প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

১৬. অন্ধকারে আলো

১৬. অন্ধকারে আলো

তাতোপানি-কাঠমান্ডু-মুম্বই, ২০১৫-২০২৩

২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল। ওই দিনটা কোনও দিন ভুলতে পারবে না অপরাজিতা। ওই দিনটা তার জীবন বদলে দিয়েছিল।

কত বয়স হবে তার তখন? বছর ষোলো। দুপুরের দিকে প্রথমে কম্পনটা ধরা পড়ে। শুরুতে অল্প, তার পরে ভয়ঙ্কর ভাবে দুলতে থাকে বাড়িঘরগুলো। মায়ের চিৎকারে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে আসে অপরাজিতা। ছোট ভাইটার হাত ধরে। মা-ও বাইরে ছিলেন। আশেপাশের বাড়িতেও একই অবস্থা। সবাই ছুটে বেরিয়ে আসছে। তাদের ছবির মতো এই গ্রামে বাড়িগুলো তেমন মজবুত নয়। পাহাড়ি গ্রামের বাড়িঘর যে-রকম হয়, সে-রকম আর কী! অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ছবির মতো গ্রামটাকে চোখের সামনে দুঃস্বপ্নের কোনও দৃশ্যে বদলে যেতে দেখল অপরাজিতা। একটার পরে একটা বাড়ি ভেঙে পড়ছে। চার দিকে আর্তনাদ, চিৎকার, হাহাকার। অনেকেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি ঠিক সময়ে। তারা আটকে পড়ে গিয়েছে মরণফাঁদে।

ধীরে ধীরে ভূকম্পের প্রভাব কমে আসে। কিন্তু নেপালের বুকে সে তার মারণচিহ্ন তত ক্ষণে রেখে গিয়েছে। ৭.৮ ম্যাগনিটিউডের এই ভূকম্পে কাঠমান্ডু আর তার চার পাশের অনেক জায়গাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে ছ’লাখ বাড়ি-ঘর-দোকানপাট-মন্দির ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছে। হতাহতের সংখ্যা জানার জন্য আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হয়। অপরাজিতাদের ছবির মতো গ্রাম তাতোপানিও ধূলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছে। তাতোপানিতে উদ্ধারকার্য চালানোর জন্য বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করে নেপালি সরকার। ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দল জোট বেঁধে এই উদ্ধারকার্যে শামিল হয়।

এর পরে আরও খবর আসতে থাকে। জানা যায়, ন’হাজারেরও বেশি মানুষ এই ভয়াল ভূকম্পে প্রাণ হারিয়েছে। সব চেয়ে মারাত্মক খবরটা অপরাজিতারা পায় ভূকম্প ঘটার দু’দিন পরে। কাঠমান্ডুতে একটি দোকানে কাজ করতে যাওয়া তার বাবা ওই ন’হাজার মৃত মানুষের মধ্যে এক জন। ওই দিনটাই বদলে দিয়ে যায় অপরাজিতার জীবন।

দু’টো বছর কেটে যায় এর পরে। বয়স বাড়তে থাকে অপরাজিতার। পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে পরিবারের অনটন। অপরাজিতা আর তার মা বুঝতে পারছিলেন, এই ভাবে আর বেশি দিন চলতে পারবে না। ভাইটাও বড় হচ্ছে। খরচ বাড়ছে। গ্রামের অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। জমানো যা কিছু ছিল, তা শেষ। এই অবস্থায় উপার্জনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল মা-মেয়ে দু’জনেই। তখনই এগিয়ে এসে ভাব জমায় ছেলেটা। গ্রামেরই ছেলে। নারাং। কাঠমান্ডুতে নিয়মিত যায়। ওখানে নাকি কী সব কাজ-টাজ করে। ছেলেটা এসে প্রস্তাব দেয়, অপরাজিতাকে কাঠমান্ডুতে কাজ পাইয়ে দেবে। বিউটি পার্লারের কাজ। মেয়েদের চুল ঠিক করতে হবে, মুখে, মাথায় ম্যাসাজ করতে হবে। এই সব আর কী। অপরাজিতা প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি, কীভাবে সে ওই সব কাজ করবে। সে তো কিছুই জানে না।

অভয় দিয়ে নারাং বলেছিল, “তুমি কিছু চিন্তা কোরো না, অপরাজিতা। খুবই সাধারণ কাজ। তোমাকে ট্রেনিং দিয়ে দেওয়া হবে। আর এ জন্য তোমার কোনও খরচ নেই। প্রথম এক মাস ট্রেনিং চলবে। তোমার থাকার ব্যবস্থাও কাঠমান্ডুতে করে দেওয়া হবে। একটা পয়সা লাগবে না। তুমি কাঠমান্ডুতে এলেই তোমার হাতে কিছু টাকা দেওয়া হবে। তুমি চাইলে, সে সব টাকা আমি তোমার মায়ের কাছে পৌঁছে দিতে পারি। এক মাস পরে তুমি চাকরিতে জয়েন করবে। আর তখন থেকে নিয়মিত মাইনে পাবে। সঙ্গে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা।”

রাতে শুয়ে শুয়ে মা-মেয়ে অনেক কথাই বলেছিল। মায়ের মনে আশঙ্কার একটা মেঘ দানা বেঁধেছিল। কিন্তু মেয়ের মনে একটা রঙিন স্বপ্ন জন্ম নিচ্ছিল। সে চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। মাকে টাকা পাঠাবে নিয়মিত। ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাবে। সংসারটা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। দিন কয়েক পরে নারাংয়ের সঙ্গে কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা দিল অপরাজিতা। চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে।

চার মাস। চার মাস লেগেছিল অপরাজিতার স্বপ্নটা বাস্তবের কঠিন জমিতে আছড়ে পড়ে দলা পাকিয়ে যেতে। বিউটি পার্লারের স্বরূপটা সে ধীরে ধীরে তখন বুঝতে পারছিল। আলো-অন্ধকারে ভরা ওই বিউটি পার্লারের ছোট ছোট কিউবিকলে কী ধরনের ম্যাসাজ হয়, সেটা ধীরে ধীরে মেয়েটার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল। সে মহিলাদের চুল ঠিক করে দিয়ে, একটু মাথা টিপে দিয়ে যা রোজগার করত, তার চার-পাঁচ গুণ বেশি অর্থ অনেক মেয়ে ওই বিউটি পার্লার থেকে কামিয়ে নিয়ে যেত। ওই সব কিউবিকলে পুরুষ কাস্টমারদের ‘সার্ভিস’ করে।

অপরাজিতার উপরেও চাপ বাড়ছিল। সে দেখতে সুন্দর, তার উপরে ত্বকের উজ্জ্বলতা আর মাখনের মতো শরীর একটা বাড়তি আকর্ষণের বস্তু হয়ে উঠেছিল। সে শুনেছিল, ক্লায়েন্টরা নাকি তাকে বিশেষ পছন্দ করছে। ‘ভার্জিন’ শব্দটাও তার কানে আসছিল। ভার্জিনদের নাকি দামটা অনেক বেশি। শব্দটার মানে সে ঠিকমতো বুঝতে না-পারলেও কিছুটা ধরতে পারছিল! যে-ফুলের পাপড়ি এখনও ঝরে যায়নি।

অপরাজিতা এক বার ভেবেছিল, সব ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাবে। কিন্তু মায়ের কী হবে তা হলে? ভাইয়ের কী হবে! তার টাকায় এখন সংসার চলছে। সে নিজেও যেন কাঠমান্ডুর এই জীবনের সঙ্গে ক্রমে মানিয়ে নিচ্ছিল। সে সব ছেড়ে এখন কীভাবে ফিরে যাবে? যে-তিনটে মেয়ের সঙ্গে রুম শেয়ার করে কাঠমান্ডুতে থাকত অপরাজিতা, তাদের জীবনযাপনেও পরিবর্তন আসতে লাগল। ভাল ভাল পোশাক কেনা, কসমেটিক্স কেনা, রেস্তরাঁয় খাওয়া-দাওয়া, সবই চুটিয়ে চলছিল। তাদের মুখে ধীরে ধীরে পুরো ব্যাপারটা শোনে অপরাজিতা। একটা মেয়ে তো তাকে এও বলেছিল, “তুই নেমে পড় এই লাইনে। তোর রেট কিন্তু অনেক বেশি হবে।”

দু’টো দিন সময় নিয়েছিল অপরাজিতা। তার পরে কিছুটা বাধ্যবাধকতা, কিছুটা প্রলোভন তাকে টেনে নিয়ে গেল এক অন্ধকার দুনিয়ায়। যে-দুনিয়া থেকে বেরিয়ে আসা যায় না।

কেটে গেল আরও একটা বছর। অপরাজিতা তখন আঠারো পার করে ফেলেছে। এর মধ্যে বার কয়েক গ্রামে গিয়েছে সে। মা, ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছে। কিন্তু সত্যি কথাটা বলা সম্ভব হয়নি। মা কিছু টের পেয়েছিলেন কি না, সে ঠিক বুঝতে পারেনি। কিন্তু মুখ ফুটে তার কাজের ব্যাপারে কিছু কখনও জিজ্ঞেস করেননি।

এক দিন আবার নারাং এল তার সঙ্গে দেখা করতে। কাজের পরে দু’জনে গিয়ে বসল একটা কফিশপে। সেখানেই নতুন প্রস্তাবটা দিল নারাং, “ইন্ডিয়া যাবে তুমি? ওখানে কিন্তু তোমার সামনে বিরাট সুযোগ থাকবে। এখানে যা পাচ্ছ, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি টাকা কামাতে পারবে। রানি হয়ে যাবে তুমি।”

অপরাজিতা ভাবতে বসল। সে তো পাঁকে নেমেই পড়েছে। আর এখন বাছতে বসার কোনও মানে নেই। যেখানে বেশি উপার্জন, সেখানেই তাকে যেতে হবে। রাজি হয়ে গেল মেয়েটা।

মাস দুয়েক পরে একটা ব্যাগে নিজের কয়েকটা জিনিস গুছিয়ে নিয়ে রাতের দিকে নারাংয়ের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল অপরাজিতা। যাওয়ার আগে অবশ্য মায়ের সঙ্গে দেখা করে বেশ কিছু টাকা দিয়ে এসেছিল। আর বলেছিল, “এ বার কাঠমান্ডুতে একটা ফ্ল্যাট কিনব। সেখানে তুমি থাকবে।”

নারাং তাকে সরাসরি ভারতে নিয়ে যায়নি। বর্ডার পার করে নিয়ে গিয়েছিল আর এক জন লোক। সে অপরাজিতাকে ভারতে নিয়ে এসে তুলে দিয়েছিল তৃতীয় এক ব্যক্তির হাতে। তার সঙ্গে অপরাজিতা পা রেখেছিল মুম্বইয়ে। কারও কাছে স্বপ্নের দুনিয়া, কারও কাছে অন্ধকারের।

মাস ছয়েক মুম্বইয়ে সেই কোঠাবাড়িতে কাজ করে অপরাজিতা বুঝে গেল, এখানে তার স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। তাকে যা বলা হবে, সেই মতো কাজ করতে হবে। এবং, কখনও কখনও সেই কাজ এমন অমানুষিক পর্যায়ে পৌঁছত যে, রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদত মেয়েটা। বুঝতে পারছিল, ভয়ঙ্কর এক জালে ক্রমে জড়িয়ে পড়ছে সে।

এক দিন এক ক্লায়েন্টের সঙ্গে রাত কাটানোর সময় হঠাৎ জ্ঞান হারাল সে। যে-রকম হয়, ক্লায়েন্টের সঙ্গে বসে পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিয়েছিল অপরাজিতা। তার পরে ধীরে ধীরে চৈতন্য হারায়। জ্ঞান ফিরলে তাকে বলা হয়, হঠাৎ শরীরটা একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অপরাজিতা ঠিক বুঝতে পারেনি। কিন্তু এইটুকু বুঝেছিল, পিঠের দিকে একটা ব্যান্ডেজ করা আছে। ব্যান্ডেজ করার কারণটা তাকে কেউ বলেনি। অপরাজিতা আন্দাজ করেছিল, এই ব্যাপারে তার ক্লায়েন্টের হাত আছে। মানুষ যে-কতটা পৈশাচিক হতে পারে, এত দিনে সে ভালই বুঝে গিয়েছে। আর টাকা দিলে তাদের শরীর নিয়ে যা ইচ্ছে করার অনুমতি পেয়ে যায় মানুষরূপী এই শয়তানগুলো।

ধাক্কাটা সে খেল ব্যান্ডেজ খোলার পরে। পিঠের দিকটা কী রকম অদ্ভুত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, চামড়াতে কোনও সমস্যা হচ্ছে। শরীরের ওই অংশটা বিকৃত হয়ে গিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, চামড়াটা কেউ কেটে তুলে নিয়েছে। ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠেছিল অপরাজিতা। ছুটে গিয়েছিল কোঠাবাড়ির মালকিনের কাছে। সে আদর করে অপরাজিতার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, “আরে চিন্তা করছিস কেন। একটু চামড়াই তো নিয়েছে। ওতে তোর কোনও ক্ষতি হবে না। চামড়া আবার গজিয়ে যাবে। এটাই তো চামড়ার সুবিধে। কিডনি তো নয় যে, আর ফিরে পাওয়া যাবে না!”

মালকিনের কুৎসিত হাসিটা অপরাজিতার আতঙ্ক কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল সে-দিন। কিন্তু মেয়েটা তখনও বোঝেনি, আগামী কয়েক বছর তার জন্য কী ভয়ঙ্কর বিভীষিকা অপেক্ষা করে আছে! ধীরে ধীরে অপরাজিতা বুঝতে পারল, সে একা নয়। তার সঙ্গে কোঠাবাড়িতে থাকা আরও কয়েক জন মেয়ের শরীরেও একই রকম চিহ্ন আছে। অপরাজিতার সামনে চলে এল ভয়ঙ্কর এক সত্য। কীভাবে এই মেয়েদের শরীর থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে চামড়া।

.

….ধীরে ধীরে একটু ধাতস্থ হল অপরাজিতা। তত ক্ষণে সমীর তার একেবারে কাছে চলে এসেছে। প্রায় কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমাদের এখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে যেতে হবে। সময় নষ্ট করা যাবে না।” অপরাজিতা তখনও বুঝতে পারছে না, কী করবে। কী বলবে। সমীর ও বেশি কথা বলতে পারছিল না রঞ্জিতের সামনে। ছেলেটা যদি দুম করে সন্দেহ করা শুরু করে, তা হলে সমস্যা হয়ে যাবে। অপরাজিতার চোখে চোখ রেখে সমীর সেই রকম নিচু গলায় প্রশ্নটা করল, “তুমি কি আমায় বিশ্বাস করো?”

অপরাজিতা মাথা নাড়ল। সে বিশ্বাস করতেই চাইছিল। সমীর এ বার অপরাজিতার হাতটা ধরল, “চলো, এখনই বেরিয়ে যেতে হবে এখান থেকে। এখানে থাকলে কিন্তু তোমার বিপদ হবে। রেহাই পাবে না ওদের হাত থেকে।”

অপরাজিতা আর কোনও কথা বলল না। খাট থেকে নেমে দাঁড়াল সমীরের পাশে। রঞ্জিতের যে-একটু খটকা লাগছিল না, তা নয়। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। সে দু’জনের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করল, দ্রুত সেন্টার ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই হাঁফাতে হাঁফাতে দু’জনে চলে এল মোড়ের মাথায় দাঁড়ানো গাড়িটার সামনে। গাড়ির চালক দরজা খুলে দিতেই দু’জনে উঠে পড়ল পিছনের সিটে। অপরাজিতা আর সমীরকে নিয়ে সাদা সুইফট ডিজায়ারটা দ্রুত মিলিয়ে গেল আন্ধেরির অন্ধকারে।

.

রেসকিউ সেন্টার থেকে অপরাজিতার নিরুদ্দেশ হওয়ার খবরটা সকাল আটটার মধ্যেই চলে গেল পুলিশের কাছে। সাধারণত এত দ্রুত এই সব খবর যায় না। দিন কয়েক অপেক্ষা করার পরে মিসিং পার্সন রিপোর্ট করা হয়। কিন্তু অপরাজিতার কেসটা স্পেশাল ছিল, তা রেসকিউ সেন্টারের মেট্রনও জানত। এর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পুলিশ মারফত সেই খবর পৌঁছে গেল বিশেষ কয়েকটি লোকের কাছে।

.

তার আগেই অবশ্য ঝড় উঠে গিয়েছিল। সব থেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল দু’টো লোক। আনোয়ার এবং রতন। দু’জনের কাছেই খবর চলে গিয়েছে, কে ভাগিয়ে নিয়ে গিয়েছে মেয়েটাকে। সবার আগে জেনে যায় রতন। সমীরের সঙ্গে কথা ছিল, রাত একটা নাগাদ আন্ধেরির একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দেখা করবে। কিন্তু সওয়া একটা নাগাদও যখন সমীরের পাত্তা পাওয়া গেল না, তখন ফোনে কয়েক বার চেষ্টা করেছিল রতন। কিন্তু সমীরের মোবাইল সুইচড্ অফ ছিল। তখনই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে রতন। সে আর তার সঙ্গী গাড়ি নিয়ে যখন ওই রেসকিউ হোমের কাছে যায়, তখন প্রায় দু’টো বাজতে চলেছে।

রতন আর দেরি না-করে রঞ্জিতকে ফোন লাগায়। তখনই সব চেয়ে বড় ধাক্কাটা খায় রতন। রঞ্জিত জানিয়ে দেয়, মেয়েটিকে নিয়ে সমীর রাত বারোটা নাগাদ চলে গিয়েছে।

রতন বুঝে যায়, ব্যাপারটা কী ঘটেছে। তা হলে তার মনে যে-সন্দেহটা অল্প হলেও ছিল, সেটাই ঠিক। মেয়েটির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে সমীর। কিন্তু এখন সে কী করবে? সমীর তার ঘনিষ্ঠ। কোপটা তাই তার উপরে পড়ার আশঙ্কা আছে। এক বার রতন ভাবল, সে-ও গা ঢাকা দেয়। তার পরে বুঝঝল, সেটা মারাত্মক বোকামি হবে। ওরা ধরে নেবে, সে নিজেও জড়িয়ে আছে মেয়েটাকে ভাগানোর ঘটনায়। তাই আর দেরি না-করে, ইষ্টনাম জপতে জপতে আনোয়ারকে ফোনটা করল রতন।

আনোয়ার-রতন-সমীর থেকে ডক্টর ডেভিলে পৌঁছতে গেলে নানা স্তর আছে। এই স্তরের এমনই এক জনের কাছে অপরাজিতার নিরুদ্দেশ হওয়ার খবরটা সকাল সকালই পৌঁছে গেল। পুরো ব্যাপারটা জানতে তার খুব বেশি সময় লাগল না। দু’টো কাজ করল সে। সমীর আর মেয়েটাকে দ্রুত খুঁজে বার করার নির্দেশ দিল। আর এমন এক জনকে ব্যাপারটা জানাল, যার মারফত ডক্টর ডেভিলের কাছে খবরটা পৌঁছে যাবে।

সন্ধ্যার দিকে নির্দেশ পেয়ে গেল লোকটা। দুবাইয়ে তখন বিকেল হয়ে গিয়েছে।

“মেয়েটাকে ফিরে পেলে ভাল, না-হলে খতম করে দাও। যে-যে মেয়েটাকে সাহায্য করেছে, তাদের কারও বেঁচে থাকা চলবে না। কোনও ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।”

নির্দেশ পাওয়ার কিছু সময় বাদে আনোয়ারকে ডেকে নিল লম্বা লোকটা। সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “মেয়েটা তো ভেগে পড়েছে। ওকে ফিরিয়ে আনতে পারলে ভাল। না-হলে মেরে দাও। ওর সঙ্গীদের কেউ যেন বেঁচে না থাকে।”

আনোয়ার চুপচাপ মাথা নাড়ল। সে জানে, মেয়েটাকে না আনতে পারলে তার মাথা বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে।

“কোথা থেকে শুরু করবে?” লম্বা লোকটার প্রশ্নের জবাব এল, “ওই হোমে আমাদের যে-ছেলেটা আছে, তার কাছ থেকে প্রথমে খবর নিই। দেখি ও কিছু বলতে পারে কি না। সমীরের বন্ধুবান্ধবদের খোঁজ খবরও করছি। তার পরে…।”

লম্বা লোকটাও উঠে দাঁড়াল, “ঠিক আছে। হাপিশ করে দাও সবাইকে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *