২৫. ইতালিয়ান দূতাবাসে

‘যুবতীটি খেলা করছিল তার বেড়ালটাকে নিয়ে
কী চমৎকার সেই দৃশ্য
শুভ্র হাত আর একটি শুভ্র থাবা
জমে-ওঠা অন্ধকারে তাদের খুনসুটি

কালো সুতোর দস্তানার মধ্যে
লুকিয়ে রেখেছে সে-আহ কী চতুরা?
অলীক রত্নের মতো তার সাংঘাতিক নোখ
ক্ষুরের মতন ধারাল আর ঝকঝকে

বেড়ালটিও, তারই মতন, দেখতে যেন কত শান্ত
ঢেকে রেখেছে লোমশ থাবার মধ্যে তীক্ষ্ণ নোখ
কিন্তু তার মধ্যে রয়ে গেছে শিকারি শয়তান
আর সেই ঘরের মধ্যে হাসির হররা
ঝনঝন করছে পরীদের ঘণ্টার মতন
ঝলসে উঠছে চারটি সূক্ষ্ম ফসফরাসের স্ফুলিঙ্গ’
–পল ভ্যারলেইন

ইতালিয়ান দূতাবাসে আমরা যখন পৌঁছলাম, ততক্ষণে আলবার্তো মোরাভিয়ার বক্তৃতা শেষ হয়ে গেছে। তখন চলছে পানাহার। সুপ্রিয়র কাছে দুখানা কার্ড আছে, সুতরাং আমাদের যোগ দিতে বাধা নেই। বক্তৃতাটাই উপলক্ষ, সেটা না শুনে শুধু খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করা উচিত কি না, এই ভেবে আমার একটু বিবেক দংশন হচ্ছিল, কিন্তু দরজার কাছে পেছন থেকে আমাদের ঠেলতে লাগল কয়েকজন। অর্থাৎ এখনও লোকজন আসছে, তারাও আসছে ইতালিয়ান ম্যাকারুনি ও রেড ওয়াইনের টানে।

প্রশস্ত হল ঘরে প্রায় শ দেড়েক লোক, কাছাকাছি আরও দু-তিনটে ঘরেও ছড়িয়ে আছে মানুষজন। মৃদু গুঞ্জন ও খুচখাচ হাসির শব্দে ঝনঝন করছে ভেতরের বাতাস। সকলেরই হাতে হাতে লাল সুরার গেলাস। সুপ্রিয় আমার হাতে একটা গেলাস ধরিয়ে দিয়ে কাকে যেন খুঁজতে চলে গেল।

এতজন লোকের মধ্যে আমি একজনকেও চিনি না। আমি একটা নন এনটিটি’র মতন এদিকে ওদিকে ঘুরতে লাগলাম। প্রথম প্রথম বিদেশে এসে এই ধরনের পার্টিতে আমি দারুণ অস্বস্তি বোধ করতাম। সব সময় মনে হত, অন্যরা ভাবছে, এই লোকটা আবার কে? আমার পোশাক নিশ্চিত ঠিকঠাক নয়। আমি এই সব জায়গায় একেবারেই অনুপযুক্ত, বেমানান।

আমেরিকান পার্টিতে অবশ্য বেশিক্ষণ একা থাকা যায় না, ওদের শিষ্টাচার অনুযায়ী কারুকে একলা দেখলেই অন্য কেউ না কেউ এগিয়ে এসে কথা বলবে। সে সব অবশ্যই খেজুরে আলাপ। একেবারেই অনাবশ্যক। মিনিট তিনেক পর সেই ব্যক্তিটি একসকিউজ মি বলে সরে পড়বে, আবার একজন আসবে, আবার ঠিক একই রকমের কথাবার্তা। ফরাসি বা ইতালিয়ানরা তেমন আলাপী নয়, আমার সঙ্গে যেচে কেউ কোনও বলল না। আমি একটা কোনও দেওয়ালের কাছাকাছি ফাঁকা জায়গা খুঁজতে লাগলাম, যেখানে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো যায়। যেখান থেকে সকলকে দেখা যায়।

মাইকেল অ্যাঞ্জোলোর একটা ছবির নীচে আমি দাঁড়াবার জায়গা পেলাম। দু-তিনজন লোক ট্রে-তে করে পানীয় নিয়ে ঘুরছে, সুতরাং খালি গেলাস ভরে নিতে অসুবিধে নেই। নিজের হীনমন্যতা কাটাবার জন্য আমি এইসব পার্টিতে শুধু নির্লিপ্ত দর্শকের ভূমিকা নিই। অন্যরা আমার সম্পর্কে কী ভাবছে তাতে কিছু আসে যায় না। আমি কী দেখছি, সেটাই বড় কথা। এমনকি কেউ যদি আমায় অবজ্ঞা করে, সেটাও আমার কাছে দর্শনীয়।

বাড়িটি পুরোনো আমলের, বড় বড় ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছে, দেওয়ালে দেওয়ালে ইতালিয়ান শিল্পীদের ছবির প্রিন্ট। রোম ছাড়া ইতালির আর কোন শহরে আমার যাওয়া হয়নি। অনেককাল আগে যেবার রোমে গিয়েছিলাম, তখন পকেটে পয়সা এত কম ছিল যে, অনবরত গুনতে হত। যে-কোনও সাধারণ একটা জিনিসের দাম দশ হাজার, পনেরো হাজার লিরা শুনে আক্কেল গুড়ুম হয়ে যেত। যদিও লিরার মূল্যমান অতি সামান্য, তবু দশ-পনেরো হাজার শোনার অভ্যেস তো আমাদের নেই। সেবার রোম শহর আর ভ্যাটিকান সিসটিন চ্যাপেল দেখতে দেখতেই পয়সা ফুরিয়ে গেল, পালাতে হল ওদেশ ছেড়ে। ফ্লোরেন্স, ভেনিস, মিলান শহরগুলির নাম শুনলেই রোমাঞ্চ হয়, আমার দেখা হয়নি আজও।

দূবাতাসের এই পার্টিতে ইতালিয়ান ও ফরাসিদের এক মিশ্র সমাবেশ, সবাই বেশ সুসজ্জিত। আমি ছাড়া কালো কিংবা খয়েরি রঙের মানুষ আর একটিও নেই। সুপ্রিয় মুখার্জির গায়ের রং বেশ ফরসা, তেমন বয়েস না হলেও তার মাথার চুলগুলো ধবধবে সাদা, অনেক বড় সাইড বার্নস, তাও সাদা, বহুদিন এদেশে থাকার জন্য তার মুখের ভঙ্গিরও খানিকটা বদল হয়েছে, সুতরাং তাকে অনেকটা সাহেব-সাহেব দেখায়। গ্রিক কিংবা যুগোশ্লাভদের অনেকের গায়ের রং একটু চাপা, সুপ্রিয়কে গ্রিক বা যুগোশ্লাভ বলে যে কেউ ভুল করতে পারে।

একটু বাদে সুপ্রিয় এসে বলল, একটা কোণের ঘরে আলবার্তো মোরাভিয়া বসে আছেন, চলো গিয়ে কথা বলে আসবে?

আমি কাকুতি-মিনতি করে সুপ্রিয়কে নিবৃত্ত করলাম। দূর থেকে দেখাই যথেষ্ট, কাছে গিয়ে মোরাভিয়ার সঙ্গে কথা বলতে চাই না।

একটু পরে একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি সুপ্রিয়কে দেখে দূর থেকে এসে কী যেন গল্প জুড়ে দিল। ভদ্রলোক এত তাড়াতাড়ি কথা বলেন যে, আমি তার কিছুই বুঝতে পারলাম না। সুপ্রিয় আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। লোকটির নাম পিয়ের, রেডিয়োতে সাহিত্য বিষয়ক একটি শাখা পরিচালনা করেন। সুপ্রিয় তাঁর কাছে আমার সম্পর্কে এমন বাড়িয়ে বাড়িয়ে, সত্য-মিথ্যা জুড়ে পরিচয় দিতে লাগল যে আমি বারবার সুপ্রিয়র কোটের পেছন টেনে তাকে থামাবার চেষ্টা করলাম।

লোকটি আমার দিকে ফিরে তাঁর মাতৃভাষায় কিছু বলতে শুরু করতেই আমি কাঁচমাচু মুখে বললাম, এক্সকুজে মোয়া, জ্য ন পার্ল পা ফ্রাঁসে।

ভদ্রলোক এবার ইংরিজি বলতে লাগলেন, বেশ থেমে-থেমে, শব্দ খুঁজে খুঁজে। এতে আমি স্বস্তিবোধ করলাম। অন্য ভাষা খুব ভালো করে না জেনে কথা বলতে গেলেই মানুষের ব্যক্তিত্ব অনেকটা কমে যায়। এখন এই লোকটার মুখখানাও কাঁচমাচু ধরনের হয়ে গেছে।

ডাজ্ঞার সিগমুণ্ড ফ্রয়েড ভিয়েনা থেকে প্রথমবার যখন একটা সেমিনারে যোগ দিতে প্যারিসে আসেন, তখন তাঁর অনেকটা এই অবস্থা হয়েছিল। বই পড়ে ফ্রয়েড ফরাসি ভাষা শিখেছিলেন, তাঁর ধারণা তিনি ওই ভাষা ভালোই জানেন। প্যারিসে এসে বিদগ্ধ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখলেন, তাঁর উচ্চারণ ঠিক হচ্ছে না, প্রায়ই উপযুক্ত শব্দটা তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না, তাঁকে থেমে যেতে হচ্ছে মাঝে মাঝে। ফ্রয়েডের আত্মসম্মানে দারুণ আঘাত লাগল, তিনি ভাবলেন, কী, অশিক্ষিত লোকদের মতন তাঁকে ভাঙা-ভাঙা ভাষায় কথা বলতে হবে? এঁরা তাঁকে ভুল বুঝবে? সেমিনারে যোগ না দিয়েই ফ্রয়েড ফিরে গেলেন ভিয়েনাতে। বছর দু-এক বাদে অত্যুত্তম চোস্ত ফরাসি শিখে তিনি আবার এসেছিলেন প্যারিসে।

ফ্রয়েডের মতন জেদ আর কজন মানুষের থাকে। বেশিরভাগ মানুষ ভাঙা ভাঙা ভাষায় কাজ চালায়।

পিয়ের বলল, এসো, চট করে খাবার খেয়ে নেওয়া যাক। তারপর আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবে? মিশেলের ছবি দেখবে?

কে মিশেল?

পিয়ের বলল, মিশেল এখানেই আছে। দাঁড়াও আলাপ করিয়ে দিচ্ছি।

পাশের ঘর থেকে সে একটি রমণীকে ডেকে নিয়ে এল। গাঢ় নীল রঙের স্কার্ট পরা সেই দীর্ঘাঙ্গিনীর মাথার চুল সোনালি। চোখ দুটি কাজল-টানা, যদিও কাজল লাগায়নি। পদ্ধবিম্বাধরোষ্ঠী একেই বলা যায়।

রমণীটিকে দেখে আমার প্রথম অনুভূতি হল বিস্ময়কর। সে খুবই সুন্দরী তো বটেই, তা ছাড়া কিছু যেন একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার আছে। তার দৃষ্টি, তার মুখের ত্বক, তার হেঁটে আসার ভঙ্গি সবই যেন অন্যরকম। সে যৌবনের পরিপূর্ণতায় পৌঁছে গেছে, তার বয়েস পঁয়তিরিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে। এই নারীরত্নটি ছবি আঁকে? একে নিয়েই। তো বহু শিল্পীর ছবি আঁকার, কবিতা লেখার কথা। এ তো মূর্তিমতী প্রেরণা হতে পারে।

আমাদের দেখে সে ছেলেমানুষের মতন বলে উঠল, একদিনে দু’জন ভারতীয়। এর আগে আমার সঙ্গে একজন ভারতীয়েরও আলাপ হয়নি। আমি ভারত সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে চাই, একবার সেই রহস্যময় দেশে যেতে চাই।

এই সুন্দরী যে একজন মহিলা শিল্পী তা আমি এখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। সুপ্রিয় ওর সঙ্গে কথাবার্তা বলছে আমি একদৃষ্টিতে ওকে দেখেছি। রূপসি হলেও রমণীটির মধ্যে অহংকারের ভাব নেই, কথাবার্তা বেশ সরল।

খানিক বাদে মিশেল বলল, তোমরা আমার ছবি দেখতে যাবে? আমার বাড়ি কাছেই।

আমরা সবাই খুব উৎসাহের সঙ্গে রাজি হলাম বটে, কিন্তু আমি মনে-মনে ধরেই নিলাম, এবার গিয়ে বেশ কিছু বাজে ছবি দেখতে হবে। সুন্দরীর আঁকা শখের ছবি আর কী আহামরি হবে!

প্যারিস শহরের কেন্দ্রস্থলে কেউ সচরাচর গাড়ি আনতে চায় না। গাড়ি পার্ক করতেই অন্তত এক ঘন্টা সময় নষ্ট হয়। পিয়ের কিংবা মিশেলের সঙ্গে গাড়ি নেই, আমরা বাইরে গিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরলাম। চারজন যাত্রী থাকলে এখানকার অনেক ট্যাক্সিই থামতে চায় না।  ড্রাইভারের পাশে তার পোষা কুকুর থাকে, সেইজন্য সামনে বসতে দিতে চায় না কোনও যাত্রীকে। কিন্তু মিশেলের মতন যাত্রিণী দেখেও প্রত্যাখ্যান করবে, এমন পুরুষ ট্যাক্সি ড্রাইভার পৃথিবীতে থাকা সম্ভব নয়।

গাড়ি চলতে শুরু করার পর মিশেল আমাকে জিগেস করল, প্যারিস তোমার কেমন লাগছে?

আমি যে আগেও বেশ কয়েকবার এ শহরে এসেছি তা গোপন করে বললাম, যত দেখছি, ততই বিস্ময় বাড়ছে।

মিশেল বলল, আমার কিন্তু শহরগুলোর রঙের ব্যবহার খুব খারাপ লাগে। ইউরোপের বেশিরভাগ রাজধানীগুলোতেই দেখবে লাল আর সোনালি রং খুব বেশি। প্রাসাদগুলো লাল, লোহার বর্শা-বসানো গেট সব সোনালি। লাল হচ্ছে রক্তের রং, ক্ষমতার রং। আর সোনালি রং হচ্ছে লোভের রং। ক্ষমতা আর লোভ। একবার মস্কোতে গিয়ে দেখি, কী একটা উৎসবের জন্য যেন গোটা শহরটা লাল পতাকায় মোড়া। আমার মনে হচ্ছিল, চতুর্দিকে থকথকে রক্ত। এক সঙ্গে বেশি লাল রং কি মানুষের চোখে সহ্য হয়? কোনও শিল্পী তো এত লাল রং ব্যবহার করে না!

এবার আমি আর একটু অবাক হলাম। এ মেয়েটির শুধু রূপই নেই, নানা বিষয়ে চিন্তাও করে। রূপসি মাত্রই বোকা হবে, এ ধারণাটাও অবশ্যই ভুল।

খুব বেশি দূর যেতে হল না। ট্যাক্সি এসে থামল একটা বড় বাড়ির সামনে। মিশেল একটা ফ্ল্যাটের দরজার তালা খুলে আমাদের বলল, এসো!

রেডিও পরিচালক পিয়ের যে মিশেলের বন্ধু, তা ওদের ব্যবহার দেখলেই বোঝা যায়। এই বন্ধুত্বও খানিকটা বিচিত্র। পিয়েরকে মোটেই সুপুরুষ বলা যায় না, মাঝারি আকারের মোটাসোটা ধরনের মানুষ। অন্যমনস্ক অধ্যাপকের মতন তার পোশাকও বেশ অগোছালো। রেডিয়োতে কাজ করে সে কতই বা মাইনে পায়? এই চোখ ধাঁধানো সুন্দরী তার বান্ধবী হল কী করে?

অ্যাপার্টমেন্টটাও খুব দামি। সোফা-সেটগুলি অ্যান্টিক, কয়েকটি অপূর্ব পাথরের মূর্তি সাজানো হয়েছে, দেওয়ালে ঝুলছে দুটি আসল মাতিস ও পিকাসো।

মিশেল ভেতরে চলে যেতেই পিয়ের আমাদের অনেক কিছু খুলে বলল। এই অ্যাপার্টমেন্টটা মিশেলের দ্বিতীয় স্বামীর। তার এই দ্বিতীয় স্বামী একজন ধনী ব্যবসায়ী। তার বয়েস আটাত্তর। ব্যাবসার কাজে তাকে প্রায়ই ইংলন্ড ও আমেরিকায় থাকতে হয়। সেই বৃদ্ধ সমাজে মিশেলকে তার স্ত্রী বলে পরিচয় দিলেও মিশেলকে সে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছে। মিশেলের ছবি আঁকার ব্যাপারে তার অঢেল প্রশ্রয় আছে এবং এই সূত্রে মিশেলকে যে অনেকের কাছে যাতায়াত করতে হয়, তাতেও তার আপত্তি নেই। পিয়েরের মতন আরও দু-একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে মিশেলের, সেটা তার স্বামী জেনেও না জানার ভান করে।

এসব শুনে মিশেলের অনুপস্থিত স্বামীর সম্পর্কে আমার বেশ শ্রদ্ধাই হল। লোকটি মোটেই সাধারণ ধনীদের মতন নয়। সে এই সুন্দরীকে কুক্ষিগত করে রাখেনি!

প্রায় গোটা দশেক ক্যানভাস ও চোদ্দ-পনেরোখানা ছবি ভেতর থেকে নিয়ে এল মিশেল। তারপর একেবারে উদীয়মান শিল্পীদের মতন লাজুকভাবে হেসে বলল, আমি মাত্র দু’বছর ধরে ছবি আঁকছি। এখনও কিছুই শিখিনি বলতে গেলে। তোমাদের কেমন লাগবে জানি না।

সুপ্রিয় জিগ্যেস করল, মাত্র দু’বছর? আগে তুমি কী করতে?

মিশেল বলল, আগে আমি সিনেমায় অভিনয় করতাম, জানো না? তুমি আমার কোনও ছবি দেখনি?

এবার আমার কাছে একটা রহস্য উন্মোচিত হল। এই জন্যই প্রথম থেকেই মিশেলকে খানিকটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। শুটিং-এর সময় বহুক্ষণ কড়া আলো পডে অভিনেত্রীদের মুখের চামড়া একটু অন্যরকম হয়ে যায়। তাদের তাকানো, তাদের দাঁড়ানোও অন্যরকম। কথা বলার মধ্যে ঠিক ঠিক পজ এবং থ্রো থাকে। এগুলিকে আমি ঠিক কৃত্রিম বলে খাটো করতে চাই না, সব শিল্পীই তো কৃত্রিম, কবিতা-ছবি-গান সবই  তো অতিরঞ্জনের সুষমা।

মিশেল বহু নামকরা পরিচালক, যেমন ত্রুফো, গদার, রেনে’র ছবিতেও অভিনয় করেছে। নায়িকা নয়, পার্শ্বচরিত্র।

মিশেল নিজেই হাসতে-হাসতে বলল, আমার নিশ্চয়ই অভিনয় প্রতিভা নেই। তাই পরিচালকরা আমার শরীরটাকে বেশি করে দেখাতে চাইত। বৃষ্টিভেজা, জলে সাঁতার কাটা, চলন্ত মোড়া থেকে পড়ে যাওয়া, এইসব দৃশ্য যে আমি কতবার করেছি! আর কত সব অদ্ভুত অদ্ভুত পোশাক, বিচ্ছিরি, কিন্তু আপত্তি জানাবার উপায় নেই। তারপর একদিন দূর ছাই বলে ছেড়ে দিলাম! আরও কেন ছাড়তে ইচ্ছে হল জানো, অন্তত পাঁচখানা ছবিতে আমাকে মৃত্যুদৃশ্যে অভিনয় করতে হয়েছে। বন্দুকের গুলি খেয়ে, ছুরি খেয়ে, এগারোতলা বাড়ি থেকে ঝাঁপিয়ে আমি খালি মরছি! তা একদিন ঠিক করলাম, আমি আর মরতে চাই না। আমি অন্যরকমভাবে বাঁচব! ছেলেবেলা থেকেই ছবি ভালো লাগে, শিল্পীদের ভালা লাগে, তাই ভাবলাম, আমি এদের সঙ্গে মিশব।

পিয়ের বলল, সিনেমা ছেড়ে এসে প্রথম প্রথম মিশেল অনেক শিল্পীর মডেল হয়েছে। অনেকেই মিশেলের ছবি এঁকেছে, তার মধ্যে দুটি ছবি বেশ বিখ্যাত হয়েছে। আমিই প্রথম মিশেল-এর নিজের আঁকা ছবি দেখে বলেছিলাম, তুমি নিজেই তো বেশ আঁকতে পারো, তা হলে তুমি শুধু শুধু মডেল হয়ে সময় নষ্ট করছ কেন?

মিশেল বলল, আমি নিজে যখন ছবি আঁকা শুরু করলাম, তখন কিন্তু অনেক শিল্পীই তা পছন্দ করেনি। অনেকেই আমার ছবি দেখে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে।

আমি বললাম, বার্থ মরিসো!

মিশেল বলল, ও লালা! তুমি বার্থ মরিসোর নাম জানো? একজাক্টর্ম!

সুপ্রিয় বলল, বার্থ মরিসো মিশেলের মতনই সুন্দরী ছিল। এদুয়ার মানে তাকে মডেল করে বেশ কয়েকখানা ছবি এঁকেছেন। তারপর বার্থ মরিসো নিজেই যখন ছবি আঁকতে শুরু করল, মানে তখন তা ঠিক মেনে নিতে পারেননি। মরিসো’র ছবির প্রদর্শনী সময় মানে আপত্তি জানিয়েছিলেন। একবার মানে মরিসোর একটা ছবিকে ভালো করে দেওয়ার জন্য তার ওপর তুলি চাপিয়ে সেটাকে কদাকার করে দিয়েছিলেন।

পিয়ের বলল, বার্থ মরিসো কিন্তু বরাবর মানে-কেই ভালোবাসত। শ্রদ্ধা ও প্রেম দুটো মিশিয়ে অর্ঘ্য দিত সেই শিল্পীকে। মানে বিবাহিত বলে বার্থ মরিসো বিয়ে করেছিল মানে’র ছোট ভাইকে, যদিও আরও অনেকেই বার্থ মরিসোকে বিয়ে করতে চেয়েছিল।

আমি বললাম, শেষ পর্যন্ত বার্থ মরিসো নামকরা শিল্পী হয়েছিলেন। ইমপ্রেশনিস্টদের মধ্যে তার বিশিষ্ট স্থান আছে।

মিশেল বলল, তখন যেমন, এখনও তেমনি এরা মহিলা শিল্পীদের দাঁড়াতে দেয় না। অবজ্ঞা করে। মেয়েরা যেন শুধু মডেলই হতে পারে, শিল্পী হতে পারে না। আমি লড়াই করে যাব! আমার প্রতিভা আছে কি না জানি না, কিন্তু সাধনার ত্রুটি রাখব না, দেখব শেষ পর্যন্ত।

এবার তবে ছবিগুলো দেখা যাক।

ছবিগুলো দেখে অবশ্য আমার বিস্ময় জাগল না। আগে যা ভেবেছিলাম, তাই। আমি ছবি তেমন বুঝি না, কিন্তু কোনও কোনও ছবি দেখলে মনে একটা আবেগের ঝাঁপটা লাগে। অনেক ছবি নিখুঁত কিন্তু মনে দাগ কাটে না। আবার কোনও ছবির সামনে দাঁড়ালেই মনে হয়, সত্যিকারের নতুন কিছু দেখছি রং, রেখা ও আয়তন নিয়ে খেলা করেছে কোনও মহৎ আঙুল।

মিশেলের ছবিগুলো ছেলেমানুষের আঁকা নয়। ফিগার ড্রয়িং সে জানে। মানুষ ও গাছপালা সে ঠিকঠাঁক আঁকে। রঙের ব্যবহার চোখকে পীড়া দেয় না। আপাতদৃষ্টিতে তার ছবিগুলিকে মনে হয় সুন্দর। শুধুই সুন্দর! তার বেশি কিছু না।

আমরা এক একটা ছবি দেখছি আর বলছি, বাঃ, চমৎকার! অপূর্ব! দারুণ! এই ছবিখানা একসেলেন্ট!

এরকমই বলতে হয়। একজন শিল্পী, তার ওপর রূপবতী নারী, সামনে বসে নিজের ছবি দেখাচ্ছে, তখন কি অন্য কথা বলা যায়?

সব শেষ হওয়ার পর মিশেল জিগ্যেস করল, এবার সত্যি করে বলো তো, কেমন লেগেছে। আমাকে খুশি করার জন্য প্রশংসা করার দরকার নেই। আমি প্রশংসা এ জীবনে অনেক শুনেছি।

আমি কথা ফেরাবার জন্য বললাম, একটা প্রশ্ন করতে পারি? তোমার এত ছবির মধ্যে মাত্র তিন-চারখান ল্যান্ডস্কেপ। আর সব কটাই কোনও মেয়ের ছবি। ন্যুড স্টাডি। তুমি নিজে একজন মহিলা শিল্পী হয়ে শুধু মেয়েদের নগ্ন মূর্তি এঁকেছ কেন?

মিশেল আমার প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে পারল না, সম্ভবত আমার ভাষার দোষেই। সে ভুরু তুলে বলল, কেন? আমি অন্য মেয়েকে মডেল করে ন্যুড এঁকেছি। আঁকা ঠিক হয়নি?

আমি বললাম, তুমি মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাও। শিল্পজগতে নিজের স্থান করে নিতে চাও। তবু তুমি নগ্ন নারী আঁকবে কেন?

মিশেল বলল, নগ্ন নারী আঁকব না? কেন বলো তো?

আমি বললাম, এটা কি পুরুষদের অনুকরণ নয়? সব পুরুষরাই নগ্ন নারী আঁকে! তাদের মতে রমণী শরীরই সৌন্দর্যের আধার। একজন রমণীর নিশ্চয়ই সেরকম মনে হবে না। মেয়েরা নিশ্চয়ই পুরুষদের শরীরের গড়নে সেইরকম সৌন্দর্য খোঁজে।

মিশেল হো হো করে হেসে উঠে বলল, ও বুঝেছি! তুমি বলতে চাও, মেয়েদের বদলে আমার নগ্ন পুরুষদের আঁকা উচিত? যাঃ, তা আবার হয় নাকি!

আমি বললাম, কেন হয় না? তুমি নারীদের অধিকার সম্পর্কে সজাগ। এই পুরুষশাসিত সমাজে সমস্ত পণ্যের বিজ্ঞাপনে, ফিলমের পোস্টারে, এমনকি শিল্প সাহিত্যেও নারীকে শরীরসর্বস্ব করে দেখানো হয়। তুমি মেয়ে হয়েও তা করবে কেন? আমার তো মনে হয়, কোনও মহিলা শিল্পীর পক্ষে পুরুষদের শরীর আঁকাই স্বাভাবিক।

সুপ্রিয় আর পিয়ের দুজনেই কিছু বলতে যাচ্ছিল, তাদের বাধা দিয়ে বললাম, আমি মিশেলের বক্তব্যটাই জানতে চাই।

মিশেল বলল, এই যে নারীমূর্তিগুলি এঁকেছি তা আসলে নারী হিসেবে আঁকিনি, গাছ পাহাড়-নদীর মতনই একটা শিল্পের বিষয়বস্তু। বহু শতাব্দী ধরে পশ্চিমের শিল্পীরা নগ্ন নারীমূর্তি এঁকেছে, নুড স্টাডি এখন শিল্পের ট্র্যাডিশানের অঙ্গ। যে কোনও শিল্পীকেই বারবার এই স্টাডি করতে হয়। নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে নিরাবরণ নারী যে আঁকতে পারে না, সে যেন শিল্পীই নয়। তার শিল্পজগতে প্রবেশের যোগ্যতা নেই। পুরুষমূর্তি নিয়ে এরকম আঁকার যে ট্র্যাডিশন নেই।

আমি মিশেলের কথা ঠিক মেনে নিতে পারলাম না। পুরুষের হাতে বহু নারী-সৌন্দর্য অমর হয়েছে। কোনও মেয়ের তুলিতে পুরুষ-সৌন্দর্য মর্যাদা পাবে না কেন? একটি মেয়ে যদি পুরুষ মডেল নিয়ে নানারকম স্টাডি করে, তবে সেটাই তো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার বলে গণ্য করা উচিত।

মিশেল আবার আপন মনে বলল, শুধু ছবি আঁকলে তো হয় না, তার মধ্যে একটা জীবন-দর্শনের প্রতিফলন চাই। শুধু ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়, তার মধ্যে মেশাতে হয় নিজের আত্মা। আমি আমার জীবনদর্শনটাই খুঁজে পাচ্ছি না। ভারতীয় দর্শনের কথা আমি একটু একটু শুনেছি, কিন্তু ঠিক বুঝিনি। আরও ভালো করে জানতে হবে। আচ্ছা, ভারতীয় দর্শন যাকে বলে, আধুনিক ভারত কি সেই অনুযায়ী চলে?

আমি একটুক্ষণ চুপ করে থেকে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, না।

মিশেল বলল, ভারতেও মারামারি, কাটাকাটি, স্বার্থের লড়াই, এই সবই আছে?

আমি দুদিকে মাথা নাড়লাম। রেডিয়োর লোক হিসেবে পিয়ের ঘোষণার সুরে বলল, ভারত দু’দুটো যুদ্ধ করেছে, সীমান্তে প্রচুর সৈন্য রাখে। বুদ্ধ কিংবা গান্ধির অহিংসার বাণী এখন শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ।

মিশেল আমাকে জিগ্যেস করল, তুমি কলকাতা থেকে এসেছ। কলকাতায় অনেক মানুষ, তাই না?

আমি বললাম, হ্যাঁ, প্রচুর মানুষ, সব সময় পথে পথে মানুষ গিসগিস করছে, প্রতিদিন শিয়ালদা স্টেশনে যত লোক নামে, নরওয়ে-ডেনমার্কের মতন দেশগুলোতে জনসংখ্যাই তার চেয়ে কম।

মিশেল কলকাতা সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ নয়। বলল, আমি জানি, তোমাদের দেশবিভাগ হয়েছে, তারপরেই কলকাতার জনসংখ্যা খুব বেড়ে গেছে। লক্ষ লক্ষ রেফিউজি এসেছে। রেফিউজিদের কী কষ্ট তা আমি জানি। আমি নিজে এক সময় রেফিউজি ছিলাম।

পিয়ের পর্যন্ত সচকিত হয়ে উঠল। এ খবর তারও অজানা। সে জিগ্যেস করল, তুমি আবার কবে রেফিউজি ছিল, মিশেল?

মিশেল বলল, আমার বাবা ফ্রেঞ্চ, মা ছিলেন ইতালিয়ান। আমরা ইতালিতেই থাকতাম। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় আমাদের ইতালি ছেড়ে পালাতে হয়। চতুর্দিকে বোমা পড়ছে, তার মধ্যে আমরা ট্রেনে চেপে পালাচ্ছিলাম স্পেনের দিকে। মাঝপথে ট্রেন থেমে গেল, তখন আমরা পায়ে হেঁটেছিলাম অনেকটা, আমার তখন চার-পাঁচ বছর বয়েস, তবু স্পষ্ট মনে আছে। বাবা মারা গেল পথেই, তিনটি ছোট-ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে মা আশ্রয় নিল একটা ফাঁকা রেলওয়ে প্লাটফর্মে। তিন চারদিন আমরা প্রায় কিছুই খেতে পাইনি। তখন ওই বয়েসেই বুঝেছিলাম, মানুষের ব্যবহার কত হিংস্র হতে পারে। তারপর লিবারেশানের সময় আমরা কী সাংঘাতিক কষ্ট করে যে ফ্রান্সে পৌঁছেছিলাম, তা তোমরা

শুনলেও বিশ্বাস করতে পারবে না। পরবর্তী কালে মা যতবার সেই ঘটনা বলতে গেছে, অমনি ঝরঝর করে তার চোখ দিয়ে জল ঝরেছে।

কথা বলতে-বলতে মিশেলের স্বর গাঢ় হয়ে এল, চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল অশ্রুবিন্দু। সিনেমার অভিনেত্রী কিংবা জাঁহাবাজ সুন্দরী নয়। মিশেলকে এখন মনে হল খুব চেনা একজন মানুষ।