১৭৬. কল্মাষ্পাদ-কাহিনী, কল্মাষপাদের রাক্ষসত্বপ্রাপ্তি, বশিষ্ঠের অলৌকিক উপেক্ষা

১৭৬. কল্মাষ্পাদ-কাহিনী, কল্মাষপাদের রাক্ষসত্বপ্রাপ্তি, বশিষ্ঠের অলৌকিক উপেক্ষা

ষটসপ্তত্যধিকশততম অধ্যায়।

গন্ধর্বরাজ কহিলেন, হে অর্জুন! দ্যুলোকে কল্মাষপাদ নামে এক অলৌকিক বলসম্পন্ন ও ইক্ষ্বাকুকুলোৎপন্ন রাজা ছিলেন। একদা তিনি মৃগয়ার্থে রাজধানী হইতে নির্গত হইয়া এক অরণ্যানী মধ্যে প্রবেশ করিলেন। রাজা সেই মহাঘোর অরণ্যে মৃগ, বরাহ, মহিষ, খড়গী প্রভৃতি অতি ভয়ঙ্কর বন্য জন্তু সকল সংহার করিয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। পরিশেষে একান্ত ক্লান্ত ও নিতান্ত শ্রান্ত হইয়া তথা হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন।

তৎকালে মহর্ষি বিশ্বামিত্র যাজ্যক্রিয়ার নিমিত্ত তাঁহাকে অনুরোধ করিতে যান। রাজা ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্থ হইয়া এক প্রশস্ত পথ দিয়া সত্বরে গমন করিতেছিলেন, ইত্যবসরে ঋষিশ্রেষ্ঠ মহাত্মা বশিষ্ঠের পুত্রশতমধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ শক্তি সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। রাজা তাহাকে দেখিয়া কহিলেন, আমাদিগের গমনপথ রোধ করিও না, অপসৃত হও। শক্তি মধুরবাক্যে রাজাকে সান্ত্বনা করিয়া কহিলেন, মহারাজ! এ আমার পথ, শাস্ত্রানুসারে রাজা সর্বাগ্রে ব্রাহ্মণদিগকে পথ দিবেন; ইহাই সনাতন ধর্ম বলিয়া প্রসিদ্ধ আছে। পথের নিমিত্ত উভয়ে এইরূপ বাগ্বিতণ্ডা আরম্ভ করিলেন। “তুমি সরিয়া যাও তুমি সরিয়া যাও” বলিয়া পরস্পর পরস্পরের প্রতি উত্তর প্রত্যুত্তর করিতে লাগিলেন। মহর্ষি স্বধর্ম প্রতিপালন করিবার নিমিত্ত পথ রোধ করিয়া রহিলেন। রাজাও অভিমানপরতন্ত্র ও ক্রোধাবিষ্ট হইয়া শক্তির গতি রোধ করিলেন এবং মোহাবেশে ভয়ঙ্কর নিশাচরের ন্যায় কশাদণ্ডদ্বারা ঋষিকে প্রহার করিলেন। প্রহারবেগে মহর্ষি ক্রোধে অধীর হইয়া তৎক্ষণাৎ তাহাকে অভিশাপ দিলেন, রে নৃপাধম! তুই যেমন দুরাচার রাক্ষসের ন্যায় তাপসকে কশাঘাত করিলি, অদ্যাবধি মদীয় শাপপ্রভাবে রাক্ষস হইবি এবং মনুষ্যমাংসলোলুপ হইয়া তোকে এই পৃথিবী পৰ্যটন করিতে হইবে।

বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠ উভয়ের যাজ্যক্রিয়ানিবন্ধন বৈর উৎপন্ন হইয়াছিল, এজন্য বিশ্বামিত্র কল্মাষপাদের নিকট গমন করেন। উভয়ের বিবাদকালে তিমি সন্নিহিত হইলেন। রাজা শক্তিকে বশিষ্ঠসদৃশ প্রভাবসম্পন্ন দেখিয়া পশ্চাৎ বশিষ্ঠতনয় বলিয়া জানিতে পারিলেন। হে অর্জুন! বিশ্বামিত্র, আত্মপ্রিয়সাধন মানসে অন্তর্হিত হইয়া রহিলেন; তাঁহাদিগকে দর্শন দিলেন না।

অনন্তর রাজা এইরূপ অভিশাপগ্রস্ত হইয়া প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত শক্তির শরণাপন্ন হইলেন। বিশ্বামিত্র রাজার আন্তরিক অভিপ্রায় অবগত হইয়া কিঙ্করনামা এক রাক্ষসকে তাহার শরীরে প্রবেশ করিবার নিমিত্ত আদেশ করিলেন। সে মহর্ষির শাপপ্রভাবে ও রাজর্ষি বিশ্বামিত্রের আদেশানুসারে রাজার শরীরমধ্যে প্রবেশ করিল। বিশ্বামিত্র রাজার শরীরে রাক্ষসের আবিভাব দেখিয়া তথা হইতে অপসৃত হইলেন। রাজা, অন্তর্গত রাক্ষসদ্বারা একান্ত পীড়িত ও কর্তব্যাকৰ্তব্যজ্ঞানশূন্য হইলেন।

অনন্তর রাজা কম হইতে প্রস্থান করিতেছেন, এমত সময়ে এক ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ তাহাকে দেখিয়া তৎসমিধানে মাংস ভোজনের প্রার্থনা করিলেন। রাজা কহিলেন, হে ব্ৰহ্মন্! আপনি এক্ষণে ক্ষণকাল অপেক্ষা করুন, আমি প্রত্যাগত হইয়া আপনকার অভিলষিত ভোজন প্রদান করিব। এই বলিয়া তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। ব্রাহ্মণ তাহার প্রতিগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। রাজা ইচ্ছামত সুখসঞ্চরণ করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। ব্রাহ্মণের নিকট যে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, নিশীথ সময়ে তাহা স্মরণ হইল; তখন তিনি সত্বর গাত্রোত্থান করিয়া সূপকারকে আহ্বানপূর্বক কহিলেন, অমুক বনে এক ব্রাহ্মণ বুভুক্ষিত হইয়া আমার প্রতীক্ষা করিতেছেন, অতএব শীঘ্র তথায় গিয়া তাহাকে সমাংস অন্ন প্ৰদান করিয়া আইস।

সূপকার তদীয় আদেশানুসারে ইতস্ততঃ অনেক অনুসন্ধান করিল, কিন্তু কোথাও মাংস পাইল না; তখন ভগ্নান্তঃকরণে রাজসমিধানে গিয়া মাংস না পাওয়ার বিষয় নিবেদন করিল। রাজা রাক্ষসাবেশপ্রভাবে অক্ষুব্ধচিত্তে বারম্বার সূপকারকে কহিতে লাগিলেন, তুমি নরমাংস আহরণ করিয়া ব্রাহ্মণের অহিারকার্য সম্পাদন কর। সূপকার তৎক্ষণাৎ রাজাজ্ঞা শিরোধার্য্য করিয়া অকুতোভয়ে বধ্যভূমিতে উপস্থিত হইল এবং সত্বর তথা হইতে নরমাংস আহরণপূর্বক যথাবিধি পাক করিয়া অন্নসংযোগে ক্ষুধিত তপন্থী ব্রাহ্মণকে উপযোগের নিমিত্ত প্রদান করিল। ব্রাহ্মণ সিদ্ধচক্ষুঃ প্রভাবে বুঝিতে পারিয়া অন্ন অভোজ্য বলিয়া রোষকষায়িতলোচনে কহিলেন, যেহেতু সেই প্রাধম আমাকে এই অভোজ্য অন্ন প্রদান করিয়াছে, অতএব সেই মূঢ়ই নরমাংস ভোজনে স্পৃহয়ালু হইবে। ইতিপূর্বে শক্ত্রির যে অভিশাপ দিয়াছেন, তদনুসারে মনুষ্যমাংস ভক্ষণে আসক্ত ও সকলের ক্লেশকর হইয়া এই পৃথিবীতল প্যটন করিবে। ব্রাহ্মণ দুইবার এইরূপ কহিলে শক্তি দত্ত শাপ বলবান্ হইয়া উঠিল। তিনি তৎক্ষণাৎ রাক্ষসাবেশে জ্ঞানশূন্য হইলেন। তদীয় ইন্দ্ৰিয়বৃত্তি সকল বিকল হইয়া উঠিল।

রাজা অনতিকালধ্যে শক্তি কে দেখিয়া কহিলেন, যেমন তুমি আমার প্রতি অসদৃশ শাপ প্রয়োগ লিখছি, তদনুসারে আনিও এক্ষণে মনুষ্যতক্ষ কৃতসঙ্কল্প হইলাম। এই বলিয়া তৎক্ষ। মহর্ষি শক্তির প্রাণসংহার করিল এবং ব্যাঘ্র যেমন অভীষ্ট পশু ভক্ষণ করে, সেইরূপ ঋমিকলেবর ভক্ষণ করিল। বিশ্বামিত্র শক্তিকে নিহত দেখিয়া বশিষ্ঠের অপর পুদিগকে ভক্ষণ করিবার নিমিত্ত রাক্ষসকে আদেশ প্রদান করিলেন। সিংহ যেমন শুদ্র ক্ষুদ্র পশুদিগকে সংহার করে, রাক্ষস ক্রোধবশ হইয়া সেইরূপ মহর্ষি শক্ত্রির অনুজদিগকে ভক্ষণ করিল।

অনন্তর বশিষ্ঠদেব ‘বিশ্বামিত্রের আদেশানুসারে শতপত্র সংহারিত হইয়াছে’ শ্রবণ করিলেন। যাদৃশ মহামহীধর বসুন্ধরাকে ধারণ করে, তিনি সেইরূপ অনিবাৰ্য শোকাবেগ ধারণ করিয়া রহিলেন। তথাচ তিনি কৌশিক বংশ উন্মলনে কৃতসঙ্কল্প হইলেন না। পরিশেষে আত্মত্যাগ মনস্থ করিয়া মেরুশিখরে আরোহণপূর্বক স্বদেহ পতিত করিলেন। তদীয় দেহ তুলরাশির ন্যায় শিলাখণ্ডে পতিত হইল, প্রাণবিয়োগ হইল না। তৎপরে মহাবন মধ্যে প্রদীপ্ত হুতাশনে প্রবেশ করিলেন। দেদীপ্যমান দহনে মহর্ষির দেহ দগ্ধ হইল না, প্রত্যুত, গাত্রে অনলের শীতল স্পর্শ অনুভূত হইল। পরিশেষে কণ্ঠদেশে নিতান্ত দুৰ্ভর শিলাখণ্ড বন্ধনপূর্বক জলধি জলে নিমগ্ন হইলন, কিন্তু স্রোতোবেগ প্রভাবে তিনি তারে উপনীত হইলেন। তখন মহর্ষি সাতিশয় সন্তপ্ত হইয়া অগত্যা পুনর্বার আশ্রমে প্রবেশ করিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *