৮. আগুনের পরশমণি
মুম্বই-প্যারিস, ২০২৩
স্থির দৃষ্টিতে দরজাটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন শ্রুতি শিণ্ডে। এই দরজাটা দিয়েই মিনিটখানেক আগে বেরিয়ে গিয়েছেন পাঞ্চালী এবং সমীর।
শ্রুতির মুখটা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মুখে যে-একটা আলগা মিষ্টতা ছিল, সেটা বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ করে হিংস্র একটা মুখ যেন বেরিয়ে এসেছে মুখোশের আড়াল থেকে। ধীরে ধীরে মোবাইলটা বার করে স্পিড ডায়ালে একটা নম্বরে চাপ দিলেন শ্রুতি। তার পরে ফোনটা কানে তুললেন।
সেকেন্ড পনেরো বাদে ওপাশ থেকে সাড়া পেয়ে কথা বললেন শ্রুতি। তাঁর গলার স্বরও বদলে গিয়েছে। কোনও সরীসৃপ যেন হিসহিস করে উঠল ফোনে, “সমীর বেঁচে আছে কী করে?”
“বেঁচে আছে? বলছেন কী? আনোয়ার যে- বলল, খতম হয়ে গিয়েছে, “ উল্টো দিকের লোকটা সত্যি আকাশ থেকে পড়ল।
“খতম হয়ে যদি যায়, তা হলে আমার চেম্বারে মিনিট পাঁচেক আগে এসেছিল কী করে!”
“মানে!” লোকটা প্রায় চিৎকার করে উঠল।
শ্রুতির হাতের গাঁটগুলো শক্ত হয়ে উঠছিল ক্রমে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন, “সমীর এসেছিল ওই পাঞ্চালী মেয়েটার সঙ্গে। একটা ভাল ব্রেক পেয়েছে বলে পাঞ্চালী ওকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল। আমাকে ও চিনে ফেলেছে। আমাকে দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তার পরে পাঞ্চালী ওকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।”
“তা হলে কী হবে এখন?” লোকটা রীতিমতো ভীত হয়ে পড়ল। এই রকম বড় সমস্যার সামনে সে আগে পড়েনি।
শ্রুতি বা ডক্টর ডেভিল নিজেকে একটু সামলে নিলেন। তার পরে বললেন, “ফোনে আর বেশি কিছু বলছি না। আমার মনে হয় না, ওরা এখনই পুলিশের কাছে যাবে। আমার বিরুদ্ধে কিছু পাবে না। কোনও প্রমাণও নেই। তুমি ক্লিনিকের ব্যাপারটা সামলাও। তার পরে আমি দেখছি কী করা যায়।”
লোকটা মোবাইল নামিয়ে রেখে ঘামতে লাগল। এত বড় দায়িত্ব সে একার কাঁধে নিতে চায় না। তার উপরে এক জন আছে। এখনই ফোনটা সেই লোকটাকে করতে হবে।
খবরটা পেয়ে দ্বিতীয় লোকটার প্রতিক্রিয়াও একই রকম হল। সে-ও একই ভাবে ব্যাপারটা নিজের কাঁধে নিতে চাইল না। এই অন্ধকার জগতের সিঁড়ির খুব উপরের ধাপেই রয়েছে সে। কিন্তু সিঁড়ি যেখানে শেষ হয়ে যায়, সেখানেই থাকে আসল দরজাটা। ওই দরজা দিয়ে আবার তাকে ঢুকতে হবে। খারাপ খবরটা দিতে হবে। ভাবতেই শরীরটা এক বার কেঁপে উঠল লোকটার।
বস যে-খারাপ খবর একেবারে পছন্দ করে না।
.
ডক্টর ডেভিল যখন ফোনটা করছেন, গাড়িতে বসে সমীরের মুখ থেকে সত্যটা শুনে ফেলেছেন পাঞ্চালী। সত্যটা এতটাই নিষ্ঠুর, যে-তাকে পুরোপুরি নড়িয়ে দিয়ে গেল। তার পরেই হুঁশ ফিরে পেয়ে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলেন, “সোজা আমার বাড়ি।” পাঞ্চালী বুঝতে পারছিলেন, এই মুহূর্ত থেকে তাঁর এবং সমীরের জীবন সুতোয় ঝুলবে।
গাড়ি গতি নেওয়ার পরে সমীরের দিকে তাকিয়ে পাঞ্চালী বললেন, “তুমি কি নিশ্চিত, ও-ই ডক্টর ডেভিল? ওই ডক্টরের মুখ তো তুমি দেখনি।”
সমীর একটা বিষণ্ণ হাসি হেসে বলল, “মুখ দেখিনি তো কী হয়েছে। ওই চেহারাটাকে আমি ভুলব না। খুব কাছ থেকে অনেক দিন দেখেছি। ওর অপারেশনে সাহায্য করেছি। ওই চেহারা মরার আগে পর্যন্ত আমার মনে থেকে যাবে।”
পাঞ্চালীর মুখ ক্রমে গম্ভীর হয়ে আসছে। এত বড় বিপদে তিনি আগে পড়েননি। হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে পাঞ্চালীর হৃৎস্পন্দন প্রয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। ফোনটা করেছেন শ্রুতি। কী বলবেন, ভেবে নিয়ে ফোনটা তুললেন তিনি।
“কী অবস্থা ছেলেটার? ও কি সুস্থ হয়েছে? এক বার উপরে নিয়ে আসুন, আমি পরীক্ষা করে দেখি,” শ্রুতির গলায় উদ্বেগের সুর।
নিজেকে একটু সামলে পাঞ্চালী বললেন, “ছেলেটার হঠাৎ করে নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছে। আসলে খুব চাপের মধ্যে আছে তো। আমি ওকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছি। আপনার সঙ্গে পরে কথা বলে নেব।” দ্রুত ফোনটা কেটে দিলেন পাঞ্চালী। তাঁর হাত রীতিমতো কাঁপছে।
দু’জনেই বুঝে গেলেন, কার মনে কী চলছে! ডক্টর ডেভিলের মুখোশ অবশেষে খুলে গিয়েছে। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসেছে শয়তানের দূত।
পাঞ্চালী আর দেরি করলেন না। পরের ফোনটা করলেন রুদ্রাণীকে। “তুই বান্দ্রার কাছে আমার ফ্ল্যাটটা চিনিস তো? ওখানে চলে আয়। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। ফোনে বলা যাবে না। তুই দেরি করিস না।”
ফোনটা নামিয়ে রেখে বাতানুকূল গাড়ির মধ্যেও ঘামতে লাগলেন পাঞ্চালী। সমীর তত ক্ষণে হাল ছেড়ে গাড়ির সিটে শরীর এলিয়ে দিয়েছে। সে বুঝে গিয়েছে, পাঞ্চালীও ফাঁদে জড়িয়ে গিয়েছেন। বেঁচে থাকার আশা ছেড়েই দিল সমীর।
সমীরকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ঢোকার মিনিট দশেকের মধ্যেই সেখানে চলে এল রুদ্রাণী। আর তার পরে পুরো ঘটনাটা শুনে নিল পাঞ্চালীর মুখে।
তিন জনেই অল্প সময় থম মেরে বসে রইল। তার পরে সমীরের দিকে ফিরে রুদ্রাণী বলল, “তুমি কি জানো এই মেয়েগুলোকে কোথায় আটকে রাখে?”
সমীর মাথা নাড়ল, “না ম্যাডাম। এদের নানা জায়গায় আছে। কখনও পতিতালয়ে রেখে দেয়, কখনও রাখে মুম্বইয়ের নানা বাড়িতে। এদের চেন অনেক লম্বা।”
রুদ্রাণী চুপ করে রইল। তার পরে শেষ চেষ্টা হিসেবে অজন্তার ছবিটা দেখাল সমীরকে। কিন্তু ছেলেটা কিছুই বলতে পারল না।
পাঞ্চালীর দিকে ফিরে রুদ্রাণী প্রশ্ন করল, “তা হলে এখন কী করবে? পুলিশের কাছে যাবে?”
পাঞ্চালী একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন, “পুলিশের কাছে গিয়ে বিশেষ লাভ হবে না। সমীর তো ওই ডক্টরের মুখই দেখেনি। আমরা বুঝে গিয়েছি, শ্রুতি শিণ্ডে আর ডক্টর ডেভিল একই লোক। কিন্তু আইন বুঝবে না। কোনও প্রমাণই আমাদের হাতে নেই। এই ঠুনকো অভিযোগের ভিত্তিতে শ্রুতি শিণ্ডের মতো ক্ষমতাশালী মানুষকে পুলিশ ঘাঁটাবে না।”
রুদ্রাণীও বুঝল, পাঞ্চালী ঠিক কথাই বলছেন।
একটু ভেবে রুদ্রাণী বলল, “আমার এক বন্ধু আছে সিবিআইয়ে। ওকে সব জানাতে পারি। দেখা যাক, বেসরকারি ভাবেও ও কোনও-রকম সাহায্য করতে পারে কি না।”
তার পরেই একটা কথা মনে পড়ল রুদ্রাণীর। “কিন্তু সমীরকে নিয়ে কী করবে? মাথায় রেখো, তোমাদের দু’জনের সামনেই কিন্তু এখন বড় বিপদ।”
পাঞ্চালী বুঝতে পেরেছিলেন ব্যাপারটার গুরুত্ব। কিন্তু সমীরকে ছেড়ে দেবেন কী করে! রুদ্রাণী একটু ভেবে বলল, “সমীরের সামনে দু’টো রাস্তা। এক, পুলিশের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করা। যা জানে সব বলে দেওয়া। শ্রুতিকে কিছু না করলেও পুলিশ সমীরকে গ্রেফতার করে নেবে। তার পরে পুলিশ কাস্টডি বা জুডিশিয়াল কাস্টডি হবে। দুই, চুপচাপ নিজের বাড়ি ফিরে যাওয়া। সে ক্ষেত্রে কোনও কথাই আর বলা যাবে না।”
দু’জনেই তাকাল সমীরের দিকে। ছেলেটা একটু বিব্রত বোধ করছিল। তার পরে বলল, “আমি বাড়িই ফিরে যাব। পুলিশকে বিশ্বাস করি না। ওদের হাতে পড়লে মরেও যেতে পারি।”
রুদ্রাণীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে পাঞ্চালী বললেন, “আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি এখন পাশের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করো। এখানে তুমি নিরাপদে থাকবে। আমরা তোমার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেব।” সমীরকে ডেকে গেস্টরুমের দরজাটা খুলে দিলেন পাঞ্চালী।
রুদ্রাণী কিছু একটা ভাবছিল। পাঞ্চালী ফিরতেই বলল, “তোমার এখানে ওকে দু’টো দিন কি রাখা যাবে? এখনই বাইরে বার করতে চাইছি না। তত ক্ষণে আমি এক বার আমার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে দেখি।”
“ঠিক আছে, সমস্যা হবে না। আমি এখন একাই আছি। হাজব্যান্ড টুরে বাইরে গিয়েছে। আমাদের সংস্থার দু’জন খুব বিশ্বাসী ছেলেকে আমি বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসব। দিন দুয়েক সামলে দিতে পারব বলে মনে হয়।”
রুদ্রাণী উঠে পড়ল। তাকে এখনই সূর্যের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
.
পাঞ্চালীর ফ্ল্যাট থেকে রুদ্রাণী বেরিয়ে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক পরে মুম্বইয়ের ওই বিলাসবহুল বাংলোর ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়েছিল লোকটা। তার আর বসার সাহস হয়নি। ইটালিয়ান লেদারের বহুমূল্য একটা সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বস ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইল বক্তার দিকে। মোটামুটি দশ মিনিট সময় নিয়ে সে পুরো ঘটনাটা বলেছে বসকে। এ বার নির্দেশের অপেক্ষা।
বস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যত সব উটকো ঝামেলা। তার পরে বলল, “এই দু’টো মেয়েকে নিয়েই গণ্ডগোলটা হচ্ছে দেখছি। ওই নেপালি মেয়েটা আর এই বাঙালি মেয়েটা। নেপালিটা তো গিয়েছে। বাঙালিটাকে হারালে চলবে না।”
লোকটা মুখ নামিয়ে পরের কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করে রইল।
“এই সমীর ছেলেটা বাঁচল কী করে?”
“ওকে গুলি করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ এসে যাওয়ায় আর লাশটা দেখা হয়নি। ছেলেটা কোনওভাবে বেঁচে গিয়েছে।”
বস সেন্টার টেবিল থেকে কিউবান সিগারটা তুলে নিল। সে সৌখিন মানুষ। দামি হাতির দাঁতের অ্যাস্ট্রেটা তার সৌখিনতার নিদর্শন। সিগারে একটা টান দিয়ে বস নির্দেশটা দিল, “আমরা একটা খুব বড় ডিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এই সময় সামান্য ঝুঁকিও নেওয়া যাবে না।” একটু থামল বস। তার পরে কথাটা শেষ করল, “শ্রুতি শিণ্ডের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। ও আমাদের কাছে এখন লায়াবিলিটি। অনেক খবর জানে। আমাকেও চেনে। পুলিশের হাতে পড়তে দেওয়া যাবে না। ব্যাড লাক। ওকে সরিয়ে দাও। দ্রুত।”
লোকটা মাথা নেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরল। পিছন থেকে বস বলে উঠল, “ওই বাঙালি মেয়েটাকে নিয়ে কোনও ঝুঁকি নেওয়া চলবে না। ওকে যে- ফাঁদে ফেলেছিল, পুলিশ তার হদিশ পেয়ে যেতে পারে। ওই ছেলেটাকেও যেন আর দেখা না যায় কোনওদিন। আর সমীরকেও। তবে সবার আগে শ্রুতি। বাকিরা পরে।”
অন্যান্য দিনের মতোই তাঁর সি ক্লাস মার্সিডিজের পিছনের সিটে বসে ছিলেন শ্রুতি শিণ্ডে। তাঁর মনে ঝড় চলছে। বসের সঙ্গে এখনও কথা হয়নি। একটু ব্যাপারটা সামলে ওদিকে গেলে ভাল হয়। যে-করে হোক সমীরকে আগে সরাতে হবে। কাজটা নিয়ে অবশ্য খুব একটা চিন্তায় ছিলেন না শ্রুতি। কোথায় আর পালাবে। এ বার ঠিক খুঁজে বার করব। তবে এ বার পাঞ্চালীও জড়িয়ে পড়েছে। ওটা একটা বড় চিন্তা।
রাত দশটা বেজে গিয়েছে। ওয়েস্টার্ন এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যথেষ্ট দ্রুতগতিতে যাচ্ছিল শ্রুতির গাড়িটা। কিন্তু হঠাৎ ড্রাইভারকে গতি কমাতে হল। সামনে একটা গাড়ি এসে গিয়েছে। কিছুতেই জায়গা দিচ্ছে না ওভারটেক করার। নিজেও গতি বাড়াচ্ছে না। বিরক্ত ড্রাইভার বার কয়েক হর্ন দিল। কেউই খেয়াল করল না পিছন থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে আসছে একটা ট্রাক। শেষ মুহূর্তে শ্রুতি যখন মাথা ঘোরালেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। বিকট শব্দে ট্রাকটা আছড়ে পড়ল মার্সিডিজের পিছনে। জার্মান কোম্পানির গাড়ির নিরাপত্তা খুবই ভাল। চার দিকে এয়ারব্যাগ আছে। জোরালো ধাক্কাও মোটামুটি সামলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু যে-দানবাকৃতি ট্রাকটা এসে ভয়ঙ্কর জোরে ধাক্কা মারল মার্সিডিজের পিছনে, তাকে সামলানোর ক্ষমতা গাড়িটার ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে খেলনা গাড়ির মতো তুবড়ে গেল মার্সিডিজের পিছনের অংশটা। ধাক্কার চোটে আছড়ে পড়ল বাঁ দিকে। পর মুহূর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল গাড়িটা। সামনের গাড়িটা তত ক্ষণে থেমে গিয়েছে। সেখান থেকে দু’টো লোক বেরিয়ে এসে মার্সিডিজটার সামনে দাঁড়াল। গাড়িটা তত ক্ষণে অনেকটাই ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে। নিশ্চিন্ত হয়ে দু’জনে গিয়ে উঠল সামনের গাড়িটায়। দ্রুত সেটা মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। পিছনের ট্রাকটা অবশ্য দাঁড়িয়েই ছিল। ড্রাইভার আর কী করবে। তার তো ব্রেকফেল হয়ে গিয়েছে! মেকানিক্যাল এরর। হিউম্যান এরর নয়। দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে।
সি ক্লাস মার্সিডিজের ভিতরে তখন দাউদাউ করে জ্বলছে ডক্টর ডেভিলের শরীর!
.
প্যারিস। মুম্বই দুর্ঘটনার বারো ঘণ্টা পরে। ভোর সাড়ে ছ’টা।
শিকাগো থেকে ইউরোপ ঘুরতে এসেছে মার্ফি পরিবার। আগের দিন রাতেই তারা প্যারিসে এসে পৌঁছছে। ভোর ছ’টাতেই উঠে পড়েছেন মিস্টার, মিসেস মার্ফি এবং তাঁদের ১২ বছরের ছেলে। এই অ্যাপার্টমেন্টটা ভাড়া নিয়েছেন তাঁরা। কয়েক দিন প্যারিসেই থাকার ইচ্ছে। ঘুম থেকে উঠেই মিসেস মার্ফি ব্রেকফাস্ট তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মিস্টার মার্ফি মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগলেন, ওয়াই ফাই-টা ঠিকঠাক কাজ করছে কি না।
তখনই বিস্ফোরণটা ঘটল।
এত জোরালো বিস্ফোরণ যে-তাঁদের অ্যাপার্টমেন্টের কাঁচের জানলাটাও ভেঙে চৌচির হয়ে গেল। মিসেস মার্ফি এবং বাচ্চাটার চিৎকারে মিস্টার মার্ফি বুঝতে পারলেন, তাঁরা এখনও বেঁচে আছেন। স্ত্রী এবং বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে মিস্টার মার্ফি জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন।
প্যারিসের আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছে। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মিস্টার মার্ফি কোনও মতে বলতে পারলেন, “মনে হচ্ছে টেররিস্ট অ্যাটাক হয়েছে।”
না, জঙ্গিহানা হয়নি সে দিন। ধীরে ধীরে জানা গেল, ঘটনাটা কী। মার্ফিদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে একটু দূরে রয়েছে আরও একটা বড় বিল্ডিং। একটা নামকরা মার্কিন পোশাক কোম্পানির অফিসও রয়েছে সেই বিল্ডিংয়ে। ওই বিল্ডিংয়ের অ্যাপার্টমেন্টও ভাড়া নিয়ে থাকে অনেকে। ওখানকার ভাড়াটা বেশ বেশি। তাই মার্ফি ও দিকটায় যাননি। বিস্ফোরণটা হয়েছে ওই বাড়িটায়। সন্দেহ করা হচ্ছে, গ্যাস লিক থেকে হতে পারে।
আরও পরে জানা গেল, প্রায় ৩০ জন জখম হয়েছে বিস্ফোরণে। জনা দশেকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আর চার জন গুরুতর ভাবে জখম। তাদের শরীরটা নাকি ভীষণ ভাবে পুড়ে গিয়েছে।
বেলা গড়াতে লাগল। আরও খবর আসতে লাগল। তার পরে শেষ খবরটা এল। চার জন অগ্নিদগ্ধ মানুষের মধ্যে এক জনের নাম— ক্যাটরিনা গ্রোপিয়াস।
বিখ্যাত হলিউড প্রোডিউসার ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াসের মেয়ে!
(তৃতীয় পর্ব সমাপ্ত)
