প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

১১. মৃগয়া

১১. মৃগয়া

কলকাতা-মুম্বই, ২০২৩

কেস ফাইলটা সামনে নিয়ে বসে ছিল রুদ্রাণী। তার দৃষ্টি ফাইলে রাখা দু’টো ছবির উপরে।

একটা অজন্তার। একটা রাজা নামের ছেলেটার।

ছবি দু’টো ইতিমধ্যেই বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অজন্তার বেশ কয়েকটা ছবি রয়েছে এই ফাইলে। যাতে পুরো চেহারাটা ধরা পড়ে। রাজার ক্ষেত্রে সম্বল বলতে হাতে আঁকা একটা ছবি।

ইনস্টাগ্রাম অ্যাপ সংস্থার কাছে ইতিমধ্যেই আবেদন করা হয়েছে, রাজার মুছে ফেলা অ্যাকাউন্টটা সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য দিতে। ইনস্টাগ্রামের নিয়ম অনুযায়ী, অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দিলেও ৩০ দিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যাবতীয় তথ্য সার্ভারে মজুত থাকবে। তার পরে মুছে ফেলা হবে। ফলে রাজার তথ্যগুলো এখনও ওই সার্ভারে আছে। কিন্তু অ্যাপ কর্তৃপক্ষ তথ্য সরবরাহে রাজি হলেও তাতে কতটা লাভ হবে, সেটাই হল প্রশ্ন। অ্যাকাউন্টে ছবি ছাড়া বাকি তথ্যগুলো যে-ভুয়ো, সে বিষয়ে রুদ্রাণীর কোনও সন্দেহই নেই।

তাই তথ্যের চেয়েও রুদ্রাণীর যেটা বেশি করে প্রয়োজন, সেটা হল, আই পি অ্যাডড্রেস। কোন আই পি অ্যাডড্রেস ব্যবহার করে ওই ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটা তৈরি করা হয়েছিল, সেটা জানা খুবই দরকার। তা হলে ওই মোবাইল ফোনটা ট্রেস করা যাবে। কে ব্যবহার করেছে, সেই ফোনের লোকেশন কোথায় ছিল, তা বোঝা যাবে। তখন একটা ধারণা পাওয়া যাবে, কোথা থেকে তদন্ত শুরু করা যেতে পারে।

আই পি অ্যাডড্রেস। অর্থাৎ, ইন্টারনেট প্রোটোকল অ্যাডড্রেস। যেসব যন্ত্র দিয়ে ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যাবে, তাদেরই আই পি অ্যাডড্রেস থাকে। সেটা ল্যাপটপ হোক, ডেস্কটপ হোক, গেম কনসোল হোক, ট্যাবলেট হোক কী মোবাইল। সেই অ্যাডড্রেস এক বার পেয়ে গেলে ওই যন্ত্রটাকে খুঁজে বার করা সম্ভব। আর তা হলেই সামনে এসে যাবে, কে ওই যন্ত্র ব্যবহার করেছে। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ফুটপ্রিন্ট রেখে যায় ব্যবহারকারী যন্ত্র। আই পি অ্যাডড্রেস পেয়ে গেলে, সেই ফুটপ্রিন্টও খুঁজে পাওয়া যায়।

কিন্তু সেই ফুটপ্রিন্ট মুছে ফেলার ব্যবস্থাও এখন হয়ে গিয়েছে ভি পি এনের দৌলতে। অন্ধকার জগতের মানুষের কাছে এই ভি পি এন একটা বড় হাতিয়ার। রুদ্রাণী বুঝে গিয়েছিল, এরা যে-রকম পাকা খেলোয়াড়, তাতে ভি পি এন ব্যবহার করবেই এবং, সেটা হবে খুবই উচ্চমানের। যার ফলে আই পি অ্যাডড্রেস পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

বিজ্ঞান যে-ভাবে এগিয়ে চলেছে, তাতে প্রযুক্তির সাহায্য না নিয়ে কোনও তদন্ত এক পাও এগোয় না। দুষ্কৃতীরা যেমন এই প্রযুক্তির সাহায্য নেয়, সে-রকম পুলিশকেও এই প্রযুক্তিকে হাতিয়ার বানাতে হয়।

কিন্তু এমন এমন সময় আসে, যখন প্রযুক্তিকেও দূরে ঠেলে দিতে হয়। তখন ভরসা রাখতে হয় প্রায় জীর্ণ হয়ে আসা এক হাতিয়ারের উপরে। সেই হাতিয়ারের নাম- মানুষ।

রুদ্রাণী বুঝল, এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি তাকে বিশেষ সাহায্য করতে পারবে না। তাকে সাহায্য নিতে হবে মানুষের চোখ, কান আর মাথার। বিশেষ করে একটা মাথার।

মোবাইলে কনট্যাক্টের লিস্ট খুলে ওই বিশেষ নম্বরটা বার করে ফেলল রুদ্রাণী। তার পরে ডায়াল বাটনে চাপ দিল।

.

মুম্বইয়ে তখন নিজের অফিসে বসে ছিলেন পাঞ্চালী। কয়েকটা দিন আগেই নেপালি মেয়েটার খবর পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর এক ইনফর্মারের ফোনের মারফত। সে দিনের কথাটা মনে পড়ে যাচ্ছিল তাঁর।

“ম্যাডাম, একটা খবর পেয়েছি। ওই নেপালি মেয়েটার ব্যাপারে।”

“কী খবর পেলি? কোথায় আছে মেয়েটা? আবার কি ধরা পড়ে গেল?” উত্তেজিত হয়ে পড়লেন পাঞ্চালী।

“না ম্যাডাম, ধরা পড়েনি। মেয়েটাকে একেবারে জানে মেরে দিয়েছে। দিন কয়েক আগে গোরখপুরে খুন হয়ে গিয়েছে। মনে হয়, গোরখপুর দিয়ে নেপালে পালানোর চেষ্টায় ছিল। কিন্তু পারেনি।”

পাঞ্চালী ধীরে ধীরে মোবাইলটা নামিয়ে রাখলেন। এই আশঙ্কাই তিনি করছিলেন। মেয়েটাকে কিছুতেই ছেড়ে দেবে না ওরা। তার উপরে শোনা যাচ্ছিল, ও বোধ হয় কোনও বড় চাঁইয়ের মুখ দেখে ফেলেছিল। এ সব ক্ষেত্রে যদি তুলে আনা না যায়, তা হলে মেরে দেওয়ার রাস্তাতেই হাঁটে গ্যাংগুলো। পাঞ্চালী বুঝলেন, যে-লড়াই তিনি লড়ছেন, তাতে তাঁকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হার মানতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে লড়ছেন, তারা এতটাই শক্তিশালী যে, মেয়েগুলোকে বাঁচিয়ে আনাই কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে এই ধরনের ঘটনায়।

।পাঞ্চালীকে ভাবাচ্ছিল আর একটা কথা। গত কয়েক সপ্তাহে বার বার শব্দটা শুনতে পেয়েছেন তিনি। স্কিন ট্র্যাফিকিং! যে-ঘৃণ্য কাজটা নাকি ক্রমে বেড়ে চলেছে। আর একটা ইনকামের রাস্তা হয়ে উঠেছে এই ভয়ঙ্কর স্কিন ট্র্যাফিকিং।

পাঞ্চালী এই ব্যাপারটা প্রথমে জেনেছিলেন ২০১৭ সালে। যখন এক মহিলা সাংবাদিক নেপালি মেয়েদের দুরবস্থা নিয়ে একটা আর্টিকেল লিখেছিলেন। তার পরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। কিন্তু স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের ব্যাপারটা সে ভাবে আর সামনে আসেনি। কারও অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে পুরো ব্যাপারটা যেন চাপা পড়ে গিয়েছে। রয়ে গিয়েছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। তবে এখন যে-বেশ কয়েকটা মামলা চলছে আদালতে, সেটা তিনি জানেন।

কিন্তু গত কয়েক মাসে বার বার এই দু’টো শব্দ কানে এসেছে পাঞ্চালীর। স্কিন ট্র্যাফিকিং অন্য মাত্রা যোগ করেছে পাচারকারীদের দুনিয়ায়। আগে আমেরিকা থেকে বেশি অর্ডার আসত। এখন নাকি ইউরোপেও চাহিদা বাড়ছে। বাড়ছে এশিয়ার কয়েকটি দেশেও। পাঞ্চালী বুঝতে পারছিলেন, পাচারকারীদের নিশানায় আরও অনেক নতুন চেহারা এ বার যোগ হবে। আরও ভয়ঙ্কর পরিণতি অপেক্ষা করে থাকবে এই ছেলে-মেয়েগুলোর ভাগ্যে।

.

মোবাইলটা বেজে উঠতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হয়ে গেলেন পাঞ্চালী। একটু খুশিও হলেন। অনেক দিন এই মেয়েটার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তাঁর বন্ধুর বোন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে ভাল আলাপ আছে। কেমন আছে মেয়েটা, কে জানে। পুলিশের চাকরি তো আর সোজা কথা নয়। মোবাইলটা কানে লাগিয়ে পাঞ্চালী বলে উঠলেন, “আরে রুদ্রাণী বল, কেমন আছিস? অনেক দিন তোর খবর পাই না। সব ঠিক আছে তো?”

মিনিট পনেরো কথা বলার পরে পাঞ্চালী যখন মোবাইলটা নামিয়ে রাখলেন, তাঁর মুখটা গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। রুদ্রাণী যা বলল, সেটা মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। পাঞ্চালী অপেক্ষা করতে লাগলেন রুদ্রাণীর কাছ থেকে আসা হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাটার জন্য। মিনিটখানেকের মধ্যে মোবাইল টুং করে জানান দিল, সেই সব মেসেজ এসে গিয়েছে।

হোয়াটসঅ্যাপটা খুলে রুদ্রাণীর পাঠানো মেসেজগুলোয় চোখ রাখলেন পাঞ্চালী। মেসেজ বলতে পাঁচটা ছবি। চারটে অজন্তার। বিভিন্ন অ্যাঙ্গলে। আর একটা রাজা বলে ছেলেটার। যেটা হাতে আঁকা স্কেচ।

রাজার ছবিটা নয়। পাঞ্চালীর দৃষ্টি আকর্ষণ করল অজন্তা। বা বলা ভাল, অজন্তার চেহারা। এই মেয়েটাকে দেখলে প্রথমেই চোখ চলে যায় তার ত্বকের দিকে। এত উজ্জ্বল ত্বক খুব কমই দেখা যায়। ছবিতেও যেন ধরা পড়ছিল ত্বকের ঔজ্জ্বল্য।

পাঞ্চালীর বুকটা একটু কেঁপে উঠল। রুদ্রাণীর কাছ থেকে পুরো ঘটনাটা শুনেছেন তিনি। মেয়েটা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে প্রায় দিন পনেরো হল। কেসটা এখন অ্যান্টি হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইউনিটের হাতে এসেছে। তথ্য-প্রমাণ দেখাচ্ছে, মেয়েটাকে পাচার করে নিয়ে আসা হয়েছে মুম্বইয়ে। কিন্তু এখান থেকে আর কোথাও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না, জানা নেই।

“যত দূর জানতে পেরেছি, মেয়েটাকে নিয়ে তিন জনের একটা গ্যাং কলকাতা থেকে মুম্বই এসেছিল ট্রেনে। সেই গ্যাংয়ে একটা মেয়েও ছিল। অজন্তাকে বোরখা পরিয়ে মুম্বই নিয়ে আসা হয়।” রুদ্রাণীর কথা শোনার পরে পাঞ্চালী একটা প্রশ্ন করেছিলেন, “রাজা বলে ছেলেটার সম্পর্কে কী জেনেছিস?”

রুদ্রাণী জবাব দেয়, “ছেলেটা মনে হচ্ছে তুখোড় খেলোয়াড়। কখনওই মোবাইল লাইনে ফোন করেনি। অ্যাপ মারফত করেছে। ধরেই নিচ্ছি, ভি পি এন ব্যবহার করেছে। কোনও-রকম ট্রেস রাখেনি। অজন্তাকে কখনও নিজের ছবি পাঠায়নি। ওর অ্যাকাউন্টে কয়েকটা ছবি ছিল। কৃষ্ণেন্দু বলে ছেলেটা ওই ছবি এক বার দেখেছিল। তার থেকে রাজার মুখটা এঁকেছে।”

পাঞ্চালী ভাবছিলেন, তুখোড় হলেও একটা ভুল করেছে রাজা। মনে হচ্ছে, নিজের অ্যাকাউন্টটা প্রাইভেট সেটিংয়ে রাখেনি। যে-কারণে ফলোয়ার না হওয়া সত্ত্বেও আরও কয়েক জন রাজার ছবিটা দেখতে পেয়েছিল। রাজা হয়তো ভেবেছিল, প্রাইভেট সেটিংয়ে রাখলে অজন্তার সঙ্গে যোগাযোগটা করতে পারবে না। কারণটা যাই হোক, একটা ছোট্ট ভুল রাজা করেছে।

“তা হলে বলছিস, রাজাই ফাঁদে ফেলে নিয়ে এসেছে অজন্তাকে?”

“একদমই তাই। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারছি না। এই রকম হাই প্রোফাইল টার্গেটের পিছনে ওরা পড়ল কেন? এই নিয়ে যে-হইচই হবে, সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিল।”

পাঞ্চালী বললেন, “তুই আমার থেকে কী ধরনের সাহায্য চাস?”

“তোমার তো কানেকশন প্রচুর মুম্বইয়ে। অনেক ইনফর্মারও আছে। যদি কোনও ভাবে রাজার খবর কিছু পাওয়া যায়। এ ছাড়া অজন্তাকে কেন তুলে আনল, সে ব্যাপারেও যদি কিছু আন্দাজ পাওয়া যায়।”

রুদ্রাণী জানত, এক বার ট্র্যাফিকিংয়ের জালে জড়িয়ে যাওয়ার পরে শিকারদের উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়। যারা কোনও ভাবে খবর পাঠাতে পারে, তারাই বেঁচে যায়। এই সব এনজিও-র কাছেও অনেক সময় খবর চলে আসে তাদের ইনফর্মার মারফত। তাই পুলিশকে এদের সাহায্য নিতেই হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে।

রুদ্রাণীর কথা শোনার পরে পাঞ্চালী একটু ভাবলেন। তার পরে বললেন, “তুই আমাকে একটু সময় দে। কোনও খবর পেলেই আমি ফোন করছি।”

মোবাইলটা নামিয়ে রেখে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন পাঞ্চালী।

রুদ্রাণীও চিন্তাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। একটা কোনও ব্রেক দরকার। একটা কোনও ক্লু। পাঞ্চালীর উপরে অবশ্যই ভরসা করা যায়। প্রায় ১৫ বছরের ওপর এই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। পাচারকারীদের হাত থেকে প্রচুর ছেলে-মেয়েকে বাঁচিয়েছেন। সব চেয়ে বড় কথা, পাঞ্চালীর নেটওয়ার্কটা অসাধারণ। বিশেষ করে মুম্বইয়ে। নানা জায়গায় এর ইনফর্মার আছে। এই রকম নেটওয়ার্ক না থাকলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কখনও লড়াই করা যায় না। দেখা যাক, পাঞ্চালীদি কোনও খবর দিতে পারেন কি না। তত ক্ষণে অন্য জায়গাগুলোও বাজিয়ে দেখতে হবে।

.

দিন দুয়েক বাদে রুদ্রাণীর মোবাইলে পাঞ্চালীর ফোনটা এল। সরাসরি প্রসঙ্গে ঢুকে গেলেন পাঞ্চালী।

“তুই স্কিন ট্র্যাফিকিং নিয়ে কতটা কী এনেছিস?”

রুদ্রাণী একটু ভেবে নিয়ে বলল, “কথাটা আমার কানে এসেছে। যেখানে চামড়া ছাড়িয়ে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। তবে এর ডালপালা কত দূর ছড়িয়েছে, এই ব্যাপারে ঠিক পরিষ্কার ধারণা নেই।”

পাঞ্চালী বলে চললেন, “স্কিন ট্র্যাফিকিং ইজ অ্যানাদার ট্রেনড অব হিউম্যান ট্র্যাফিকিং। শোনা যাচ্ছে, ইউরোপ-আমেরিকা থেকে প্রচুর ক্লায়েন্ট পাওয়া যাচ্ছে ভারতীয় চামড়ার জন্য।”

রুদ্রাণী প্রশ্নটা না-করে পারল না, “কিন্তু এক জনের চামড়া অন্য জন লাগিয়ে কী করবে? কালার ম্যাচিং, টেক্সচার ম্যাচিংয়ের ব্যাপারগুলো তো থেকেই যায়। ভারতীয় ছেলে-মেয়েদের চামড়া কি আর বিদেশিদের পছন্দ হবে?”

পাঞ্চালী তৈরি ছিলেন প্রশ্নটার জন্য। “সে জন্য শুরুর দিকে নেপালি মেয়েদের টার্গেট করা হত। ওদের চামড়া কী রকম, সেটা তো জানিস। এখন এই জালটা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।”

“কী রকম সেটা?”

“এখন আর নেপালি মেয়েদের মধ্যে ব্যাপারটা আটকে নেই। আমার সোর্স বলছে, এখন সমাজের নানা স্তরের মেয়েদের টার্গেট করা হচ্ছে। যাদের ত্বক আকর্ষণীয়, তারা টার্গেট লিস্টে চলে আসছে। এখানে ধনী, গরিব কিছুই দেখা হচ্ছে না। এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এই গ্যাংগুলো।”

রুদ্রাণীর মনে একটা চাপা আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। তবু কিছু না বলে পাঞ্চালীর কথা শুনে যেতে লাগল।

“দেশ জুড়ে বিভিন্ন ক্লিনিক গজিয়ে উঠেছে এখন। এখানে আগেও অবশ্য নানা ঘৃণ্য কাজ হত। এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এই স্কিন ট্র্যাফিকিং। এটাও অর্গ্যান ট্র্যাফিকিংয়ের একটা অঙ্গ। যেখানে মেয়েদের নিয়ে এসে অল্প অল্প  করে তাদের চামড়া ছাড়িয়ে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এই ব্যবসার একটা বড় লাভ কী জানিস?”

“কী?”

পাঞ্চালী একটু দম নিয়ে বললেন, “একটা মেয়ে বা ছেলের থেকে বার বার চামড়া তুলে নেওয়া যাবে। কিছু দিনের মধ্যেই তো চামড়া গজিয়ে যাবে। তাই ভিক্টিমদের বাঁচিয়ে রাখাই এখন লক্ষ্য থাকে এই গ্যাংগুলোর। যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিন লাভ করা যাবে। এটা পুরো সেই সোনার ডিম দেওয়া হাঁসের মতো গল্প। হাঁসকে মেরে দিলে তো সব শেষ হয়ে যাবে। বাঁচিয়ে রাখলে ফারদা।”

রুদ্রাণীর গা-টা শিরশির করে উঠল। পাঞ্চালীর কথা তখনও শেষ হয়নি- “এখানে একটা ভাল শিকার ধরতে পারলে বছরের পর বছর ধরে লাভ করা যায়। মেয়েদের বিক্রি করে দিলে বা শরীরের অন্য অর্গ্যান কেটে বিক্রি করলে এক বারই টাকা পাওয়া যাবে। কিডনি, চোখ, হার্ট— এ সব তো দু’বার গজাবে না। কিন্তু চামড়ার ব্যাপারটা অন্য। চামড়া আবার গজিয়ে যাবে। যত বার কাটা হবে, তত বার গজাবে। তা ছাড়া শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে তো চামড়া কেটে নেওয়া যায়। অতএব কোনও সমস্যা নেই।”

এত ক্ষণ যে-প্রশ্নটা রুদ্রাণীর মনে ঘোরাফেরা করছিল, এ বার সেটা সে করেই ফেলল, “তুমি এই সব বলছ কেন? তোমার কি সন্দেহ…।” রুদ্রাণী কথা শেষ করতে পারল না।

রুদ্রাণীর না বলা কথাটা শেষ করে দিলেন পাঞ্চালী—

“অজন্তার ছবি আমি দেখেছি। ওর ত্বকটা অসাধারণ। মেয়েটাকে যখন এত ঝুঁকি নিয়ে অপহরণ করা হয়েছে, তখন নিশ্চয়ই বিশেষ কারণ আছে। স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের দিকটা আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না।” একটু থামলেন পাঞ্চালী। তার পরে শেষ কথাটা বললেন, “সব চেয়ে ভয়ের কথা কী জানিস? এই চক্রের সঙ্গে এমন সব মাথা জড়িয়ে আছে, যাদের আমরা ছুঁতেও পারব না। তাদের দিকে আঙুল তুললে মানুষ আমাদেরই পিটিয়ে মেরে দেবে।”

.

পাঞ্চালীর সঙ্গে কথা বলার পরে রুদ্রাণী বুঝতে পারছিল, তার সামনে চ্যালেঞ্জটা বড়ই কঠিন। নরকে পা রেখেছে অজন্তা। এক শয়তানের গ্রাসে গিয়ে পড়েছে। সেখান থেকে কি আদৌ মেয়েটাকে বাঁচিয়ে আনা যাবে?

আত্মবিশ্বাসটা টলে যাচ্ছিল রুদ্রাণীর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *