২২৬. খাণ্ডবারণ্যবাসী প্রাণীদিগের দাহ, ইন্দ্রের খাণ্ডববহ্নিনির্বাণ-প্রয়াস

২২৬. খাণ্ডবারণ্যবাসী প্রাণীদিগের দাহ, ইন্দ্রের খাণ্ডববহ্নিনির্বাণ-প্রয়াস

ষড়বিংশত্যধিকদ্বিশততম অধ্যায়।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, কৃষ্ণ ও অর্জুন রথদ্বয়ে আরোহণপূর্বক খাণ্ডববনের উভয়পার্শ্বে থাকিয়া নানাবিধ প্রাণিগণ দগ্ধ করাইতে আরম্ভ করিলেন। খণ্ডবারণ্যবাসী জন্তুগণকে যে দিকে পলায়ন করিতে দেখিলেন, তাঁহারা সেই সেই দিকে বেগে ধাবমান হইতে লাগিলেন। গমনকালে সেই বায়ুবেগগামী রথদ্বয়ের অন্তর্গত অবকাশ সকল অলক্ষ্য হইল, কেবল, অলাতচক্রের ন্যায়, ভ্রাম্যমাণ রথিদ্বয় দৃষ্ট হইতে লাগিলেন। এইরূপে খাণ্ডববন দগ্ধ হইতে আরম্ভ হইলে, শত শত প্রাণিগণ ভয়ঙ্কম চীৎকার করিতে করিতে ইতস্ততঃ প্ৰধাবিত হইতে লাগিল। কোন কোন জন্তু তীব্র তাপে দগ্বৈকদেশ, স্ফুটিতচক্ষুঃ ও বিশীর্ণ হইয়াদৌড়িতে লাগিল। কেহ কেহ পিতা, পুত্র ও ভ্রাতৃগণকে আলিঙ্গন করিয়া সেইশত তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিতে না পরাতে তথায় প্রাণত্যাগ করিল। কেহ কেহ দশনে দশন নিপীড়নপূর্বক ইতস্ততঃ ধাবমান হইতে লাগিল এবং বিঘূর্ণিতকলেবরে, অগ্নিতে পতিত হইয়া প্রাণ পরিত্যাগ করিল। পক্ষিগণ দগ্ধপক্ষ, দগ্ধচক্ষুঃ ও দগ্ধচরণ হইয়া মহীতলে বিলুণ্ঠনপূর্বক প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল। জলাশয় সকল তীব্র ভাপে কাথ্যমান হওয়াতেই তত্রস্থ কূর্ম ও মৎস্য সমুদায় বিনষ্ট হইয়া গেল। কোন কোন জন্তুর সমস্ত কলেবর প্রজ্বলিত হওয়াতে মূর্তিমান বহির ন্যায় দৃষ্ট হইতে লাগিল। কোন কোন পক্ষী তীব্র তাপে সাতিশয় সন্তপ্ত হইয়া উচ্চফুলপুবক পলায়ন করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল; কিন্তু পার্থ তীক্ষ্ণ শরদ্বারা তাহাদিগকে খণ্ড খণ্ড করিয়া অগ্নিতে নিপাতিত করিতে লাগিলেন। কতিপয় পক্ষী অর্জুনের তীব্র শরৈ ক্ষত বিক্ষত হইয়া চীৎকার রবে বেগে উড্ডীন ও পুনরায় খাগ্নিমধ্যে পতিত হইতে লাগিল। শত শত বন বাসী জন্তুগণ খুরশরে জর্জরিতকলের হইয়া ভয়ানকস্বরে চীৎকার করিতে লাগিল। তাহাদের ঘোরর নিনাদ মথ্যমান সমুদ্রের গভীর শব্দের ন্যায় এত হইতে লাগিল। ক্রমে ক্রমে প্রজ্বলিত হুতাশনের শিখাসমুদায় নভোমণ্ডল পর্যন্ত ব্যাপ্ত হইয়া দেবগণেরও মহান্ উদ্বেগ জন্মাইল। তখন তীব্র তাপে সন্তপ্ত দেবগণ ঋষিগণকে সমভিব্যাহারে লইয়া সুরপতি ইন্দ্রের নিকট গমনপূর্বক তাহাকে কহিলেন, হে অমরেশ্বর! বহ্নি কি নিমিত্ত অদ্য সমুদায় মর্ত্যলোক দগ্ধ করিতেছেন? অদ্য কি লোকসংক্ষয় সমুপস্থিত হইয়াছে।

সুররাজ ইন্দ্র দেবগণের মুখে সেই ভয়ঙ্কর ব্যাপার শুনিয়া এবং স্বয়ং দর্শন করিয়া খাণ্ডববন রক্ষার্থে গমন করিলেন। তিনি নানাবিধ রথসমূহদ্বারা আকাশমণ্ডল ব্যাপ্ত করত বারিবর্ষণ করিতে লাগিলেন। মেঘগণ দেবরাজের আদেশানুসায়ে খাণ্ডবারণ্যমধ্যে মুষলধারে করি নিক্ষেপ করিতে লাগিল, কিন্তু ঐ সঙ্গত বারিধারা হুতাশনের তীব্রতাপবশতঃ অন্তরীক্ষেই শুষ্ক হইয়া গেল; অগ্নির উপর এক বিন্দুও পতিত হইল না। তখন সুররাজ পুরন্দর সাতিশয় সংক্রুদ্ধ হইয়া পুনরায় মহামেঘদ্বারা বেগে বারিবর্ষণ করিতে লাগিলেন। তৎকালে খাণ্ডবারণ্য ঝরিধারাপাতে ধূমাকীর্ণ ও অগ্নি শিখার ব্যাপ্ত হওয়াতে বিদ্যুৎ-সমফুল ঘনঘটার ন্যায় অতি ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *