১৪. কেউ তো জানে না মনেরই ঠিকানা….
প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড, কলকাতা, ২০২৩
সে দিন নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে আসার পরে অজন্তার মনে হচ্ছিল, মাথার মধ্যে গরম হাতুড়ি দিয়ে কেউ পিটছে। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা তাকে ক্রমাগত রক্তাক্ত করে চলছিল। ছেলেটা তার সঙ্গে এই রকম করল! মিথ্যা বলল!
গত দেড় মাস ধরে ছেলেটার সঙ্গে কথাবার্তা ভালই এগোচ্ছিল অজন্তার। প্রথমে চ্যাট, তার পরে ইনস্টায় ফোন। অবশ্যই বাবা-মা বেরিয়ে গেলে। যখন স্কুল যাওয়ার ব্যাপার থাকে না, তখন। দুপুরে লুকিয়ে নিজের ঘরে বসে। একটা অনাস্বাদিত জগতে পা রাখছিল অজন্তা। তার মনটা যেন কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিল। যে-হারিয়ে যাওয়া জগতের কোনও ঠিকানা ছিল না। ছেলেটার মুখে তার নানা প্রশংসা আর মজার মজার কথা শুনতে শুনতে অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্যে কাটছিল মেয়েটার সময়।
তার পরে একদিন একটা আব্দার করে বসল রাজা।
প্রথম যে-দিন ছেলেটার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, সে দিন সতর্কই ছিল অজন্তা। নিজের সামনে একটা প্রাচীর খাড়া করে রেখেছিল। যে-প্রাচীরের গেট দিয়ে কারও প্রবেশ করার অনুমতি ছিল না। কিন্তু সময় সে-প্রাচীরেও ফাটল তৈরি করে দেয়। অজন্তার মনটা ধীরে ধীরে নরম হতে শুরু করে। সে বুঝতে পারে, ছেলেটা সত্যিই ভাল।
কিন্তু আজ রাজার উপরে মারাত্মক রাগ হচ্ছে অজন্তার। তা হলে কি এত দিন ছেলেটা স্রেফ মজা করছিল তার সঙ্গে? কেন মিনিট পনেরো আগে ওই ফোনটা করল রাজা?
ছেলেটা এখন ভালই জানে, অজন্তার স্কুল ছুটি। বাবা-মা অফিসে বেরিয়ে গিয়েছে। তাই ফোনটা বাজতে মোটেই অবাক হল না। রাজার কাছে এখন অজন্তার মোবাইল নম্বরটাও আছে। তবে মোবাইল নম্বরে ফোন করে না রাজা। করে অ্যাপ মারফত।
মোবাইলটা কানে লাগিয়ে অজন্তা খুব চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী ব্যাপার, এখন ফোন করছ কেন? আমার পড়াশোনা আছে তো, নাকি?” ইচ্ছে করেই একটু রাগী সুরে কথাটা বলেছিল অজন্তা। রাজাকে এই ভাবে শাসন করতে ভালই লাগে তার!
“একটা আব্দার আছে তোমার কাছে, প্লিজ না কোরো না।”
“মানে, কী আব্দার?” একটু অবাকই হয়ে গেল অজন্তা।
উল্টো দিক থেকে ছেলেটা বলে চলল, “এক বার তোমার কমপ্লেক্সের বাইরে আসবে?”
“মানে!” অবাক হওয়ার মাত্রাটা ভীষণই বেড়ে গেল অজন্তার, “বাইরে আসব কেন?”
“আমি তোমার কমপ্লেক্সের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। কলকাতায় এসেছি। কালই ফিরে যাব। যাওয়ার আগে তোমাকে একটু সামনাসামনি দেখতে চাই।”
চমকে উঠল অজন্তা। তার সঙ্গে দেখা করতে সেই মুম্বই থেকে কলকাতায় চলে এসেছে রাজা। সত্যিই অবাক হয়ে গেল মেয়েটা। একটা অদ্ভুত ভাললাগায় মনটা ভরে গেল। কিন্তু সহজে গলে গেলে হবে না। অজন্তা তাই যতটা সম্ভব উত্তেজনা চেপে রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, “তোমার মাথাটা গিয়েছে। প্রথমত, আমার সঙ্গে মজা করছ। আর তুমি যদি এসেই থাকো, তা হলেও আমি যাব কেন দেখা করতে?”
উল্টো দিকে একটু নীরবতা। অজন্তা একটু ঘাবড়ে গেল। তা হলে কি সে একটু বেশি কড়া হয়ে গেল? রাজা কি দুঃখ পেল তার কথায়? কী করবে ভাবতে ভাবতেই আবার শোনা গেল রাজার গলাটা। কাকুতিমিনতি ঝরে পড়ছে কণ্ঠস্বরে, “এক বার এসো প্লিজ। শুধু তোমাকে দেখব। আর কিছু না। এত দূর থেকে এসেছি শুধু তোমাকে এক বার সামনে থেকে দেখব বলে। দু’দিন ধরে ভেবেছি, তোমাকে ফোন করে কথাটা বলব। কিন্তু সাহস পাইনি। আনোয়ার শাহ রোডের কমপ্লেক্সের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে গিয়েছি। আজ সাহস করে ফোনটা করেই ফেললাম।” রাজা একটু থামল, তার পরে বলল, “হয়তো জীবনে আর তোমার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হবে না। হয়তো মুম্বই ফিরে যাওয়ার পথে ভেঙে পড়বে আমার প্লেনটা! তাই এক বার বাইরে এসো প্লিজ।”
“চুপ করো, বাজে বকার অভ্যাসটা ত্যাগ করো তো,” ঝাঁঝিয়ে উঠল অজন্তা। তার পরে একটু ভেবে বলল, “আচ্ছা, আমি আসছি কমপ্লেক্সের গেটের বাইরে।” রাজাকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ফোনটা কেটে দিল অজন্তা।
বাইরে সে ঠিকই এসেছিল। বেশ কিছুটা সময় অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু চেষ্টা করেও রাজাকে দেখতে পায়নি। এক বার ভাবছিল, ফোনটা করে। কিন্তু রাগে-অপমানে কানটা লাল হয়ে গিয়েছিল তার। উত্তেজিত ভাবে নিজের ঘরে ফিরে এসে মোবাইলটা খাটে ছুড়ে ফেলে মিনিট কয়েক চুপ করে বসে রইল অজন্তা।
ফোনটা বেজে উঠল। রাজা!
ছেলেটার স্পর্ধা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল অজন্তা। এর পরেও তাকে ফোন করার সাহস পায় কী করে! বেজে বেজে থেমে গেল মোবাইলটা। তার পরে আবার, আবার! অজন্তা ফোনটা ধরবে না ঠিক করে রইল। কাজের দিদি বার কয়েক ঘুরে গেল ঘরের সামনে দিয়ে। একটু অবাক চোখে তাকিয়েও থাকল। অজন্তা প্রথমে ব্যাপারটা খেয়াল করেনি। তার পরে বুঝতে পেরে উঠে দুম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তার মাথায় আগুন জ্বলছে।
এই প্রথম সে বোধ হয় মায়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়ল। এবং, রীতিমতো উত্তেজিত ভাবে। মনের মধ্যে যন্ত্রণাটা এতটাই তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল যে, কথা বলতে ভালই লাগছিল না।
রাতে অফিস থেকে ফিরে মা অবাক হয়ে দেখলেন, নিজের ঘরে দরজা আটকে বসে আছে অজন্তা। কাজের দিদির কাছে শুনলেন, অজন্তা ফোন করে প্রাইভেট টিউটরকে পড়াতে আসতে বারণ করে দিয়েছে। ভীষণই অবাক হয়ে গেলেন মা। এই রকম তো কোনও দিন ঘটেনি। শরীর-টরির খারাপ হল নাকি!
মিনিট পাঁচেক দরজা ধাক্কানোর পরে রাগত মুখে দরজা খুলে বেরিয়ে এল অজন্তা। এবং, রীতিমতো ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল, “কী ব্যাপার, এত ধাক্কা দিচ্ছ কেন? আমাকে একটু একা থাকতে দিতে পারো না তোমরা?”
অবাক হয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। এ রকম আচরণ তো তার মেয়ে কখনও করেনি! একটু এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে গেলেন তিনি। এক ঝটকায় মাথাটা সরিয়ে নিয়ে অজন্তা বলে উঠল, “প্লিজ স্টপ দিস। আমাকে একটু একা থাকতে দাও।”
অবাক হয়ে অজন্তার মা বলে উঠলেন, “কী হয়েছে তোর! টিউটরকে আসতে বারণ করেছিস কেন? শরীর ঠিক আছে তো?”
“পড়তে ভাল লাগছিল না, তাই আসতে বারণ করে দিয়েছি। আর মা, আমার বয়স ১৮ হতে চলল! প্লিজ স্টপ কন্ট্রোলিং মাই লাইফ।” মায়ের মুখের ওপর দুম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল অজন্তা। আর তার পরে বিছানায় শুয়ে গুমড়ে গুমড়ে কাঁদতে লাগল। জীবনের প্রথম রঙিন স্বপ্নটা যে-শুরুতেই এই ভাবে ধূসর হয়ে যাবে, মেয়েটা ভাবতেও পারেনি। আঘাতটা তাই খুব বেশি লেগেছে।
ঘরের বাইরে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন মা। তার পরে ধীরে ধীরে সরে এলেন দরজার সামনে থেকে। এই রকম পরিস্থিতির মুখে তাঁকে আগে পড়তে হয়নি। বুঝতে পারছিলেন, কোনও কারণে মেয়েটা ভীষণই ক্ষেপে গিয়েছে। আর ঘাঁটাতে চাইলেন না। একটু মাথা ঠান্ডা হোক, তার পরে কথা বলা যাবে। তবে তার মনের মধ্যে একটা আশঙ্কা দানা বাঁধতে শুরু করল। যতই হোক, মায়ের মন তো!
.
ধর্মতলা চত্ত্বরের একটা সস্তার হোটেলে নিজেদের ঘরে বসে ছিল দু’জন। সামনে রামের দু’টো গ্লাস আর প্লেটে চানাচুর, পেঁয়াজ। এক জন বয়সে বড়। দেখে মনে হবে, মধ্য-তিরিশ। অন্য জনের বয়স অনেক কম। কুড়ি- বাইশের বেশি হবে না। এই ছেলেটা যথেষ্ট লম্বা-চওড়া, ফর্সা। দেখতে খুবই সুন্দর। নায়কোচিত একটা ভাব আছে।
বয়স্ক লোকটা গ্লাসে চুমুক দিয়ে মুখ খুলল, “দেখা না-করে কি ঠিক করলি? মেয়েটা তো এখন ক্ষেপে আছে তোর ওপর। ফোনও ধরছে না। পারবি ওকে তুলতে?”
ছেলেটা ধীরেসুস্থে হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিল। তার পরে একটা ধূর্ত হাসি হেসে জবাব দিল, “কিছু ভেবো না গুরু। প্রথমে একটু ধাক্কা দিতে হয়। তা হলে বরফ আরও তাড়াতাড়ি গলবে। মাছকে দেখোনি কী রকম খেলিয়ে তুলতে হয়! এ সব নিয়ে তুমি কিছু ভেবো না। দু’দিনের মধ্যে ওর সঙ্গে দেখা করছি আমি। মিলিয়ে নিয়ো কথাটা।” গ্লাসটা নামিয়ে রেখে রাজা নামের ছেলেটা কথা শেষ করল, “ব্যাপারটা তুমি এক্সপার্টের হাতে ছেড়ে দাও।”
মধ্য বয়স্ক লোকটা এ বার উঠে দাঁড়াল। তার পরে রাজার দু’টো কাঁধে হাত রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, “মালটাকে দ্রুত তুলতে হবে। না-হলে কিন্তু তোরই চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে বিক্রি করে দেব আমরা।”
