তিন
নিজের ঘরে ফিরে এসে কাকলি ভাবতে বসল।
ভৈরব দাশ কী চায়? সে যে কী চায় তা অবশ্য জানতে বাকি নেই কাকলির, কিন্তু কায়দা করে স্বর্ণদির ওই দশ শতাংশ শেয়ার সে কেন কিনেছে? ওর খাতাপত্র দেখতে পারবে বলে? ওর যাবতীয় পরিকল্পনায় তিনভাগের একভাগ নাক গলাতে পারবে বলে? এভাবে শত্রুতা করে ভৈরবের কী লাভ? বোধহয় লোকটার স্বভাবই ওই রকম। বড়লোকের আদুরে ছেলে। ছেলেবেলা থেকে যা চেয়েছে হাতের কাছে পেয়েছে। আদর দিয়ে বাবা-মা হয়তো ওর মাথাটা শৈশবেই খেয়েছেন। কাকলি যে ওর প্রতিটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এটা সে সইতে পারছে না।
হঠাৎ কাকলির মনে পড়ে গেল এক বান্ধবীর কথা। মেয়েটি ঘটনাচক্রে একটা চরম বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল। কিছু অপরাধজীবী সুপরিকল্পিতভাবে তাকে ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিল। তাকে অদ্ভুতভাবে বাঁচিয়ে দেন একজন ব্যারিস্টার-শুধুমাত্র সুপরামর্শ দিয়ে। নিরপরাধ মেয়েটি ওদের ষড়যন্ত্রজাল ভেদ করে অক্ষত বের হয়ে আসে। কাকলির মনে পড়ে গেল সেই ব্যারিস্টারটির নাম। টেলিফোন ডাইরেক্টরিটা টেনে নিয়ে নম্বর দেখে ও তাঁকে ফোন করল।
ও-প্রান্তে ফোন ধরলেন একজন মহিলা, পি. কে. বাসুর রেসিডেন্স। বলুন?
কাকলি বললে, আমার নাম কাকলি দত্ত। আমি একটা বিপদে পড়ে গেছি। আইন অনুসারে আমার কী করা উচিৎ বুঝে উঠতে পারছি না। বাসু-সাহেবের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইছি।
– আমি মিসেস বাসু বলছি। আমিই ওঁর সেক্রেটারি। আপনার বিপদটা কী জাতের আমাকে কিছু আভাস দিতে পারেন?
– পারি। আমি ‘সুজাতা ফোটোগ্রাফিক স্টোরস’-এর মালিক। ঠিক মালিক নই। এটা একটা ছোট কোম্পানি আর কি। আমরা দুই বোন আশি ভাগ শেয়ার-হোল্ডার। শুধু বিশ শতাংশ শেয়ার ছিল আমাদের পরিবারের বাইরে। দুর্ভাগ্যবশত একজন ধুরন্ধর ব্যবসায়ী তার ভিতর দশ শতাংশ শেয়ার অতি সম্প্রতি কিনেছে। আমার আশঙ্কা, লোকটা আমাদের বিপদে ফেলতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের কতটা অধিকার, কী করণীয়, ইত্যাদি–
– বুঝেছি। বিষয়টা তাহলে খুব জরুরি নয়, কেমন?
– না মানে, আমি খবরটা এইমাত্র জেনেছি। আতঙ্কিত হয়ে প্রথমেই জানতে চাইছি আই মীন, উনি যদি আমার সমস্যাটা–
– ঠিক আছে, ঠিক আছে। কাল বিকাল চারটের সময় আপনি ওঁর চেম্বারে আসতে পারবেন কি? চেম্বার মানে বাড়িতেই, নিউ আলিপুরে-–
– হ্যাঁ, ঠিকানা তো টেলিফোন ডাইরেক্টরিতে আছে। তাই আসব। কাল বিকালে। এই সময়?
– না। এখন চারটে দশ। ঠিক চারটেয় আসবেন। উনি ভীষণ পাঞ্চয়াল। আমি ওঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্যাডে লিখে রাখলাম।
– ঠিক আছে। তাই আসব। চারটেয়।
টেলিফোনটা নামিয়ে রেখে কাকলি আবার বাইরে বার হয়ে এল। সুপর্ণাকে, বললে, আমি একটু বেরুচ্ছি। সাতটার মধ্যে দোকানে ফিরে না এলে তুমি দোকান বন্ধ করে চলে যেও। বাইরের চাবি গোপালের কাছে দিয়ে যেও। গোপাল দুধ আনতে গেছে। এখনি ফিরে আসবে।
গোপাল ওর ঠিকে চাকর, পাশের বাড়িতেই থাকে।
প্রবেশপথের কাছেই যে প্রমাণ মাপের আয়নাটা আছে তাতে নিজ প্রতিবিম্বের দিকে একবার তাকিয়ে দেখল। হাতব্যাগ থেকে চিরুনি বার করে চুলটা আঁচড়ে নিল। শাড়ির নিচের দিকটা একটু টেনে-টুনে ঠিক করল। বত্রিশ বছর বয়সেও তাকে দেখলে লোকে পঁচিশ-ছাব্বিশ বলে ভুল করে। মেদবর্জিত সুঠাম দীর্ঘ দেহ। কয় বছর কঠোর পরিশ্রম করে সে দোকানটাকে লাভজনক অবস্থায় নিয়ে এসেছে। দুর্দান্ত প্রতিকৃতি তুলবার সুখ্যাতি শহরময় এমনই ছড়িয়ে পড়েছে যে, দূর-দূরান্ত থেকে ওর কাছে ফটো-তোলাতে খদ্দের ছুটে আসে। এই সুখ্যাতি ওর চরিত্রে একটা আলাদা মর্যাদা অর্পণ করেছে। কাকলি দত্ত আলোকচিত্র-শিল্পী মহলে এখন একটি সুপরিচিত নাম। কাকলি বাসস্টপের দিকে এগিয়ে গেল। অফিস-টাইমের ভিড় এখনো শুরু হয়নি। অপ্রয়োজনে সে ট্যাক্সি চাপে না। ফিয়াট গাড়িটা যোধপুর পার্কের বাড়িতেই আছে। ওটা জয়া ব্যবহার করে না এখন। তা হোক, কাকলিও সেটা ব্যবহার করে না। ওটা তো দিদির।
সুপর্ণা পিছন থেকে তাকিয়ে দেখছিল। মনে মনে ভাবছিল কী আছে ওই ত্রিশোত্তীর্ণা মহিলাটির, যা নেই ওর নিজের– এই একুশ বছরের দৃপ্তযৌবনার? কেন ভৈরব দাশ ঐ যৌবন-উত্তীর্ণার পিছন পিছন হ্যাংলার মতো ল্যাং-ল্যাং করে ঘুরে মরছে, অথচ সুপর্ণাকে একটা ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করতেও দিতে চায় না?
বাড়ির পোর্টিকোয় দাঁড়িয়ে কাকলি তার ভ্যানিটিব্যাগ খুলে ল্যাচ-কীটা বার করল। সদর-দরজায় ইয়েল-লক। একটা চাবি থাকে কাকলির কাছে। একতলায় শুধু ওর বেডরুমটাই তালাবন্ধ আছে– বাকি ঘর দুটি জয়া ভোগ করছে। অবশ্য জয়া বর্তমানে নিচে নামতে পারে না। আছে দ্বিতলের বড় ঘরটায় – এককালে যেটা ছিল হরগোপালের মাস্টারস-রুম।
দরজা খুলে একতলার ড্রইংরুমে ঢুকেই নজর হল একটা সোফায় আধশোয়া যাদুগোপাল স্টেটসম্যান পড়ছে। তার বাঁ-হাতে একটা সবুজ-মলাটওয়ালা ছোট্ট পকেট-বুক। ওর বাঁ-কানের উপর একটা লাল-নীল পেনসিল। দরজায় শব্দ হতেই সে চোখ তুলে তাকালো। মুহূর্তমধ্যে বিরক্তির অভিব্যক্তির উপরে স্মিতহাস্যের অভ্যর্থনার একটা ব্যঞ্জনা ফুটে উঠল। কানের পাশ থেকে পেনসিল এবং বাঁ হাতের পকেটবইটা তাড়াতাড়ি পাঞ্জাবির পাশ পকেটে ঢুকিয়ে বললে, কাকলি যে! আজ এত সকাল সকাল?
কাকলি সপ্তাহে দু-তিনদিন আসে। সচরাচর দোকান বন্ধ করে। সে বললে, দিদি কি ঘুমুচ্ছে?
– না, বই পড়ছে।
– ঠিক আছে, তাহলে উপরেই যাই। তুমি বেরুচ্ছ না তো?
– না। হঠাৎ ও কথা জিজ্ঞেসা করলে কেন?
– পাঞ্জাবি পরে বসে আছো তো! যা হোক, নেমে এসে তোমার সঙ্গেও দু-একটা কথা বলব, তাই জানতে চাইছি।
– না। আমি বাড়িতেই আছি।
কাকলি কোনাকুনি ঘরটা পার হয়ে দ্বিতলে যাবার সিঁড়ির মুখটায় থমকে দাঁড়াল। হঠাৎ ঘুরে বললে, একটা কথা বলি যাদু, কিছু মনে কর না। রেস-খেলা বেআইনি নয়। নিজের টাকায় যে কেউ রেস খেলতে পারে। লোকজনকে দখলে রেসের-বই ওভাবে লুকিয়ে ফেলার কোনো প্রয়োজন নেই। ওটা বিশ্রী লাগে।
যাদুগোপাল কথাটা অন্যদিকে মোড় ঘোরাতে চাইল, কতবার বলেছি কাকলি, এখন আমাকে নাম ধরে ডাকলে ভাল দেখায় না। হাজার হোক, আমি তোমার বড় ভগ্নীপতি।
কাকলি হেসে বলল, সে তো নিতান্ত ঘটনাচক্রে। হাজার হোক, দিদি তোমার চেয়ে বয়সে বড় আমি রাজি হলে ওকেই তো “দিদি” বলে ডাকতে হত তোমাকে। তাই না?
– কিন্তু তুমি তো রাজি হওনি।
কাকলি জবাব দিল না। উঠে গেল দ্বিতলে। তখনো দিনের আলো ম্লান হয়ে আসেনি, তবু জয়া বেড ল্যাম্পটা জ্বেলেছে। কাকলিকে দেখে ওর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বইটা নামিয়ে রেখে বললে, আজ এত সকাল-সকাল?
– ‘সকাল-সকাল’ নয়, এটাকে বলে ‘বিকেল-বিকেল’! দোকানে খদ্দের নেই। তাছাড়া তোকে দেখবার জন্য হঠাৎ মন কেমন করল। ওটা কী বই?
– বাদ দে। কিছু খাবি? নেতাই আছে?
জয়ার টুলের উপরেই ছিল একটা কল-বেল। জয়া সেদিকে হাত বাড়াতেই কাকলি বাধা দিল। বললে, এখন নয় রে, দিদি। ওষুধপত্র ঠিকঠাক খাচ্ছিস তো?
– আমি কি খাচ্ছি? যাদু খাওসাচ্ছে। এক্কেবারে ঘড়ি ধরে। বেচারি ভারি আটকা পড়েছে। বাড়ি থেকে বেরুতেই পারে না।
– কেন, নেতাই তো আছে। শিবুর মাও আছে।
– তা আছে, তবু যাদু যেভাবে আমার সেবা করে–
কাকলি উঠে দাঁড়ায়। বলে, পরে আবার আসব। একটা কথা আছে যাদুর সঙ্গে। সেটা সেরে আসি–
জয়া হাত বাড়িয়ে কাকলির মণিবন্ধটা চেপে ধরে, জরুরি কথা? কী কথা?
– ডাক্তারবাবু কী বলেন শুনতে পাস না? এখন তুই এসব কথা একদম ভাববি না।
– ভাবি কি আর সাধে? তোরা দু’জনে যে দু-মুখো হাঁটছিস!
– মানে?
– আমি কি বুঝি না, কলি? তোরা দু’জনেই দু’জনকে দেখতে পারিস না!
– এসব চিন্তা এদম করবি না কিন্তু। তাহলে আমি এবাড়ি আসা বন্ধ করে দেব।
– ঠিক আছে, ঠিক আছে। যা–
কাকলি নিচে নেমে এল। যাদুগোপাল তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে রেসের বইখানা বার করেনি। পেনসিলটাও পকেটস্থ। কাকলিকে দেখেই বললে, চা খাবে তো? নেতাই মাদার-ডেয়ারি থেকে দুধ আনতে গেছে। আমিই চাটা বানাই। কী বল?
– না থাক। শোন যাদুগোপাল, একটা বিশেষ প্রয়োজনে-আমি মনে করি-আমাদের তিনজনের কিছু খোলাখুলি কথাবার্তা হওয়া দরকার।
– সেটা অসম্ভব, কলি। জয়াকে এখন বিজনেস-সংক্রান্ত কোনো কথা বলা যাবে না। ডাক্তারের বারণ। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনটা কী?
– আজ ভৈরব দাশ এসেছিল দোকানে।
– ভৈরব দাশ? সেই ফ্লপ-স্পেশালিস্ট প্রোডিউসার? কী চায় সে?
– আমাদের দোকানের অন্তত ফিফটি-ওয়ান পার্সেন্ট শেয়ার।
– বটে! তাকে বলতে পারলে না যে, দ্বিতীয়বার দোকানে ঢুকলে তাকে ‘ট্রেসপাসার’ হিসাবে ধরিয়ে দেওয়া হবে?
– না যাদুগোপাল। তা আমি বলতে পারিনি। তার হেতু, ভৈরব দাশ আমাদের কোম্পানির একজন মেজর শেয়ার-হোল্ডার। দশ পার্সেন্ট!
– শেয়ার-হোল্ডার মানে? টেন পার্সেন্ট? ভৈরব দাশ কোন সূত্রে–
– স্বর্ণদি! ভৈরব তার কাছ থেকে সব শেয়ার কিনে নিয়েছে। আমাদেরই ভুল। আমাদের উচিত ছিল স্বর্ণদি যখন চাকরি ছেড়ে চলে গেল তখন শেয়ারগুলো কিনে নেওয়া – স্বনামে-বেনামে যাই হোক। এটা আমাদের ত্রুটি।
কাকলির মনে হল একথা শুনে স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেলল যাদুগোপাল। বললে, তাই বল। কিন্তু সে তো মাত্র দশ শতাংশ….
– না, যাদু, ভৈরব অত সহজে থামবে না। সে এখন আইনত ডিরেক্টরস বোর্ডের মেম্বার।
– তা সে নয়, যতক্ষণ না শেয়ারগুলো ওর নামে এন্ডোর্স হচ্ছে।
– হতে পারে। আমি ঠিক জানি না, আইন কী বলে। তাই কাল বিকালে আইনের পরামর্শ নিতে একজনের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছি।
– ভাল কথা। কে তিনি?
– পি. কে. বাসু, বার-অ্যাট-ল।
– তিনি নিলেন তোমার কেস? তাঁর সঙ্গে কথা বলেছ?
– না। তাঁর সেক্রেটারির সঙ্গে বলেছি।
– তাই বল। এসব ‘পেটি-কেস’ উনি ছোঁন না। আমি বরং তোমাকে দু-একজনের নাম বলছি, লিখে নাওযাব
– এখনই নয়। আগে বাসু-সাহেব প্রত্যাখ্যান করুন আমাকে। প্রত্যাখ্যান করলেও অন্তত কার কাছে সে পরামর্শটা তিনি আশা করি দেবেন।
– তুমি ঘুরিয়ে কি এ-কথাই বলতে চাইছ কাকলি যে, তোমার নিকট-আত্মীয়ের পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করে ওই অচেনা ব্যারিস্টার-সাহেবের পরামর্শ মতোই তুমি চলতে চাও?
– না যাদু, আমি না-ঘুরিয়ে সোজাসুজি এ কথাটাই তোমকে বলতে চাই যে, তুমি পাঁচ-সাত বছর ধরে আইন পড়ছ বটে – এখনো পাশ করনি– আর তিনি কলকাতা বারের–
– অল রাইট, অল রাইট। আর কিছু বলবে?
– আমার মনে হল আমাদের দুই বোনের সব শেয়ার সার্টিফিকেট নিয়ে তাঁকে দেখানো দরকার। উনি হয়তো সেগুলো দেখতে চাইবেন। অরিজিনাল শেয়ার সার্টিফিকেটস্।
যাদুগোপাল মাথা নেড়ে বলল, না, কলি। তা তিনি চাইবেন না, অ্যাজুমিং তিনি তোমার কেসটা নেবেন।
– ঠিক আছে, দেখতে না চাইলে আবার ফেরত নিয়ে আসব। দিদির শেয়ারের কাগজগুলো একটু বার করে দেবে?
যাদুগোপাল রীতিমতো বিরক্ত হল। বলল, কেন এমন অবুঝের মতো আমাকে বিরক্ত করছ, কাকলি। বলছি, সেগুলি উনি দেখতে চাইবেন না। তাছাড়া শেয়ারের কাগজগুলো বাড়িতে নেই। ব্যাঙ্ক-ভল্টে রাখা আছে।
– ব্যাঙ্ক ভল্ট? যেটা দিদি আর আমি জয়েন্টলি খুলেছিলাম?
– না। এটা নতুন একটা ভল্ট। আমরা দু’জন খুলেছি। বিয়ের পর।
– ও! তা তুমি কাল সকালে একবার কষ্ট করে ব্যাঙ্ক-ভল্ট থেকে শেয়ারগুলো নিয়ে আসবে? আমি বিকাল তিনটে নাগাদ তা পিক-আপ করে নেব?
হঠাৎ যেন ক্ষেপে গেল যাদুগোপাল। কার্য-কারণসূত্র ঠিক বোঝা গেল না। তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল। ঘরময় পায়চারি শুরু করল। বললে, প্লীজ, স্টপ ন্যাগিং, কাকলি। ব্যারিস্টার-সাহেব যদি অরিজিনাল শেয়ারের কাগজ দেখতে চান চাহলে তোমার দিদির শেয়ারগুলো আমি দেখিয়ে আনব। পরের সপ্তাহে। আর য়্যু স্যাটিসফায়েড?
কাকলি নির্বাক তাকিয়ে থাকে। যাদুগোপাল বোধকরি বুঝতে পারে যে, সে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। তাই ওর মুখোমুখি বসে বলে, কিছু মনে কর না, কাকলি। আমি নিজেই পড়েছি একটা বিপদে। তাই আমার মাথার ঠিক নেই। রূঢ় কথা যদি কিছু বলে থাকি–
বাধা দিয়ে কাকলি বললে, কী বিপদ তোমার?
– আরে সে এক মাতালের কাণ্ড। তোমাকে বলিনি। তোমার পেটে তো কথা থাকে না-দিদিকে বলে বসবে। আর তাহলেই সে worry করতে শুরু করবে। ইয়ে হয়েছে….তোমার দিদির ফিয়াট গাড়িখানায় এক মাতাল ড্রাইভার এসে মেরেছে ধাক্কা। ক্ষতি বেশি হয়নি। সামনের হেডলাইট ভেঙেছে শুধু। ডান দিকের মাড-গার্ড আর রিয়ার-ভিযু আয়নাটাও চুরমার হয়ে গেছে।
– কদিন আগে?
– লাস্ট উইকে। ইন ফ্যাক্ট, গত সোমবার।
– তুমি চালাচ্ছিলে?
– আরে না। গাড়িটা বিজলী সিনেমার সামনে পার্ক করা ছিল। জাস্ট সিটিং-ডাক। লোকটা পাঁড় মাতাল। কোথা থেকে এসে মেরেছে পিছন থেকে ধাক্কা।
কাকলি অবাক হয়ে বললে, পিছন থেকে ধাক্কা মারল আর তোমার সামনের হেডলাইট গেল ভেঙে। মানে?
– আরে বাবা, পিছন থেকে ধাক্কা লাগলে গাড়ি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে না? একটা ইলেকট্রিক পোস্টে ধাক্কা লেগে….
– আই সী। সে গাড়ির নম্বরটা নিয়েছ?
– কোত্থেকে নেব? বলছি না, আমি সেখানে ছিলামই না। একটা দোকানে ঢুকেছিলাম। ফিরে এসে দেখি এই কাণ্ড। প্রত্যক্ষদর্শী যারা ছিল তারা এতই গাঁইয়া যে, ও গাড়িটা হাওয়া হয়ে যাবার আগে তার নম্বরটা টুকে রাখেনি।
– আই সী। তোমাদের গাড়িটা কোথায়?
– সারিয়ে নিয়েছি। গ্যারেজেই আছে।
কাকলি উঠে দাঁড়াল। বলল, ঠিক আছে। গাড়ি তো সারিয়েই নিয়েছ। তাহলে কাল সকালে ব্যাঙ্কে গিয়ে–
– কী আশ্চর্য! এককথা কতবার বলবে কাকলি? কাল সকালে আমার অন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। ওই অ্যাকসিডেন্টের খেসারত আদায় করা।
– ও! তাহলে তো কথাই নেই। কিন্তু একটা কথা আমাকে সত্যি করে বলবে যাদুগোপাল?
যাদুগোপাল উঠে দাঁড়ায়। বলে, কী?
– দিদির শেয়ারগুলো সত্যি সত্যি ব্যাঙ্ক-ভল্টেই আছে তো?
হঠাৎ ধৈর্যচ্যুত হয়ে গেল যাদুগোপাল। বললে, তুমি আমাকে একটা কথা সত্যি করে বলবে কাকলি? কেন আসো রোজ দিদির কাছে? তার মনটাকে এখন আমার বিরুদ্ধে বিষিয়ে দিয়ে তোমার কিছু লাভ আছে? যা হবার তা তো হয়েই গেছে।
কাকলি চাপা গর্জন করে ওঠে, আস্তে, আস্তে, চ্যাংড়া মস্তানের মতো গলাবাজি কর না। তুমি কী চাও? দিদি বুঝে ফেলুক আমরা দুজন ঝগড়া করছি?
দু’হাতে মুখ ঢেকে যাদুগোপাল বসে পড়ে। দাঁতে দাঁত দিয়ে বলে, ঝগড়া যদি সত্যিই না করতে চাও তাহলে প্লীজ বাড়ি চলে যাও। তুমিও হাঁফ ফেলে বাঁচো, আমিও বাঁচি।
কাকলি সোজা চলে গেল একটা পাবলিক টেলিফোন বুথ-এ। এখনো পাঁচটা বাজেনি। অফিসগুলো বন্ধ হয়নি। সে প্রথম টেলিফোন করল ন্যাশনাল ইনশিওরেন্স কোম্পানির ক্লেম সেকশানে। সেখানে জানা গেল ওর ফিয়াট গাড়ির কোনও ক্রেম পেন্ডিং নেই। অর্থাৎ অ্যাকসিডেন্ট যদি আদৌ হয়ে থাকে তবে যাদুগোপাল সেজন্য কোনও দাবী পেশ করেনি। কেন? দুটো সম্ভাবনা। হয়, দুর্ঘটনা আদৌ হয়নি, অথবা দুর্ঘটনার অন্তরালে এমন কিছু আছে যা যাদুগোপাল গোপন করতে চায়। দ্বিতীয় ফোনটা করল ভবানীপুর থানায়, ইন্সপেক্টর শ্যামল মণ্ডলকে। ভাগ্যক্রমে সে সীটে ছিল। শ্যামল একজন অ্যামেচার ফোটোগ্রাফার, কাকলির গুণগ্রাহী; আর তার দোকানের বাঁধা খদ্দের। শ্যামল মাধ্যমে জানা গেল গত সপ্তাহে থানার পাশে– ঠিক বিজলী সিনেমা হলের সামনে– একটা অ্যাম্বাসাডার গাড়ির সঙ্গে একটা ফিয়াট গাড়ির ধাক্কা লাগে। দোষ সম্পূর্ণ ফিয়াট গাড়ি-চালকের। ক্ষতি বেশি হয়েছে অ্যাম্বাসাডারের সে গাড়ির চালককে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। সে গাড়ি চালাচ্ছিলেন গাড়ির মালিক সুরেশ কাপাডিয়া। তাঁর গাড়ির ও টেলিফোন নম্বর শ্যামল দিতে পারল।
অতঃপর কাকলি ফোন করল কাপাডিয়া সাহেবকে। দেখা গেল কাপাডিয়া সাহেব সাবধানী। প্রথমেই জানতে চাইলেন, জী হাঁ, অ্যাকসিডেন্ট তো হুয়া হ্যায়, লেকিন আপ কৌন?
কাকলি জানালো যে, সে ন্যাশনাল ইন্সশিওরেন্স কর্মী। ঐ ফিয়াট গাড়ির মালিক খেশারত দাবি করেছেন, তাই ও প্রকৃত তথ্য জানতে চাইছে।
– তব আপ ভবানীপুর থানামে যাইয়ে। ওইখানে সব পাত্তা মিলে যাবে।
– সেখানে গিয়েই তো আপনার নাম, টেলিফোন নম্বর প্রেয়েছি। আপনি যদি কাইন্ডলি ঘটনাটা করোবরেট করেন– মানে, ঠিক কী হয়েছিল? কিভাবে দুর্ঘটনা হল?
– আরে ম্যাডাম, হামি বিজলী পিকচার-হৌসে টিকিট খরিদ করে হমার গাড়িতে বসেছে। গাড়ি স্টার্ট ভি দি নাই। অচানাক বহ্ মাতোয়ারা আসে হমার বনেটে মারল ধক্কা! দ্রাম! ব্যাস। হামি বিলকুল লেংড়া।
– হ্যাঁ শুনেছি, আপনাকে হাসপাতালে য়েতে হয়েছিল। এখন ভাল আছেন তো?
– হাসপাতাল নেহি, ম্যাডাম, নার্সিংহোম। অখন কুছ ভালো আছি।
– ওই ফিয়াট গাড়ির কারও চোট লাগেনি?
– জীনা। না যাদুগোপাল, না উনার মিসেস।
– মিসেস? যাদুগোপালের স্ত্রীও ছিলেন গাড়িতে?
– ম্যাডাম! হামি ওঁদের ম্যারেজ সার্টিফিকেট দেখিনি। তবে সামনের সীটে ওঁর পাশে যেভাবে বসেছিলেন-ওয়েল, গার্ল ফ্রেন্ড ভি হোতে পারেন। উইটনেস হিসাবে পুলিশ তাঁর নাম পতা লিখে নিয়েছিল-হমার ভি য়্যাদ আছে; নবনীতা রায়, ‘সোনালি স্বপন’, সাত-বি চৌরঙ্গী টেরেস।
– একটা কথা, যাদুগোপালবাবু কি মাতোয়ারা অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন?
– সচ্ বাত শুনার হিঞ্ছা আছে?
– জী হাঁ, নিশ্চয়। বলুন?
– তব কাল উলটি-টাইমমে ফোন কিজিয়ে।
– কেন? কাল সন্ধ্যায় কেন? আজ বলতে পারেন না?
– জী না যাদুগোপাল কাল সুবে হামার ডেরায় আসবে। ক্যাস-ডাউন কম্পেনসেশন! হামার ডিমান্ড মোতাবেক সেটলমেন্ট হৈয়ে গেলে যাদুগোপাল ড্রাঙ্কার্ড ছিল না। না হৈলে সে আলবাৎ মাতোয়ারা ছিল। সমঝলেন?
ধন্যবাদ জানিয়ে লাইনটা কেটে দিল কাকলি।
ধীরে ধীরে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে। কেন ইন্সিওরেন্স কোম্পানি কিছু খবর রাখে না, কেন যাদুগোপাল দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে একগাদা মিছে কথা বলেছিল। কিন্তু একটা কথা, দিদির শেয়ারের ওরিজিনাল সার্টিফিকেটগুলো ব্যাঙ্ক-ভল্টেই আছে তো?
