প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৭. ফ্ল্যাশব্যাক: দ্য হরিয়ানা কেস

৭. ফ্ল্যাশব্যাক: দ্য হরিয়ানা কেস

সদর রেওয়ারি থানা

স্টেশন হাউস অফিসারের (এসএইচও) সামনে বসে ছিলেন পাঞ্চালী ও তাঁর এক সহকর্মী। তাঁর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তরফে পাঠানো চিঠিটা অফিসারের সামনের টেবিলে রয়েছে। উপরমহল থেকে ফোনও এসেছে অফিসারের কাছে। এই ধরনের রেইডে পুলিশ যেতে বেশ গড়িমসি করে। যে- কারণে ওপর থেকে চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তাই যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে এবং পুরো ঘটনাটা হরিয়ানা পুলিশের উপরমহলে খুলে বলেছিলেন পাঞ্চালী। এই কাজে অবশ্য তাঁকে সাহায্য করেছেন দিল্লি পুলিশের এক বড় কর্তা।

তবু কিছুটা চিন্তিত মুখে বসে ছিলেন পাঞ্চালী।

একটু পরে সামান্য বিরক্ত মুখে বললেন, “আমাদের কিন্তু একটু তাড়াতাড়ি ওখানে পৌঁছতে হবে। যত দেরি হবে, মেয়েটার জীবন তত বিপন্ন হবে।”

অফিসার একটা পেন মুখে নিয়ে চেবাচ্ছিলেন। এ বার পেনটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বললেন, “ম্যাডাম, একটা জিনিস আপনাকে খুব ভাল করে বুঝতে হবে। যে-জায়গাটার কথা আপনি বলছেন, সেটা একেবারে প্রত্যন্ত একটা গ্রাম। ওখানকার মানুষ পুলিশকেও বিশেষ ডরায় না। ওরা যা খুশি তাই করতে পারে। আমাদের খুব সতর্ক হয়ে কাজ করতে হবে।”

বিরক্তিটা ক্রমে উদ্বেগে বদলে যাচ্ছিল পাঞ্চালীর। সহকারীর দিকে এক বার তাকিয়ে অফিসারকে পরের প্রশ্নটা করলেন তিনি, “তা হলে কখন যাব আমরা? মেয়েটাকে তো ওই ভাবে ফেলে রাখা যাবে না।”

“অবশ্যই না। আপনারা বসুন। আমি ব্যবস্থা করছি।”

দু’জনকে বসিয়ে রেখে ঘরের বাইরে চলে গেলেন অফিসার। পাঞ্চালী প্রার্থনা করতে লাগলেন, তিনি যেন দেরি না-করে ফেলেন। তাঁর ইনফর্মারের মুখে পুরো ঘটনাটা শোনার পরে পাঞ্চালীও পাথর হয়ে গিয়েছিলেন।

ছেলেটা পুরো ব্যাপারটা জানে তার পরিচিত ওই মেয়েটির কাছ থেকে। যে-আবার পূর্ণিমারও পরিচিত। বাঙালি মেয়েটা তার দুঃস্বপ্নের কাহিনি শুনিয়েছিল ওই জাঠ মেয়েটিকে। কিন্তু সমবেদনা জানানো ছাড়া ওই মেয়েটি আর কোনও ভাবে সাহায্য করতে পারেনি। কিন্তু ছেলেটা যখন যোগাযোগ করল, তখন সব কিছু খুলে বলতে এতটুকুও দ্বিধা করেনি জাঠ তরুণী।

ইনফর্মারের ফোন পাওয়ার পরের দিনই দিল্লি থেকে রেওয়ারি চলে এসেছিলেন পাঞ্চালী। আর তার পরেই শোনেন পুরো ঘটনাটা—

এই সব আশেপাশের গ্রামে মেয়ের সংখ্যা এতই কমে গিয়েছে যে, ছেলেরা রাজ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে মেয়ে খুঁজতে। আর বৃহৎ সংখ্যক ছেলের নজর থাকে বাংলার মেয়েদের উপরে। একটা চালু ধারণা আছে, বাংলায় দারিদ্র বেশি। লেখাপড়ার হার কম। বাবা-মায়েরা উঠেপড়ে লেগে থাকে কোনও মতে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে পার করে দেওয়ার জন্য। মেয়েগুলোও বেশ নরমসরম হয় তাদের সামলানো মোটেই কঠিন কাজ নয়। ধমকধামকে কাজ না-হলে দু’চারটে চড়-থাপ্পড়েই বেশির ভাগ মেয়ে বশ মেনে যায়। আর যে-অল্পসংখ্যক মেয়ে একটু গোঁয়ার আছে, তাদের জন্য বরাদ্দ থাকে আরও কড়া ব্যবস্থা।

বাইরের রাজ্য থেকে বিয়ে করে আনাটা অন্যায় নয়। মেয়েগুলো এসে যদি সুখে ঘরসংসার করতে পারত, তা হলে এত কিছু হতই না। কিন্তু বেশির ভাগ মেয়ের কপালে অত সুখ নেই। বিশেষ করে যে-সব ছেলে এই ধরনের গ্রাম থেকে যায়। যেখানে মেয়েদের সংখ্যা কমতে কমতে বেশির ভাগ পরিবারেই চার- পাঁচটা করে শুধু পুরুষমানুষের বাস। তাদের শারীরিক ক্ষুধার কোনও কমতি নেই। কিন্তু এই সব গ্রামে সেই খিদে মেটানোর উপায়ও বেশি থাকে না। উপায় সাধারণত একটাই হয়। একটা পরিবারে একটা মেয়ে যদি বিয়ে করে আসে, তা হলে সেই মেয়েটি বাকি সব পুরুষের কাছে ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

“পূর্ণিমার হালও ওই রকম হয়েছিল,” ইনফর্মার ছেলেটির মুখ থেকে পুরো কাহিনিটা শুনছিলেন পাঞ্চালী। “মাস ছয়েক আগে মেয়েটাকে বিয়ে করে আনে বাড়ির সেজো ছেলে। তার পর থেকে ছ’জন পুরুষের লালসার শিকার হয়ে চলেছে মেয়েটা। অমানুষিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে ওকে। তার মধ্যেও মেয়েটা বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে চলেছে।

ছেলেটা বলে যাচ্ছিল, “গ্রামে দু’-একটি মেয়ে আরও আছে। তারা অবশ্য স্থানীয়। তাদের সঙ্গে অল্পবিস্তর আলাপ আছে মেয়েটার। আমার পরিচিত মেয়েটিও তার মধ্যে আছে। ওর কাছ থেকেই আমি পুরো ঘটনাটা শুনি। আর একটা-দু’টো বাচ্চার সঙ্গেও খুব ভাল মিশে গিয়েছে। ওদের অল্পবিস্তর বাংলাও শিখিয়েছে। ওই রকম একটা বাচ্চা মেয়ের মুখে বাংলা শুনে আমার প্রথম সন্দেহ হয়।”

পাঞ্চালী যে-স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত, তাদের পরিচিতি এবং ক্ষমতা যথেষ্ট বেশি। ফলে পুলিশের উপরমহলে যোগাযোগ করে বাকি ব্যবস্থা করতে সমস্যা হয়নি। এই ধরনের উদ্ধারকার্য সাধারণত এনজিও-র সাহায্যেই হয়ে থাকে। দিল্লিতে ফিরে গিয়ে সব ব্যবস্থা করে আবার এই শহরে ফিরে এসেছেন পাঞ্চালী। মেয়েটিকে উদ্ধার করতে।

পাঞ্চালী ঘড়ি দেখলেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। এই সময় দরজার বাইরে থেকে অফিসার ডাকলেন, “চলে আসুন, আমরা রওনা দেব।”

হাইওয়ে থেকে কাঁচা রাস্তায় জিপ দু’টো নামতেই গাড়ির গতি শ্লথ হয়ে গেল। পাঞ্চালী চার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, এখানকার গ্রামগুলো সত্যিই প্রত্যন্ত। দূরে দূরে ছড়িয়ে আছে বসতবাড়ি। কিন্তু এখানেও মোবাইল টাওয়ার ঠিক চলে এসেছে। মানুষের কাছে খাদ্য না পৌঁছক, মোবাইল সিগন্যাল ঠিক পৌঁছে গিয়েছে। তাঁর ইনফর্মার ছেলেটা স্বাভাবিক ভাবেই সঙ্গে আসেনি। পুলিশ বা স্থানীয় লোকের কাছে ছেলেটার পরিচয় ফাঁস করার কোনও প্রশ্নই নেই। তবে গ্রামের নামটা শুনে পুলিশ বুঝে গিয়েছে, ঠিক কোন জায়গায় আসতে হবে।

.

সন্ধ্যা নেমেছে রেওয়ারির আকাশে। ধীরে ধীরে অন্ধকার গ্রাস করে নিচ্ছে গ্রামটাকে। পূর্ণিমার শ্বশুর খাটিয়াটাকে টেনে উঠোনের একটা পাশে রেখে দিল। তার পাঁচ ছেলেই বাড়িতে রয়েছে। সেজো বিয়ে করে আসার পরে কেউ আর বাড়ি ছেড়ে বিশেষ নড়তে চায় না।

বাড়ির ভিতরে বসে পূর্ণিমা লণ্ঠনটা জ্বালাল। তার পরে প্রতিদিনের মতো ঘরের এক কোণে গিয়ে, হাঁটু মুড়ে বসে মনে মনে সন্ধ্যা-আরতি করতে লাগল। এই কয়েকটা মুহূর্ত তার জীবনে শান্তি নিয়ে আসে। তার পরে তো আবার শুরু হবে নারকীয় অত্যাচার। এই দুঃস্বপ্নের হাত থেকে কি কোনও দিন সে বাঁচতে পারবে? সে অনুভব করছে, তার শরীরের মধ্যেও এখন পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। বন্ধ থাকা অবস্থায় মেয়েটার দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এল সেজো ছেলে, অর্থাৎ পূর্ণিমার বর। তার পরে পড়িমরি করে বাবার সামনে গিয়ে বলল, “বাপু, পুলিশ আসছে। এই মাত্র আমার বন্ধু জানাল। গ্রামের রাস্তায় ও পুলিশের জিপ ঢুকতে দেখেছে।”

এক মুহূর্ত ভাবল বাবা। তার পরে বলল, “মেয়েটাকে নিয়ে এখনই পিছনের খেতে চলে যা। পুলিশ যেন ওর কোনও হদিশ না পায়।”

সেজো ছেলে এক মুহূর্ত ভাবল। তার পরে জবাব দিল, “ঠিক আছে, আমি যা করার করছি। তোমরা ঘরে যাও।” বলে সবার আগে ঘরের দিকে ছুটে গেল সে।

জিপ দু’টোকে বাড়ির বেশ কিছুটা আগেই থেমে যেতে হল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে এসএইচও, এক জন মহিলা সাব-ইন্সপেক্টর আর বেশ কয়েক জন পুলিশকর্মীকে নিয়ে উঠোন পেরিয়ে পাঞ্চালী পৌঁছে গেলেন বাড়ির দরজার সামনে।

ডাক শুনে প্রথমে বেরিয়ে এল প্রৌঢ় লোকটি। তার পিছনে চার ছেলে।

“কী হয়েছে? কী চাই তোমাদের?” কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল বড় ছেলে। ধীরে ধীরে প্রৌঢ় লোকটার চোখে চোখ রেখে পাঞ্চালী জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের বাড়ির বৌ কোথায়?”

“কেন, ওকে দিয়ে তোমার কী দরকার?” প্রশ্নটা ধেয়ে এল বাবার মুখ থেকে।

এ বার এগিয়ে এলেন এসএইচও, “দেখো, বেশি চেঁচামেচি কোরো না। মেয়েটাকে ডেকে নিয়ে এসো এখুনি, না-হলে আমরা ঘরে ঢুকব।”

বাবা বিরসবদনে জবাব দিল, “মেয়েটা ভেগে গিয়েছে ক’দিন আগে। আমার ছেলে ওকে খুব ভালবাসত। সে-ও বৌকে খুঁজে আনার জন্য বাড়ি থেকে চলে গিয়েছে।”

অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠল পাঞ্চালীর। তিনি ঘুরে তাকালেন এসএইচও-র দিকে। অফিসারের ইশারায় মুহূর্তে ঘরে ঢুকে পড়ল বাকি পুলিশকর্মীরা। ছোট বাড়ি। অল্প সময় লাগল পুরোটা খুঁজে দেখতে। তার পরে মহিলা সাব ইন্সপেক্টর এসে বললেন, “ঘরে কোথাও নেই স্যার। তবে বেশ কয়েকটা শাড়ি আলনায় দেখলাম। এমনকি, মেয়েদের গোটা দুয়েক চটিও আছে।”

এসএইচও বাকিদের নির্দেশ দিলেন, “তোমরা চট করে বাড়ির আশেপাশের মাঠ আর খেতগুলো দেখে নাও তো। হতে পারে, আমাদের আসার খবর পেয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে।” পাঞ্চালীরও সেই সন্দেহ হচ্ছিল। তাঁর মনে হচ্ছে, একটু খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে মেয়েটাকে।

মিনিট দশেক পরেই দূরের একটা খেতের মধ্যে থেকে আওয়াজ পাওয়া গেল এক কনস্টেবলের, “স্যার, শিগগির এখানে আসুন।”

এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না-করে এসএইচও, মহিলা পুলিশ অফিসার আর পাঞ্চালী ছুটলেন আওয়াজ লক্ষ্য করে।

অন্ধকার তখন ঘনিয়ে এসেছে। দিনটা অমাবস্যা, অন্ধকারটা তাই আরও বেশি জমাট। বাইরে কোনও আলো নেই। শুধু একটু দূরে গমের খেতটার মধ্যে দেখা যাচ্ছিল কয়েকটা টর্চের আলো। পাঞ্চালীরা দৌড়লেন সেই আলোর দিকে।

সবার আগে এসে পৌঁছলেন পাঞ্চালী। টর্চগুলোর আলো তখন মাটিতে একটা জায়গায় স্থির হয়ে আছে। পাঞ্চালীর চোখও চলে গেল সে দিকে।

দু’জোড়া শক্তিশালী টর্চের আলোয় মেয়েটার মুখের অভিব্যক্তি পরিষ্কার ধরা পড়ছিল। বিস্ময়, আতঙ্ক আর দুঃখ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে সেই মুখে। খোলা চোখ দু’টো তখনও জলে ভিজে আছে। মেয়েটা আতঙ্কে কোনও আওয়াজ করতে পারেনি, না কি শেষ মুহূর্তে তার মুখ চেপে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, তা আর জানা যাবে না। সবুজ শ্যামলা বাংলার গ্রামের এক মেয়ে হরিয়ানার রুক্ষ ক্ষেতের মাটিতে তখন রক্তস্নাত হয়ে চিরকালের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছে। কোনও এক ধারালো বস্তুর আঘাতে গলার নলি দু’ফাঁক করে দেওয়া হয়েছে পূর্ণিমার

কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে বসে পড়লেন পাঞ্চালী। এসএইচও তখন বাকি পুলিশকর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছেন, “শিগগির যাও। বাবা আর ছেলেগুলো পালাল কি না দেখো।”

চোখের সামনে থেকে সব কিছু আবছা হয়ে গিয়েছিল পাঞ্চালীর। তাঁর কানে কোনও কথা ঢুকছিল না। অতি কষ্টে চোখ দু’টো এক বার বন্ধ করে নিলেন। কিন্তু তাও মুছে ফেলতে পারছিলেন না সামনে শুয়ে থাকা মেয়েটার অসহায় ভঙ্গিটা।

“আর কোনও দিনও হবে না। আর কোনও দিনও এই ভাবে কোনও মেয়েকে মরে যেতে দেব না,” নিজের মনেই কথাগুলো বিড়বিড় করছিলেন তিনি।

তার পরে চোখ খুললেন। চোখ দিয়ে যেন আগুন জ্বলছিল পাঞ্চালী রায়ের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *