৭. এক পলকে একটু দেখা
কলকাতা, ২০২৩
পুরো দু’টো দিন পাগলের মতো অবস্থা হল কৃষ্ণেন্দুর। সে না পারছে খেতে, না পারছে ঘুমোতে।
ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকটা সময় নিজের ঘরে বসে ছিল কৃষ্ণেন্দু। বুঝতে পারছিল না কী করবে। সে দিন ওই গাড়িতে কে ছিল, কার সঙ্গে অজন্তা উঠে গিয়েছিল, সে জানে না। সঞ্জয়ের কাছ থেকে পুরো ঘটনাটা শোনার পরে সে তার স্মৃতি থেকে গাড়ির নম্বরটা একটা ডায়েরিতে লিখে রেখেছে। কিন্তু বুঝতে পারছিল না, রাজাই এই কাজের সঙ্গে জড়িত কি না। বা সত্যিই ওই গাড়িটা করে অজন্তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে কি না। আধ ঘণ্টা পরে ফাইল আর ডায়েরিটা নিজের স্টাডি ক্যাবিনেটে খুব সাবধানে রেখে দিল কৃষ্ণেন্দু।
কিন্তু এখনই কারও কাছে মুখ খুলতে সাহস পেল না। যদি দেখা যায়, অজন্তা ফিরে এসেছে, তা হলে তো সে হাস্যাস্পদ হয়ে উঠবে। সবাই তার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলবে, এই ছেলেটা তো অজন্তার পিছু নেয়। একেবারে স্টকার একটা। পুলিশও রাগারাগি করতে পারে। কৃষ্ণেন্দু অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। কাউকেই এখন কিছু বলবে না। বন্ধুদেরও নয়।
দু’টো দিন যে-কী মারাত্মক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে কাটাল কৃষ্ণেন্দু, তা সে বলে বোঝাতে পারবে না। তৃতীয় দিন ফোনটা করল সঞ্জয়কে।
“তোকে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে। আমার বাড়িতে আসতে পারবি? একটা জিনিসও দেখানোর আছে।”
পুজো আর দু’দিন পরে। তাদের স্কুলে ছুটি পড়ে গিয়েছে। সঞ্জয়ের বাড়িও তাদের বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। সন্তোষপুরের কাছাকাছি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সঞ্জয় চলে এল কৃষ্ণেন্দুর বাড়ি।
নিজের ঘরে নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে ফাইল আর ডায়েরিটা বার করে আনল কৃষ্ণেন্দু। তার পরে ছবিটা বার করল। ছবিটা এক ঝলক দেখেই সঞ্জায় বলে উঠল, “আরে এ তো অজন্তা। আর এই ছেলেটা সেই রাজা না? তুই এঁকেছিস? খুব ভাল হয়েছে। কিন্তু এটা দেখানোর জন্যই কি তুই ডেকে আনলি?”
কৃষ্ণেন্দু নেতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, “আরও একটা ব্যাপার আছে।” তার পরে ডায়েরির পাতাটা খুলে গাড়ির নম্বরটা দেখাল সঞ্জয়কে।
“এটা কীসের নম্বর? কোনও গাড়ির? এটা দেখাচ্ছিস কেন?” সঞ্জয় এ বার একটু বিরক্তই হল। পাড়ার বন্ধুদের ছেড়ে তাকে এখানে আসতে হয়েছে। ক্লাবের পুজোর প্রোগ্রামের ব্যাপারে অনেক আলোচনা ছিল।
কৃষ্ণেন্দু এ বার খুব ধীরে ধীরে বলল, “এই নম্বরের গাড়িতেই সে দিন অজন্তা উঠেছিল। তার পর থেকে ওর কোনও খোঁজ নেই।”
সঞ্জয় হাঁ করে তাকিয়ে রইল তার বন্ধুর দিকে। তার পরে জিজ্ঞেস করল, “তুই জানলি কী করে?”
মিনিট দশেক সময় নিয়ে পুরো ঘটনাটা খুলে বলল কৃষ্ণেন্দু।
উত্তেজনায় সঞ্জয় উঠে দাঁড়াল। “তুই এত দিন ঘুমোচ্ছিলি নাকি? পাঁচ দিন হয়ে গেল অজন্তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তুই আগে বলিসনি কেন?”
কৃষ্ণেন্দু চুপ করে রইল। তার পরে বলল, “সেটা আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। সে সব কথা থাক। এখন বল, কী করব?”
সঞ্জয় এ বার থমকে গেল। সে-ও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, কী করা উচিত। তার সে-রকম যোগাযোগ নেই। তার পরে একটা নাম মনে এল।
“রাজীবকে ফোন করি। ওর অনেক জায়গায় চেনাশোনা আছে। দেখি ও কী বলে।”
পুরোটা শোনার পরে রাজীব একটা কথাই বলল, “আমাদের দেখা করতে হবে। আধ ঘণ্টার মধ্যে সাউথ সিটি মলে চলে আয়। আমিও আসছি।”
মিনিট পয়তাল্লিশেক বাদে তিন বন্ধু মিলে ফুডকোর্টে তিনটি সফট ড্রিঙ্কসের ক্যান হাতে গভীর আলোচনায় ডুবে গেল। কথা বলছিল রাজীবই।
“দ্যাখ, আমি অনেক ভেবেছি। ব্যাপারটা খুবই ঘোরালো হয়ে গিয়েছে। পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে অজন্তাকে। কলকাতার চ্যানেলগুলো আর সোশ্যাল মিডিয়ায় তো ওকে নিয়েই চর্চা চলছে। আমাদের স্কুল নিয়েও কথা হচ্ছে। এমন সময় এই সব জানাজানি হলে মারাত্মক ব্যাপার হতে পারে।”
“কিন্তু আমরা তো সব জেনে চুপ করে বসে থাকতে পারি না। ওই গাড়িটার নম্বর থেকে যদি কোনও হদিশ পায় পুলিশ,” বলে উঠল সঞ্জয়।
“চুপ করে থাকার প্রশ্নই নেই। আমাদের কিছু করতেই হবে,” ক্যানটা টেবিলে ঠক করে নামিয়ে রেখে বলল রাজীব। সবাই আবার কয়েক মুহূর্ত চুপ। তার পরে মুখ খুলল রাজীবই, “আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে। আমরা সরাসরি পুলিশের কাছে গেলে অনেক ঝামেলা হতে পারে। বাবা-মাকে জানালে কেস আরও গড়বড় হয়ে যাবে। কিন্তু এক জন আছে, যে-আমাদের সাহায্য করতে পারে।”
“কে?” জানতে চাইল বাকি দুই বন্ধু।
“সুপর্ণা আন্টি। তোরা তো সুপর্ণা আন্টিকে দেখেছিস। ওই যে-বার ওই বৃদ্ধাশ্রমে গিয়েছিলাম, তখন দেখলি তো। সুপর্ণা আন্টির সঙ্গে কিন্তু অনেকের যোগাযোগ আছে। বেশ কিছু পুলিশ অফিসারকেও চেনে বলে শুনেছি।”
দুই বন্ধু চুপ করে শুনছিল রাজীবের কথা। “আমি সুপর্ণা আন্টির সঙ্গে আগে কথা বলে দেখি। পুরো ব্যাপারটা জানাই। তার পরে গিয়ে দেখা করব।”
.
সে দিন বিকেলেই আবার সাউথ সিটি মলে জড়ো হল তিন বন্ধু। তবে এ বার তাদের সঙ্গে আরও এক জন ছিল। সুপর্ণা দত্ত। যিনি সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত।
সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘোরাফেরা করতে হয় তাঁকে, বিভিন্ন মানুষের সঙ্গেও মেলামেশা আছে। রাজীবের মুখে পুরো ঘটনাটা শোনার পরে সুপর্ণা বুঝে গিয়েছিলেন, এই মামলাটা অত্যন্ত জটিল। মিডিয়ার দৌলতে অজন্তার কেসটার কথা তাঁর কানেও এসেছে।
একটুও সময় নষ্ট না-করে তিন বন্ধুকে তিনি ডেকে নিয়েছেন সাউথ সিটি মলে। পুরো ব্যাপারটা আবার শোনার জন্য। সুপর্ণা এ বার ঘটনাটা শুনতে চাইছিলেন কৃষ্ণেন্দুর মুখ থেকে। সব কিছু শোনার পরে একটাই প্রশ্ন করলেন তিনি, “গাড়ির নম্বরটা তোমার ঠিক মনে আছে তো?”
“হ্যাঁ, আন্টি। আমার কোনও ভুল হচ্ছে না।” কৃষ্ণেন্দু জানে, সে সব কিছু ভুলে গেলেও ওই নম্বরটা ভুলবে না। আর ভুলবে না অজন্তার মুখটা। কোনও দিনও না।
সুপর্ণা কর্তব্য স্থির করে ফেললেন। এই অঞ্চলের পুলিশের এক বড় কর্তার সঙ্গে তাঁর চেনাশোনা আছে। ফোনটা প্রথমেই উপরমহলে করা ভাল। না- হলে অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।
এর পরের ব্যাপারগুলো খুব দ্রুতগতির সঙ্গেই এগোল। সুপর্ণার ফোনটা সেই বড় কর্তার কাছে যাওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে যাদবপুর থানা নড়েচড়ে বসল। কেস ইনচার্জ মির আহমেদের ফোন চলে এল সুপর্ণার মোবাইলে।
কৃষ্ণেন্দুর ঝামেলাটা শুরু হল তার পর থেকেই। সুপর্ণা জানালেন, তিনি নিজেই কৃষ্ণেন্দুকে সঙ্গে করে থানায় আসছেন। তবে তার আগে কঠিন ব্যাপারটা ছিল কৃষ্ণেন্দুর বাবা-মাকে পুরো ঘটনাটা খুলে বলা।
যে কোনও বাবা-মায়ের মতোই কৃষ্ণেন্দুর অভিভাবকেরাও আঁতকে উঠেছিলেন পুরো ঘটনাটা শোনার পরে। ছেলে এই রকম একটা ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে, সেটা চায় না কোনও অভিভাবকই। তার পরে তাঁরা বুঝতে পারলেন, ব্যাপারটা এখন হাতের বাইরে চলে গিয়েছে।
এর আধ ঘণ্টা পরে কৃষ্ণেন্দুর বাবা-মাকে নিয়ে যাদবপুর থানায় চলে এলেন সুপর্ণা। বাকি দু’টো ছেলেকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল আগেই।
.
কৃষ্ণেন্দুকে নিয়ে আলাদা একটা ঘরে গিয়ে বসলেন মির। শুনতে চাইলেন পুরো ঘটনাটা। এক বা নয়, তিন বার। তার পরে জেরার পর্বটা শুরু হল:
প্রশ্ন: গাড়ির নম্বরটা কি একেবারে ঠিকঠাক মনে আছে?
জবাব: হ্যাঁ স্যার। আমি একেবারে নিশ্চিত। গাড়িটা আমি চোখ বন্ধ করেও দেখতে পাব। সাদা রংয়ের স্করপিও। নম্বরটা জে এইচ …।
প্রশ্ন: দেখে কি মনে হয়েছে, অজন্তাকে জোর করে গাড়িতে তোলা হয়েছে না নিজের ইচ্ছেতেই উঠেছে?
জবাব: নিজের ইচ্ছেতেই উঠেছে স্যার। আমি দেখলাম, ও দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরে গাড়িটা এসে থামল। ও সামনের জানলায় গিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলল। তার পরে মাঝের দরজাটা খুলে গেল। অজন্তাও গাড়িতে উঠে গেল।
প্রশ্ন: গাড়িতে ক’জন ছিল বোঝা গিয়েছে? বা কাউকে দেখতে পেয়েছিলে? জবাব: না, স্যার। পিছনের কাঁচটা খুব ডিপ কালারের ছিল। ভিতরটায় কিছু দেখা যাচ্ছিল না।
প্রশ্ন: এর আগে কখনও অজন্তাকে ওই জায়গায় দেখেছ?
জবাব: না স্যার, আগে কখনও ওখানে দেখিনি। তাই বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।
প্রশ্ন: তুমি ওখানে কী করছিলে?
জবাব: স্যার, আমার বাড়ি ওখান থেকে খুব কাছেই। আমি কয়েকটা জিনিস কিনতে বেরিয়েছিলাম। তার পরে ওখান দিয়ে আসার পথে অজন্তাকে দেখতে পাই।
প্রশ্ন: তোমার ক্লাসের মেয়ে। গিয়ে কথা বললে না কেন?
জবাব: প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তার পরে এগিয়ে গিয়েছিলাম কথা বলার জন্য। কিন্তু ওর কাছে পৌঁছনোর আগেই অজন্তা গাড়িতে উঠে যায়।
একই প্রশ্নগুলো অফিসার আরও বেশ কয়েক বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করলেন। গাড়ির নম্বরটাও কয়েক বার জিজ্ঞেস করলেন। যদি কৃষ্ণেন্দুর কথায় কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়ে। বার বার একই জবাব দিয়ে গেল কৃষ্ণেন্দু। অফিসার বুঝে নিলেন, ছেলেটা সত্যি কথাই বলছে। নম্বরটাও মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। তার পরে প্রশ্নটা করলেন।
“তুমি রাজা বলে কোনও ছেলের কথা শুনেছ? অজন্তার বন্ধু। সম্ভবত মুম্বইয়ে থাকে।”
একটু সময় চুপ করে থাকল কৃষ্ণেন্দু। তার পরে ধীরে ধীরে জবাব দিল, “আমি চিনি না স্যার। তবে শুনেছি। ছেলেটি নাকি অজন্তার বিশেষ বন্ধু। ইনস্টাগ্রাম মারফত আলাপ।”
“ছেলেটার ছবি তুমি দেখেছ?”
“হ্যাঁ দেখেছিলাম। ইনস্টাগ্রামে।”
অফিসার একটু ভাবলেন, “ছেলেটাকে দেখতে কী রকম? তুমি বলতে পারবে? তোমার বন্ধুরা পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারেনি।”
কৃষ্ণেন্দু অবাক হয়ে বলল, “কেন ইনস্টাগ্রাম দেখলেই তো ওর অ্যাকাউন্টটা পেয়ে যাবেন। ওখানে রাজার ছবি আছে।”
অফিসার একটু থমকালেন। তার পরে বললেন, “ওই ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা হয়েছে। ওখানে কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।” অজন্তার কোনও বন্ধু রাজার ছবির স্ক্রিনশট নেয়নি বা ‘সেভ’ করেও রাখেনি। ফলে ছবির সন্ধান পাওয়া কঠিন হয়ে গিয়েছে।
কৃষ্ণেন্দু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তা হলে কি এই রাজা বলে ছেলেটাকে পুলিশ সন্দেহ করছে?
“কী হল, তুমি বলতে পারবে ছেলেটাকে কেমন দেখতে?”
অফিসারের প্রশ্নে হুঁশ ফিরল কৃষ্ণেন্দুর। তার পরে সাহস করে বলল, “আমার বাড়িতে একটা ড্রয়িংবুক আছে। আমি ওখানে রাজার ছবি এঁকেছিলাম ওর ইনস্টাগ্রামে ছবি দেখে। বললে ওই খাতাটা নিয়ে আসতে পারি।”
অফিসার প্রথমে অবাক হয়ে গেলেন। তার পরে লাফিয়ে উঠলেন। “চলো, চলো। এখনই তোমার বাড়ি যেতে হবে।”
মিনিট পঁয়তাল্লিশেক পরে অফিসারের হাতে চলে এল কৃষ্ণেন্দুর ড্রয়িং খাতাটা। ছবি দু’টো সত্যিই সুন্দর হয়েছে। অজন্তার ফোটো আগেই দেখেছিলেন অফিসার। তাই বুঝে নিতে অসুবিধে হল না, মেয়েটার মুখ দারুণ ভাবে ফুটে উঠেছে কৃষ্ণেন্দুর আঁকা ছবিতে। অজন্তা বলে চিনতে কোনও সমস্যাই হচ্ছে না। সেই হিসেবে এটাও ধরে নেওয়া যেতে পারে রাজা নামের ছেলেটার মুখও একই ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে কৃষ্ণেন্দু। মির ঠিক করলেন, অজন্তার কয়েক জন বন্ধুকে ছবিটা দেখিয়ে এক বার ক্রসচেক করে নেবেন, রাজার সঙ্গে মিল আছে কি না।
একটা আশার আলো তিনি দেখতে পাচ্ছেন। এত দিনে দু’-দু’টো কংক্রিট ব্লু হাতে পেয়ে গিয়েছেন। তবে একটাই আফসোস। ছেলেটা কেন আগে এল না।
কে জানে, এখন কী অবস্থায় আছে মেয়েটা।
