদাধর টেলিফোনে জানালো যে, ডাক্তারবাবুও গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছেন। তাতেই তো তোমার সন্দেহ হল যে, ওরা দুজনে যুক্তি করে কমলেশকে হত্যা করতে গেছে।

ত্রিদিব: না হলে ছন্দার ব্যাগে রিভলভার আসবে কোত্থেকে? আপনিই বলুন।

বাসু: কারেক্ট। তুমি অবশ্য জানতে না যে, রিভলভারটা ডক্টর ব্যানার্জির!

ত্রিদিব: না স্যার, জানতাম। আগের দিনই টেলিফোনে ওদের কথাবার্তা আমি আড়ি পেতে শুনেছিলাম। তাতেই তো আমি জানতাম: খুনটা ডক্টর ব্যানার্জিই করেছে– সেই হচ্ছে ছন্দার আসল লাভার – কমলেশ বিশ্বাস নয়! আমি সেদিনই আপনাকে বলিনি যে, খুনটা করেছে ঐ ব্যানার্জিই– আর সে পরস্ত্রীর পেটিকোটের আড়ালে মুখ লুকাতে চাইছে? আমি জানতাম, ছন্দা খুনটা করেনি, করতে পারে না – চাবিটা ঐ ঘরের মেজেতে ফেলে এসে সে মিথ্যা খুনের দায়ে জড়িয়ে পড়েছে…

বাসু: আই রিমেম্বার! এ-কথা তুমি সে-দিনই বলেছিলে! আর সে জন্যই গদাধর যখন বলল যে, ডক্টর ব্যানার্জি বাড়িতে নেই ঠিক তখনই তুমি স্থির করলে: স্ত্রীকে ফলো করা দরকার!

ত্রিদিব: না স্যার, ঠিক তখনই নয়। তার অনেক আগেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, ছন্দা যদি আমাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে রাত্রে কোথাও অভিসারে যেতে চায়, তাহলে তাকে ফলো করব।

বাসু: আমি তো তা জানিই।

ত্রিদিব: আপনিও তাই আন্দাজ করেছিলেন? কেমন করে?

বাসু: না হলে ছন্দার মারুতি-সুজুকি গাড়ির পিছন দিকের ডান চাকায় অমন চোরা-লীক হবে কেমন করে? আমি জানতাম– ওটা তুমিই করেছিলে। যাতে ছন্দা তড়িঘড়ি রওনা হলেও তোমার ফলো করতে অসুবিধা না হয়।

ত্রিদিব: এটা কী করে বলছেন, স্যার? টায়ার-পাঞ্চার তো অ্যাক্সিডেন্টালিও হতে পারে?

বাসু: পারে। যে-চাকা পথের ঘর্ষণে নিত্য ক্ষয়িত হচ্ছে তা পাঞ্চার হতেই পারে। কিন্তু যে-চাকা জমি থেকে দুই-ফুট উঁচুতে ডিক-এর বর্মে নিরাপদে সুরক্ষিত, তাতে অ্যাক্সিডেন্টালি একটা পেরেক ফুটতে পারে না! পারে?

ত্রিদিব: মানে?

বাসু:আরে বাপু, ‘মানে’টা তুমিও জানো, আমিও জানি। ঐ স্পেয়ার টায়ারে একটা পেরেক ঢুকিয়ে চোরা ‘লীক’ তৈরী করতে পার একমাত্র তুমিই। কারণ ছন্দা ছাড়া ঐ গাড়ির চাবি শুধুমাত্র তোমার কাছেই ছিল। ছন্দা তো আর নিজের গাড়ির স্পেয়ার-টায়ারে পেরেক পুঁতে রাখবে না! ফলে ওটা তোমার কীর্তি! তুমি এমন ব্যবস্থা করেছিলে যে, ছন্দা মাঝরাতে হঠাৎ কোথাও অভিসারে গেলে অন্ততপক্ষে দশ-পনের মিনিট সময় তোমাকে দিতে বাধ্য হবে। দু-দুবার ‘লীক’ সারাতে। তবে হ্যাঁ, এর মধ্যে দোষের কিছু নেই। তোমার মূল উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। সাচ্চা রাঠোর শক্তাবৎ রাজপুতের মতো। শুধু সমঝে নেওয়া: স্ত্রী দ্বিচারিণী কি না!

ত্রিদিব: আপনিই বলুন, স্যার। আর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে আমার?

বাসু: কারেক্ট! স্রেফ রাজপুত শ্যিভালরি!…তুমি যে টেলিফোন করার পর নিজের অ্যাম্বাসাডারবার করে ওকে ‘ফলো’ করেছিলে এটা বুঝতে আমার কোন অসুবিধা হয়নি।

ত্রিদিব: কী করে বুঝলেন?

বাসু: যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত: দেখ! ছন্দা বলেছে– গাড়িটা বার করে তারাতলামুখো যাবার আগে সে গ্যারেজের স্লাইডিং ডোরটা টেনে তালাবন্ধ করে দিয়ে গেছিল। তুমিও বলেছিলে জানলা দিয়ে দেখতে পাও ডবল্-পাল্লা স্লাইডিং ডোরটা সে টেনে বন্ধ করে। নবতাল তালা লাগায়। তুমি বলেছিলে, ফিরে এসে ছন্দা তোমাদের ট্রিপলিকেট চাবি দিয়ে নবতাল-তালাটা খোলে, স্লাইডিং-ডোরটা সরায় তাই নয়?

ত্রিদিব: হ্যাঁ, তাই। কারণ, ওর নিজের চাবির সেট তো তখন তারাতলায় পড়ে আছে।

বাসু: তাই যদি হয়, অহলে শুতে যাবার আগে, গ্যারেজের পাল্লা সে টেনে বন্ধ করেনি কেন?

ত্রিদিব : আপনিই বলুন?

বাসু: একমাত্র যুক্তি: ইতিমধ্যে অ্যাম্বাসাডার গাড়িটা কেউ বার করেছিল এবং ছন্দা ফিরে আসার আগে দ্বিতীয়বার ঢুকিয়েছিল। তবে তাড়াহুড়ায় অ্যাম্বাসাডার-গাড়িটা যথেষ্ট ভিতরে ঢুকিয়ে ‘পার্ক’ করেনি। সে জন্যই ঐ গাড়ির বাম্পারে স্লাইডিং-ডোরটা আটকে যাচ্ছিল। ছন্দা তাই স্লাইডিং ডোরটা বন্ধ করতে পারেনি। নবতাল-তালা লাগানোর প্রশ্নই ওঠেনি।

ত্রিদিব:কে?…কে? অ্যাম্বাসাডার গাড়িটা বার করবে? ঢোকাবে?

বাসু : একমাত্র তুমিই তা পারতে। তুমিই তা করেছিলে। যেহেতু সাচ্চা শক্তাবতের মতো তুমি জানতে চেয়েছিলে তোমার স্ত্রী দ্বিচারিণী কিনা। কী? ঠিক বলছি তো?

ত্রিদিব: হ্যাঁ, ঠিকই বলছেন! আমি স্বচক্ষে দেখেছি, ছন্দা ঐ গ্যলভানাইজড পাইপটা ঘুরিয়ে কমলেশের মাথায় মারল। বিশ্বাস করতে পারেন? আমি সে-কথা পুলিশকে বলিনি। কাউকে বলিনি। কিন্তু নিজের চোখে আমি তা দেখেছি।

বাসু :আমি তো তা জানিই!

ত্রিদিব: তাও জানেন আপনি! অসম্ভব! কী জানেন?

বাসু: বলছি। শোন! মিলিয়ে নাও! ছন্দা রওনা হবার পর তুমি ডাক্তার ব্যানার্জিকে একটা ফোন কর। কারণ তুমি জানতে তোমার হাতে যথেষ্ট সময় আছে। ছন্দাকে দু-দুবার চাকা বদলাতে হবে। দু-দুবার টিউবে হাওয়া ভরাতে হবে। ডাক্তার ব্যানার্জিও তাঁর বাড়িতে নেই শুনে তুমি ধরে নিয়েছিলে ওরা দুজনে মিলে তারাতলায় গেছে। তাই তুমি সোজা তারাতলার মা-সন্তোষী অ্যাপার্টমেন্টে চলে যাও। ছন্দা চাকায় হাওয়া ভরে সেখানে পৌঁছানোর অনেক আগেই তুমি পৌঁছাও। পুলিসটা পরে যে-ভাবে ঢুকেছিল সেই ভাবে ভারা বেয়ে মেজানাইন-উচ্চতায় উঠে জানলার ফোকর বেয়ে ভিতরে ঢুকে লুকিয়ে বসে থাক। একটু পরে কমলেশের টেলিফোনটা বাজে। কমলেশ জেগেই ছিল। টেলিফোনে কথা বলে…

ত্রিদিব: কী-কথা বলুন তো?

বাসু: ফোন করেছিল ওর এক পাওনাদার। ও তাকে জানায় ছন্দা রাও ওকে পরদিনই দু-হাজার টাকা দেবে। তা থেকে কমলেশ তার ধার কিছুটা শোধ করবে।

ত্রিদিব: আজ্ঞে না! ভুল হল আপনার: ধার নয়। ওর আর এক প্রাক্তন শ্যালক ফোন করেছিল। কমলেশ যে-টাকা চুরি করেছে তাই উশুল করতে চাইছিল। বুঝলেন?

বাসু:তাহলে তাই হবে। মোটকথা একটু পরে ছন্দা এসে কলবেল বাজায়। কমলেশ নিচে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। ওরা দুজনে উপরে উঠে আসে। দু’জনে কথা কাটাকাটি থেকে ঝগড়া করছিল। তুমি আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনছিলে। কমলেশ বিশ্বাস দু-হাজার টাকা চাইছিল, আর ছন্দা বলছিল অত টাকা ওর কাছে নেই! কমলেশ তা বিশ্বাস করে না, সে-একটা অশ্লীল গালাগাল দিয়ে ওর হাত চেপে ধরে।

ত্রিদিব: কারেক্ট! তখন আমার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। আপনি তো জানেনই, আমার ধমনীতে শক্তাবৎ রাঠোর রাজপুতের রক্ত।

বাসু : তাহলে তুমি ঝাঁপিয়ে পড়ে কমলেশের চোয়ালে একটা ঘুসি মারলে না কেন? ‘ঢিসম্’ করে! অমিতাভ বচ্চনের মতো?

ত্রিদিব: মারতামই তো! কিন্তু ওদের দু-জনের হেপাজতেই আছে রিভলভার – আমি নিরস্ত্র! আমি দেখলাম, ওরা দুজনে মারামারি করছে! ছন্দা এক ধাক্কা মেরে তার হাতটা ছাড়িয়ে নিল। সেই ধাক্কাতে একটা কাচের গ্লাস ঝন্ধনিয়ে ভেঙে পড়ল। এই সময় কমলেশ কী করল জানেন?

বাসু: জানি। দু-হাত বাড়িয়ে ছন্দার গলা টিপে ধরতে গেল!

ত্রিদিব: কারেক্ট! তখনই ছন্দা একটা জলের পাইপ তুলে নিয়ে এলোপাথাড়ি ঘোরাতে থাকে। পাইপটা দ্রাম করে গিয়ে লাগে কমলেশের মাথায়। ও পড়ে যায়। ঠিক তখনি আমি হাত বাড়িয়ে সুইচটা অফ্ করে দিই।

বাসু : আই নো! কিন্তু কমলেশের আঘাতটা মারাত্মক ছিল না। পাঁচ সেকেন্ড বাদেই সে উঠে বসতে চাইল!

ত্রিদিব : একজ্যাক্টলি! রাস্তার আলো পড়েছিল ঐখানে। আমি স্পষ্ট দেখলাম – ও হিপ-পকেটে হাত চালিয়ে দিয়েছে। তার মানেটা বুঝেছেন, স্যার?

বাসু : জলের মতো পরিষ্কার! ওর হিপ্-পকেটে ছিল রিভলভারটা! তাই তো? তাহলে তুমি যা করেছিলে তা সমর্থনযোগ্য। ওটা তো আত্মরক্ষার্থে! না হলে কমলেশই গুলি করে মারত। তাই না?

ত্রিদিব: বলুন স্যার! আমার অন্যায়টা কী হল? আমি ছন্দার ফেলে যাওয়া জলের পাইপটা নিয়ে ঐ শয়তানটার মাথার পিছন দিকে অ্যাইসা এক বাড়ি ঝাড়লাম যে, ওর ভবলীলা খতম!

বাসু: বুঝলাম। তারপর তুমি ছন্দাকে নাম ধরে ডাকলে না কেন?

ত্রিদিব: আমার ধারণা ছিল ছন্দার জন্য ডক্টর ব্যানার্জি নিচে অপেক্ষা করছে। সেটা সত্যি কি না তাই দেখতে চাইলাম। নিচে হঠাৎ ‘কলবেল’ বেজে ওঠায় আমার সন্দেহ বেড়ে যায়। তারপর আমার হঠাৎ আতঙ্ক হয় – যে লোকটা ‘কলবেল’ বাজাচ্ছে সে যদি পুলিশ হয়! তাই আমি তৎক্ষণাৎ ভারা বেয়ে নিচে এলাম। দেখলাম, একটা লোক আমার আগে আগে ভারা বেয়ে নিচে নামছে। সে দৌড়ে গিয়ে একটা মটোর-সাইকেলে উঠে পালিয়ে যায়।

বাসু: তুমিও গাড়িতে উঠে বাড়ি ফিরে এসেছিলে, কেমন? কিন্তু তোমার হাতে সময় ছিল কম। তাই তাড়াহুড়া করে গাড়িটা পার্ক করে স্লাইডিং-ডোর টেনে দেবার সময় পাওনি। তালা লাগাবার প্রশ্নই ওঠেনি।

ত্রিদিব: কারণ আমি জানতাম দু-তিন মিনিটের মধ্যেই ছন্দা এসে পৌঁছাবে। তাড়াহুড়ায় অ্যাম্বাসাডার গাড়িটা আমি ঠিক মতো পার্ক করতে পারিনি। তাই ছন্দা স্লাইডিং-ডোরটা বন্ধ করতে পারেনি।

বাসু: তুমি সব কথাই বলেছ ত্রিদিব, কিন্তু একটা কথা এখনো বলনি!

ত্রিদিব: কী কথা?

বাসু: পরদিন সকালে, যখন ছন্দা অঘোরে ঘুমোচ্ছে, আর তুমি আমার কাছে আসবে বলে মনস্থির করলে তখন তুমি পকেট হাৎড়ে দেখতে পেলে– তোমার চাবির থোকাটা নেই! আগের দিন রাত্রে কমলেশের ফ্ল্যাটে যখন পকেট থেকে দেশলাই বার করছিলে তখন অসাবধানে তোমার চাবির থোকাটা পড়ে গেছে! যেহেতু তারাতলায় পৌঁছে কমলেশের ফ্ল্যাটে যাওয়ার আগে তুমি গাড়ি ‘লক’ করে যাওনি আর ইশন-কী ড্যাশ বোর্ডে লাগানো ছিল, যেহেতু ছন্দাকে অনুসরণ করার সময় তুমি নবতাল-তালাটা লাগিয়ে যাওনি তাই বাড়ি ফিরে তোমার কোনও অসুবিধা হয়নি। তাই না? তার মানে তুমিই ড্রয়ার থেকে ট্রিপ্সিেিকট চাবিটা সংগ্রহ করেছিলে। পরদিন সকালে। আর ছন্দার ব্যাগ খুলে তার চাবিটাও নিজের পকেটে ভরে নাও। অর্থাৎ খবরের কাগজে যে ফটো বার হয়েছে তা তোমার চাবির সেট– ছন্দার নয়। কী? ঠিক বলছি?

ত্রিদিব: আশ্চর্য! আপনি কেমন করে টের পেলেন?

বাসু-সাহেব হাতটা তুলে রানুকে থামতে বললেন, দ্যাট্স অল! আর পড়ার দরকার নেই। তুমি বিশ্রাম নাও গে যাও।

রানু কাগজগুলো নিয়ে তাঁর ইনভ্যালিড-চেয়ারের চাকায় পাক মেরে গৃহাভ্যন্তরে চলে গেলেন। তবে নিতান্ত মেয়েলী কৌতূহলে রাঠোর রাজপুতটির দিকে একবার চকিত দৃষ্টিপাত করতে ভুল হল না।

ফোলানো বেলুনটিতে কে যেন নির্মমভাবে সূচ ফুটিয়েছে! উনি স্রেফ চুপসে গেছেন!

রানু চলে যাবার পর স্বয়ংক্রিয়-পাল্লাটা বন্ধ হতেই ত্রিবিক্রমনারায়ণ ঝুঁকে পড়ে বললেন, আপনি কি এই ডিপজিশনের কপি পুলিশকে দেবেন?

জবাবে বাসু বললেন, ফর য়োর ইনরমেশন মিস্টার রাও, আপনার পুত্রবধূর জামিনের অর্ডার বেরিয়ে গেছে। প্রসিকিউশনের নিজেদের সাক্ষীরাই তাকে ‘অ্যালেবাই’ দিয়েছে। সম্ভবত পুলিস এ-কেস চালাবে না। হত্যামুহূর্তে আসামী অকুস্থলে ছিল না, এটা প্রমাণিত হয়েছে!

ত্রিবিক্রম পুনরায় বলেন, তা নয়, আমি জিজ্ঞেস করছি, এই ‘ডিপজিশনে’র কপি কি আপনি পুলিশ-কমিশনারকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন?

বাসু বলেন, আপনার পুত্র ও পুত্রবধূ দু-জনেই ‘মিউচুয়ালি এগ্রি’ করেছে। বিবাহবিচ্ছেদটা হয়ে যাবে। অবশ্য অ্যালিমনির খেশারতটা আপনি দিতে রাজি হলে।

ত্রিবিক্রম স্পষ্টতই বিরক্ত হলেন: দ্যাটস্ নট দ্য পয়েন্ট, কাউন্সেলার! আমি জানতে চাইছি, এই ডিপজিশনের কপি কি পুলিশে পাঠানো হবে?

– কে পাঠাবে? আমরা ছয়জন জানি, কমলেশকে কে হত্যা করেছে। ত্রিদিব নিজে জানে, কিন্তু সে পাঠাবে না। কারণ সে হত্যাকারী। নটরাজন আর স্টেনোগ্রাফার ‘প্রফেশনাল এথিক্সে’ পুলিসে জানাতে পারে না। বাকি রইলাম আমরা তিনজন: আপনি, আমি আর আমার সেক্রেটারি! কে পাঠাবে?

ত্রিবিক্রম দাঁতে-দাঁত দিয়ে বললেন, আপনি?

– না। আমি পাঠাব না। কেন জানেন? আমি চাই না যে, টাকার জোরে আপনি আইনকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হন। এ জন্য শাস্তি যা দেবার তা আমি নিজেই দেব।

– আপনি নিজেই শাস্তি দেবেন? ত্রিদিবকে?

– নিজেই দেব। ত্রিদিবকে নয়। তার বাবাকে। প্রকৃত অপরাধীকে। কমলেশ যখন পকেট থেকে রিভলভার বার করেছে, তখন তার মাথায় বাড়ি মারাকে খুন তো বলাই চলে না। সেটা আত্মরক্ষা করা। সাচ্চা মরদ হলে সে পুলিসে গিয়ে অকপটে আদ্যন্ত সত্য কথা বলত। নিঃসন্দেহে সে নির্দোষী হিসাবে মুক্তি পেত। কিন্তু ত্রিদিব সে-পথে যায়নি। তার পরিবর্তে সে তার স্ত্রীর – যে স্ত্রী দ্বিচারিণী নয়, যে দু হাজার টাকা ব্ল্যাকমেলারকে দিতে রাজি হল না – তাকে ফাঁসিয়ে দিল। ফাঁসির দড়িতে ঝোলাতে চাইল! তার ভ্যানিটিব্যাগ থেকে চাবির গোছা চুরি করে পুলিসের কাছে মিথ্যা এজাহার দিয়ে এল। এই হিমালয়ান্তিক অপরাধের জন্য দায়ী কে? একমাত্র ত্রিদিবের বাবা! যে ওকে মেরুদণ্ডহীন ক্রিমিকীটের মতো না-মানুষ করে গড়ে তুলেছে। অপরাধীকে তাই কঠিন শাস্তি দেব আমি।

– কী শাস্তি?

– অর্থদণ্ডই! তবে আইন-সম্মতভাবে। ঘুষ নয়!

ত্রিবিক্রম পকেট থেকে চেক বই বার করে, কলমের খাপটা খুলে বলেন, বলুন?

– দুটো চেক লিখবেন। একটা আমাকে। অ্যাকাউন্ট-পেয়ী। আপনার পুত্রবধূর পক্ষে মামলা লড়ার জন্য ‘ফীজ’: পঞ্চাশ হাজার, ইনক্লুডিং কস্ট। দ্বিতীয়টা আপনার বধূমাতাকে – হোয়াইট মানি– অ্যালিমানি-কাম-প্রপার্টি সেটলমেন্ট: সাতাত্তর লক্ষ টাকা।

ত্রিবিক্রম একটু চমকিত হয়ে বললেন, বেগ্ য়োর পার্ডন? লক্ষ? ‘হাজার’ নয়?

– না ‘মিলিয়ান’ নয়, লক্ষই। আপনিই না সেদিন বললেন, আপনার হাত দিয়ে দিনে লাখ-লাখ নয়, কোটি-কোটি টাকা হাত ফিরি হয়?

ত্রিবিক্রম জবাব দিলেন না। দু-খানি চেক লিখে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, আগে বলিনি, তাহলে আমাকে ভুল বুঝতেন। এখন বলছি, আই প্লীড: গিলটি! ছেলেটাকে আমি ঠিক মতো মানুষ করতে পারিনি।

বাসুও উঠে দাঁড়ালেন। করমর্দনের জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, শুভ-প্রচেষ্টা যে-কোন বয়সেই শুরু করা যেতে পারে। উইশ্ বেস্ট অব লাক্। ছেলেকে এবার মানুষ করে তুলুন!

ত্রিবিক্রম ওঁর প্রসারিত হাতটা ধরেই ছেড়ে দিলেন। বললেন, থ্যাংস্ কাউন্সেলার, ফর দিস কাউন্সেল!