প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৩. সাহায্য প্রার্থনা

৩. সাহায্য প্রার্থনা

মুম্বই, ২০২৩

পরের দিন সকালেই শ্রুতি চলে গেলেন ওই হোমে। তার পরে বিশদ জানলেন ব্যাপারটা।

দশ দিনের ওপর হয়ে গিয়েছে ওই মেয়েটা নিখোঁজ। কিন্তু কেউ পুলিশে কিছু জানায়নি। জ্যোতির কথা স্বাভাবিক ভাবে কাউকে বলেননি শ্রুতি। তিনি কথা বললেন হোমের দায়িত্ব থাকা মহিলার সঙ্গে।

“একটা মেয়েকে দশ দিনের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না, আর আপনারা কিছু করলেন না? পুলিশকে কেন জানানো হয়নি?”

মহিলাটা বুঝে গেল, এখান থেকেই কেউ খবর দিয়েছে শ্রুতি শিণ্ডেকে। তিনি আমতা আমতা করে বলতে লাগলেন, “দিদি, আমাদের এখানে তো অত স্টাফ নেই। সে ভাবে পাহারাও দিতে পারি না। বাচ্চাগুলো তো মাঝেমধ্যে এ দিক-ও দিক পালিয়ে যায়। পুলিশ ভীষণ বিরক্ত হয় এই ভাবে রিপোর্ট লেখাতে গেলে। ঝামেলা করে। কী করব বলুন!”

শ্রুতি বুঝলেন, মহিলা ভুল কিছু বলছেন না। শুধু এই হোম কেন, মুম্বইয়ের অনেক জায়গা থেকেই এই ভাবে উদ্ধার হয়ে আসা বাচ্চারা হারিয়ে যায়। কেউ আর তাদের খোঁজ পায় না।

শ্রুতি টের পেয়েছিলেন, কোন বাচ্চাটা হারিয়ে গিয়েছে। এই মেয়েটাকে তাঁর খুবই পছন্দ ছিল। ফুটফুটে একটা বাচ্চা। দেখতে বেশ সুন্দর, ফর্সা রং। মাস চারেক হল এই হোমে এসেছে। বাড়ির কথা কিছুই বলতে পারেনি। পুলিশ তাদের ওয়েবসাইটে মিসিং পার্সন তালিকায় মেয়েটার ছবি তুলে দিয়েই খালাস। মেয়েটার বাড়ির খবর আদৌ পাওয়া যাবে কি না, কে জানে।

কিন্তু কিছু তো একটা করতেই হবে। এই ভাবে বাচ্চাটার হারিয়ে যাওয়া তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। বিশেষ করে যেখানে তিনি জড়িয়ে আছেন।

হোমের দায়িত্বে থাকা মহিলাটিকে নিয়ে শ্রুতি থানায় গেলেন রিপোর্ট লেখাতে। পুলিশ রিপোর্ট লিখে নেওয়ার পরে প্রথাগত ভাবে জানিয়ে দিল, যা করার তারা করবে। কিন্তু সে দিন রাতে বাড়ি ফিরে শ্রুতির মনে হল, পুলিশের উপরে শুধু নির্ভর করে থাকলে হবে না। তাঁকে অন্য রাস্তাও খুঁজতে হবে। অন্য কারও সাহায্য নিতে হবে।

আর তখনই আবার মনে পড়ে গেল নামটা। পাঞ্চালী রায়। সামান্য সময় ভেবে নিয়ে পাঞ্চালীর নম্বরটা বার করলেন শ্রুতি। ভাগ্যিস, সে দিন রেখে দিয়েছিলেন। না-হলে আরও সময় নষ্ট হত পাঞ্চালীকে খুঁজে বার করতে।

“আরে ম্যাডাম বলুন। কোনও খবর আছে নাকি?” শ্রুতির ফোনটা পেয়ে একটু আশান্বিত হয়ে উঠলেন পাঞ্চালী। যদি ট্র্যাফিকিংয়ের ব্যাপারে কোনও খবর থাকে।

ট্র্যাফিকিং নিয়েই খবরটা। কিন্তু ব্যাপারটা অন্য। সংক্ষেপে ঘটনাটা বলে একটা অনুরোধ করলেন শ্রুতি— “আপনি কি আর এক বার আমার ওই চেম্বারে আসতে পারবেন? কাল সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ। আমি ও টি সেরে ওখানে চলে আসব। যদি আপনার কোনও অসুবিধে না হয়।”

অসুবিধা হয়নি পাঞ্চালীর। আবার ওই চেম্বারে ডক্টর শ্রুতি শিণ্ডের মুখোমুখি হলেন তিনি। শ্রুতির মুখ থেকে এ বার পুরো ঘটনাটা শুনে পাঞ্চালী বললেন, “এই রকম কেসের কথা তো প্রায়ই শোনা যায়। এই হোমগুলোর অবস্থা শোচনীয়। কীভাবে বাচ্চা হারিয়ে যায়, ভাবতেও পারবেন না। আমাদের কাছে প্রায়ই খবর আসে।”

“পুলিশ কিছু করতে পারে না?” একটু উদ্বিগ্ন মুখে প্রশ্ন করলেন শ্রুতি।

“পুলিশকে সব সময় দোষ দেওয়াও ঠিক নয়। আমি তো দিই না। ওদের উপরে মারাত্মক চাপ থাকে। আর এই সব ইনভেস্টিগেশনে বাইরে কোথাও যেতে হলে নিজের খরচে যেতে হয়। পরে পুরো খরচের টাকাটাও ফেরত পায় না। ফলে একটা সময়ের পরে ওদেরও আগ্রহ হারিয়ে যায়,” জবাব দিলেন পাঞ্চালী।

“তা হলে এই বাচ্চাগুলো এ ভাবেই হারিয়ে যাবে?” একটু উত্তেজিত হয়ে পড়লেন শ্রুতি।

“আসলে কী জানেন, ডক্টর,” পাঞ্চালী বলতে থাকলেন, “এই ধরনের কেসে বেশির ভাগ ব্রেকথ্রু আসে সোর্স মারফত। যেখানে এই বাচ্চাগুলোকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তার আশেপাশের লোকেরা কিছু জানলে খবর পাওয়া যায়। বা যারা হারিয়ে গিয়েছে, তারা যদি কোনও ভাবে খবর পাঠাতে পারে, তা হলেও উদ্ধার করা সম্ভব হয় কোনও কোনও ক্ষেত্রে।”

“আপনি তো এই লাইনে অনেক দিন থেকে আছেন। প্রচুর অভিজ্ঞতা। শুনেছি অনেক বাচ্চাকে ট্র্যাফিকিংয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। আপনি কী করে খবর পান?”

পাঞ্চালী একটু ভাবলেন। নিজের ইনফর্মারদের ব্যাপারে সব সময় খোলাখুলি কথা বলেন না তিনি। তবে রাখঢাক করে বলা যেতেই পারে –

“আমার নানা জায়গায় ইনফর্মার থাকে। ওদের কাছ থেকেও আমি খবর পাই। সন্দেহজনক কিছু দেখলে খবর পাঠায়। তার পরে জায়গাটার উপরে নজরদারি চালানো হয়। সত্যিই যদি মনে হয়, ব্যাপারটা গোলমেলে, তখন পুলিশের সাহায্য নেওয়া হয়। আর পুলিশ নিয়েই আমরা রেইডে যাই।” পাঞ্চালী একটু থামলেন। তার পরে অল্প হেসে বললেন, “বইয়ের গোয়েন্দাদের মতো এ সব ক্ষেত্রে কিন্তু হাতের ছাপ বা অন্য কোনও ক্ল দিয়ে অপরাধীদের খুঁজে বার করা সম্ভব হয় না। এই সব কেসে সাহায্য লাগে ইনফর্মারদের। যা পুলিশেরও আছে, আমারও আছে।”

দু’জনেই চুপ করে থাকলেন অল্প সময়।

“তা হলে এখন কী হবে? আমরা চুপ করে বসে থাকব?” একটু যেন হতাশ মনে হল শ্রুতিকে।

“না, চুপ করে বসে থাকব না। আপনার কাছে ওই বাচ্চাটার ছবি হবে?”

পুলিশে রিপোর্ট করার আগে হোম থেকে কয়েকটা ছবি জোগাড় করেছিলেন শ্রুতি। সেগুলো তাঁর মোবাইলে স্টোর করা ছিল। ছবিগুলো হোয়াটসঅ্যাপ মারফত পাঞ্চালীকে তখনই পাঠিয়ে দিলেন তিনি।

“আমার ইনফর্মারদের কাছে ছবিগুলো পাঠাই। দেখি ওরা কিছু খবর পায় কি না।”

“অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আমার পুলিশের উপরতলাতেও চেনাশোনা আছে। বন্ধু আছে। কিন্তু ওদের বলার আগে আপনার নামটাই আমার মাথায় এল। মনে হল, আপনিই সাহায্য করতে পারবেন।”

“আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব ম্যাডাম।”

পাঞ্চালী চলে যাওয়ার পরে একটু একা বসে রইলেন শ্রুতি। রিসেপশনিস্টকে বলে দিলেন, মিনিট পাঁচেক ডিস্টার্ব না করতে।

মেয়েটাকে বাঁচানো যাবে কি না, তিনি বুঝতে পারছিলেন না। তবে এটুকু বুঝেছেন, পাঞ্চালী আপ্রাণ চেষ্টা করবে বাচ্চাটাকে উদ্ধার করতে। মেয়েটার গোঁ আছে। কোনও কিছু ধরলে ছাড়তে চায় না।

তা ছাড়া ওর ইনফর্মার নেটওয়ার্কও বেশ শক্তিশালী। না-হলে এই কাজে এত সফল হত না। ইনফর্মারদের ব্যাপারটা শ্রুতিও জানেন। পুলিশের যেমন ইনফর্মার থাকে, আন্ডারওয়ার্ল্ডেরও থাকে। এ ব্যাপারটা কে না জানে। এখন কথা হল, এই ইনফর্মাররা কি আদৌ কোনও খবর এনে দিতে পারবে?

.

বাচ্চাটা তখন বদ্ধ ঘরের মধ্যে ছটফট করছিল। মেয়েটার মুখে একটা কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা। হাত দু’টোও পিছমোঁড়া করে বাঁধা রয়েছে। একটা পা শিকলের সঙ্গে আটকানো। যার অন্য প্রান্তের চেনটা তালা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে খাটের পায়ার সঙ্গে।

সকালে এই সময়টা তার মুখ বেঁধে দিয়ে যায় ওই বয়স্ক মহিলা। হাতটাও। যাতে সে কোনও শব্দ না করতে পারে। বালুর মায়ের বয়স ষাট পেরিয়ে গেলেও শরীরে যথেষ্ট শক্তি ধরেন মহিলা। ওই বাচ্চাটাকে সামলাতে তাঁর বিশেষ কষ্ট করতে হয় না।

তাও গোঙানির মতো একটা আওয়াজ বেরিয়ে আসে বাচ্চাটার মুখ থেকে। খাচায় বন্দি হয়ে থাকা একটা পশুর মতো ছটফট করতে থাকে। কত দিন বাইরের কারও মুখ সে দেখিনি। তার মুখও কেউ দেখেনি। এই নরক বাচ্চাটাকে ক্রমে মানুষ থেকে পশু বানিয়ে দিচ্ছে।

.

রান্না সেরে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আবার ওই বন্ধ দরজা দু’টোর দিকে তাকাল রাধা। একটা ঘরের মধ্যে থেকে চাপা আওয়াজটা ইদানীং মাঝেমধ্যেই কানে চলে আসে তার। রাধার মনে প্রচণ্ড অস্বস্তি হতে লাগল।

কী আছে ওই ঘরে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *