১০. রক্তে রাঙা পৃথিবী
গোরখপুর, উত্তরপ্রদেশ, ২০২৩
অজন্তার কেসটা তখনও অ্যান্টি হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইউনিটের কাছে যায়নি। কিন্তু সমীর-অপরাজিতাকে নিয়ে ট্রেন ঢুকে পড়েছে উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর স্টেশনে। রাত তখন দেড়টা।
গোরখপুর স্টেশন এমনিতে খুবই জমজমাট। উত্তরপ্রদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা জাংশন। এই স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। দু’টো ট্রেন পর পর দাঁড়িয়ে পড়তে পারে ওই বিশেষ প্ল্যাটফর্মে।
গোরখপুর এক্সপ্রেস যে-প্ল্যাটফর্মটায় এসে থামল তার নম্বর ৯। এই ৯ নম্বর প্ল্যাটফর্মটা যাত্রীদের বেশ পছন্দের। এখান থেকে সহজেই যাত্রীরা নর্থ গেট দিয়ে শহরে প্রবেশ করতে পারেন। নর্থ গেটের আর একটা বিশেষত্ব আছে। এখানে পার্কিং টিকিট নিয়ে ভিতরে আসার পরে গাড়ি নিয়ে সোজা পৌঁছে যাওয়া যাবে প্ল্যাটফর্মের খুব কাছে।
সাধারণত এই প্ল্যাটফর্মেই এসে দাঁড়ায় পুণে-গোরখপুর এক্সপ্রেস। সে দিনও তাই হল। বেশ কিছু যাত্রী নেমে দ্রুত বেরিয়ে গেল প্ল্যাটফর্ম থেকে। কেউ নেপাল যাওয়ার উদ্দেশে বাস ধরবে। কেউ নিজের বাড়ির দিকে ছুটবে।
সমীর বা অপরাজিতার কারও কোনও তাড়াহুড়ো ছিল না ট্রেন থেকে নামার। একটু সময় নিয়েই দু’জনে পা রাখল গোরখপুর জাংশনের ৯ নম্বর প্ল্যাটফর্মে।
ভিড়টা তখন একটু পাতলা হয়ে এসেছে। হাল্কা ঠান্ডা আর ধোঁয়াশার একটা আস্তরণ প্ল্যাটফর্মটাকে যেন ঢেকে রাখছিল। কয়েক জন মানুষকে দেখা গেল চাদরমুড়ি দিয়ে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে। হাতের ব্যাগটা একটা ফাঁকা বেঞ্চের সামনে রেখে অপরাজিতার দিকে তাকিয়ে সমীর বলল, “তুমি এখানে একটু বোসো। এত রাতে বেরিয়ে লাভ হবে না। ভোরের আলো ফুটলে স্টেশন থেকে বেরোব আমরা।”
অপরাজিতা কিছু না বলে সমীরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। তার পরে বেঞ্চটায় গিয়ে বসল। একটু হাল্কা ঠান্ডা আছে। কিন্তু সে সেটা ভালই উপভোগ করছে। সমীর অবশ্য একটা চাদর জড়িয়ে আছে গায়ে।
অদ্ভুত একটা ভাললাগায় অপরাজিতার মনটা যেন আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল। সমীর এক বার চারদিকটা দেখে নিল। এখান থেকে বড় গেটটা খুব কাছেই। যেটা দিয়ে স্টেশনের বাইরে যাওয়া যায়। গেটটার কাছেও ভিড় পাতলা হয়ে এসেছে। প্রায় সবাই বেরিয়ে গিয়েছে। গেটটার কাছেই, প্ল্যাটফর্মের উপরে একটা ছোট চায়ের দোকান। যেখানে চিপসের কয়েকটা প্যাকেটও ঝুলছে।
অপরাজিতার দিকে তাকিয়ে সমীর বলল, “একটু চা খেয়ে নেবে নাকি? আমাদের তো বেশ কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে এখানে।” অপরাজিতা আবারও মাথা নেড়ে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। সে কোনও দিন এই ভাবে কারও সঙ্গে বাইরে ঘুরতে যায়নি। তার মন থেকে ভয়-আতঙ্কটা ক্রমে দূর হয়ে যাচ্ছিল। নতুন এক জীবনের স্বাদ পেয়েছে সে। মনে হচ্ছে, স্বামীর সঙ্গে যেন কোথাও বেড়াতে এসেছে।
মনে মনে একটু লজ্জাই পেয়ে গেল অপরাজিতা। সমীরের পিছন পিছন চায়ের দোকানটার সামনে এসে দাঁড়াল সে।
“দু’টো চা,” অর্ডার দিয়ে সমীর আবার দেখে নিল চারপাশটা। অপরাজিতা হয়তো পারিপার্শ্বিক অবস্থাটা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু সমীর ভোলেনি। সে জানে, তাদের তাড়া করা হবেই। কিন্তু এই ক’দিনে খারাপ কিছুর ইঙ্গিত না পাওয়ায় সমীরের মনেও একটা আশার আলো দেখা দিচ্ছে। হয়তো সে ওদের ধোঁকা দিতে পেরেছে। হয়তো ওরা জানেই না তারা এখন কোথায় এসে পৌঁছেছে। আর কয়েকটা দিন যদি সে সময় পায়, তা হলে হয়তো অপরাজিতাকে নেপালে পৌঁছে দিতে পারবে। তার পরে যা হওয়ার দেখা যাবে।
আবার বাইরে যাওয়ার গেটটার দিকে তাকাল সমীর। লোক আর নেই দেখে চেকার ভদ্রলোকও একটু দূরে সরে গিয়ে সিগারেটে আগুন ধরিয়েছে। দৃশ্যটা দেখে সমীরেরও সিগারেট খাওয়ার নেশাটা একটু চাগাড় দিল অপরাজিতার দিকে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটা কয়েক পা এগিয়ে গিয়েছে গেটটার দিকে। হাতের ব্যাগটা দোকানের সামনে রেখে এক প্যাকেট সিগারেটের অর্ডার দিল সমীর। চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিল ভাল করে। তার পরে সিগারেট ধরিয়ে তৃপ্তির একটা সুখটান দিল। আহ, কত দিন পরে নিজেকে একটু হাল্কা লাগছে।
“এই নিন আপনাদের চা,” কথাটা শুনে মুখটা তুলে সমীর দেখল দোকানি একটা থালায় দু’টো কাপ তার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। চট করে সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে নিভিয়ে দু’টো কাপ দু’হাতে তুলে নিল সমীর। তার পরে মুখটা তুলে ডাকতে গেল অপরাজিতাকে।
“কী রে, চা-টা আমার জন্য নাকি?”
সামনের দিকে তাকিয়ে সমীরের মনে হল তার স্বপ্নের জগৎটা ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে। একটা নারকীয় অন্ধকার ক্রমশ তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। পা দু’টো কাঁপতে লাগল সমীরের।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আনোয়ার একটা বিষাক্ত হাসি হাসল। সমীরের তখন ভাল করে কিছু দেখার মতো অবস্থা নেই। তাই দেখতে পেল না আনোয়ারের হাতে ধরা ভোজালিটাকে।
একটা আর্তনাদে হুঁশ ফিরে পেল সমীর। সামনে তাকিয়ে দেখল, দু’টো লোক অপরাজিতাকে টেনে নিয়ে প্ল্যাটফর্মের বাইরে চলে যাচ্ছে। তৃতীয় আর একটা ছেলে রয়েছে পিছনে। অপরাজিতার আর্তনাদটা উঠেই অবশ্য মিলিয়ে গিয়েছিল। একটা লোক মেয়েটার মুখটা চেপে ধরায়।
চার জনই এ বার গেটটা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। আর তখনই পুরোপুরি হুঁশ ফিরল সমীরের। আনোয়ারের ভোজালি ধরা হাতটা সবে উপরের দিকে উঠছে। সমীর একটা জান্তব চিৎকার করে হাতের দু’টো কাপই ছুড়ে মারল আনোয়ারের মুখে। তার পরে সোজা দৌড়ল গেটের দিকে।
এত দ্রুত যে সমীর কিছু করবে, সেটা ভাবতে পারেনি আনোয়ার। গরম চায়ের দু’টো কাপ তার মুখে আছড়ে পড়তেই যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল সে। তার পরে কোনও মতে দু’টো হাত দিয়ে মুছতে লাগল মুখটা। ভোজালিটা গড়িয়ে পড়ল আনোয়ারের পায়ের কাছে।
সমীর তত ক্ষণে গেটের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। বাইরের আলোয় সে দেখতে পেল অপরাজিতাকে একটা গাড়িতে ওঠানোর চেষ্টা করছে তিনটে লোক।
“বাঁচাও, বাঁচাও” চিৎকার করে সমীর দৌড়তে লাগল গাড়িটার দিকে। পার্কিং লটের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটা লোক এ দিকে তাকালেও নিজেদের একটু দূরে রাখাই পছন্দ করল। উত্তরপ্রদেশে এই রকম দৃশ্য মোটেই বিরল নয়। স্টেশনে কাজ করা লোকগুলো জানে, এই উটকো ঝামেলায় জড়ালে বেঘোরে প্রাণটাই চলে যেতে পারে।
আনোয়ার তত ক্ষণে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়েছে। চোখ তুলে দেখল, সমীর প্রায় গেটের বাইরে চলে গিয়েছে।
ওই সময়ই এগিয়ে এল প্ল্যাটফর্মে থাকা আর একটা ছেলে। এই ছেলেটার হাতে একটা রিভলবার।
আনোয়ার আগেই বলে রেখেছিল, গুলি যেন না চলে। ভোজালিতেই কাজ হয়ে যাবে। যতটা সম্ভব নিঃশব্দে কাজ করে এখান থেকে চলে যেতে হবে। পুলিশ চলে এলে সমস্যা হয়ে যাবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সমীর চিৎকার করতে করতে ছুটছে অপরাজিতাকে বাঁচাতে। পাশের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আনোয়ার বলে উঠল, “চালা গুলি।”
ছেলেটা নিশানা নেওয়ার বিশেষ সুযোগ পায়নি। সমীর গেটটার বাইরে চলে গিয়েছে। ওই অবস্থায় নলটা তাক করে ট্রিগারে চাপ দিল। পর পর দু’বার।
প্রথম গুলিটা নিশানায় লাগেনি। দ্বিতীয় গুলিটা ভুল করল না।
সমীরের মনে হল তাঁর কাঁধের ওখানটায় কেউ একটা গরম লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়েছে। তার শরীরটা এক বার ঘুরপাক খেয়ে ছিটকে পড়ল অন্ধকারে। পাশেই একটা বড় গর্ত। সমীর গিয়ে পড়ল সেই গর্তে।
সমীরের চিৎকারে যা হয়নি, রিভলবারের গর্জনে সেটা হল। ঘুমন্ত স্টেশনটা জেগে উঠল। চায়ের দোকানের লোকটা আগে দৌড় মারল ঘটনাস্থল ছেড়ে। কিন্তু দূর থেকে বেশ কয়েক জন লোক এগিয়ে আসতে লাগল গেটের দিকে। আর গুমটি থেকে বেরিয়ে এল রেল পুলিশের জনা কয়েক কনস্টেবল।
আনোয়ার আর দেরি করল না। সঙ্গীর দিকে ফিরে বলল, “দৌড়ো।” দু’জনেই ছুটতে শুরু করল। গর্তে পড়ে থাক সমীরের দেহটার দিকে আর তাকানোর সময় নেই তাদের।
যে তিনটে ছেলে অপরাজিতাকে টেনে সুমোয় তুলছিল, তাদের এক জন গিয়ে বসল সামনের সিটে। অন্য জন মাঝের সিটে আগে উঠে গিয়ে টেনে তুলে নিল অপরাজিতাকে। দ্বিতীয় লোকটা এক বার পিছনে ফিরে দেখল, আনোয়ার আর ওর সঙ্গী দৌড়ে আসছে। ওরা সুমোর পিছনের সিটে উঠে পড়বে। লোকটা এ বার উঠতে গেল মাঝের সিটে।
অপরাজিতা তখনও শেষ চেষ্টা করছে লড়াই করার। মেয়েটা বুঝে গিয়েছিল, যদি এক বার গাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তা হলে সে চিরতরে হারিয়ে যাবে এই নরকে। শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে সে ঝটকাটা দিল। ঠিক যেমন করে বাঘের কবলে পড়া হরিণী বাঁচার একটা আপ্রাণ চেষ্টা করে।
শরীরে ঝাটকাটা দিয়েই ডান কনুইটা পিছনে চালাল অপরাজিতা। কনুইটা গিয়ে লাগল পিছনে থাকা ছেলেটার নাকে। যন্ত্রণায় একটা গালাগালি দিয়ে উঠল সে। ওই মুহূর্তে আলগা হয়ে গেল ছেলেটার হাতের মুঠি। একটা ঝটকায় ছেলেটার হাত ছাড়িয়ে নিল অপরাজিতা। অন্য লোকটা প্রায় উঠে এসেছে সিটে। বাঁচার শেষ চেষ্টায় এ বার লাথি চালাল অপরাজিতা। মৃত্যুর সামনে দাঁড়ানো মানুষ অনেক কিছুই করে ফেলতে পারে। অপরাজিতার লাথিটা যে—এতটা জোরালো হবে, তা ভাবেনি লোকটা। লাথিটা খেয়ে গড়িয়ে পড়ল গাড়ির বাইরে।
টেনে হিঁচড়ে নিজের শরীরটাকে বাইরে নিয়ে এল অপরাজিতা। তাকে বাঁচতে হবে। এত দূর এসে সে হার মানবে না। সে অপরাজিতা। গাড়ি থেকে নেমেই ছুটতে গেল মেয়েটা।
আর তখনই তার পা দু’টো যেন মাটিতে গেঁথে গেল।
অপরাজিতা প্রথমে বুঝতে পারেনি, ঠিক কী হল। তার পরেই শুরু হল যন্ত্রণা। অসহ্য এক যন্ত্রণা। পেট থেকে শুরু হয়ে যে-যন্ত্রণাটা তার শরীরের শিরা- উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ছে। তার অনুভূতিগুলোকে অসাড় করে দিচ্ছে।
অপরাজিতা এ বার মাথা নিচু করে পেটের দিকে তাকাল। একটা ভোজালির হাতল বেরিয়ে আছে পেট থেকে। সেই হাতলটা ধরে আছে একটা বালা পরা হাত। অপরাজিতা মুখ তুলে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার মুখ সে আগে দেখেনি। মুখের একটা দিক পুড়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে কেউ গরম জল ছিটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু অপরাজিতার মাথায় তখন অতশত ঢুকছিল না। ভয়ঙ্কর এক যন্ত্রণা তাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল ক্রমশ।
আনোয়ারও তাকিয়ে রইল অপরাজিতার মুখের দিকে। তার পরে ভোজালিটায় একটা মোচড় দিল। নাড়িভুড়িগুলো জট পাকিয়ে গেল শরীরের মধ্যে। এর পরে একটা লম্বা টানে পেটটা ফালা ফালা করে দিয়ে ভোজালিটা বার করে আনল আনোয়ার।
দু’হাতে পেটটা চেপে ধরে গড়িয়ে পড়ল অপরাজিতা। এক বার পড়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখল আনোয়ার। এর আর বাঁচার কোনও সম্ভাবনা নেই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই উপরে চলে যাবে। আনোয়ার আর দেরি করল না। সুমোর পিছনের দরজা খুলে সে আর তার সঙ্গী উঠে বসল গাড়িতে। পিছন থেকে হুইসল বাজার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। দ্রুত এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। এক বার বেরিয়ে গেলে, ব্যাস। এই গাড়ির নম্বর প্লেটটাও ভুয়ো। হাতেনাতে ধরা না পড়লে পুলিশের বাবারও ক্ষমতা হবে না তাদের খুঁজে পাওয়ার। আর যদি বা পায়, তা হলে সেটা সামলানোর উপায়ও তাদের জানা আছে। ধুয়ো উড়িয়ে সুমোটা দ্রুত বেরিয়ে গেল গোরখপুর স্টেশন থেকে।
অপরাজিতা এক বার চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করল। এক বার সে দেখতে চাইছিল সমীরকে। কোথায় গেল ছেলেটা! কিন্তু চোখ দু’টো তার ক্রমে ভারী হয়ে আসছে। শারীরিক অনুভূতিও কেমন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে যন্ত্রণাবোধটাও। পেট থেকে হাতটা সরিয়ে সে এক বার মাটিটা স্পর্শ করতে চাইল। সেই মাটি, যেখানে ছোটবেলায় সে খেলে বেড়াত মায়ের হাত ধরে। সেই মাটি, যেখানে পড়ে গেলেও সে উঠে দাঁড়াতে পারত।
অপরাজিতার হাতটা সেই মাটি খুঁজে পেতে চাইল। শেষ বারের জন্য। কিন্তু তার হাতটা এসে ঠেকল ঠান্ডা কংক্রিটে। মাটির স্পর্শ আর পাওয়া হল না মেয়েটার। উঠে দাঁড়ানোও আর হল না। চোখটা শেষ বারের মতো বুজে এল অপরাজিতার।
নেপালের ছোট্ট এক পাহাড়ি গ্রামের মেয়ে চিরঘুমে ডুবে গেল উত্তরপ্রেদেশের এক রেল স্টেশনের বাইরে।
.
মিনিট কয়েক পরে রেল পুলিশের দু’জন কনস্টেবল আর কয়েক জন লোক যখন ছুটে এল ঘটনাস্থলে, তখন সব শান্ত হয়ে গিয়েছে। সুমোটা মিলিয়ে গিয়েছে অন্ধকারে। মেয়েটার নিথর দেহ পড়ে আছে রাস্তার একটা পাশে। কনস্টেবল দু’জনের পাশাপাশি ছুটে আসা কয়েক জন লোকেরও বুঝতে অসুবিধে হল না, পড়ে থাকা মেয়েটা খুন হয়ে গিয়েছে।
.
অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও গর্তটা থেকে ধীরে ধীরে উঠে বসল সমীর। তার পরে শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এল। একটু দূরে ভিড় জড়ো হচ্ছে। আরও কয়েক জন লোক ছুটে যাচ্ছে ঘটনাস্থলের দিকে। তার দিকে কারও নজর নেই।
প্ল্যাটফর্মের সামনেই পড়ে আছে তার চাদরটা। বাঁ কাঁধে এক বার হাত ঠেকিয়েই সমীর বুঝল, রক্ত ঝরছে। মাথাটাও ঘুরছে তার। তবে সেটা যন্ত্রণায় নয়, ভয়ে। তীব্র এক আতঙ্ক তাঁর শরীরকে অবশ করে দিচ্ছে। এই আতঙ্ক নিজের প্রাণ সংশয়ের জন্য নয়। এই আতঙ্ক কাউকে চিরতরে হারানোর আতঙ্ক। সমীরের মনে হচ্ছিল, সব কিছুই হারিয়ে ফেলেছে সে। হাতটা চোখের সামনে এনে দেখতে পেল লাল হয়ে গিয়েছে রক্তে। আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে চাদরটা তুলে নিয়ে গায়ে জড়ালো সমীর। এই অবস্থাতেও সে বুঝতে পারছিল, পুলিশের হাতে তার ধরা পড়া চলবে না।
একটু একটু করে সে ভিড়টার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার পরে থেমে গেল। সামনে পড়ে আছে অপরাজিতার নিথর দেহটা। পেটটা ফালা ফালা হয়ে গিয়েছে। মেয়েটার মুখের দিকে তাকালে বুঝতে সমস্যা হয় না, সে আর বেঁচে নেই।
একটা ভয়ঙ্কর আর্তনাদ সমীরের গলা চিরে বেরিয়ে আসছিল। অতিকষ্টে নিজেকে থামাল সে। এখানে এই ভাবে তার থাকা চলবে না। রক্ত যে-ভাবে ঝরছে, তাতে হয়তো আর বেশি সময় জ্ঞান থাকবে না তার। ব্যাগটা ফেলে এসেছে স্টেশনে। কিন্তু ব্যাগে এমন কিছু নেই, যাতে তাদের পরিচয় পাওয়া যাবে। মোবাইল আর মানিব্যাগটা এখনও তার পকেটেই আছে।
আস্তে আস্তে শরীরটাকে ভিড় থেকে দূরে টেনে নিয়ে এল সমীর। তার পরে মিশে গেল অন্ধকারে।
