২২. মোটর গাড়ির অসুখ

মোটর গাড়ির তো প্রায়ই নানারকম অসুখ দেখা যায়, কিন্তু মোটর গাড়ি যাদের থাকে, তাদেরও অনেকের মোটর গাড়ি সংক্রান্ত অসুখ কম থাকে না। গাড়ি ধ্যান, গাড়ি জ্ঞান, গাড়ির দুঃখে দুঃখী। জার্মানিতে পাউলভাকের নামের একটি লোক দুর্দান্ত গতিতে তার প্রেয়সীকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তারপর থামল এসে একটা দোকানের সামনে একটু ফলের রস খেয়ে নেবে। প্রেয়সীকে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে একা এল দোকানের সামনে, খুশির আড়চোখে তাকাতে লাগল প্রেয়সীর দিকে।

রহস্য না করে বলে দেওয়াই ভালো, পাউলভাকের-এর প্রেয়সী এক্ষেত্রে কোনও মেয়ে নয়। একটি নতুন চকচকে মোটর গাড়ি। পাশেই একটা গ্যাস স্টেশন বা পেট্রোল পাম্প –সেখানকার কর্মী জোসেফ বেইনেরট কথায়-কথায় জিজ্ঞাসা করল,–

গাড়িটা আপনার?

পাউলের উত্তর : হ্যাঁ। নতুন কিনলাম। কেমন গাড়িটা?

বেইনেরট : বাজে। ওগুলো বাজে গাড়ি।

–কী?

কথায়-কথায় তর্ক শুরু হয়ে গেল। প্রেয়সীর অপমান। পাউল ঝট করে পকেট থেকে পিস্তল বার করে সঙ্গে-সঙ্গে গুলি করল বেইনেরটকে এবং তৎক্ষণাৎ মৃত্যু।

জার্মানিতে গাড়িপ্রেম এতই বেশি যে এ-রকম ঘটনা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। তার প্রমাণ, পাউলের লঘু শাস্তি। বিচারে পাউলের মাত্র দুবছর সাত মাস জেল হয়েছে। অভিযোগ প্ররোচনার ফলে মানুষ খুন। আদালতে পাউল বলেছিল, আমি আমার মারসিডিজ গাড়িটাকে ভালোবাসি। ওর শরীরে সামান্য আঘাত পেলে, আমি নিজের শরীরে আঘাত পাই। ওকে কেউ অপমান করলে আমি সহ্য করতে পারি না।

আমেরিকাতে সেরা উইনকিনস নামে একটি মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, তাকে আমি মোটর গাড়ির সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বিরাট থানার বার্ড গাড়িখানার কাছে ছুটে যায়, নিজে সারা গাড়িটাকে ধুয়ে মুছে চকচকে করে। আবার রাত্তিরে শুতে যাওয়ার আগে গাড়ির স্টিয়ারিং-এ চুমু খেয়ে আসে।

সেরা উইলকিনসের ছেলে বন্ধুর নাম রয় রর্জাস। ওদের বিয়ে ঠিকঠাক, পি এইচ ডি র ডেসারটেশানটা হয়ে যাওয়ার পরই বিয়ে হয়ে যাবে। হঠাৎ শুনলাম ওদের বিয়ে ভেঙে গেছে। কারণ খুবই সামান্য, রয় রজার্স সেরা উইকিনসের থানবাড়ার বার্ড নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিল, ড্রাইভ-ইন সিনেমায় গাড়ি পার্ক করতে গিয়ে সামান্য দুর্ঘটনা হয়। গাড়ির কিছুই ক্ষতি হয়নি প্রায়, মাডগার্ডের দু-একটা চলটা উঠে গেছে, রজার্সের হাতে সামান্য চোট লেগেছে। রজার্সের যা হচ্ছে হোক, গাড়ির রূপ নষ্ট হওয়ার জন্য রাগ করে সেরা বিয়ে ভেঙে দেয়। গরের মাসেই সেরার বিয়ে হয়ে যায় অন্য ছেলের সঙ্গে।

শিকাগোতে আমার প্রতিবেশী একজন বিজ্ঞানের অধ্যাপক। প্রগাঢ় পান্ডিত্য, উন্নত চরিত্রবান, সহৃদয়–ওঁর গাড়িতে প্রায়ই আমায় লিফট দিতে চাইতেন। অমন চমৎকার লোক, কিন্তু ওঁর গাড়িতে চড়ার নাম শুনলেই আমি পালিয়ে-পালিয়ে বেড়াতুম। অন্য সময় তিনি কত বিষয়ে কত জ্ঞানের কথা বলতেন। কিন্তু গাড়িতে উঠলেই শুধু গাড়ির কথা। এই গাড়ি কত হাজার মাইল ছুটেছে, কত বিপদসংকুল পথ তিনি এ গাড়িতে পার হয়েছেন–সেসব গল্প নয় মোটেই। গাড়িতে উঠলেই ওঁর মুখ চোখ বদলে যায়, সজাগ উৎকর্ণভাবে বলতে থাকেন, আচ্ছা, গিয়ার বদলাবার সময় একটা শব্দ হোল না? জানালার কাঁচটা নড়ছে নাকি? ওয়াইপারটা মনে হচ্ছে একটু ধীরে হয়ে গেছে। পেছন দিক থেকে একটা কিচকিচ কিচকিচ শব্দ হচ্ছে। শোনো তো কান পেতে শোনো তো। এসব শুনতে-শুনতে আমার কান ঝালাপালা।

ফ্রাংক অরড একজন ইংরেজ। কী প্রাণবন্ত, উদার ছেলে, আমাদের সঙ্গে বিষম বন্ধুত্ব। ফ্রাংকের টুকটুকে লাল রং-এর মোটর গাড়ি। এক শনিবার আমরা ঠিক করলুম, উইনডগর, প্যালেস দেখতে যাব, আমরা চারজন বাঙালি বন্ধু আর ফ্রাংক। ফ্রাংক ওর গাড়িতে নিয়ে যাবে। কিন্তু অবাক কান্ড করল ফ্রাংক। যাওয়ার মুহূর্তে ও বলল তোমরা চারজন? কিন্তু আমার গাড়িতে তো আমি সবশুদ্ধ চারজনের বেশি নিয়ে যাই না। চারজনের বেশি হলে ওর কষ্ট হবে, বুঝলে। তিনজন আমার গাড়িতে এসো, আর একজন ট্রেনে চলে যাও।

আমি ওর কাঁধে চাপড় মেরে বললুম, কী বলছে। আমরা একটা গাড়িতে এর আগে আট-দশজন পর্যন্ত চেপেছি। কী হবে। একজন কখনও আলাদা যেতে পারে? তোমার এমন চমৎকার গাড়ি।

ফ্রাংক নিরেট মুখ করে বলল, না ভাই, চারজনের বেশি নিলে আমার গাড়ির কষ্ট হয়। আমি ফিল করি। তোমরা একজন আলাদা যাও।

বলাবাহুল্য, সেবার আমরা ফ্রাংকের গাড়িতে যাইনি। এসব অসুখ ছাড়া কি? অন্যান্য বহু রোগের পর এখন মোটর গাড়ির অসুখ। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি গাড়ি আছে আমেরিকান, কত লোকের গাড়ি আছে সে কথা না বলে শুধু বলাই যথেষ্ট যে, এক পরিবারেই দুটি বা তার বেশি মোটর গাড়ি আছে, এরকম পরিবার সংখ্যাই ওদেশে এগারো মিলিয়ন। মোটর গাড়ি ছাড়া এক পা বেরুতে পারে না–এমন নারী পুরুষ ওদেশে অসংখ্য। হেঁটে গেলে বড় জোর দু-মিনিটের রাস্তা, তবু একখানা চিঠি পোস্ট করতে হলেও মোটর গাড়ি বার করেন।

মোটর গাড়ির সংখ্যায় আমেরিকার পরই দ্বিতীয় স্থান পশ্চিম জার্মানির (৮,৭০০,০০০) এবং অনেকেই নিজের নিজের গাড়ির একটা আলাদা নাম রাখে। টেলিফোনে একটি জার্মান ছেলে তার বান্ধবীকে হয়তো বলছে, আজ যেতে পারবো না ডিয়ার, আমার সুসির আজ অসুখ। এ কথা শুনলে অন্য লোকের চমকে যাওয়ার কথা। কিন্তু সুসি ওর মোটর গাড়ির নাম, সেই রকমই মাউসি কোটে, হানসেন ইত্যাদি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জার্মান পুরুষদের গাড়ির প্রতি প্রেম এত বেশি যে, ৬০% পুরুষ নিজেই নিজের গাড়ি ধোয়ামোছা করে, এদের মধ্যে ৫৭% প্রতি সপ্তাহে বা প্রতিদিনে একবার।

স্নানের চূড়ান্ত হচ্ছে সাবান-স্নান। রোমের সাম্রাজ্ঞীরা যেমন সাবানের ফেনায় ডুবে থেকে স্নান করতেন জার্মান পুরুষেরা তাদের গাড়িকেও সেইরকম স্নান করাতে চায়। প্রতি শনিবার পথে-পথে অসংখ্য সভ্য শিক্ষিত জার্মান পুরুষকে দেখা যাবে, হাতে গুড়ো সাবানের প্যাকেট কিযে ফিরছেন। কারণ রবিবার সকালে বালতিতে সাবানের ফেনা গুলে নিজের মোটরগাড়িকে স্নান করাবেন।