প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

১২. সুপ্ত আগুন

১২. সুপ্ত আগুন

গোরখপুর, উত্তরপ্রদেশ, ২০২৩

সময় হিসেব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল সমীর। সেই ঘটনার পরে ক’টা দিন কেটে গিয়েছে, তাও আর মনে করতে পারছে না। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছে দৃশ্যটা।

অপরাজিতার নিষ্প্রাণ দেহটা পড়ে আছে রাস্তায়। চোখ দু’টো খোলা। মেয়েটা শেষ বার কী দেখতে চেয়েছিল? সমীর জানে না। সে শুধু জানে, অপরাজিতাকে বাঁচাতে পারেনি সে। হার মানতে হয়েছে তাঁকে। এবং যার মূল্য চোকাতে হয়েছে ওই মেয়েটাকে। যে-বাঁচতে চেয়েছিল।

কীভাবে যে-ওই রাতে বেঁচে ফিরতে পেরেছিল সমীর, তা সে নিজেও জানে না। ক’দিন আগের স্মৃতিও ধূসর হয়ে এসেছে তার মনে।

.

…কাঁধ রক্তে ভিজে যাচ্ছিল, কিন্তু যন্ত্রণা আর টের পাচ্ছিল না। টলতে টলতে স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার এক কোণে, অন্ধকারের মধ্যে একটা দোকানের সামনে বসে পড়েছিল সমীর। তার ভাগ্য ভাল, কেউ এসে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।

শরীর অসাড় হয়ে এলেও তার মস্তিষ্ক একটা সিগনাল দিচ্ছিল বার বার। বাঁচতে হবে, বাঁচতে হবে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে সমীর বার করে এনেছিল মোবাইলটা। গোরখপুর স্টেশন থেকে বেশি দূরে নয় তাদের বাড়ি। এই এলাকা তার চেনা। সব চেয়ে বড় কথা, এই স্টেশনের কাছাকাছি তার দু’-এক জন বন্ধুও থাকে। তাদের এক জনের নম্বর রয়েছে মোবাইলে। সমীর কোনও মতে মোবাইলে নামটা খুঁজে বার করে কল বাটনটা টিপল।

ঘড়িতে ক’টা বাজে, সমীরের তখন দেখার কোনও ইচ্ছেই ছিল না। বা মাথাতেও আসেনি। তার সহজাত প্রবৃত্তি তাকে বাঁচার রাস্তাটা শুধু দেখাচ্ছিল। রাত আড়াইটে নাগাদ ফোনটা পেয়ে চমকে উঠেছিল বন্ধু। এত রাতে সমীর তাকে ফোন করবে, এটা সে ভাবতেই পারেনি। অল্প কয়েকটা কথা বলতে পেরেছিল সমীর। গুলিতে জখম হওয়ার কথাটা আর সে স্টেশনের বাইরে কোথায় রয়েছে, তার একটা ইঙ্গিত দেওয়া।

বন্ধু আর দেরি করেনি। তার ভাইকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ি বার করে চলে এসেছিল স্পটে। আসতে মিনিট দশেকের বেশি সময় লাগেনি। একটু দূর থেকেই দেখেছিল, স্টেশন চত্বরে তখন পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়েছে। একটা অ্যাম্বুল্যান্সও দাঁড়িয়ে আছে।

গাড়িটা একটু দূরে রেখে রাস্তার বাঁ দিকের দোকানগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটতে লাগল দুই ভাই। মিনিট পাঁচেক পরেই দেখতে পেল চাদরমোড়া চেহারাটাকে। এর পরে আর বিশেষ সমস্যা হয়নি। সমীর তখনও জ্ঞান হারায়নি। কোনও মতে দু’ভাই তাকে দু’পাশে ধরে গাড়িতে তোলে। তার পরে চেনাশোনা এক ডাক্তারের বাড়িতে। এই সব অঞ্চলের অনেক লোকেরই নানা সময় টুকটাক গুলি লেগেছে। তারা বেঁচে গেলে সব সময় হাসপাতালে যায় না। পরিচিত ডাক্তাররাই গুলি-টুলি বার করে যা করার করে দেন। পুলিশের ঝামেলায় আর কে পড়তে চায়।

সে-রকমই এক ডাক্তার সমীরের কাঁধের গুলিটা বার করে দিলেন। অপারেশন শেষ করে সমীরের বন্ধুর দিকে তাকিয়ে ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, “তোমার বন্ধুর ভাগ্য ভাল গুলিটা ফ্লেশি পার্টে লেগেছিল। মাংসে গেঁথে যায়। তাই বিশেষ ক্ষতি করেনি। ব্যান্ডেজ করে দিলাম। দিন সাতেক বাদে এক বার দেখিয়ে যেও। আশা করি, সমস্যা হবে না।”

শারীরিক সমস্যা হয়নি সমীরের। কিন্তু মানসিক যন্ত্রণা তাকে বিধ্বস্ত করে দিচ্ছিল। ওই অবস্থায় বাড়িতে ফিরে আসতে হয়েছিল সমীরকে। আর তাকে বাড়ি ছেড়ে বেরোতে দেননি সমীরের মা। দিন দশেক হয়ে গেল বাড়িতেই রয়েছে সমীর। কাঁধের চোটটা অনেকটাই সেরে গিয়েছে। কিন্তু বাবা-মা ভয় পাচ্ছেন, বাড়ির বাইরে বেরোলে ছেলে হয়তো আর বেঁচে ফিরবে না। ভয়টা অমূলক ছিল না।

.

গোরখপুর প্ল্যাটফর্ম থেকে সেই রাতে সুমোটা বেরিয়ে সোজা লখনউয়ের দিকে ছুটেছিল। লখনউ অবশ্য খুব বেশি দূরে নয়। ২৭০ কিলোমিটার। ফাঁকা রাস্তায় দ্রুতগতির গাড়ি আনোয়ারদের ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেয়। আনোয়ারের দুই সঙ্গী ছাড়াও ছিল স্থানীয় দুই ভাড়াটে খুনি। যাদের মধ্যে এক জন গুলি চালিয়েছিল সমীরের দিকে। গাড়ি থেকে নামার আগে আনোয়ার তাকে এক বার জিজ্ঞেস করল, “কী রে, ছেলেটা টপকে গিয়েছে তো? ওর বডিটা তো আর দেখা হল না।”

“আরে তুমি ভাবছ কেন গুরু! দু’টো গুলি লেগেছে। বডিটা কীভাবে ছিটকে গিয়ে পড়ল দেখলে না। ও মালটা আর বেঁচে নেই।”

আনোয়ারের মনটা তাও খুঁতখুঁত করছিল। মেয়েটার লাশটা সে নিজে দেখে নিয়েছে। সমীরেরটা দেখা হল না। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আনোয়ার বলল, “তাও এক বার ভাল করে খোঁজ নিস। লাশটা পুলিশ পেল কি না। না পেলে চোখকান খোলা রাখবি। দেখলেই মেরে দিবি।” বলে ছেলেটার হাতে টাকার খাম আর নিজের ভোজালিটা তুলে দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল আনোয়ার।

তারা লখনউ থেকে দিল্লির বিমান ধরে দ্রুত বেরিয়ে যাবে। তার পরে দিল্লি থেকে মুম্বই। গাড়িতে আসতে আসতেই ফোনে কথা বলে নিয়েছিল আনোয়ার। প্লেনের টিকিটও তার ই-মেলে চলে এসেছে। আনোয়ারও এখন জানে মেল থেকে কীভাবে টিকিট বার করতে হয় বা কীভাবে ওয়েব চেক ইন করতে হয়। এই যুগে এ সব না জানলে চলে! তিনটে মূর্তিই হাঁটা দিল লখনউ বিমানবন্দরের দিকে।

.

মুম্বই পৌঁছনোর পরে একই প্রশ্নের মুখে পড়তে হল আনোয়ারকেও। “ওদের দু’জনের কী হল?”

“মেয়েটার পেট ফাঁসিয়ে দিয়েছি আমি নিজে। ওকে জ্যান্ত অবস্থায় গাড়িতে তোলা যায়নি। ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল। পুলিশও এসে গিয়েছিল প্রায়। তাই আর ঝুঁকি নিতে পারিনি। মেরে দিয়েছি। লাশটা নিজের চোখে দেখে নিয়েছি।”

“আর ছেলেটা?” লম্বা লোকটা ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল।

“দু’টো গুলি লেগেছিল ওর শরীরে। বডিটা স্টেশনের পাশে গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মেয়েটা গাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল দেখে, আমাদের তাড়াতাড়ি স্পটে পৌঁছতে হয়। পুলিশও গুলির শব্দ পেয়ে গিয়েছিল। তাই ছেলেটার বডি আর দেখা হয়নি।” উল্টো দিকের লোকটার দিকে এক বার তাকিয়ে আনোয়ার কথা শেষ করল, “তবে চিন্তা করার কিছু নেই। ও মরে গিয়েছে। দু’টো গুলি হজম করার ক্ষমতা ওর নেই।”

লোকটা কী ভাবল। তার পরে বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু খোঁজ নাও। মালটা মরেছে কি না।”

পরের দিন যে-খবরটা পাওয়া গেল, সেটা আনোয়ারকে একটু চিন্তায় ফেলে দিল। একটাই লাশ মিলেছে। মেয়েটার। সেটাই ওখানকার স্থানীয় খবরের চ্যানেলগুলো আর সংবাদপত্রে দেখানো হয়েছে। কিন্তু কোনও ছেলের কথা বলা হয়নি।

তা হলে কি মালটা বেঁচে গেল? আনোয়ার আবার ফোন করল গোরখপুরে। পরিষ্কার নির্দেশ দিল, ছেলেটা কোথায় গেল খুঁজে বার করতে। আর খোঁজ পেলেই মাথাটা নামিয়ে দিতে। তাকেও উপরওয়ালাদের কাছে জবাব দিতে হবে। তবে আনোয়ারের আশা ছিল, ছেলেটা ওখানে না মরলেও হয়তো দু’-এক দিনের মধ্যে অন্য জায়গায় গিয়ে মরবে। আর না মরলেও সাহস হবে না মুম্বইয়ে ফিরে আসার। মৃত্যুকে যে-এত কাছ থেকে দেখেছে, সে আর ভুলেও যমদূতের সামনে আসবে না।

আরও কয়েকটা দিন কেটে গেল। পাঞ্চালী নানা জায়গায় লোক লাগিয়েছেন। ছবিগুলোও মোবাইল মারফত তাঁর ইনফর্মারদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

একটা কথা রুদ্রাণীকে বলেননি পাঞ্চালী। নেপালি মেয়েটার খুন হয়ে যাওয়ার কথা। এখনও দু’টো ঘটনার মধ্যে কোনও যোগসূত্র খুঁজে পাননি তিনি। কিন্তু মনে একটা সন্দেহ উঁকি মারছে।

একটা ডায়েরি খুলে বসলেন তিনি। এখানে কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট লিখে রাখেন পাঞ্চালী। সেই রকম একটা পয়েন্টে চোখ পড়ল তাঁর। যে-দিন নেপালি মেয়েটার রেসকিউ হোমে যাওয়ার খবরটা পেয়েছিলেন। মানে ধরে নেওয়া যায়, সে দিন থেকে মেয়েটা হাতছাড়া হয়েছে গ্যাংটার।

এর পরে আর একটা পয়েন্টের উপরে চোখ বোলালেন পাঞ্চালী। যে-দিন রুদ্রাণী তাঁকে ফোনটা করে অজন্তার খবরটা দেয়। অজন্তা তারও দিন পনেরো আগে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। পাঞ্চালী একটা হিসেব কষতে বললেন। অজন্তার ঘটনাটা ঘটেছে ওই নেপালি মেয়েটা পালিয়ে যাওয়ার প্রায় দিন দশেক পরে।

অজন্তাকে তোলার জন্য যেন মরিয়া হয়ে উঠেছিল গ্যাংটা। কেন হঠাৎ ওরা এত বেপরোয়া হয়ে উঠল? তা হলে কি ওরা নেপালি মেয়েটার বদলি খুঁজছিল? নেপালি মেয়েটাকে দেখেননি পাঞ্চালী। কিন্তু মোটামুটি ধারণা আছে চেহারাটা কী রকম হবে। অজন্তার চেহারাটা তাঁর চোখের সামনে ভাসছে। যোগসূত্রটা তাঁর মোটেই ভাল ঠেকছে না। দ্রুত কিছু খবর পাওয়া দরকার। না- হলে অজন্তাও হারিয়ে যাবে চিরতরে।

আরও বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেল। তার পরে চাকাটা গড়াতে শুরু করল। বেশ দ্রুতগতিতে।

.

ক্ষতটা প্রায় সেরেই এসেছে সমীরের। হাতে একটা যন্ত্রণা অবশ্য আছে। ডান হাতটা তুলতে কষ্ট হয়। ওই ডাক্তার বলেছে, সময় দিতে হবে আরও। তা হলে ব্যথাটা চলে যাবে। কয়েকটা ব্যায়াম তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। যেগুলো নিয়মিত করলে হাতটা সচল থাকবে। কাঁধটা সমস্যা ছিল না সমীরের কাছে। সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়।

আবার সেই দুঃস্বপ্নটা ফিরে এসেছে। আবার মেয়েটা তাঁর দিকে তাঁকিয়ে আঁকুতির স্বরে প্রশ্ন করছে। তবে এ বার প্রশ্নটা বদলে গিয়েছে। মেয়েটা দু’হাত বাড়িয়ে তাঁকে প্রশ্ন করে চলেছে—

কেন আমাকে বাঁচতে দিলে না? কেন আমাকে মেরে ফেললে তোমরা?

স্বপ্নটা তাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না। মাঝরাতে বিছানায় উঠে বসে থাকছে ছেলেটা। কাঁধের যন্ত্রণাটা এই যন্ত্রণার কাছে কিছুই নয়।

বাড়ি থেকে এখনও বাইরে যাওয়ার অনুমতি পায়নি সমীর। সে-ও জানে, তাকে যখন এক বার খুঁজে পেয়েছে ওরা, কিছুতেই ছাড়বে না। আজ না হোক কাল, ঠিক মেরে দেবে। ক’দিন আর লুকিয়ে থাকবে সে?

একটা একটা করে দিন যাচ্ছে আর যন্ত্রণাটা বেড়েই চলেছে। সমীরের মনে হচ্ছে সে পাগল হয়ে যাবে। ঘাতক তাকে খুঁজে বার করার আগেই তাকে আত্মহত্যা করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলল সমীর। সে আর পালিয়ে বেড়াবে না। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও সে লড়াই করবে। কাপুরুষ হয়ে মরতে চায় না সমীর!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *