পুরুদেহে যযাতির জরাসঞ্চার
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! তৎপরে রাজা যযাতি জরাগ্রস্ত হইয়া নিজ রাজধানী প্রত্যাগমনপূর্ব্বক স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্ৰ যদুকে কহিলেন, “বৎস! শুক্রের শাপপ্রভাবে এই মহাঘোর জরা আমাকে আক্রমণ করিয়াছে, কিন্তু অদ্যাপি আমি বিষয়ভোগ করিয়া পরিতৃপ্ত হই নাই; অতএব তুমি মদীয় পাপ ও জরা গ্রহণ কর। আমি তোমার যৌবন লইয়া ইচ্ছানুরূপে বিষয়-ভোগ করি। সহস্র বৎসর পূর্ণ হইলে পুনর্ব্বার তোমার যৌবন তোমাকে সমর্পণ করিয়া আমি পাপের সহিত আপন জরা গ্ৰহণ করিব।” যদু কহলেন, “মহারাজ! জরার অনেক দোষ, তাহাতে পানভোজনে যথেষ্ট ব্যাঘাত জন্মে, শ্মশ্রুজাল শুক্ল (বার্দ্ধক্যে দাড়ি পাকিয়া শুভ্রবর্ণ) এবং মাংস শিথিল ও সন্ধুচিত হওয়াতে জীর্ণ ব্যক্তি শ্ৰীভ্রষ্ট, নিরানন্দ ও সর্ব্বকাৰ্য্যে নিরুৎসাহ হয়। আত্মীয়ব্যক্তিরা জরাজীর্ণকে পদে পদে পরাভব করে; অতএব আমি সেই জরা-গ্রহণে সম্মত নাহি। আপনার আমা হইতে প্রিয়তর অনেক পুত্র আছে, তাহাদিগকেই জরা প্ৰদান করুন।” যযাতি কহিলেন, “তুমি যেহেতু আমার ঔরসপুত্ৰ হইয়া স্বকীয় যৌবন-প্রদানে সম্মত হইলে না, অতএব তোমার বংশ পরম্পরায় কেহই রাজ্যাধিকারী হইবে না।” তৎপরে রাজা যযাতি তুর্ব্বসুর নিকট উপস্থিত হইয়া কহিলেন, “বৎস! আমার পাপ ও জরা গ্ৰহণ কর, আমি তোমার যৌবন লইয়া বিষয়োপভোগ করিব। সহস্ৰ বৎসর অতীত হইলে পুনর্ব্বার তোমার যৌবন তোমাকে সমর্পণ করিয়া পাপের সহিত আপন জরা গ্ৰহণ করিব।” তুর্ব্বসু কহিলেন, “মহারাজ! রূপনাশিনী জরা মনুষ্যকে ইচ্ছানুরূপ ভোগসুখে বঞ্চিত করে। জরার প্রভাবে বুদ্ধিভ্রংশ ও পদে পদে প্রাণনাশের আশঙ্কা উপস্থিত হয়; অতএব আমি আপনার জরা-গ্রহণে সম্মত নাহি।” যযাতি কহিলেন, “বৎস! তুমি আমার আত্মজ হইয়া আমার প্রার্থনা পূরণে সম্মত হইলে না, অতএব আমি শাপ দিতেছি, তুমি নির্বংশ হইবে এবং সঙ্কীর্ণাচার ধর্ম্মসম্পন্ন, প্রতিলোমাজ, রাক্ষস, চণ্ডাল, গুরুদার নিরত, তিৰ্য্যাগ-যোনিজাত, পশুধর্ম্মা ও পাপিষ্ঠদিগের রাজা হইবে।”
এইরূপে তুর্ব্বসুকে অভিশাপ দিয়া রাজা যযাতি শৰ্মিষ্ঠাপুত্ৰ দ্রুহ্যুকে কহিলেন, “বৎস! সহস্ৰ বৎসরের নিমিত্ত আমার এই রূপনাশিনী জরা গ্ৰহণ করা, আমি তোমার যৌবন লইয়া ভোগ বাসনা চরিতার্থ করিব। নির্দিষ্টকাল অতিক্রান্ত হইলেই পুনর্ব্বার পাপের সহিত জরা গ্ৰহণ করিয়া তোমার যৌবন তোমাকে প্ৰদান করিব।” দ্রুহ্যু কহিলেন, “মহারাজ! মনুষ্য জীর্ণ হইলে হস্তী, অশ্ব ও রথে আরোহণ করিতে বা কামিনীসম্ভোগ করিতে অসমর্থ হয় এবং জীর্ণ ব্যক্তির বাক্য স্থলিত হয়, অতএব আমি জরা-গ্রহণে সম্মত নহি।” তাহা শুনিয়া রাজা রোষাবিষ্ট-চিত্তে কহিলেন, “দ্রুহ্যু! তুমি আমার আত্মজ হইয়া যৌবন-প্রদানে পরাঙ্মুখ হইলে; অতএব অতঃপর তোমার কোন বাসনা ফলবতী হইবে না; আর যে-স্থানে গজ, বাজী, রথ ও শিবিকাদি যানের সমাগম নাই, কেবল উড়ুপ (ভেলা)
বা সন্তরণ দ্বারা গমনাগমন করিতে হয় তোমাকে সেই স্থানে যাইয়া বাস করিতে হইবে। তোমার বংশে কেহই রাজা হইবে না।” রাজা দ্রুহুকে এইরূপ অভিশাপ দিয়া অনুকে কহিলেন
, “বৎস! তুমি আমার পাপ ও জরা গ্ৰহণ কর; আমি তোমার যৌবন লইয়া এক সহস্ৰ বৎসর বিষয়-ভোগ করিব।” অনু কহিলেন, “মহারাজ! জীর্ণ ব্যক্তি অশুচি ও বালকের ন্যায় অনিয়ত-কালে ভোজন করিতে প্রবৃত্ত হয় এবং যথাকলে অগ্নিহোত্ৰাদি ক্রিয়া সম্পাদনা করিতে পারে না; অতএব আমি জরা—গ্রহণ করিব না।” তখন রাজা কহিলেন, “তুমি আমার ঔরসপুত্র হইয়া জরার দোষোল্লেখপূর্ব্বক যৌবনপ্রদানে পরাঙ্মুখ হইলে; অতএব আমি তোমাকে অভিশাপ দিতেছি, তুমি অচিরাৎ সেই জরাদোষে লিপ্ত হইবে এবং তোমার সন্তান-সন্ততি যৌবন প্ৰাপ্তিমাত্ৰেই কালগ্রাসে পতিত হইবে।” সর্ব্বশেষে পুরুর নিকট উপস্থিত হইয়া কহিলেন, “বৎস পুরো! আমি শুক্রের শাপে জরাগ্রস্ত হইয়াছি; আমার কেশ পালিত (পক্ক) ও মাংস লোলিত হইয়াছে। কিন্তু আমি যৌবনসুখ-সম্ভোগ করিয়া পরিতৃপ্ত হই নাই; অতএব তুমি আমার পাপের সহিত জরা গ্রহণ করা; আমি তোমার যৌবন লইয়া কিছুকাল ইচ্ছানুরূপ বিষয় ভোগ করি। আমি অঙ্গীকার করিতেছি, সহস্ৰ বৎসর অতিক্রান্ত হইলে তোমার যৌবন তোমাকে পুনর্ব্বার প্রদান করিয়া পাপের সহিত আপন জরা গ্ৰহণ করিব। হে পুরো! তুমি আমার প্রিয়তম পুত্র, এইরূপ করিলে সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হইতে পরিবে৷” পুরু এইরূপ অভিহিত হইয়া কহিলেন, “যে আজ্ঞা মহারাজ! আপনি যেরূপ অনুমতি করিতেছেন, আমি তাহা পালন করিব; আমি পাপের সহিত আপনার জরা গ্ৰহণ করিব, আপনি আমার যৌবন লইয়া বাসনারূপ বিষয়-সম্ভোগ করুন।” তখন যযাতি কহিলেন, “বৎস! তোমার এইরূপ অচলা ভক্তি ও প্রগাঢ় অনুরাগ সন্দর্শনে আমি যৎপরোনাস্তি প্রীতি ও সম্পন্ন হইলাম; এক্ষণে আশীর্ব্বাদ করি, তোমার রাজ্যে প্রজারা সর্ব্বসমৃদ্ধিসম্পন্ন হইয়া সর্ব্বকাল পরমসুখে বাস করিবে।” এই বলিয়া রাজা শুক্রকে স্মরণপূর্ব্বক স্বীয় পুত্র পুরুর শরীরে স্বকীয় জরা সঞ্চারিত করিলেন।
