প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৪. যমদূতদের মোলাকাত

৪. যমদূতদের মোলাকাত

মুম্বই, ২০২৩

প্যারিস দুর্ঘটনার ছ’দিন পরে।

লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ওড়া কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট যখন মুম্বইয়ের মাটি ছুঁল, রাত আড়াইটে বেজে গিয়েছে। অজন্তাকে নিয়ে গাড়িটা প্রায় সুরাট পৌঁছে গিয়েছে।

লম্বা, সুঠাম চেহারাটা ইমিগ্রেশন ডেস্ক পেরিয়ে ধীরে সুস্থে বেরিয়ে এল অ্যারাইভাল গেটের বাইরে। তার হোয়াটসঅ্যাপে ড্রাইভারের ফোন নম্বরটা এসে গিয়েছে। কিন্তু তার আর দরকার পড়ল না। অ্যারাইভাল গেটের বাইরে তার নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে কেতারদুরস্ত পোশাক পরা ড্রাইভারকে নজরে পড়ে গেল লোকটির।

দশ মিনিটের মধ্যেই পেন্টারকে নিয়ে বিএমডব্লিউ ছুটে চলল গন্তব্যস্থলের দিকে।

.

অজন্তাকে সুরাট পাঠানোর পরিকল্পনায় শেষ মুহূর্তে একটু বদল করা হয়েছিল। জেলেদের নৌকোর উপরে আর ভরসা রাখা হয়নি। পুরোটাই গাড়িতে যেতে হবে বলে নির্দেশ চলে আসে ওপর থেকে।

মুম্বই থেকে দমন হয়ে সুরাট পৌঁছতে ঘণ্টা ছয়েক মতো লাগে। রাস্তায় গোটা দুয়েক পুলিশ চেকপোস্ট আছে। কিন্তু সেই পোস্টে সমস্যা হওয়ার কোনও কারণ ছিল না। হয়ওনি।

অজন্তার যখন আচ্ছন্ন ভাবটা ধীরে ধীরে কাটছিল, তখনও ভোর হয়নি। গাড়ির জানলার বাইরে শুধুই অন্ধকার।

অজন্তা প্রথমে বুঝতে পারেনি সে কোথায় আছে, কী করছে। তার পরে আবছা আবছা মনে পড়তে লাগল ঘটনাটা। রীতার হাত থেকে দুধটা নিয়ে খাওয়ার পরেই সে ঘুমে ঢলে পড়ে। তার পরে আর কিছু মনে নেই।

ধড়মড় করে উঠে বসতে গেল অজন্তা। পাশ থেকে রীতা আলতো করে কাঁধে হাত রেখে বলল, “কিছু চিন্তা কোরো না। সব ঠিক আছে। আমরা পৌঁছে গিয়েছি।” রীতার দিকে তাকিয়ে অবশ্য চোখ দু’টোর বাইরে আর কিছু দেখতে পেল না অজন্তা। বাকি শরীরটা বোরখায় ঢাকা। সে নিজের হাতটা তুলেও দেখল। তার পরনেও ওই কালো বোরখা।

রীতা আবার অজন্তার কাঁধে চাপ দিল। “আমরা এসে গিয়েছি। এ বার নামতে হবে।”

অজন্তা প্রথমে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল। আবছা আলোয় সামনে একটা ছোট্ট বাড়ি দেখা যাচ্ছে বলে মনে হল তার। অজন্তা ফিরে তাকাল রীতার দিকে।

রীতার চোখের নীরব ভাষা যেন পড়তে পারল অজন্তা। মেয়েটা যেন বলতে চাইছে- আমি তো আছি, ভয় কী!

রীতার হাত ধরে সুরাটের একটি গোপন ঠিকানায় এসে নামল অজন্তা।

দুবাইয়ের এক সুপার এক্সক্লুসিভ কেবিনে তখন স্কিন ট্র্যান্সপ্লান্টের জন্য অপেক্ষা করে আছে ক্যাটরিনা। গত ছ’দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছে চলেছে সতেরো বছরের এক মার্কিন তরুণী।

.

গ্রোপিয়াসের লোক যে-মুম্বই পৌঁছে গিয়েছে, সে খবরটা বসের কানে ঠিক সময়ই চলে গিয়েছিল। অপারেশনটা মসৃণ ভাবেই এগোচ্ছে। কিন্তু একটা কাঁটা বার বার বসের মনে খোঁচা দিচ্ছিল।

এত বড় অপারেশনটা কয়েক জন জেলে আর লো লেভেল অপারেটিভদের হাতে ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হচ্ছে কি না। গ্রোপিয়াসের লোক ওখানে থাকবে, সেটা আবার অন্য সমস্যা। লোকটা কতটা কী বুঝবে, কে জানে। ওর জন্যই না কোনও ঝামেলায় তৈরি হয়ে যায়। তার উপরে ওই মার্কিনের সঙ্গে কথাবার্তাই বা কে চালাবে ওখানে। এমন কাউকে চাই যে-সমস্যা হলে দ্রুত সমাধান করতে পারবে। যে-কোনও উপায়।

একটা নামই মনে পড়ছে বসের। মোবাইলে তার নম্বরটাই ডায়াল করল বস। বাংলোর নীচের তলা থেকে বসের ড্রয়িংরুমে পৌঁছতে অ্যাডামের ঠিক সাড়ে সাত মিনিট লাগল। প্রতিদিনই তাই লাগে। অ্যাডামের প্রতিটা পদক্ষেপই মাপা। তবে সে জানে, প্রয়োজনে ওই সাড়ে সাত মিনিটটাকে তিন মিনিটে নামিয়ে আনতে পারবে। এ দিন অবশ্য সেই প্রয়োজন পড়েনি।

অ্যাডামের দিকে তাকিয়ে বস বলল, “তোমাকে সুরাট যেতে হবে। একটা অপারেশন হ্যান্ডল করার জন্য। আমার এক জন ঘনিষ্ঠ সহকারীও যাবে তোমার সঙ্গে। আর যাবে আমেরিকা থেকে আসা গ্রোপিয়াসের লোক।”

অ্যাডাম কথা না বলে তাকিয়ে রইল। বেশি কথা বলার অভ্যাস তার নেই।

পরের আধ ঘণ্টার মধ্যে ড্রয়িংরুমে হাজির হয়ে গেল বসের ঘনিষ্ঠ তিনের এক জন। সোলাঙ্কি।

“শোনো, আমি ঠিক করেছি অ্যাডামও তোমার সঙ্গে যাবে। গোপিয়াস কাকে পাঠিয়েছে, জানি না। কিন্তু এই রকম অপারেশনে বাইরের একটা লোকের উপস্থিতি আমার ভাল লাগছে না। লোকটার জন্য কোনও সমস্যা না হয়ে যায়।”

দুই শ্রোতাই চুপ করে রইল। বস বলে যেতে লাগল, “তোমরা দু’জনে গিয়ে ওই লোকটার সঙ্গে দেখা করো। সব কিছু খুলে বল। বলবে, অ্যাডাম এখানকার অপারেশনটা পুরো দেখবে। মেয়েটাকে জাহাজে তুলে দেওয়ার পরে ও বুঝে নিতে পারে।”

“লোকটা যদি নৌকো করে জাহাজে যেতে যায়, তখন কী করব?” প্রশ্ন করল সোলাঙ্কি।

একটু ভাবল বস। তার পরে পাল্টা প্রশ্ন করল, “জেলে নৌকো করে কি ওর যাওয়া সম্ভব?”

লোকটা অল্প সময় ভাবল। তার পরে জবাব দিল, “প্রথমে যে-নৌকোটা মেয়েটাকে নিয়ে যাবে, সেটা ছোট। একটা ডিঙি মতো। সেখানে জায়গা হবে কি না, বলতে পারব না।”

বস অ্যাডামের দিকে তাকাল, “স্পটে থেকে তুমি যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবে। শুধু মনে রাখবে, মেয়েটাই সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রোপিয়াসের লোক নয়।” একটু থেমে নিজের সহকারীকে নির্দেশ দিল বস, “অ্যাডামকে পুরো অপারেশনের ব্যাপারটা খুলে বল।”

অ্যাডাম মাথা নাড়ল। সে যা বোঝার বুঝে গিয়েছে।

.

বিছানায় ঠায় বসে ছিল পেন্টার। শরীরের একটা মাংসপেশি ও নড়ছিল না। দূর থেকে কেউ দেখলে ভাববে, একটা ব্রোঞ্জের মূর্তি বোধ হয় বসে আছে। চোখ দু’টোও বন্ধ। সে নিজেকে মানসিক ভাবে তৈরি করছিল আসন্ন অপারেশনটার জন্য।

কলিংবেলের আওয়াজে ধীরে ধীরে চোখ মেলল পেন্টার। নেমে এল বিছানা থেকে। তার পরে অনাবৃত শরীরটা ঢেকে নিল ড্রেসিংগাউনে।

দরজার সামনে এসে একবার দাঁড়িয়ে পড়ল প্রোপিয়াসের ঘাতক। যেন বুঝে নিতে চাইল, বাইরে কত জন আছে। তার পরে দরজাটা খুলে দিল। কি হোলে উঁকি মারার প্রয়োজন হয়নি তার।

“হাই মিস্টার এডওয়ার্ডস। আমার সঙ্গেই আপনার ফোনে কথা হয়েছিল।”

এডওয়ার্ডস কথা না বলে একটু সরে দাঁড়াল। ঘরে ঢুকে এল দু’জনে।

দরজাটা বন্ধ করে এডওয়ার্ডস গিয়ে বসল সুসজ্জিত সুইটের সিঙ্গল সোফাটায়। লোকটার বাড়ানো হাত সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে।

সোলাঙ্কি সামান্য হতভম্ব হয়ে গেলেও চট করে নিজেকে সামলে নিল। তার পরে বলল, “আপনাকে সুরাট নিয়ে যাওয়ার জন্য আর একটু পরেই গাড়ি চলে আসবে। ওখানেই অপারেশনের শেষ পার্টটা। আপনার সঙ্গে যাব আমরা দু’জন।” বলে ঘুরে অ্যাডামের দিকে ইঙ্গিত করল সোলাঙ্কি।

অ্যাডাম অবশ্য সেই জায়গায় তখন ছিল না। বড় সোফাটার পায়ের উপরে পা তুলে দিয়ে বসে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল এডওয়ার্ডসের দিকে।

বেশ কয়েক সেকেন্ড পরস্পরের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দুই পেশাদার ঘাতক। কোনও কথা না বলেও দু’জনেই বুঝে গেল, উল্টো দিকের লোকটা মোটেই সহজসরল নয়। নড়াচড়া, মুখের ভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি একটা কথাই বলছে। দু’জনেই বিপদকে নিয়ে ঘর করতে ওস্তাদ। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছে দু’জনে।

সোলাঙ্কি এক বার এর মুখের দিকে, আর এক বার ওর মুখের দিকে তাকিয়ে নিল। তার পরে দ্রুত বলল, “আমরা আর একটা নির্দেশ কঠোর ভাবে মেনে চলব এই অপারেশনে। কোনও আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখা চলবে না। ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। পুরোটাই খুব গোপনে করতে হবে। তা ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্রের কোনও প্রয়োজনও হবে না।”

পেন্টার এক বার কাঁধটা ঝাঁকাল। “আপনার কি মনে হয় আমি আমেরিকা থেকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এসেছি?”

শ্রোতা দু’জনের কেউ কোনও কথা বলল না।

তার পরে সোলাঙ্কি বলল, “ঠিক আছে। আপনি তৈরি হয়ে নিন। ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যে একটা গাড়ি হোটেলের নীচে অপেক্ষা করবে। মানে সাড়ে এগারোটা। আমরা একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ব।”

এডওয়ার্ডস এ বারও কোনও কথা বলল না। ঘর ফাঁকা হলে সে নিজের মোবাইলটা হাতে তুলে নিল। তার পরে গোপন এক গ্যালারি থেকে বার করে আনল কিশোরী মেয়েটার ছবি।

মিনিটখানেক অজন্তার ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল পেন্টার। তার মুখটা কঠিন হয়ে আসছে।

.

৪৮ ঘণ্টা লাগল না। সোলাঙ্কি আর অ্যাডাম যখন পেন্টারের হোটেলে পা রাখছে, তার কিছু সময় আগেই সূর্যের ফোনটা চলে এল রুদ্রাণীর মোবাইলে। ঘড়িতে তখন সকাল ন’টা।

“আমাদের দেখা করতে হবে, দ্রুত।”

.

বান্দ্রা-কুর্লা কমপ্লেক্সে এমটিএনএলের কাছেই যে-সিবিআই দফতর কাজ শুরু করেছে ২০১৬ সাল থেকে, সেখানেই সূর্যের অফিস।

তার কাছেই একটা চায়ের দোকানে সূর্যের সঙ্গে দেখা করল রুদ্রাণী। “আমি খবর নিচ্ছিলাম সুরাট নিয়ে। রাজা খুব একটা ভুল খবর দেয়নি। সন্দেহজনক গতিবিধি বেড়ে গিয়েছে ওই দিকটায়।”

“তোমরা বা ওখানকার পুলিশের কাছে খবর নেই এই ব্যাপারে?

সূর্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তুমি তো সবই বুঝতে পারছ সিবিআইয়ের হাতে কেস না এলে তো তদন্ত করে দেখা সম্ভব নয়। আর স্থানীয় পুলিশ সব সময় সব ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। এটাও অনেকটা সে-রকম।”

“তুমি কী খবর পেয়েছ?” রুদ্রাণী অধৈর্য হয়ে পড়েছিল।

হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল সূর্য। “সে-রকম কিছুই পাইনি। শুধু ভাসা ভাসা শুনেছি, ওখান থেকে অপারেশন হয়। কিন্তু নতুন কাউকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে কিছুই জানি না।” কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল সূর্য। তার পরে বলল, “আরও কিছু জানতে গেলে আমাদের সুরাট যেতে হবে।”

“তুমি ম্যানেজ করতে পারবে?”

“ম্যানেজ করে নিয়েছি। আজ শুক্রবার। উইকএন্ডটা বলে রেখেছি। মানে তিনটে দিন হাতে পাব।”

রুদ্রাণী উঠে দাঁড়াল। “তা হলে আর দেরি করে লাভ নেই। আমাদের এখনই সুরাট রওনা দিতে হবে।”

“ঠিক আছে। আমার গাড়িটা নিয়ে আসছি। সড়কপথে ঘণ্টা ছয়েক লাগবে সুরাট পৌঁছতে। এখন রওনা দিলে সন্ধ্যার আগে সুরাটে পৌঁছে যাব।”

.

প্রায় একই সময় দু’টো গাড়ি মুম্বই থেকে রওনা দিল সুরাটের উদ্দেশে। সূর্য আর রুদ্রাণীকে নিয়ে হন্ডা সিটি শহর ছাড়ার মিনিট তিরিশেক পরে একটা দামি এসইউভি-ও সুরাটের রাস্তা ধরল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *