১৫. অন্তর্দ্বন্দ্ব
লস অ্যাঞ্জেলেস-মুম্বই, ২০২৩
নিজের স্টুডিয়োর সুবিশাল কেবিনে বসে ডাক্তারের রিপোর্টটায় চোখ বোলাচ্ছিলেন কার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস।
ভারত থেকে তাঁর কাছে একটা স্যাম্পল এসে পৌঁছেছে। অবশ্যই তিনি নিজে কিছু দেখেননি। দেখলেও তাঁর কিছু বোঝার ক্ষমতা ছিল না। তাঁর নিজস্ব ডক্টরদের টিম আছে। এ ছাড়া আছে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট টিম। তাদের সম্প্রতি একটা নির্দেশ দিয়েছেন গ্রোপিয়ান। বৈধ ভাবে স্কিন অ্যান্ড কসমেটিক প্রোডাক্টের ব্যবসা কতটা লাভজনক হতে পারে, তা খতিয়ে দেখে রিপোর্ট দিতে।
ভারত থেকে আসা স্কিন স্যাম্পল এবং যার শরীর থেকে ওই চামড়ার টুকরোটা এসেছে, তার মেডিক্যাল রিপোর্ট চলে গিয়েছিল তাঁর টিমের কাছে। দিন দুয়েক আগে পাঠানো ওই স্যাম্পল পরীক্ষা করে দেখে রিপোর্ট পাঠিয়েছে মেডিক্যাল টিম। শুধু স্কিনের রিপোর্টই নয়, আছে ব্লাড রিপোর্টও।
গ্রোপিয়াসের টিমের যে-ডক্টর ভারত থেকে আসা অজন্তার ব্লাড রিপোর্টটা দেখেছিলেন, তিনি আর দেরি না-করে তড়িঘড়ি সেটা পাঠিয়ে দিয়েছেন তাঁর বসের কাছে। এই রিপোর্টটা যে-তাঁর বসকে ভীষণই আগ্রহী করে তুলবে, সেটা বুঝে গিয়েছিলেন ওই ডক্টর।
সত্যিই তাই হল। ওই বিশেষ রিপোর্টটা গ্রোপিয়াসের যাবতীয় মনোযোগ কেড়ে নিল। রিপোর্টটায় শুধু একটা কথাই লেখা ছিল। অজন্তার ব্লাড গ্রুপ। এবি নেগেটিভ।
বিশ্বের সব চেয়ে দুর্লভ ব্লাড গ্রুপ এই এবি নেগেটিভ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই গ্রুপের রক্তবহনকারী মানুষের সংখ্যা ০.৬ শতাংশেরও কম। সারা বিশ্বে এই ধরনের মানুষ হয়তো এক-দেড় শতাংশ হবে। গ্রোপিয়াস মেডিক্যাল লাইনের লোক নন। কিন্তু এই ব্লাড গ্রুপটা সম্পর্কে তিনি দু’টো তথ্য জানেন। এক, যাদের এই গ্রুপের রক্ত, তারা শুধু ‘আরএইচ নেগেটিভ’ রক্তই শরীরে নিতে পারবে। যেমন, এবি নেগেটিভ, ও নেগেটিভ, এ নেগেটিভ, বি নেগেটিভ। এই সব গ্রুপ মিলিয়ে যোগ করলে আমেরিকায় সংখ্যাটা ১৮ শতাংশও হবে না। এই গ্রুপের রক্তকে তাই দুর্লভ বলে চিহ্নিত করা যায়।
দুই, ‘এবি নেগেটিভ’ রক্তবহনকারীরা যে-কোনও ব্লাড গ্রুপের মানুষকে প্লেটেলেটস এবং প্লাসমা দিতে পারবে। যদিও ‘এবি নেগেটিভ’ রক্তধারী অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের থেকে প্লাসমা নেওয়া হয় না। কারণ, অন্তঃসত্ত্বা থাকাকালীন মহিলাদের শরীরে এমন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা অন্যের শরীরে গেলে ক্ষতিসাধন করতে পারে। ‘এবি নেগেটিভ’ ডোনারদের চাহিদা খুবই বেশি মেডিক্যাল জগতে।
বিশেষ একটা কারণে গ্রোপিয়াসকে এই তথ্যগুলো জানতে হয়েছিল। শুধু জানাই নয়, রীতিমতো মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছেন তিনি।
রিপোর্টটা একপাশে সরিয়ে রেখে ডেস্ক থেকে ফোনটা তুলে পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টকে ধরলেন গ্রোপিয়াস। “ডক্টর ম্যাথুসকে ফোনে ধরে দাও।”
তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে গ্রোপিয়াসের টেবিলের ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা তুলে সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এলেন গ্ৰোপিয়াস-
“আপনার রিপোর্টটা আমি পড়লাম। খুবই ইন্টারেস্টিং।”
“হ্যাঁ স্যার, আমার চোখে পড়তেই তাড়াতাড়ি আপনাকে পাঠিয়ে দিলাম,” বসকে খুশি করতে পেরে রীতিমতো আপ্লুত ডক্টর ম্যাথুস।
গ্রোপিয়াস পরের প্রশ্নটা করলেন। “আপনি স্কিন ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করার ব্যাপারে কী জানেন? এক জনের চামড়া আর এক জনের শরীরে লাগালে কী সমস্যা হতে পারে? সেখানে ব্লাড গ্রুপ ম্যাচিং কতটা জরুরি?”
ডক্টর সামান্য সময় ভাবলেন। তার পরে বললেন, “স্কিন হল আমাদের শরীরের সব চেয়ে বড় অর্গ্যান। আর অর্গ্যান ট্র্যান্সপ্লান্টের ক্ষেত্রে ব্লাড গ্রুপ ম্যাচিংয়ের চেয়েও আরও একটা ব্যাপার জরুরি হয়ে পড়ে। এইচ এল এ ম্যাচিং।”
এইচ এল এ। হিউম্যান লিউকোসাইট অ্যান্টিজেনস। মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষে দু’শোরও বেশি ‘এইচ এল এ’ মার্কার আছে। বলা যেতে পারে, এরা সবাই শরীরে সৈন্যের কাজ করে। আর এদের মধ্যে এমন ছ’টি মার্কার আছে, যারা হল আসল কমান্ডো। এই ছয় মার্কারের নাম- এ, বি, সি, ডিআর, ডিপি এবং ডিকিউ। এই ছয় কমান্ডোর কাজ হল শরীর জুড়ে পাহারাদারি চালানো। আর যখনই কোনও বিদেশি কোষের সন্ধান পায় তারা, সেই কোষকে মেরে দেয়। এই ভাবেই শরীরকে বিদেশি শত্রুর হানা থেকে বাঁচিয়ে চলে ছয় মার্কার। শত্রুর সন্ধান এরা খুব সহজেই পেয়ে যায়। যদি এরা দেখে কোনও কোষের এইচ এল এ মাকারের সঙ্গে তাদের মার্কার মিলছে না, তখনই হামলা চালানো হয়। শত্রু নিকেশ না-করে শান্ত হয় না এরা। শত্রু নিধনের ক্ষেত্রে শরীর যে-শ্বেতকণিকা কাজে লাগায় তার নাম টি-সেলস।
সমস্যাটা বাধে যখন এই কমান্ডোরা শরীরের প্রয়োজনীয় কোষকেও মেরে দিতে থাকে। অটো ইউমিউন ডিজিজ যে-কারণে হয়। একই ভাবে যখন এক জনের অর্গ্যান অন্য এক জনের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়, তখন ‘এইচ এল এ’ ম্যাচিংটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। না হলে ওই ছয় মার্কারের হাতে নতুন অর্গ্যান ‘খুন’ হয়ে যাবে। অর্গ্যান ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট তখনই নিখুঁত ভাবে কাজ করবে, যখন ব্লাড গ্রুপের সঙ্গে ‘এইচ এল এ’ ম্যাচিংও ঠিকঠাক হবে।
চুপ করে ডক্টর ম্যাথুসের ব্যাখ্যাটা শুনে যাচ্ছিলেন গ্রোপিয়াস। এ বার প্রশ্ন করলেন, “চামড়া প্রতিস্থাপন করলেও কি একই সমস্যা হতে পারে?”
“চামড়া কয়েক রকম পদ্ধতিতে ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে শুধু উপরের আস্তরণটা তুলে নেওয়া হয়, যাকে বলে এপিডারমিস। এই আস্তরণের সঙ্গে শিরা-উপশিরার কোনও সংযোগ নেই। যার ফলে রক্ত এখানে সঞ্চালিত হয় না। এই ধরনের ক্ষেত্রে ব্লাড ম্যাচিং বা অন্য ম্যাচিংয়ের সে-রকম প্রয়োজন হয় না। কিন্তু…,” ম্যাথুস থেমে গেলেন।
“কিন্তু কী?” একটু অধৈর্য হয়ে উঠলেন গ্রোপিয়াস।
ম্যাথুস তাড়াতাড়ি বলতে লাগলেন, “আর এক ধরনের স্কিন ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট হয়, যাকে বলে ফুল থিকনেস স্কিন গ্রাফ্টিং। এখানে এপিডারমিস এবং চামড়ার পরের স্তর ডারমিসও তুলে আনা হয়। তার পরে প্রতিস্থাপন করা হয় অন্য এক জনের শরীরে। যার শরীরের ওই জায়গার চামড়াটা পুরো নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ডারমিসের সঙ্গে রক্ত সরবরাহকারী শিরা-উপশিরার সংযোগ আছে। নতুন ডারমিসে যখন রক্ত সরবরাহ হতে থাকে, তখনই সমস্যা শুরু হয়ে যায়। তাই এ ক্ষেত্রে ম্যাচিংটা খুব দরকার।”
“আর ম্যাচিং যদি না হয়?” ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করলেন গ্রোপিয়াস।
ফোনের উল্টো দিকে এক বার ঢোক গিলে ম্যাথুস জবাব দিলেন, “সে ক্ষেত্রে ইমিউনোসাপ্রেসান্ট ড্রাগের ব্যবহারটা জরুরি হয়ে পড়ে। শরীরের ইমিউনিটি কমিয়ে বাইরে থেকে আনা অর্গ্যানটাকে বাঁচার সুযোগ করে দেওয়া হয়।” ম্যাথুস ঠিক বুঝতে পারছিলেন না, কেন গ্রোপিয়াস এত প্রশ্ন করছেন অর্গ্যান ট্র্যান্সপ্লান্ট নিয়ে। কোনও বড় সমস্যা হয়ে গেল না কি?
গ্রোপিয়াসের গলা ভেসে এল ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে, “ঠিক আছে। এতেই চলবে। পরে প্রয়োজন হলে যোগাযোগ করব।”
ডক্টর ম্যাথুস ফোনটা নামিয়ে রাখতে যাচ্ছিলেন। তখনই গ্রোপিয়াসের শেষ প্রশ্নটা কানে এল-
“কোনও এবি নেগেটিভ ডোনার আমাদের হাতে থাকলে কি ভাল হয়?”
একটু চমকে উঠলেন ডক্টর। বসের মাথায় কী চলছে, ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। একটু সতর্ক ভাবেই জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, সে-রকম ডোনার থাকলে তো খুবই ভাল হয়। সারা পৃথিবী খুঁজলে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ পাওয়া যাবে যাদের শরীরে এই গ্রুপের রক্ত আছে। এই রকম রক্ত দিয়ে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো যায়। মেডিক্যাল সায়েন্সের অগ্রগতির পক্ষে যে-সব পরীক্ষা বেশ জরুরি।”
“ঠিক আছে,” বলে ফোনটা রেখে দিলেন গ্রোপিয়াস। তার পরে আবার রিপোর্টটা তুলে দেখলেন।
এ বার তাঁর হাতে রয়েছে চামড়ার রিপোর্টটা। মেডিক্যাল জার্গনের বাইরে গিয়ে যতটা যা বুঝলেন, তাতে একটা ব্যাপার স্পষ্ট। এই চামড়ার নমুনাটা অতি উৎকৃষ্ট। অ্যালোডার্ম বা অন্যান্য স্কিন সংক্রান্ত প্রোডাক্ট বানানোর ক্ষেত্রে খুবই কাজে লাগবে। বিশেষ করে পশ্চিমী দুনিয়ায়। কারণ শ্বেতাঙ্গদের চামড়ার রং আর টেক্সচারের সঙ্গে এই চামড়ার মিলটা খুবই বেশি।
চামড়া প্লাস রক্ত। গ্রোপিয়াস ভাবতে লাগলেন।
.
দিন দুয়েক পরে ফোনটা যখন গ্রোপিয়াস করলেন, স্থানীয় সময় সকাল এগারোটা। ভারতীয় সময় তখন রাত সাড়ে বারোটা। বস সবে শরীরটা এলিয়ে দিয়েছিলেন বিছানায়। এই সময় তাঁর খুবই ব্যক্তিগত মোবাইলটা বেজে উঠল। এই নম্বরটা খুব কম লোকের কাছেই আছে। তার স্ত্রী। তার সন্তান। ভারতে চালায় এমন কয়েক জন লোক। এবং, বিদেশে তার খুব গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্যাক্ট।
নম্বরটা দেখে বুঝে নিলেন ফোনটা আসছে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে। আর ফোনের ও পারে কে আছে। এই ফোনটা না ধরে উপায় নেই। বস মোবাইলটা কানে তুললেন-
“হ্যাললো, মিস্টার গ্রোপিয়াস। গুড মর্নিং। আমাদের এখানে অবশ্য মাঝরাত।”
এত রাতে ফোন করতে হয়েছে বলে গ্রোপিয়াসের কোনও অনুশোচনা হয়েছে বলে মনে হল না। তাঁর হয়ও না। ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এলেন, “আপনি যে-স্যাম্পল আমাকে পাঠিয়েছেন, সেটা আমার টিম দেখেছে। আই অ্যাম ইন্টারেস্টেড ইন দিস ভেনচার। তবে দু’টো ব্যাপার আছে।”
“বলুন কী ব্যাপার,” বস খুশিই হল। গ্রোপিয়াসের অর্থ আর কানেকশনটা পেলে তার ব্যবসা এক লাফে অনেকটাই এগিয়ে যাবে।
“আপনাদের সঙ্গে পুরোমাত্রায় যুক্ত হওয়ার আগে আমার দু’টো শর্ত আছে। প্রথমটা হল, এই রকম চামড়াই আমার চাই। এই বিশেষ ব্যবস্থার জন্য আপনার যা লাগবে, আমি দিয়ে দেব। আর একটা ব্যাপার মাথায় রাখবেন। এই মেয়েটার ব্লাড গ্রুপ খুব দুর্লভ। সেটা আপনাদের রিপোর্টেই আছে। আমার এই বিশেষ ব্লাড গ্রুপের মানুষ আরও প্রয়োজন হতে পারে।”
গ্রোপিয়াসের আগ্রহ দেখে বস খুশিই হল। তবে গ্রোপিয়াসের চেয়েও বেশি খুশি হলেন ডক্টর ডেভিলের উপরে। সত্যিই, একটা ভাল স্পেসিমেন জোগাড় করেছে এ বার। যে মেয়েটা হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে, তার থেকেও ভাল।
“আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মিস্টার গ্রোপিয়াস। একটা কমবয়সি মেয়ের চামড়া আপনাকে পাঠানো হয়েছে। ১৬-১৭ বছর বয়স হবে। এই মেয়েটাকে আমরা আলাদা করে রেখে দিয়েছি। আপনি ভবিষ্যতে যে-ভাবে চান, ব্যবহার করতে পারেন। সমস্যা হবে না।”
গ্রোপিয়াসের প্রতিক্রিয়া শোনার অপেক্ষায় একটু চুপ করে রইল বস। উল্টো দিক থেকে কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে বলে উঠল, “আর দ্বিতীয় ব্যাপারটা কী?”
“আমার কয়েক জন লোক ভারতে যাবে। তারা সব খতিয়ে দেখবে। তাদের কিছু জানার আছে, সেগুলো জানবে। নিরাপত্তার ব্যাপারটাও দেখা হবে।”
“সে তো খুব ভাল। কবে আসবে, আমাদের জানিয়ে দেবেন।”
“আরও মাস দুয়েক সময় লাগবে ব্যাপারটা গুছিয়ে নিতে। তার পরে যাবে।”
“নো প্রবলেম, মিস্টার গ্রোপিয়াস। ওয়েলকাম টু আওয়ার ওয়ার্ল্ড।”
“নট সো ফাস্ট মিস্টার…। আমি কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনেক কিছুই খতিয়ে দেখি। আর যেগুলো বললাম, সে সব মাথায় রাখবেন।”
“ডু নট ওয়ারি, স্যার। আপনি যা চাইছেন, পেয়ে যাবেন।”
ফোনটা নামিয়ে রেখে বস একটু ভাবল। মেয়েটার চামড়াই শুধু নয়, ব্লাড গ্রুপও দেখা যাচ্ছে খুবই আকর্ষণীয়। তবে সেটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে। তার আগে আর একটা ফোন করা জরুরি। ওই মেয়েটার যত্নআত্যি বাড়িয়ে দিতে হবে। কোনও ভাবেই যেন কোনও ক্ষতি না হয়!
.
গ্রোপিয়াসও ফোনটা নামিয়ে রেখে একটু ভাবলেন। ভারতে একটা টিম পাঠানো দরকার। তার আগে আরও একটু রিসার্চ করতে হবে তাঁর টিমকে। স্কিন প্রোডাক্টের মার্কেটটা দেখে নিতে হবে। সব কিছু ঠিকঠাক চললে তার আর অ্যান্ড ডি’ টিমের কয়েক জনকে ভারতে পাঠাবেন। ‘র মেটেরিয়াল’-এর ব্যাপারটা দেখে আসা দরকার। একই সঙ্গে কোন রুটে কী আসবে, সেটাও জানতে হবে। গ্রোপিয়াস কোনও কাজে ত্রুটি রাখতে চান না।
কিন্তু আর একটা ব্যাপার আছে, যেটা তিনি বেশি দিন ফেলে রাখতে চান না। এই মেয়েটার কথা তার মাথায় ঘুরছে। এর শরীরের চামড়া, রক্ত, টিসু নানা ভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। এ বার তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইলটা তুলে নিলেন এক সময়কার আর্মস ডিলার আর বর্তমানের হলিউড ফিল্ম প্রোডিউসার। “তোমার সঙ্গে এক বার কথা বলা দরকার। আমরা যেখানে দেখা করি, ওখানে চলে এস।”
এক মাত্র এই লোকটার সঙ্গে দেখা করতে হলেই তিনি তার কাছে যান। লোকটাকে ডেকে পাঠান না।
.
যে ক্লাবটায় দ্য পেন্টার বসে ছিল, সেটা এক্সক্লুসিভলি রিজার্ভড ফর দ্য মেম্বার্স। শুধুই সদস্যদের জন্য। আর এই ক্লাবের সদস্যপদ পেতে গেলে সমাজের খুব উঁচু স্তরে বিরাজ করতে হয়। এডওয়ার্ডস বা পেন্টার সমাজের সেই স্তরের মানুষ নয়। কিন্তু সে যার হয়ে কাজ করে, তার হাত অনেক লম্বা। সেই হাত হোয়াইট হাউস পর্যন্ত ছুঁয়ে যায়। ফলে একটা সদস্যপদ জোগাড় করে দিতে কোনও সমস্যা হয়নি।
একটা কোনের টেবিলে বসে ছিল পেন্টার। পাশে বিশাল জানলা। লস অ্যাঞ্জেলেসের আকাশটা দেখা যাচ্ছে সেই জানলা দিয়ে। নীল আকাশ ক্রমে ঢেকে যাচ্ছে কালো মেঘে। কত দিন আকাশের দিকে ভাল ভাবে তাকায়নি পেন্টার। তার কাজটা তাকে ক্রমশ নীচে টেনে নামাচ্ছে। উপরের দিকে তাকানোর সময় কোথায় তার।
নির্দিষ্ট সময়ের আধ ঘণ্টা আগেই সে চলে এসেছিল ক্লাবে। বিশেষ কোনও কারণ যে-ছিল, তা নয়। এইটুকু সময় সে একা নিজের সঙ্গে কাটাতে চাইছিল হয়তো। পেন্টারের মনে পড়ে যাচ্ছিল আর একটা জীবনের কথা। ফেলে আসা একটা জীবন। যে-জীবনে সে পরিচিত ছিল এডওয়ার্ডস নামে।
.
…ইউ এস মেরিন। স্বপ্নের একটা নাম। বাবা ছিলেন মেরিন লেফ্টেন্যন্টকমান্ডার। যে-কারণে ছোটবেলা থেকেই এডওয়ার্ডস একটা স্বপ্নই দেখত। সে-ও ইউ এস নেভিতে যোগ দেবে। একটু বড় হওয়ার পরে স্বপ্নটা আর একটু ডানা মেলল। এডওয়ার্ডসের চোখে তখন নেভি সিলে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন।
ইউ এস নেভি সিল টিমস। যার মানে হল ‘ইউ এস নেভি সি, এয়ার, ল্যান্ড টিমস’। সারা বিশ্বে যার পরিচিতি নেভি সিল বলে। সংক্ষেপে বলা হয়, সিল টিম। ইউ এস ন্যাভাল স্পেশাল কমান্ডের অন্তর্ভুক্ত এই সিল টিম।
নেভি সিলে যোগ দেওয়ার লম্বা রাস্তাটা বেছে নিয়েছিল এডওয়ার্ডস। বাবার মতো নেভিতে যোগ দিয়ে। ১৮ বছর বয়সে সার্ভিসে যোগ দেয় এডওয়ার্ডস। বছর দুয়েক নেভিতে কাজ করার পাশাপাশি সিল ট্রেনিংয়েও অংশ নেওয়া শুরু করে। যেখানে তার শরীর ক্রমশ একটা অস্ত্র হয়ে উঠছিল।
তবে নেভি সিল টিমে যারা যোগ দিতে চায়, তাদের অনেকেই একটা বাঁধার সামনে গিয়ে আটকে যায়। যার নাম বাডস। BUD / S. পুরোটা হচ্ছে, বেসিক আন্ডারওয়াটার ডিমোলিশন/সিল। নামে বেসিক হলে এর মতো কঠিন ট্রেনিং আর পরীক্ষা বোধ হয় খুব কমই আছে। পরীক্ষার্থীকে যেমন চৌখশ রানার হতে হবে, সে-রকম সাঁতারুও হতে হবে। এই দুইয়ের মেলবন্ধন কিন্তু খুব কম মানুষের মধ্যেই হয়। কারণ ভাল সুইমার আর ভাল স্প্রিন্টারের শারীরিক গঠন অনেকটাই আলাদা হয়।
২৪ সপ্তাহের এই ট্রেনিং কোর্সও নিখুঁত ভাবে উৎরে যায় এডওয়ার্ডস। তার নামের পাশে বসে যায় সিল কমান্ডোর তকমা। তার কমান্ডিং অফিসারের নজরেও পড়ে যায় এই তরুণ। এডওয়ার্ডসের গোপন ফাইলে তার নামের পাশে জুড়ে যায়, ‘পটেনশিয়াল লিডারশিপ কোয়ালিটি’র সার্টিফিকেট। অর্থাৎ, যে-লোক একটা দলকে নেতৃত্ব দিতে পারে। টিমের সদস্যদের জন্য নিজেকে বিপদে ফেলতে দু’বার ভাবে না।
বিশ্বের সব চেয়ে বিপজ্জনক মিলিটারি ইউনিটগুলোর একেবারে শীর্ষে থাকে ইউ এস মেরিন। সাপের রক্ত খেয়ে তৃষ্ণা মেটাতেও দ্বিধা করে না মেরিন কমান্ডোরা। সেই মেরিন কমান্ডোদেরও এক ধাপ পিছনে ফেলে দেয় সিল টিমের সদস্যরা। যাদের বলা যেতে পারে ‘দ্য আল্টিমেট ওয়ারিয়র’। চূড়ান্ত যোদ্ধা।
ট্রেনিং পর্ব শেষ করে সিল টিমে যোগ দেওয়ার পরেই এডওয়ার্ডস বুঝিয়ে দিতে থাকে তার দক্ষতা। কমান্ডিং অফিসারদের মেনে নিতে হয়, সিল টিমেও এই ধরনের দক্ষ কমান্ডো খুব কমই দেখা গিয়েছে। এর পরে এডওয়ার্ডসের উত্থান হতে থাকে খুব দ্রুত গতিতে। কেটে যায় দশটা বছর। আর একটার পর একটা অপারেশন।
আর তার পরে আসে সেই অপারেশনটা। অপারেশন রেড উইংস!
.
…স্মৃতির সাগরে তলিয়ে গেলেও এডওয়ার্ডসের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ঠিকই কাজ করছিল। তাই পিছনে যে-একটা লোক এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা বুঝতে তার কোনও সমস্যাই হয়নি। অভ্যাসবশত, টেবিলের উপরে রাখা ডাইনিং নাইফটার হাতলে পাঁচটা আঙুল চেপে বসে গেল এডওয়ার্ডসের। তার পরে ধীরে ধীরে মুঠিটা খুলে সে বলল, “আসুন স্যার, এত জরুরি তলব কেন?”
এডওয়ার্ডস থেকে সে আবার ‘দ্য পেন্টার’ হয়ে গিয়েছে!
উল্টো দিকের চেয়ারে শরীরটাকে এলিয়ে দিলেন গ্রোপিয়াস। তার পরে একটু অপেক্ষা করলেন। পরিচিত ওয়েটার তাঁর পছন্দের পানীয়টা টেবিলে রেখে গেল। এডওয়ার্ডস এ সব কিছুই মুখে তোলে না। সে-ও অপেক্ষা করতে লাগল।
ওয়েটার চলে যাওয়ার পরে পানীয়র গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে পেন্টারের দিকে তাকালেন গ্রোপিয়াস, “তোমাকে এক বার ভারতে যেতে হতে পারে।”
কোনও প্রশ্ন না-করে তাকিয়ে থাকল পেন্টার।
আর একটা চুমুক গ্লাসে। তার পরে গ্রোপিয়াস বললেন, “একটা মেয়েকে গোপনে ভারত থেকে এ দেশে নিয়ে আসতে হতে পারে। এখনই নয়। সময়টা আমি বলে দেব।”
পেন্টার একটু সময় চুপ করে রইল। তার পরে জিজ্ঞেস করল, “টার্গেট সম্পর্কে আর কিছু বলা যাবে?”
গ্রোপিয়াস বলতে লাগলেন, “মেয়েটাকে সম্ভবত কিডন্যাপ করে রাখা হয়েছে ভারতে। ও দেশেরই মেয়ে। আমার কাছে মেয়েটা খুবই মূল্যবান। যে- কারণে মাস খানেকের মধ্যে হয়তো ওকে গোপনে ভারত থেকে আমেরিকায় নিয়ে আসতে হতে পারে। অবশ্যই জোর করে। মেয়েটা নিজের ইচ্ছেয় আসবে না।”
“টার্গেটের বয়স?” সেই ঠান্ডা গলায় প্রশ্নটা এল।
এই ধরনের গলা গ্রোপিয়াস পছন্দই করেন। কোনও আবেগ নেই। ঠিক যেন একটা মেশিন। এই রকম মেশিনই তো দরকার গ্রোপিয়াসের। কিলিং মেশিন।
“১৬-১৭ হবে বোধ হয়। মনে হয় না, তোমার বিশেষ সমস্যা হবে বলে।” পেন্টারের মাথার একটা শিরা দপদপ করতে লাগল।
যন্ত্রণাটা আবার শুরু হয়েছে। অনেক, অনেক দিন পরে।
