প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৪. অচিন পাখি

৪. অচিন পাখি

মুম্বই, ২০২৩

“কী রে রাধা মুখ ব্যাজার করে আসছিস কোথা থেকে?”

সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। কাজ শেষ করে হনহন করে নিজের বস্তিতে ফিরে আসছিল রাধা। ডাক শুনে ঘুরে তাকাল।

রাস্তার মোড়ের পান-সিগারেটের দোকানের সামনে কয়েকটা ছেলে আড্ডা জমিয়েছে। তার চেনা ছেলে। প্রায় সমবয়সি। ডাক শুনে কী ভেবে ছেলেগুলোর কাছে চলে এল রাধা।

“কী রে মুখটা ও-রকম কেন?”

মুখের গম্ভীর ভাবটা ধরে রেখে রাধা বলল, “মেজাজটা খারাপ হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, একটা ভুল কাজ করছি।”

“কেন, কী হল?” একটা ছেলে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল।

রাধা প্রথমে ভাবল, বলবে কি না। এতগুলো টাকার ব্যাপার। কিন্তু তার মনে একটা পাথর বসে আছে। কাউকে কথাগুলো বলতে না পারলে হাল্কা বোধ করবে না। রাধা বলেই ফেলল— “সকালে যে-ফ্ল্যাটটায় রান্না করতে যাই, সেখানে গণ্ডগোল আছে বলে মনে হচ্ছে।”

“কেন?”

“রান্না করার সময় আমাকে রান্নাঘরে আটকে দেয়। কাজ হওয়ার পরে বাইরে আসতে দেয়।”

ছেলেগুলো হাঁ হয়ে গেল। “বলিস কী রে? রান্নাঘরে আটকে কাজ করায়? তা তুই ঝামেলা করিসনি কেন?”

রাধা এ বার আমতা আমতা করে বলল, “আসলে টাকাটা খুব ভাল দেয়। সে জন্য কিছু বলিনি। একটা বয়স্ক মহিলা থাকে। অন্য কোনও সমস্যা নেই।”

“তা হলে এখন মুখ গোমড়া করে আছিস কেন?”

“ক’দিন ধরে মনে হচ্ছে ওই ফ্ল্যাটে আরও কেউ আছে। দু’টো ঘরের দরজা সব সময় বন্ধ থাকে। মনে হয় দু’টো বেডরুম। কিন্তু ওখান থেকে ইদানীং একটা গোঙানির আওয়াজ পাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে। খুবই অস্পষ্ট। কিন্তু মনে হচ্ছে, কেউ একটা আছে ওই দরজার ও পাশে।”

“কেলো কেস তো!” লম্বা-রোগা মতো ছেলেটা বলে উঠল। ওর নাম বীরু। “কী মনে হয়, কাউকে আটকে রেখেছে ঘরে?”

“বুঝতে পারছি না। বাড়িতে তো ওই একটা বুড়ি থাকে। যদিও বেশ গাঁট্টাগোট্টা, কিন্তু কাকে আটকে রাখবে?”

ছেলেগুলো চুপ করে গেল। তার পরে বীরু বলে উঠল, “একটু ঝামেলার কেস আছে মনে হচ্ছে। ওই ফ্ল্যাটে আর কে আসে?”

“আমি তো আর কাউকে দেখিনি। প্রথম দিন ওই মহিলার ছেলে এসেছিল। ওর সঙ্গেই মাইনেকড়ি নিয়ে কথা হয়। ওই লোকটাই বলেছিল, রান্নাঘরে আটকে রাখা হবে। ওর মা নাকি অজানা কারও সঙ্গে ফ্ল্যাটে থাকতে ভয় পায়।”

ছেলেগুলো একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল। আর একটা ছেলে বলল, “কী করবি তুই? পুলিশকে কিছু বলবি নাকি?”

প্রায় আঁতকে উঠল রাধা, “পাগল নাকি। পুলিশ আমাকে দুরদুর করে তাড়িয়ে দেবে। আর না-হলে ঝামেলায় ফেলে দেবে। পুলিশকে বলার কোনও প্রশ্নই নেই।”

রাধার কথাটা মেনে নিল ছেলেগুলোও। ঠিকই বলেছে। কে আর বেকার ঝামেলায় পড়তে চায়।

রাধা চলে গেল বাড়ির দিকে। ছেলেগুলোও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল।

.

একটা ছেলের মাথা থেকে কিন্তু রাধার কথাগুলো কিছুতেই যাচ্ছিল না। রাধার মতো তারও মনে হচ্ছে, ওই ফ্ল্যাটে কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। কিন্তু পুলিশের ঝামেলায় জড়ানোর তারও ইচ্ছে নেই। তবে…

বীরুর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। পুলিশকে সে জানাতে যাবে না, কিন্তু এমন এক জন আছে যাকে জানালে পুলিশ খবর পেয়ে যাবে। যাকে বলা হয় পুলিশের খোচর। কে বলতে পারে, এই রকম একটা খবর থেকে বড় কেসের মীমাংসা হয়ে গেল। আর তার ভাগ্যে কিছু টাকাও জুটে গেল! সেটা না- হলেও ওই খোচরের নেকনজরে থাকা ভাল। কোনও পুলিশ কেসে পরে পড়লে লোকটা তাকে সাহায্য করতে পারবে। পুলিশের সঙ্গে ওর ভাল খাতির। যে- কারণে ওকে কেউ বড় একটা ঘাঁটায় না।

.

পরের দিন একটু দূরের এক বস্তিতে গিয়ে হাজির হল বীরু। লোকটা তখন দরজায় তালা লাগাচ্ছিল। বীরুকে দেখে ভ্রুটা নাঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী রে, এখানে কী চাই?”

“তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে। খুবই জরুরি। একটু আড়ালে চলো, বলছি।”

লোকটা এক বার চার দিকে তাকিয়ে বলল, “সামনের চায়ের দোকানটায় গিয়ে বস, আমি আসছি।”

মিনিট দশেক পরেই বীরুর উল্টোদিকের চেয়ারে এসে বসল লোকটা। “বল, কী বলবি?”

“গুরু, একটা ভাল খবর আছে। বড় কেস হলে আমাকে একটু ভাল পাত্তি দিয়ো কিন্তু।”

লোকটা বিরক্ত মুখে বলল, “বড় কী ছোট, সেটা আমি বুঝব। কী জানিস, বল।”

রাধার মুখে শোনা ঘটনাটা খুলে বলল বীরু।

লোকটা একটু ভাবল। তার পরে বলল, “ঠিক আছে, তুই যা। প্রয়োজন হলে তোর সঙ্গে যোগাযোগ করে নেব।”

বীরু চলে যাওয়ার পরে লোকটা একটু ভাবল। সে যেমন পুলিশের ইনফর্মার, সে-রকম আরও এক জনকেও খবর দেয়। ফোনটা কাকে করবে সে?

.

মিনিট দশেক পরে বেজে উঠল পাঞ্চালীর মোবাইল।

পুরো ব্যাপারটা শোনার পরে পাঞ্চালী নির্দেশ দিল— “আমার আরও কিছু খবর চাই। বাড়িতে ওই বৃদ্ধা ছাড়া আর কোনও লোককে দেখা যায় কি না, জানতে হবে। বৃদ্ধার ছেলে বাড়িতে কখন আসে? এ ছাড়া আর কেউ সত্যিই ওই বাড়িতে আছে কি না। দেখো, কতটা কী খবর জোগাড় করতে পারো।”

আরও ২৪ ঘণ্টা পরে লোকটার থেকে দ্বিতীয় ফোনটা পেলেন পাঞ্চালী। আর তার পরেই শ্রুতি শিণ্ডেকে ফোন করলেন, “দেখা করা খুব দরকার আপনার সঙ্গে। একটা ক্লু পেলেও পেতে পারি।”

.

পুরো ঘটনাটা পাঞ্চালীর মুখে শুনে শ্রুতি বলে উঠলেন, “এ তো খুবই সন্দেহজনক ব্যাপার। আমার মেয়েটা না হতে পারে, কিন্তু অন্য কেউ আটকে থাকতেই পারে ওই ঘরে। আপনার রেইড করা উচিত ওখানে।”

পাঞ্চালী হাসলেন, “ব্যাপারটা অত সোজা না ম্যাম। আমাদের হাতে কোনও প্রমাণ নেই। বাড়িত রান্না করে এমন একটি মেয়ের মনে হয়েছে ঘরে কাউকে আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু ওই বাড়ির উপরে নজর রাখার পরেও আমার ইনফর্মার সন্দেহজনক কিছু দেখেনি। এত তাড়াতাড়ি অবশ্য প্রমাণ পাওয়াও যায় না। সময় লাগে।” একটু থেমে পাঞ্চালী কথা শেষ করলেন, “শুধু জেনেছে, রাত সাতটা-আটটা নাগাদ ওই লোকটা মাঝেমধ্যে আসে ফ্ল্যাটে।”

অধৈর্য হয়ে উঠলেন শ্রুতি, “প্রমাণ পেতে পেতে যদি বাচ্চাটার কিছু হয়ে যায়? একেবারে হাতেনাতে গিয়ে দেখলেই তো হয়। ভুল হলে ক্ষমা চেয়ে চলে আসব।”

পাঞ্চালী আবার থামালেন শ্রুতিকে। “এই ভাবে রেইড করা যায় না। বাড়ির ওই মহিলা দরজা না খুললে কিছুই করা যাবে না। মহিলা থাকা মানে আরও ঝামেলার ব্যাপার। লেডি পুলিশ লাগবে। তা ছাড়া এ রকম ঠুনকো অভিযোগের ভিত্তিতে সার্চ ওয়ারেন্ট পাওয়া যাবে না। পুলিশ যাবে না রেইডে।”

দু’জনেই একটু সময় চুপ করে রইলেন। তার পরে শ্রুতি বললেন, “আর পুলিশ যদি যায়, তা হলে আপনি যাবেন সঙ্গে?”

একটু অবাক হয়ে গেলেও পাঞ্চালী বললেন, “অবশ্যই।”

শ্রুতি কী ভেবে নিয়ে বললেন, “ঠিক আছে। আমাকে ঘণ্টাখানেক সময় দিন। আপনার সঙ্গে আমি যোগাযোগ করে নেব।”

এক ঘণ্টাও লাগল না।তার আগেই ফোনটা বেজে উঠল। পাঞ্চালী দ্রুত কলটা ধরে নিলেন—

“হ্যাঁ, বলুন।”

“আপনি যে-ঠিকানাটা দিয়েছিলেন, সেটা গোরেগাও ওয়েস্ট পুলিশ স্টেশনের আওতায় পড়ছে। আপনি কি ওখানে সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা নাগাদ পৌঁছতে পারবেন? আমিও চলে যাব।”

.

পাঞ্চালীর কোনও সমস্যা ছিল না। নির্দিষ্ট সময়ে থানায় পৌঁছে তিনি দেখলেন শ্রুতি শিণ্ডে বসে আছেন স্টেশন হাউস অফিসারের উল্টো দিকে। তাঁকে দেখেই সাদরে পাশের চেয়ারে বসতে বললেন শ্রুতি। তার পরে উল্টো দিকের অফিসারকে দেখিয়ে বললেন, “মিস্টার চৌহান নিজে যাবেন আমাদের সঙ্গে রেইডে।”

ও পাশ থেকে চৌহান বলে উঠলেন, “সঙ্গে এক জন লেডি অফিসারও থাকবেন। ওই বাড়িতে বয়স্ক মহিলা আছেন তো।”

“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই,” বলে উঠলেন শ্রুতি।

তাঁদের দু’জনকে একটু অপেক্ষা করতে বলে উঠে গেলেন চৌহান।

পাশে বসা শ্রুতির দিকে সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে তাকিয়ে পাঞ্চালী বলে উঠলেন, “আপনি তো খুব ক্ষমতাশালী। আমার নিজেরও পুলিশ মহলে চেনা আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এত তাড়াতাড়ি কিছুই করতে পারতাম না।”

শ্রুতি হেসে উঠে বললেন, “উপরমহলে একটু চেনাশোনা আছে বটে। তবে সে সব আমি কাজে লাগাই না। এ ক্ষেত্রে একটা বাচ্চার জীবন বিপন্ন মনে হচ্ছে বলেই এত সব করলাম।”

মিনিট পনেরো বাদে এসে দাঁড়ালেন অফিসার। “ম্যাডাম, আমরা তৈরি। চলুন, বেরিয়ে পড়া যাক।”

দু’জন কনস্টেবল, এক জন লেডি অফিসার, মিস্টার চৌহান, পাঞ্চালী এবং শ্রুতিকে নিয়ে জিপটা ছুটে চলল নির্দিষ্ট ঠিকানায়।

বাড়িটা একটা গলির মধ্যে। গলিটার মুখে এসে গাড়িটা মন্থর হতেই পাঞ্চালী বলে উঠলেন, “জিপটা নিয়ে বাড়ির সামনে না গিয়ে যদি পায়ে হেঁটে যাই? মানে, যদি সত্যিই ব্যাপারটা ও-রকম মারাত্মক কিছু হয়, তা হলে পুলিশের জিপ দেখে সন্দেহ করতে পারে।”

ড্রাইভারকে ইশারায় গাড়িটা থামাতে বলে পাঞ্চালীর দিকে ফিরে চৌহান জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা তো সরাসরি ওই ফ্ল্যাটে রেইড করব। জিপটা বাইরে থাকলে অসুবিধে কোথায়?”

“আমি একটা কথা ভাবছিলাম,” বুঝিয়ে বললেন পাঞ্চালী, “লোকটা যদি ওই সময় আসে, তা হলে পুলিশের জিপ দেখলে উপরে উঠবে না। পালিয়ে যাবে। জিপ না দেখলে উপরে উঠে আসবে। যদি সত্যিই কাউকে ওই ফ্ল্যাটে পাওয়া যায়, তা হলে আমরা লোকটাকেও হাতেনাতে ধরতে পারব।”

চৌহানের মনে ধরল প্রস্তাবটা। জিপ থেকে সবার আগে নেমে পড়লেন তিনি। তার পরে বললেন, “এক জন কনস্টেবল নীচে আড়ালে থাকুক। আমরা বাকিরা উপরে যাই। জিপটা গলিতে ঢুকবে না।”

এক জনকে নীচে দাঁড় করিয়ে বাকিরা উঠে এলেন তিন তলায়। ঘড়িতে তখন আটটা বাজতে চলেছে। লিফট থেকে বেরিয়ে ডান দিকে ঘুরলেই ফ্ল্যাটটা।

ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে পাঞ্চালী চাপা গলায় বললেন, “ওই ভদ্রমহিলা যদি ছেলে ভেবে দরজা খুলে দেয়, তা হলে ঠিক আছে। কিছু সন্দেহ করলে আবার ছেলেকে ফোন করতে পারে। দরজাও খুলবে না।”

একটু অধৈর্য হয়ে পড়লেন শ্রুতি। গলা নামিয়েই তিনি বললেন, “কত ক্ষণ দরজা আটকে রাখবে? আমরা জোর করে ঢুকব। বাচ্চাটাকে বাঁচানো আগে দরকার। লোকটাকে পরেও ধরা যাবে।”

পাঞ্চালী চুপ করে রইলেন। তিনি জানেন, বিনা ওয়ারেন্টে এই রকম ভাবে জোর করে ফ্ল্যাটে ঢোকা পুলিশের পক্ষে কতটা ঝামেলার। চৌহানও কথা বললেন না। কিন্তু তাঁর মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠেছে। পাঞ্চালী কিছু বলবেন না বলেই ঠিক করলেন। শ্রুতির উপরমহলের যোগাযোগটা খুবই ভাল বোঝা যাচ্ছে। না-হলে এই পুলিশ অফিসার কখনও এই ধরনের রেইডে আসতেন না।

শ্রুতিই সবার আগে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। তার পরে একটু দম নিয়ে দু’বার নক করলেন ফ্ল্যাটের দরজায়।

ভিতর থেকে কোনও সাড়াশব্দ নেই। শ্রুতি ঘুরে তাকালেন বাকিদের দিকে। তার পরে আবার হাত তুললেন দরজায় টোকা মারার জন্য।

কেউই খেয়াল করেননি লিফটটা কখন নীচে নেমে গিয়েছে। এ বার সবারই কানে এল লিফটের দরজা খোলার আওয়াজ। পুরনো আমলের লিফট কোলাপসিবল গেট লাগানো। সেই গেটটা ঝরাং করে খোলার আওয়াজ এল। তার পরে আবার বন্ধ হয়ে গেল।

একটা মূর্তি এসে দাঁড়াল ঘরটার সামনে। দরজার সামনে অত জনকে দেখে সে প্রথমে চমকে উঠল। তার পরে একটু কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করতে গেল— “কী হচ্ছে এখানে…।”

কিন্তু কথাটা পুরো শেষ করতে পারল না। মূর্তিটার নজর গিয়ে পড়ল শ্রুতি শিণ্ডে আর পাঞ্চালী রায়ের উপরে। কথা বন্ধ হয়ে গেল লোকটার।

এক রাশ বিস্ময় আর আতঙ্ক মাখা দৃষ্টি নিয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলেন পাঞ্চালী আর শ্রুতিও।

হাতের ব্যাগটা পাঞ্চালীদের দিকে ছুড়ে দিয়ে দ্রুতবেগে সিঁড়ির দিকে দৌড় লাগাল লোকটা। ঠিক যেন ফাঁদে পড়া একটা পশু মুক্তিলাভের শেষ চেষ্টা করছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *