১৯. দ্য ইনফর্মার্স
মুম্বই, ২০২৩
আন্ধেরির রেসকিউ হোমটার সামনে চায়ের দোকানটা সকাল থেকেই জমজমাট থাকে। একটু দূরেই রাস্তার মোড়টা। গাড়ি-ঘোড়া সব সময় চলছে। হোমের সিকিয়োরিটি গার্ড এবং অন্যান্যরা এসে চা খেয়ে যায়। এ ছাড়া টোস্ট- ডিম-পাওভাজি, এই ধরনের টুকটাক খাবার তো পাওয়াই যায় এখানে। তাই দোকানে কাজ করে যে-তিনটি ছেলে, তারা দম ফেলার ফুরসতই পায় না।
তিন জনের মধ্যে একটি ছেলের বয়স বছর বাইশেক। নাম চিন্ময়। বছর তিনেক হল এই দোকানে কাজ করছে। যথেষ্ট চালাক-চতুর। বেলা আটটা হয়ে গিয়েছে। পর পর অর্ডার পড়ছে টেবিলগুলো থেকে। বাঁ-দিকের রোয়ের তিন নম্বর টেবিলে বসে যে-দু’জন কথা বলছে, তাদের ছেলেটা ভাল করেই চেনে। এক জনের নাম রঞ্জিত। অন্য জনের নাম না জানলেও এইটুকু জানে যে, দু’জনেই সামনের রেসকিউ সেন্টারে কাজ করে। রঞ্জিত সিকিয়োরিটি গার্ড, অন্য জন সম্ভবত হিসাব-টিসাব রাখে। দু’জনেই বেশ গম্ভীর। খুব চাপা স্বরে কথা বলছে।
চিন্ময় একটু ভাবল। তার পরে ধীরে সুস্থে হাতের ট্রে-টা নিয়ে এগিয়ে গেল পাশের টেবিলটায়। চায়ের কাপটা ওই টেবিলে রাখলেও তার কানটা খাড়া ছিল পাশের টেবিলের কথাবার্তা শোনার জন্য। চাপা গলায় কথা বললেও চিন্ময়ের বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না। কারণ, কী বিষয়ে কথা হতে পারে, তার একটা আন্দাজ ছিল ছেলেটার।
রঞ্জিতের উল্টো দিকে বসা ছেলেটা প্রশ্নটা করল, “কিন্তু পালাল কী করে বল তো? তুই কিছু দেখিসনি রাতে?”
রঞ্জিত শুধু গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল। উল্টো দিকের ছেলেটা আর এই নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে চাইল না। সে ভালই জানে, এই হোমে এমন সব কাণ্ড ঘটে যা নিয়ে বেশি ভাবতে গেলে সমস্যা হয়ে যাবে। চায়ে চুমুক দেওয়ার আগে প্রায় নিজের মনেই বলল, “দু”দিনের মধ্যেই মেয়েটাকে ভাগিয়ে নিয়ে গেল। নিশ্চয়ই মেয়েটার খুব ডিমান্ড!”
রঞ্জিত চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে মুখ খুলল, “যাক গে, বেশি ভেবে লাভ নেই। নেপালি মেয়ে। ও থাকা, না-থাকা সমান। কেউ মাথায় ঘামাবে না।”
চিন্ময়ের আর এর চেয়ে বেশি কিছু শোনার দরকার ছিল না। সে এ রকম কিছুরই আশঙ্কা করেছিল। ধীরেসুস্থে ফাঁকা ট্রে-টা হাতে নিয়ে কিচেন কাউন্টারের দিকে এগোল। এ বার সময় করে ফোনটা করতে হবে।
.
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফোনটা পেয়ে গেলেন পাঞ্চালী। তাঁর নতুন অফিস এখন মুম্বইয়ে। এই সংস্থাটা তাঁরই। বিভিন্ন কারণে আগের সংস্থায় তাঁর পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু নিজেকে সরিয়েও আনতে পারেননি এই ভয়ঙ্কর মানুষ পাচারের দুনিয়া থেকে। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠতেন। একটা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি নিলেও বিবেক তাঁকে সেই কাজ করতে দেয়নি। আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে এই জগতে।
বেশ কয়েক বছর আগে, হরিয়ানার একটি ক্ষেতে দাঁড়িয়ে নিজের কাছে যে-প্রতিজ্ঞাটা করেছিলেন তিনি, তা এখনও ভোলেননি পাঞ্চালী। কিন্তু এইটুকু তিনি বুঝেছিলেন, তাঁর জীবন পণ করে লড়াইও সবাইকে বাঁচাতে পারবে না। বাঁচানো সম্ভব নয়। তিনি তো এই ভয়ঙ্কর জগৎটা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। পাঁচ বছর হল তাঁর বিয়ে হয়েছে। কিন্তু মা হওয়ার সাহস দেখাতে পারেননি। যে-জগতে তাঁর চলাফেরা, সেখানে আটকে পড়া শিশু-কিশোরদের জন্য কী নির্মম ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে থাকে, তা তিনি ভালই জানেন।
কাজ না করতে পারার অসহ্য যন্ত্রণা তাঁকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে এই জগতে। এ বার নিজস্ব একটা সংস্থা খুলে নিয়েছেন পাঞ্চালী। বছর তিনেক হল মুম্বইয়ে বসে কাজ করছেন। যতটা সম্ভব বিস্তার করেছেন তাঁর সংস্থার শাখাকে।
আগের দিনের মতো ফোনটা এই অফিসে বসেই রিসিভ করলেন পাঞ্চালী। একই জায়গা থেকে ফোন এসেছে। মিনিটখানেক শোনার পরে একটা কথা বলেই কলটা কেটে দিলেন, “চোখ-কানটা ভালমতো খুলে রাখিস। আর কোনও খবর পেলেই আমাকে জানিয়ে দিস।”
মোবাইলটা নামিয়ে রেখে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন পাঞ্চালী। এত দ্রুত যে-ওরা মেয়েটাকে সরিয়ে নিয়ে যাবে, তা তিনিও ভাবতে পারেননি। নিশ্চয়ই মেয়েটার ভাল চাহিদা আছে বাজারে। পাঞ্চালী বুঝলেন, তাঁকে আরও কয়েকটা ফোন করতে হবে। তাঁর আরও কয়েক জন ইনফর্মারকে। যদি এখনও কিছু করা সম্ভব হয়।
ইনফর্মার। শব্দটা অন্ধকার জগতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে আছে। এই সব ইনফর্মার ছাড়া পুলিশের চলে না। আবার গ্যাংদেরও প্রয়োজন হয়ে পড়ে ইনফর্মারদের। মানুষ পাচারের সঙ্গে যুক্ত যারা, তাদের ইনফর্মার-চেন তো সাঙ্ঘাতিক। দেশের নানা কোণ থেকে ক্রমাগত খবর চলে আসে। সে জন্য তাদের সঙ্গে লড়াই করতে গেলেও পাঞ্চালীদের মতো যোদ্ধাদের প্রয়োজন এই সব ইনফর্মারকে।
বছর দশেকের ওপর ধরে এই ক্ষেত্রে কাজ করার ফলে পাঞ্চালীর একটা ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় তৈরি হয়ে গিয়েছে এই সব ইনফর্মারকে নিয়ে। সবার উপরে তো ভরসা করা যায় না। পাঞ্চালী দেখেছেন, বছর তিরিশের মধ্যে যাদের বয়স, তাদের উপরে একটু বেশি ভরসা করা যায়। কেননা, এই ছেলে বা মেয়েগুলোর মধ্যে বিবেক কিছুটা জাগ্রত থাকে। এর চেয়ে বেশি বয়সের মানুষগুলো গ্রাহ্যই করে না কার কী হচ্ছে। কে মরল, কে বাঁচল। তাই পাঞ্চালী নজর রাখে এই বয়সের ছেলে-মেয়েদের উপরে।
চায়ের দোকান, পানের দোকানের ছেলে। টোটো-ট্যাক্সি চালক। নানা পানশালার ওয়েটার। বিভিন্ন বস্তিতে বসবাসকারী নিম্নবিত্ত কিছু মানুষ। এমনকি, পুলিশের খোচরও। এরাই হল পাঞ্চালীর ইনফর্মার। যাদের হাতে টাকা না থাকলেও মনটা এখনও অন্যের জন্য কাঁদে। তাই আড়ালে থেকে তারা যতটা পারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। তাদেরও যথাসম্ভব সাহায্য করেন পাঞ্চালী। এদের বেছে নিয়ে অবশ্য আলাদা করে একটু প্রশিক্ষণ দিতে হয়। কোন পরিস্থিতিতে চোখ-কান খোলা রাখা দরকার, কী কী ব্যাপারের উপরে নজর রাখতে হবে, এ সব পাখিপড়া করানোর মতো করে নিজের ইনফর্মারদের বোঝান পাঞ্চালী। এই রকমই কয়েকটা ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন তিনি। অনুরোধ করলেন, যদি এই মেয়েটাকে নিয়ে কোনও খবর পাওয়া যায়, তা হলে তাঁকে জানাতে।
অপরাজিতা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পরে।
রঞ্জিত বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল রাতের ডিউটি করতে যাবে বলে। কিন্তু বরিভালি স্টেশনে পৌঁছনোর আগেই থেমে যেতে হল তাকে। বড় রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়েছিল গাড়িটা। গাড়ির দরজা খুলে যে-গাঁট্টাগোট্টা লোকটা বেরিয়ে এল, তাকে দেখে রঞ্জিতের গলাটা খুব শুকিয়ে গেল। লোকটা কোনও কথা না বলে রঞ্জিতকে ইশারা করল পিছনের সিটে উঠতে। তার পরে নিজে এসে বসল রেসকিউ সেন্টারের সিকিয়োরিটি গার্ডের পাশে।
রঞ্জিতের কাঁধে হাত রেখে আনোয়ার সাপের মতো হিসহিস করে বলল, “মেয়েটা কীভাবে পালাল? কে ভাগাল? তুই কেন কিছু জানালি না?”
রঞ্জিত একটা ঢোক গিলল, “আমার সঙ্গে তো রতনের কথা হয়ে গিয়েছিল। এই ছেলেটাকে আগেও রতনের সঙ্গে দেখেছি। ছেলেটা এসে রাত বারোটার টাইম বলল। আমি ওকে ঘরে নিয়ে গেলাম। তার পরে তো দেখলাম, মেয়েটা সত্যিই ওকে চেনে। আমি আর কী জানাব!”
আনোয়ার চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারছিল, এ ক্ষেত্রে রঞ্জিতের কোনও দোষ নেই। যা করেছে সমীরই করেছে। তবে তার মারাত্মক রাগটা গিয়ে পড়ছিল রতনের উপরে। ওই মালটার বন্ধু সমীর। ওর জন্যই সব গুবলেট হয়ে গেল। সমীরের কথা ওই রতনই বলেছিল। কে জানে, ওর আলাদা কোনও মতলব আছে কি না।
রঞ্জিতের দিকে তাকিয়ে ফের হিসহিস করে বলে উঠল আনোয়ার, “ঠিক আছে, দেখছি। কিন্তু যদি জানতে পারি, আমাদের মিথ্যা কথা বলেছিস বা কিছু গোপন করেছিস, তা হলে জ্যান্ত তোর ছাল ছাড়িয়ে নেব। তুই তো জানিস, এটা আর এখন কথার কথা নেই।”
লোকটা আর একটা ইশারা করা মাত্র গাড়ির দরজা খুলে দ্রুত রাস্তায় নেমে এল রঞ্জিত। তার গা-টা গুলিয়ে উঠছে।
.
তিনটে দিন কেটে গেল।
তার পরে একটা ফোন পেলেন পাঞ্চালী। তাঁর এই ইনফর্মার মুম্বইয়ের এক পানশালার ওয়েটার। যেখানে সম্ভবত সব চেয়ে বেশি কথা আদানপ্রদান হয়। মদ পেটে পড়লে মুখটা চট করে খুলে যায় লোকের। তা সে যতই ঘাঘু মাল হোক না কেন। ওয়েটারের কাছ থেকে পুরোটা শোনার পরে পাঞ্চালী বুঝে গেলেন, মেয়েটাকে বাঁচানো সত্যিই কঠিন হয়ে যাবে।
তার একটা কারণ হল, স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের জন্য এই নেপালি মেয়েটার চাহিদা খুবই বেশি। ফলে যে-গ্যাংয়ের হাত থেকে মেয়েটা পালিয়েছে, তারা হন্যে হয়ে খুঁজছে ওকে। একই সঙ্গে আরও একটা খবর চাউর হয়ে গিয়েছে। মেয়েটা হয়তো ওই গ্যাংয়ের খুব উঁচু সারির কাউকে কখনও দেখে ফেলেছে। ফলে এই মেয়েটিকে হাতছাড়া করা যাবে না। আরও একটা নাম কানে এল পাঞ্চালীর।
ডক্টর ডেভিল!
এর মুখ প্রায় কেউ দেখেইনি। কিন্তু আড়ালে-আবডালে এই নামটা এখন বেশ শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের জগতে। পাঞ্চালী একটু আঁচ পাচ্ছিলেন, এই ডক্টর ডেভিলের কাজটা কী। মানুষ পাচারের সঙ্গে মেডিক্যাল ওয়ার্ল্ডেরও একটা বড় যোগ আছে। অর্গ্যান ট্র্যাফিকিং তো ডাক্তারদের মদত ছাড়া হওয়া সম্ভবই নয়। স্কিন ট্র্যাফিকিংও তাই। পেশাদার চিকিৎসক লাগবে সুচারু ভাবে চামড়াটা ছাড়িয়ে নিতে। শারীরিক ভাবে শিকারের কোনও ক্ষতি না-করে।
এই নেপালি মেয়েটাকে মনে হয় না কোনও ভাবে রক্ষা করা যাবে। তবু যদি কোনও খবর পাওয়া যায়। পাঞ্চালী নিঃশব্দে মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
.
চার দিন পরে মুম্বইয়ের স্থানীয় কাগজগুলোয় যে-খবরটা ভিতরের দিকে ছোট করে বেরিয়েছিল, তা অবশ্য পাঞ্চালীর চোখে পড়েনি।
একটা মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে আন্ধেরির একটি রাস্তার পাশে। দেখলেই বোঝা যায়, লোকটার উপরে প্রচণ্ড অত্যাচার করা হয়েছে খুন করার আগে। আর তার পরে ধারালো একটা ভোজালি জাতীয় কিছুর সাহায্যে পৌঁচ দিয়ে কাটা হয়েছে পেটটা। নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে রাস্তার ড্রেনের জল যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
কাগজে অবশ্য একটা কথা লেখা হয়নি। মরার আগে যা জানত, সবই বলে গিয়েছে রতন। খুব একটা কাজের কথা অবশ্য নয়। তবে একটা কথা কিরকির করছে আনোয়ারের মাথায়। সমীরের এক বন্ধু আছে যে-ক্যাব কোম্পানিতে গাড়ি চালায়!
