প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

১. নরক যন্ত্রণা

১. নরক যন্ত্রণা

মুম্বই, ২০২৩

এই ফ্ল্যাটটায় কিছুতেই কাজ করতে আসতে চায় না রাধা। তার ভালই লাগে না। অদ্ভুত একটা শর্তে এখানে কাজ করতে হয় তাকে।

ফ্ল্যাটে ঢোকার পরে কোনও দিকে না তাকিয়ে তাকে সোজা চলে যেতে হবে রান্নাঘরে। তার পরে রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে বাইরে থেকে। ঘণ্টা দুয়েক সেখানে আটকে থেকে কাজ করে আবার একই ভাবে বেরিয়ে যেতে হবে। এই ফ্ল্যাটে ঢুকেই প্রথমে পড়ে একটা ডাইনিং কাম ড্রয়িংরুম। যার মধ্য দিয়ে হেঁটে রান্নাঘরে আসতে হয় রাধাকে। সে দেখেছে আরও দু’টো ঘর আছে। সে ঘর দু’টোর দরজা বাইরে থেকে বন্ধ থাকে। এই ফ্ল্যাটটা বিল্ডিংয়ের তিন তলায়। বাইরে থেকে সে এক বার দেখেছিল, একটা ঘরের সঙ্গে অ্যাটাচড ব্যালকনি আছে। যেটা বিল্ডিংয়ের পিছন দিকে।

সে এই ফ্ল্যাটে ঢোকার পরেই তাকে রান্নাঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দেয় এক বৃদ্ধা মহিলা। যে-একাই থাকে এই বাড়িতে। রাধা জানে এই মহিলার এক ছেলে আছে। যে-মাঝেমধ্যে এখানে আসে। সেই লোকটিই রাধাকে চাকরিতে রেখেছিল। কিন্তু শর্তসাপেক্ষে

লোকটা রাধাকে ডেকে বলেছিল, “তোমাকে কাজে রাখতে পারি একটা শর্তে। তুমি যত ক্ষণ রান্না করবে, রান্নাঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকানো থাকবে। রান্না শেষ হয়ে গেলে দরজায় টোকা মারবে। আমার মা দরজা খুলে দেবে। তুমি সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যাবে ফ্ল্যাট থেকে।”

রাধা অবাক হয়ে গিয়েছিল শর্ত শুনে। “আটকে রাখবেন কেন আমাকে? এ রকম কেউ কারও সঙ্গে করে নাকি?”

লোকটা অদ্ভুত একটা যুক্তি দিয়েছিল। মা একা থাকে ঘরে। বাইরের কেউ ঘরে এলে খুবই ভয় পেয়ে যায়। তাই রাধাকে রান্নাঘরের মধ্যেই আটকে রাখা হবে। রাধা এই শর্ত মেনে কিছুতেই কাজ করত না। কিন্তু এরা বড্ড বেশি টাকা দিচ্ছে। সাধারণত সে যা মাইনে পায়, তার দ্বিগুণ। আর পরিশ্রমও বেশি নয়। দু’জনের মতো রান্না করে যেতে হবে দু’বেলার। রান্না খুবই ছিমছাম। কোনও ঝামেলা নেই। রাধা রাজি হয়ে গেল।

মাসখানেক হল সে কাজে লেগেছে। এপাশ-ওপাশ থেকে সে শুনেছে, আগে একটা মেয়ে এখানে রান্নার কাজ করত। মেয়েটা চলে যাওয়ার পরে নতুন লোক নেওয়া হয়েছে।

দিন কুড়ি রাধার কোনও সমস্যা হয়নি। ঘড়ি ধরে কাজ করে সে চলে গিয়েছে। রান্না শেষ হলে সে দরজায় টোকা দিত। ওই বৃদ্ধা মহিলা এসে বাইরে থেকে খুলে দিত রান্নাঘরের দরজা। রাধা বেরিয়ে যেত।

কিন্তু দিন দশেক হল তার কী রকম একটা অস্বস্তি হচ্ছে। তার যেন মনে হচ্ছে, এই ফ্ল্যাটে আরও এক জন আছে। মনে হচ্ছে, বন্ধ ঘরের দরজার ভিতর থেকে নড়াচড়ার আওয়াজ আসছে। কখনও মনে হচ্ছে ফুঁপিয়ে কান্নার একটা আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ওই বৃদ্ধা মহিলা এখন আরও বেশি খিটখিটে হয়ে উঠেছে। রাধার কাজ শেষ হলেই তাকে প্রায় ঠেলে দরজার বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। যেন অতিরিক্ত এক মুহূর্ত এই ফ্ল্যাটে থাকতে দিতে চায় না তাকে। আরও কয়েকটা দিন গেল। রাধার অস্বস্তিটা কমার বদলে বাড়তেই লাগল।

.

সাধারণত রাত আটটার পরে লোকটা আসে। সপ্তাহে দুই কী তিন দিন। আর তখনই নরক দর্শন শুরু হয় মেয়েটার। নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় তাকে।

লোকটা আসার পরেই বড় ঘরে তখন টিভিটা বেশ জোরের সঙ্গে চালিয়ে দেওয়া হয়। বয়স্ক ভদ্রমহিলা বসে থাকে ড্রয়িংরুমে। আর লোকটা সোজা ঢুকে যায় একটা বন্ধ দরজার ভিতরে। যেখানে রয়েছে বছর বারোর ওই মেয়েটা।

প্রথম দিন লোকটা একটা চকোলেট খেতে দিয়েছিল মেয়েটাকে। তার পরে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। বাচ্চা মেয়েটা বোঝেনি এর পরে কী আসছে। হঠাৎ লোকটা তার মুখটা বেঁধে ফেলে। মুখ থেকে কোনও শব্দই বার করতে পারছিল না বাচ্চাটা। হাত দু’টোও বেঁধে দেয় পিছমোড়া করে।

তার পরে শুরু হয় অত্যাচার। তার ছোট্ট শরীরটাকে প্রথমে উল্টো করে শুইয়ে দেওয়া হয়। একটা সরু বেত এনে লোকটা মারতে থাকে তাকে। পিঠে, কোমরে, নিতম্বে। যন্ত্রণায় ছটফট করে মেয়েটা। প্রচণ্ড যন্ত্রণা। কখনও কখনও মেয়েটার মাথা ধরে লোকটা সজোরে ঠুকে দেয় দেওয়ালে।

মিনিট পনেরো কী কুড়ি ধরে চলে অত্যাচার। তার পরে লোকটা একটু থিতিয়ে যায়। বসে পরে চেয়ারে। মেয়েটার তত ক্ষণে জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা। লোকটা এর পরে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ঘরে চলে আসে বয়স্ক মহিলাটি। মেয়েটাকে কোনও মতে টেনে তুলে খুলে দেয় তার মুখের বাঁধন। কিন্তু তার আগে একটা কথা বলে দেয় বাচ্চাটার কানে, “মুখ দিয়ে যদি কোনও আওয়াজ বেরিয়েছে, কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হবে।”

ওদের মুখ দেখে বাচ্চাটা বুঝতে পারে, এরা সত্যি কথা বলছে। সে কোনও আওয়াজ করলে তাকে কেটে ফেলা হবে। অব্যক্ত যন্ত্রণায় গুমড়াতে থাকে সে।

দিন কয়েক আগে একটা দিন তো বাচ্চাটা ভয়ঙ্কর রকম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। বাচ্চাটাকে সে দিন চিৎ করে একটা টেবিলের উপরে শুইয়ে দিয়েছিল লোকটা। তার পরে হাত-পা বেঁধে দেয়। আতঙ্কিত অবস্থায় মেয়েটা দেখতে পায়, লোকটা একটা খুব সরু মতো ছুরি বার করছে। ধীরে ধীরে ছুরি ধরা হাতটা এগিয়ে আসে তার গালের দিকে। মেয়েটা কিছু বোঝার আগেই তার গালের উপরে আলতো করে নেমে আসে ছুরিটা। গভীর ভাবে নয়। অল্প করে চামড়ার ওপর দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হয় ছুরিটা। একটু পরে মেয়েটা দেখতে পায়, ওই ছুরিটায় উঠে এসেছে একটা চামড়ার টুকরো। মেয়েটা বুঝতে পারে, চামড়ার টুকরোটা তারই। আতঙ্কে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মেয়েটা।

