প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৬. ফ্ল্যাশব্যাক: পূর্ণিমায় অমাবস্যা

৬. ফ্ল্যাশব্যাক: পূর্ণিমায় অমাবস্যা

শাহজাহানপুর-রেওয়ারি রোডের ধারে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর কোনও একটা

“ওই পুতুলটার দাম কত?” খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল ছোট্ট মেয়েটা। দোকানি একটু অবাক হয়ে জানতে চাইল, “কে বোল রাহা সে?”

আট-ন’বছরের মেয়েটা হাসতে হাসতে এ বার পরিচিত ভাষায় প্রশ্নটা করল। দোকানিও দেরি না-করে জবাব দিয়ে দিল।

দোকানি যত না অবাক হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছিল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক জাঠ যুবক। এই ভাষাটা সে আগেও শুনেছে তার বিশেষ পরিচিত এক জনের মুখে। কিন্তু এই রকম জায়গায় একটা বাচ্চা মেয়ের মুখে এই ভাষা যে-কখনও শুনতে পাবে, তা ভাবতে পারেনি ছেলেটা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করতে লাগল, কখন মেয়েটা দোকান ছেড়ে বেরিয়ে আসবে।

আশেপাশের বেশ কয়েকটা গ্রাম মিলে এই স্থানীয় মেলাটার আয়োজন করে বছরে দু’বার। এখানে ফাঁকা মাঠের অভাব নেই। সেই রকমই একটা মাঠে বেশ কিছু দোকান আর নাগরদোলা, মেরি গো রাউন্ড, ইত্যাদি বসিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে এ বারের মেলাটা। বাচ্চা-বুড়ো, পুরুষ ভিড় করেছে সবাই। স্বাভাবিক ভাবেই মেয়েদের ভিড় বেশি নেই। চারপাশের এই রকম বেশ কিছু গ্রামে মেয়েদের সংখ্যা এতই কম যে, তাদের আর বাইরে বিশেষ দেখা যায় না।

বাচ্চা মেয়েটা এ বার দোকান থেকে বেরিয়ে এ দিক-ও দিক তাকাতে লাগল। মনে হয়, বাড়ির লোকেদের খুঁজছে। ছেলেটা আর সময় নষ্ট না-করে দ্রুত এগিয়ে গেল বাচ্চাটার দিকে। তার পরে জিজ্ঞেস করল, “এই ভাষাটা তুমি শিখলে কোথা থেকে?”

মেয়েটা আবার একমুখ হেসে জবাব দিল, “আমাদের গ্রামে এক জন দিদি আছে। ও এই ভাষাটা বলে। ওর কাছ থেকে অল্প কিছু শিখেছি।”

“তোমাদের গ্রামের নাম কী?” মেয়েটা স্থানীয় একটা গ্রামের নাম বলল। নামটা শুনেই ছেলেটার মনে একটা সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল। এই গ্রামটা সম্পর্কে সে ভালই জানে। এখানে তার পরিচিত একটি মেয়ে আছে। খবরটা ভাল করে নিতে হবে।

ছেলেটা আর কথা বাড়াল না। কেউ দেখে ফেললে অন্য রকম কিছু ভাবতে পারে। আর এখানকার লোকেদের যা মেজাজ, একটু এ-দিক ও-দিক হলে মুন্ডুটা নামিয়ে দিয়ে লাশটা কোথাও ফেলে দেবে।

একটু আড়ালে চলে এসে ভাবতে লাগল ছেলেটা। ব্যাপারটা খুবই অস্বাভাবিক। এই রকম প্রত্যন্ত, জাঠ অধ্যুষিত এলাকায় একটা মেয়ে বাংলা ভাষা জানে, এটা স্বাভাবিক ভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। বাচ্চাটার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে, ওর ওই দিদি এক জন বাঙালি। এটা হতেই পারে, বাঙালি মেয়েটা বিয়ে করে ওই গ্রামে এসেছে। কিন্তু ছেলেটার মনে একটা সন্দেহ হচ্ছিল। সে ওই বিশেষ গ্রামটা সম্পর্কে একটা ব্যাপার জানে। ওখানে এমন কিছু কাণ্ড ঘটেছিল অতীতে, যা ভোলা সম্ভব নয়। তা ছাড়া তাকে বিশেষ করে বলে দেওয়া হয়েছে, এই সব ক্ষেত্রে কোনও-রকম কোনও খটকা লাগলেই ভাল করে খোঁজ নিতে।

ছেলেটা ওর কর্তব্য স্থির করে ফেলল। ওই গ্রামে পরিচিত যে-মেয়েটি আছে, তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। পুরোপুরি নিশ্চিত হতে হবে, কী ঘটছে। তার পরে ঠিক জায়গায় ফোনটা করবে।

.

হরিয়ানা স্টেট হাইওয়ের অন্তর্গত শাহজাহানপুর-রেওয়ারি রোড এঁকেবেঁকে অনেক দূর পর্যন্ত চলে গিয়েছে। আর মাঝেমধ্যেই মূল রাস্তা থেকে শাখা প্রশাখার মতো বেরিয়ে আসা ছোট ছোট, কাঁচা রাস্তাগুলো মিলিয়ে গিয়েছে ধু ধু প্রান্তরে। যার আশেপাশে মাঝেমধ্যে গজিয়ে উঠেছে কিছু গ্রাম। যে-সব গ্রামে এখনও শহুরে শাসন ব্যবস্থা চলে না। যেখানে খাপ পঞ্চায়েত চূড়ান্ত কথা বলে। যেখানে পুরুষদের চোখে মেয়েরা শুধুই সম্ভোগের বস্তু। যেখানে ভ্রূণহত্যার জেরে এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যে, বিয়ের জন্য ছেলেরা আর পাত্রী পায় না। তাদের চোখ তখন গিয়ে পড়ে অনেক অনেক দূরে।

মাস ছয়েক আগে এ রকমই একটা গ্রামের দৃশ্য। বাড়ির সামনের খাটিয়ায় পা তুলে বসে ছিল প্রৌঢ় লোকটি। বয়স ৭০ পার হয়ে গিয়েছে, কিন্তু চেহারার বাঁধুনি আলগা হয়নি। শরীরের চামড়াও ঝুলে যায়নি। চোখের দৃষ্টিতে এখনও সেই লোলুপ ভাবটা ধরা পড়ে, যা যৌবনের আগুন চিরতরে নিভে যাওয়ার আগে শেষ ধুকপুকুনিটার আভাস দিচ্ছে। সকালের রোদে খাটিয়ায় আরাম করে বসে লোকটা ডুবে যাচ্ছিল অতীতে। আহা, কী সব সুখের স্মৃতি। কত কী করেছে সে যৌবনে। তার শরীরের ক্ষমতা কত, তা অনেক মেয়েই টের পেয়েছে। এখনও সেই ক্ষমতা অটুট আছে, কিন্তু তা প্রয়োগ করার উপায় কোথায়! লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

তার পাঁচ ছেলের চার জন এখনও এই বাড়িটায় থাকে। চাষ-আবাদ আর টুকটাক কাজকর্ম সামলায়। ঘরের কাজকর্মও এই চার জনে মিলে উতরে দেয়। বাড়িতে মেয়ে কই যে, গৃহস্থালির কাজ সামলাবে। মেয়ে নেই, মেয়ে আনার উপায়ও দেখা যাচ্ছে না। কোথায় গিয়ে বিয়ে করবে ছেলেরা! এ দিকে তো মেয়েদের আকাল পড়ে গিয়েছে।

তার সেজো ছেলে এখানে এখন থাকে না। সে কলকাতা না কোথায় গিয়েছে। চাকরি করছে সেখানে, টাকাও পাঠায়। কিন্তু তারা কেউ টাকা চায় না। ছেলের কাছ থেকে একটা জিনিস খুব বেশি করে চায় বয়স্ক লোকটি। সেই চাহিদা ছেলে মেটাতে পারবে কি না, সেটাই এখন মানুষটার কাছে সব চেয়ে বড় প্রশ্ন।

প্রশ্নের জবাবটা যে-এত তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে, ভাবতেই পারেনি লোকটা। সে দিন একই ভাবে রোদ পোয়াচ্ছিল সে। হঠাৎ দৌড়ে এল বড় ছেলে।

“ভাইয়া ফোন করেছিল, বাপু।”

বাবা শুধু মুখ তুলে তাকাল।

“ভাইয়া বিয়ে করেছে। খুব তাড়াতাড়ি বৌকে নিয়ে বাড়ি আসছে,” বড় ছেলের উত্তেজনা যেন বেড়েই চলেছে।

বাপুর নির্লিপ্ত মুখেও এ বার হাসি ফুটল। একটা কুটিল, লোলুপ, শ্বাপদের হাসি। আহ, অনেক দিনের অতৃপ্তিটা এ বার মেটানো যাবে।

ফোনটা আসার তিন দিনের মধ্যে সেজো ছেলে বাড়ি ফিরল বৌকে নিয়ে। মেয়েটা ঠিক কলকাতার নয়। বর্ধমানের। চাকরি করতে ওই দিকেই গিয়েছিল ছেলেটা। তার পরে আলাপ, সেখান থেকে প্রেম আর কয়েক মাসের মধ্যেই বিয়ে।

স্বামীর হাত ধরে বাড়ি ছাড়ার সময় পূর্ণিমার চোখে ছিল নানা রঙিন স্বপ্ন। বহু দূরের এক সংসারে যাচ্ছে সে। কাউকে চেনে না। কিন্তু পাশে তার স্বামী আছে, এটাই ভরসা। পূর্ণিমা মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল, সে আপ্রাণ চেষ্টা করবে সবার সঙ্গে মানিয়ে নিতে। ঘরে ভাশুরেরা আছে, বয়স্ক শ্বশুর আছেন। তার চেষ্টাই থাকবে সবার মুখে হাসি ফোটাতে।

তিন দিনের মধ্যেই রঙিন বুদবুদটা ফেটে মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। পূর্ণিমার জীবনে অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এল। এতই ভয়ানক সে অন্ধকার যে, ২০ বছরের একটি নিষ্পাপ, বাঙালি মেয়ের জীবন তাতে চিরকালের মতো ঢাকা পড়ে গেল।

রাত তখন ক’টা হবে? বড়জোর আটটা। তাদের বাড়িতে তিনটে ঘর। একটা নতুন বর-বৌকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একটায় বাবা থাকে। অন্য ঘরটায় বাকি চার ছেলে। আটটা মানে প্রায় গভীর রাত। মেঝেয় লন্ঠনের অল্প আলোয় ঘরটা ছায়া ছায়া হয়েছিল। আর সেই আধো-ছায়ায় বোঝা যাচ্ছিল, দুই নরনারী বিছানায় সম্ভোগ-সুখে মত্ত।

আধ ঘণ্টা পরে স্বামীকে শরীরের উপর থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বিছানায় উঠে বসল পূর্ণিমা, “তুমি তো একেবারে জানোয়ার হয়ে গিয়েছ।” মুখে অবশ্য হাসি লেগেই ছিল মেয়েটার। এই রকম সুখ সে কোনও দিন পায়নি। এমন সময় দরজার বাইরে থেকে শ্বশুরের গলা পাওয়া গেল। ছেলেকে ডাকছে। ছেলে দ্রুত পাজামাটা পরে নিয়ে দরজা খোলার জন্য এগোল। আরও দ্রুততার সঙ্গে পূর্ণিমা নিজের নগ্ন শরীর শাড়িতে ঢাকার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

শ্বশুরমশাই অবশ্য ঘরে ঢোকেনি। ছেলের সঙ্গে বাইরে দাঁড়িয়ে মিনিটখানেক কী কথা বলল। তার পরে পায়ের আওয়াজে বোঝা গেল নিজের ঘরের দিকে চলে গেল প্রৌঢ় লোকটি।

ছেলেটা এ বার ঘরে এসে পূর্ণিমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “বাপু তোমাকে ডেকেছে। একটু ওর ঘরে যাও তো এখন।”

“এখন মানে? এই অবস্থায় কী করে যাব?” সম্পূর্ণ হতচকিত হয়ে পড়ল পূর্ণিমা।

“আরে কিছু হবে না। শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে চলে যাও। বাপুজি তোমার সঙ্গে কী কথা বলতে চায়। আর ঘর তো প্রায় অন্ধকার। তোমাকে থোড়াই দেখবে।”

অবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকল পূর্ণিমা। স্বামীর এই রকম চেহারা সে আগে দেখেনি। ভয় ভয় করতে লাগল তার। স্বামী আবার এগিয়ে এসে তাড়া দিল, “আরে চলো না, বাপুজি কত ক্ষণ অপেক্ষা করবে তোমার জন্য?”

মনে এক রাশ আশঙ্কা নিয়ে স্বামীর পিছন পিছন শ্বশুরের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল পূর্ণিমা। ছেলে দরজাটা খুলে ধাক্কা দিয়ে বৌকে ঢুকিয়ে দিল ঘরের মধ্যে। আর বাইরে থেকে দরজায় শিকল তুলে দিল।

আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পূর্ণিমা দরজা ধাক্কানোর একটা চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সুযোগ পেল না। দু’টো শক্তিশালী হাত অন্ধকার থেকে এগিয়ে এসে তার কোমর জড়িয়ে ধরে একটা হেঁচকা টানে মেঝেতে ফেলে দিল। আলগোছে যে- শাড়িটা গায়ে জড়ানো ছিল, সেটা তত ক্ষণে এক টানে খুলে ফেলেছে লোকটা। সম্পূর্ণ নগ্ন শরীরটার দিকে কয়েক পলক লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল লোকটা। তার পরে ঝাঁপিয়ে পড়ল তীব্র জৈবিক ক্ষুধা মেটানোর জন্য।

প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর লজ্জায় চোখ খুলতে পারছিল না পূর্ণিমা। তার মধ্যে ও বুঝতে পারল, তার শ্বশুর আর মানুষ নেই, এক কামুক জন্তুতে পরিণত হয়েছে।

কতটা সময় তার দেহটা ভোগ করেছিল ওই কামুক পশু, পূর্ণিমা বলতে পারবে না। শরীরের উপর থেকে যখন একটা পাথর সরে গেল, তখন পূর্ণিমার চেতনা প্রায় লুপ্ত। হতে পারে একটা যুগ, হতে পারে মিনিট পনেরো। কে জানে কতটা সময় কেটে গিয়েছে। পূর্ণিমা হঠাৎ টের পেল তার স্বামী এসে টেনে তুলছে তাকে। টলমল পায়ে কোনও মতে ঘরের বাইরে আসতেই আতঙ্কে জমে গেল পূর্ণিমা। সামনে দাঁড়িয়ে আরও চারটে অর্ধনগ্ন পুরুষ মূর্তি। তার ভাশুর এবং দেওরেরা। স্বামীর আর একটা ধাক্কায় পূর্ণিমা গিয়ে ছিটকে পড়ল বড় ভাশুরের বুকে। দু’টো লোহার মতো হাত আবার জড়িয়ে ধরল কোমল শরীরটা। পূর্ণিমার গলা থেকে যে-আর্তনাদটা বেরোল, তা ঠোক্কর খেতে খেতে ছড়িয়ে পড়ল গ্রামের নানা কোণে। কিন্তু কেউ অবাক হল না।

এই রকম আর্তনাদ তারা মাঝেমধ্যেই শুনে থাকে। বিশেষ করে যখন কোনও পরিবারে নতুন মেয়েছেলে আসে। কী আর করা যাবে। শারীরিক চাহিদা তো সবারই থাকে। আর যেখানে মেয়ের সংখ্যা এত কম, সেখানে বাইরের একটা মেয়েকে পেলে তো চার-পাঁচ জন পুরুষ একসঙ্গে ভোগ করবেই। এ ছাড়া উপায়ই বা কী আছে!

.

ওই ঘটনার মাস ছয়েক বাদে এক সন্ধ্যায় তাঁর নয়ডার অফিস থেকে বেরোতে যাবেন পাঞ্চালী, মোবাইলটা বেজে উঠল। নম্বরটা তার পরিচিত। তাঁর অগুনতি ইনফর্মারের মধ্যে এক জন ফোন করেছে।

“হ্যাঁ, বলো।”

“দিদি, একটা খবর আছে। হরিয়ানার এক গ্রামে এক বাঙালি মেয়েকে পাচার করে নিয়ে আসা হয়েছে। সব খবর পেয়েছি।”

এক মুহূর্ত ভাবলেন পাঞ্চালী। তার পরে বললেন, “ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি। আমাদের দেখা হওয়াটা খুবই জরুরি। সময় একদম নষ্ট করা যাবে না।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *