রিস্তেদারের কাঁটা – ৭

সাত

পরদিন সকালে এগারোটা নাগাদ বাসু-সাহেব টেলিফোন পেলেন। সলিল দত্ত, দত্ত অ্যাণ্ড সলিসিটর্স ফার্মের সিনিয়র পার্টনার।

– হ্যালো মিস্টার দত্ত, বলুন, কী খবর?

– কী খবর সেটা তো আপনি ভালো ভাবেই জানেন মিস্টার বাসু। রাকেশ জৈন আমার ক্লায়েন্টের নামে পঞ্চাশ হাজার টাকা জমা দিল…

– এক্সকিউজ মি! আপনার ক্লায়েন্টের অ্যাকাউন্টে? ঠিক জানেন?

– কেন আপনি জানেন না, চৌবে ঐ অ্যাকাউন্টের কনজারভেটর!

– তাহলেও আইনত অ্যাকাউন্টটা চৌবের হয় না। যা হোক, তারপর?

– তারপর আপনি আদালতের আদেশ অগ্রাহ্য করে টাকাটা তুলে নিলেন।

– আদালতের কোন আদেশ?

– য়ু নো বেটার! মিস্টার বাসু, এটা আমি ভালো চোখে দেখছি না!

– নাকি? আমি মর্মাহত! তা হলে তো কোর্টে ব্যাপারটা মুভ করা দরকার!

– তা তো করবই। আপনাকে টেলিফোনে শুধু বলতে চাই – এটাকে বলে ‘শার্প প্র্যাকটিস’ – আপনার তরফে!

– ভুল বললেন মিস্টার দত্ত! এটাকে বলে ‘ডাল প্র্যাকটিস’, আপনার তরফে!

– দেখা যাক, আদালত কী বলেন!

– কারেক্ট! দেখা যাক, আদালত কী বলেন!

কৌশিক সরেজমিনে তদন্ত করতে ধানবাদ রওনা হয়ে গেছে। শুক্রবার সকালের মধ্যে তাকে তদন্ত-রিপোর্ট দাখিল করতে হবে। চৌবে এবং ঠাকুরের কেস কী জাতের। পাড়ায়, কর্মস্থানে, ট্রেড-ইউনিয়ন পার্টিতে তাদের কী সুনাম বা দুর্নাম। সুজাতাও বসে নেই। বাসু-সাহেবের ফরমাশ মতো কলকাতার এখানে-ওখানে দৌড়াদৌড়ি করছে। ব্যাঙ্ক থেকে টাকাটা পেয়ে বাসু-সাহেব গিয়েছিলেন যদু কলোনিতে। গীতা ফ্ল্যাটে ছিল না– অফিস গেছে। কিন্তু স্মরণিকা ছিল। ব্যাঙ্ক ড্রাফট দেখে সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। বললে, কোথা থেকে কী করলেন মেসো? বাসু ওকে বুঝিয়ে দিলেন, এ টাকা সেই চেক ভাঙানোর। নয়খানা পাঁচ-হাজার টাকার ব্যাঙ্ক ড্রাফ্ট ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এটা দুর্দিনের জন্য। আর এইনগদ পাঁচ হাজার দিয়ে লড়াই কর।

– আপনার ফী?

– দূর পাগলি! কেসটা মিটুক। ফী তো নেব তোমার জেঠুর কাছে! আর একটা কথা। তোমাকে বলেছিলাম যে, ডক্টর দাশগুপ্ত যখন মিস্টার সেনকে দেখতে যাবেন তখন আমি তোমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাব। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। ডক্টর দাশগুপ্ত একান্তে রোগীকে পরীক্ষা করতে চান।…

– তাহলে ভিজিটিং আওয়ার্সে গিয়ে আমি একাই জেঠুর সঙ্গে দেখা করি?

– সেটা পণ্ডশ্রম। ওরা তোমাকে ঢুকতেই দেবে না। শুনলে না, কাল সেই রিসেপশনিস্ট ভদ্রমহিলা বললেন, ডক্টর রথ ওঁর ঘরে বোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে– ‘নট টু বি ডিস্টার্বড।’…আমার কি মনে হয় জানো টুকু? ঐখানে যে কয়জন বন্দী আটক পড়ে আছেন তাঁরা সবাই ধনী, কেউ পাগল নয়, নিজ নিজ রিস্তেদারের কাঁটায় গাঁথা, জিওনো কইমাছ! তোমার জেঠুর কথাই ধর– পাঁচ-সাত-দশ লাখ টাকার মালিক। এই গরমে পড়ে আছেন ফ্যানহীন টিনের চালা-ঘরে, ঝাঁপের জানলা, বৃষ্টিতে হয়তো ঘরে জল ঢোকে। সাপখোপ যে ঢোকে না এই যথেষ্ট।

স্মরণিকা কোন জবাব দিল না।

– শুক্রবার বেলা দুটোয় আমাদের কেসটা উঠবে। পৌনে দুটোর মধ্যে তোমাকে আদালতে উপস্থিত হতে হবে। তোমাকে কি পিক-আপ করার ব্যবস্থা করব, নাকি তুমি নিজেই চলে যাবে।

– আমি নিজেই চলে যাব। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। এখন তো টাকার অভাব নেই।

বিকাল চারটের সময় বেজে উঠল টেলিফোনটা। বাসু-সাহেব দুপুরে ঘুমান না, তবে মিনিট-কুড়ি চোখ বুজে বিশ্রাম করেন শবাসনে। তারপর বই পড়েন। সাড়ে চারটেয় বিশে চা নিয়ে আসে। চায়ের প্রতীক্ষাতেই ছিলেন। হঠাৎ বৈঠকখানায় টেলিফোনের কর্কশ কণ্ঠ।

শয়নকক্ষে টেলিফোনের একটা এক্সটেনশন আছে। রানী হাত বাড়িয়ে রিসিভারটা তুলে নিয়ে শুনলেন। কথা-মুখে হাত চাপা দিয়ে কর্তার দিকে ফিরে বললেন, ডক্টর কৈলাশনাথ। তোমাকে খুঁজছেন। কিন্তু কণ্ঠস্বর – যদি আমার অনুমান সত্য হয় – প্রমাণ দেয়, তিনি অত্যন্ত উত্তেজিত – ধর।

বাসু-সাহেব বিছানাটা পাক দিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলেন, বাড়িসুদ্ধ সবাই ‘টিকটিকি’ হলে আমরা কোথায় যাই?

– হ্যালো ডক্টর? দিস্ ইজ বাসু।

– মিস্টার বাসু, আমি বড়িশা-বেহালার সেই ‘স্বর্গধাম’না ‘শান্তিনীড়’ থেকে কথা বলছি। নিজের নার্সকে নিয়ে কথামতো ঠিক চারটেয় পৌঁছেছি। মিস্টার সত্যানন্দ সেনকে পরীক্ষা করতে…

– কেমন দেখলেন?

– কই আর দেখলাম? সতেরো নম্বরের কেবিনে কেউ নেই!

– মানে? ওরা কি তাঁকে অন্য কোথাও শিফ্ট করেছে?

– স্বীকার করছে না। বলছে রোগী ‘পালিয়ে গেছে’। বুঝুন কাণ্ড! চারদিকে মানুষভর পাঁচিল, তার উপর কাঁটা-তারের বেড়া, গেটে দারোয়ান। বন্দীর বয়স পঁচাত্তর, সে নাকি সর্বদা রেস্টলেস, তাই তার হেভি সিডেশন দরকার– তবু সে পালিয়ে গেছে! রূপকথার গপ্পোটা হজম করতে পারছেন?

পাশ থেকে মিনমিনে গলায় কে যেন কী বলল, ঠিক বোঝা গেল না। টেলিফোনে ভেসে এল ডক্টর দাশগুপ্তের হুষ্কার: শাট আপ! আপনারা যা বলার পুলিসকে বলবেন…লুক হিয়ার মিস্টার বাসু..আপনি কি একবার এখানে আসতে পারবেন? পুলিস আসার আগে? সবকিছু ট্যাম্পার হবার আগে?

– কিন্তু ওঁরা কি আমাকে ঢুকতে দেবেন? ‘নট টু বি ডিসটার্বড’ বোর্ড টাঙানো আছে শুনলাম, সতের নম্বরের কেবিনে?

– ওরা বাধা দেবার কে? আমি কোর্ট-অর্ডারে এখানে এসেছি। আমার অর্ডারই কোর্ট-অর্ডার! আপনি এখনি চলে আসুন। সম্ভব হলে আপনার সেই দূত-দতিকেও পাঠিয়ে দিন। ‘সুকৌশলী’ না কি-যেন নাম? তারা এসে তদন্ত শুরু করে দিক। আপনি কতক্ষণের মধ্যে এসে পৌঁছতে পারবেন?

– বিশ মিনিট।

এবার আপ্যায়ন অন্যরকম। গাড়িটা গেটের সামনে দাঁড়াতেই দারোয়ান উঠে স্যালুট করল। খাতাখানা বাড়িয়ে ধরল না আদপেই। অন্যমনস্কের মতো এগিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ দারোয়ানটি হিন্দুস্থানীতে জানতে চায়, আপনার গাড়িতে মাইজী আসেননি?

– কোন মাইজি?

– বহ্ নার্স মাইজি।

বাসু-সাহেব বুঝতে পারেন দারোয়ান ভুল করছে। প্রথমদিন তিনি যখন স্মরণিকাকে নিয়ে এখানে এসেছিলেন তখন ঐ অশিক্ষিত দারোয়ানটা ধরে নিয়েছিল তিনি একজন ‘ডাগডরবাবু’ এবং তাঁর সঙ্গিনী একটি নার্স। তিনি সংক্ষেপে বললেন, না, তিনি আমার সঙ্গে আসেননি।

গাড়ির শব্দে অফিস-ঘর থেকে বার হয়ে এল একটি মেয়ে। অল্পবয়সী। সেদিনের সেই চোখে-মুখে-কথা মাঝ-বয়সী মহিলাটি নন। এর নার্সের পোশাক। এগিয়ে এসে নমস্কার করে বললে, আসুন, আসুন, স্যার, ডাক্তারবাবুরা সতের নম্বর কেবিনে অপেক্ষা করছেন।

বাসু বলেন, আপনাদের সেই মধ্যবয়সী রিসেপশনিস্ট মহিলাটি কই?

– উনি রিসেপশনিস্ট নন স্যার, স্বয়ং মালকিন, মিসেস রথ।

– আই সী! তা তিনি কোথায়?

– ট্রাঙ্ককলে কী-যেন দুঃসংবাদ পেয়ে তিনি কটকে না ভুবনেশ্বরে চলে গেছেন।

– বুঝেছি। যাতে তাঁকে সমন ধরানো না যায়।

– আজ্ঞে?

– আজ্ঞে! চল, সতের নম্বরটা কোনদিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চল।

ঘরের কাছাকাছি এসে দেখা গেল সতের নম্বর কেবিনের দরজা খোলা। ভিতর থেকে দু-জাতের ধ্বনি-গুচ্ছ নির্গত হচ্ছে-একটি তারায়, একটি উদারায়। একটা ভারী, দরাজ, ধমকের গাম্ভীর্যে ভরপুর, অপরটি মিনমিনে কৈফিয়তের সুর। বাসু-সাহেবকে দেখতে পেয়ে ওঁরা ঘর ছেড়ে বারান্দায় বার হয়ে এলেন। ডক্টর দাশগুপ্তের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। দাড়ি, গোঁফ কামানো। পরিধানে সুট। ছয় ফুটের কাছাকাছি লম্বা, মেরুদণ্ড বিলকুল সোজা। দ্বিতীয়জন– নিশ্চয় ডক্টর রথ– বেঁটে-খাটো স্থূলাঙ্গ। কণ্ঠস্বর মেয়েলী। তবে জব্বর একটা গোঁফ আছে, বোধ করি পৌরুষের ব্যঞ্জনা দিতে। একটি নার্স। বোধহয় কৈলাশনাথের সঙ্গে এসেছেন।

কৈলাশনাথ বাসুকে ডেকে বললেন, আসুন পরিচয় করিয়ে দিই। ইনিই মিস্টার নিত্যানন্দ রথ…– ডক্টর রথ, প্লীজ!

– ও ইয়েস, ‘ডক্টর’ রথ! কটকে বাড়ি।ডাক্তারীটা কোথা থেকে পাশ করেছেন আমার জানা হয়নি, তবে ‘ডক্টর’ সম্বোধনটাই উনি পছন্দ করেন!

নিত্যানন্দ বাসু-সাহেবের দিকে ফিরে বললে, গুড-আফটারনুন, স্যার! এই মেন্টাল-হোমটা পরিচালনার দায়িত্ব আমার। আমার নামেই লাইসেন্স…

কৈলাশনাথ বাধা দিয়ে বললেন, কারেক্ট! তবে সেটা আর কতদিন বহাল থাকবে প্রভু জগন্নাথ জানেন! যাক সে কথা…আমি জানতে চেয়েছি এ কয়দিন মিস্টার সত্যানন্দ সেনকে কী খাওয়ানো হয়েছে, ঔষধ এবং পথ্য, তা ওঁরা কিছুই বলতে পারছেন না। কোন রেকর্ডই নেই…

– এটা রেগুলার হাসপাতাল নয়, স্যার! রেস্ট-হোম মাত্র মিনমিনের কৈফিয়ৎ।

– তাই বলে কোন রোগীর কী চিকিৎসা হচ্ছে তার রেকর্ড থাকবে না?

– সাধারণত আবাসিকদের নিজস্ব ডাক্তারেরা আসেন।তাঁরা যা ঔষধ ও পথ্য প্রেসক্রাইব করেন, তাই আমরা সার্ভ করি–

– অল রাইট! এই সতের নম্বরের আবাসিককে কোন ডাক্তার ঔষধ ও পথ্য প্রেসক্রাইব করেছেন? তাঁর নাম-ঠিকানা কী?

– আয়াম সরি, স্যার। তিনি আউট-সাইডার। তা আমরা জানি না। ওঁর আত্মীয়, যিনি ভর্তি করে দিয়ে যান, তিনিই সে-সব জানেন।

– অল-রাইট! সেই ঔষধ ও পথ্য যিনি সার্ভ করেছেন তিনি তো আর আউট-সাইডার নন, তাঁর নাম কী? তাঁকে ডাকুন!

– আয়াম সরি এগেন! এই সতের নম্বরের আবাসিককে সার্ভ করতেন আমার ওয়াইফ নিজেই। ঔষধ ও পথ্য। পরশু রাত্রে কটক থেকে একটি জরুরী ট্রাঙ্ক-কল পেয়ে তিনি সেখানে চলে গেছেন। তাই বিস্তারিত জানাতে পারছি না।

বাসু এই চাপান-উতোরে কান খাড়া রেখে ঘরটার ভিতরে ঢুকে খুঁটিয়ে দেখছিলেন চারিধার। ঘরের মাপ প্রায় চার মিটার বাই তিন-মিটার। পাকা মেঝে, দেওয়ালে আস্তর নেই। মুলি-ঝাঁপের জানলা, টিনের চাল, সিলিং নেই। ঘরের মাঝখানে একটা স্টিলের হসপিটাল-বেড। তার উপর গদি নেই, তোষক পাতা। চাদরটা বেশ ময়লা। স্টিলের ফোল্ডিং টেবিল, খান দুই ফোল্ডিং চেয়ার। সংলগ্ন বাথরুমে কল আছে, শাওয়ার নেই। ইন্ডিয়ান-টাইপ প্যান-সাইফন আছে, ফ্লাশিং-সিসটার্ন নেই। টিনের একটা হলদে-হয়ে-যাওয়া বালতি, মগের বিকল্প একটি ডালডার টিন আর রঙ-চটা ওয়াশ-বেসিন, যার ডিসচার্জ পিটটা চোক হয়ে জলে ভর্তি, অকেজো। দেওয়ালে সাঁটা একটা মেডিসিন ক্যাবিনেট – কোনও ওষুধপত্র সেখানে নেই। একটা কাঠের আলনা, তাতে একটা নীল-সাদা ডোরাকাটা পায়জামা আর একই রঙের বুশ-কোট। আবাসিকদের চিহ্নিত পোশাক। অর্থাৎ সত্যানন্দের পরিত্যক্ত পোশাক।

তদন্ত করে ফিরে এসে বাসু-সাহেব বললেন, ঘরে বা বাথরুমে তো মিস্টার সেনের কোনও জিনিসপত্র দেখছি না? জামা-কাপড়-শেভিংসেট-স্লিপার-টুথ-ব্রাশ বা তোয়ালে?

ডক্টর রথ বলে ওঠেন, জিনিসপত্র উনি কিছুই নিয়ে আসেননি। প্র্যাকটিক্যালি খালিহাতেই এসেছিলেন…

– সে কি! এই ক’দিন তিনি দাঁত মাজেননি? জামা-কাপড় বদলাননি? তোয়ালে দিয়ে মুখ মোছেননি?

– না, না। আপনারা আমার কথা বুঝতে পারছেন না। আমি বলছি, প্রথমদিন যখন আসেন তখন খালিহাতে এসেছিলেন। পরে ওঁর ভাই মিস্টার চৌবে সুটকেসে করে সে-সব পৌঁছে দেন – পাজামা, গেঞ্জি, টুথব্রাশ, পেস্ট…

– শেভিং সেট?

– আজ্ঞে না। ওটা আমরা পেশেন্টের ঘরে রাখতে দিই না। রোজ সকালে নাপিতে এসে আবাসিকদের কামিয়ে দিয়ে যায়।

– বুঝলাম। তার মানে বৈমাত্রেয় ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম যেদিন বাড়ি ছেড়ে বের হন সেদিন তিনি স্বপ্নেও বুঝতে পারেননি যে, শান্তিনীড়ের কারাগারে বন্দী করে রাখবার জন্য ওরা তাঁকে নিয়ে আসছে!

নিত্যানন্দ বাধা দিয়ে বললেন, ‘বন্দী’ বা ‘কারাগার’ বলেছেন কেন? এটা তো একটা স্যানিটেরিয়াম। উনি তো এখানে দু-এক সপ্তাহের জন্য বিশ্রাম নিতে এসেছিলেন মাত্র।

– দু-এক সপ্তাহের জন্য কেউ যদি কোথাও বিশ্রাম নিতে যায় তবে ‘একেবারে খালিহাতে’ যায় না। একটা সুটকেস অন্তত তার সঙ্গে থাকে। তাতে তার দৈনিক প্রয়োজনের জিনিস গুছানো থাকে–

– কিন্তু উনি তো মানসিকভাবে সুস্থ-স্বাভাবিক ছিলেন না।

বাসু-সাহেব মাথা নেড়ে বললেন, হল না! এ কৈফিয়ৎ যথেষ্ট নয়। দৈহিক বা মানসিক অসুস্থ মানুষ যখন দুই-এক সপ্তাহের জন্য নার্সিংহোমে বা স্যানিটেরিয়ামে যায়, তখন তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ঝি-চাকর কেউ না কেউ একটা সুটকেস গুছিয়ে দেয়। রোগীকে অচৈতন্য অবস্থায় স্ট্রেচারে করে রিমুভ করা হলেও! এ ক্ষেত্রে তা হয়নি। তার একমাত্র অর্থ: বৃদ্ধকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে এখানে এনে বন্দী করা হয়েছিল।

নিত্যানন্দ রুখে ওঠে, ‘ভুলিয়ে’ এনেছিলেন কি ‘ভালিয়ে’ এনেছিলেন তা জানি না। তাঁর রিস্তেদারেরা সুটকেস গুছিয়ে না দিয়ে যদি অন্যায় করে থাকেন সেজন্য আমার প্রতিষ্ঠান দায়ী নয়!

বাসু-সাহেবের কী খেয়াল হল। চেয়ারখানা টেনে নিয়ে গেলেন বাথরুমে; মেডিসিন-ক্যাবিনেটের গায়ে লাগিয়ে চেয়ারে উঠে দাঁড়ালেন। গা-আলমারিটার মাথার উপর – যেখানে দৃষ্টি যায় না – অবলীলাক্রমে হাত চালিয়ে দিলেন।

ডক্টর দাশগুপ্ত বলেন, ও কী করছেন? ওখানে বিছে-ফিচে…

ততক্ষণে বাসু-সাহেব ঐ গর্ত থেকে বার করে এনেছেন চামড়ার একজোড়া স্ট্র্যাপ। নিত্যানন্দের নাকের ডগায় মেলে ধরে বলেন, এটা কী?

– চামড়ার স্ট্র্য্যাপ।

– সে তো দেখাই যাচ্ছে। ও দুটো ওখানে লুকানো ছিল কেন? কী হয় ও দিয়ে?

– লুকানো ছিল না, রাখা ছিল। পেসেন্টকে যখন কিছুতেই ম্যানেজ করা যায় না, তখন টেম্পরারিলি ঐ চামড়ার স্ট্র্যাপের সাহায্যে খাটের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়।

ডক্টর দাশগুপ্ত বলেন, ওয়ান্ডারফুল! কী ওষুধ দেওয়া হয়েছে জানেন না, কী ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে জানেন না, কী পথ্য দেওয়া হয়েছে জানেন না! আর পঁচাত্তর বছরের বুড়োটাকে কী দিয়ে বেঁধে রাখা হত তা ঠিক জানেন! কী, ‘ডক্টর’ রথ?

বাসু-সাহেব বলেন সত্যানন্দ সেনকে তাহলে ঐভাবে লোহার খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হত? দিবারাত্র?

– না, না, দিবারাত্র নিশ্চয় নয়। তাছাড়া মিস্টার সেনকে আদৌ কোনদিন বাঁধা হয়েছিল কিনা তা আমি জানি না। আমি বলতে চাইছি – কোনও পেশেন্ট আনম্যানেজেবল হলে এটার ব্যবহার করা হয়, এই আর কি! মিস্টার সেনকে যদি আদৌ ওটা দিয়ে কখনো বাঁধা হয়ে থাকে, তবে সেটা নিতান্ত সাময়িক ভাবে। আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন, ওটা খুলে রাখা হয়েছে!

– আজ্ঞে না! খুলে রাখা হয়নি। অত্যন্ত ধারালো কোন অস্ত্র দিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে। জাস্ট লুক অ্যাট ইট! –

নিত্যানন্দের নাকের ডগায় আবার সেই চামড়ার স্ট্র্যাপজোড়া মেলে ধরেন বাসু।

নিত্যানন্দ এবার সত্যই অবাক হল: মাই গড! এটা কী করে হল?

ডক্টর দাশগুপ্ত বলেন, দ্যাটস্ দ্য মিলিয়ন-ডলার কোশ্চেন!

বাসু বলেন, শুনুন মশাই। আপনাদের থিয়োরি-মোতাবেক তিনি যদি পালিয়ে গিয়ে থাকেন তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি দ্বিতীয় ব্যক্তির সাহায্য পেয়েছেন। নাহলে লোহার খাটের সঙ্গে চামড়ার স্ট্র্য্যাপ দিয়ে বাঁধা একটি পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধ কীভাবে বন্ধনমুক্ত হতে পারেন? ধারালো অস্ত্র দিয়ে যে বাঁধনটা কেটেছে সেই দ্বিতীয় ব্যক্তি আপনার প্রতিষ্ঠানের কেউ হতে পারে…

– পারে না! এখানে সবাই বিশ্বস্ত!

– অথবা বাইরের কেউ হতে পারে…

– পারে না! আমাদের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র!

– তবে কী করে তিনি অপসারিত হলেন?

– অপসারিত হননি। তিনি স্বেচ্ছায় গেছেন। তিনি যে খাটের সঙ্গে বাঁধা ছিলেন এটা প্রমাণিত হয়নি, আপনাদের অনুমান মাত্র।

কৈলাশনাথ বজ্রকণ্ঠে বলে ওঠেন, অল রাইট মিস্টার লাইসেন্স-হোল্ডার! আই উইল কোট য়ু ভার্বাটিম বিফোর দ্য জাজ! আপনি আগামীকাল সকালে ঐ আদালতে উপস্থিত থাকবেন। মিস্টার বাসু, আপনি সামন্স ধরিয়ে দেবেন, কাইন্ডলি!

রথ আঁৎকে ওঠে। বলে, আগামীকাল। অসম্ভব!

– লুক হিয়ার, ম্যান! আপনার স্বীকৃতি-মতে আপনি একটি পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধকে এই সতের নম্বর কেবিনে এক সপ্তাহ ধরে আটকে রেখেছিলেন – আপনার স্বীকৃতি-মতে তিনি নিজের দায়-দায়িত্ব নিজে নিতে অশক্ত, তাঁর চিন্তাশক্তির পারম্পর্য নেই; মানুষজন চিনতে পারেন না। তিনি রেস্টলেস, তাই তাঁকে ‘হেভি সিডেটিভ’ দিয়ে সব সময় ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হত। কেমন তো? ঐরকম একটি বৃদ্ধকে আপনারা লোহার খাটের সঙ্গে স্ট্র্যাপ দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন– যেহেতু আপনাদের মতে তিনি পাগল! তিনি হুডিনি, গণপতি বা পি. সি.সরকার নন! অথচ দেখা যাচ্ছে সেই তথাকথিত পাগল নিজের চেষ্টায় এবং উদ্ভাবনী শক্তিতে কারও সাহায্য ছাড়াই নিজের জামা-কাপড় সব গুছিয়ে নিয়েছেন। তারপর ঐ অবস্থা থেকে পালিয়ে গেছেন। এবং যদিচ তাঁর পকেটে একটি পয়সা নেই তবু তিনি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন। অলরাইট! এই গপ্পোটাই আপনি জজ-সাহেবকে শোনাবেন।…নাউ, পুলিশে খবরটা কে দিচ্ছে?

বাসু বলেন, আমি দেব। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।

থ্যাঙ্কস্! কোর্টে দেখা হবে। এস সরমা…

নিজের নার্সকে নিয়ে কৈলাশনাথ গেটের দিকে রওনা দিলেন। সেখানে তাঁর গাড়ি অপেক্ষা করছিল।

গাড়িটা ডায়মন্ড-হারবার রোডের দিকে রওনা হয়ে গেলে বাসু বলেন, এবার আপনার অফিস-ঘরে চলুন। পুলিশে খবরটা দিতে হবে।

নিত্যানন্দ সঙ্কুচিত হয়ে বললে, মিস্টার চৌবেকে না জানিয়ে পুলিশে খবর দেওয়াটা কি ঠিক হবে?

বাসু-সাহেব দাঁড়িয়ে পড়েন। বলেন, ক্লায়েন্ট-এর প্রতি আপনার নিষ্ঠা দেখে আমি অভিভূত, ডক্টর রথ! কিন্তু আপনি কি চান পুলিশ আপনার মাজায় দড়ি বেঁধে থানায় ধরে নিয়ে যাক?

– মাজায় দড়ি বেঁধে?

– এবং থানায় কোন লোহার খাটের সঙ্গে চামড়ার স্ট্র্য্যাপ দিয়ে বেঁধে রাখুক? ঠিক যেমন আপনি বেঁধে রেখেছিলেন সত্যানন্দকে?

এবার আর জবাব যোগায় না। রথ স্রেফ ঢোক গেলে।

– তাহলে আমার পিছন-পিছন অফিসে আসুন। মিসিং পার্সন্স স্কোয়াড-এ ফোন করুন। ভুলে যাবেন না, আপনিই লাইসেন্স-হোল্ডার, আপনার ক্লায়েন্ট নয়।

অফিসে এসে নিত্যানন্দ নিজেই থানায় ফোন করে জানালো তার শান্তিনীড়ের একজন আবাসিক নিরুদ্দিষ্ট হয়েছেন। নিরুদ্দেশের প্রাবল্যে পুলিশ স্টেশনে আজকাল এ খবরে কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। নিত্যি ত্রিশদিন মানুষজন হারাচ্ছে। বুড়ো-বাচ্চা সবাই। কিশোরী মেয়ে, কচি বউ, বুড়ি ঠান্ডদি। নির্বিচারে। কেউ পরীক্ষায় ফেল করে, কেউ ব্যর্থ প্রেমে, কেউ ঝগড়া করে, কেউ বা সংসারের যাঁতাকলের পেষণে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে। পুলিশ-স্টেশনে যিনি ফোন ধরেছিলেন তিনি খিঁচিয়ে ওঠেন, তা একটি বুড়ো নিরুদ্দেশ হয়েছে বলে ফোনে বিরক্ত করছেন কেন? লিখিত এজাহার দিতে হবে না? সই দিতে হবে না? সেটা কি টেলিফোনে হবে? দশ কপি ফটো নিয়ে থানায় চলে আসুন।

নিত্যানন্দ এতক্ষণে গরুড়-পক্ষীর ভঙ্গিতে বললে, প্লীজ ব্যারিস্টার-সাহেব, আমাকে সমন ধরাবেন না। আমার ওয়াইফের বোন, মানে আমার শালী, কটকে মরণাপন্ন। যে কোন সময় ট্রাঙ্ক-কল আসতে পারে।

– কটকে আপনার শালীর বাড়িতে টেলিফোন আছে?

– আছে। ফোন করতে তাঁর কোনও অসুবিধা হবে না।

– টেলিফোন-নাম্বার আর নাম-ঠিকানা সব লিখে দিন

– কেন স্যার? কী হবে?

– আপনার ওয়াইফকে সমন ধরাতে হবে যে। কেন, আপনার ওয়াইফ বলেননি? আমার একটি ক্লায়েন্টের স্বামীকে পাগল সাজিয়ে এখানে আটক রাখতে চাই – এ-কথা বলেননি? আমাকে তো বলেছিলেন আপনার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলতে। আপনিই জানাবেন– কী জাতের সার্ভিসে কীরকম চার্জ দিতে হবে!

রথ চারিদিকে একবার তাকিয়ে দেখে নিম্নস্বরে বলল, একটা কথা বলব স্যার? আপনি যা ভেবেছেন তা ঠিক নয়। এটা সত্যিই একটা স্যানিটেরিয়াম। আমি ভিনদেশী মানুষ। আপনাদের কলকাতায় এসে রুজিরোজগার করছি। এখানেই লেখাপড়া শিখেছি, আমি বাঙালীই হয়ে গেছি! আপনি এভাবে আমার সর্বনাশ করবেন না স্যার!

বাসু পাইপটা ধরিয়ে বললেন, আপনার সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা নেই। আপনি যদি সহযোগিতা করেন, তবে আমি নিজের থেকে আপনাকে ফ্যাসাদে ফেলব না। হয়তো সমনই ধরাবো না…

– বলুন স্যার? কী জানাতে হবে?

– আপনার শালী কটকে সত্যই অসুস্থ?

– আজ্ঞে না। আপনি সেদিন যে ভয় দেখিয়ে গেছেন, তাই আমার ওয়াইফ পালিয়ে বসে আছেন। যাতে আপনি সমন ধরাতে না পারেন!

– এবার বলুন, সত্যানন্দকে কে সরিয়ে নিয়ে গেছে– ধনঞ্জয় না তার বন্ধু বিলাস সিং?

– প্রভু জগন্নাথের দিব্যি স্যার! আমি সত্যিই কিছু জানি না। বুড়োটা নিশ্চয় নিজে নিজেই পালিয়ে গেছে। ওদের দুজনের কেউ নয়…

– সেটা যে অসম্ভব তা আপনি নিশ্চয় বুঝছেন। বাথরুমে ব্রেড বা ক্ষুর ছিল না। বৃদ্ধ স্ট্র্য্যাপ দিয়ে বাঁধা ছিলেন খাটের সঙ্গে…

– না, স্যার। এটা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ওটা আপনাদের অনুমান।

বাসু-সাহেব উঠে দাঁড়ান। বলেন, অল-রাইট! সমনটা তাহলে সার্ভ করি! আদালতেই তাহলে ফয়শালা হবে।

নিত্যানন্দ তৎক্ষণাৎ গরুড়পক্ষী: মেনে নিলাম, স্যার। বুড়োটা খাটের সঙ্গে স্ট্র্যাপ দিয়ে বাঁধাই ছিল!

– তাহলে বাইরের কেউ এসে তাঁকে মুক্ত করেছে। আপনার প্রতিষ্ঠানের কেউ নয়? আপনি নিশ্চিত? অলরাইট, অলরাইট! এখানে কে কে আছে বলুন– ঠাকুর, চাকর, ঝি নার্স, দারোয়ান। বিস্তারিত সব বলে যান।

বিস্তারিত শুনে গেলেন চোখ বুজে। তারপর বললেন, এদের মধ্যে দু-তিন মাসের মধ্যে বহাল হয়েছে কে কে?

– কেউ নয় স্যার। সবাই আমার পুরানো কর্মী।

– অলরাইট। এর আগে যেদিন এসেছিলাম সেদিন আপনাদের নোটিস বোর্ডে একটি কর্মখালির বিজ্ঞপ্তি দেখেছিলাম। আজ সেটা নেই। কেন? লোক পেয়েছেন? একটি আনট্রেন্ড নার্স?

– পেয়েছি।

– তাকে ডাকুন দেখি–

– সরি স্যার। সে নেই। কাজে জয়েন করেই দু-দিনের ছুটি নিয়েছে। কলকাতার মেয়ে নয়। ডায়মন্ড-হারবারের। খালিহাতে এসেছিল চাকরির সন্ধানে। আমি চাকরি দেওয়ায় ডায়মন্ড-হারবার চলে গেছে গতকাল। আগামীকাল ফিরে আসবে ওর জামাকাপড় ইত্যাদি নিয়ে।

– কী নাম তার? বাড়িতে তার কে কে আছে?

– কল্যাণী দাসী। বিবাহিতা। স্বামী খেতে দেয় না, মদ্যপ। বাড়িতে মা আছে, ছোট ভাই আছে। এত কথা জানতে চাইছেন কেন স্যার?

– যেহেতু একমাত্র সেই হচ্ছে আনুনোন ফ্যাক্টর এবং মিসিং পার্সন! অবশ্য তার চেয়ে বেশি সন্দেহজনক আরও একজন আছেন, যিনি বুড়োটাকে মুক্ত করে নিয়ে রাতারাতি পালিয়ে যেতে পারেন।

– কে? কে স্যার? কে আমার এমন সর্বনাশটা করল, স্যার?

– আপনার ওয়াইফ। ধনঞ্জয় বা বিলাসের কাছে টাকা খেয়ে। আপনাকে না জানিয়ে। অথবা আপনার সাহচর্যে, সহায়তায়

– প্রভু জগন্নাথের দিব্যি, স্যার।

– বারে বারে প্রভু জগন্নাথকে পেড়ে ফেলছেন কেন? তিনি ঠুটো বলে?

নিত্যানন্দ নিজের দু-হাত দু-কানে ঠেকালো।