প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৩. যেখানে দেখিবে ছাই

৩. যেখানে দেখিবে ছাই

মুম্বই-প্যারিস, ২০২৩

প্যারিস দুর্ঘটনার চার দিন পরে।

ডক্টর ডেভিল না থাকার ফলে তার কোর টিমটা একটু দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কিছু করার নেই। বস বুঝেছিল, তার হাতে সময় কম। দ্রুত যা করার করতে হবে।

সামনে তার কোর গ্রুপের তিন জন বসে। এরা হল তার নিরাপত্তার স্তর। বস জানে, এরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য। মরে গেলেও তার দিকে আঙুল তুলবে না।

“আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। গ্রোপিয়াসের মেয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়েছে। অগ্নিকাণ্ডের শিকার। এই অবস্থা থেকে আমরা যদি গ্রোপিয়াসকে বাঁচাতে পারি, তা হলে ও সারা জীবন আমাদের সঙ্গে থেকে যাবে। ভাগ্য একটা সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতেই হবে।”

“আপনি ঠিক কী চাইছেন স্যার?” প্রশ্ন করল বসের সব চেয়ে ঘনিষ্ঠ লোকটা। সোলাঙ্কি।

“আমি নয়, গ্রোপিয়াস ওই ভারতীয় মেয়েটাকে চাইছে। সেটা তো তোমরা জানো। এ বার বল, কীভাবে ওকে দুবাইয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যাবে।”

“যে ভাবে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের ক্লায়েন্টদের মাল পাঠাই, সেই রাস্তাই নেওয়া হবে স্যার। কল্যাণ থেকে ফিশিং বোটে ভাসাই হয়ে দমন। সেখান থেকে সুরাট। আর তার পরে সমুদ্রপথে জাহাজে তুলে দেওয়া হবে। আমি সব কথা বলে রেখেছি, স্যার,” এ বার মুখ খুলল আর একটি লোক।

বস মাথা নাড়ল, “ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা মাথায় রেখো, কোনও গণ্ডগোল যেন না হয়।’

তিন জনই মাথা নেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ করল।

“ও হ্যাঁ, আর একটা কথা,” পিছন থেকে ডেকে বলল বস, “গ্রোপিয়াস যে-লোকটিকে পাঠাচ্ছে, তার কী হল?”

জবাব দিল সোলাঙ্কি, “আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। পরশু মুম্বই এসে পৌঁছচ্ছে। এর মধ্যে মেয়েটাকে আমরা সুরাটে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। জাহাজে কবে তুলব, সেটাও চূড়ান্ত করে নেব। আপনি ভাববেন না কিছু।”

.

প্যারিস দুর্ঘটনার পাঁচ দিন পরে।

মেডভ্যাক। পুরো কথাটা হল মেডিক্যাল ইভাকুয়েশন। বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন কোম্পানি এই ফ্লাইট চালায়। প্রতিটা ফ্লাইটে বিশেষ ব্যবস্থা আছে। ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট থেকে ট্রমা কেয়ার ইউনিট। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষ নার্স, ডক্টর সবাই থাকে ফ্লাইটে। মোদ্দা কথায়, পুরোদস্তুর একটা মিনি হসপিটাল।

ক্যাটের খবরটা জানার পরেই গ্রোপিয়াসের সহকারী যে-কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে রেখেছিল, তারা বিশ্বের প্রায় যে-কোনও জায়গা থেকে মেডিক্যাল রেসকিউ করে। এই অপারেশনে কাজে লাগানো হয় পাঁচ ধরনের জেট। সহকারীর ধারণা ছিল, প্রয়োজন হলে প্যারিস থেকে আমেরিকার কোনও শহরে নিয়ে আসা হবে ক্যাটকে। কিন্তু সেটা হয়তো ডাইরেক্ট ফ্লাইটে হবে না। এক বার স্টপ দিতে হবে হবে জ্বালানি ভরার জন্য।

দুবাইয়ের নামটা শুনে সে দ্রুত যোগাযোগ করে কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে। প্রতিনিধি আশ্বস্ত করে, এ ক্ষেত্রে সমস্যা হবে না।

কোম্পানিটি যে-পাঁচ ধরনের জেট চালায়, সেগুলো হল সেসনা সিটেশন ওয়ান। সেসনা সিটেশন টু। লিয়ারজেট ৩৫। লিয়ারজেট ৫৫। গাল্ফস্ট্রিম থ্রি মেডিক্যাল জেট। প্যারিস থেকে দুবাইয়ের আকাশপথে দূরত্ব ৩২৬০ মাইল। ওই কোম্পানিটির হাতে থাকা পাঁচটি জেটের মধ্যে মাত্র একটার ক্ষমতা ছিল একবারে অতটা দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার।

গাল্ফস্ট্রিম থ্রি। এক বারে উড়ে যেতে পারে ৩৫০০ মাইল। গতি ঘণ্টায় ৫০০ মাইল। এই জেটে রুগি ছাড়াও থাকতে পারে মেডিক্যাল টিম এবং ছ’জন যাত্রী।

ক্যাটকে নিয়ে প্যারিস হাসপাতাল থেকে হেলিকপ্টারটা সোজা শার্ল দ্য গল বিমানবন্দরে নামার আগেই গ্রোপিয়াসের টিম পৌঁছে গিয়েছিল গন্তব্যস্থলে।

বাবার চোখের সামনে মেয়েকে তুলে দেওয়া হল মেডিক্যাল জেটে। আর আধ ঘণ্টার মধ্যে গাল্ফস্ট্রিম থ্রি উড়ে চলল মধ্যপ্রাচ্যের এক শহরের দিকে। প্যারিসে তখন বেলা সাড়ে তিনটে।

.

শার্ল দ্য গল বিমানবন্দর থেকে তখনও গাল্ফস্ট্রিম থ্রি তার পেশেন্টকে নিয়ে আকাশে ওড়েনি।

প্যারিস দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে তিন দিন আগে। রুদ্রাণীদের অবশ্য কোনও ধারণাই নেই, প্যারিসের এক বিস্ফোরণের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে গিয়েছে অজন্তার ভাগ্য।

গত কয়েক দিন ধরেই আনোয়ার এবং রাজাকে আলাদা আলাদা ঘরে নিয়ে এসে জেরার কাজটা শুরু করেছে রুদ্রাণী। পুলিশ কাস্টডিতে থাকা দু’জনের সঙ্গে কথা বলতে সমস্যা হয়নি তার। কিন্তু সূর্য এই জেরায় অনুপস্থিত ছিল। সিবিআইয়ের সঙ্গে সরকারি ভাবে এখনও এই কেসের কোনও সম্পর্ক নেই।

সব রকম চেষ্টা করেও আনোয়ারের মুখ থেকে কোনও কথা বার করা যায়নি। সে শুধু বলেছে, টাকা নিয়ে খুন করে। কারা টাকা দেয়, সে জানে না।

সমীরকেও গ্রেফতার করেছে মুম্বই পুলিশ। ওই অবস্থায় আর কোনও রাস্তা ছিল না। অজন্তার খোঁজ পাওয়ার জন্য সমীরকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রুদ্রাণী। এ ছাড়া কিছু করার ছিল না। রুদ্রাণী নিশ্চিত ছিল, পাঞ্চালীর বাড়ির ঠিকানা খুঁজে পেতে দুষ্কৃতীদের কোনও সমস্যা হবে না। কিন্তু বাড়িতে হানা দেওয়ার ঝুঁকি সম্ভবত নেবে না এখনই। নজর রাখবে। ওদের প্রাথমিক লক্ষ্য থাকবে সমীর। তাই সমীরকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া উপায় ছিল না রুদ্রাণীর। শিকারিরাও সেই ফাঁদে পা দেয়।

সূর্যকে সে এই কাজে পেয়ে যায়। পাঞ্চালী একটু দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে যান। অজন্তার কাছে পৌঁছনোর আর কোনও রাস্তা তিনিও দেখতে পাচ্ছিলেন না। সেই রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে সমীরকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হলে, দিতে হবে। কিছু করার নেই। সমীরও এই অপরাধের সঙ্গে অনেক দিন ধরে জড়িত।

সমীরের কথামতো সেই ক্লিনিকে পুলিশ রেইড করে। কিন্তু ক্লিনিক তত ক্ষণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ক্লিনিকের মালিককে খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে পুলিশ। রুদ্রাণী জানে, তাতে কোনও লাভ হবে না। নানা রকম ভুয়ো নাম আর ঠিকানার আড়ালে আসল অপরাধীরা আত্মগোপন করে থাকে। তাদের ছোঁয়াও যাবে না।

টানা জেরা করা হল রাজাকেও। সে অবশ্য কয়েকটা নাম বলেছে। যারা তাকে এই কাজে লাগায়। কিন্তু সেগুলোও রুদ্রাণীর কোনও কাজে লাগবে না। এদের খুঁজে বার করতে মোটামুটি যা সময় লাগবে, তত দিনে অজন্তা পাচার হয়ে যাবে কোন দূর দেশে। যদি না এত দিনে হয়ে থাকে।

জেরার শেষ দিকে এসে রাজার মুখ থেকে একটা কথা বেরোয়, যার সঙ্গে অজন্তার সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে।

“অজন্তা খুব হাই প্রোফাইল টার্গেট ছিল। আমার উপরে খুব প্রেসার ছিল ওকে তুলে আনার জন্য। টাকাও পেয়েছিলাম প্রচুর।”

রুদ্রাণী এ সব জানে। সে অধৈর্য হয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল, “অজন্তা এখন কোথায়?”

রাজা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “সেটা আমি জানি না। ট্রেন থেকে নামার পরে আমি আর ওদের সঙ্গে থাকিনি। আমাদের কখনও বলাও হয় না শিকারদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়। সবার আলাদা আলাদা ডিপার্টমেন্ট আছে। কেউ কারও কাজে নাক গলায় না।”

হতাশ হয়ে পড়ছিল রুদ্রাণী। এত কাছে এসেও ব্যর্থ হতে হবে। একটু দম নেওয়ার জন্য থেমেছিল রাজা। রুদ্রাণীর মুখের দিকে তাকিয়ে সে আবার বলা শুরু করল, “তবে এই ধরনের হাই প্রোফাইল শিকারকে ভারতে রাখা হয় না। বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়।”

“কোন রুটে করা হয়? মুম্বই থেকে?”

রাজা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। “মুম্বই এখন পুরনো হয়ে গিয়েছে। মুম্বইয়ের উপরে পুলিশ থেকে মিডিয়া, সবার নজর থাকে। তাই এরা অন্য একটা চ্যানেল ব্যবহার করে শিকারদের বাইরে পাঠানোর জন্য।”

রুদ্রাণী কঠিন চোখে তাকিয়ে রইল। রাজা কথা শেষ করল, “এখন বেছে নেওয়া হয়েছে সুরাটকে। ওখান থেকেই প্রচুর ছেলে-মেয়েকে বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়। কিন্তু কী উপায়ে পাঠানো হয়, আমি জানি না। সত্যিই বলছি। যা জানি, সব আপনাকে বলে দিলাম।”

রুদ্রাণী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে বুঝেছিল, রাজাকে যতটা কচলানো যায়, কচলানো গিয়েছে। ও সত্যিই কিছু জানে না। কিন্তু একটা নাম পাওয়া গিয়েছে। দেখা যাক, আর কিছু জানা যায় কি না।

ইন্টারোগেশন রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল রুদ্রাণী। থামল রাজার শেষ কথাটা শুনে।

“অন্তাকে তুলে আনা হয়েছে অনেক দিন হল। ও সম্ভবত আর ভারতে নেই। এত দিনে বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়েছে।”

রুদ্রাণী বুঝতে পারছিল, সময় সত্যি শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সুরাট! আবার তাকে পাঞ্চালী আর সূর্যের সাহায্য নিতে হবে। মোবাইলটা বার করল রুদ্রাণী।

.

প্যারিস দুর্ঘটনার চার দিন পরে।

মেরিন ড্রাইভের কাছে একটা কাফেতে বিকেলে বসে ছিল তিন জন। সবারই মুখ গম্ভীর। প্রথমে মুখ খুলল সূর্য, “রাজার কথা যদি বিশ্বাসও করি, কিন্তু তা হলেও বোঝা কঠিন সুরাটের কোথা থেকে মেয়েটাকে পাচার করা হবে।”

“বিদেশে পাচারের ক্ষেত্রে সাধারণত একটা বিশেষ রুট নেওয়া হয়।” মনে করিয়ে দিলেন পাঞ্চালী। অন্য দু’জনও জানত সেই রুটের কথা। জলপথ! সুরাটের ক্ষেত্রেও কি সেই একই রাস্তা নেওয়া হচ্ছে? এ ছাড়া সীমান্ত পার করার তো আর সহজ রাস্তা নেই।

দু’টি মেয়েই এ বার ঘুরে তাকাল সূর্যের দিকে। “আমাকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দাও। আমি একটু খবর নিয়ে দেখি,” সিবিআই অফিসারের ভ্রু দুটো কুঁচকে আছে। জলপথের কথাটা ওঠায় তার মাথায় একটা চিন্তা খেলছে।

.

প্যারিস দুর্ঘটনার পাঁচ দিন পরে।

রাত আটটা নাগাদ রীতা নামের অল্পবয়সি নার্সটি এসে বসল অজন্তার পাশে। কাঁধে হাত রেখে বলল, “সময় এসে গিয়েছে।” চমকে উঠল অজন্তা। ভীত হরিণীর মতো চোখ তুলে বলল, “কীসের সময়?”

নার্সটি গলা আরও নামিয়ে বলল, “তোমাকে এখান থেকে বার করার। ভাল করে আমার কথা শোনো।”

অজন্তা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে শুধু তাকিয়ে রইল। রীতা বলে যেতে লাগল, “এদের প্ল্যান হল, তোমাকে এখান থেকে জলপথে সুরাট নিয়ে যাওয়া। প্রথমে গাড়িতে কল্যাণ। সেখান থেকে জেলেদের নৌকোয় তুলে দেওয়া হবে তোমাকে। দমন ঘুরে পৌঁছে দেওয়া হবে সুরাটে।”

অজন্তার মুখে আবার আতঙ্কর ছায়া খেলে যেতে লাগল। কোনও মতে বলতে পারল, “কেন? কী করা হবে আমাকে নিয়ে?”

নার্সটি বলল, “সেটা আমি জানি না। তবে আমি যা করার করেছি। আমার এক পরিচিত মহিলা আছে, যিনি একটি এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত। তিনি প্রচুর হারিয়ে যাওয়া ছেলে-মেয়েকে উদ্ধার করেছেন। তিনিই বাকি কাজটা করবেন।”

“তিনি আমাকে বাঁচাতে পারবেন?” অজন্তার গলায় শঙ্কার ছোঁয়াটা যে- কারওরই নজরে পড়বে।

অজন্তার মাথায় হাত বুলিয়ে রীতা বলল, “তুমি কিছু ভেব না। তোমাকে সুরাট থেকে উদ্ধার করার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। যখন ওরা তোমাকে বাইরে নিয়ে যাবে।”

“এখান থেকে বাঁচানো গেল না আমায়? ওই মহিলা যদি পুলিশ নিয়ে এখানে চলে আসতেন? তা হলে তো আমি বেঁচে যেতাম,” আঁকুতি ঝরে পড়ে অজন্তার গলায়।

উল্টোদিকের মেয়েটা অজন্তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলতে থাকে, “সেটা করার থাকলে অনেক আগে করা যেত। কিন্তু এই এলাকাটা পুরো ওদের লোকে ভর্তি। পুলিশ কাছাকাছি এলেই ওরা খবর পেয়ে যাবে। আর তোমাকে মেরে লাশটা গুম করে দেবে। আগেও এ রকম কেস হয়েছে।”

অজন্তা শিউরে উঠল।

“তবে তোমাকে নিয়ে এরা খুব খুশি। তুমি ওদের কথা শুনে চলেছ, ঠিকমতো খাবার খেয়েছ, কোনও ঝামেলা করোনি। ওরা ধরে নিয়েছে, তুমি চুপচাপ সব করবে। তোমাকে ওরা বিশ্বাস করে। আর এই সুযোগটা আমাদের কাজে লাগাতে হবে।”

অজন্তার হঠাৎ কী মনে হতে মেয়েটার হাত চেপে ধরল। তার পরে বলল, “তুমি থাকবে তো আমার সঙ্গে? শেষ পর্যন্ত?”

মেয়েটা হাসল, “তুমি চিন্তা কোরো না। তোমাকে এদের হাত থেকে ছাড়ানোর পরে আমি থামব।”

অজন্তার চোখটা ছলছল করে উঠল। এই মেয়েটাকে পাশে পেয়েছে বলে সে এত দিন এই বন্দিদশা সহ্য করতে পেরেছে। মেয়েটা সব সময় তার খেয়াল রেখে এসেছে। একটুও আঁচড় পড়তে দেয়নি। আগলে রেখেছে। কিন্তু…

অজন্তা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এ বার জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তোমার কী হবে? আমাকে পুলিশ উদ্ধার করে নিয়ে গেলে ওরা তো তোমাকেও সন্দেহ করবে? তখন?”

রীতা হাসল। একটু করুণ হাসি। তার পরে বলল, “আমার কথা তুমি ভেবো না। অনেক দিন আমি এই নরকে রয়েছি। আর নয়। তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে মরতে হলে মরব।” একটু যেন ছলছল করে উঠল রীতার চোখ। তার পরে নিজেকে সামলে বলল, “আমার যদি কিছু হয়েও যায়, ভেবো না। আমি ওদের কিছু বলব না। তোমাকে সুরাট থেকে উদ্ধার করার ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে। ওই মহিলা সেই প্ল্যান মতোই তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে।”

অজন্তা জড়িয়ে ধরল রীতাকে। তার পরে ফোঁপাতে শুরু করল।

ধীরে ধীরে অজন্তার আলিঙ্গন ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল তরুণী নার্স। তার পরে বলল, “তুমি শান্ত হও। ওরা যেন কিছু বুঝতে না পারে। আর তিনটে দিন তুমি সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করে যাও। তিন দিন পরে তুমি ওদের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাবে। কথা দিলাম।”

অজন্তাকে শান্ত করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল রীতা। তার এখন অনেক কাজ।

মনিটরের সামনে বসে অজন্তার ঘরের পুরো দৃশ্যটা ভাল করে দেখছিল আব্দুল। প্রতিদিনই সে লক্ষ্য রাখে। রীতা আর অজন্তার মধ্যে বেড়ে ওঠা বন্ধুত্ব তার চোখ এড়ায়নি। কিন্তু কী কথা হচ্ছে, আব্দুল শুনতে পায় না। আশা করা যায়, রীতা নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারবে না। তা হলে সবার আগে রীতার গলাটাই কেটে দেওয়া হবে।

.

রাত দশটা বেজে গিয়েছে।

চকোলেট মিল্কের একটা গ্লাস হাতে অজন্তার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল রীতা। বাইরে থেকে আটকানো দরজাটা খুলে ভিতরে ঢুকে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিল অজন্তার দিকে।

“সময় হয়ে গিয়েছে। এখন বাড়ি থেকে বেরোতে হবে। এই দুধটা খেয়ে নাও। তোমার ঝিমুনি আসবে। কিন্তু ঘাবড়িও না। আমি থাকব তোমার সঙ্গে।”

অজন্তা বুঝতে পেরেছিল। এ ছাড়া সত্যিই কোনও রাস্তা নেই। তার জীবন এখন পুরোপুরি রীতার হাতে। গ্লাসটা নিয়ে ধীরে ধীরে দুধটা শেষ করল অজন্তা।

সত্যিই তার ঝিমুনি আসছে। মাথাটা ঘুরছে। বিছানায় বসে পড়ল মেয়েটা।

আধ ঘণ্টা বাদে অজন্তাকে ধরাধরি করে ওপর থেকে নামিয়ে এনে তোলা হল একটা দামি এসইউভি-তে। এই গাড়ি এখন রওনা দেবে সুরাটের উদ্দেশে। এর পরে শুরু হবে অপারেশনের পরের ধাপ।

পিছনের সিটে অজন্তাকে উঠিয়ে তার পাশে গিয়ে বসল রীতা। অন্য দিকের জানলার ধারে আর এক জন বয়স্ক মহিলা। তিন জনের পরনেই বোরখা।

সামনে আরও একটা গাড়ি। মিনিট দু’য়েকের মধ্যেই গাড়ি দু’টো ছুটে চলল কল্যাণের দিকে।

মিলিয়ে যাওয়া গাড়ি দু’টোর দিকে তাকিয়ে ছিল আব্দুল। খেলাটা ভালই চলছে। শেষ পর্যন্ত এই খেলায় কে জেতে, সেটাই হল আসল। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে আনল লোকটা।

গাল্ফস্ট্রিম থ্রি তখন দুবাইয়ে ল্যান্ড করতে চলেছে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *