প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

১১. দ্য রেসকিউ সেন্টার

১১. দ্য রেসকিউ সেন্টার

মুম্বই। আন্ধেরির কোনও এক জায়গায়, ২০২৩

পুলিশ তাকে এখানে এনেছে ৪৮ ঘণ্টা আগে। প্রথমে যখন গাড়িটায় একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে, ঠিকমতো বুঝতে পারেনি সে। তখনও তার হুঁশ ছিল না। কিন্তু শরীরে একটা ধাক্কা অনুভব করে। আস্তে আস্তে যেন চেতনাটা ফিরে আসছিল।

সেই আধো-চেতনার মধ্য দিয়ে মেয়েটি বুঝতে পারে, তাকে স্ট্রেচার করে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার পরে একটা বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হল। তখনও চোখটা খুলতে পারছিল না মেয়েটা। এর পরে হাতে একটা সুঁই ফোটানোর যন্ত্রণা। তার পরে আবার অন্ধকারে ডুবে যাওয়া। এই অন্ধকারটা বড় ভয়ঙ্কর। এই সময় কোনও স্বপ্ন দেখা যায় না, দুঃস্বপ্নও নয়। মনে হয়, এক ঘণ্টা-দু’ঘণ্টা-তিন ঘণ্টা যেন জীবন থেকে কেউ শুষে নিয়েছে। ঠিক যেমন ব্লটিং পেপার দিয়ে কালি শুষে নেওয়া হয়।

এর পরে যখন জ্ঞান ফিরে আসে, সামনে সাদা অ্যাপ্রন পরা একটি মেয়েকে দেখতে পায় সে। এই পোশাকটা সে ভাল করেই চেনে। বুঝে গেল, সামনের মেয়েটি একটি নার্স। কিন্তু বুঝতে পারছিল না সে ঠিক কোথায় আছে। নার্সের পোশাক পরা মেয়েটি এ বার তার দিকে তাকিয়ে হাসল। তার পরে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছ তুমি? কোনও সমস্যা হচ্ছে না তো?”

মেয়েটা অল্প করে মাথা নাড়ল। কী বলবে বুঝতে পারছিল না। সমস্যা! সে তো তার জীবনকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়েই আছে। আর সে সব সাধারণ সমস্যা নয়। মেয়েটা একটা জিনিস তখনও বুঝতে পারছিল না। সে ঠিক কোথায় আছে এখন। নার্সটি বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। মেয়েটা এ বার ঘাড় ঘুরিয়ে আশপাশটা দেখার চেষ্টা করল। তার দু’ধারে আরও কয়েকটা বেড রাখা আছে। সেখানে ও মনে হচ্ছে কারা যেন শুয়ে আছে। ঘরটা অনেকটা হাসপাতালের ওয়ার্ডের মতো। তা হলে কি সে কোনও হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে? মেয়েটার মনে ধুকপুকুনি বেড়ে যেতে লাগল।

একটু পরেই নার্সের সঙ্গে ঘরে ঢুকে এল ডাক্তারের পোশাক পরা একটা মানুষ। মেয়েটির সামনে এসে ভাল করে এক বার দেখে জিজ্ঞেস করল, “তোমার কোথাও যন্ত্রণা হচ্ছে?”

মেয়েটির শরীরে সত্যিই যন্ত্রণা হচ্ছিল। বিশেষ করে বাঁ-কাঁধের দিকটায়। সে দিকে ইঙ্গিত করল সে। ডাক্তার মাথা নাড়ল। তার পরে জানতে চাইল, “আর মুখে?”

মেয়েটা এ বার চমকে উঠল। নিজের অজানতেই হাতটা চলে গেল মুখে। আর শিউরে উঠল সে। নিজেকে আর সামলাতে পারল না। দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। ডাক্তার দ্রুত বলে উঠলেন, “আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি একটু ঘুমনোর চেষ্টা করো। আমি আবার পরে আসব।”

মেয়েটা চোখ বন্ধ করার আগে দেখতে পেল সাদা পোশাক পরা ডাক্তারের শরীরটা দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই রকম একটা দৃশ্য যেন তার মাথায় ধরা আছে। মাঝেমধ্যেই দেখতে পায়, সাদা পোশাক পরা একটা মুখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝেমধ্যে গভীর ঘুম থেকে কোনও মতে জেগে ওঠার পরে যখন চোখের পাতাটা সামান্য খুলতে পারে, তখন আবছা দেখতে পায়, দূরে এই রকম সাদা পোশাক পরা একটা শরীর মিলিয়ে যাচ্ছে। যত বারই সেই সাদা পোশাকের শরীরটা চোখে পড়ে মেয়েটার, অন্তরাত্মা শুকিয়ে আসে তার। তবে এ দিন আধো-চেতনার মধ্যেও একটা জিনিস বুঝতে পারে মেয়েটা। অতীতের সেই দৃশ্যগুলোর সঙ্গে আজকের এই দৃশ্যের একটা পার্থক্য আছে!

“নাম কী তোমার?” আবার কারও একটা প্রশ্নে মেয়েটার আচ্ছন্ন ভাব কিছুটা কেটে গেল। একটু কষ্ট করে চোখ দু’টো খুলে সামনে তাকাল সে।

সামনে পুলিশের পোশাক পরা দু’জন লোক দাঁড়িয়ে। তাদেরই এক জন আবার প্রশ্নটা করল- নাম কী তোমার?

মেয়েটা মনে করার চেষ্টা করল। তার মা একটা নামে ডাকত তাকে। কিন্তু সে যেন কোন যুগের কথা। সেই সব স্মৃতি এখন ঝাপসা হয়ে এসেছে। কিন্তু তাও স্মৃতির অতলে ডুব মেরে নামটাকে খুঁজে আনল মেয়েটা

“আমার নাম অপরাজিতা। অপরাজিতা থাপা।”

পুলিশ দু’জন এক বার মুখ চাওয়াচাওয়ি করে নিল। তার পরে সিনিয়র অফিসার আবার প্রশ্ন করল, “কোথায় বাড়ি তোমার?”

“নেপাল।”

পুলিশ দু’জন আর কথা না বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সিনিয়র অফিসার তার জুনিয়রকে বলল, “মেয়েটা তা হলে নেপালেরই। চেহারা দেখে সে-রকমই মনে হচ্ছিল। এখন তো পরিষ্কার হয়ে গেল!”

জুনিয়রও মাথা নাড়ল, “তা হলে যে-আশঙ্কা করছিলাম, সেটাই মনে হচ্ছে ঠিক।” অফিসার সায় দিলেন, “ঠিকই। নেপালি মেয়েরা তো বেশি টার্গেট হয়ে উঠেছে।”

“কী করবেন এখন?”

“আমাদের কিছু করার নেই। ওপরওয়ালার কাছে খবর গিয়েছে। ওই হোমটায় মেয়েটাকে আজ পৌঁছে দিতে হবে। হাসপাতালও রাখতে চাইছে না। কারণ, চোট সে-রকম কিছু নেই।”

পুলিশের ভ্যানই তাকে দু’দিন আগে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছে এই হোমটায়। আরও অনেক মেয়ে আছে এখানে। কিন্তু তাকে আলাদা করে রাখা হল একটা ঘরে।

তার খাবারটাও এই ঘরে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সে বুঝতে পারছিল, পুলিশ বোধ হয় কোনও বিশেষ নির্দেশ দিয়ে গিয়েছে।

এই হোমটায় মহিলা কর্মীদের সঙ্গে পুরুষ সিকিয়োরিটি গার্ডও রয়েছে। প্রথম দিন বিকেলের দিকে তাদেরই এক জন এসে দেখা করে গেল অপরাজিতার সঙ্গে।

“কিছু চিন্তা কোরো না তুমি। সব ঠিক হয়ে যাবে। পুলিশ এসে কথা বলবে তোমার সঙ্গে। ওদের সব বোলো। বাড়ির কথা জানিয়ো। দেখবে, তোমাকে পুলিশ ঠিক বাড়িতে পৌঁছে দেবে।”

অপরাজিতা কী বলবে, ভেবে পেল না। সে আর বাড়ি ফেরার স্বপ্নও দেখে না। সেই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটার ছবি ক্রমে ধূসর হয়ে এসেছে তার স্মৃতিতে। যে-আতঙ্কের মধ্য দিয়ে তাকে রোজ যেতে হচ্ছে, সেই আতঙ্ক তাকে ক্রমে মানুষ থেকে পশু বানিয়ে তুলছে। যেখানে বেঁচে থাকার জন্য জৈবিক চাহিদা মেটানো ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবতে পারে না মেয়েটা।

এই নরকযন্ত্রণা থেকে সে কি কোনও দিন মুক্তি পাবে? বিছানায় মুখ গুঁজে আবার শুয়ে পড়ল অপরাজিতা।

প্রথম দিন রাতে এক জন জাঁদরেল মহিলা এসে অপরাজিতাকে বলল, “তোমার ঘরের বাইরে আমি পাহারায় থাকব। চিন্তার কিছু নেই। তুমি ঘরের দরজা ভিতর থেকে আটকাবে না।” অপরাজিতা বাধ্য মেয়ের মতো কথাটা শুনে নিল। না-শুনেও তার উপায় ছিল না।

প্রথম রাতটা বিছানায় শুয়ে ছটফট করেই কাটাল অপরাজিতা। কিছুতেই তার ঘুম আসছে না। দ্বিতীয় রাতে অবশ্য তার চোখের পাতাটা একটু বুজে এসেছিল। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। রাত ক’টা হবে, কোনও ধারণা ছিল না অপরাজিতার। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল মেয়েটা। হঠাৎ কী কারণে ঘুমটা ভেঙে গেল তার? মেয়েটা বুঝতে পারছিল না। কিন্তু তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিছু একটা ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

তার পরেই কারণটা স্পষ্ট হয়ে গেল। অল্প আলোয় বোঝা গেল, ঘরে ঢুকে এসেছে দু’টো ছায়ামূর্তি।

আতঙ্কে মুখ থেকে আওয়াজ বার করার একটা চেষ্টা করল অপরাজিতা। কিন্তু তার আগেই শক্তপোক্ত একটা হাত এসে তার মুখটা চেপে ধরল। অন্য ছায়ামূর্তিটা এগিয়ে এসে ঘরের লাইটটা জ্বালিয়ে দিল।

অপরাজিতা তাকিয়ে রইল ছায়ামূর্তি দু’টোর দিকে। তার শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *