প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

১৮. যে বাঁধনে বেঁধেছ পারি না তো খুলিতে…

১৮. যে বাঁধনে বেঁধেছ পারি না তো খুলিতে…

কলকাতা, ২০২৩

এই রকম একটা ধাক্কা সে খাবে, সেটা কৃষ্ণেন্দু ভালই জানত। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যে-আসবে, সেটা বোঝেনি। খবরটা দিল তারই বন্ধু সঞ্জয়।

“তুই কি ব্যাপারটা জানিস কিছু?”

“কী ব্যাপার?” একটু অবাকই হয়ে গেল কৃষ্ণেন্দু।

“তুই একেবারে গাধা। কিসসু হবে না তোর দ্বারা,” ঝাঁঝিয়ে উঠল সঞ্জয়, “অজন্তার সঙ্গে একটা ছেলের ঘনিষ্ঠতা হয়েছে!”

“মানে, কার?”

ধাক্কা খাওয়ার পাশাপাশি অবাকও হয়ে গেল কৃষ্ণেন্দু। অজন্তার প্রতি ছেলেদের আকর্ষণ থাকবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। সে ভালই জানে, এই স্কুলের বেশ কয়েক জন ছেলেও নাকি মেয়েটার প্রতি আকৃষ্ট। এক জন নাকি প্রেমপত্রও দিয়েছিল। যত দূর জানে তাতে অজন্তার মন গলেনি। সেই জন্যই অবাক হয়ে গেল কৃষ্ণেন্দু। স্কুলের কোন ছেলের প্রতি হঠাৎ করে আকৃষ্ট হয়ে পড়ল তাদের স্কুলের সেরা রত্ন?

ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল সঞ্জয়ের কথায়। “অজন্তার এক ঘনিষ্ট বন্ধু আবার আমারও খুব কাছের। ওর থেকেই ব্যাপারটা শুনলাম পুরো। ইনস্টাগ্রামে একটা ছেলের সঙ্গে নাকি আলাপ হয়েছিল অজন্তার। কলকাতার ছেলে নয়। দিল্লি না মুম্বই, কোথায় থাকে। সেখান থেকেই প্রেম। ছেলেটা নাকি দেখাও করে গিয়েছে কলকাতায় এসে।”

কৃষ্ণেন্দু কিছু বলল না। কিছু বলার মতো অবস্থাতেও ছিল না সে। কী- ই বা বলবে। অজন্তা যদি এলিট ক্লাসের প্রতিনিধি হয়, তা হলে সে তো সি ক্লাস বা ডি ক্লাসের কেউ হবে। বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানোর যে-স্বপ্ন সে এত দিন দেখে এসেছিল, সেই স্বপ্ন এখন ভেঙে চুরচুর হয়ে গেল।

সঞ্জয় আর কিছু না বলে চলে গেল। ক্লাসও শুরু হল। যথারীতি ফার্স্ট বেঞ্চে নিজের জায়গায় বসে ছিল অজন্তা। কিন্তু সে দিকে আর তাকাতে পারছিল না কৃষ্ণেন্দু। যত বার তাকানোর কথা ভেবেছে, তত বারই তার বুকের ভিতরটা জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিল।

ছুটির পরে আবার হাজির হল সঞ্জয়। এ বার তার হাতে মোবাইল ফোন। চট করে সেখানে ইনস্টাগ্রাম অ্যাপটা খুলল সঞ্জয়। তার পরে জিজ্ঞেস করল, “তুই কি অজন্তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটা ফলো করিস?”

ভ্যাবলার মতো জবাব দিল কৃষ্ণেন্দু, “আমার তো ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টই নেই।”

হাঁ করে তাকিয়ে রইল সঞ্জয়। তার পরে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “সত্যিই তোর কিছু হওয়ার নয়। যাই হোক, তোকে একটা জিনিস দেখাতে এলাম। আমি আবার অজন্তার অ্যাকাউন্টটা ফলো করি।”

নিজের মোবাইলে টুকটাক কী করে ফোনটা তার দিকে এগিয়ে দিল সঞ্জয়। স্ক্রিনে একটা ছেলের মুখ দেখা যাচ্ছে। সঞ্জয় বলতে লাগল, “এই সেই ছেলেটা। যার সঙ্গে অজন্তা এখন প্রেম করছে। নাম রাজা।”

কৃষ্ণেন্দু তাকাল স্ক্রিনটার দিকে। ছেলেটা সত্যিই দেখতে ভাল। বেশ ফর্সা, ধারালো নাক। ব্যাকব্রাশ করা চুল, পাতলা ঠোঁট। হাসিটা আকর্ষণীয়। ছেলেটার আরও কয়েকটা ছবি দেখাল সঞ্জয়। শারীরিক গঠন চমৎকার। স্লিভলেস টি-শার্ট পরা একটা ছবিতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, জিম করে নিয়মিত। এও বোঝা যাচ্ছে, যথেষ্ট পয়সাওয়ালা ঘরের ছেলে। কৃষ্ণেন্দু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। খেলা শুরু হওয়ার আগেই তার হার হয়ে গিয়েছে।

সঞ্জয় বলে যাচ্ছিল, “দ্যাখ, অজন্তার কত ফলোয়ার। কলকাতার বাইরের ছেলেই বেশি। মুম্বইয়ের আরও কয়েকটা ছেলের সঙ্গেও ও চ্যাট করে। তবে আমি যত দূর জানি, এই রাজা নামের ছেলেটাই অজন্তার প্রেমিক।”

কৃষ্ণেন্দুর আর কিছু ভাল লাগছিল না। সে ধীরে ধীরে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলের বাকি ছাত্রদের ভিড়ে মিশে গেল।

.

দিন কাটতে লাগল। জীবনযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই পরাজিত এক সৈনিকে বদলে গিয়েছিল কৃষ্ণেন্দু। সে ঠিক করে নিয়েছিল আর তাকাবেই না অজন্তার দিকে। ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবে মেয়েটাকে। কিন্তু কাজটা যে-এতটা কঠিন হবে, বোঝেনি ছেলেটা। এমনই বাঁধনে বাঁধা পড়ে গিয়েছিল কৃষ্ণেন্দু, যে- সে-ই বাঁধন খুলে বেরিয়ে আসার কোনও রাস্তাই পাচ্ছিল না।

.

তাদের স্কুলে নানা রকম এক্সট্রা ক্যারিকুলার অ্যাক্টিভিটি হয়। দিন কয়েক বাদে সে-রকমই একটা অ্যাক্টিভিটিতে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হল একটা ওল্ডএজ হোমে। একটা এনজিও-র তত্ত্বাবধানে।

তারা ঘুরে ঘুরে আলাপ করছিল আবাসনের বৃদ্ধবৃদ্ধাদের সঙ্গে। যাঁদের হয় কেউ নেই, না হয় যাঁদের সন্তানেরা বৃদ্ধ বয়সে বাড়িতে রাখার বদলে বাবা- মায়েদের হোমে রাখাই ঠিক মনে করেছে।

এঁদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে একটা জিনিস বুঝতে পারছিল কৃষ্ণেন্দু। মানুষের জীবনে ভালবাসা কতটা ঠুনকো। কিন্তু তাঁদের কেউ কেউ এখনও স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে। এখনও আশা করে, এক দিন সেই স্বপ্ন সফল হবে। কৃষ্ণেন্দু মনে মনেই হাসল। এঁদের স্বপ্ন সত্যি হবে কি না, সে জানে না। তার স্বপ্ন যে-অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে, সেটা সে বুঝে গিয়েছে।

এখানেও আকর্ষণের কেন্দ্রে সেই অজন্তা। ঝকঝকে স্মার্ট মেয়েটার সঙ্গে অনেক ক্ষণ ধরেই কথা বলছিলেন এনজিও-র কর্ণধার সুপর্ণা ম্যাডাম। তাকে কেউ পাত্তাও দিচ্ছে না। ধীরে ধীরে কোনার দিকে একটা চেয়ারে এসে বসল কৃষ্ণেন্দু। দেখছিল, কীভাবে অজন্তার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছেন সুপর্ণা ম্যাডাম।

সুপর্ণা ম্যাডামের সঙ্গে তার আরও এক বন্ধু রাজীবকে কথা বলতে দেখছিল কৃষ্ণেন্দু। আর একটু পরে রাজীব এসে বসল কৃষ্ণেন্দুর পাশে।

“কী রে, এই কোনায় একা একা বসে কী করছিস?” রাজীবের প্রশ্নে একটু বোকার মতো হেসে কৃষ্ণেন্দু জবাব দিল, “ভাল লাগছে না। তাই একা বসে আছি।”

রাজীব একটু উত্তেজিত ভাবে বলে চলল, “জানিস, এই সুপর্ণা ম্যাম আমার মায়ের খুব পরিচিত। আমিও চিনি ওঁকে। সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত। অনেকের সঙ্গে চেনাপরিচিতি আছে।”

কৃষ্ণেন্দুর এই সব কথা শুনতে ভাল লাগছিল না। রাজীব আর না ঘাঁটিয়ে একটু পরে উঠে চলে গেল।

তখনও সুপর্ণা ম্যামের পাশে পাশে ঘুরতে ঘুরতে বৃদ্ধবৃদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলছিল অজন্তা। মুখটা ঘুরিয়ে নিল কৃষ্ণেন্দু। এই দৃশ্যটা সে আর দেখতে চায় না। তাই অজন্তা আর সুপর্ণা— এই দু’টো মুখকে সে দ্রুত ভুলে যেতে চায়। সে ভালই জানে, এই দু’জন কোনও ভাবেই তার জীবনে প্রভাব ফেলবে না।

ভুল ভেবেছিল কৃষ্ণেন্দু। ভীষণই ভুল!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *