প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

২. যন্ত্রণা, শুধু যন্ত্রণা

২. যন্ত্রণা, শুধু যন্ত্রণা

লস অ্যাঞ্জেলেস, ২০২৩

সিটি অব অ্যাঞ্জেলসে কেউ আসে কিছু খুঁজে পেতে, কেউ আসে কিছু ভুলে যেতে।

এডওয়ার্ডস এসেছিল দু’টোরই খোঁজে। বেশ ক’বছর লস অ্যাঞ্জেলেসে কাটানোর পরে এডওয়ার্ডসের মনে প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই জেগে ওঠে— সে কি সত্যিই কিছু খুঁজে পেল? সে কি সত্যিই ভুলে যেতে পারল?

প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা সে এখনও জানে না। কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটা এডওয়ার্ডস পেয়ে গিয়েছে।

না। সে ভুলে যেতে পারেনি। আঠারো বছর পার হয়ে গেলেও।

.

২০০৫। কুনার অঞ্চল, আফগানিস্তান। নেভি সিলের অপারেশন রেড উইংস।

টিম কম্যান্ডারের কাছে একটা খবর এসেছিল ওপরমহল থেকে। ওই অঞ্চলে দেখা গিয়েছে তালিবানের এক শীর্ষস্থানীয় নেতাকে। হয় তাকে ধরতে হবে, না হয় মেরে দিতে হবে।

এডওয়ার্ডস ছাড়াও ওই সিল টিমে আর চার জন সদস্য ছিল। দিনের বেলাতেই বেরিয়ে পড়েছিল সিল টিম। টার্গেটের সন্ধানে।

কুনার অঞ্চলের আশি ভাগই পাহাড়ে ঘেরা। দক্ষিণ প্রান্ত থেকে বয়ে যায় কুনার নদী। সেই কুনার নদীকে বাঁ দিকে রেখে এডওয়ার্ডসদের টিমটা এগিয়ে যাচ্ছিল পাহাড়ি পথ ধরে। নড়াচড়াটা প্রথমে চোখে পড়ে এডওয়ার্ডসেরই।

পাহাড়ের একটা দিকে কিছুটা সমতল জমি। সেই জমির বেশ কিছুটা জায়গা আবার ঝোপঝাড়ে ঢাকা। এডওয়ার্ডসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চোখ ধরে নিল নড়াচড়াটা। সেই দিকে ইঙ্গিত করে টিম লিডারের দৃষ্টি আকর্ষণ করল এডওয়ার্ডস। থমকে দাঁড়িয়ে গেল পুরো টিম। তার পরে লিডারের ইশারায় একটা অর্ধবৃত্ত রচনা-করে সিল টিম এগিয়ে গেল ওই ঝোপগুলোর দিকে।

এ বারও সবার আগে এডওয়ার্ডসেরই নজরে পড়ল দৃশ্যটা। দু’টো ছোট বাচ্চা, আর তাদের সঙ্গে দু’জন কিশোর। বাচ্চা দু’টোর বয়স দশ-বারো হবে। কিশোর দু’জন পনেরো কী ষোলো। আর তাদের থেকে কিছুটা দূরে চড়ছে কয়েকটা ভেড়া।

বাকিদেরও নজরে পড়ল দৃশ্যটা। কিন্তু কেউ চোখ সরাল না ওদের ওপর থেকে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রেরট্রিগারের ওপর থেকে কারও আঙুলই শিথিল হল না। কমান্ডোরা জানে, এই সব জায়গায় আক্রমণ আসতে পারে যখন তখন

ছেলেগুলো যখন তাদের দেখল, বৃত্তটা একেবারে কাছে চলে এসেছে। তিন জন কমান্ডো তাদের এম৪এ১ কারবাইন উঁচিয়ে রইল টার্গেটের দিকে। বাকি দু’জন ছড়িয়ে পড়ল দু’দিকে। দেখে নিতে হবে, আর কেউ কোথাও আছে কি না কাছে ধারে।

এডওয়ার্ডস ছিল বাচ্চাগুলোর কাছেই। কারবাইনের নলের দিকে তাকিয়ে বাচ্চাগুলোর চোখে যে-আতঙ্ক ফুটে উঠছিল, তা নজর এড়ায়নি এডওয়ার্ডসের। কিন্তু তার ট্রেনিং বলছে, এই সব অঞ্চলে কখনও মনঃসংযোগ নষ্ট করবে না। একটা সামান্য ভুল মানে প্রাণহীন শরীর পড়ে থাকবে পাহাড়ের কোনও খাদে।

কারবাইনের নলটা একটি কিশোরের দিকে তাক করে রইল এডওয়ার্ডস।

মিনিট পাঁচেক পরে টিমের বাকি দু’জন কমান্ডো এসে দাঁড়াল।

“কাউকে দেখা গেল না, স্যার।”

এ বার টিম লিডার এগিয়ে এল বাচ্চাগুলোর দিকে। সে কিছুটা পাতো জানে। ভাঙা ভাঙা গলায় মিনিট পাঁচেক কথা বলে ফিরল দলের বাকিদের দিকে।

“ছেলেগুলো বলছে, ওরা ভেড়া চড়াতে এসেছে। রোজই আসে। ওদের গ্রামটা উত্তর দিকে। এখান থেকে মাইল দুয়েক হবে সম্ভবত।” লিডারের কথা শেষ হওয়ার পরে প্রশ্নটা করল এডওয়ার্ডস, “আমরা যার খোঁজে এসেছি, তার সম্পর্কে কিছু বলতে পারল?”

লিডার আবার ফিরে তাকাল বাচ্চাগুলোর দিকে। আবার কিছু শব্দ চালাচালি হল।

“ওরা সে-রকম কাউকে দেখেনি। তবে মাঝেমধ্যেই এই রাস্তা দিয়ে স্থানীয় লোক চলাচল করে। তাদের হাতে অস্ত্রও থাকে।

লিডারের কথা শেষ হওয়ার পরে বাকিরা অপেক্ষা করে রইল পরবর্তী নির্দেশের।

একটু ভেবে লেফ্টেন্যান্ট নির্দেশ দিল, “ওদের এক বার ভাল করে সার্চ করে দেখো, কিছু পাওয়া যায় কি না।” মিনিট পাঁচেক ভাল ভাবে তল্লাশি করেও ছোট একটা ছুরি ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেল না।

ছুরিটা হাতে নিয়ে লিডার বলল, “ঠিক আছে। ওদের ছেড়ে দিয়ে আমরা এগিয়ে যাই। এদের পিছনে সময় নষ্ট করলে টার্গেট হাত থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।”

সিল টিম আবার সামনে এগিয়ে যেতে লাগল। খুব বেশি হলে তিনশো মিটার এগোনো গিয়েছে। তখনই হামলাটা হল পিছন থেকে

একটা গুলি এসে লাগল এডওয়ার্ডসের এক সঙ্গীর গায়ে। আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল ছেলেটা। রিফ্লেক্স অ্যাকশনে বাকি চার সিল কমান্ডো নিজেদের ছুড়ে দিল মাটিতে।

পাহাড়ি রাস্তার কোণে পড়ে থাকা একটা বড় পাথরের আড়াল থেকে তখন শুরু হয়েছে গুলিবৃষ্টি। এডওয়ার্ডস সে দিকে লক্ষ্য করে এম৪এ১ কারবাইনের ট্রিগারে চাপ দিল।

নেভি সিল টিমের অন্যতম পছন্দের অস্ত্র হল এই এম৪৩১। এম১৬এ২ রাইফেলেরই সংক্ষিপ্ত মডেল হল এই মেশিন কারবাইন। যা সঙ্গে রাখতে যে- রকম সুবিধে, শত্রুকে ঝাঁঝরা করতেও সমান কার্যকর। ১৯৯৪ সালে ইউ এস স্পেশাল অপারেশন কমান্ডের নির্দেশে এই বিশেষ অস্ত্র তৈরি করা হয়। হাইটেক, মাল্টিপল ইউজ অ্যাসল্ট রাইফেল দিনেও যেমন নিখুঁত লক্ষ্যে বুলেট ছুড়তে পারে, সে-রকম রাতেও টার্গেট খুঁজে নেয় লেজার আর লাইটের সাহায্যে। সেমিঅটোমেটিক এবং অটোমেটিক, দু’রকম ভাবেই ব্যবহার করা যায় এই কারবাইন। ৫.৬৬ এমএম ক্যালিবারের বুলেট কিন্তু বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ভেদ করেও টার্গেটকে মেরে দিতে সক্ষম।

এডওয়ার্ডস গুলি চালাচ্ছিল অটোমেটিক মোডে। মিনিটে সাতশোরও বেশি বুলেট ছুটে যাচ্ছিল টার্গেটের দিকে। হঠাৎ ট্রিগার থেকে আঙুলটা সরিয়ে নিল এডওয়ার্ডস। তার চোখে আর একটা দৃশ্য ধরা পড়েছে।

দশ-বারো বছরের একটা বাচ্চা ছুটে আসছে তাদের দিকে। পাথরের আড়াল থেকে তখনও চলছে গুলিবৃষ্টি। ফাঁকা মাঠের মধ্যে পড়ে গিয়েছে বাচ্চাটা। যেখানে বাচ্চাটা রয়েছে, সেখান থেকে এডওয়ার্ডসদের দূরত্ব খুব বেশি হলে চল্লিশ মিটার মতো হবে। বাচ্চাটা ছুটতে ছুটতে আসছে। এডওয়ার্ডস ভাল করে তাকিয়ে দেখল, তিনটে বাচ্চার দেহই পড়ে আছে মাঠে। সম্ভবত ক্রস ফায়ারিংয়ের শিকার। শেষ বাচ্চাটা ছুটে আসছে প্রাণ বাঁচাতে।

এডওয়ার্ডসের বন্দুকটা নীরব হয়ে যেতে অবাক হয়ে সঙ্গীর দিকে তাকাল টিম লিডার। তার পরে এডওয়ার্ডসের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই বুঝতে পারল ব্যাপারটা। বাচ্চাটা ছুটে আসছে। দূরত্ব দ্রুত কমছে।

লিভার এ বার চেঁচিয়ে নির্দেশ দিল-

“শুট, ড্যাম ইট, শুট। গুলি চালাও। ওই শয়তানটার হাতে বোমা থাকতে পারে। আমরা সবাই মারা যাব।”

এডওয়ার্ডস এম৪এ১-এর ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখল। বাচ্চাটার হাতে কিছু একটা আছে! সেটা কি কোনও বোমা? ঠিক বুঝতে পারছে না এডওয়ার্ডস। তার কানে আবার এসে ধাক্কা মারল লিডারের গর্জন- “শুট, ম্যান শুট। গুলি চালাও। ইটস আ ফাকিং অর্ডার।”

এডওয়ার্ডস সামনে তাকাল। তার আঙুলটা চলে গেল এম৪এ১-এর ট্রিগারে।

.

মোবাইলের রিংটোনে হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেল এডওয়ার্ডস। একটা মেসেজ ঢুকেছে। সেটাই জানান দিল মোবাইল। একটা এনক্রিপ্টেড মেসেজ। এসেছে একটা গোপন সার্ভার থেকে। যার হদিশ পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

মেসেজটা একটা শব্দের— ‘টার্গেট’। সঙ্গে কয়েকটা ছবি। ডাউনলোড করার পরে ছবিগুলোর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল পেন্টার।

.

তাঁর ‘আর অ্যান্ড ডি’-র রিপোর্ট যত পড়ছেন, তত খুশি হচ্ছেন গ্রোপিয়াস। কসমেটিক ইন্ডাস্ট্রিতে এখন সত্যিই ‘বুম’ এসেছে। মানুষের মধ্যে সুন্দর হওয়ার প্রবণতা দিনকে দিন বাড়ছে। মানে, বিত্তশালীদের মধ্যে। গরিবগুর্বোদের কী চাহিদা, তা নিয়ে গ্রোপিয়াসের মাথা ব্যথা নেই।

রিপোর্টে আরও একটা লাইন নজর কেড়ে নিল গ্রোপিয়াসের। ইউ এস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একটা মন্তব্য। যেখানে বলা হয়েছে, “কসমেটিক প্রোডাক্ট এবং যে-সব উপাদান দিয়ে এই প্রোডাক্ট তৈরি হচ্ছে, তা এফডিএ-র অনুমতি ছাড়াই জোগাড় করা যাবে এবং তা দিয়ে তৈরি পণ্য বাজারে আনতেও এফডিএ-র অনুমতি লাগবে না।” আমেরিকায় এই এফডিএ-র অনুমতি ছাড়া কোনও ওষুধ, মেডিক্যাল ড্রাগস বা বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্ট বাজারে আসতে পারে না। কিন্তু মার্কিন আইন কসমেটিকের ক্ষেত্রে এই ছাড়টা দিয়েছে। শুধু রংয়ের ক্ষেত্রে কী অ্যাডিটিভ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা দেখিয়ে নিলেই চলবে।

আইনের এই বিশাল ফাঁকটাই কসমেটিক ইন্ডাস্ট্রি ভীষণ ভাবে কাজে লাগিয়ে চলেছে। গ্রোপিয়াসের আফসোস হচ্ছিল, কেন তিনি এই ইন্ডাস্ট্রির দিকে আগে নজর দেননি। বিশেষ করে যেখানে তিনি হলিউডের এ রকম দাপুটে প্রোডিউসার। সামান্য অঙ্গুলিহেলনে তো তাবড় তাবড় সুপারস্টার আর মডেলরা লাইন লাগিয়ে দেবে তাঁর প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন করার জন্য।

যাই হোক, এই ব্যবসাটায় ঠিকঠাক নামতে পারলে ওই ভারতীয়কে বিশেষ ধন্যবাদ দেবেন তিনি। রাস্তাটা ও-ই দেখিয়েছে। এই কসমেটিক ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্কিন প্রোডাক্টও। ওই ভারতীয় ব্যবসায়ী যে-ইঙ্গিত দিয়েছে, তাতে ‘র মেটেরিয়াল’-এর কমতি হবে না।

সাপ্লাই অ্যান্ড ডিমান্ড। যে-কোনও ব্যবসা সফল হওয়ার মূলমন্ত্র। তাঁর হাতে ধরা রিপোর্ট অনুযায়ী কসমেটিক ইন্ডাস্ট্রি হুহু করে ছড়িয়ে পড়ছে। ডিমান্ডের কমতি নেই। নানা ধরনের ডিমান্ড।

আর সাপ্লাই? তারও খামতি নেই। অতীতে কসমেটিক ইন্ডাস্ট্রিতে শুধু জন্তু-জানোয়ারের উপরেই উৎপীড়ন চলত। সেই তালিকায় মানুষও যোগ হয়েছে। রাস্তা আরও খুলে যাচ্ছে।

জন্তু-জানোয়ারের ক্ষেত্রে যেমন সাপ্লাইয়ের অভাব হয় না, সে-রকম মানুষের সাপ্লাইও আসতে থাকবে। ভারত দেশটা আছে কী করতে! সাপ্লাইয়ের খনি।

অনেক দিন বাদে মনটা খুশি হয়ে উঠল গ্রোপিয়াসের। পাঁচ সেকেন্ড বাদে মোবাইলে যার কলটা এল, সেটা তার খুশির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল।

“আরে ডার্লিং বলো, কত দূর কী হল তোমাদের?”

“ড্যাড, উই আর অল সেট। কাল আমরা ইউরোপ টুরে বেরিয়ে পড়ছি, “ ক্যাটরিনা রীতিমতো উত্তেজিত।

“লাভলি। আজ রাতে ফ্যামিলি ডিনার হচ্ছে।”

খুশি মনে মোবাইলটা নামিয়ে রাখলেন গ্রোপিয়াস। মিনিট পাঁচেক পরে সুরেলা টোন জানান দিল, একটা বিশেষ মেসেজ ঢুকেছে তাঁর প্রাইভেট মোবাইলে। অবশ্যই এনক্রিপ্টেড মেসেজ। কী মেসেজ এসেছে, সেটা কেউ জানতে পারবে না।

মেসেজটা এসেছে ভারত থেকে। সংক্ষিপ্ত লেখা—

“এই মেয়েটির স্যাম্পলই পাঠানো হয়েছিল।” সঙ্গে একটি অল্পবয়সি মেয়ের বেশ কয়েকটা ছবি।

খুশিই হলেন গ্রোপিয়াস। না, এই মেয়েটাকে তার চাই। পেন্টারকে কাজে লাগানোর সময় এসে গিয়েছে।

আর দেরি না-করে পেন্টারকে ছবিগুলো পাঠিয়ে দিলেন গ্রোপিয়াস। সঙ্গে একটা ছোট্ট শব্দ— টার্গেট।

.

এই বন্দিদশার মধ্যে অজন্তার একটাই আলোর রেখা ওই অল্পবয়সি নার্স মেয়েটি। সে প্রায় সব সময় তার সঙ্গে থাকে। গল্প করে। অভয় দেয়।

এক দিন মেয়েটা এমন কথা বলল, যা অজন্তার সামনে ক্ষীণ হলেও একটা আশার আলো নিয়ে এল। এই ভয়াবহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা।

মেয়েটা সে দিন অজন্তার বিছানায় বসে চাপা গলায় বলল, “তুমি বেশি চিন্তা কোরো না। আমি একটা কিছু করবই তোমার জন্য। এখান থেকে বার করে নিয়ে যাব তোমাকে। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখতে হবে তোমাকে।”

অজন্তা তাকিয়ে রইল। মেয়েটা ফিসফিস করে বলতে লাগল, “তুমি খাওয়াদাওয়া ঠিকঠাক করো। না-হলে দুর্বল আর অসুস্থ হয়ে পড়বে। নিজের শক্তিটাকে বাড়াও। তার পরে এক দিন সুযোগ বুঝে তোমার মুক্তির ব্যবস্থা করবই।”

অজন্তা জড়িয়ে ধরল মেয়েটাকে। অজন্তার মাথায় হাত বোলাতে লাগল নার্সটি।

‘হোস্টেজ সিচুয়েশন’ যারা সামলে এসেছে, তাদের কেউ দেখলে নির্ঘাত বলত, এ তো ‘স্টকহোলম সিনড্রোম’ একেবারে। যেখানে শিকার তার শিকারির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। যেখানে কিডন্যাপারের প্রতি আকৃষ্ট হয় কিডন্যাপড বা হাইজ্যাক হওয়া মানুষ।

বিশেষজ্ঞরা কেউ হয়তো এই দৃশ্যটা দেখেননি। কিন্তু এক জন দেখল। অজন্তার ঘরে লুকোনো সিসি ক্যামেরাটা বিরামহীন ভাবে ঘরের ছবিগুলো পাঠিয়ে যাচ্ছিল একটা মনিটরে। সেই মনিটরের সামনে বসা লোকটা দৃশ্যটা দেখে হাসল। বিষাক্ত একটা হাসি।

.

মুম্বইয়ে পা রাখার পরে বেশ কয়েকটা দিন হয়ে গিয়েছে। সব চেয়ে কম খরচে একটা ঘুপচি মতো ডর্মিটরি খুঁজে বার করেছে সমীর। যা টাকা পয়সা সে জোগাড় করেছিল অপরাজিতাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য, তার বেশির ভাগটাই রয়ে গিয়েছে। সে সব সঙ্গে নিয়েই আবার মুম্বইয়ে ফিরে এসেছে সমীর।

কিন্তু সে বুঝতে পারছে না, কী করবে। মুম্বইয়ে আসার পরে সে নিজের অসহায়তা আরও ভাল করে টের পারছে। সে কী করে প্রতিশোধ নেবে! ওই ডক্টর ডেভিল আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা অনেক দূরের গ্রহের লোক। তাদের কাছে পৌঁছনোর ক্ষমতা সমীরের নেই। এমনকি, আনোয়ারকেও সে ছুঁতে পারবে কি না, জানে না। কিন্তু আনোয়ারের মুখটা ভেসে উঠলেই চোয়াল শক্ত হয়ে আসে সমীরের।

আগের দিন সে ফিরে গিয়েছিল ওই রেসকিউ হোমে। যেখান থেকে অপরাজিতার হাতটা ধরে পা বাড়িয়েছিল এক অজানা রাস্তায়। যে-রাস্তার শেষে সে শুধু যন্ত্রণাই পেয়েছে আর রক্তাক্ত হয়েছে।

বেশি ক্ষণ অবশ্য সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পায়নি সমীর। ওই রঞ্জিত যদি তাকে দেখে ফেলে। তাই ফিরে এসেছিল।

এখন সে কী করবে? ডর্মিটরির নোংরা বিছানাটায় শুয়ে এ পাশ-ও পাশ করতে লাগল সমীর। তার পরে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।

আবার সে যাবে সেই জায়গাটায়। সেই ক্লিনিকে। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সব কিছু।

সমীরের কল্পনাতেও ছিল না, ডক্টর ডেভিলকে ঘিরে তখন কী কাণ্ড শুরু হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *