প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

১৪. দম মারো দম

১৪. দম মারো দম

সান্তা ক্রুজ ওয়েস্ট, মুম্বই, ২০২৩

শরীরগুলো উদ্দামভঙ্গিতে নেচে চলেছে। গানের শব্দলহরীতে মাতাল হয়ে গিয়েছে নারী-পুরুষরা। একে অন্যের সঙ্গে লেপ্টে রয়েছে নাচের ভঙ্গিমায়। পুরনো দিনের ‘দম মারো দম’ থেকে আধুনিক সময়ের ‘সোয়াগ সে সোয়াগত’, সবই চলছে।

তবে ‘দম মারো দম’ গানটাই বোধ হয় এই পার্টির মুডের সঙ্গে সব চেয়ে ভাল যায়। গাঁজার কল্কেয় এখন টানটা কম পড়ে। বিশেষ করে সমাজের এই স্তরে। এখানে মানুষকে সপ্তম স্বর্গে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনেক রকম ব্যবস্থা আছে। সেই ব্যবস্থা কখনও ট্যাবলেটের আকার নেয়, কখনও পাউডারের গুঁড়ো। কেউ পানীয়র সঙ্গে ট্যাবলেট গলাঃধকরণ করে, কেউ নাক দিয়ে পাউডার টেনে নেয়। তার পরে দুনিয়া কি জয়সি, ত্যায়সি!’

জুহু বিচের সামনেই এই বিল্ডিংটা। সুইমিং পুল থেকে জিম, কী নেই এখানে। আর আছে রাতভর পার্টি চলার ব্যবস্থাও। বলিউডের মহাতারকাদের দেখা যায় এই সব পার্টিতে। শুধু মহাতারকারাই নয়, আসতে পারে স্বল্পখ্যাত অভিনেতারাও। কারও আমন্ত্রণে।

কয়েক বছর ধরে এই সব পার্টিতে একটা ট্রেন্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পার্টিতে এখন অনেক খেলোয়াড়ও যোগ দেয় তাদের বন্ধুবান্ধবদের ডাকে। আইপিএল অনেক নিষিদ্ধ দরজাই খুলে দিয়েছে। এখন তো প্রাক্তন হয়ে যাওয়া অনেক বিদেশি ক্রিকেটারও নিজেদের দেশের থেকে বেশি সময় কাটায় ভারতে। মানি থেকে হানি, সবই সহজলব্ধ এই দেশে। আর মদ, মেয়ে, মাদকের ত্রিবেণী সঙ্গম তো এই মুম্বইয়েই ঘটে। ফলে ফুলের গন্ধে যেমন মৌমাছি ছুটে আসে, সে- রকমই অন্য মধুর স্বাদ নিতে রুপোলি পর্দা আর সবুজ ঘাসের তারকারাও ভিড় করে এই সব পার্টিতে। দেখা যায় রাজনৈতিক নেতাদের, প্রতিপত্তিশালীও ব্যবসায়ীদের। মাঝেমধ্যে চলে আসে উচ্চপদস্থ আমলারাও।

.

সেই রাতে খাঁচায় বদ্ধ পাখির মতো বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে করতে ঘুমোনোর চেষ্টা করছিল অজন্তা। কিন্তু বোবা আতঙ্ক তার ঘুমটাও কেড়ে নিয়েছে। এখনও এরা তাকে নিয়ে আর কিছু করেনি। এই ঘরটাতেই আটকে রেখেছে। মাঝেমধ্যে এক জন ডাক্তার গোছের লোক এসে দেখে যায় অজন্তাকে।

আর সঙ্গে থাকে ওই কমবয়সি নার্সটি। মেয়েটি তাকে বোঝায়, “তুমি লক্ষ্মীটি হয়ে থাকো। কথা শুনে চলো। তোমাকে বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে আসা হবে। আমি সে-রকমই শুনেছি।”

অজন্তার মন মেয়েটির কথা বিশ্বাস করতে চায়। কিন্তু মস্তিষ্ক অন্য কথা বলে। সে বুঝতে পারে, এখান থেকে বেরনো কতটা কঠিন। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারে না। তাকে কেন কিছু না-করে এই ভাবে আটকে রাখা হয়েছে? তার কাছ থেকে কী চায় লোকগুলো?

নিজের হাতটার দিকে এক বার তাকাল অজন্তা। নাইট বাবের হাল্কা আলোয় দেখা যাচ্ছে, ক্ষতটা প্রায় ঠিক হয়ে এসেছে। ব্যান্ডেজও খুলে নেওয়া হয়েছে। কত দিন আগে চোটটা লেগেছিল? অজন্তা ঠিক মনে করতে পারে না। হয়তো দিন দশেক হবে।

চোখটা বন্ধ করে ঘুমনোর চেষ্টা করল অজন্তা।

.

ঘুম নেই এই ছেলে-মেয়েগুলোর চোখেও। যারা ওই রাতে পার্টিতে উদ্দাম নেচে চলেছে। এক দল আবার ক্লান্ত শরীরে টেবিলে বসে রয়েছে। সামনে দামি বিদেশি মদের গ্লাস।

আরও একটা দল জমায়েত হয়েছে কোণের দিকে অন্ধকার টেবিলে। ওই দিকটায় বেশ কয়েকটা টেবিল ছড়ানো ছিটানো রয়েছে। জায়গাটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। কারা বসে আছে, মুখগুলো ঠিক দেখা যায় না। কয়েক জন সিকিয়োরিটি গার্ড টেবিলগুলোর থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সতর্ক চোখে ঘরটার উপরে নজর রাখছে। চট করে অচেনা কোনও অতিথি যাতে এই দিকটায় চলে আসতে না পারে।

একেবারে কোণের দিকের টেবিলটায় তিনটে লোক গা এলিয়ে বসে ছিল। এক জন একটু বয়স্ক। পঞ্চাশ পার হয়ে গিয়েছে। বলিউড জগতের আনাচে- কানাচে লোকটার যাতায়াত আছে বলে শোনা যায়। ঠিক কী করে, কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু লোকটাকে ঘিরে বিস্তর গুজব রয়েছে। এর হাতে নাকি অনেক চাবিকাঠি। অনেক তালা খুলে দিতে পারে লোকটা। অন্ধকার দুনিয়া আর গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের মধ্যে যোগসূত্র এই লোকটাই। কাউকে চূড়োয় তুলতে পারে, আবার ছুড়েও ফেলতে পারে। লোকটার নেক নজরে পড়ে গেলে কেরিয়ার নিয়েও ভাবনা নেই, অর্থ নিয়েও নয়।

কিন্তু তার বিনিময়ে কী দিতে হবে, সেটাই হল প্রশ্ন! অনেকে বলে, বিনিময়ে দাসত্ব গ্রহণ করতে হবে লোকটার। যেখানে যেতে বলবে, যেতে হবে। যেখানে টাকা ঢালতে বলবে, ঢালতে হবে। না করার রাস্তাটা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে এক বার এই লোকটার কাছে বিকিয়ে গেলে।

শয়তানের কাছে আত্মা বিকিয়ে দেওয়ার চেয়ে কিছু কম নয় লোকটার কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া। এক বার বিক্রি হয়ে যাওয়ার পরে যে-কথা রাখে না, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বলিউডে দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যার ঘটনা কম না কি!

দ্বিতীয় লোকটার বয়স চল্লিশের উপরে। নিজে ফিল্ম প্রোডিউসার। তা ছাড়া আরও একটা পরিচয় আছে তার। এই প্রথম ব্যক্তিটির বেশ ঘনিষ্ঠ বলে লোকে তাকে জানে।

তৃতীয় ছেলেটার বয়স অনেকটাই কম। মধ্য পঁচিশের হবে হয়তো। বলিউডের উঠতি অভিনেতা। কয়েকটা ছবিতে অভিনয় করেছে। তার অভিনয় যথেষ্ট প্রশংসিতও। কিন্তু যে-রকম হিট সে খুঁজছে, তা এখনও পায়নি।

এই টেবিলে বসে সে রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করছে। সে নিজেও যে- টুকটাক নেশা করে না, তা নয়। করে। কিন্তু এই টেবিলে ব্যাপারটা মাত্রাছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তার দুই সঙ্গীর সামনে বেশ কয়েকটা ট্যাবলেট পড়ে আছে। আর রাখা আছে সাদা পাউডারের গুঁড়ো। কখনও সুরার সঙ্গে ট্যাবলেট নেমে যাচ্ছে গলা দিয়ে, কখনও নাসারন্ধ্র দিয়ে শরীরে প্রবেশ করছে সাদা পাউডার।

দ্বিতীয় লোকটা এ বার ছেলেটার কাঁধে একটা থাবড়া মেরে বলে উঠল, “শেঠি সাব, একে একটু দেখুন এক বার। অভিনয়টা খারাপ করে না। কিন্তু মুম্বইয়ে বাজার ঠিক জমাতে পারছে না।”

শেঠি তার লাল চোখ মেলে ছেলেটাকে দেখল। তার পরে বলল, “তুই কী চাস? সলমন, শাহরুখদের মতো হিরো হতে? টাকার পাহাড়ে বসে থাকতে? বল, কী চাস!”

ছেলেটা ইতস্তত করতে লাগল। এই প্রশ্নের জবাব সে কী দেবে? পাশের লোকটা বলে উঠল, “হ্যাঁ, শেঠি সাব। এই লাইনে যারা এসেছে, সবাই এই সব চায়। আপনার আশীর্বাদ পেলে সব হয়ে যাবে।”

শেঠি এ বার হাসল। তার পরে একটা ট্যাবলেট গ্লাসে ফেলে চুমুক দিল পানীয়তে। গ্লাসটা ঠক করে টেবিলে নামিয়ে রেখে ঠোঁটটা মুছে শেঠি তাকাল ছেলেটার দিকে। “সবই তো পাবি। কিন্তু তার বদলে কী দিবি আমাকে?”

ছেলেটা আমতা আমতা করতে লাগল। শেঠি ঝুঁকে এল ছেলেটার দিকে। লোকটার মুখ থেকে আসা গন্ধটা অসহ্য লাগলেও সরতে পারল না ছেলেটা। ছেলেটার চোখে চোখ রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে শেঠি বলল, “তুই কি দিবি জানিস? তার বদলে নিজেকে আমার কাছে বাঁধা রাখবি তুই। আমি যা বলব, শুনবি। এটাই আমার ব্যবসা। আমি মানুষ কিনি। অবশ্যই যদি তার মধ্যে সে-রকম মাল- মশলা থাকে, তা হলে।” বলে হা হা করে অট্টহাসি হেসে উঠল শেঠি।

প্রোডিউসার লোকটা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “ও সব নিয়ে আপনি ভাববেন না। আপনি যা বলবেন, ও করে দেবে। ছেলেটার মধ্যে কিন্তু প্রতিভা আছে। আমি ওর পিছনে টাকা ঢালছি। আপনি ওকে একটু পুশ করে দিন প্লিজ।”

শেঠি কিছু বলল না। তার পরে দূরে তাকিয়ে কাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। সঙ্গী দু’জনকে কিছু না বলে এগিয়ে গেল সামনের দিকে।

সেখানে দাঁড়িয়েছিল দু’জন আন্তর্জাতিক স্তরের খেলোয়াড়, এক জন অভিনেতা আর এক জন রাজনৈতিক নেতা। চার জনই শেঠির চেনা। মিনিট পাঁচেক কথা বলে আবার টেবিলে ফিরে এল শেঠি। তার পরে মদের গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলল, “ওদের সঙ্গে সম্পর্কটা ধরে রাখতে হয়। ওদের মধ্যে দু’জন আবার ইনভেস্টর।”

প্রোডিউসার লোকটা সামনে ঝুঁকে এল। টাকার গন্ধ পেয়ে গিয়েছে সে। “কীসের ইনভেস্টর, শেঠি সাব? ভাল মাল কামানোর সুযোগ আছে?”

শেঠির চোখটা তখন জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গিয়েছে। সব ক’টা মাদকদ্রব্য একসঙ্গে গিয়ে আঘাত হানছে শরীরের কোষে, মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। একটা গালাগালি দিয়ে শেঠি বলে উঠল, “মাল কামানোর সুযোগ বলছিস কী রে? এক টাকায় দশ টাকার হিসেবে যোগটা কর। আর মুনাফা দু’শো ভাগ নিশ্চিত।” প্রোডিউসার লোকটার চোখ বড় বড় হয়ে গেল, “সত্যি বলছেন? টাকা জলে যাবে না তো?”

আবার একটা গালাগালি দিল শেঠি। “ওই দু’জনের দিকে তাকা। এই ব্যবসায় ওরা কত টাকা ঢেলেছে জানিস? একশো থেকে দেড়শো কোটি। বেশ কয়েক বছর ধরেই ঢালছে। টাকা লস যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে ওরা ধারেকাছেও আসত না।” কথা শেষ করে এক বার অবজ্ঞার চোখে সামনে বসা লোকটার দিকে তাকিয়ে শেঠি বলে উঠল, “তবে তুই এ সব ভুলে যা। এই ব্যবসায় আসা তোর ক্ষমতার বাইরে।”

“কেন শেঠি সাব? কী এমন ব্যবসা, যেখানে আমি চাইলেও টাকা ঢালতে পারব না?”

শেঠি টেবিলের উপরে রাখা সাদা গুঁড়ো নাক দিয়ে টেনে নিতে ব্যস্ত ছিল। টেবিলটা সাফ হয়ে গেলে সে মাথা তুলে ঝাঁকাতে লাগল। গদিওয়ালা চেয়ারে মিনিটখানেক মাথাটা হেলিয়ে রাখার পরে চোখ খুলল শেঠি। তার পরে হাতের চেটোর পিছন দিকটা দিয়ে নাকটা মুছে নিয়ে ঘোলাটে চোখে বলল, “কী বললি তুই?”

“মানে বলছি, কী এমন ব্যবসা যে-ক্ষমতা থাকলেও টাকা ঢালতে পারব না?”

শেঠি তাকিয়ে রইল প্রোডিউসারের দিকে। তার পরে গলাটা নামিয়ে বলল, “মেয়েছেলের ব্যবসা। বুঝলি? ওদের কোটি কোটি টাকা এই ব্যবসায় খাটে। কোঠাবাড়ি তৈরি হয়। সারা দেশ থেকে মেয়েছেলে তুলে আনতে কাজে লাগে। আর বিনিময়ে ওরা তিনগুণ, চারগুণ মুনাফা লুটে চলে যায়।”

উল্টো দিকের লোকটা চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। শেঠি বলে যেতে লাগল, “এ বার বুঝলি তো কেন এই ব্যবসায় মন্দা আসবে না? মানুষের মন থেকে কোনও দিনও নারী শরীরের লালসা যাবে না। আর আমাদের ব্যবসাও থামবে না।” বোতল থেকে গ্লাসে পানীয় ঢালতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল শেঠি। একটা লম্বা চুমুক দিয়ে দুই সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বলল, “তবে শুধু মেয়েছেলে নয়, আরও অনেক কিছুও আছে!”

শেঠি চুপ করার পরে মিনিটখানেক কেউ কোনও কথা বলল না। তার পরে প্রোডিউসার লোকটা বলে উঠল, “শেঠি সাব, দয়া করে আমাকে এই ব্যবসায় টাকা লাগানোর সুযোগ দিন। অতটা হয়তো প্রথমে আমি লাগাতে পারব না, কিন্তু এক-আধবার মুনাফা হয়ে গেলেই দেখবেন, লগ্নির অঙ্ক কোথায় চলে যায়। আপনাদের ওই সুপারস্টারদের চেয়েও বেশি।” তার পরে চোখটা একটু টিপে বলল, “টাকা ঢাললে নিশ্চয়ই প্রোডাক্টও একটু চেখে দেখার সুযোগ পাব। আপনাদের হাতে বাচ্চা ছেলেমেয়েও নিশ্চয়ই আসে?” লোকটার চোখে লালসার আগুন ধক করে জ্বলে উঠল।

অল্প বয়সি ছেলেটা এত ক্ষণে চুপ করে বসে ছিল। এ বার আর সহ্য করতে পারল না। রাগত গলায় বলে উঠল, “আপনাদের কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে? এর মধ্যে আমি নেই। আপনারা জাহান্নামে যান।” উত্তেজিত ছেলেটা এ বার প্রোডিউসার লোকটার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, “আমার ফিল্ম কেরিয়ার যদি শেষও হয়ে যায়, তা হলেও আপনার মতো শয়তানের সঙ্গে কাজ করব না।”

উত্তেজিত ছেলেটা টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

শেঠি কী একটা বলতে যাচ্ছিল। তখনই একটু দূর থেকে কে যেন তার নাম ধরে ডাকল। কিছু ক্ষণ আগে যাদের সঙ্গে কথা বলে এসেছে, তাদের এক জন হাত নেড়ে বলে উঠল, “এখন চললাম। পরে আবার দেখা হবে।” শেঠিও হাত নাড়ল।

ছেলেটাও তাকিয়ে ছিল ওই দিকে। এ বার শেঠির দিকে ফিরে বলল, “ওই সুপারস্টাররা তোমার ব্যবসায় ইনভেস্ট করে তো? এই ব্যাপারটা মিডিয়া জানলে কী প্রতিক্রিয়া হয়, দেখা যাক।” কাউকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ছেলেটা দ্রুতগতিতে বেরিয়ে গেল পার্টি ছেড়ে।

শেঠি এ বার ফিরে তাকাল প্রোডিউসারের দিকে। তার চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। হিসহিস করে বলে উঠল, “শুয়োরের বাচ্চা, কাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস? তোকেই জানে মেরে দেব।”

প্রোডিউসার লোকটাও কাঁপতে লাগল, “ও এমন করবে, আমি বুঝতেই পারিনি শেঠি সাব। আপনি কিছু ভাববেন না। আমি ওকে যা বলার বলে দেব। নেশার ঘোরে উল্টোপাল্টা বলে ফেলেছে।”

শেঠি আবার মদের গ্লাসটা তুলে চুমুক দিল। তার পরে বলল, “তুই একটা কথাও বলবি না। এখানে কী কথা হল আজ, সেটা যেন বাইরে না যায়। তা হলে তুইও আর বাঁচবি না।”

শেঠির শেষ কথাটা শুনে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল লোকটার শরীরে। শেঠি শেষ প্রশ্নটা করল, “ছেলেটার নাম কী? কোথায় থাকে?” ভাঙা ভাঙা গলায় শেঠির প্রশ্নের জবাবটা দিয়ে দিল প্রোডিউসার লোকটা।

শেঠি এক বার ভেবেছিল, চেপে যাবে পুরো ব্যাপারটা। কিন্তু তার পরে ভাবল, ছেলেটা যদি সত্যিই মিডিয়ার সামনে মুখ খোলে, তা হলে তো কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। লোকে তখন সত্যি-মিথ্যে বিচার করবে না। তুলকালাম কাণ্ড শুরু হয়ে যাবে দেশজুড়ে। এখন যাও বা বাঁচার সুযোগ আছে, তখন কিছুই থাকবে না।

পার্টি থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে তখনই তার বসের সঙ্গে দেখা করল শেঠি। সেখান থেকে কয়েক হাত ঘুরে মুম্বইয়ের ওই বিলাসবহুল বাংলোয় যখন খবরটা এল, সবে ভোর হয়েছে।

সকাল সকাল উঠে পড়াটা বসের বহুদিনের অভ্যাস। শারীরচর্চায় তার খুব শখ! ভগ্নদূতের মতো যে-লোকটা শেঠির খবর নিয়ে হাজির হল, সে এত সকালে আসতে চারনি। বসের মেজাজ বিগড়ে গেলে কী হয়, তার একটা আন্দাজ আছে লোকটার। কিন্তু ব্যাপারটা এতটাই সিরিয়াস, যে-অপেক্ষা করাটা বড্ড বেশি ঝুঁকির হয়ে যাবে।

ট্রেডমিলটা থামিয়ে নেমে এল বস। তার পরে একটু দূরের সোফায় গা এলিয়ে বলল, “বলে ফেলো, কী খারাপ খবর নিয়ে এসেছ?”

সব কিছু শোনার পরে বস একটাই প্রশ্ন করল, “এই শেঠি লোকটা আমাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?”

“খুবই গুরুত্বপূর্ণ, স্যার। বলিউডের সঙ্গে আমাদের কনট্যাক্ট। ইনভেস্টিংয়ের ব্যাপারটা ও হ্যান্ডল করে।”

বস এ বার কিউবান সিগারটা হাতে তুলে নিল। এত সকালে ধূমপান করার ইচ্ছে তাঁর ছিল না। কিন্তু মেজাজ এতটাই বিগড়েছে যে-সিগারটা এখন খুবই প্রয়োজন।

ধুয়ো ছেড়ে বস বলে উঠল, “কিন্তু নেশার ঘোরে যে-লোক দুমদাম মুখ খোলে, তার উপরে কতটা নির্ভর করা যায়?”

লোকটা চুপ করে রইল। এই প্রশ্নের জবাব সে দিতে চায় না।

বস মিনিটখানেক সময় নিল ভাবতে। তার পরে বলল, “মাস খানেকের মধ্যে আর এক জনকে তৈরি করে ফেলো যে ওই শেঠির জায়গা নেবে। আর ওই অভিনেতা ছেলেটার নাম আর ঠিকানা অ্যাডামকে দিয়ে দাও।”

অ্যাডাম এই বাংলোতেই থাকে। বসের সর্বক্ষণের ছায়াসঙ্গী। মাঝেমধ্যে অবশ্য দূরে যেতে হয়, যখন বিশেষ কাজের দায়িত্ব এসে পড়ে। আবার সেই সময়টা এসে গিয়েছে।

সময় এসেছে পিট বুলকে শিকারের পিছনে লেলিয়ে দেওয়ার!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *