প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৩. দ্য পেন্টার

৩. দ্য পেন্টার

ব্রডওয়ে, ডাউনটাউন লস অ্যাঞ্জেলেস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

১৪ মাস আগে।

পেন্টহাউসের জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে কয়েক মুহূর্তের জন্য যে— কারও চোখ আটকে যেতে বাধ্য। আকাশের অনেকটা জুড়ে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের সারি। আর নীচের দিকে তাকালে দেখা যাবে ব্যস্ত জনপদ। সকাল, বিকেল, সন্ধ্যা, রাত। সব সময় জীবন বয়ে চলেছে সিটি অব অ্যাঞ্জেলসে। এই শহর ঘুমোতে জানে না।

ডাউনটাউন লস অ্যাঞ্জেলেসে এই অ্যাপার্টমেন্টটা অত্যন্ত ধনাঢ্যদের জন্যই তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এই পেন্টহাউস অ্যাপার্টমেন্টটা। লিভিংরুমের লাগোয়া বিশাল জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেই দেখা যাচ্ছে লস অ্যাঞ্জেলেসের আকাশ। দুপুর বারোটা বাজলেও এ দিন আকাশ কিন্তু সে-রকম ঝকঝকে নয়। মেঘ ছেয়ে আছে। বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে অল্প সময় আগে। বাইরের তাপমাত্রাও অনেকটাই কমে গিয়েছে। শীতকালের এই সময়টা মাঝেমধ্যেই বৃষ্টি হয়।

জানলা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখার মতো কেউ অবশ্য তখন লিভিংরুমে ছিল না। যে-দু’জন ওই মুহূর্তে অ্যাপার্টমেন্টে হাজির ছিল, তারা তখন অন্য একটা ঘরে। পেন্টহাউসের মালিকের বয়স ৭০ পার হয়ে গিয়েছে। আর অতিথির বয়স কত, সেটা তার সুঠাম চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই। তিরিশ হতে পারে, চল্লিশও হতে পারে। দু’জনের মনেই তখন ভেসে উঠছিল আধ ঘণ্টা আগে ঘটে যাওয়া দৃশ্যগুলো।

এই অ্যাপার্টমেন্টের মালিক অবশ্য এখানে থাকেন না। তিনি এক জন মার্কিন সেনেটর। এ ছাড়া বনেদি ধনী। পূর্বপুরুষের অর্থ তো ছিলই, সঙ্গে যোগ হয়েছিল নিজের নানা উপার্জনের পথ। ফলে নামের পাশে ‘বিলিয়োনিয়ার’ শব্দটা বসে যেতে সময় লাগেনি। আর বিলিয়োনিয়াররা এই সব অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন না। তাঁরা এই ধরনের বাড়ি ভাড়া করে রাখেন, বিশেষ বিশেষ শখ মেটানোর তাগিদে।

সেনেটরও এই তালিকাতেই পড়েন। সপ্তাহে এক বার তাঁর এই অ্যাপার্টমেন্টে আসা চাই-ই। পেন্টহাউস অ্যাপার্টমেন্টের একটা প্রাইভেট এনট্রান্স আছে। যেখান দিয়ে শুধু এই অ্যাপার্টমেন্টের মালিক আর তাঁর অতিথিরাই আসতে পারবেন। সপ্তাহে ছ’দিন এই ব্যক্তিগত রাস্তায় সিসিটিভির নজরদারি চললেও একটা দিন বন্ধ থাকে যন্ত্রিক চোখ। যে-দিন সেনেটর এবং তাঁর বিশেষ কোনও অতিথি এই অ্যাপার্টমেন্টে পা রাখে। এ দিনও যেমন রেখেছে।

যৌবন থেকেই যে-সেনেটর এই শখের বশবর্তী, তা কিন্তু নয়। বয়স পঞ্চাশের উপরে চলে যাওয়ার পরে তিনি আবিষ্কার করেন, নারীসঙ্গের পাশাপাশি পুরুষরাও তাঁকে আকৃষ্ট করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে লম্বা, সুঠাম চেহারার পুরুষ। যার শরীর থেকে পুরুষালি জৌলুস ঝরে পড়বে। আরও একটা ব্যাপারের উপরে তীক্ষ্ণ নজর আছে সেনেটরের। এই শখ তিনি বহির্বিশ্ব থেকে গোপনই রাখতে চান। যে-কারণে বিশেষ কোনও পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া তো দূরের কথা, দ্বিতীয় বার তাকে কাছে ডাকেননি সেনেটর। তাঁর এক অত্যন্ত গোপনীয় সোর্সের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন পুরুষ শয্যাসঙ্গী পেয়ে যান তিনি।

এ দিনও যেমন পেয়েছেন। সুরেলা কলিংবেলটা বেজে ওঠার মিনিট দু’য়েকের মধ্যে দরজার সিকিয়োরিটি লকটা খুলে অতিথিকে ঘরে ডেকে নেওয়ার সময় থেকেই সেনেটরের মনটা একটা অন্য রকম আনন্দে ভরে যায়। অনেককে দেখেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর সামনে এখন যে-দাঁড়িয়ে আছে, সে-রকম সুপুরুষ লোক কমই দেখেছেন।

প্রায় ছ’ফুট উচ্চতা। নিখুঁত থ্রি পিস সুটের বাইরে থেকেও বোঝা যাচ্ছিল পেশিবহুল চেহারার আদল। সব চেয়ে আকৃষ্ট করল মুখ আর মুখের চামড়াটা। গ্রিক দেবতার মতো টানা নাক আর চোখ। ঠোঁট দু’টো সামান্য পাতলা। আর চামড়ার রংটা পুরো তামাটে। যা মার্কিন মুলুকে প্রায় বিরল। দেখে মনে হয় মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার কোনও লোক। বয়স বোঝা সত্যিই কঠিন। তিরিশ, চল্লিশ যা কিছুই হতে পারে। সেনেটরের অবশ্য তখন অতিথির বয়স বোঝার মতো অবস্থা ছিল না।

তাঁর হাতটা উত্তেজনায় কাঁপছিল। ধীরে ধীরে লোলচর্ম মানুষটি তাঁর স্থূলকায় আঙুলগুলো সামনে দাঁড়ানো লোকটির মুখে বোলাতে লাগল। আর একই সঙ্গে অনুভব করতে লাগল নিজের শরীরে বয়ে যাওয়া ইলেক্ট্রিক শকটা। লোকটা অল্প হাসল। তার পরে গ্লাভস পরা দু’হাতে সেনেটরের আঙুলগুলো ধরে গাঢ় স্বরে বলল, “আপনাকে আজ আমি স্বর্গে পৌঁছে দেব। একটু অপেক্ষা করুন।”

গ্লাভস পরে থাকা সত্ত্বেও লোকটার আঙুলের স্পর্শে সেনেটরের মনে হচ্ছিল, তিনি তখনই স্বর্গে পৌঁছে গিয়েছেন। তাঁর হাঁটু দু’টো অল্প কাঁপতে লাগল। লোকটা ধীরে ধীরে সেনেটরের স্পর্শ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সামান্য দূরে সরে গেল। তার পরে পোশাক খোলায় মন দিল।

সেনেটর আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। সামনে রাখা সোফাটায় নিজের শরীরটা এলিয়ে দিয়ে দৃষ্টিসুখ উপভোগ করতে লাগলেন!

একটু একটু করে পোশাকের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এল লোকটির সুঠাম শরীর। লোলুপ, কামার্ত দৃষ্টিতে যে-শরীরের দিকে তাকিয়ে রইলেন সেনেটর। অসম্ভব সুঠাম একটা শরীর। প্রতিটা মাংসপেশি যেন মিকেলাঞ্জেলোর মতো কোনও শিল্পী নিখুঁত দক্ষতায়, নিরলস পরিশ্রমে ফুটিয়ে তুলেছে। কাঁধ, হাত, বুক, পেট— সেনেটরের দৃষ্টি আরও নীচে নামতে গিয়ে আটকে গেল! আর ওই গায়ের চামড়া! যেন কোনও ব্রোঞ্জের মর্মরমূর্তি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু ওই তামাটে চামড়ার জন্যই আরও বেশি করে মানুষটাকে কাছে টেনে নিতে ইচ্ছে করছিল সেনেটরের।

ধীরে ধীরে বয়স্ক মানুষটার সামনে এসে দাঁড়াল অতিথিটি। দু’হাতে তাঁর কাঁধ দু’টো ধরে আস্তে করে টেনে তুলল। সেনেটরের তখন দাঁড়ানোর অবস্থা নেই। কাঁপতে কাঁপতে সামনে দাঁড়ানো লোকটির গোপনাঙ্গে হাত দেওয়ার চেষ্টা করলেন সেনেটর। অল্প হেসে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে সুপুরুষ অতিথিটি বলে উঠল, “আর একটু অপেক্ষা করুন। বলেছি তো, আপনাকে স্বর্গসুখ দেব।” তার পরে একটু হেসে বলল, “সে জন্য আমাদের একটু বাথটবের সাহায্য নিতে হবে।”

সেনেটরের শরীর দিয়ে তখন যে-অনুভূতির স্রোত খেলা করছিল, তার স্বাদ তিনি অনেক দিন পাননি। সত্তর পার হয়ে যাওয়ার পরে এই প্রথম শরীরে আবার উদ্দাম যৌবনের একটা আঁচ তিনি টের পাচ্ছিলেন। সেনেটর নিজের পোশাক খোলার দিকে নজর দিলেন। কিন্তু লোকটা তাঁকে নিরস্ত করল।

“এখানে নয়, বাথরুমে গিয়ে।”

সেনেটর আর দেরি না-করে এগিয়ে গেলেন বাথরুমের দিকে। পিছনে লোকটি। যার শরীরে এক টুকরো সুতো পর্যন্ত নেই।

“এ বার গরম জলটা চালিয়ে দিন বাথটবের। দেখবেন, টেম্পারেচরটা যেন বেশি থাকে।”

সেনেটর আর দেরি করলেন না। বাথটবে জল ভরার সঙ্গে সঙ্গে ঢেলে দিলেন অত্যন্ত দামি এক শিশি বাবল বাথ। বাথটবের জল ঢেকে গেল গোলাপি ফেনায়।

“এ বার পোশাকটা খুলে ফেলুন।”

এই কথাটাই শোনার অপেক্ষায় ছিলেন সেনেটর। দ্রুত গাউনটা খুলে রেখে দু’হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। অতিথিটি এক বার হাসল। অন্য কেউ বাথরুমে থাকলে তার গা অবশ্য ঘিনঘিনও করে উঠতে পারত। লোলচর্ম, নগ্ন, পেটমোটা এক বৃদ্ধ দু’হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে! এই রকম কুৎসিত দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।

প্রায় ছ’ফুট চেহারাটা এ বার এগিয়ে গেল বাথটবের কাছে। হাত বাড়িয়ে বন্ধ করে দিল জলের কলটা। বাবল আর জলে বাথটব তখন প্রায় কানায় কানায় ভর্তি। লোকটি এ বার আস্তে করে হাত বাড়িয়ে দিল সেনেটরের দিকে। সেনেটরের ডান হাতটা ধরে ধীরে ধীরে, অত্যন্ত সাবধানে তাঁকে বসিয়ে দিল বাথটবের মধ্যে। বয়স হয়েছে মানুষটার, পা পিছলে গেলে বিশ্ৰী চোট লেগে যেতে পারে। সেই ঝুঁকি নিতে চায় না অতিথি।

সেনেটর নিজের শরীরটা ডুবিয়ে দিলেন বাবল বাথে। টানটান হয়ে শুয়ে পড়লেন বাথটবে। তাঁর পাঁচ ফুট ন’ইঞ্চির শরীরে পুরো বাথটব প্রায় ভরে গিয়েছিল। পা দু’টো ছুঁয়েছিল এক প্রান্ত, মাথাটা অন্য প্রান্ত।

লোকটি এ বার হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল বাথটবের পাশে। ধীরে ধীরে বাবল বাথের মধ্যে হাত নামিয়ে আঙুল বোলাতে লাগল সেনেটরের শরীরে। থেমে থাকলেন না সেনেটরও। প্রায় কাঁপতে কাঁপতে ডান হাতটা বুলিয়ে চললেন সামনে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা মানুষটার শরীরে। ওই চামড়ার স্পর্শ তাঁকে সম্পূর্ণ অন্য জগতে নিয়ে গিয়েছে। মনে মনে রিওয়াইন্ড করে নিচ্ছিলেন এত ক্ষণ কী ঘটল। তার পরে একটা ব্যাপার ঠিক করে নিলেন। ওই চামড়ার মালিককে তাঁর চাই। আর নয়, এ বার একটা পাকাপাকি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। আর তুলতে হবে এই লোকটার সঙ্গেই। হঠাৎ একটা ব্যাপার খেয়াল হল সেনেটরের। লোকটার নামই তো জানা হয়নি! “তোমার নামটা তো এখনও বলোনি!”

লোকটা আবার হাসল। যে-হাসিতে লুকিয়ে আছে এক অমোঘ আকর্ষণ। তার পরে ফিসফিস করে বলল, “আমার নাম দ্য পেন্টার।”

“দ্য পেন্টার? এটা আবার কী রকম নাম?”

“আসলে আমি এক জন শিল্পী। তাই লোকে আমাকে ভালবেসে ডাকে পেন্টার বলে। আমার শিল্পকলা আপনি টের পাচ্ছেন না? বলেছিলাম না, আপনাকে স্বর্গে পৌঁছে দেব।”

লোকটার হাত সেনেটরের গলা, বুক, পেট হয়ে আরও নীচের দিকে নামতে লাগল। সেনেটরের মুখেও এ বার একটা হাসি ফুটে উঠল। নাহ, এ শুধু শিল্পী নয়। জাত শিল্পী। এর আঙুলের স্পর্শ এক জনকে সত্যিই স্বর্গে পৌঁছে দিতে পারে। সেনেটরের চোখ দু’টো বন্ধ হয়ে এল তৃপ্তিতে। তাঁর মাথাটা ধীরে ধীরে হেলে যেতে লাগল পিছনের দিকে। ফিসফিস করে সেনেটর বললেন, “তোমাকে আমার চাই। চিরদিনের জন্য।”

“আমিও চাই আপনাকে। চিরদিনের মতো।”

পেন্টারের হাতটা এ বার ওপর দিকে উঠতে লাগল। আঙুলগুলো সেনেটরের বুকের ওপর দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে জলের উপরে ভেসে উঠল। বাথটবের জল তখন সেনেটরের গলা পর্যন্ত চলে এসেছে।

পেন্টার এ বার আঙুলগুলো গুটিয়ে নিল। ডান হাতের চেটোটা হাল্কা করে রাখল সেনেটরের থুতনির নীচে। সেনেটর তখন তৃপ্তিতে প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছেন। বিড়বিড় করে কী একটা বলার চেষ্টা করলেন বৃদ্ধ লোকটি। কিন্তু কথাটা আর শেষ করতে পারলেন না। পেন্টারের চেটোটা একটু শক্ত হয়ে উঠল। তার পরে অল্প জোরের সঙ্গে সেনেটরের মাথাটা ঠেলে দিল পিছনের দিকে।

ওইটুকুই যথেষ্ট ছিল। সেনেটরের মাথার পিছনটা সজোরে গিয়ে লাগল বাথটবের উপরের অংশে। ফট করে একটা শব্দ হল। পেন্টার তত ক্ষণে হাতটা সরিয়ে নিয়েছে। সে জানত, দ্বিতীয় ধাক্কা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন হবে না। দ্বিতীয় ধাক্কা দেওয়া যাবেও না। তা হলে পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টে ধরা পড়ে যাবে। সেনেটরের শরীরটা এ বার ধীরে ধীরে ডুবে গেল বাবল বাথের মধ্যে। গোলাপি জলে হাল্কা লালের ছোঁয়া তত ক্ষণে লেগে গিয়েছে।

পেন্টার এ বার উঠে দাঁড়াল। তাকিয়ে রইল তার শিল্পকর্মের দিকে। সেনেটরের শরীর মিলিয়ে গিয়েছে বাবল বাথের আড়ালে। মিনিট দুয়েক অপেক্ষা করে হাতটা ডুবিয়ে সেনেটরের গলার কাছটা এক বার পরীক্ষা করে নিল পেন্টার। নাহ, প্রাণ নেই। থাকার কথাও নয়। পুরো বাথরুমটায় এক বার চোখ বোলাল পেন্টার নামের ব্যক্তিটি। সেনেটরের গাউনটা হুকে ঝুলছে। বাবল বাথের শিশিটা রয়েছে বাথটবের পাশে রাখা একটা ছোট টেবিলের উপরে। থাক, কোনও সমস্যা নেই।

আবার বাথটবের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল পেন্টার। তার পরে হাতের তেলোর সাহায্যে বাথটবের আশেপাশে ছিটিয়ে দিতে লাগল বাবল বাথের জল। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় একটা শরীর জলে পড়লে, যে-ভাবে জল ছলকে পড়ে, ঠিক সে ভাবে। তার পরে জলে হাত ঢুকিয়ে আলতো করে সেনেটরের পা দু’টো একটু ছেতরে দিল। একটা শরীর ওপর থেকে পড়লে, পা দু’টোর অবস্থান যেমন হয়, সে-রকম আর কী!

কাজ শেষ করে সেনেটরের জলে ডোবা শরীরের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল পেন্টার। তার পরে চাপা গলায় বলল, “আপনাকে দেওয়া কথাটা মনে হয় রাখতে পারলাম না। আপনি তো স্বর্গে নন, যাবেন নরকে। তবে চিন্তা করবেন না। মরলে আমিও সোজা নরকেই যাব। তখন আবার দেখা হবে।”

ধীরে ধীরে লিভিংরুমে চলে এল পেন্টার। প্রথমে পরে নিল চামড়ার গ্লাভস জোড়া। তার পরে পুরো পোশাক। বাইরের তাপমাত্রা বেশ কম থাকলেও ঘরের ভিতরে ক্লাইমেট কন্ট্রোল যন্ত্র পরিবেশ খুবই আরামদায়ক রেখেছে। আর দেরি না-করে দেওয়ালে লাগানো একটা নব ঘুরিয়ে ঘরের তাপমাত্রা কমাতে লাগল পেন্টার। ২৬ থেকে ১৪ ডিগ্রিতে নেমে এল লিভিংরুমের টেম্পারেচর।

পেন্টার হাসল। মার্কিন মুলুকের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন, অর্থাৎ সিডিসি-র একটা রিপোর্টের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বয়স্ক মানুষ, বিশেষ করে যারা অ্যাথেরোস্কলেরোসিসে ভোগে, তাদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাবশত মৃত্যু অনেক সময় বাথটবে স্নান করতে গিয়ে হয়। আর এই মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পায় শীতকালে। তার একটা বিশেষ কারণও আছে।

অনেক সময় দেখা যায়, লিভিংরুম বা বেডরুমের তাপমাত্রা বেশ কম থাকে। ওই অবস্থায় কেউ যখন বাথটবের গরম জলে শরীর ডুবিয়ে দেয়, তখন শরীরের মধ্যে হঠাৎ করে পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে। বিশেষ করে যারা অ্যাথেরোস্কলেরোসিসে আক্রান্ত। এই রোগে মানুষের শরীরে ফ্যাটস, কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ধমনীর দেওয়াল সঙ্কুচিত হতে থাকে। প্লোক জমে যায়। এর ফলে রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। ওই অবস্থায় ঠান্ডা আবহাওয়া থেকে গরম জলে হঠাৎ শরীর ডুবিয়ে দিলে রক্তচাপ দুম করে কমে যেতে পারে। যার ফলে নার্ভাস সিস্টেমে রক্তপ্রবাহের মাত্রাও ধাক্কা খাবে। ওই অবস্থায় জ্ঞান হারানোটা খুবই স্বাভাবিক। এই ধরনের বাথটব দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এটা খুবই সাধারণ একটা কারণ।

এই অপারেশনে আসার আগে পেন্টার খুব মন দিয়ে সেনেটরের মেডিক্যাল ফাইলটা পড়ে নিয়েছিল। আর তার পরে ব্যক্তিগত ফাইল। দু’সপ্তাহের নজরদারি। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সেনেটর কোথায় থাকেন, বার করতে সমস্যা হয়নি। সমস্যা হয়নি, সেনেটরের ওই বিশেষ সোর্সকে প্রভাবিত করতে। তার এবং তার বসের হাত অনেকটাই লম্বা।

লিভিংরুমটা এক বার ভাল করে দেখে নিল পেন্টার। তাপমাত্রা ভালই কমে গিয়েছে। এ বার সুটের পকেট থেকে এক টুকরো কাপড় বার করে ঘরের বিশেষ বিশেষ কয়েকটা জায়গা মুছে দিল পেন্টার। একই কাজ করল বাথরুমে গিয়েও। তার প্রায় ফোটোগ্রাফিক মেমোরিতে ধরা আছে সেনেটরের পেন্টহাউসে প্রবেশ করার পরে গ্লাভসহীন অবস্থায় সে কোন কোন জায়গা ছুঁয়েছিল।

পুরো অপারেশনটা শেষ করে ঘরটা আরও এক বার ভাল করে দেখে নিল পেন্টার। ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ এটাকে দুর্ঘটনা বলেই ধরে নেবে। অন্য কোনও সন্দেহ হলেও এক সেনেটরের মৃত্যু নিয়ে বিশেষ জলঘোলা করতে চাইবে না। বিশেষ করে যেখানে জলঘোলা করতে গেলে সেনেটরের অন্য এক জীবন সামনে চলে আসতে পারে।

নিজের কাজটা দেখে নিজেকেই তারিফ করতে ইচ্ছে করল পেন্টারের। সত্যিই সে এক জন পেশাদার শিল্পী। যে-হত্যাকে শিল্পকর্মে পরিণত করেছে। তার পরে শিস দিতে দিতে যে-রাস্তা ধরে এসেছিল, সেটা ধরেই বেরিয়ে গেল। সে জানে, সেনেটর না বেরনো পর্যন্ত সিসিটিভি এখন বন্ধই থাকবে।

অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে একটা ক্যাব ডেকে নিল পেন্টার। তত ক্ষণে তাঁর মাথায় চলে এসেছে একটা টুপিও। যাতে মুখের অনেকটাই ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। মিনিট দশেক পরে নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে দিয়ে মিলিয়ে গেল ক্যাবটি। সেখান থেকে আরও কিছুটা হেঁটে একটা পার্কিং লটে পৌঁছে নিজের গাড়ির দরজাটা খুলল সে। সিটবেল্ট লাগানোর আগে মোবাইল মারফত একটা বিশেষ নম্বরে বার্তাটা পাঠিয়ে দিল দ্য পেন্টার-

‘পেন্টিং হ্যাজ বিন ফিনিশড।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *