চার
ঠিক সাড়ে দশটার সময় চীফজাজ ঘোষণা করলেন, আদালত বসছে।
প্রথমেই শ্রীসত্যানন্দ সেনের তরফে অছিনিযুক্তিকরণ বিষয়ে আলোচনা। পূর্ববর্তী আদেশে বলা হয়েছিল শ্রীসেনের তরফে সাময়িকভাবে শ্রীধনঞ্জয় চৌবেকে অছি নিযুক্ত করা হল। কাউন্সেলার পি. কে. বাসু আমাকে জানিয়েছেন ঐ বিষয়ে তিনি কিছু অ্যাডিশনাল তথ্য পেশ করতে চান। আদালত তা শুনতে প্রস্তুত। আদালত দেখতে পাচ্ছেন সাময়িকভাবে নিযুক্ত অছি শ্রীচৌবে এবং তাঁর কাউন্সেলর আদালতে উপস্থিত। সুতরাং আদালত কাউন্সেলর পি. কে. বাসুকে তাঁর অতিরিক্ত নূতন তথ্য দাখিল করতে অনুমতি দিচ্ছেন।
বাসু-সাহেব দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, আমি দুটি এফিডেবিট দাখিল করব, ধর্মাবতার। প্রথমটি দাখিল করছেন শ্রীমতী স্মরণিকা সেন। তিনি বৃদ্ধ ব্যবসায়ী শ্রীসত্যানন্দ সেনের ভ্রাতুষ্পুত্রী। উল্লেখ্য, শ্রীমতী সেনের পিতৃদেব স্বর্গত সত্যপ্রিয় সেন ছিলেন সত্যানন্দের সহোদর ভ্রাতা, বৈমাত্রেয় ভ্রাতা নন। শ্রীমতী সেন তাঁর এফিডেবিটে বলেছেন, মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে তিনি যখন টুরিস্ট ভিসায় লন্ডনে বেড়াতে যান তখন তাঁর জেঠামশাই বহাল তবিয়তে, সুস্থ মস্তিষ্কে স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে ছিলেন।ফিরে এসে তিনি দেখেছেন, জেঠামশাই ‘মেন্টাল নার্সিংহোমে’, তাঁর বাড়ির পুরাতন সেবকবৃন্দ-যে সব ঝি-চাকর-পাচক শ্রীসত্যানন্দ সেনকে গত কয়েক দশক ধরে সেবা করে এসেছে তারা সকলেই বিতাড়িত। পুরনো লোক একটিও নেই। নূতন চাকর-বাকরদের নিযুক্ত করেছেন শ্রীসত্যানন্দ সেনের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা, যাঁর হেপাজতে থাকার সময় মাত্র পাঁচ সপ্তাহে বৃদ্ধ সেন-মশাই মানসিক স্থৈর্য হারিয়েছেন। দ্বিতীয় এফিডেবিট দাখিল করেছেন নিউ আলিপুরের গ্রিন্ডলেজ ব্যাঙ্কের ম্যানেজার শ্রীসি. এস. রঙ্গনাথন। তিনি শ্রীসত্যানন্দ সেনকে দীর্ঘসময় ধরে চেনেন। তাঁর মতে শ্রীসেন বিগত দশ বছর গ্রিন্ডলেজ ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট রেখেছেন। ব্যবসায়ে এবং শেয়ার কেনাবেচায় তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন। এফিডেবিটে তিনি আরও বলেছেন যে, শ্রীসেনের ভাইঝি শ্রীমতী স্মরণিকা সেন বিদেশে যাওয়ার ঠিক পরে শ্রীধনঞ্জয় চৌবে তাঁর কাছে জানতে এসেছিলেন শ্রীসেনের ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্স কত। শ্রীরঙ্গনাথন তাঁকে তা জানাতে অস্বীকার করায় তিনি নানা কর্মচারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। শ্রীরঙ্গনাথন তখন সন্দিগ্ধ হয়ে মিস্টার সেনকে বাড়িতে টেলিফোন করেন। কিন্তু তাঁকে টেলিফোনে পান না। বলা হয়, শ্রীসেন অসুস্থ। সুতরাং আমরা আদালতের কাছে এই আর্জি রাখছি যে, যদি আদালতের মতে শ্রীসত্যানন্দ সেন মানসিকভাবে নিজ সম্পত্তির দেখাশোনা করতে অশক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর দীর্ঘদিনের সহচরী, সেবিকা ও ভ্রাতুষ্পুত্রী শ্রীমতী স্মরণিকা সেনকে অছি নিযুক্ত করা হোক। তিনি যে ধনঞ্জয় চৌবের চেয়ে বাঞ্ছনীয় অছি এটা প্রমাণ করতে আমি শ্রীধনঞ্জয় চৌবেকে সাক্ষীর মঞ্চে উঠে দাঁড়াতে বলছি। তাঁকে কিছু প্রশ্ন করার আছে।
বিচারক ভাদুড়ী কুঞ্চিত ভ্রূভঙ্গে চৌবেকে বললেন, আপনি সাক্ষীর মঞ্চে উঠে দাঁড়ান। ইতিপূর্বেই আপনি হলফ নিয়েছেন, তবু ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে এবং সাক্ষ্যের গুরুত্ব বোঝাতে আমি আবার ওঁকে হলফনামা পড়াতে বলছি।
ধনঞ্জয় সাক্ষীর মঞ্চে উঠে হলফনামা পাঠ করে। বছর পঞ্চাশ বয়স হবে। মাথায় চকচকে টাক। চোখ দুটো মর্মভেদী। দেখলে মনে হয়, এ লোক দু’-ঘা নিতেও পারে, দু’ঘা দিতেও পারে।
বাসু-সাহেব তাঁর জেরা শুরু করেন, আপনার নাম শ্রীধনঞ্জয় চৌবে? আপনি শ্রীসত্যানন্দ সেনের বৈমাত্রেয় ভাই এবং অছি-নিযুক্ত আবেদনে আপনিই মূল নিয়ামক, কেমন তো?
– হ্যাঁ তাই।
– আপনি কতদিন আগে ঐ বাড়িতে এসেছেন?
– প্রায় তিন মাস। দাদার জনডিস হয়েছে খবর পেয়ে। সঙ্গে আমার স্ত্রীও এসেছিলেন। তিনি পাশ করা নার্স।
জাস্টিস ভাদুড়ী বলে ওঠেন, আপনাকে যা প্রশ্ন করা হচ্ছে শুধু সেটুকুর জবাব দিন। অহেতুক কথা বাড়াবেন না।
বাসু প্রশ্ন করেন, আপনাদের সঙ্গে মিস্টার বিলাসসিং যাদবও ধানবাদ থেকে এসেছিলেন, তাই নয়?
– আজ্ঞে হ্যাঁ
– এবং ঐ নিউ আলিপুরের বাসাতেই এই তিন মাস ধরে আছেন, তাই নয়?
– আজ্ঞে হ্যাঁ।
– তিনি কি পাসকরা নার্স বা ডাক্তার অথবা শ্রীসেনের আত্মীয়?
– আজ্ঞে না। তিনি আমাদের সঙ্গে আছেন, মানে আমাদের বন্ধুস্থানীয়। দাদার অবস্থা ঘোরালো হয়ে ওঠায় তাঁর ফিরে যাওয়া ঘটে ওঠেনি।
– আপনার দাদার অবস্থা ঘোরালো হয়ে ওঠার সঙ্গে যাদব-সাহেবের কী সম্পর্ক?
– কিছুই নয়, আবার সবই। মানে বন্ধুকৃত্য। আমার বিপদে সাহায্য করা।
– আপনার তো কোন বিপদ ঘটেনি এই কয় মাসে? ঘটেছে?
– না, মানে দাদার বিপদ মানেই আবার আমার বিপদ। দাদাকে সবাই মিলে যেভাবে দোহন করছিল, তিনি তো দুদিন পরেই পথের ভিখারী হয়ে যেতেন।
– তাই নাকি! কে দোহন করছিল আপনার দাদাকে।
– আপনি জানেন না? তিনি সওয়া লক্ষ টাকার বিয়ারার চেক পাঠিয়ে চিঠি লিখে একজনকে বলেছিলেন টাকাটা গাপ করে ফেলতে।
– আই সী। আপনি চিঠিটা কোথায় দেখলেন?
– সেটা ডাকে দেওয়ার আগেই। দাদার দেরাজে
– আপনি ভেবেছিলেন চিঠিটা আপনাকে লেখা?
– তা কেন ভাবব? খামের উপর ‘কনফিডেনশিয়াল’ লেখাই ছিল।
– খামটা খোলা ছিল, না বন্ধ?
– তা আমার মনে নেই।
– তাহলে অপরের চিঠি আপনি পড়লেন কেন?
– জানতে যে, বিদ্যেধরী আমার দাদাকে কতটা মোহগ্রস্ত করেছেন!
– ‘বিদ্যেধরী’ মানে কী? আপনি কি আপনার দাদার ভাইঝি স্মরণিকা সেনের কথা বলছেন?
– আমি স্মরণিকার কথাই বলছি, তবে সে ‘সেন’ও নয়, দাদার ভাইঝিও নয়। তার নাম স্মরণিকা দত্ত!
পি.কে. বাসু জাঁদরেল ব্যারিস্টার; তৎক্ষণাৎ বুঝে নেন ও পক্ষের আস্তিনের তলায় একটা অ্যাটম বোমা লুকানো আছে। উপায় নেই! এখন সেটা বিস্ফোরিত হবেই। সেই ব্রহ্মাস্ত্রের আঘাতটা তাঁকে বুক পেতে সহ্য করতে হবে, অবিচলিত চিত্তে, কিন্তু টুকু কি পারবে আঘাতটা সইতে?
তাঁকে প্রশ্নটা করতেই হল, স্মরণিকার বাবার নাম কী?
– আমি জানি না।
– তবে ওর ‘দত্ত’ উপাধি হল কি করে?
– যেহেতু ওর মায়ের উপাধি দত্ত। ওর মায়ের নাম শান্তিরানী দত্ত– তিনি আমার দাদার সংসারে গভর্নেস হিসাবে দীর্ঘদিন ছিলেন।
জাস্টিস ভাদুড়ী সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে প্রশ্ন করেন, মিস্টার চৌবে, আপনি যে অ্যালিগেশান উপস্থিত করেছেন তার প্রমাণ নিশ্চয় দিতে পারবেন?
চৌবে বিচারকের দিকে ফিরে বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ, হুজুর। প্রসঙ্গটা এমন অপ্রীতিকর যে, বাধ্য না হলে তা আমি আদালতে উপস্থিত করতাম না। বিশেষ, স্মরণিকার মা জীবিতা নেই!
বিচারক বলেন, উপায় নেই, প্রসঙ্গটা আপনি এতদূর টেনে এনেছেন যে, তারপর এ প্রশ্ন করতেই হবে। আপনি অভিযোগ এনেছেন মিস্টার সেন যাঁকে সওয়া লক্ষ টাকার চেক লিখে দিয়েছিলেন তিনি ওঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী নন। এক্ষেত্রে মাঝপথে আপনি থামতে পারেন না। মোটামুটি ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলুন।
চৌবে নিখুঁত কায়দায় প্রসঙ্গটা অবতারণা করে জিজ্ঞাসিত হল। এবার সে স্মরণিকার জন্মবৃত্তান্তের কথা সবিস্তারে বলতে থাকে। তার জ্ঞানমতে – সত্যপ্রিয় সেন সন্ত্রীক মটোর অ্যক্সিডেন্টে যখন মারা যান তখন তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন। তার কয়েক মাস আগে শান্তিরানী দত্ত সেন-পরিবারে এসেছেন। স্বামীত্যক্তা, সদ্যোবিবাহিতা এবং গর্ভে সন্তান! বস্তুত শান্তি দেবী নাকি বিবাহ করেন গর্ভে সন্তান নিয়ে। আর সেজন্যই তাঁর স্বামী – সুহাস দত্ত, বিবাগী হয়ে সংসার ত্যাগ করে চলে যায়। সত্যানন্দ তখন এই ব্যবস্থা করেন। শান্তি দেবীর সন্তানকে তিনি ভাইঝি সাজান। কারণ সুহাস দত্তের পরিবার ঐ মেয়েটিকে কিছুতেই গ্রহণ করত না। তাছাড়া শান্তিদেবীর পক্ষে শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখা সম্ভবপর ছিল না। এইভাবে ঐ অবৈধ কন্যাটিকে একটা নাম দেওয়া গেল, সামাজিক মর্যাদাও। না হলে তাকে স্কুলে ভর্তি করাই মুশকিল হত।
– আপনি এসব কথা প্রমাণ করতে পারবেন? – প্রশ্ন করেন বিচারক।
– আজ্ঞে হ্যাঁ। ধর্মাবতার। দাদার সে-আমলে লেখা চিঠি আমার কাছে সযত্নে রাখা আছে। আমাদের তিনি অনুরোধ করেছিলেন ব্যাপারটা গোপন রাখতে। তাই এতদিন রেখে এসেছি আমরা, কিন্তু এখন, যখন দেখা যাচ্ছে রক্তের সম্পর্করহিত ঐ মেয়েটি দাদার সম্পত্তি গ্রাস করতে চাইছে, তখন আমাদের সবকিছু প্রকাশ্যে বলতে হচ্ছে।
– স্মরণিকা পাসপোর্ট পেল কীভাবে?
– দাদার এফিডেবিট-বলে। তিনি মিথ্যা এফিডেবিট করেছিলেন যে, ওঁর ভাইঝির বার্থ-সার্টিফিকেট দেশের বাড়িতে পড়ে আছে। দেশ বলতে ‘বাংলাদেশ’। ওঁরা যখন চলে আসেন তখন তা ছিল পূর্বপাকিস্তান। আমরা এতদিন কোনও উচ্চবাচ্য করিনি, কিন্তু যখন দেখলাম ঐ সুযোগসন্ধানী মেয়েটি দাদার গোটা সম্পত্তিটা গ্রাস করতে চায় তখন দাদার স্বার্থেই আমাদের চলে আসতে হল কলকাতায়…
– শুধু দাদার, না আপনাদের নিজেদেরও? – প্রশ্ন করেন বাসু।
– ‘ইফ্ দ্য কোর্ট প্লীজ’, উঠে দাঁড়ান অ্যাডভোকেট সলিল দত্ত – ‘দত্ত অ্যান্ড দত্ত’-ফার্মের সিনিয়ার পার্টনার। ধনঞ্জয় চৌবের কাউন্সেল। বলেন, আমরা এতক্ষণ ধৈর্য ধরে একতরফা শুনে যাচ্ছিলাম, ধর্মাবতার। কারণ ঐ অল্পবয়সী মেয়েটির অবৈধ জন্মপ্রসঙ্গটা আমরা উত্থাপন করতে চাইনি। কিন্তু অবস্থা এখন যেখানে এসে ঠেকেছে তাতে আমরা আদালতের সামনে এই আর্জিই পেশ করব যে, শ্রীমতী স্মরণিকা দত্ত – যাঁকে কেউ-কেউ স্মরণিকা ‘সেন’ নামে জানে– এই পরিবারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্ক-বিরহিত। শ্রীসত্যানন্দ সেনের এস্টেটের অছি-নিযুক্তিকরণ সংক্রান্ত মামলায় ঐ বহিরাগতার কোন বক্তব্য থাকতে পারে না। ফলে, কাউন্সেল পি. কে. বাসু, বার-অ্যাট-ল-র কোনও ‘লোকাস-স্ট্যান্ডাই’ নেই। তিনি এইমাত্র যে প্রশ্নটি করেছেন সে প্রশ্ন করার অধিকারই তাঁর নেই।
চীফজাজ ভাদুড়ী বলেন, এই আর্জিবিষয়ে আমি এখনই কোন সিদ্ধান্তে আসছিনা। শ্রীমতী স্মরণিকা সেনের জন্মবৃত্তান্ত এখনও প্রমাণিত হয়নি, ফলে তিনি সেন-পরিবারভুক্ত কিনা এটা এখন তর্কের বিষয়। সে প্রশ্ন সরিয়ে রেখে আমি সাক্ষীকে সরাসরি কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে অবস্থা সন্বন্ধে অবহিত হতে চাই। প্রথম প্রশ্ন, কবে কী করে আপনার মনে হল ঐ মেয়েটি– শ্রীমতী স্মরণিকা – আপনার দাদার বিষয়-সম্পত্তি গ্রাস করতে চাইছে?
– এবার কলকাতা এসে, হুজুর। আমরা এসে দেখলাম দাদার স্টীল আলমারির চাবি ঐ মেয়েটির হেপাজতে আছে। টাকা-পয়সার প্রয়োজন হলে দাদাই ওর কাছ থেকে তা চান, মেয়েটি আলমারি খুলে টাকা এনে দেয়। ব্যাঙ্কের খাতাপত্র, এন. এস. সি. ভল্টের চাবি, সব কিছুই থাকে ঐ আলমারিতে।
– আপনাদের আশঙ্কা হল যে, দাদা তাঁর সম্পত্তি থেকে আপনাদের বঞ্চিত করে– ঐ মেয়েটাকে ওয়ারিশ করে উইল করতে চান?
ধনঞ্জয় হঠাৎ সিঁটিয়ে গেল। একটু ভেবে নিয়ে বললে, আজ্ঞে না, হুজুর। অতটা আমরা আশঙ্কা করিনি।
– আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এ নিয়ে কখনো আলোচনা হয়নি।
– আজ্ঞে না।
– যখন দাদার এস্টেটে একজন ‘কনজারভেটর’ নিযুক্ত করার আবেদন করেন, তখনো কি আপনার মনে পড়েনি যে, আদালত সেই মর্মে নির্দেশ দিলে আপনার দাদার উইল করার অধিকারটাও কেড়ে নেওয়া হবে?
যেন এখন এইমাত্র সে বিষয়ে সচেতন হল এমনিভাবে চমকে উঠে চৌবে বললে, আজ্ঞে না, হুজুর। সে-কথা আমরা ভেবেই দেখিনি কোনদিন।
বাসু-সাহেব উঠে দাঁড়ান। একটি বাও করে বলেন, ইওর অনার! আমি বর্তমানে আমার স্ট্যাটাসটাও ঠিকমতো জানি না। আপনার তদন্তের মাঝখানে বাধা দিচ্ছি অন্য একটি হেতুতে। যেহেতু ইতিপূর্বেই বর্তমান সাক্ষী স্বীকার করেছেন যে, স্মরণিকা দেবীকে লেখা সত্যানন্দের চিঠিখানি তিনি দেখেছেন তাই আমার মনে হয় আদালতের জানা প্রয়োজন সে চিঠিতে কী লেখা ছিল। মূল চিঠিখানি আমি আদালতের হস্তান্তরিত করতে চাই।
জজ-সাহেব চিঠিখানি আদ্যন্ত পড়ে ধনঞ্জয় চৌরের দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন আপনি বলছেন যে, আপনার বৈমাত্রেয় দাদা আপনাকে বঞ্চিত করে একটি উইল প্রণয়ন করতে পারেন এ-কথা কখনো আপনার মনে উদয় হয়নি?
চৌবে নড়ে-চড়ে বসল। ইতস্ততঃ করে বলে, না…মানে…
– মানে?
– আজ্ঞে না।
– প্রথমবারে আপনার উত্তর ছিল বিনা দ্বিধায় ‘না’। এবার কণ্ঠস্বরে কিছুটা দ্বিধা দেখছি। তা সত্ত্বেও আপনার জবাব: ‘না’?
– আজ্ঞে, হ্যাঁ। ‘না’!
– অথচ আমার হাতে যে চিঠিখানা রয়েছে, আপনি ইতিপূর্বে স্বীকার করেছেন যে, ডাকে দেওয়ার আগেই তা আপনি পড়েছেন। তাতে আপনার দাদা স্পষ্টাক্ষরে স্মরণিকা দেবীকে জানাচ্ছেন যে, তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তাঁকে দিতে চান। তা পড়েও…
– আজ্ঞে ঐ চিঠি পড়ার পরে তা আমরা বুঝেছি বৈকি।
– অথচ একটু আগে বললেন, দাদার এস্টেটে কনজারভেটর নিযুক্ত করার আবেদন যখন করেন তখনো সে আশঙ্কা আপনাদের ছিল না?
– না…মানে…
– মিস্টার সত্যানন্দ সেন বর্তমানে কোথায়?
– একটি আরোগ্য-নিকেতনে। বড়িশা-বেহালায় ডঃ নিত্যানন্দ রথের স্যানিটোরিয়ামে– ‘শান্তিধাম’। দাদার চিন্তাধারায় এখন কোনও পারম্পর্য নেই – মানুষজনও ঠিক চিনতে পারছেন না। আমার স্ত্রীর মতে – উনি একজন ট্রেইন্ড নার্স – দাদা যে অসুখে ভুগছেন তার নাম ‘সেনাইল ডিমেনশিয়া’।
দর্শকদলের মধ্যে থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন একজন স্থূলাঙ্গী মহিলা। বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ, ধর্মাবতার। আমি তাই বলেছি।
চীফজাজ ভাদুড়ী বলেন, আপনার হলফনামা নেওয়া নেই। তা হোক, এখন আমি কিছু তথ্য সংগ্রহ করছি মাত্র। আপনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে যখন আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন তখন বলুন, চিঠিখানা কি আপনিও দেখেছিলেন?
– আজ্ঞে হ্যাঁ, ধর্মাবতার, দেখেছিলাম।
– কে আপনাকে দেখান?
– আমার স্বামী।
– মিস্টার সেনের ড্রয়ার থেকে খামটা বার করে?
– আজ্ঞে, হ্যাঁ।
– খামটা তো আঠা দিয়ে বন্ধ ছিল, ছিল না?
– আজ্ঞে আমি যখন দেখি তখন খোলাই ছিল।
– অর্থাৎ তার আগে বন্ধ ছিল? কে খুলেছিল খামটা?
সাক্ষী মর্মান্তিক দৃষ্টিতে তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখে। জবাব যোগায় না তার কণ্ঠে।
মিস্টার ভাদুড়ী বলেন, আজ এইখানেই থামতে হচ্ছে।কারণ এর পরের মামলার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু এ ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি ফয়শালা হওয়া দরকার। পেশকারের দিকে ফিরে জানতে চান, কবে ডেট দেওয়া যায়, বৈকুণ্ঠ?
শুক্রবার আফটারনুনে টি. এন. বিশ্বাস ভার্সেস স্টেট-গভর্নমেন্ট কেসটায় আপনি ডেট মঞ্জুর করেছেন, হুজুর।
– অল রাইট। এই তথ্যানুসন্ধানের মামলা শুক্রবার বেলা দুটোয় শুরু হবে। তখন শ্রীসত্যানন্দ সেনকে আদালতে উপস্থিত করতে হবে।
ধনঞ্জয় হাতদুটি জোড় করে উঠে দাঁড়ায়। বলে, সেটা যে একান্তই অসম্ভব ধর্মাবতার। উনি খুবই অসুস্থ…মানে একেবারে ইয়ে ডক্টর রথের মতে…
জজসাহেব ভাদুড়ী ওকে মাঝপথে থামিয়ে বলে ওঠেন, অল রাইট। কাল পর্শর মধ্যে আদালত-নিযুক্ত মনস্তাত্ত্বিক-বিশেষজ্ঞ ঐ স্যানিটেরিয়ামে গিয়ে মিস্টার সেনকে পরীক্ষা করবেন। আদালত এজন্য ডক্টর কৈলাশনাথ দাশগুপ্ত, এম. ডি.-কে নিযুক্ত করছেন। তিনি যদি মনে করেন যে, মিস্টার সেনকে সশরীরে আদালতে উপস্থিত করা যুক্তিযুক্ত হবে না– তবে তা গ্রাহ্য হবে। নচেৎ মিস্টার সেনকে আদলেতে হাজির করতে হবে। ডক্টর দাশগুপ্ত তাঁর ‘ফাইন্ডিংস’-ও ঐদিন আদালতে পেশ করবেন – অর্থাৎ মিস্টার সেনের মানসিক অবস্থা কী, তাঁর আদৌ কোন অছির প্রয়োজন আছে কিনা। এবার কাউন্সেল সলিল দত্ত যে আর্জিটি পেশ করেছেন সেই প্রসঙ্গে আসতে হয়। শ্রীমতী স্মরণিকা – তা তিনি সেনই হন অথবা দত্ত – দুই দশক ধরে ঐ বৃদ্ধের দেখাল করেছেন এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। তদুপরি শ্রীধনঞ্জয় চৌবের এজাহারে দেখা যাচ্ছে মিস্টার সেন– যে সময় তাঁর মানসিক স্থৈর্য অবিকৃত ছিল – ঐ মেয়েটিকে বিশ্বাস করে তাঁর স্টিল আলমারির চাবি গচ্ছিৎ রেখেছিলেন। ঐ আলমারিতেই রাখা ছিল সেন-মশায়ের সমস্ত কাগজপত্র, যা এই দুই-দশকের ভিতর তছনছ হয়নি। তাই আদালত এখনি ঐ ইংরেজি প্রবচনটি মেনে নিতে পারছেন না – ‘ব্লাড ইজ থিকার দ্যান ওয়াটার’! ফলে কাউন্সেলার পি. কে.বাসুর ‘লোকাস-স্টান্ডাই’ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তার বৈধতা বিষয়েও আদালত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজ আগামী সিটিং পর্যন্ত স্থগিত রাখছেন। আদালত এক্ষেত্রে মিস্টার বাসুকে রাষ্ট্রের স্বার্থ দেখতে ঐদিন আদালতে উপস্থিত থাকতে বলছে amicus curiae হিসাবে…অর্থাৎ আদালতের স্বার্থ দেখতে আদালত কর্তৃক নিযুক্ত আইনজীবী হিসাবে…আগামী শুক্রবার বেলা দুটোয় এ মামলা পুনরায় উঠবে।
