৭. সত্য বড়ই নিষ্ঠুর
মুম্বই, ২০২৩
ছেলেটাকে দোকানে ঢুকতে দেখেই মাথার মধ্যে ঢং করে ঘণ্টা বেজে উঠেছিল চিন্ময়ের। এই ছেলেটাকে সে আগে বেশ কয়েক বার দেখেছে। ওই হোমের বাইরে ঘুরে বেরাতে। মাসখানেক আগেও দেখেছিল। দিন দুয়েক আগেও দেখেছে।
সে তো অনেককেই দেখে থাকে চিন্ময়। এই চায়ের দোকানে কাজ করার সুবাদে। এখানে প্রচুর লোক আসে। কিন্তু এই বেয়ারার কাজটা করার পাশাপাশি সে আরও একটা কাজ করে। অর্থের জন্য নয়। চিন্ময় মনে করে, এই কাজের মাধ্যমে সে সামান্য হলেও সমাজের সেবা করছে। কতগুলো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে।
ছেলেটাকে দেখে একটু অবাকই হয়েছিল চিন্ময়। কিন্তু তার বিস্ময় বহুগুণ বেড়ে গেল ছেলেটাকে কাঁদতে দেখে। এই রকম কাণ্ড সে আগে দেখেনি। চট করে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল সে। কারও চোখ এখনও পড়েনি ছেলেটার উপরে। দোকানটায় এখন ভিড়টা কমই আছে। তার পরে এগিয়ে এসে প্ৰশ্ন করল-
“কী হয়েছে তোমার? কোনও সমস্যা? আমাকে বলতে পারো।”
সমীর মাথা তুলে তাকাল। তার চোখটা লাল হয়ে আছে। সামনের ছেলেটাকে দেখে নিজেকে সামলে নিল সমীর। তার পরে বলল, “না, না। এমন কিছু নয়। আসলে পুরনো কথা মনে পড়ছিল বলে নিজেকে সামলাতে পারিনি।” আর একটু গুছিয়ে সমীর অল্প হেসে বলল, “আমাকে এক কাপ চা আর একটা অমলেট দেবেন, প্লিজ।”
চিন্ময় মাথা নেড়ে সরে গেল। কিন্তু তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। আর গণ্ডগোলটা ওই হোমকে নিয়ে। সে যখন পাঞ্চালীর ইনফর্মার হিসেবে কাজ শুরু করেছিল, তখন তাকে কিছুটা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। বোঝানো হয়েছিল, কোন কোন ক্ষেত্রে চোখকান খুলে রাখা প্রয়োজন। কী ধরনের ব্যাপার দেখলে সন্দেহ করা উচিত। সে সেটাই করে। যে-কারণে হোমের অনেক খবরই সে পাঞ্চালী ম্যাডামকে জানাতে পারে।
চিন্ময়ের মনে হচ্ছে, এই ব্যাপারটা মোটেও সহজসরল নয়। তাকে একটু নজর রাখতে হবে।
দোকানের ছেলেটা যে-ভাবে এসে তার কাঁধে হাত রেখেছিল, তাতে চমকে গিয়েছিল সমীর। তার পরেই নিজেকে সামলে নেয়। জায়গাটা মোটেই ভাল নয়। কে তাকে চিনে ফেলবে, কে জানে। সমীর ভাবল, এখনই উঠে চলে যায়। তার পরে ঠিক করল, খাবারটা খেয়েই যাবে। কতটা সময় আর লাগবে!
চিন্ময় তত ক্ষণে একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে মোবাইলটা বার করল। দিন কয়েক হল পাঞ্চালীদি একটা মেয়েকে নিয়ে ভীষণ উতলা হয়ে আছে। বার বার জানতে চাইছে, মেয়েটার কোনও খোঁজ পাওয়া গেল কি না। তার আগে এই হোমের মেয়েটার খবরও পাঞ্চালীদিকে দিয়েছিল সে। কিন্তু সেই মেয়েটার কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি। তার কাছে খবর, মেয়েটা আর বেঁচে নেই। এই ছেলেটা আর রঞ্জিত কথা বলার পরেই মেয়েটা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল হোম থেকে। চিন্ময় নিশ্চিত হয়ে গেল, এই ছেলেটা ওই ঘটনার সঙ্গে কোনও ভাবে জড়িয়ে। কিন্তু ছেলেটা কাঁদছে কেন, সে ঠিক বুঝতে পারল না।
পাঞ্চালী সব শুনেই বললেন, “ছেলেটাকে ছাড়া চলবে না। আমি কাছাকাছি আছি। আধ ঘণ্টার মধ্যে ওখানে পৌঁছব। তার আগে ওকে কিছুতেই যেতে দিস না।”
একটু দূর থেকে ছেলেটার উপরে নজর রাখছিল চিন্ময়। ছেলেটা উসখুস করছে। একবার ঘড়ি দেখল। উঠে না চলে যায়। চায়ের কাপটা হাতে টেবিলের দিকে এগিয়ে এল চিন্ময়। টেবিলে কাপটা রেখে বলল, “তোমার ওমলেট আসছে।” তার পরে হাতের ব্যাগটা দেখে হাল্কা করে একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল— “কোথাও যাচ্ছ মনে হচ্ছে! বাড়িতে চললে নাকি?”
ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে গিয়ে বলল, “না, না। বাড়ি যাব কেন? আমি সবে মুম্বইয়ে এসেছি। আমার এক বন্ধু থাকে কাছেই। ওর কাছে যাব। খিদে পেয়ে গিয়েছিল বলে এই দোকানটায় ঢুকেছি।”
চিন্ময় নিশ্চিত হয়ে গেল, কিছু একটা গোলমাল আছে পুরো ব্যাপারটায়। ছেলেটা মিথ্যে বলছে। কিন্তু বুঝতে পারছিল না, কীভাবে ছেলেটাকে আটকে রাখবে। দেখে মনে হচ্ছে, ছেলেটা মুম্বই ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
ছেলেটা এ বার বলে উঠল, “ওমলেট আসতে দেরি হলে আমি যাচ্ছি। আমাকে ট্রেন ধরতে হবে।” কথাটা বলেই থেমে গেল সমীর। বুঝল একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেছে। সে তো সবে মুম্বই এসেছে। কিন্তু নিজেকে বোঝাল, ট্রেন শুধু দূরপাল্লার হবে কেন, লোকাল ট্রেনও তো হতে পারে।
দোকানের মালিকের চোখে পড়েছিল ব্যাপারটা। সে এ বার বলে উঠল, “আরে দেখ না, ওমলেটটা হল কি না।”
চিন্ময় বুঝল, কিছু করার নেই। সে চটজলদি ওমলেটের প্লেটটা এসে টেবিলে নামিয়ে রাখল। তার পরে দূরে গিয়ে আবার মোবাইলটা বার করল পকেট থেকে।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে খাবারটা শেষ করে দাম চুকিয়ে দিল সমীর। অনেকটা সময় সে এই দোকানে থেকেছে। আর নয়। এ বার যেতে হবে। চিন্ময় আর কোনও কথা না বলে টাকাটা নিয়ে চলে গেল। ফেরত টাকার জন্য অপেক্ষা না-করে সমীর উঠে পড়ল টেবিল ছেড়ে। তার পরে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে গেল দোকান থেকে।
নিষ্পলক দৃষ্টিতে সমীরের বেরিয়ে যাওয়াটা দেখল চিন্ময়। তার পরে দ্রুত এগিয়ে গেল মালিকের টেবিলের দিকে।
.
আন্ধেরি থেকে কল্যাণ জাংশনে পৌঁছতে প্রায় দু’ঘণ্টা লেগে গেল সমীরের। তখন বেলা একটা বেজে গিয়েছে। গোরখপুর যাওয়ার ট্রেনটা ছাড়ে সাড়ে চারটে নাগাদ। সমীর গিয়ে কাউন্টার থেকে অসংরক্ষিত কামরার একটা টিকিট কেটে আনল। তার পরে এসে বসল একটা ফাঁকা বেঞ্চে।
তার মাথাটাও বেঞ্চের মতো ফাঁকা হয়ে আছে। যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে ভিতরটা। নিজের এই কাপুরুষ রূপটা সে কোনওদিন দেখবে, ভাবেনি। সমীর খেয়ালও করল না, তার দু’পাশে দু’জন এসে বসল। এক জন মহিলা, অন্য জন কমবয়সি একটা ছেলে। ছেলেটাকে দেখলে সমীর চিনতে পারত, মহিলা তার অপরিচিত।
প্রথম কথাটা বলল মহিলাই। এবং, যা বলল শুনে সমীরের শরীর কাঁপতে শুরু করল। মহিলা খুব নিরুত্তাপ ভাবে বললেন, “নেপালি মেয়েটা তা হলে মারাই গেল!”
বাঁ পাশে বসা মহিলার কথাটা শুনে সাদা হয়ে গেল সমীরের মুখ। তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। মহিলা আবার সেই একই রকম নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “কী নাম ছিল মেয়েটার?”
“অ-প-রা-জি-তা,” কোনও মতে নামটা বলেই আর নিজেকে সামলাতে পারল না সমীর। হু হু করে কেঁদে ফেলল। সমীরের মাথায় ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলেন পাঞ্চালী। মেয়েটাকে নিয়ে তিনি আন্দাজে ঢিল ছুড়েছিলেন। কিন্তু লেগে গিয়েছে।
পাশে বসা চিন্ময় চুপ করে রইল। সমীরকে চলে যেতে দেখেই সে মালিককে বলে দোকান থেকে বেরিয়ে ছেলেটার পিছু নেওয়া শুরু করে। একটু পরেই বুঝে যায়, ছেলেটা কল্যাণ জংশনের দিকে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ফোনে পাঞ্চালীদিকে জায়গাটার কথা বলে সে ছেলেটার পিছনে লেগে থাকে। পাঞ্চালী আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন। চিন্ময়কে দেখে নেন তিনি। তার পরে সমীরের পিছন পিছন দু’জনে ঢুকে আসেন প্ল্যাটফর্মে।
.
এতটাই ভেঙে পড়েছিল সমীর, যে সামলাতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। পাশে বসা মহিলা তখনও তার মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন। যেন কত দিনের পরিচিত। সমীরকে একটু সামলে উঠতে দেখে মহিলা স্নেহমাখা গলায় প্রশ্ন করলেন, “তুমি অপরাজিতাকে চিনলে কী করে?”
বুকের মধ্যে থাকা পাথরটা সামান্য হলেও হাল্কা হয়েছিল। সমীরের মুখের আগল খুলে গেল। বলে ফেলল, “আমি যে-ক্লিনিকে কাজ করতাম, সেখানে অপরাজিতাকে নিয়ে আসা হত প্রায়ই। ওখানেই দেখেছিলাম।”
পাঞ্চালীর বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। ছেলেটা বলছে কী! ক্লিনিকে দেখেছে! তা হলে তো এই ছেলেটা ডক্টর ডেভিলকেও দেখে থাকতে পারে। উত্তেজনায় এ বার কাঁপতে লাগলেন পাঞ্চালী। কোনও মতে নিজেকে শান্ত করে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ডক্টর ডেভিলের কথা শুনেছ তুমি?”
এ বার চমকে ওঠার পালা সমীরের। তার মুখে ভয়ের ছায়া খেলে যেতে দেখেই পাঞ্চালী দ্রুত বলে উঠলেন, “তোমার কোনও ভয় নেই। আমি তোমাকে সাহায্য করব। আমি একটা সংগঠন চালাই। এই সংগঠনের কাজই হল হারিয়ে যাওয়া ছেলে-মেয়েদের খুঁজে বার করা।”
পাশে বসা চিন্ময় এ বার বলে উঠল, “দিদিকে বিশ্বাস করতে পারো। দিদির সঙ্গে অনেকের চেনা আছে। তোমার কোনও বিপদ হবে না।”
সমীর বুঝতে পারছিল না, এই মহিলাকে ভরসা করা ঠিক হবে কি না। কিন্তু এত দূর চলে আসার পরে পিছনেও ফেরা যায় না। সে ধীরে ধীরে বলল, “হ্যাঁ, শুনেছি।”
পাঞ্চালী প্রায় শ্বাস বন্ধ করে বললেন, “কখনও দেখেছ ডক্টর ডেভিলকে?”
চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল সমীর। নীল আকাশে সাদা মেঘের নকশায় সে কি অপরাজিতার মুখের আদল দেখতে পাচ্ছে? তার পরে চোখ নামিয়ে মহিলার দিকে ফিরে বলল, “হ্যাঁ, দেখেছি। অনেক বারই।”
পাঞ্চালী আর উত্তেজনা সামলাতে পারলেন না- “ওকে দেখলে চিনতে পারবে তুমি?”
“ডক্টর ডেভিলের মুখ কোনওদিন দেখিনি। মুখে একটা বড় সার্জিকাল মাস্ক থাকত সব সময়। আসল নাম জানার তো প্রশ্নই নেই। কিন্তু চেহারাটা দেখলে চিনতে পারব। ওই চেহারা ভোলা যায় না।”
পাঞ্চালী ভাবতে পারেননি, ভাগ্য এতটা সদয় হবে তাঁর প্রতি। এই রকম এক জন সাক্ষীর সন্ধানই তো তিনি করছিলেন। এমন এক জন, যে-ডক্টর ডেভিলকে চিহ্নিত করতে পারবে।
এই ছেলেটার সামনে এক বার জয়ন্ত দেশমুখকে বসিয়ে দিতে হবে। তার পরে দেখা যাবে, কত ক্ষণ মুখ বন্ধ রাখতে পারে দেশমুখ। পাঞ্চালী একটা কথা ব্যাপার বুঝে গিয়েছিলেন। সমীর হয়তো ডক্টর ডেভিলের মুখ দেখেনি কখনও, কিন্তু ডক্টর ডেভিল তো সমীরের মুখ দেখেছে! দুম করে সমীরকে নিয়ে জয়ন্ত দেশমুখের সামনে হাজির হলে লোকটার প্রতিক্রিয়া কী রকম হয়, সেটা তিনি দেখতে চাইছিলেন।
.
পাঞ্চালী বুঝে গেলেন, এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা যাবে না। কোনও কারণে সমীরের মন ঘুরে গেলে বিশাল সমস্যা হয়ে যাবে। কিন্তু এত দ্রুত কী করে জয়ন্ত দেশমুখের কাছে পৌঁছবেন? কোর্টের অর্ডার বার করতে করতে তো ৪৮ ঘণ্টা লাগবেই। অন্য কোনও রাস্তা…।
তার পরেই মনে পড়ে গেল শ্রুতি শিণ্ডের কথা। ভদ্রমহিলার অনেক চেনাশোনা ওপরমহলে। একমাত্র শ্রুতিই পারেন ভিতর দিয়ে দ্রুত একটা ব্যবস্থা করে দিতে। আর দেরি না-করে মোবাইলটা বার করলেন পাঞ্চালী। শ্রুতির গলা শুনেই বলা শুরু করলেন, “অকল্পনীয় একটা ব্রেক পেয়েছি। কিন্তু ফোনে আর কিছু বলতে পারছি না। নিরাপদ নয় মোটেই। আপনার সঙ্গে এখনই দেখা করতে হবে। কোথায় আসব?”
শ্রুতি একটু ভাবলেন। তার পরে বললেন, “আমি তিনটে থেকে ওই চেম্বারে থাকব। আপনি ওখানে চলে আসুন।”
“আচ্ছা,” বলে পাঞ্চালী ফোনটা রেখে দিলেন। তার পরে ছেলেটার দিকে ফিরে বললেন, “তোমার নাম কী ভাই?”
“সমীর।”
“শোনো সমীর, আমি তোমার মনের ভাবটা বুঝতে পারছি। তুমি চেয়েছিলে অপরাজিতাকে এই নরক থেকে বাঁচাতে। কিন্তু পারোনি। তা বলে হার মানলে চলবে না। অপরাজিতার বলিদানকে ব্যর্থ হতে দিয়ো না। আরও অনেক অপরাজিতা এই নরকে ডুবে আছে। তাদেরকে বাঁচাতে সাহায্য করো আমাকে।
পাঞ্চালীর কথায় যেন সমীরের মনে নিভু নিভু হয়ে আসা আগুনটা আবার দপ করে জ্বলে উঠল। সে বলল, “কী করতে বলেন আমাকে?”
“আমার সঙ্গে চলো। তোমাকে এক জনের কাছে নিয়ে যাব। তার অনেক ক্ষমতা। আমাদের সাহায্য করবে আসল শয়তানকে খুঁজে বার করতে। অপরাজিতার মৃত্যু আমরা ব্যর্থ হতে দেব না।”
সমীর কিছু বলল না। সে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। পাঞ্চালীও উঠে পড়লেন বেঞ্চ থেকে। তার পরে চিন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই দোকানে ফিরে যা। পরে তোর সঙ্গে কথা বলে নেব।”
এর পরে সমীরের হাতটা ধরে প্ল্যাটফর্মের বাইরে বেরিয়ে এলেন পাঞ্চালী। পার্কিংয়ে তাঁর গাড়িটা অপেক্ষা করছিল। পিছনের সিটে সমীরকে উঠিয়ে ছেলেটার পাশে গিয়ে বসলেন পাঞ্চালী। গন্তব্যস্থলের ঠিকানাটা বলে দিলেন ড্রাইভারকে।
গাড়িতে উঠে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল পাঞ্চালীর। জয়ন্ত দেশমুখের ছবি তো তাঁর মোবাইলে আছে। এক বার ছেলেটাকে দেখালে কী রকম হয়? যদিও ছেলেটা বলেছে, ডক্টর ডেভিলের মুখ দেখেনি কখনও। তবু এক বার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী!
পাঞ্চলী মোবাইলটা বার করে এক বার দেখালেন সমীরকে। “এই লোকটাকে কখনও দেখেছ তুমি?” সমীর আলগোছে এক বার চোখ বুলিয়ে বলল, “না।” তার পরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার মনে যেন একটা তীব্র যুদ্ধ চলছে। কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেল সমীর।
পাঞ্চালী আর ঘাঁটালেন না। আর কিছু জানার জন্য চাপও দিলেন না। আগে তো শ্রুতির চেম্বারে পৌঁছনো যাক। একটা ওষুধ দিয়ে সমীরের নার্ভটাকে শান্ত করতে হবে। তার পরে ওর হয়তো আরও কিছু মনে পড়বে। বিশেষ করে জয়ন্তকে সামনাসামনি দেখলে। মুখ না চেনারই কথা। কিন্তু সামনে থেকে দেখলে চিনে ফেলতে পারে। তা ছাড়া জয়ন্তর প্রতিক্রিয়াটাও তো দেখতে হবে।
এখন একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে আছে ছেলেটা। আর কিছু বললে আবার হিতে বিপরীত না হয়ে যায়। দু’জনেই চুপ করে রইলেন। ঘণ্টাখানেক সময় লাগল শ্রুতি শিণ্ডের চেম্বারে পৌঁছতে।
উপরে উঠতেই রিসেপশনিস্ট বললেন, “আপনারা ম্যাডামের চেম্বারে গিয়ে অপেক্ষা করুন। ম্যাডাম বলে রেখেছেন আপনাদের পাঠিয়ে দিতে।”
সমীরকে নিয়ে পাঞ্চালী ঢুকে এলেন তাঁর পরিচিত চেম্বারে। প্রথম দিনের মতোই চেম্বারটা ফাঁকা। দু’জনে বসলেন ভিজিটর্জ চেয়ারে। সমীরের দিকে ফিরে পাঞ্চালী বললেন, “তুমি কিছু ভেব না সমীর। তোমার কোনও বিপদ হবে না। আমি আর এই ম্যাডাম মিলে তোমাকে রক্ষা করব।”
সমীর কিছুই বলছিল না। তার মাথার মধ্যে কুয়াশার নানা স্তর ঘোরাফেরা করছে। সে যেন বুঝতে পারছে না কোথায় এসেছে। একটু ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে পাঞ্চালীর দিতে তাকাল সমীর। তার পরে মুখ ফিরিয়ে নিল। সমীরের মনে এখন একটা ভয় দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সে কি ঠিক কাজ করছে?
অ্যান্টি চেম্বারের দরজাটা খুলে গেল। আর প্রধান চেম্বারে পা রাখলেন শ্রুতি শিণ্ডে। পাঞ্চালী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনাকে বলেছিলাম না, দারুণ একটা ব্রেক পেয়ে গিয়েছি। এই হচ্ছে সেই ব্রেক।” বলে সমীরের দিকে তাকালেন পাঞ্চালী। আর রীতিমতো চমকে উঠলেন।
সমীরের ফুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সমীর। ওয়াক ওয়াক করে বমি করতে শুরু করল।
পাঞ্চালী ভাবতেও পারেননি এ রকম কিছু হবে। মারাত্মক রকমের নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছে ছেলেটার। মনে হচ্ছে, এখনই জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। শ্রুতিও তাকিয়ে ছিলেন অবাক দৃষ্টিতে। এর পরে ধীরে ধীরে বললেন, “কী হয়েছে ওর? অসুস্থ হয়ে পড়েছে মনে হল। দাঁড়ান, একটু জল দিই ছেলেটাকে।”
সমীরের কাঁপুনিটা বাড়তে লাগল। সে পাঞ্চালীর হাতটা ধরে কোনও মতে বলতে লাগল, “না, জল লাগবে না। দয়া করে আমাকে বাইরে নিয়ে চলুন। দয়া করে।”
পাঞ্চালী প্রথমে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। এ বার ভয় পেয়ে গেলেন। ছেলেটার হার্ট অ্যাটাক না হয়ে যায়। তিনি কোনও মতে শ্রুতির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি ওকে বাইরে নিয়ে যাচ্ছি। গাড়িতে নিয়ে বসাচ্ছি। তার পরে ফোন করছি আপনাকে।”
শ্রুতি কিছু না বলে তাকিয়ে রইলেন। কোনও মতে সমীরকে ধরে বাইরে নিয়ে এলেন পাঞ্চালী। তার পরে লিফটে নামিয়ে চলে এলেন গাড়ির সামনে। দরজা খুলে বসিয়ে দিলেন পিছনের সিটে। সমীর তত ক্ষণে একটু স্বাভাবিক হয়েছে। ব্যাগে থাকা জলের বোতল ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিলেন পাঞ্চালী। উঠে বসলেন সমীরের পাশে। তার পরে বললেন, “কী হল তোমার? ও-রকম করছিলে কেন?”
সমীর ঢকঢক করে কিছুটা জল খেয়ে একটু ধাতস্থ হল। তার পরে অস্ফুটে বলল, “কোথায় নিয়ে এসেছেন আমাকে?”
“কেন, এটা শ্রুতি শিণ্ডের চেম্বার। ও খুব বড় ডাক্তার। আমাদের কাজে দারুণ ভাবে সাহায্য করছে।”
সমীর অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলপাঞ্চালীর দিকে। তার পরে বিড়বিড় করে বলল, “ডক্টর ডেভিল! ডক্টর ডেভিল!”
“কী আবোল তাবোল বকছ। ও ডক্টর ডেভিল হতে যাবে কেন? ও তো এক জন মহিলা…,” বলতে বলতে থেমে গেলেন পাঞ্চালী। তাঁর চোখ দু’টোও আতঙ্কে বড় বড় হয়ে উঠেছে।
পাঞ্চালীর হাতটা ধরে ধীরে ধীরে সমীর বলল—
“আমি কখন বলেছি ডক্টর ডেভিল এক জন পুরুষ?”
