৮. রক্তলোলুপ শ্বাপদ
বালেওয়াড়ি, পুণে-গোরখপুর, উত্তরপ্রদেশ, ২০২৩
পুণেয় ঢুকতে ঢুকতে এগারোটা বেজে গেল আনোয়ারদের। কোনও – রকম দেরি না-করে তাদের গাড়িটা চলে গেল পুণে স্টেশন রোডের দিকে। যেখানে প্রায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রয়েছে মহারাষ্ট্র রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের তিনটি বাস স্ট্যান্ড।
আনোয়ার বুঝে গিয়েছিল, ব্যাপারটা অনেকটা খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার মতো হবে। বেশ কয়েক দিন হয়ে গিয়েছে সমীর-অপরাজিতা পালিয়েছে। তিন- চার দিন আগে দেখা ছেলেমেয়েকে কেউ মনে রাখবে না। যদি না তারা কোনও বিশেষ ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে থাকে।
আনোয়ারদের ভাগ্য আর সাহায্য করল না তাদের। তিনটে বাস স্ট্যান্ড ঘুরে যত বেশি সম্ভব লোককে সমীর আর অপরাজিতার ছবি দেখানো হল। কিন্তু কেউই মনে করতে পারল না, কয়েক দিন আগে এই দু’জনকে তারা স্ট্যান্ডে দেখেছিল কি না।
পুলিশ অফিসারের সাহায্যে এর পরে বাস ডিপো থেকে ওই বিশেষ দিনটার মুম্বই থেকে পুণে বাসের হদিশ বার করা হল। এ বার আনোয়ারদের ভাগ্য কিছুটা ভাল দেখা গেল। পুণে স্টেশন বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে খোঁজ পাওয়া গেল ওই বাসের হেল্পারের
ছবিটা মিনিটখানেক খুঁটিয়ে দেখে ছেলেটা বলল, “মনে হয় এই দু’জনকে দেখেছি। মেয়েটা মুখটা ঢেকে রেখেছিল। কিন্তু যখন বাস থেকে নামছিল, তখন মুখের ওড়নাটা এক বার সরে যায়। মুখে একটা ব্যান্ডেজ লাগানো ছিল। সে কারণে মুখটা মনে আছে। এই রকম নেপালিদের মতোই দেখতে।” আরও এক বার ছবিটা খুঁটিয়ে দেখল ছেলেটা। তার পরে বলল, “মনে তো হচ্ছে এই মেয়েটা। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।”
আনোয়াররা অবশ্য নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। গালে ব্যান্ডেজ লাগানোর কথা শুনেই সে বুঝে গিয়েছিল, এই মেয়ে অপরাজিতা না হয়ে যায় না। সে আর একটা প্রশ্ন করল ছেলেটাকে
“এই দু’জন কোন দিকে গিয়েছে, কিছু মনে আছে?”
ছেলেটা সবেগে মাথা নাড়ল দু’দিকে, “না, স্যার। সে সব মনে নেই। আরও প্যাসেঞ্জার নামছিল বাস থেকে। আমি সে দিকে মন দিই। পরে আর ওদের দু’জনকে দেখিনি। তবে ওরা একেবারে দাদারের স্ট্যান্ড থেকে উঠেছিল।”
আনোয়াররা আরও এক বার ভাল করে খোঁজ নিল আশেপাশে। বিশেষ করে দোকানগুলোয়, সামনের অটো স্ট্যান্ডে। কিন্তু অপরাজিতা-সমীরের হদিশ পাওয়া গেল না।
বেলা একটা বেজে গিয়েছে। পুলিশ সঙ্গীটি এ বার বলে উঠল, “আনোয়ার চল, কোথাও বসে খেয়ে নিই আগে। তার পরে একটা হোটেলে গিয়ে ঘর নিই। একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার ভাল করে খুঁজতে হবে। মনে হচ্ছে সময় লাগবে। তবে…।” সঙ্গীর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল আনোয়ার। সঙ্গী কথা শেষ করল, “তবে এর মধ্যে যদি এখান থেকেও ভেগে যায়, তা হলে সমস্যা আছে। বেশ কয়েক দিন হয়ে গেল তো।”
বাস স্ট্যান্ডের গায়েই খাবার দোকান। আর একটু এগোলেই একটা হোটেল। চারমূর্তি খাবার খেয়ে হোটেলে গিয়ে যখন ঢুকল, তখন চারটে বেজে গিয়েছে।
আনোয়ার স্বপ্নেও ভাবেনি শিকারের কত কাছে এসে পড়েছে সে। বাস স্ট্যান্ড থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যেই পুণে রেল স্টেশন। যেখানে তখনও দাঁড়িয়ে পুণে-গোরখপুর এক্সপ্রেস। একটা স্লিপার ক্লাস বগির মধ্যে তখন বসে আছে তিন জন। সমীর, অপরাজিতা আর সমীরের বন্ধু। সওয়া চারটে বাজতেই দুলে উঠল ট্রেনটা। সমীর এবং তার ‘স্ত্রী’র কাছে বিদায় নিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে এল সমীরের বন্ধু দিবাকর।
ট্রেনটা চলতে শুরু করতেই অপরাজিতার পাশে গিয়ে বসল সমীর। মেয়েটা তখন জানলার বাইরে দিয়ে দূরে চলে যাওয়া শহরটা দেখছে। সমীর চোখ দু’টো বন্ধ করল। এই ক’দিনের টেনশন তাকে কুরেকুরে খাচ্ছে। তবে এখন মনে হচ্ছে, তারা হয়তো বেঁচে গেলেও বেঁচে যেতে পারে। গোরখপুরে পৌঁছনোর পরে নিশ্চয়ই একটা কোনও ব্যবস্থা করা যাবে।
পুণে শহরকে পিছনে ফেলে ছুটতে শুরু করল গোরখপুর এক্সপ্রেস। স্টেশন থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের হোটেলের ঘরে তখন পায়চারি করেই চলেছে আনোয়ার। সে বুঝে উঠতে পারছে না, কী করবে।
এমন সময় বেজে উঠল আনোয়ারের মোবাইলটা।
উল্টো দিকের লোকটার কথা শুনতে শুনতে রাগে লাল হয়ে উঠল আনোয়ারের মুখ। লোকটা তার উপরওয়ালা না-হলে একটা গালাগালিই দিয়ে দিত। কোনও মতে রাগ চেপে বলল, “গত কাল মোবাইলটা অন হয়েছিল আর এখন আমাদের জানাচ্ছেন। শিকার তো উড়ে যেতে পারে।” জবাবটা শোনার পরে আনোয়ারের প্রশ্ন, “বালেওয়াড়ির কোথায় বললেন?” উত্তরটা শুনে ফোনটা নামিয়ে রাখল আনোয়ার। তার পরে সঙ্গী পুলিশটির দিকে ফিরে একটা গালাগালি দিয়ে বলল, “শালা, গত কাল ছেলেটা ফোন অন করেছিল। প্রায় দেড় দিন বাদে আমাকে ওর লোকেশনটা বলছে।”
পুলিশ অফিসারটি তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। “কোথায় জায়গাটা?”
“বালেওয়াড়ির কাছে। তবে সঠিক জায়গাটা বলতে পারছে না। একটা এলাকার নাম বলল। ওর দু’শো-তিনশো মিটারের মধ্যেই হবে।”
“চল, তা হলে আর দেরি করে লাভ নেই। ওখানে ছবি দেখিয়ে খুঁজে বার করব। পেয়ে গেলে তুলে আনব। আমি আছি, সমস্যা হবে না।”
চার জনই হুড়মুড় করে নেমে এল হোটেলের নীচে। রক্তের গন্ধ পাওয়া শ্বাপদের মতো চকচক করছে তাদের চোখ।
১৬ কিলোমিটারের মতো পথ গাড়িতে যেতে মিনিট পঁয়ত্রিশেকের বেশি লাগল না। যে-জায়গাটার কথা বলা হয়েছে, সেই অঞ্চলটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
আনোয়ার এবং পুলিশ অফিসারটি দ্রুত নেমে এল গাড়ি থেকে। সামনেই একটা চায়ের দোকান। কয়েক জন বয়স্ক মানুষ বসে আড্ডা মারছে। দু’জনে এগিয়ে গেল তাঁদের দিকে। নিজের আই কার্ডটা বার করে লোকগুলোর চোখের সামনে এক বার তুলে ধরল আনোয়ারের সঙ্গী। তার পরে বলল, “আমি মুম্বই পুলিশের লোক। একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে খুঁজছি। এই ছবি দু’টো দেখে বলুন তো এদের এখানে দেখেছেন কি না।”
লোকগুলো একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল পুলিশ শুনে। তার পরে ঝুঁকে পড়ল ছবি দু’টোর উপরে। এর পরে এক জন বলে উঠল, “ঠিক এই দু’জন কি না, বুঝতে পারছি না। তবে এখানে দিবাকরের দুই বন্ধু এসেছে দিন কয়েক হল। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। শুনেছি স্বামী-স্ত্রী। তবে ওদের মুখ ভাল করে দেখিনি।”
পাশের লোকগুলোও মাথায় নাড়িয়ে সায় দিল।
এ বার কথা বলল আনোয়ার, “দিবাকরদের বাড়িটা কোথায় একটু দেখিয়ে দেবেন?”
“এই তো সামনেই,” বলে একটা লোক বুঝিয়ে দিল কোথায় যেতে হবে। পাশের লোকটা বলে উঠল, “কী ব্যাপার স্যার? কোনও ঝামেলা হয়েছে?”
পুলিশ অফিসারটি হেসে জবাব দিল, “ওই মেয়েটাকে ভাগিয়ে নিয়ে চলে এসেছে। আমরা ওদের নিয়ে যেতে এসেছি। বড় কিছু কেস নয়।”
দিবাকরদের সদর দরজাটা বন্ধই ছিল। দু’বার কড়া নাড়তেই দরজা খুলে বেরিয়ে এল এক বয়স্ক ব্যক্তি।
“কী চাই?”
“দিবাকর আছে?”
“কী ব্যাপার বলুন তো?” লোকটা একটু সন্দেহের চোখে তাকাল বাইরে দাঁড়ানো চার মূর্তির দিকে।
আনোয়ারের সঙ্গী আবার আই ডি কার্ড বার করল, “বিশেষ কিছু নয়। দিবাকরের যে-দু’জন বন্ধু এসেছে, তাদের সঙ্গে দেখা করা প্রয়োজন।”
লোকটা এ বার বলে উঠল, “ওরা তো আজ দুপুরেই চলে গেল। দিবাকর ওদের ছেড়ে আসতে গিয়েছে স্টেশনে। বিকেলের দিকে ট্রেন ছিল।”
আনোয়ার এবং পুলিশ অফিসারটি পরস্পরের দিকে এক বার তাকাল। তার পরে পুলিশটি বলল, “কোথায় যাচ্ছে জানেন আপনারা?”
“না, সেটা আর কিছু বলেনি। বলল, আজ চলে যাচ্ছি। কেন? বড় কোনও ব্যাপার নাকি?”
পুলিশ অফিসারটি মাথা নাড়িয়ে বলল, “না, সে-রকম কিছু নয়। আমাদের কয়েকটা কথা জানার ছিল।” একটু থেমে আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে কথা শেষ করল বন্ধু, “দিবাকর কোথায়? ওর সঙ্গে একটু কথা বলতে হবে।”
“সে তো এখনও ফেরেনি। ফোন করব ওকে?”
“না, তার কোনও দরকার নেই। ধীরেসুস্থে আসুক। আমরা একটু বসতে পারি? একটু জল পেলেও ভাল হয়।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। ভিতরে আসুন না।” তাড়াতাড়ি দরজা খুলে চার জনকে ভিতরে ডেকে নিলেন গৃহকর্তা।
সামনে একটা বড় উঠোন মতো। যেখানে দু’টো খাটিয়া পাতা। সেখানেই আরাম করে বসল চার জন।
বেশি সময় বসতে হল না। মিনিট পনেরোর মধ্যেই ফিরে এল দিবাকর। আরও মিনিট পাঁচেক লাগল তাকে সব বুঝিয়ে দিতে। তার পরে সামনে বসে ঠান্ডা গলায় পুলিশ অফিসারটি প্রশ্ন করল, “কোথায় যাচ্ছে তোমার বন্ধুরা?”
একটু ইতস্তত করে দিবাকর জবাব দিল, “ওরা গোরখপুর চলে গেল। ওখানে সমীরের বাড়ি।”
আনোয়ার এ বার এগিয়ে এল, “তুমি কি ওদের ট্রেনে তুলে দিয়ে এলে?”
দিবাকর মাথা নাড়ল। “কোন ট্রেন আর কোন বগিতে উঠেছে তোমার
এক বার দু’জনের মুখের দিকে তাকাল দিবাকর। তার পরে বুঝল, জবাব দিয়ে দেওয়াই ভাল। মেয়েটা নিশ্চয়ই খুব বড়লোক বাড়ির। তাই মেয়েকে নিয়ে ভেগেছে দেখে সমীরের পিছনে পুলিশ লাগিয়ে দিয়েছে বাবা। কী যে-ঝামেলায় ফেলে ছেলেটা।
“গোরখপুর এক্সপ্রেস। ওরা ইঞ্জিন থেকে প্রথম আনরিজার্ভড কম্পার্টমেন্টে উঠেছে।”
আনোয়ার একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বন্ধুর দিকে তাকাল। ছেলেটা মাথা নাড়ল। সে বুঝে গিয়েছে, দিবাকর সত্যিটাই বলছে। বেকার মিথ্যে বলে ঝামেলা বাড়ানোর ঝুঁকি নেবে না।
“ঠিক আছে। তোমাকে ধন্যবাদ। তবে একটা কথা শুনে রাখো। মেয়েটাকে শুধু ভাগিয়ে আনেনি তোমার বন্ধু। প্রচুর টাকাও চুরি করে এনেছে। ওদের হদিশ যদি না পাই, তা হলে কিন্তু তোমার কাছে ফিরে আসব। আর সেটা ভাল হবে না।” পুলিশটার ঠান্ডা চোখের দিকে তাকিয়ে দিবাকর বুঝো গেল, মিথ্যে হুমকি নয় এটা।
পাশে দাঁড়িয়ে দিবাকরের বাবা বলে উঠল, “না, স্যার। ছেলে সত্যি বলছে। ওরা দু’জন আজ দুপুরেই চলে গিয়েছে। টাকার কথা আমরা কিছুই জানি না।”
আর কথা না বাড়িয়ে চার জনই বেরিয়ে এল দিবাকরদের বাড়ি থেকে। গাড়িতে বসে আনোয়ার জিজ্ঞেস করল, “গোরখপুর এক্সপ্রেস কখন গোরখপুর পৌঁছয়?”
মোবাইলটা একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে বন্ধু জবাব দিল, “এখান থেকে সওয়া চারটেয় বেরিয়ে গিয়েছে। গোরখপুর পৌঁছবে পরশু রাত একটা নাগাদ।”
আনোয়ার দ্রুত হিসেব করে নিল। তাদের হাতে প্রায় তিরিশ ঘণ্টা মতো সময় আছে। সে এক বার ভাবল, মুম্বই ফিরে যাবে। তার পরে ফোন করল তার বসকে, “এ বার কী করব?” জবাব এল, “তোমাকে একটু পরে ফোন করে নিচ্ছি।”
মিনিট পনেরো পরে নির্দেশ-সহ ফোনটা চলে এল, “পুণে থেকে গোরখপুরের ফ্লাইট আছে। কাল দুপুরের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যাবে। ওই ফ্লাইটটা নিয়ে সোজা গোরখপুর চলে যাও। রাতে ট্রেন ওখানে পৌঁছলে যা করার করো। তোমার কী আর কিছু লাগবে?”
“হ্যাঁ, আরও দু’জনকে পাঠিয়ে দিন। আর কিছু টাকা। গোরখপুরে গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে।” আনোয়ার জানত, এখানে তার পুলিশ সঙ্গীকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তবে তার আর প্রয়োজন নেই। শিকারকে তারা খুঁজে পেয়ে গিয়েছে। এ বার অন্য খেলা।
রাতে নিজের ঘরে শুয়ে শুয়ে দিবাকর ভাবছিল, সমীরকে একটী ফোন করে সতর্ক করে দেবে কি না। তার অনেক দিনের বন্ধু। কিন্তু আবার সতর্ক করে দিলে সে না বড় ঝামেলায় ফেঁসে যায়। দোটানায় পড়ে গেল দিবাকর। তার পরে বন্ধুত্বেরই জয় হল।
মোবাইলটা তুলে নিয়ে সমীরের নম্বর ডায়াল করল দিবাকর। জবাব এল—
“যে মোবাইল নম্বরটির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইছেন, সেটি এখন বন্ধ আছে।”
