২৩. প্রথম দার্জিলিং যাই

আমি প্রথম দার্জিলিং যাই স্কুল-বয়সে।

তখন দেশ স্বাধীন হয়েছে বটে, কিন্তু দার্জিলিং তখনও প্রায় সাহেবি শহর। চা বাগানের মালিক ও ম্যানেজারেরা সব সাহেব। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সংখ্যাও ছিল অনেক, অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে সাহেবদের তফাত বুঝতাম না আমরা। উচ্চবিত্ত বাঙালিরা কখনও সপরিবারে হাওয়া বদলাবার জন্য দার্জিলিং-এর হোটেলে কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসবেন। কিছু কিছু বাড়িও ভাড়া পাওয়া যেত। গরিব বাঙালিদের কাছে দার্জিলিং ছিল স্বর্গের মতন স্বপ্নের দূরত্ব।

আমি গিয়েছিলাম বয়েজ স্কাউট হিসেবে। খাকি হাফ প্যান্ট ও সাদা হাফ শার্ট, পায়ে নটি বয় সু, গলায় বাঁধা নীল স্কার্ফ। তখনও গোঁফের রেখা গাঢ় হয়নি। দেশ ভাগ হয়ে গেছে বলে সারাব্রিজ আর ব্যবহার করার উপায় ছিল না আমাদের তাই তখন দার্জিলিং যাওয়াটাই ছিল বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চারের ব্যাপার। তিন রকমের ট্রেন। প্রথম বড় ট্রেনে শিয়ালদা থেকে সাহেবগঞ্জ কিংবা শকরিকালি ঘাট। তারপর ঢাউস স্টিমার। ফারাক্কা বাঁধ তো দূরের কথা, উত্তর ভারতে অনেক বাঁধই তখনও হয়নি, গঙ্গায় জল ছিল অনেক, নদীগুলি ছিল ঠিক নদীরই মতন। বড় মনোহর ছিল এই জলযাত্রা। ওপারের মনিহারি ঘাটে স্টিমার ভেড়বার আগেই যাত্রীদের মধ্যে দেখা যেত বিশেষ চাঞ্চল্য। থামা মাত্রই টপাটপ বালির ওপর লাফিয়ে পড়ে সবাই মিলে দৌড় প্রতিযোগিতা। খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকত ফাঁকা ট্রেন, কিন্তু তাতে রিজার্ভেশানের ব্যবস্থা ছিল না, সুতরাং যে আগে উঠে জায়গা দখল করতে পারে।

এবারে মিটার গেজ। আমরা জানলা দিয়ে উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে থাকতাম, কখন পাহাড় দেখব! কিছুই দেখা যেত না। আবার এক সময় মালপত্র বয়ে নিয়ে ন্যারো গেজের ট্রেনে ওঠা সে ট্রেন যেন খেলনা গাড়ি। আমরা তখন কলকাতার আশপাশেই মার্টিন কোম্পানির এই রকম ট্রেন দেখেছি অনেকবার, অবিকল কু ঝিকঝিক কু ঝিকঝিক আওয়াজ, ঠিক গল্পের বইয়ের মতন। অনেক ছেলে এই চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে খানিকটা দৌড়ে আবার উঠে পড়ে। দুজন লোক ইঞ্জিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, ট্রেন চলার সময় তারা অনবরত সামনের লাইনে বালি ছড়ায়। ওই লোক দুটির চাকরি খুব লোভনীয় মনে হয়েছিল।

দেওঘর-মধুপুরে এর আগে ছোট ছোট পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতা ছিল। খুদে ট্রেনে চুনভাটি পর্যন্ত ওঠার পরেই বুঝতে পেরেছিলাম, আসল পাহাড় কাকে বলে! এ যেন পাহাড়ের সমুদ্র। যতদূর চোখ যায় ঢেউয়ের পর ঢেউ। এত সবুজ আগে কখনো একসঙ্গে দেখিনি। একদিকে খাদ বা উপত্যকা, অন্যদিকে জঙ্গলের দেয়াল। কী নিবিড় বন, দিনের বেলাতেও অন্ধকার! আমরা শুনেছিলাম প্রায়ই জঙ্গল থেকে হাতিরা বেরিয়ে এসে লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ট্রেন তখন থেমে পড়ে করুণভাবে সিটি দেয়। সেই হাতির পাল মর্জি মতন কতক্ষণ বাদে সরে যাবে, তার কোনও ঠিক নেই। হায়, সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জনের সৌভাগ্য আমাদের হল না।

কার্শিয়াং টুং
সোনাদা, ঘুম!

কার্শিয়াং পেরুবার পরেই আমরা ছড়ার মতন এই নামগুলো আবৃত্তি করি! এক একটা রূপকথার মতন স্টেশান। মানুষজন প্রায় দেখতেই পাওয়া যায় না। রাস্তার ধারে দু-একটা ফরসা ফরসা ছেলেমেয়ে অবাক চোখে চেয়ে থাকে। আমার সব সময়েই মনে হচ্ছিল, সব কিছুই যেন গল্পের বইতে পড়া জগতের মতন।

মাঝে-মাঝে ইলশেগুড়ি বৃষ্টি ও রোদের খেলা চলছিল, সোনাদা পেরুবার পরই হঠাৎ রাশি-রাশি মেঘ এসে ঢুকে পড়ল ট্রেনের কামরায়। দার্জিলিং-এ ঘরের মধ্যে মেঘ ঢুকে পড়ে, এ রকম আমরা শুনেছিলাম আগেই, কিন্তু চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আমরা ছুটোছুটি করে সেই মেঘ ধরায় চেষ্টা করতে লাগলাম। ক্রমে মেঘ এমনই জমাট হল যে আর কিন্তু দেখা যায় না। একদা রাজকুমাররা পক্ষীরাজ ঘোড়ায় উড়ে চলে যেত মেঘের রাজ্যে, আর আমরা কিশোর বয়েজ স্কাউটরা টয় ট্রেনে মেঘ ভেদ করে যাচ্ছি।

ঘুম নামটার মধ্যেই এক অদ্ভুত আমেজ আসে। হয়তো শব্দটা বাংলা নয়, এর অন্য মানে আছে, তবু একটা জায়গার নাম ঘুম শুনলেই সেই জায়গাটিকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি সেদিন হাঁ করে মেঘ খাচ্ছিলাম।

এই রাস্তায় ঘুমই সবচেয়ে উঁচুতে, তারপর আবার উয়াই। একটু পরেই যেন এক ফুয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল সব মেঘ। ঝকঝকে রোদে ফুটে উঠল পাহাড়, জঙ্গল। কোথাও বৃষ্টির লেশমাত্র নেই লাইনের ওপর কয়েকটা পাথর পড়েছে বলে থেমে গেল ট্রেন। আসলে, ওই পাথরগুলি যেন ট্রেনটাকে থামতে বাধ্য করেছিল আমাদেরই জন্য। আমরা হুড়মুড় করে নেমে পড়লাম কামরা থেকে। সামনেই একটা গভীর উপত্যকা, তার উল্টো দিকের আর একটি পাহাড়ের গায়ে দার্জিলিং এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। যেন সোনা দিয়ে বাঁধানো একটি ছবি। যেন অমরাবতী! বুক দুরদুর করছিল, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, মহান সুন্দরের সেই বিভা যেন সমস্ত উপভোগের শক্তিকে ছাড়িয়ে যাবার মতন।

অল্প বয়সে চোখ দুটি ছোট থাকে সমস্ত কিছুকেই বেশি বড় বড় দেখায়। সেই সময়ে কুশ্রীতা-কদর্যতার দিকে চোখ পড়লেও মনে দাগ কাটে না, সুন্দর, মধুরের অভিজ্ঞতাই মনে ছাপ ফেলে যায়।

যতদূর মনে পড়ে সেই প্রথম দেখা দার্জিলিং ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও নয়নাভিরাম শহর। ভিড় খুব কম, সব দিকই ফাঁকা। পাহাড়ের পটভূমিকায় এই নির্জনতাই ছিল আসল সৌন্দর্য। পর্যটকদের জটলা ছিল শুধু ম্যালে। একদিন ঘোড়ায় চড়তে গিয়ে এক ঘণ্টার জন্য ভাড়া নিয়ে দুই বন্ধু বেরিয়ে পড়েছিলাম। খানিকটা পরে দু’জনে বিচ্ছিন্ন হয়ে পথ হারিয়ে ফেললাম। এক সময় দেখি, কোথাও কোনও জন-মনুষ্য নেই, আমার ঘোড়ার পায়ের কপাৎ কপাৎ শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দও নেই, রীতিমত গা ছমছম করছিল। সেও তো মোহময় ভালো লাগা।

আমরা যেখানে উঠেছিলাম, সেটি একটি পুরোনো আমলের হোটেল হলেও, নাম স্যানাটোরিয়াম। এই নামটা শুনলেই টি বি রোগের কথা মনে পড়ে। সে আমলে টি বি-ই ছিল রাজরোগ, ক্যান্সার হার্ট অ্যাটাক তেমন পাত্তা পেত না। তবে কি আমরা যক্ষ্মারোগীদের খাট বিছানায় শুচ্ছি? এই চিন্তায় আমাদের স্কাউট মাস্টাররা খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। পরে অবশ্য জেনেছি, যক্ষ্মারোগের সম্পর্ক ছাড়াও যে-কোনও স্বাস্থ্যনিবাস বা আরোগ্য নিকেতনকেই স্যানাটোরিয়াম বলে। যাই হোক, আমাদের দাদা শ্রেণি অভিভাবকরা বলে দিয়েছিলেন যে আমরা যেন খবর্দার বাইরে কোনও খাবার না খাই। দার্জিলিং-এ খুব টি বি রোগের উৎপাত!

দার্জিলিং খুব স্বাস্থ্যকর জায়গা। অসুস্থ ব্যক্তিরা এখানে আসে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য। অথচ এখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা নাকি খুব রোগে ভোগে, অধিকাংশেরই টি বি আছে। এখানকার নেপালিদের বেশ ফুটফুটে সুন্দর চেহারা, নানান রকম রঙিন জামা কাপড় পরে থাকে, তবু তাদের টি বি কেন? এরা পরিশ্রম করে বেশি সেই তুলনায় ঠিক মতন খেতে পায় না, তাই তাদের ক্ষয় রোগ ধরে যায়। এখানকার কুলি রমণীদের দেখেছি মাথায় দড়ি বেঁধে দু-চারটে বাক্স-প্যাঁটরা বয়ে নিয়ে পাহাড়ি রাস্তা ধরে হাঁপাতে-হাঁপাতে ওঠে।

বাস, দার্জিলিং-এর নেপালিদের সম্পর্কে শুধু ওইটুকুই জানা গিয়েছিল সেবারে।

দার্জিলিং কার?

কোনও এক সময় লেপচারাই ছিল এখানকার অধিবাসী। তারপর প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে তারা অনেক পিছিয়ে পড়েছে। এখন তাদের প্রায় খুঁজেই পাওয়া যায় না। লেপচাঁদের মধ্যে বেশ কিছু অংশ এখন ক্রিশ্চিয়ান হয়ে গেছে, পূর্ব গৌরব স্মরণ করে তারা মাঝে-মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

দার্জিলিং শহরটি নির্মাণের কৃতিত্ব তো ইংরেজদের বটেই, এই জেলাটারও পত্তন করে সেই সাহেবরাই। ইংরেজরা পা দেবার আগে এই জঙ্গল-ঢাকা পাহাড়গুলিতে জনবসতি ছিল নগণ্য, এই এলাকা ছিল পশু পাখিদের নিশ্চিন্ত লীলাভূমি। প্রগাঢ় নির্জনতার মধ্যে খুব সম্ভবত অপ্সরা ও কিন্নরেরা এখানে গোধুলিবেলায় খেলা করতে আসত।

কাগজে কলমে এই অঞ্চল ছিল সিকিম রাজাদের অধীনে। গত শতাব্দীতে সিকিমের সঙ্গে নেপালের ঝগড়া-মারামারি লেগে যেত যখন তখন। কোম্পানির রাজত্ব তখনও খুব বেশি দূর বিস্তৃত হয়নি, তবে ইংরেজদের সঙ্গে সিকিমের রাজার একটা মৈত্রী চুক্তি ছিল নেপাল বেশি বাড়াবাড়ি করলে ইংরেজরা এগিয়ে গিয়ে সাহায্য করতে সিকিমের রাজাকে। অর্থাৎ নেপালি তিব্বতিদের খুব ঠ্যাঙাত।

সেই রকমই একবার সিকিম-নেপাল সীমান্তে সংঘর্ষের সময় কলকাতা থেকে লর্ড বেন্টিংক তাঁর দুজন প্রতিনিধি পাঠালেন হিমালয়ের এই দিকে। এই দুজন অফিসার হলেন ক্যাপটেন লয়েড এবং মিঃ গ্র্যান্ট।

প্রকৃতিপ্রেম ইংরেজদের মজ্জাগত,-না হলে ওদের মধ্যে অত রোমান্টিক কবির জন্ম হল কী করে? শুধু নিরীহ কবিরা কেন, ইংরেজদের মধ্যে অনেক ডাকাত, খুনে, সুদখোর মহাজনও খুব রোমান্টিক হয় এবং তারাও কবিতা লেখে। (যেমন, স্যার ওয়াল্টার র‍্যাল, মারলো, শেকসপিয়ার প্রমুখ)। অরণ্য ও নিসর্গের প্রতিও ইংরেজরা প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়।

ক্যাপটেন লয়েড এবং মিঃ গ্ল্যান্টের মধ্যে কে বেশি প্রকৃতি প্রেমিক ছিলেন তা বলা শক্ত, সম্ভবত প্রথমজনই। তলোয়ার বন্দুকধারী এই দুই ইংরেজ যুবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা করলেও নগাধিরাজের রূপ দেখে মুগ্ধ হলেন এবং গোখাদের একটি গ্রামে তাঁবু ফেলে একটানা ছটা দিন কাটিয়ে দিলেন নিষ্কর্মাভাবে। চোখের সামনে গগনচুম্বী ধবল পর্বত, চতুর্দিকে সবুজ অরণ্যের সমারোহ, আর নির্মল শীতল বাতাস যেন একেবারে বিলেতের মতন। কলকাতায় গরম, ঘামাচি, ওলাওঠা, ঘোড়ার গাড়ি, ঠেলা গাড়ির ঘর্ঘর আর মধ্যে মধ্যে তোপধ্বনির তুলনায় এই গ্রামটি যেন স্বর্গ।

এই গ্রামটির নামই দার্জিলিং। বর্তমান অবজারভেটরি হিসের ওপর এককালে একটি তিব্বত গুম্ভা ছিল, সেটির নাম ছিল দোরজেলিং, সেই থেকেই স্থানটির নাম এসেছে। লিং মানে জায়গা আর দোরজে শব্দটি বজ্র শব্দের তিব্বতি অপভ্রংশ।

আমাদের এক সংস্কৃত পন্ডিতমশাই অবশ্য বলেছিলেন যে, দার্জিলিং নামটি এসেছে ‘দুর্জয়লিঙ্গ’ থেকে। ওই এক শ্রেণির লোক ছিলেন, যাঁরা মনে করতেন সমস্ত নামই সংস্কৃত শব্দের রুপান্তর এমনকি পারস্য দেশটিও পারা অস্য! অবশ্য ‘দুর্জয়লিঙ্গ’ শব্দটির সঠিক কী অর্থ হয়, তা বোধ হয় ওই পণ্ডিতমশাই ভেবে দেখেননি।

যাই হোক লয়েড, ও গ্রান্টের আমলে মাত্র গোটা কুড়ি স্থানীয় লোকেদের কুঁড়ে ঘর ছিল ওই দার্জিলিং গ্রামটিতে। সেই সময়কার একটি দৃশ্য অনায়াসেই এরকম কল্পনা করা যায়।

তাঁবুর সামনে পাশাপাশি দুটি চেয়ারে বসে আছেন লয়েড এবং গ্রান্ট। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর ঝকঝক করছে আকাশ। সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। ঠান্ডা বাতাস খুব মোলায়েম স্পর্শ দিচ্ছে এই দুই ইংরেজ তনয়ের শরীরে। ছোটো ব্র্যান্ডির পেগে চুমুক দিতে-দিতে লয়েড বললেন, ওহে গ্র্যান্ট, এই জায়গাটা আমাদের হোমের চেয়েও অনেক রমণীয় তাই না? এখানে দু-একটা হোটেল-বাড়ি বানালে হয় না? যাতে কলকাতার ঝাঁঝাঁ রোদ প্যাঁচপেচে বৃষ্টি থেকে পালিয়ে মাঝে মাঝে এখানে এসে থাকতে পারি!

গ্রান্ট বললেন, অতি উত্তম প্রস্তাব। স্থানটি অতি অনবদ্য তাতে সন্দেহ নেই। শরীর ও মন জুড়িয়ে যাচ্ছে একেবারে। কিন্তু একটাই মুশকিল, এই জায়গাটি তো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নয়। এটা সিকিমের রাজার সম্পত্তি।

লয়েড বললেন, নেটিভরা এত মনোরম স্থান নিয়ে কী করবে? ওরা কি এর ব্যবহার জানে? সিকিমের রাজা কোনওদিন এখানে এসেছে? নেটিভরা এই সৌন্দর্যের মর্মই বুঝবে না। সিকিমের রাজার কাছ থেকে এই জায়গাটা কেড়ে নিতে কতক্ষণ লাগবে?

গ্রান্ট বললেন, তার আগে গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিংককে জানানো দরকার।

লয়েড বললেন, কোম্পানির সার্ভেন্টরা কলকাতায় কত রকম রোগে ভোগে। তাদের কিছুদিন এ রকম একটা স্বাস্থ্যকর জায়গায় রাখলে আপনিই শরীর সারবে। বেঙ্গল-এর মধ্যেই যে এমন সুন্দর জায়গা আছে, তা আমরা জানতামই না।….

যেমন কথা তেমন কাজ। কলকাতায় ফিরেও লয়েড ও গ্রান্ট তাদের সংকল্প বিস্মৃত হলেন না। তাঁরা লর্ড বেন্টিংককে বোঝালেন যে দার্জিলিং গ্রামটি একটি চমৎকার স্বাস্থ্যনিবাস তো হওয়া উচিতই, তা ছাড়া সেখানে একটি সামরিক ঘাঁটিও বসানো যেতে পারে। নেপালকেও তো আটকানো দরকার।

কলকাতায় বসে তুষার মাখা পাহাড় আর হিমেল হাওয়ার বার্তাই যেন অবিশ্বাস্য মনে হয়। দার্জিলিং গ্রামটির বর্ণনা পড়ে লর্ড বেন্টিংক আকৃষ্ট হলেন এবং ক্যাপটেন রবার্ট নামে একজন ডেপুটি সার্ভেয়ার জেনারেলকে পাঠালেন জরিপের জন্য। সঙ্গে গেলেন মিঃ গ্রান্ট। বলাই বাহুল্য, ক্যাপটেন রবার্টও জায়গাটি দেখে মুগ্ধ। তাঁর রিপোর্ট গেল কোম্পানির কোট অব ডিরেক্টরসের কাছে। সকলেরই পরিকল্পনাটি খুব পছন্দ হল।

ক্যাপটেন লয়েড় ইতিমধ্যে জেনারেল লয়েড় হয়েছেন। তিনি এবার লর্ড বেন্টিংকের প্রতিনিধি হয়ে সিকিমের রাজার সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালাতে এলেন। আলোচনা আর কী, জায়গাটা ইংরেজদের চাই।

শক্তিমান কিংবা বড়লোকদের ইচ্ছেটাই আদেশ। সিকিমের রাজা কোনও দরাদরির মধ্যেই গেলেন না। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক চেয়েছেন সুতরাং সিকিমের রাজা বিনা শর্তে পুরো জায়গাটাই দান করে দিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। বিনা রক্তপাতে তো বটেই, একটি কপর্দকও ব্যয় না করে সিকিমের খানিকটা অংশ চলে এল ইংরেজদের হাতে। রঙ্গিত নদীর দক্ষিণ থেকে মহানদী নদীর পশ্চিম পর্যন্ত। সেই মর্মে একটি চুক্তি সম্পাদিত হল ১৮৩৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ওই তারিখটিকে দার্জিলিং এর জন্মদিন বলে গণ্য করে অনেকে।

অত্যুৎসাহী জেনারেল গ্রান্ট এরপর পুরো একটা শীতকাল এবং পরবর্তী বসন্তকাল পর্যন্ত রয়ে গেলেন দার্জিলিং অঞ্চলে। কোথায় স্বাস্থ্যনিবাস আর অন্যান্য বাড়িঘর তৈরি হবে ঠিকঠাক করলেন সেই সব।

এই নবলব্ধ অঞ্চলে জেনারেল লয়েডই হলেন কোম্পানির এজেন্ট এবং তিনি আহ্বান করলেন দার্জিলিং-এর বাড়ি ঘর বানাতে ইচ্ছুকদের কাছ থেকে আবেদনপত্র। কলকাতা থেকে অনেকেই জমি চাইলেন, তারা প্রায় সকলেই সাহেব। কলকাতার বাঙালি বাবুদের টনক নড়ল না।

বাঙালিরা পাহাড়-বিলাসী, কিন্তু পর্বতপ্রেমিক নয়। বাঙালি মানসে পাহাড়ের রুক্ষতা কিংবা উচ্চতা নেই। নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালিরাও কোনওক্রমে পয়সা জমিয়ে সপরিবারে, জীবনে একবার অন্তত মাঝারি ধরনের পাহাড়ি অঞ্চলে বেড়াতে যাবেই, দূর থেকে পাহাড়চূড়ায় বরফ দেখে জীবনে ধন্য করবে, তবু কোনও বাঙালি পরিবারই সমতল ছেড়ে পার্বত্য অঞ্চলে সংসার পাততে যাবে না।

পশ্চিমবাংলার মধ্যেই এমন মহান, সুন্দর, সবুজ ও রুপালি পর্বতশ্রেণি রয়েছে, কিন্তু বাঙালিরা সেখানে বসতি স্থাপনে আগ্রহী হয়নি।

সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরুনোর প্রবাদটা ইংরেজদের ক্ষেত্রে প্রায় সব জায়গাতেই খাটে। সিকিমের রাজার কাছ থেকে প্রথমে মিষ্টি কথার কৌশলে আদায় করা হল, তারপর ছলে ও বলে দখল করা হল তরাই অঞ্চল ও কালিম্পং।

ক্যাম্পবেল নামে একজন ডাক্তারকেই বলা যায় দার্জিলিং শহর নির্মাণের প্রথম স্থপতি। তিনি এখানে এসে প্রথমেই একটি চমৎকার স্যানাটোরিয়াম স্থাপন করলেন, তারপর বাজার বসালেন, রাস্তাঘাট তৈরির দিকে মন দিলেন। পাঁচ বছরের মধ্যে তৈরি হল পাঙ্খবাড়ির দিকের রাস্তা, কার্শিয়াং ও দার্জিলিং-এ দুটি হোটেল হল। কিন্তু স্থায়ী নাগরিক ছাড়া শহর জমে না। ৭০ ঘর ইওরোপীয়ের বসবাস শুরু হলেও দৈনন্দিন কাজ চালাবার জন্য নেটিভদেরও দরকার। এখানে এসে যারা বসতি স্থাপন করতে চায় তাদের বাসস্থানের জন্য জমি এবং চাকরি দেবারও প্রলোভন দেখালেন ক্যাম্পবেল সাহেব। সমতলের বাঙালিরা তাতেও প্রলুব্ধ হল না বিশেষ। সমতলের সকল বাঙালিই সে সময় ভালোভাবে খেয়ে পরে, নিজ বাসস্থানে বহাল তবিয়তে ছিল, এমন মনে করার অবশ্য কোনও কারণ নেই।

প্রথম চোদ্দো বছরে গোটা দার্জিলিং জেলার জনসংখ্যা দাঁড়ালো মাত্র দশ হাজার।

ডাক্তার ক্যাম্পবেলই প্রথম দার্জিলিং-এর চায়ের গাছ নিয়ে পরীক্ষা করেন এবং তাঁর স্বজাতীয়দের চা-চাষের প্ররোচনা দেন। ১৮৫৬ সালে আলুবাড়ি এবং লেবং-এ প্রথম চালু হল চা-বাগান। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চা গাছের কচি পাতা ও কুঁড়ি উঁকি মারল কাঞ্চনজঙ্ঘার পাদদেশে।

চা ব্যাবসার অভাবনীয় সাফল্যে দার্জিলিং-এ একটা জন বিস্ফোরণ ঘটে গেল। মাত্র দশ বছরে চা-বাগানের সংখ্যা হল ৩৯, পরবর্তী দশ বছরে সেই সংখ্যা বাড়ল আরও তিনগুণ। প্রচুর চাকরির সুযোগ খুলে গেল, হুড়হুড় করে আসতে লাগল মানুষ। শুধু বাগানের চাকরিই নয়, আনুষঙ্গিক উপার্জনের ক্ষেত্রও হল বিস্তীর্ণ।

১৮৬৯ সালে দার্জিলিং জেলার জনসংখ্যা দাঁড়ায় বাইশ হাজার। তার ঠিক একশো দু বছর পরের (১৯৭১) আদমসুমারিতে দার্জিলিং-এর লোক সংখ্যা ৭,৮১,৭৭৭ জন।

স্বাধীনতার আগে, এই জেলার জনবসতির মধ্যে কোন জাতের মানুষ কতজন, তার একটা হিসেব নেওয়া হয়েছিল। সিকিম ও দার্জিলিং-এর যারা আদিবাসী, সেই লেপচাঁদের সংখ্যা তখন মাত্র শতকরা ৩.৩ জন। সেই তুলনায় নেপালিরা শতকরা ৬১.৮ জন। এই বিপুল সংখ্যক নেপালিরা এসেছে বাইরে থেকে। তখন পাহাড় বাঙালিদের টানেনি। সেই সময় তথাকথিত ভদ্র শ্রেণির হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি শতকরা মাত্র ৫.৩ জন আর সিডিউলড কাস্ট, রাজবংশী, শতকরা ৬.২ জন। অর্থাৎ শতকরা সাড়ে এগারোজন বাংলাভাষী। ‘ভদ্দরলোক’ বাঙালিদের তুলনায় বিহার-উত্তর প্রদেশ থেকে আসা হিন্দি উর্দুভাষীদের সংখ্যা কিন্তু তখনই কিছুটা বেশি, শতকরা ৭.৪ জন।

স্বাধীনতা তথা দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রচুর শরণার্থী এসেছে পশ্চিমবাংলায়। অন্যান্য জেলাগুলিতে তার বিরাট প্রভাব দেখা গেলেও দার্জিলিং-এ সেই উদ্বাস্তুরা এসেছে যৎসামান্য। এই জেলার চারটি মহকুমার মধ্যে একমাত্র শিলিগুড়িতেই সেই উদ্বাস্তুদের জন্য কিছু সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু সেই ছিন্নমূল মানুষের দল পাহাড় ও অরণ্যের বিরাট খালি এলাকায় ওঠেনি কিংবা তাদের উঠতে দেওয়া হয়নি।

নেপাল থেকে মানুষের স্রোত কিন্তু অব্যাহতই থেকেছে। পাহাড়ে অভ্যস্ত সেই সব নেপালি গোখারা ভরিয়ে দিয়েছে দার্জিলিং-কালিম্পং এর পার্বত্য অঞ্চল। সরকারি খাস জমিতে গজিয়ে উঠেছে তাদের কলোনি। পূর্ব পাকিস্তানের পর, বাংলাদেশ থেকেও শরণার্থীরা এসেছে এবং এখনও আসছে পশ্চিমবাংলায় তথা ভারতে, তা নিয়ে মাঝে মাঝেই হইচই হয়, প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। কিন্তু হাজার হাজার নেপালি বংশোদ্ভূতরা প্রবেশ করছে, তা নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নেই, রাজ্য বা কেন্দ্রের সরকার সে বিষয়ে এতদিন মাথাও ঘামাননি।

যখন সুযোগ ছিল, তখন বাঙালিরা এমন চমৎকার পাহাড়-অরণ্যে বাড়ি বানায়নি, জঙ্গল হাসিল করে জমি চাষ করেনি, ব্যাবসা বাণিজ্যও ছেড়ে দিয়েছে অবাঙালিদের হাতে। নেপালিরা এখানে এসেছে, ঘাম ঝরিয়ে বসতি স্থাপন করেছে, এখন তাদের বিপুল সংখ্যাধিক্য, এই অঞ্চলের ওপর তাদেরই ন্যায্য অধিকার।

হঠাৎ যেন একদিন ঘুম ভেঙে বাঙালিরা গেল-গেল রব তুলে দিল। দার্জিলিং তাদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে! যা কোনওদিনই হাতে ছিল না তা আবার হাত ছাড়া হবে কী? কলকাতার দেয়ালে-দেয়ালে বড় বড় পোস্টার পড়ল, রক্ত দিয়ে গোর্খাল্যান্ড রুখব।

যারা ক্রমিক রক্তাল্পতায় ভোগে তারাই বোধ হয় কথায়-কথায় রক্ত দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়! বাঙালিরা নিজেদের ও ভাই বন্ধুদের রক্ত অনেকবার ঝরিয়েছে বটে, কিন্তু সে যেন আরও দুর্বল হয়ে যাবার জন্য তান্ত্রিক সাধনা!

শীতে উপেক্ষিতা

পঞ্চাশের দশকে যাযাবর ছদ্মনামধারী একজন লেখক ‘দৃষ্টিপাত’ নামে একটি বই লিখে দারুণ হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। একজন অজ্ঞাত কুলশীল লেখকের কোনও একখানি বইয়ের এমন বিপুল জনপ্রিয়তা অভূতপূর্ব।

বইটি বেশ সুখপাঠ্য, কিন্তু প্রচারের ব্যাপারে খানিকটা অন্যান্য কৌশল নেওয়া হয়েছিল। রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে ওই লেখক অকালমৃত, তাঁর ওই একটিই প্রথম ও শেষ বই। যাযাবর আসলে বিনয় মুখোপাধ্যায়, তিনি পরে আরও কয়েকটি বই লিখেছেন এবং সুদীর্ঘজীবী হয়েছেন।

দৃষ্টিপাত-এর সাফল্যের কিছুদিন পর রঞ্জন নামে আর একজন লেখক আত্মপ্রকাশ করলেন এবং প্রচারের ব্যাপারে কিছুটা চালাকির আশ্রয় নিয়ে জনপ্রিয় হলেন। শীতে উপেক্ষিত’ নামে সেই বইয়ের ভুমিকায় এমন একটা ধারণা সৃষ্টি করা হল যেন রঞ্জন আর যাযাবর আসলে একই ব্যক্তি।

এর কোনও প্রয়োজন ছিল না, রঞ্জন ওরফে নিরঞ্জন মজুমদার ইংরেজি সাংবাদিকতায় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং বাংলা সাহিত্যেও যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন পরবর্তীকালে। সৈয়দ মুজতবা আলির সঙ্গে যুগ্মভাবে তাঁর গল্পের বই-ও প্রকাশিত হয়েছিল।

‘শীতে উপেক্ষিতা’ বইটির নায়িকা দার্জিলিং নগরী।

উপেক্ষিতা অর্থে টুরিস্ট-উপেক্ষিতা, তাও সব টুরিস্ট নয়, বাঙালি টুরিস্ট। দার্জিলিং নিয়ে গল্প-উপন্যাস কবিতা কম লেখা হয়নি বাংলায়, সবই টুরিস্টের চোখ দিয়ে। এত যে ভালোবাসা দার্জিলিং-এর প্রতি, তাও মাত্র সাড়ে তিন মাসের জন্য। গ্রীষ্মের ছুটির দু-মাস, পুজোর ছুটির দেড় মাস। রবীন্দ্রনাথও দার্জিলিং গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু ‘শেষের কবিতা’ লিখলেন শিলং-এর পটভূমিকায়। দার্জিলিং তার কাছে লক্ষণ-পত্নী।

রঞ্জনের লেখাটি পড়লে মনে হয় কোনও বিদেশি শৈল শহরের ভ্রমণ কাহিনী। সুদুর অচেনা। সেই বইটি পড়ার পর থেকেই কখনও ঘোর শীতে দার্জিলিং ভ্রমণের ইচ্ছে পুষে রেখেছিলাম। একবার দার্জিলিং-এ তুষারপাতের খবর পেরেই রওনা হয়ে গেলাম কয়েকজন দল বেঁধে।

শীতের জায়গায় শীতকালে ভ্রমণই প্রকৃষ্ট। সেবারেই দার্জিলিংকে পরিপূর্ণভাবে দেখা গিয়েছিল। কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনের জন্য সাধ্য সাধনা করতে হয় না, ঘুরতে ফিরতে যখন তখন চোখে পড়ে। রাস্তার ধারে ধারে থোকা থোকা ফুলের মতন জমে ছিল বরফ। তার ওপর ঝকঝক করছে রোদ। যেখানে সেখানে মানুষের ভিড়ে ধাক্কা খেতে হয় না, ম্যালটাকে সত্যিই বেড়াবার জায়গা মনে হয়।

শহরটা অবশ্য মোটেই জনশূন্য নয়। চকবাজারে স্থানীয় মানুষদের কেনাকাটা চলে সমানে। টুরিস্টদের মধ্যে বাঙালিদের সংখ্যা আশ্চর্য রকমের কম হলেও বিদেশি টুরিস্ট অনেক, প্রচুর জাপানি ছেলেমেয়ে। সেই জাপানিরা এতই শীত ভালোবাসে যে দার্জিলিং এর বদলে টাইগার হিসের টুরিস্ট লজেই ভিড় বেশি। বাঙালিরা এত শীতকাতুরে হয় কেন কে জানে! কলকাতার ডিসেম্বরেই সকালে ময়দানে অনেকের মাথায় বাঁদুরে টুপি দেখা যায়।

জানুয়ারির শীতে আমি দার্জিলিং–কালিম্পং অঞ্চলে আরও দু-বার গেছি, ক্রমশই একটা পরিবর্তন চোখে পড়েছে। হয় শীত কমেছে, অথবা বেড়েছে বাঙালিদের সাহস। এখন বাঙালি হানিমুন-যুগলকেও দেখতে পাওয়া যায় ওই সময়।

শীতকালের পাহাড়ের একটা বিশেষ ঘ্রাণ আছে। নিশ্বাসের সঙ্গে বাতাস যেন বুকের ভেতরটা পর্যন্ত ধুয়ে দেয়।

উৎসবে নৈরাশ্য

রবীন্দ্র শতবার্ষিকীর বছরে ভারতের প্রতিটি রাজ্যের রাজধানী এবং পশ্চিমবাংলার প্রত্যেকটি জেলা সদরে একটি করে রবীন্দ্র ভবন স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল সরকারিভাবে। এতে কারুরই আপত্তি থাকার কথা নয়, কারণ সরকারি খরচে একটা রঙ্গমঞ্চ পাওয়া যাচ্ছে, যা যে কোনও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। আসামে সে সময় বাঙালি বিদ্বেষ চরমে উঠেছিল, এমনকি জাতীয় সংগীতে আসামের নাম উল্লেখ নেই বলে সেটাও বর্জন করা হচ্ছিল, কিন্তু গৌহাটিতে রবীন্দ্র ভবন প্রতিষ্ঠার কোনও বাধা হয়নি। আপত্তি উঠেছিল খোদ পশ্চিমবাংলায় দার্জিলিং শহরে। রবীন্দ্র নামটি স্থানীয় নেপালিদের পছন্দ হয়নি, রবীন্দ্রনাথ তাদের কেউ না। তাদের নিজস্ব মহাকবি ভানুভক্তের নামে কোনও স্মৃতিচিহ্ন নেই।

শেষ পর্যন্ত জোড়াতালি দিয়ে রবীন্দ্র-ভানুভক্ত হল এই নামে সেই ভবনটির উদ্বোধন হয়েছিল। প্রারম্ভিক গন্ডগোলের কথা বিশেষ প্রচারিত হয়নি। এখন সেই ভবনটি শুধু ভানুভক্ত হল নামেই পরিচিত।

এ কথাও ঠিক, ভানুভক্তের নাম কিংবা তাঁর কোনও রচনার সঙ্গে বাঙালি পাঠকরা অনেকেই পরিচিত নয়। বাংলায় কত রকম অনুবাদের বই বেরোয় অথচ আমাদের এত কাছাকাছি একজন লেখকের কথা আমরা জানিই না!

দার্জিলিং শহরের দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে একটা উৎসবের ব্যবস্থা হয়েছিল তাঁতে বাঙালি ও নেপালিদের মেলাবার একটা প্রয়াস ছিল। কলকাতা থেকে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন কিছু লেখক ও সঙ্গিতশিল্পী, দার্জিলিং-এর নেপালি লেখক ও গায়ক-গায়িকাও অংশ নিয়েছিলেন। প্রথম থেকেই কেমন যেন থমথমে ভাব ছিল। কলকাতা থেকে বহু দূরে, আমেদাবাদ কিংবা ভোপালে কোনও অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে অন্য ভাষার লেখক লেখিকাদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়, আড্ডা হয়, অল্পক্ষণেই আত্মীয়তা জন্মে যায়। আর পশ্চিমবাংলারই নেপালি লেখকদের কাছে আমরা একেবারে অনাত্মীয়। কেউ আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে এলেন না। নেপালি ভাষা এমন কিছু দুর্বোধ্য নয়, আর যাঁরা দু-তিন পুরুষ ধরে পশ্চিম বাংলায় বাস করছেন, তাঁদের পক্ষে কিছু-কিছু বাংলা জানা অস্বাভাবিক নয়, তবু পারস্পরিক কোনও যোগাবোগ হল না। উৎসবের সন্ধ্যায় ভানুভক্ত হলের মঞ্চে নেপালি লেখকরা বসলেন একদিকে, বাঙালিরা অন্যদিকে, কোনও রকম হাস্য পরিহাস নেই, সবাই উৎকট গম্ভীর।

এমনও শোনা গেল যে দার্জিলিং-এর এই উৎসবে কলকাতার লেখক-শিল্পীদের আমন্ত্রণ করে আনা নেপালি বুদ্ধিজীবীরা পছন্দ করেননি। এই সংবাদে আমরা এমনই অবাক হয়েছিলাম, যে রাগ করতেও ভুলে গেছি। পশ্চিম বাংলার মধ্যেই কোনও জায়গায় বাংলা ভাষা অনভিপ্রেত।

এতদিন আমরা জেগে ঘুমিয়েছি। দার্জিলিংটাকে আমরা একটা বেড়াবার জায়গা বলে ধরে নিয়েছি, কিন্তু সেখানে যে বহু মানুষজন থাকে, তাদের ভাষা সংস্কৃতির সঙ্গে বাকি পশ্চিম বাংলার যোগাযোগ কতখানি, তা খেয়ালই করিনি।

দার্জিলিং জেলায় নেপালিভাষীর সংখ্যা ৫৯.১ শতাংশ, হিন্দিভাষীর সংখ্যা ৭.৭ শতাংশ আর বাংলাভাষীর সংখ্যা ১৮.৪ শতাংশ (৬১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী)। এর মধ্যে বাংলাভাষীর সংখ্যা শিলিগুড়িতেই বেশি, বাকি তিনটি মহকুমায় নগণ্য। সেই সব জায়গায় বাংলা ভাষার প্রসারের কোনও চেষ্টাই হয়নি। পাহাড়ের স্কুলগুলিতে বাংলার নাম গন্ধ নেই। নেপালিরা নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করবে, এটা খুবই স্বাভাকি ও ন্যায্য। কিন্তু তা হলে যে পশ্চিমবাংলায় তাদের দু-তিন পুরুষের বাস, সেখানকার ভাষা, সাহিত্য, সংগীত তারা কিছুই জানবে না? আসামের বাঙালিরা অসমীয়া লিখতে বাধ্য হয় না? বিহারের বাঙালিরা সবাই হিন্দি জানে, অথচ পশ্চিমবাংলায় নেপালিরা বাংলাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে যেতে পারে!

অবশ্য তাদের প্রতি অবিচারও হয়েছে প্রচুর।

একবার দার্জিলিং অঞ্চলে বেড়াতে গেছি, তখন কলকাতায় ক্রিকেটের একটা টেস্ট ম্যাচ চলছিল। প্রতিদিনের রেজাল্ট জানবার আগ্রহে একটি ছোট রেডিও নিয়ে গিয়েছিলাম সঙ্গে। যথা সময়ে সেটা খুলে দেখি কড়র কড়র চ্যাঁ-চোঁ এইসব বিকট আওয়াজ হচ্ছে। খানিকক্ষণ পণ্ডশ্রমের পর একজনের কাছ থেকে জানা গেল যে কলকাতা বেতারকেন্দ্রের কোনও অনুষ্ঠানই দার্জিলিং জেলার অনেক জায়গা থেকে কিছুই শোনা যায় না। আমি হতবাক। কলকাতায় এতদিনের একটা পুরানো বেতারকেন্দ্র, এত রকমের নাটক-গান বাজনা, তার কোনও কিছুই দার্জিলিং-এর মানুষের জন্য নয়? কলকাতায় যে কোটি কোটি টাকা খরচ করে দূরদর্শন কেন্দ্র স্থাপন হয়েছে, তারও কোনওই উপযোগিতা নেই এই রাজ্যের একটু দূরের জেলাগুলির মানুষদের। দিল্লির অনুষ্ঠান তবু দেখা যায়, কিন্তু বাংলা অনুষ্ঠান গোটা পশ্চিমবাংলার জন্য নয়! অপূর্ব ব্যবস্থা।

বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের চোখে দার্জিলিং-কালিম্পং নিছক প্রমোদকেন্দ্র। কিংবা টুরিস্ট স্পট। গ্রীষ্মকালে রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের জরুরি কাজ পড়ে যেত দার্জিলিং-এ, তখন কয়েকটা দিন তাঁদের ভিড়ে পাহাড় সরগরম, তারপর বছরের অন্য সময় দার্জিলিং-এর কথা আর মনেই পড়ে না। সেখানে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ সারা বছর বাস করে, তাদের জীবনযাত্রার যে নানান অসুবিধে থাকতে পারে, তাদের যে একটা সাংস্কৃতিক ক্ষুধা আছে, সে ব্যাপারে কোনও সই ছিল না সরকারের। সুভাষ ঘিসিং এবং তাঁর দলবল রক্তমাখা ভোজালি তুলে ধরতেই সারা ভারতবর্ষ থেকে সাংবাদিকরা ছুটে এল, দিল্লির বড় তরফ এই প্রথম যেন দার্জিলিং সম্পর্কে সচেতন হল।

আজকাল অস্ত্রের ভাষা ছাড়া সাধারণ মানুষের দাবি দাওয়া গণতান্ত্রিক সরকারের কর্ণে পশে নয়। আসামে বোরো উপজাতির যে এতখানি ক্ষোভ রয়েছে, তা টের পাওয়া গেল কয়েকটি শক্তিশালী বোমা ফাটার পর। ঝাড়খন্ডীরাও এখন হাতে তির-ধনুক তুলে নিয়েছে।

সুভাষ ঘিসিং-এর কৃতিত্ব সত্যিই বিস্ময়কর। মাত্র কয়েক বছরের আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত তো তিনি অনেকখানি দাবি আদায় করে ছাড়লেন! দার্জিলিং শহরের দেড়শো বছর পূর্তি উৎসবে যোগ দিতে যখন আমরা যাই, তখন সুভাষ ঘিসিং-এর নামও শোনা যায়নি। কিন্তু সেই উৎসবের মধ্যে বেশ বেসুরো আওয়াজ শোনা গিয়েছিল। আমরা অনুভব করেছিলাম এই সুন্দর শৈলাবাসের তলায়-তলায় প্রচুর বিক্ষোভের ধোঁয়া জমে গেছে।

এক বছর আগে পরে

গত বছর, তখনও সুভাষ ঘিসিং-এর সঙ্গে বুটা সিং-জ্যোতি বসুর সই-সাবুদ হয়নি, কয়েকদিনের জন্য গিয়েছিলাম দার্জিলিং বেড়াতে। সমতলের বাঙালিদের কাছে তখন দার্জিলিং এক ভয়াবহ জায়গা, খুনোখুনি লেগেই আছে, যখন তখন ষাট ঘণ্টা একশো কুড়ি ঘণ্টা বনধ লেগেই আছে, ভ্রমণ-পাগল বাঙালিরা কেউ শিলিগুড়ির ওপরের দিকে পা বাড়ায় না।

আমি আর স্বাতী কিন্তু বেশ নিশ্চিন্তেই পৌঁছেছিলাম দার্জিলিং-এ। জি এন এল এফ এর আন্দোলন যতই উগ্র হোক, তারা টুরিস্টদের ওপর কখনও হামলা করেনি, নেহাত দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া স্থানীয় বাঙালিদের ওপরেও আক্রমণের কথা শোনা যায়নি। জিন এন এল এফ-এর লড়াই ছিল পুলিশ, অ-নেপালি সরকারি কর্মচারী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। এ ব্যাপারে তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল।

গ্রীষ্মকালে এত ফাঁকা দার্জিলিং যেন চোখে দেখলেও বিশ্বাস করা যায় না। জানুয়ারিতেও এমন জনশূন্য ম্যাল দেখিনি। বড় বড় হোটেলগুলি খদ্দেরের অভাবে বন্ধ।

সেসময় একটা কিছু মিটমাটের সম্ভাবনায় কিছুদিনের জন্য আন্দোলন স্থগিত ছিল, কিন্তু চতুর্দিকে ধ্বংসচিহ্ন। ম্যালের সবক’টা কাঠের বেঞ্চ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, রাইফেলধারী সিপাহীরা সেখানে টহল দিচ্ছে সর্বক্ষণ।

একটা গাড়ি ভাড়া নিয়ে আমরা দেখতে গিয়েছিলাম আমাদের প্রিয় জায়গাগুলি। আমাদের সঙ্গী ছিলেন, তাপস মুখার্জি। তাপসরা দার্জিলিং-এর তিন পুরুষের বাসিন্দা, ওখানকার স্থায়ী রিপোর্টার। একটা ভুল সংবাদে ক্ষিপ্ত হয়ে জিন এন এল এফ-এর একটি দল একবার তাপসকে ধরে নিয়ে যায়। মাথা গরম সেই সব ছোকরারা তখন প্রতিপক্ষকে যখন তখন মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে, কুকরির এক কোপে উড়ে যাচ্ছে মুণ্ডু। পুলিশকে খবর দিয়ে তখন কোনও লাভ ছিল না। তাপসের স্ত্রী ছুটে গিয়ে জিন এন এল এফ-এর আর একটি শাখার লোকদের কাছে গিয়ে সাহায্য চেয়েছিল। খবরটি যে তাপসের লেখা নয়, তা প্রমাণিত হবার পর প্রায় শেষ মুহূর্তে তাপস ছাড়া পেয়েছিল। সেই সাংঘাতিক বিপদের ফাঁড়া গেছে সেই রাত্রিটায় তাপসের মুখে কিন্তু কোনও ভয়ের চিহ্ন নেই। তারপরেও সে বেপরোয়াভাবে ঘুরে বেড়িয়েছে সর্বত্র।

তাপস আমাদের নিয়ে গেল টাইগার হিলে। একেবারে জনশূন্য পথ। টাইগার হিলের চমৎকার বাংলোটিতে আমি একাধিকবার রাত কাটিয়ে গেছি, কত মধুর স্মৃতি আছে, গতবার দেখলাম সেখানে বাংলোটির বদলে পড়ে আছে একটা ধ্বংসস্তূপ। আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে। চতুর্দিকে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাপ-প্লেট।

অথচ কী সুন্দর সেই সকালটি। ঝলমল করছে স্বর্ণাভ রোদ, দূরে পাইন গাছের সারিতে খেলা করছে একদল শিশু-মেঘ, লাফালাফি করছে দুটি ছাগলছানা। স্বাতী মুগ্ধ হয়ে দেখছে সবুজ ঘাসের ডগায় একটা টিপ পোকা। তার পাশেই একটা কালো, পোড়া

বিকট পাথরের বাড়ি, মনে হয় যেন তার গা থেকে এখনো ধোঁয়া বেরুচ্ছে। এমনও মনে হয়, ওর আড়াল থেকে যেন অতর্কিতে বেরিয়ে আসছে একদল সশস্ত্র আততায়ী।

আরও মন খারাপ লেগেছিল লেপচা জগৎ-এর ডাকবাংলোটি দেখে। টাইগার হিলের মতন এই বাংলোটি তেমন জনপ্রিয় ছিল না। সূর্যোদয় দেখার হুজুগে টাইগার হিলে বহু মানুষ ছোটে, সেই তুলনায় লেপচা জগৎ অনেক নিরিবিলি। সুখিয়াপোখরির দিকে মূল রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে তারপর এই বাংলোটির অবস্থান। সাহেবদের পক্ষেই খুঁজে খুঁজে এমন জায়গা বার করা সম্ভব ছিল। সামনে এক বিশাল উপত্যকা, তার পাশে পাহাড়ের গায়ে চুমকি বসানো দার্জিলিং নগরী পটভূমিকায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। এখানে প্রায় সর্বক্ষণই ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ে। এক ইংরেজ একবার লন্ডন থেকে এখানে বেড়াতে এসেছিল। বাংলোর পুরানো ভিজিটার্স বুকের পাতা ওলটাতে ওলটাতে সে দেখতে পায়, প্রায় তিরিশ বছর আগে তার পিতাও এখানে দু-একদিন থেকে গেছেন। তিনি লিখে গেছেন। এখানে সারাদিন কিছুই করার নেই, শুধু বৃষ্টি, বারান্দায় চুপচাপ বসে শুধু বৃষ্টি দেখা! যুবকটি তার তলায় লিখছেন, ড্যাডি, ইটস স্টিল রেইনিং!

সেই রাতেও কি বৃষ্টি পড়েছিল, যখন এই বাংলোটিতে আগুন ধরানো হয়েছিল? পুরোনো আমলের কারুকার্য, সব নষ্ট হয়ে গেছে, নতুন করে আর তা গড়া যাবে না। নিশ্চয়ই ভালো করে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন দেওয়া হয়েছিল, যাতে বাড়িটিকে কিছুতেই রক্ষা করা না যায়।

সেই ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে দুটি পরস্পর বিরোধী চিন্তা আমাকে পেয়ে বসেছিল। এমন সুন্দর বাংলো, এমন শান্ত নির্জন জায়গা। এখানে আগুন লাগিয়ে, নষ্ট করে আন্দোলনকারীদের কী লাভ হল?

আসলে আমরা দূর থেকে এসে এই সব জায়গাকে সুন্দর দেখি, প্রকৃতির শোভায় মেহিত হই। কিন্তু যারা এখানে নিত্য তিরিশ দিন থাকে, প্রকৃতি-ফ্রকৃতি নিয়ে মাথা ঘামাবে কেন? তাদের খাদ্য-বস্ত্র, জীবিকা, স্বাধীনতার প্রশ্নই অনেক বড়। তাদের ক্রোধের আগুন এই সব সরকারি সম্পত্তিকে ছুঁয়ে গেছে।

গত বছর পুলিশের ডি আই জি রমেশ হান্ডার বীরত্বের কাহিনী সকলের মুখে-মুখে ঘুরছিল। সুভাষ ঘিসিং-এর উগ্রপন্থী চেলারা হান্ডাকে খুন করার জন্য বদ্ধপরিকর ছিল। কয়েকবার তিনি চমকপ্রদভাবে বেঁচে গেছেন। উগ্রপন্থীদের বহু গুপ্তঘাঁটি তিনি ভেঙে দিয়েছেন এবং কিছুতেই জিন এন এল এফ-কে তিনি দার্জিলিং-এর প্রশাসন দখল করতে দেননি।

এক সন্ধ্যেবেলা হান্ডা সাহেবের সঙ্গে অনেকক্ষণ আড্ডা হল। গত বছর দার্জিলিং-এ পাহাড় ও আকাশ দেখার চেয়েও হান্ডাকে দেখার আকর্ষণ কম ছিল না। সত্যিই অন্য রকমের অভিজ্ঞতা। এই বীর পুরুষটির চেহারা বা কথাবার্তা শুনে কিছুই বোঝা যায় না। অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র ধরনের মানুষ, কখনও চেঁচিয়ে কথা বলেন না, ব্যবহারে অহমিকার বিন্দুমাত্র স্পর্শ নেই। তাঁকে যে বলতে গেলে চব্বিশ ঘণ্টাই সজাগ থাকতে হয়, একটা টেনশান সর্বক্ষণই থাকে, তার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই তাঁর হাবে-ভাবে। দিব্যি হেসে-হেসে গল্প করতে লাগলেন।

অনেকে বলে, হান্ডার বদলে কিছু কম দক্ষ কোনও পুলিশ অফিসার এই সময় দার্জিলিং-এ থাকলে সুভাষ ঘিসিং ঠিকই শেষ পর্যন্ত পৃথক গোর্খা রাজ্য আদায় করে ছাড়তেন।

গত বছর কপালে সবুজ ফেট্টি বাঁধা জি এন এল এফ-এর ভলান্টিয়ারদের দেখেছি সর্বত্র। প্রত্যেক বাড়িতে জিন এন এল এফ-এর পতাকা তোলা ছিল বাধ্যতামূলক। আমরা যেখানে ইচ্ছে ঘুরে বেড়িয়েছি, কেউ কোথাও বাধা দেয়নি তা ঠিক, কেউ আমাদের দিকে কোনও বিদ্রুপের মন্তব্যও ছুঁড়ে দেয়নি, তবু মনে হচ্ছিল এ আমাদের সেই চেনা দার্জিলিং নয়, যেন এসে পড়েছি কোনও বিদেশে, স্থানীয় লোকেদের সঙ্গে চোখাচোখি হলেই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের দিকে মুখে তাকালেও তারা হাসে না। ইচ্ছে করেই ঢুকেছিলাম রাস্তার ধারের একটা ছোট রেস্তোরাঁয়, আর কোনও খরিদ্দার নেই তবু কেউ আমাদের বসতে বলল না, সামান্য খাতিরও করল না, চেঁচিয়ে অর্ডার দিতে একজন এসে দু-কাপ চা দিয়ে গেল অবশ্য। আর একটি কথাও নেই। বিল মেটাবার সময় প্লেটে কিছু অতিরিক্ত পয়সা রাখলুম বখসিস হিসেবে, বেয়ারাটি তা ছুঁল না পর্যন্ত।

তখন মনে হয়েছিল, নেপালিদের সঙ্গে আমাদের বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে! আর কোনওদিন পারস্পরিক মেলামেশা হবে না।

কয়েক মাসের মধ্যেই আবার বদলে গেল সব কিছু।

পৃথক গোখা রাজ্যের দাবি ছেড়ে সুভাষ ঘিসিং হিল কাউন্সিল-এর দাবি মেনে নিলেন, সেই অনুযায়ী চুক্তি হল। জ্যোতি বসুর নামে আগে কত কু-কথা বলেছেন ঘিসিং, এখন আবার তাঁর সঙ্গে গলাগলি করলেন, কলকাতায় খানাপিনা করে গেলেন। আবার বাঙালি গোখা ভাই-ভাই। রাজনীতি এরই নাম।

এবারের গ্রীষ্মে পরিবর্তিত দার্জিলিং-এর রূপ দেখার ইচ্ছে হয়েছিল আমার। চুক্তি স্বাক্ষরের এক বছর পূর্তি উৎসবে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, তাঁদের চ্যালা চামুণ্ডা, আমলা ও দেহরক্ষীদের ভিড়ে দার্জিলিং সরগরম রইল বেশ কয়েকদিন, সেই সময়টা আমি এড়িয়ে গেলাম। তার পরেও শুনি, এ বছর টুরিস্টদের ভিড়ে দার্জিলিং শহর উপচে পড়ছে, হোটেলগুলিতে জায়গা নেই, প্লেন বা ট্রেনের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। বিমানের টিকিট কাটতে গিয়ে শুনি ছিয়ানব্বই নম্বর ওয়েটিং!

কোনও রকমেই আর যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তখন প্রকৃতি একটি থাপ্পড় কষালেন। একদিনের বিরাট ঝড় ও বৃষ্টিপাত দার্জিলিং-এ ধস নামলো, হিলকোর্ট রোড বন্ধ, বাড়ি ধসে মারা গেছে কয়েকজন। সঙ্গে-সঙ্গে টুরিস্টদের স্রোত বন্ধ। সেই মওকা আর আমি ছাড়ি কেন? একমাত্র মানুষের হিংসাকেই আমার ভয়। প্রকৃতির বিপর্যয়ে অনেক সময় মজা অনেক বেশি পাওয়া যায়।

প্রায় অর্ধেক ফাঁকা প্লেনে আমি পৌঁছোলাম বাগডোগরা। এবারে পেরুবো, সেই ছেলেবেলার মতন। সময় যতই বেশি লাগুক তাতে কিছু যায় আসে না।

আগেরবার টয় ট্রেনের অবস্থা দেখে খুব নৈরাশ্য বোধ করেছিলাম। মনে হয়েছিল এই বিশ্ববিখ্যাত ট্রেন লাইনটি বুঝি চিরতরেই নষ্ট হয়ে গেল। স্টেশানগুলিতে মিলিটারির আখড়া, লাইন অনেক জায়গায় ওপড়ানো, কোথাও কোথাও শূন্যে ঝুলছে। নতুন কিছু গড়ার ক্ষমতা আমাদের নেই, ভেঙে ফেলা খুবই সহজ।

পাহাড়ের এই রেল লাইনটি একটি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিস্ময়। পৃথিবীর বহু দেশের রেল বিশেষজ্ঞরা এই লাইনটি দেখে গেছে।

দার্জিলিং-এ শহর স্থাপনের গোড়ার দিকে কলকাতা থেকে এখানে পৌঁছোতে সময় লাগত আটানব্বই ঘন্টা! সাহেবরা এত সময় নষ্ট করতে রাজি ছিল না, তাই নানা কৌশলে রাস্তা ও যানবাহন তৈরি করে দূরত্ব কমিয়ে আনে। শিলিগুড়ি থেকে এই লাইনকে প্রথম প্রথম বলা হত ট্রামওয়ে। প্রথম ইঞ্জিনটার নাম ছিল ‘টাইনি’, সেটি বানিয়েছিল কলকাতার টম মিচেল অ্যান্ড রাসজে কোম্পানি। প্রথম এই ইঞ্জিনটি চালু করা হয় ১৮৮০ সালে, ভারতের তৎকালীন বড় লাট এই ট্রামে চেপে কিছুটা পথ গিয়েছিলেন। সেই বড় লাটের নাম লর্ড লিটন (ইনি গল্প-উপন্যাস লিখতেন, ‘লাস্ট ডেইজ অফ পমপেই’ নামে তাঁর একটি বই এককালে বেশ বিখ্যাত হয়েছিল) তিনি নিজে এই খুদে রেলে চেপে পাহাড় ভ্রমণ করলেন বটে, কিন্তু তাঁর সঙ্গে যে প্রচুর লটবহর ছিল, সেগুলির বোঝা এই ইঞ্জিন বইতে পারল না, কুলিরা সেসব মাথায় চাপিয়ে পাশে-পাশে দৌড়েছিল। সুতরাং পরের বারে ওই ইঞ্জিন বাতিল করে শক্তিশালী ইঞ্জিন বানাবার অর্ডার দেওয়া হয় গ্লাসগো’র একটি কোম্পানিকে, ট্রামওয়ের বদলে এই রেলপথের নাম রাখা হয় ‘দা দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে’।

আন্দোলনের দু-তিন বছরে অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেলেও এই ট্রেন আবার চালু করা হয়েছে এটা একটা সুসংবাদ। কিন্তু আমার সেই ট্রেনে চাপার আর সুযোগ হল না, সাম্প্রতিক ধসে দু-তিন জায়গার লাইন উপড়ে যাওয়ায় কয়েকদিন আবার বন্ধ আছে।

অগত্যা একটি ট্যাক্সি নিতে হল। বেশ আশা করেছিলাম, রাস্তার কোনও জায়গায় গাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে রাস্তার ধারেই রাতটা কাটাবো। কিন্তু ট্যাক্সি চালক নানান কায়দা করে ঠিক এক সময় পৌঁছে দিল শহরে।

ঠিক এক বছরে কত তফাত। দার্জিলিং শহরে গিসগিস করছে মানুষ, ম্যাল এমনই ভরতি যে হাঁটতে গেলে লোকের গায়ে ধাক্কা লাগে। নতুন করে আবার বেঞ্চ বসিয়ে রং টং করা হয়েছে। কাঠমান্ডু এবার বন্ধ, কাশ্মীরেও মৌলবাদীরা বোমা ফাটাচ্ছে, তাই পাহাড়-বিলাসী বাঙালিরা সব ধেয়ে এসেছে দার্জিলিং-এ। শুনলাম, অনেকে হোটেলে জায়গা না পেয়ে বারান্দায় শুচ্ছে। এত জনসমাগমের চাপ সহ্য করতে পারছে না এই শহর। যখন তখন বিদ্যুৎ চলে যায়, পানীয় জলের অভাব প্রচন্ড। খাবার দাবারের দাম আকাশছোঁয়া।

নিউ এলগিন হোটেল গতবারে কত খাতির করেছিল, এবার আমাকে পাত্তাই দিতে চায় না। একটা স্যাঁতসেতে, দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার মতন ঘরে প্রথমে আমাকে জায়গা দিল। তাপস মুখার্জির সাহায্যে ভালো ঘর কিছু পরে পাওয়া গেল অবশ্য। গতবার স্বাতী ও আমিই ছিলাম এ হোটেলের একমাত্র বাসিন্দা। বাড়ি ঘর ফাঁকা, এবার আমার মতন অনেক খদ্দেরদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গতবারের তুলনায় সমস্ত চার্জও দ্বিগুণ।

সকালে-বিকেলে দার্জিলিং শহরে কয়েক চক্কর দিতে এসেই বোঝা গেল, সেরকম টেনশান আর কোথাও নেই, দোকানগুলো ভিড়ে ভরতি, ঘোড়ায় চেপে ঘুরছে সুসজ্জিত ফুটফুটে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা। ঠিক আগেকার পুরোনো দৃশ্য। সন্ধ্যে হতে না হতেই অবশ্য রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য, দিনের আলো শেষ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় দোকানপাট, টুরিস্টরা কেউ তখন বাইরে ঘোরাফেরা করে না। আন্দোলন থেমে গেছে বটে, কিন্তু ছিনতাই, রাহাজানি অব্যাহত। একদল লোক চাঁদা তোলা, জোর-জুলুম করায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল, এখন তারা আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চায় না। আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে প্রচুর জমি জবর-দখল হয়েছে, দার্জিলিং-এর আশেপাশে কোথাও ফাঁকা জায়গা নেই, সর্বত্র গজিয়ে উঠেছে নতুন-নতুন বাড়ি। শুকনা থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত হিলকার্ট রোডের এককালে সৌন্দর্যই ছিল নির্জনতা, দু-দিকে নিবিড় বনানী, এখন সেই রাস্তার কোনও এক জায়গাতেও নিরিবিলিতে হিসি করারও উপায় নেই, সর্বত্র মানুষ, রাস্তার ধারে-ধারে অগুনতি নড়বড়ে বাড়ি। মানুষ বাড়ছে, নেপাল থেকে এখনও মানুষ আসছে এখানে আশ্রয় নিতে; গরিব মানুষেরা অসহায় মানুষেরা দেশ কালের সীমানা মানে না। আরও মানুষ আসবে, জঙ্গল কেটে সাফ হয়ে যাবে, রাজকীয় মহিমায় মাথা তুলে আছে যেসব বিশাল মহিরূহ, তারাও ধুলোয় লুটোবে। মানুষের জন্যেই অরণ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন, অথচ মানুষেরই আশু বাঁচার তাগিদে ধ্বংস করা হচ্ছে অরণ্য।

বড় বড় হোটেলগুলি ট্যাংকারে করে দূর দূর থেকে জল আনে। সন্ধেবেলা শুনলাম, একদল গ্রামবাসী ওপরে উঠে এসেছে জল ভিক্ষে করতে। হোটেলের মালিকরা তাদের পয়সা দিয়ে কেনা জল বিলি করতে রাজি নয়, তৃষ্ণার্ত গ্রামবাসীরাও ছাড়বে না। জলের হাহাকারের এই রূপ আমি আগে কখনও দেখিনি। পানীয় জলের সরবরাহের তুলনায় লোক সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে। শহরের নাগরিকদের জন্য মিউনিসিপ্যালিটি থেকে দিযে একবার বা দু-বার জল বিলি করে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, গৃহস্থবাড়ির বউ-ছেলে-মেয়েরা এক একটা পাত্র নিয়ে ছোটে। আমার পরিচিত একটি পরিবার সারাদিনের জন্য মাত্র এক জেরিক্যান জল পেয়েছে। গ্রামের লোকদের এ ব্যবস্থাও নেই। এই সব শুনে, হোটেলের বাথরুমে কল খুলতে আমার লজ্জা হয়।

বাইরের থেকে দার্জিলিং বেড়াতে এসে কী পায়? শুধু ম্যাল, জলাপাহাড়, অবজারভেটারি হিল পর্যন্ত ঘোরাফেরা, তার চেয়ে দূরে কেউ যায় না। কোনওরকম খেলাধুলা, আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা নেই। সন্ধের পর হোটেলের ঘরে বন্দি। শুধু গ্রীষ্মকালের ঠান্ডা বাতাস আর পাহাড়ে মেঘের বক্রক্রীড়া! টুরিজন এখন হিল কাউনসিলের হাতে, তারা আর কী নতুন জিনিস দেবে কে জানে! ফিরে আসার সময় হিলকার্ট রোড ছেড়ে পাঙ্খবাড়ির রাস্তা ধরলাম। এদিকটায় জনবসতি এখনও কম। জোর এক পশলা বৃষ্টি হবার পর আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে, গাড়ি থামিয়ে এক জায়গায় দাঁড়ালাম একটুক্ষণ। পাহাড়ের পর পাহাড়ের ঢেউ, সদ্যোস্নাত গাছপালাগুলি, নানারকমের সবুজ, চতুর্দিকে একটা বিরাটত্বের মহিমা। তখন মনে হল, শহরের ফ্ল্যাট বাড়ি, নোংরা কাদা প্যাঁচপেচে রাস্তা ঘিঞ্জি মফস্বল, পরনিন্দা পরচর্চা মুখর গ্রাম, সমতলের জীবনে অনেক ক্লেদ, সেসব ছেড়ে অন্তত দু-একদিনের জন্যও এই আকাশছোঁয়া পাহাড়, এই সবুজ উচ্চতাকে দেখে গেলে চক্ষু ও হৃদয় জুড়িয়ে যায়। এর মূল্য অনেক।