শক্তিরূপেণ – কৌশিক দাশ
শক্তিরূপেণ – কৌশিক দাশ
Shoktirupeno By Koushik Das
প্রথম প্রকাশ : মার্চ, ২০২৪
প্রচ্ছদ : সৌরভ মিত্র
.
হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের এক অন্ধকার জগতে আপনাকে স্বাগত। স্কিন ট্র্যাফিকিং। যেখানে অল্প বয়সি মেয়েদের চামড়া ছাড়িয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয় দেশে-বিদেশে। শিশু-কিশোর-কিশোরীদের মাংস থেকে চামড়া—সব কিছুই যেখানে বিক্রয়যোগ্য।
তাঁকে বলা হয় ‘ডক্টর ডেভিল’। দক্ষতার সঙ্গে মানুষের চামড়া ছাড়িয়ে নেন তিনি। এর পরে সেই চামড়া বিক্রি হয়ে যায় দেশে-বিদেশে। কে এই ডক্টর?
নেপালের এক গ্রাম থেকে আসা তরুণীটি জড়িয়ে গিয়েছিল এক ভয়ঙ্কর মাকড়শার জালে। সেখান থেকে কি পালাতে পারবে সে? কলকাতার এক নামী স্কুলের ছাত্রীকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে মারাত্মক এক চক্রান্ত। কী আছে কিশোরীটির ভাগ্যে?
ভয়াল, ভয়ঙ্কর এক জগৎ! যেখানে মানুষ মানে শুধুই পণ্য। বিলিয়ন ডলার এই ইন্ডাস্ট্রির মাথায় যারা বসে আছে, তাদের হাতেই দেশের চাবিকাঠি। এই ব্যবসা তাই বন্ধ করবে কে?
তবু কেউ কেউ লড়াই করেন। যেমন, হিউম্যান ট্র্যাকিকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা এক অগ্নিকন্যা— পাঞ্চালী রায়। যেমন সিআইডি অ্যান্টি হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইউনিটের রুদ্রাণী সিংহ। এবং আরও কেউ কেউ। এই লড়াইয়ে তাঁরা যদি হেরে যান, তা হলে যে অপরাজিতা, অজন্তার মতো মেয়েরা হারিয়ে যাবে চিরতরে। অসম এই লড়াই কি জিততে পারবেন পাঞ্চালীরা?
শক্তিরূপেণ – মুম্বইয়ের কোনও এক জায়গা থেকে শুরু হওয়া কাহিনি ছড়িয়ে পড়েছে কলকাতা, লস অ্যাঞ্জেলেস, দুবাই, প্যারিস, সুরাটে। যে কাহিনির অন্ধকার গলিতে হাঁটতে হাঁটতে চেনা লোক অচেনা হয়ে যায়, অচেনা লোক চেনা। সাহস আছে আপনার এই নরকে পা রাখার?
.
শুরুর কথা
স্কিন ট্র্যাফিকিং কথাটা আমি প্রথম শুনি বছরখানেক আগে সুন্দরবনে একটা ত্ৰাণ শিবিরে যাওয়ার পথে। মানুষের, বিশেষ করে কমবয়সি মেয়েদের গায়ের চামড়া তুলে নেওয়া হচ্ছে। তার পরে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংরক্ষিত করে রাখা হচ্ছে সেই চামড়া। সে সব চামড়া পরে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে বিদেশে। ইউরোপে নাকি এই সব চামড়ার এখন বিশেষ চাহিদা আছে।
ভীষণই কৌতূহলী হয়ে পড়লাম। এর পরে শুরু করলাম ইন্টারনেটে তথ্য সন্ধান। স্কিন ট্র্যাফিকিং নিয়ে একটা প্রতিবেদন ভেসে উঠল। ২০১৭ সালে ‘ইউথ কি আওয়াজ’ বলে একটি ওয়েবসাইটে লিখেছিলেন এক বাঙালি সাংবাদিক সোমা বসু। কীভাবে নেপালি মেয়েদের চামড়া তুলে নেওয়া হচ্ছে। কোথাও ইচ্ছাকৃত ভাবে, অর্থের বিনিময়ে। কোথাও জোর করে, মেয়েটার অজানতে। তার পরে এই চামড়া নানা ভাবে সংরক্ষণ করে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সেখানে তৈরি হচ্ছে নানা রকম পণ্য। তার পরে সেই পণ্য আবার ভারতে চলে আসছে। ব্যবহৃত হচ্ছে কসমেটিক সার্জারির ক্ষেত্রে। আমার এই উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে ওই প্রতিবেদনটিও প্রচুর সাহায্য করেছে। সেই জন্য আমি সোমা কাছে কৃতজ্ঞ।
ওই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পরে নেপাল সরকার নড়েচড়ে বসে। সরকারের তরফে জানানো হয়, এই ব্যাপারে তদন্ত করে দেখা হবে। অর্গ্যান ট্র্যাফিকিংয়ে একটা নতুন মাত্রা যোগ করে এই স্কিন ট্র্যাফিকিং। পরে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সও এই নিয়ে খবর করে। এই প্রতিবেদন লেখার সুবাদে Kurt Schork Memorial Award পান সোমা। প্রশংসিত হন নানা মহলে।
সোমা এখন ফিনল্যান্ডে গবেষণারত। সাংবাদিকতা আর করেন না। তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছিলাম ওই প্রতিবেদনের নেপথ্য কাহিনি। সোমা বলেছিলেন, “ভারত-নেপাল সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে আমি তদন্ত চালিয়েছিলাম। যে-মেয়েরা এই অর্গ্যান ট্র্যাফিকিংয়ের শিকার হয়েছিল, তাদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। বেশ কয়েক বছরের পরিশ্রমের পরে ওই আর্টিকেল লিখি।” সোমা জানান, তাঁর ওই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরে নড়েচড়ে বসে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও।
কিন্তু এর পরে আর কেন স্টোরিটার ফলো আপ হল না? সোমার জবাব, “আমি নিজের অর্থে, একক প্রচেষ্টায় এই খবরটার জন্য ঝাঁপাই। কারও সাহায্য পাইনি। এর পরে আমার রিসোর্স ফুরিয়ে যায়। ফলে আমার পক্ষে আর ওই খবরের পিছনে ছোটা সম্ভব হয়নি।” জানা যায়, এর পরে অনেক নেপালি মেয়েও আর মুখ খুলতে চাননি। সোমা এখন সাংবাদিকতা থেকে পুরোপুরি দূরে সরে এসে গবেষণার কাজে ব্যস্ত। তাই বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক কী, সে সম্পর্কে আর খবর রাখেন না।
আমার আর একটি সোর্সের মুখে শুনি এই স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের কথা। এখন নাকি ডালপালা মেলেছে এই ভয়ঙ্কর রোগ। নানা জায়গায় কথা বলতে গিয়ে এই নিয়ে দু’রকম তত্ত্ব শুনতে পেলাম। এক, এখনও স্কিন ট্র্যাফিকিং চলছে। কসমেটিক বা রিকনস্ট্রাক্টিভ সার্জারি বিশ্ব জুড়ে জনপ্রিয় হয়ে পড়ার কারণে স্কিন ট্র্যাফিকিংও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। দুই, এখন অনেক ক্ষেত্রে সিন্থেটিক প্রোডাক্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, যে-কারণে মানুষের চামড়ার প্রয়োজন কমছে। তবে কেউ কেউ বলছেন, মানুষের চামড়ার প্রয়োজন থাকবেই।
স্বীকার করে নিচ্ছি, এই মুহূর্তে স্কিন ট্র্যাফিকিং ঠিক কী অবস্থায়, তা আমি জোর দিয়ে বলতে পারব না। এই অন্ধকার জগতের খুব ভিতরে পা না- রাখলে পুরো ছবিটা পরিষ্কার হওয়া সম্ভব নয়। আর অত ভিতরে ঢুকলে মনে হয় না কারও পক্ষে বেঁচে ফিরে আসা সম্ভব।
স্কিন ট্র্যাফিকিং যে-অবস্থাতেই থাকুক না কেন, হিউম্যান ট্র্যাফিকিং যে- ভয়ঙ্কর অবস্থায় চলে গিয়েছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। একটি মেয়ে বা ছেলের শরীরকে বার বার বিক্রি করা যায়। ছোটবেলায় বাড়ির কাজের লোক হিসেবে, একটু বড় হলে যৌন ব্যবসায়, তার পরে অর্গ্যান ট্র্যাফিকিংয়ে, যার মধ্যে স্কিন ট্র্যাফিকিংও পড়ে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিকার হয় মেয়েরা, তবে ছেলেদের সংখ্যাও বাড়ছে। আমি একটি মেয়ের কথা শুনেছি, যাকে নাকি ২২ বার বিক্রি করা হয়েছিল! হ্যাঁ, ২২ বার।
এই হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে লড়াই চালিয়ে আসছেন পল্লবী ঘোষের মতো যোদ্ধারা। যাঁরা একেবারে কোর এরিয়ায় গিয়ে ট্র্যাফিকিং রোখার চেষ্টা করছেন। ট্র্যাফিকিংয়ের শিকার হয়ে যাওয়া বাচ্চাদের উদ্ধার করছেন। যদিও অসম যুদ্ধ, তাও তাঁরা লড়াই থেকে সরে আসছেন না।
সব চেয়ে ভয়ঙ্কর প্রশ্ন, এই হিউম্যান ট্র্যাফিকিং থামানোর জন্য সে- ভাবে কোনও উদ্যোগ কি আদৌ নেওয়া হচ্ছে? কোটি কোটি টাকার ব্যবসা এই হিউম্যান ট্র্যাফিকিং। সমাজের খুবই উচ্চ স্তরে বিরাজ করেন, এমন সব মানুষ এই অপরাধের সঙ্গে নানা ভাবে জড়িত।
দারিদ্র, জনসংখ্যা, আইনের ফাঁক-ফোকড়— সব কিছু মিলিয়ে হিউম্যান ট্র্যাফিকিং হয়ে উঠেছে সমাজের অন্যতম ভয়ঙ্কর ব্যাধী। আমাদের চার পাশেই এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আর আমরা চোখ বন্ধ করে রয়েছি। ভাবছি, আমাদের পরিবারে তো আঁচ পড়বে না। তা হলে অত ভেবে কী লাভ?
এত দ্রুত স্পোর্টস থ্রিলারের ঘরানার বাইরে বেরিয়ে এসে এই উপন্যাস লিখব, ভাবিনি। কিন্তু এমন কিছু ঘটনা কানে এল, যার পরে মনে হল, একটা প্ল্যাটফর্মে এই নিয়ে কিছু বলা দরকার। তা সে কল্পকাহিনিই হোক না!
একটা বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ অবশ্য দিয়ে রাখতে হচ্ছে। এটি একটি কাল্পনিক কাহিনি। এই কাহিনির কোনও ঘটনা বা চরিত্রের সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়।
উপন্যাস লেখার প্রথম দিন থেকেই পাশে পেয়েছি শপিজেন বাংলা প্রকাশনী সংস্থার তিন মুখ প্রিয়ব্রত বসু, সুপর্ণা মজুমদার এবং দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এই বই লেখার ক্ষেত্রে দেবদত্তার পরামর্শও কাজে দিয়েছে।
ভূমিকা শেষ করার আগে একটা কথা বলে নিতে চাই। ফিল্ডে কাজ করা মানুষজনের মুখেই শুনছিলাম, হিউম্যান ট্র্যাফিকিং এখন এমন ভাবে ডানা মেলেছে যেখানে শুধু গরিব, গ্রামের পিছিয়ে পড়া, অশিক্ষার অন্ধকারে ঢেকে থাকা ছেলেমেয়েরাই এর শিকার হচ্ছে না। শহুরে, শিক্ষিত, পয়সাওয়ালা ঘরের ছেলেমেয়েদেরও শিকার বানানো হচ্ছে। শুধু অল্পবয়সি ছেলেমেয়েরা নয়, বাড়ির বৌয়েরাও এদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
আমি-আপনি চোখ বন্ধ করে বালিতে মুখ গুঁজে রয়েছি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচা যাবে তো?
কৌশিক দাশ
.
কৃতজ্ঞতা
আমার স্কুলের তিন বন্ধু, অদিতি, বিষ্ণুপ্রিয়া আর সুপর্ণাকে ধন্যবাদ দিতেই হবে। হাজার কাজের মধ্যেও অদিতি আমার বইটি দারুণ ভাবে সম্পাদনা-করেছে। বেশ কিছু জায়গায় বদল করার পরামর্শ দিয়েছে।
বিষ্ণুপ্রিয়া নিজে ডাক্তার। এই বইয়ের চিকিৎসা সংক্রান্ত টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো ও দেখে দিয়েছে। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছে লেখাকে ধারালো করে তুলতে।
সুপর্ণা না-থাকলে হয়তো এই উপন্যাসের প্লটটাই পেতাম না। সুপর্ণার সংস্থা ‘প্রচেষ্টা’ বৃদ্ধবৃদ্ধাদের নিয়ে কাজ করে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায়। পাশাপাশি হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক প্রচারও করে এই সংস্থা। সুন্দরবনে প্রচেষ্টার এক শিবিরে যাওয়ার পথে প্রথম শুনি স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের ব্যাপারটা।
এ ছাড়া বলতে হবে আমার ভগ্নিপতি সৌমেন সরকারের কথা। সৌমেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক। এই বইয়ে পুলিশি তদন্তের প্রক্রিয়া, সাইবার-তদন্তের ক্ষেত্রে কী সমস্যা হয়, তা জানিয়েছে সৌমেন।
এদের পাশে না-পেলে এই বইটি লেখাই হত না।
.
উৎসর্গ
‘যোদ্ধা’ পল্লবী ঘোষকে। যিনি নিরন্তর লড়াই করে চলেছেন হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের বিরুদ্ধে। যিনি পাচারকারী দুষ্কৃতীদের কবল থেকে দশ হাজারেরও বেশি শিশু-কিশোর-কিশোরীকে উদ্ধার করেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। সেই লড়াইয়ে পাশে থাকার সামান্য প্রয়াস এই বইটি।
.
কৌশিক দাশ
জন্ম ১৯৭২ সালের ১ জুলাই, কলকাতায়। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি করার সময় ১৯৯৫ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগদান। ১৯৯৬ সাল থেকে ক্রীড়া বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে আনন্দবাজার পত্রিকার ক্রীড়া বিভাগের সহকারী সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। ক্রীড়া সাংবাদিক জীবনে বাংলাদেশে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের অধিনায়ক হিসেবে টেস্ট অভিষেক থেকে বার্সেলোনায় লিয়োনেল মেসির ম্যাচ কভার করার অভিজ্ঞতা, সবই রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই খেলা এবং সাহিত্যের প্রতি টান। যার মেলবন্ধন ঘটে আনন্দবাজার ক্রীড়া দফতরে আসার পরে। ২৮ বছরের ক্রীড়া সাংবাদিকতায় এমন অনেক ঘটনা ও কাহিনির সাক্ষী আছেন, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সংবাদপত্রে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। সেই অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে উপন্যাসে।
লেখকের বিশেষত্ব হল বাস্তবের পটভূমিকায় কাহিনিকে গড়ে তোলা। ‘শয়তানের মা’ ও ‘শিকারের সন্ধানে’ সেই রাস্তা ধরে এগিয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। লেখকের তৃতীয় বই, ‘শক্তিরূপেণ’ একটি ডার্ক থ্রিলার। এ ক্ষেত্রেও লেখায় ফুটে উঠেছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছাপ।



Leave a Reply