বালু এক বার ছুরিতে লাগানো চামড়াটা আর এক বার মেয়েটার গালের দিকে তাকিয়ে থাকে। নাহ, এ বার ঠিক হয়েছে। মেয়েটাকে শিক্ষা দেওয়া গিয়েছে। তবে এই শিক্ষার পালা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। আরও চলবে।

মেয়েটাকে সপ্তাহে কয়েকটা ইঞ্জেকশনও দেওয়া হয়। যাতে ক্ষতগুলো ঘায়ে না বদলে যায়। মাথার ক্ষতে ফেট্টিও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। মেয়েটাকে মরতে দিলে চলবে না। তা হলে সে প্রতিশোধটা নেবে কার ওপর? সে ডাক্তার, তাই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সমস্যা হয়নি। বাঁচিয়ে রাখার মতো চিকিৎসা। আরও একটা নির্দেশ মাকে দিয়ে এসেছে বালু। কাজের মেয়েটা যখন রান্না করতে আসবে, তখন যেন এই মেয়েটার মুখ বেঁধে রাখা হয়। কোনও শব্দ যেন না করতে পারে বাচ্চাটা।

প্রথম কয়েকটা দিন মেয়েটাকে খোলা ছেড়ে রাখা হয়েছিল। বালু তখনও অত্যাচার শুরু করেনি বাচ্চাটার উপরে। যে-দিন থেকে সেটা শুরু হল, মেয়েটাকে আর ছেড়ে রাখা যায়নি। বাচ্চাটার পায়ে একটা শিকল পরিয়ে, লম্বা একটা চেনের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হল। এই ঘরেই লাগোয়া বাথরুম আছে। মেয়েটার বাথরুমে যেতে সমস্যা হয় না।

বাকি ব্যাপারটা বালুর মা সামলে দিতে পারেন। এই অবস্থা থেকে তাঁকে কাবু করে বাচ্চাটার পক্ষে যে-পালানো অসম্ভব, সেটা তিনি বুঝে গিয়েছেন।

ছেলের দেখাদেখি তাঁর মনটাও এখন কী রকম যেন বিকৃত হয়ে গিয়েছে। বালু ডাক্তারি পাশ করার কয়েক বছর পরেই তাঁর স্বামী মারা যান। বালু প্রথম কয়েক বছর মাকে নিজের কাছে এনে রেখেছিল। বিয়ের পরে অবস্থার পরিবর্তন হয়। মাকে এই ফ্ল্যাটটার ব্যবস্থা করে দেয়। শুধু মাকে আলাদা রাখার জন্যই নয়। তাঁর একটা গোপন ডেরারও প্রয়োজন ছিল যেখানে সে নির্বিঘ্নে নিজের কাজটা করতে পারবে।

স্ত্রীকে নিয়ে বিশেষ সমস্যা ছিল না। স্ত্রীও নিজের জগৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। ফলে সপ্তাহে দু’তিন দিন কয়েক ঘণ্টার জন্য বালুর এই ফ্ল্যাটে আসা নিয়ে প্রশ্ন উঠত না। বালুর স্ত্রীরও বিশেষ আগ্রহ ছিল না শাশুড়িকে দেখার। বাচ্চারা আব্দার করলে মাকে মাঝেমধ্যে নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে যেত বালু। মাঝেমধ্যে বিদেশ যেতে হলে বালুকে অবশ্য দূরে থাকতে হত এই সব থেকে। দেশে ফেরার পরে শুরু হত তাঁর নারকীয় কর্মকাণ্ড।

ছেলের মানসিক অবস্থা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, এটা যে-মা একেবারে বুঝতে পারেননি, তা নয়। ডাক্তারি পড়ার সময়ই বুঝেছিলেন। যখন নিরীহ পশুগুলোর ছাল ছাড়ানো শরীর মাঝেমধ্যে তাঁরও চোখে পড়ত। কিন্তু ছেলেকে কিছু বলতে পারেননি। আর অন্য কাউকে তো নয়ই। ভয়ে, লজ্জায় আর সব হারানোর আশঙ্কায়।

ছেলে যদি ডাক্তারি পড়া শেষ করতে না পারে, তা হলে তাঁদের কী হবে? যা সঞ্চয় ছিল, তা দিয়েই ছেলেকে মানুষ করেছেন তাঁরা। এর পরে তো না খেয়ে মরতে হবে। তাই মা মুখ বন্ধ রেখেছিলেন।

আর এখন যা অবস্থা, তাতে মুখ খোলার কথা তিনি ভাবতে পারেন না। সব হারাবেন তা হলে। কখন যেন তিনিও বালুর এই পাপ কাজের সঙ্গী হয়ে গিয়েছেন, বুঝতেও পারেননি মা। তিনি শুধু জানেন, এখন আর ফেরার উপায় নেই।

.

সমাজে তার প্রতিপত্তি, তার অর্থ বালুকে একটা আলাদা সম্মান এনে দিয়েছিল। ফলে নানা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হত সে। বিশেষ অতিথি হয়ে যেতে হত নানা এনজিও-তে। ধীরে ধীরে বালু জড়িয়ে পড়ে কয়েকটা সংস্থার সঙ্গে। যারা মূলত কাজ করে ট্র্যাফিকিং থেকে উদ্ধার পাওয়া ছেলে-মেয়েদের বা অনাথ কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে। যে-সব বাচ্চার সামনে আর ঘরে ফেরার রাস্তা নেই।

এই সব সংস্থার কয়েকটা আবার বেশ আলাদা। পর্দার আড়ালে এখানে চলে আরও কিছু কুকীর্তি। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কিশোর-কিশোরীরা অনেক সময় হারিয়ে যায় এই সব হোম থেকে। কেউ কেউ পাচার হয়ে যায় বিদেশে। কেউ চলে যায় যৌনপল্লীতে। আর কাউকে কাউকে বাড়ির কাজের লোক করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় মুম্বই এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে। কেউ আর এই ছেলে-মেয়েদের খোঁজ করে না। এরা হারিয়ে যায় চিরতরে।

বালু পেয়ে গেল একটা সোনার খনির সন্ধান। তার শরীরে জন্ম নিল আরও একটা রূপ। যে-রূপ উঠে এসেছে নরক থেকে। সে নরক যন্ত্রণা সহ্য করেছে একটা সময়, এ বার সব ফিরিয়ে দেওয়ার পালা।

.

মুম্বই শহরে রাত নামে। রাতের অন্ধকারেও কখনও কখনও ফুটে ওঠে আসল চেহারাগুলো। কারও মার্সিডিজ ছুটে চলে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের দিকে। কেউ তার বিএমডব্লিউ পার্ক করে ড্রাইভারের সাহায্যে টলতে টলতে উঠে যায় নিজের ডুপ্লেক্সে। কেউ ডুবে যায় অদ্ভুত এক অন্ধকারে। অমাবস্যার নিকষ আঁধারকেও যে-অন্ধকার হার মানাবে।

রাত হয়েছে। বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে। লতা দেশমুখ নিজের ড্রয়িংরুমে বসে দিন কয়েক আগের কথাগুলো ভাবছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে পাঞ্চালী নামের মেয়েটা যে-কথাগুলো বলছিল। স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের কথা। প্ল্যাস্টিক সার্জনদের কথা। যা শোনার পর থেকে তাঁর মাথায় একটা চিন্তা ঘুরছিল।

তিনি উঠে এগিয়ে গেলেন বেডরুমের দিকে। একটু আগেই চেম্বার থেকে ফিরেছেন তাঁর স্বামী জয়ন্ত। নামী প্ল্যাস্টিক সার্জন। মাঝেমধ্যেই বিদেশে ছুটতে হয়। ফিরেও অবশ্য বিশ্রাম নেই। ল্যাপটপ খুলে বসে পড়েছেন।

বিছানায় স্বামীর পাশে বসে লতা বললেন, “দিন কয়েক আগে এক জন অ্যান্টি ট্র্যাফিকিং অ্যাক্টিভিস্টের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। একটা নতুন কথা শুনলাম ওর মুখে।”

“কী?” মুখ না তুলেই প্রশ্ন করলেন লতার স্বামী।

“স্কিন ট্র্যাফিকিং। এটা নাকি ভয়ানক চেহারা নিচ্ছে।”

এ বার ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে তাকালেন জয়ন্ত। তার পরে বললেন, “কে বলেছে কথাটা?”

“পাঞ্চালী নামের এক মহিলা। অ্যান্টি ট্র্যাফিকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। একটা সেমিনারে দেখা হয়েছিল। ও জানতে চাইছিল এই ব্যাপারে। বিশেষ করে প্ল্যাস্টিক সার্জনদের ব্যাপারে। তাই ভাবলাম, তোমাকে কথাটা বলি।”

ল্যাপটপটা বন্ধ করে স্ত্রীর দিকে তাকালেন জয়ন্ত। তার পরে বললেন, “কেন এই সব লোকজনের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠতা করছ! কোথা থেকে কোথায় জড়িয়ে যাবে, বুঝতেও পারবে না। লিভ ইট।”

লতা অবাকই হয়ে গেলেন স্বামীর মুখে কথাটা শুনে।

.

মেডিসিনের একটা নতুন রিসার্চ পেপারের উপরে চোখ বোলাচ্ছিলেন অপূর্ব দেশপাণ্ডে। কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারছিলেন না। ঘুরে ফিরে তার মন চলে যাচ্ছিল দিন কয়েক আগের ঘটনাটায়। পাঞ্চালী নামের এই মেয়েটার বড্ড বেশি কৌতূহল। স্কিন ট্র্যাফিকিং নিয়ে কথা বলছে। তিনি যে-দুনিয়ার সঙ্গে জড়িত, সেখানে সাদা আর কালোর মাঝেও একটা জগৎ আছে। ধূসর জগৎ। অনেক মানুষের বিচরণ ক্ষেত্র এই ধূসর জগৎ।

এই দুনিয়াটা মোটেই সোজা নয়। কোনটা খারাপ আর কোনটা ভাল, তার বিচার করবে কে। তাদেরও তো বেঁচে থাকতে হবে। তাই যারা এই ধূসর জগতে ঘোরাফেরা করে, তারা চায় না তাদের মুখটায় আলো পড়ুক। পাঞ্চালীর মতো মানুষেরা এই কাজটা করে। ধূসর জগতের মানুষের মুখে আলো ফেলে তাদের দুনিয়ার সামনে তুলে ধরে। ছোটবেলা থেকেই অপূর্ব দেশপাণ্ডে একটু ভীতু প্রকৃতির মানুষ। অল্পতেই টেনশনে পড়ে যান।

রিসার্চ পেপারটা নামিয়ে তিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরেও রুমাল দিয়ে কপালটা মুছে নিলেন।

.

একটা বড় অস্ত্রোপচার সেরে ঘরে ফিরেছেন প্রশান্ত পাটিল। সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে এল তার দুই সন্তান। এক জন আট বছর, এক জন দশ। বাবাকে খুবই ভালবাসে। বাবাও কম ভালবাসেন না তাদের। দু’জনকে একটু আদর করে পোশাক বদলে একটা স্কচের গ্লাস নিয়ে বসলেন তিনি। স্ত্রী ঘোষণা করে দিলেন, আধ ঘণ্টার মধ্যে ডিনার রেডি হয়ে যাবে।

বাচ্চা দু’টো আবার পড়তে বসেছে। প্রশান্ত পাটিল এই ফাঁকে টুক করে একটা ফোন করে নিলেন। তার পরে গদিমোড়া সোফায় গা এলিয়ে দিলেন।

কিন্তু কাঁটাটা তাঁর মনে এখনও বিধছে। বিধিয়ে দিয়ে গিয়েছে ওই পাঞ্চালী বলে মেয়েটা। বড্ড বেশি প্রশ্ন করছে। বিশেষ করে স্ক্রিন ট্র্যাফিকিংয়ের মতো অস্বস্তিকর বিষয় নিয়ে। তাঁরা কেউ অবশ্য পাঞ্চালীর সামনে মুখ খোলেননি, কিন্তু সবাই জানতেন, পাঞ্চালী কী বলতে চাইছে। মেডিক্যাল ওয়ার্ল্ড দুধের শিশুদের জায়গা নয়। এখানে নিরামিষাশী হরিণের চেয়ে বাঘের মতো শিকারি শ্বাপদের সংখ্যাই বেশি।

ডক্টর প্রশান্ত পাটিলের কপালটা একটু কুঁচকে উঠল।

.

শ্রুতি শিণ্ডে বিয়ে করে সংসারী হননি। তাঁর জগৎটা অন্য। এমনিতে তিনি বিশেষ কাউকে পাত্তা দেন না। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে একটা একরোখা ভাব আছে। তাঁর বড়সড়, ভারিক্কি চেহারাটা সবার মধ্যেই সম্ভ্রম আদায় করে নিতে পারে। যদিও হাসলে তাকে শিশুর মতোই নিষ্পাপ দেখায়।

নিজের পেশায়, নিজের জগতে শ্রুতি খুবই সফল। যাকে বলে মইয়ের প্রায় উপরেই উঠে গিয়েছেন। কিন্তু তিনি জানেন, এই জীবনটা একটা সাপ- মইয়ের লুডো খেলা। যে-মুহূর্তে সাপের মুখে পড়বেন, আবার নীচে নেমে আসতে হবে। শ্রুতি শিণ্ডে তাই ভীষণ সতর্ক থাকেন। প্রতিটা পদক্ষেপ তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ফেলেন।

তাঁর মনেও একটা কাঁটা খচখচ করছিল। পাঞ্চালী বলে মেয়েটাকে কি তিনি একটু বেশি কথা বলে ফেললেন? এতে কি তাঁর বিপদ বেড়ে যাবে? শ্রুতির চিন্তাটা যাচ্ছে না।

.

ঘড়িতে রাত এগারোটা বেজে গিয়েছে। চার ডক্টরের কারওর চোখেই ঘুম নেই। একটা নামই ঘুরছে সবার মাথায়। পাঞ্চালী রায়। নামটা ঘুরছিল আরও কারও মাথায়।

সওয়া এগারোটা নাগাদ মুম্বইয়েরই কোনও জায়গায় একটা মোবাইল বেজে উঠল। কলটা রিসিভ করতেই উল্টো দিক থেকে এক জন বলে উঠল, “পাঞ্চালী বলে এক জন সমাজসেবী খুব বেশি প্রশ্ন করছে। কাজ নিয়ে খোঁজ খবর করছে।”

“কী করতে চান?”

“নজর রাখো। যতটা পারো খবর সংগ্রহ করো। আমিও চেষ্টা করছি খবর নেওয়ার। তবে এর বেশি কিছু করতে যেও না। যত ক্ষণ না আমি বলব।”

“ঠিক আছে।” কলটা কেটে গেল।

.

রাত বারোটা নাগাদ হঠাৎ বেজে উঠল শ্রুতি শিণ্ডের মোবাইল। ভদ্রমহিলা ঘুমনোর চেষ্টা করছিলেন। স্ক্রিনে নম্বরটা দেখে মোবালইটা কানে তুলে নিলেন

“কী হয়েছে জ্যোতি? এত রাতে?”

যে কয়েকটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে শ্রুতি শিণ্ডে জড়িত, তার একটায় কেয়ারটেকারের কাজ করে এই মেয়েটি। খুব ভাল। শ্রুতি একে বিশেষ স্নেহ করেন। এত রাতে জ্যোতির ফোনটা তাঁকে অবাকই করে দিল।

“ম্যাডাম, আপনাকে একটা কথা জানাতে চাই। দিন দশেক হল আমাদের এখান থেকে একটা মেয়ে হারিয়ে গিয়েছে। এই নিয়ে কেউ কোনও কথাই বলছে না। পুলিশকেও জানানো হয়নি।”

শ্রুতির ভ্রুটা কুঁচকে উঠল। জ্যোতি বলে যেতে লাগল, “এটা কিন্তু প্রথম নয়। এর আগেও এখান থেকে বাচ্চা হারিয়ে গিয়েছে। কেউ কিছু করেনি। এ বার সাহস করে আপনাকে কথাটা জানালাম।”

শ্রুতি সামান্য সময় ভেবে জবাব দিলেন, “ঠিক আছে। তুমি আর কাউকে কিছু বোলো না। আমি যা করার করছি।”

ফোনটা রেখে আবার চিন্তায় ডুবে গেলেন শ্রুতি শিণ্ডে। মনে হচ্ছে, ঘুমটা চটকে গেল। তাঁকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *