৩. দ্য ইনভেস্টর্স
লখনউ-দুবাই।
ফার্দিনান্দ প্রোপিয়াসের সঙ্গে ডক্টর ডেভিলের মিটিংয়ের মাসখানেক আগে…
লখনউ থেকে পূর্বাঞ্চল এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে শ’দুয়েক কিলোমিটার আসার পরে বাঁ দিকে একটা রাস্তা চলে গিয়েছে। খয়েরি রংয়ের টাটা সুমোটা এ বার হাইওয়ে থেকে সেই রাস্তাটা ধরল।
গাড়িতে চালকের পাশে এক বসে। মাঝের সিটে তিন জন। আর পিছনে দুজন। এমনিতে অস্বাভাবিকত্ব কিছু নেই। এই রাস্তা ছোট হলেও এখানে এই ধরনের গাড়ি মাঝেমধ্যেই যাওয়া-আসা করে। অস্বাভাবিকত্বটা ছিল অন্য জায়গায়। মাঝের সিটের মধ্যিখানে যে-ব্যক্তি বসে ছিল, তার চোখটা বাঁধা। কাপড়ের ফেট্টি ভেদ করে তার পক্ষে দেখা বা বোঝা সম্ভব নয়, গাড়িটা কোন রাস্তা ধরেছে বা সামনে যে-গ্রামটা আছে, তার নামটাই বা কী!
আরও মিনিট প্নেরো চলার পরে মাঝে বসে থাকা লোকটি বুঝতে পারল, গাড়িটা কোথাও এসে থেমেছে। দু’পাশের দু’টো দরজা খুলে গেল। বাঁ দিক থেকে হিন্দিতে কেউ কাঠখোট্টা ভাবে বলে উঠল, “নীচে নেমে এসো।” একটা বলিষ্ঠ হাত এসে তার বাহুটা ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনল।
দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, গাড়িতে থাকা বাকি সওয়ারিদের থেকে এই লোকটি একটু আলাদা গোত্রের। জামাকাপড় দেখলে শহরে বলেই মনে হয়। চুলটাও পরিপাটি করে ছাঁটা।
তার হাত ধরে যে-লোকটা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, সে পরেছিল ছোট একটা পাঞ্জাবি আর ময়লা ধুতি। কাঁধে দোনলা বন্দুক। তার দু’জন সঙ্গীও মোটামুটি একই পোশাকে। এই তিন জনেই সশস্ত্র।
দলটা মিনিট পাঁচেক গিয়ে থামল একটা বাড়ির সামনে। পাঁচিল দেওয়া একতলা বাড়ি। তবে পাকা। গেট খুলে লোকটাকে নিয়ে এ বার দরজার সামনে এসে দাঁড়াল অস্ত্রধারী তিন ব্যক্তি।
চোখ বাঁধা থাকলেও লোকটি বুঝতে পারছিল, সামনের কোনও দরজার তালা খোলা হচ্ছে। সেকেন্ড তিরিশেক পরেই ক্যাঁচ করে দরজা খোলার আওয়াজ শোনা গেল। আবার হাতে টান। চৌকাঠে একটু হোঁচট খেয়ে নিজেকে সামলে ভিতরে পা রাখল লোকটা। তবে হাতের টানটা শিথিল হল না। লোকটা বুঝল, তাকে একটা ঘরের মধ্য দিয়ে টেনে নিয়ে আর একটা ঘরে আনা হল। এ বারেও দরজার তালা খোলার আওয়াজ পেয়েছে সে।
সামনের লোকটা এত ক্ষণে হাত ছেড়ে দিয়েছে। এ বার পিছনে এসে খুলে দিল লোকটার চোখের কাপড়। ঘণ্টা দুয়েকের ওপর তাকে এই ভাবে চোখ বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছে। চোখ খোলার পরে স্বাভাবিক ভাবেই প্রথমে লোকটা কিছুই ভাল করে বুঝতে পারল না। তার পরে একটু ধাতস্থ হল। আর অবাক চোখে তাকাতে থাকল ঘরটার চার পাশে।
একটা প্রত্যাশা নিয়েই সে এই বাড়ির ভিতরে পা রেখেছিল। কিন্তু সামনের দৃশ্যটা যে-প্রত্যাশাকে এই ভাবে ছাপিয়ে যাবে, সেটা আশা করেনি।
যে-ঘরটার মধ্যে সে দাঁড়িয়ে আছে, তা কম করে ১৬ ফুট উঁচু তো হবেই। চওড়ায় প্রায় ১৪ ফুট। লম্বাও ১৬ ফুটের কম হবে না। এই রকম একটা ঘরের মাঝখানে ভারা এক জনের পিছনে এক জন করে দাঁড়িয়ে। পাশাপাশি দাঁড়ানোর উপায় নেই। দু’পাশ জুড়ে প্রায় ছাদ অবধি উঠে গিয়েছে একটার উপরে একটা রাখা প্লাস্টিকের বস্তার সারি।
বস্থা বলাটা ভুল হল। প্ল্যাস্টিকের বিশাল বিশাল প্যাকেট বললে কিছুটা ঠিক বলা হত। সেই প্ল্যাস্টিকের প্যাকেটের সারি উঠে গিয়েছে প্রাম ছাদ পর্যন্ত। দু’পাশে এমন ভাবে সাজানো আছে সে-সব প্যাকেট যে, মাঝখানে একটা ছোট প্যাসেজ ছাড়া এত বড় ঘরে আর কোনও জায়গা নেই।
প্ল্যাস্টিকের প্যাকেটগুলো স্বচ্ছ হওয়ায় ভিতরে কী আছে, বুঝতে কোনও সমস্যা হল না লোকটার। প্রতিটা প্ল্যাস্টিকের প্যাকেট ঠাসা পাঁচশো টাকার নোটে। লোকটা এক বার আন্দাজ করার চেষ্টা করেছিল, কত কোটি টাকা আছে ঘরটার মধ্যে, তার পরে হিসেব করা ছেড়ে দিল!
তবে এটুকু সে জানে, ২০ হাজারটা পাঁচশো টাকার নোটে এক কোটি হচ্ছে। আর সেই নোটের মিলিত ওজন হবে মোটামুটি ২৩ কেজি। দেখে মনে হচ্ছে, ওই ২৩ কেজির কাছাকাছিই ওজন হবে এক-একটা প্ল্যাস্টিক প্যাকেটের!
বন্দুকধারী লোকটা এ বার মুখ খুলল, “তোমাকে আর একটা কথা জানাতে বলা হয়েছে। এই রকম ঘর এই গ্রামে আরও বেশ কয়েকটা আছে। আর নিশ্চিন্ত থেকো, এখানে একটা নোটও জাল নয়।”
বন্দুকধারীর কথা অবিশ্বাস করল না লোকটা। মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সে সন্তুষ্ট হয়েছে। আবার কালো কাপড়ে বেঁধে দেওয়া হল লোকটার চোখ। শুরু হল ফেরার যাত্রা।
লখনউয়ে পৌঁছে লোকটা আর দেরি করল না। তাকে যেখানে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে হোটেলটা বেশি দূরে নয়। হোটেলে ফেরার আগে অবশ্য মোবাইল থেকে একটা ফোন করল সে-
“সব ঠিক আছে। যা বলা হয়েছিল, তার থেকে বেশি বই কম টাকা নেই পার্টির কাছে।”
উল্টো দিক থেকে জবাব এল, “ওকে। তোমার কাজ শেষ। এ বার ফিরে এসো।”
লোকটা আর দেরি করল না। হোটেল থেকে বেরিয়ে রওনা দিল লখনউ এয়ারপোর্টের দিকে।
মুম্বইয়ে যার কাছে ফোন গিয়েছিল, সে-ও খানিকটা নিশ্চিত হল। প্রথমে যখন উত্তরপ্রদেশের এই লোকটার খবর তারা পায়, একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিল সবাই। উত্তরপ্রদেশে এই ধরনের ক্ষমতাশীল লোকের কাছে নিঃসন্দেহে টাকার অভাব হবে না, কিন্তু তাদের ব্যবসায় যে-পরিমাণ টাকা ঢালা প্রয়োজন, সেটা আছে কি না, সন্দেহ ছিল সেখানেই। একশো কোটি-দেড়শো কোটির ইনভেস্টমেন্ট প্রয়োজন এখানে। লোকটাকে ব্যবসায় এন্ট্রি দেওয়ার আগে তার অর্থনৈতিক অবস্থাটা বোঝার একটু প্রয়োজন ছিল। যে-কারণে চাক্ষুস দেখাটা জরুরি হয়ে পড়ে। লোকটা রাজিও হয়ে যায় নিজের ধনসম্পদের একটা নমুনা দেখাতে। আর তার পরেই তাদের এজেন্ট উড়ে যায় লখনউয়ে।
পুরো ব্যাপারটা জানা যাবে সেই এজেন্ট লখনউ থেকে মুম্বই এলে। কিন্তু যা ইঙ্গিত পাওয়া গেল, তাতে নিশ্চিন্ত হওয়াই যায়।
এক দিনের মধ্যেই একটা ফোন চলে গেল দুবাইয়ে—
“আমরা নতুন ইনভেস্টর পেয়ে গিয়েছি।”
দুবাইয়ে তখন বেলা এগারোটা। বৈঠকটা হচ্ছিল পাম জুমেইরার ভয়ানক বিলাসবহুল একটা অ্যাপার্টমেন্টে। ঘরের মাঝখানে যে-লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল, কোনটা যায় তারই মোবাইলে। উল্টো দিকের লোকটার কথা শুনে হাসিমুখে মোবাইলটা নামিয়ে রেখে ঘরের দিকে ফিরল সে– “বন্ধুগণ, আমরা আরও এক জন ইনভেস্টর পেয়ে গেলাম আজ।”
ঘরের মধ্যে ওই ব্যক্তি ছাড়া রয়েছে আরও তিন জন। এক জন অবশ্য তাদেরই লোক। বাকি দু’জন সম্ভাব্য ইনভেস্টর!
স্বাভাবিক ভাবেই এই ব্যবসায় নামার রাস্তাটা সোজা নয়। শুধু টাকা থাকলেই হবে না, উপযুক্ত যোগাযোগ থাকতে হবে, সে-রকম ক্ষমতা থাকতে হবে। এদের একটা স্কাউট টিমও থাকে। যারা এই সম্ভাব্য ইনভেস্টরদের একটা তালিকা তৈরি করে। এই ইনভেস্টররা শুধু ভারতেরই হয় না, বিদেশিরাও থাকে তালিকায়। তার পরে সেই নামগুলোর উপরে আলাদা করে নজর রাখা হয়। তাদের সঙ্গে ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো হয়। এবং, সুযোগ বুঝে ইঙ্গিত দেওয়া হয়। যারা সেই ইঙ্গিত বুঝে আগ্রহ দেখার, তাদেরই পরবর্তী ধাপের জন্য বেছে নেওয়া হয়। সেই পরবর্তী ধাপ হল এ রকমই কোনও মিটিং। যেখানে অনেকটাই খোলাখুলি আলোচনা হয়।
এ দিন যেমন মিটিংয়ে হাজির ছিল দু’জন খুবই বিখ্যাত আন্তর্জাতিক স্তরের ব্যক্তিত্ব। এক জন রাজনীতিবিদ, অন্য জন এক আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়।
ফোনটা নামিয়ে রেখে কেতাদুরস্ত মধ্য তিরিশের যুবা এ বার অতিথিদের দিকে তাকাল। ছেলেটার কথাবার্তা, পোশাকআশাকের মধ্য দিয়ে একটা কর্পোরেট সংস্কৃতি ফুটে উঠছে। ঠিক যেন কোনও এমবিএ পাশ যুবক তার কোম্পানির প্লাস-মাইনাস পয়েন্ট বোঝাচ্ছে ক্লায়েন্টদের।
“আমাদের টিমে আরও এক জন ইনভেস্টর যুক্ত হল। দেখেছেন তো, এই ব্যবসা কীভাবে বিত্তশালী লোকেদের টেনে আনছে।” এক মুখ হাসি হেসে বলল সে।
“আপনারা যেমন বলেছেন, সে-রকম রিটার্ন পাওয়া যাবে কি?” মুখ খুললেন রাজনীতিবিদ।
ছেলেটির জবাব তৈরি করাই ছিল, “যদি এক টাকা বিনিয়োগ করেন, দশ টাকা মুনাফা হবে আপনার। এই ব্যবসায় কখনও মন্দা আসবে না। ব্যবসা দাঁড়িয়ে থাকে সাপ্লাই আর ডিমান্ডের উপরে। বিশ্ব জুড়ে আমাদের প্রোডাক্টের ডিমান্ড আছে। আর সাপ্লাই কমার কোনও প্রশ্নই নেই।”
সত্যি, সাপ্লাই কমবে কী করে? ভারতে দারিদ্র কখনও কমবে না। কমবে না কন্যা সন্তানের জন্মানোর হার। যারা বড় হয়ে সামান্য খাদ্য সংস্থানের জন্য নিজেকে বিকিয়ে দেবে এই ভয়ঙ্কর জগতে। তারা নিজেরা না-বিকোলে, বিকিয়ে যাবে তাদের বাড়ির লোক। বাবা-মা, দাদা-জামাইবাবু, মাসি-পিসি। কেউ বাদ যায় না মেয়ে পাচারের ক্ষেত্রে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তো বাড়ির লোক এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমেই পাচার হয়ে যায় মেয়েরা। দারিদ্র কোনও দিনই দূর হবে না দেশ থেকে। আর সাপ্লাইও কোনও দিন কমবে না।
ছেলেটা তাই নিশ্চিন্তে গ্যারান্টি দিয়ে দিতে পারল। তার পরে বলল, “এ বার আপনি ক’শো কোটি টাকা লগ্নি করবেন, সেটা আপনার ব্যাপার। তবে আমার পরামর্শ হবে, একশো কোটির কম হলে ব্যাপারটা ঠিক জমবে না।”
ঘরে সামান্য নীরবতা। তার পরে মুখ খুললেন ক্রীড়াবিদটি। “কিন্তু আমাদের নাম জড়িয়ে গেলে কী হবে? আমরা তো শুধু টাকা ঢালছি। কিন্তু সেটাও জানাজানি হয়ে গেলে তো কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।” স্বাভাবিক ভাবেই নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করার ব্যাপারটা তাঁর কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে সবার আগে।
এ বারও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব এল, “এই নিয়েও দুশ্চিন্তা করার কোনও প্রয়োজন নেই। আপনাদের আর এই ব্যবসার মধ্যে অনেকগুলো স্তর থাকবে। যা ভেদ করে কেউ পৌঁছতেই পারবে না আপনাদের কাছে। আর আপনারা তো সরাসরি কিছুর সঙ্গেও জড়িত থাকবেন না। টাকা ঢালবেন আর মুনাফা শুনে নেবেন। ব্যস। আপনাদের কাজ শেষ।”
টাকা লেনদেনেরও অনেক সহজ প্রক্রিয়া আছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে, চ্যারিটি ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে। এ ছাড়া কাঁচা টাকার লেনদেন তো আছেই। ‘ব্ল্যাক মানি’ তো এই ভাবেই হাতবদল হয়। যার যে-রকম সুবিধে। বিদেশি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আর হাওয়ালা মারফত টাকা এ-দিক ও-দিক করাটা তো খুবই সহজ কাজ। মোদ্দা কথা, টাকা আর ইচ্ছেটা থাকতে হবে। তা হলেই সব কাজ মসৃণ ভাবে হয়ে যাবে।
কর্পোরেট সংস্কৃতিতে দেখা যায়, অনেক সময় মানুষকে ভুল বোঝানো হয়। ব্যবসাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়। এখানে কিন্তু ব্যাপারটা অন্য। যা বলা হচ্ছে, সেটাও কম। হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের ডাল-পালা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে গিয়েছে। দেশের নানা জায়গায় গজিয়ে উঠছে নিত্যনতুন কোঠাবাড়ি। মানে, পতিতালয়। যেখানে টাকা ঢাললে চোখ-ধাঁধানো মুনাফা গোটা যায়। তাই সমাজের একেবারে উচ্চ স্তরে থাকা প্রচুর মানুষের টাকা খাটে এখানে। এ ছাড়া অন্য দিকগুলো তো আছেই। খুলে যাচ্ছে নতুন নতুন রাস্তাও। তবে ক্লায়েন্টদের এত কথা বলার কোনও প্রয়োজন হয় না। তাদের মোটামুটি বুঝিয়ে দিতে হয়, ‘তোমরা টাকা ঢালো আর চোখ বন্ধ করে দশ গুণ-কুড়ি গুণ মুনাফা লোটো। বাকি সব কিছু আমাদের উপরে ছেড়ে দাও।’
লোকটা আবার তাকাল তার দুই ক্লায়েন্টের দিকে। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, দু’জনকেই জালে তোলা গিয়েছে। সে জানে, লোভ মানুষকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নিতে পারে।
ঠোঁটে একটা হাসি ঝুলিয়ে খুব আস্তে আস্তে ছেলেটা বলা, “আপনাদের নাম কোথাও কোনও ভাবে জড়াবে না। আর কেউ যদি জড়ানোর চেষ্টা করে, তাদের চিরকালের মতো চুপ করিয়ে দেওয়ার উপায় আমাদের জানা আছে। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”
