প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

২০. সোনার হরিণ

২০. সোনার হরিণ

মুম্বই-পুণে-কলকাতা, ২০২৩

মিনিট পনেরো সময় লেগেছিল। সুইফ্ট ডিজায়ার গাড়িটা যখন দাদারের শিবনেরি বাস স্ট্যান্ডে এসে থেমেছিল, তখন রাত দু’টো। গাড়ির চালক বন্ধুকে ধন্যবাদ জানিয়ে অপরাজিতার হাত ধরে মহারাষ্ট্র স্টেট রোড ট্র্যান্সপোর্ট কর্পোরেশনের অফিসের দিকে এগোতে লাগল সমীর।

যখনই ঠিক করে নিয়েছিল অপরাজিতাকে উদ্ধার করার জন্য ঝাঁপাবে, তখনই একটা পরিকল্পনা ছকে নেয় সমীর। সে জানে, অপরাজিতার পালিয়ে যাওয়ার খবরটা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গ্যাংয়ের কাছে পৌঁছে যাবে। তার পরেই শুরু হবে পিছু ধাওয়া। তাই তাদের কিছু দিন আত্মগোপন করে থাকতেই হবে।

ব্যাঙ্কে যা জমেছিল আর হাতে যা ছিল, তা নিয়ে ক্যাবচালক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে সমীর। এই বন্ধুটি অবশ্য সহজেই রাজি হয়ে যায় সমীরকে সাহায্য করতে। মনস্থির করার পরে সমীরের মাথায় একটাই চিন্তা ছিল। অপরাজিতা তার সঙ্গে আসতে রাজি হবে কি না। যখন অপরাজিতার হাতটা ধরে রেসকিউ হোম থেকে সে বেরিয়ে আসছে, সমীরের মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত আনন্দ খেলা করছিল। সেই আনন্দের স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তাঁর যাবতীয় দুশ্চিন্তাকে। এই ভাবে পালালে কী পরিণতি হতে পারে তাদের, সত্যিই কি তারা বাঁচতে পারবে ওই নৃশংস মানুষগুলোর হাত থেকে, জীবন না মৃত্যু, কী অপেক্ষা করে আছে রাস্তার শেষে, এ সব দুশ্চিন্তা যেন ভেসে চলে গিয়েছিল কোথায়। সমীর শুধু বর্তমানে বিচরণ করছিল। আর বুঝতে চেষ্টা করছিল, মেয়েটা কী ভাবছে! মেয়েটা যে-তার উপরে ভরসা করছে, বিশ্বাস রেখেছে, সেটা বুঝে গিয়েছিল সমীর। আর বুঝেছিল বলেই নিজের কাছে নিজেই একটা প্রতিজ্ঞা করল ছেলেটা। তার জীবন যায় যাক, কিন্তু অপরাজিতার কোনও ক্ষতি হতে দেবে না সে!

কিন্তু পালাবে কোথায়? বেশ কয়েকটা জায়গার নাম মাথায় এসেছিল তার। মুম্বইয়ের আশেপাশে তার কয়েক জন পরিচিত লোক থাকে। এদের কারও কাছে কয়েক দিন গিয়ে থাকা যেতে পারে। সে-রকমই একটা শহর বেছে নিল সমীর। পুণে। ওখানে বালেওয়াড়ির কাছে তার এক বন্ধু থাকে। অপরাজিতাকে নিয়ে পালানোর আগে সেই বন্ধুকে ফোনটা করে সমীর। এ সব ক্ষেত্রে যা বলতে হয়, সেটাই বলেছিল বন্ধুকে।

“শোন, তোর বাড়িতে কয়েকটা দিন থাকা যাবে? আমি আর আমার বান্ধবীর একটু জায়গা দরকার।”

এর পরে গল্পটা শুনিয়েছিল সমীর। তার বান্ধবীর সঙ্গে মুম্বই ছেড়ে পালাতে চলেছে সে। স্বাভাবিক ভাবেই বান্ধবীর বাড়ির লোক সেটা চায় না। কিন্তু ওরা বিয়ে করতে মরিয়া। কয়েকটা দিন একটু আত্মগোপন করে থাকতে চায়। তার পরে সব কিছু ঠান্ডা হলে বিয়েটা করে শ্বশুরবাড়ি যাবে।

বন্ধু বেশ উৎসাহের সঙ্গেই রাজি হয়ে গেল। কিন্তু একটা কথা বলে দিল, “দ্যাখ, একটা ঘরের ব্যবস্থা আমাদের বাড়িতে হয়ে যাবে। কিন্তু আমার বাড়ির লোককে বলবি, তোরা বিবাহিত। প্রয়োজনে সিঁদুর-টিদুর যা লাগানোর, লাগিয়ে নিস। বিবাহিত না-হলে অনেক প্রশ্ন উঠবে। বাড়ির লোকদের বলব, তোদের সদ্য বিয়ে হয়েছে। পুণে বেড়াতে এসেছিস মুম্বই থেকে।”

সমীর রাজি হয়ে গেল। টিকিট কাউন্টার থেকে ভোর সাড়ে পাঁচটার বাসের দু’টো টিকিট কেটে নিয়ে দু’জনে এসে বসল স্ট্যান্ডের গুমটিতে রাখা চেয়ারে। হোম থেকে বেরিয়ে আসার পরে দু’জনের মধ্যে কোনও কথা হয়নি। সমীর বুঝল, এ বার তাকে সব পরিষ্কার করে বলতে হবে।

.

রতনকে খুন করার পরে আনোয়ার বুঝতে পারছিল, তারও এমন দশা হবে মেয়েটাকে খুঁজে বার করতে না পারলে। কোনও এক জন এসে তার পেটটা ফাঁসিয়ে দিয়ে চলে যাবে।

তার সঙ্গীরা হন্যে হয়ে খোঁজা শুরু করল সমীর আর ওর বন্ধুকে। ধারাভির যে-বস্তিতে ছেলেটা থাকত, সেখানে গিয়ে দেখল দরজায় তালা। সমীরের সঙ্গী ছেলেটা এখনও মুম্বই ফেরেনি। আশেপাশের লোকেরা জানাল, কয়েক দিন আগে সমীরকে ঘর তালাবন্ধ করে বেরিয়ে যেতে দেখেছে। তার পর থেকে কোনও খোঁজ নেই।

আরও কয়েকটা দিন কেটে গেল। আনোয়ার এ বার চিন্তায় পড়ে যাচ্ছে। তার উপরে চাপ আসছে, যে-করে হোক ওদের খুঁজে বার করতেই হবে। আনোয়ার জানে, যারা চাপ দিচ্ছে, তারা খুব সহজ মানুষ নয়। তার সময়ও শেষ হয়ে আসছে।

সে ঠিক করে নিল, এক বার ওই হোমের সামনেটায় যেতে হবে। সে দিন সমীর আর মেয়েটা ওখান থেকে কীভাবে পালিয়েছিল, সেটা খুঁজে পেতে হবে। তার থেকে যদি কিছু হদিশ পাওয়া যায়।

.

সে রাতে নিজের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লিভিংরুমে বসেও ঘামছিলেন ডক্টর ডেভিল। তাঁর কাছেও ওপর মহল থেকে বার্তা এসেছে। বিদেশি এক ক্লায়েন্ট ভাল ‘স্কিন’-এর খোঁজ শুরু করেছে। এই ক্লায়েন্টের সঙ্গে কিছু দিন আগে তিনি নিজেই দেখা করে এসেছিলেন। এই ক্লায়েন্টকে চটানোর কোনও প্রশ্নই নেই। এই মার্কিন ধনকুবেরকে তাঁদের দলে প্রয়োজন। এই ক্লায়েন্টকে চটালে বস তাঁকে ছাড়বে না।

বেশ খানিকটা সময় ভেবে নিলেন ডক্টর। তার পরে মোবাইলে একটা নম্বর ডায়াল করলেন, “আমাদের দেখা করা খুবই দরকার। কালকে দুপুরে ক্লাবে চলে এসো।”

বান্দ্রার অভিজাত ওই ক্লাবের একটা কোণের দিকে বসে ছিলেন দু’জন। সামনে ইটালীয় খাদ্যের সমাহার। দু’জনের কারও অবশ্য খাওয়ার মেজাজ ছিল না। মাঝেমধ্যে পানীয়র গ্লাসে চুমুক মারছিলেন দু’জনে। তার পরে ডক্টরের সঙ্গী মুখ খুলল, “কী করা যায় তা হলে? নেপালি মেয়েটা থাকলে কোনও সমস্যাই ছিল না। স্যাম্পল পাঠিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু ওকে তো খুঁজেই পাওয়া যায়নি এখনও।”

ডক্টর ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, “নেপালি মেয়েটার কোনও স্কিন স্যাম্পল কি আমাদের কাছে মজুত করা আছে?”

লোকটা একটু ভেবে নিয়ে জবাব দিল, “না নেই। ওর যা স্কিন ছিল, সবই বিক্রি হয়ে গিয়েছে। আমাদের হাতে অবশ্য কয়েকটা পুরনো মেয়ে আছে। আপনি তো সেটা জানেন।”

ডক্টর মাথা নাড়লেন, “ওই মেয়েগুলোকে তো আমি দেখেছি। ওদের দিয়ে হবে না। এই মেয়েটার চামড়া অতি উৎকৃষ্ট পর্যায়ের ছিল।” পানীয়ের গ্লাসে একটা চুমুক দিলেন ডক্টর। তার পরে মুখ খুললেন, “আমাদের অজুহাত দিলে চলবে না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের কাউকে চাই, যার স্কিন স্যাম্পল বিদেশে পাঠানো যাবে। যার চামড়ার মান এই নেপালি মেয়েটার মতো হবে।”

লোকটা একটু চুপ করে থাকল। তার পরে বলল, “আমরা কয়েকটা মেয়ের উপরে নজর রেখেছিলাম। তাদের জালে ফেলার কাজটাও শুরু হয়ে গিয়েছে। ওদের ছবিগুলো এক বার দেখতে পারেন।”

ডক্টর এক বার ঘাড়টা ঘুরিয়ে চারদিক দেখে নিলেন। এখানে কেউ আড়ি পাতবে না। সিসিটিভি-তেও ধরা পড়ার ভয় নেই। এটা একটা এক্সক্লুসিভ ক্লাব। শুধু সদস্য আর তাঁদের অতিথিরাই আসতে পারেন। আর সদস্যপদ পাওয়াও খুব সোজা নয়।

“দেখি কী আছে।”

লোকটা ট্যাবলেটটা এগিয়ে দিল। ডক্টর স্ক্রল করে পর পর কয়েকটা ছবি দেখে নিলেন। তার পরে একটা ছবিতে এসে আটকে গেলেন।

“এই মেয়েটার চামড়াটা তো খুবই ভাল লাগছে। এর কী অবস্থা?”

লোকটা ছবিটা এক বার দেখে নিল। “এই মেয়েটা অনেকটাই জালে জড়িয়ে গিয়েছে। আমাদের অপারেটিভ মেয়েটাকে সামনে থেকে দেখেওছে। মেয়েটার স্কিন সত্যিই দুর্দান্ত। তবে একটু ঝুঁকি থেকে যাবে মেয়েটাকে সরিয়ে আনলে। হইচই হতে পারে। বড়লোক বাড়ির মেয়ে। বাবা-মা বড় চাকরি করে।

ডক্টর আবার সময় নিলেন ভাবতে। তার পরে ধীর গলায় বললেন, “যা হওয়ার হবে। এই মেয়েটাকে আমার চাই। যে-করে হোক এক সপ্তাহের মধ্যে ওকে আমার সামনে হাজির করো।”

.

রাজা মুম্বই চলে যাওয়ার পরে অজন্তার মনটা খারাপ হলেও সেই ভয়ঙ্কর মানসিক অবস্থাটা কাটিয়ে উঠেছিল। রাজা তাকে সত্যিই ভালবাসে। তাদের জন্য ভবিষ্যৎ কী নিয়ে অপেক্ষা করে আছে, সেটা অজন্তা জানে না। সে শুধু এই ভাললাগার মুহূর্তটা উপভোগ করে যেতে চায়। রাজা ছেলেটা বাকিদের  চেয়ে অনেকটাই অন্য রকম। সে তার কয়েক জন বন্ধুর কাছ থেকে শুনেছে, এই ধরনের চ্যাটে যে-সব ছেলে বন্ধুত্ব পাতায় তারা কয়েক দিনের মধ্যেই মেয়েদের থেকে খোলামেলা ছবি চায়। ভিডিয়ো কলে নোংরা নোংরা কথা বলতে চায়। এক দল তো আবার বান্ধবীদের থেকে টাকাও চেয়ে বসে। রাজা এই কোনও দলেই পড়ে না। এখনও পর্যন্ত একটাও অশ্লীল কথা তার সঙ্গে বলেনি। তাঁর কোনও খোলামেলা ছবিও দেখতে চায়নি। এমনকি, অজন্তার মনে হয়েছে, রাজা তাকে খুব একটা খোলামেলা পোশাকে দেখতেও চায় না। সত্যি, রাজা ছেলেটা একেবারেই অন্য রকম। রাজা যেন একটা দুর্নিবার ঘূর্ণি, যার টানে সে ক্রমে নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।

মনের মধ্যে ঝড়টা থেমে যাওয়ার পরে নিজেও শান্ত হয়ে গিয়েছিল অজন্তা। বুঝতে পারছিল, মায়ের সঙ্গে ব্যবহারটা বেশ খারাপই করে ফেলেছে।

মা-ও অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেন মেয়েকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দেখে। নিজেকে বোঝালেন, তিনি অহেতুক চিন্তা করছিলেন। মিতুল ওই ধরনের মেয়েই নয়। পড়াশোনার বাইরে তার কোনও জগতই নেই। জীবন আবার স্বাভাবিক রাস্তায় চলে এল অজন্তার জন্য।

কিন্তু সেটা মাত্র কিছু দিনের জন্য। তার পরেই ফোনটা এল।

দিনটা ছিল বুধবার। প্রতি দিনই একটা নির্দিষ্ট সময়ে রাজার ফোন আসে মুম্বই থেকে। ইনস্টাগ্রাম কল। রাজা কখনও মোবাইল নম্বরে কল করে না। শুধুই ইনস্টাগ্রাম। কলটা সে দিনও এসেছিল। আর উল্টো দিক থেকে রাজা যে-কথাগুলো বলল, তা শুনে মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠল অজন্তার।

“তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দিতে চাই।”

“কী সারপ্রাইজ?” কপট গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল অজন্তা।

“আমি আবার কলকাতায় এসেছি!”

“মানে!” রাজার কথা শুনে অজন্তার মনটা নেচে উঠলেও নিজেকে সামলে নিল সে। “আবার চাল মারছ?”

“আরে শোনো না পুরো কথাটা। আমার দাদা-বৌদির কলকাতায় আসার দরকার ছিল। ওরা আগে আসেনি। আমি শুনেই সুযোগটা লুফে নিলাম। ওদের গাইড হিসেবে কলকাতায় চলে এসেছি।”

অজন্তাও রীতিমতো খুশি হয়ে উঠল, “কাজের কাজ করেছ। তা ক’দিন থাকবে?”

“পরশু ফিরে যাব। কিন্তু তার আগে তোমার সঙ্গে দেখা করতে হবে। সে জন্যই তো আমার আসা।”

অজন্তা একটু ইতস্তত করে বলল, “কিন্তু তোমার দাদা-বৌদি থাকবে তো! তুমি আসবে কী করে?”

চাপা হেসে রাজা জবাব দিল, “তোমার কথা বলেছি ওদের। ওরা জানে আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাব। ওরাও থাকবে। তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চায়।”

“কী যে-বল, তার ঠিক নেই।” অজন্তা একটু লজ্জা পেয়ে গেল।

রাজা বলে চলল, “আরে, ওরা খুবই ভাল মানুষ। আলাপ করে দেখো। খুব ভাল লাগবে। বিশেষ করে বৌদিকে। ও তোমার মতোই পড়াশোনায় তুখোড়। পিএইচ ডি করেছে। কলেজে পড়ায়।”

অজন্তা একটু একটু করে সহজ হচ্ছিল।

“তুমি একটা কাজ করো। বেশি দূর যেতে হবে না। তোমাদের যাদবপুরের কাছে একটা বাসস্ট্যান্ড আছে না…,” রাজা মনে করার চেষ্টা করল নামটা।

“কীভাবে দেখা করবে?”

“এইট বি।”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, এইট বি। ওই বাসস্ট্যান্ডের সামনে কাল দুপুর একটা নাগাদ চলে এস। আমরা গাড়ি নিয়ে আসব। তোমাকে তুলে নেব ওখান থেকে। তার পরে বাইপাসের ধারে কোথাও খেয়ে নিয়ে তোমাকে আবার পছন্দ মতো জায়গায় ড্রপ করে দেব। বড়জোর ঘণ্টা দুয়েক তোমাকে বাইরে থাকতে হবে।” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল রাজা।

অজন্তা হিসেব করে নিল। এ বার সে মাকে বলেই বেরোবে। বলবে, বন্ধুর কাছে একসঙ্গে পড়তে যাচ্ছে। বন্ধুকেও জানিয়ে রাখতে হবে ব্যাপারটা। মা ফোন করে খোঁজ নিলে যাতে ছোট্ট একটা মিথ্যা কথা বলে তাকে বাঁচিয়ে দিতে পারে!

এর পরে দুপুরে বেরিয়ে যেতে সমস্যা হবে না। একটু বেশি সময় লাগলেও আশা করছে, পাঁচটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসতে পারবে। রাজার সঙ্গে দেখা করার জন্য এইটুকু মিথ্যার আশ্রয় তো নেওয়াই যায়। বিশেষ করে ছেলেটা যখন সেই মুম্বই থেকে কলকাতা ছুটে এসেছে, তার সঙ্গে দেখা করবে বলে। তাকে তো আর মুম্বই যেতে হচ্ছে না।

.

অজন্তা মোবাইলটা নামিয়ে রাখার মিনিট পাঁচেক বাদে মুম্বইয়ের বান্দ্রা- কুর্লা কমপ্লেক্স অঞ্চলের একটা বাড়িতে আলোচনায় ডুবে গেল তিন ব্যক্তি। এদের মধ্যে প্রথম জন কয়েক দিন আগে ডক্টর ডেভিলের সঙ্গে ওই বিশেষ ক্লাবে হাজির ছিল।

তিন জনের মধ্যে চশমা পরা বেঁটেখাটো লোকটা গম্ভীর মুখে বলে উঠল, “এই কাজটা কিন্তু অত্যন্ত ঝুঁকির হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটাকে কলকাতা থেকে কিডন্যাপ করতে হচ্ছে। তার পরে অতটা রাস্তা পার করে মুম্বই নিয়ে আসতে হবে। প্লেনে তো আনা সম্ভব নয়। এ তো আর স্বেচ্ছায় আসছে না।”

প্রথম জন এ বার মুখ খুলল, “প্লেন নয়, ট্রেনে আসছে। কলকাতা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ ট্রেন ছাড়বে। আমাদের লোক ট্রেনটার ফার্স্ট ক্লাস কেবিন বুক করে রেখেছে। চার জনের সিট। দরজা টেনে দিলে প্রাইভেসি থাকবে। দু’টো মেয়ে আর দু’টো ছেলে। মেয়ে দু’জন অবশ্যই বোরখা পরে থাকবে। কারও সাহস হবে না বোরখা সরিয়ে দেখতে।”

“কিন্তু মেয়েটা তো চেঁচামেচি করতে পারে। তখন কী করবে?” চশমা পরা লোকটার উদ্বেগ যাচ্ছিলই না।

প্রথম লোকটা আবার জবাব দিল, “সে জন্যই তো স্পেশাল কে বা কিটক্যাট আছে!”

এ বার চশমা পরা লোকটা হাসল। সত্যিই স্পেশাল কে-র ব্যাপারটা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

.

স্পেশাল কে, কিটক্যাট, হর্স ট্র্যাঙ্ক। বাজার চলিত অনেক নাম আছে ড্রাগটার। মেডিক্যাল নাম হল কেটামিন। তবে আর একটা বিশেষ নামে কুখ্যাত হয়ে আছে এই বস্তুটি। ডেট রেপ ড্রাগ

অনেক পার্টিতে বা ডেটিংয়ের সময় মেয়েদের এই ড্রাগটি খাইয়ে দেওয়া হয়। এই ড্রাগের বিশেষত্ব হল, কোনও গন্ধ বা স্বাদ নেই। তরল বা পাউডার আকারে মেলে এই ড্রাগ। ইঞ্জেকশনের সাহায্যে শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সময় টেনে নেওয়া যায়। বা পানীয়র সঙ্গেও ও মিশিয়ে দেওয়া যায়। সব চেয়ে দ্রুত কাজ করে ইঞ্জেকশনের সঙ্গে শরীরে ঢোকাতে পারলে। মিনিট দু’য়েকের মধ্যেই শিকার বুঝতে পারে না, সে কোন জগতে আছে। পানীয়র সঙ্গে খাইয়ে দিলে মিনিট তিরিশেক সময় লাগে কাজ করতে।

কাজ করা শুরু হলে শিকারের মনে হবে, সে আর বাস্তব জগতে নেই। যেন এক অলীক জগতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সব কিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে। তখন সব কিছুই ভাল লাগতে শুরু করবে তার। সব কিছুতেই আনন্দ পেতে থাকবে। এক মায়াময় জগতে বিচরণ করতে থাকবে সে। অনেক ক্ষেত্রেই হুঁশ ফিরে পেলেও মনে করতে পারবে না, চব্বিশ ঘণ্টা আগে তার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেয়েদের কেটামিন মেশানো পানীয় খাইয়ে দেওয়া হয়। মাদক কাজ করা শুরু করার পরে ধর্ষিত হতে হয় মেয়েটিকে। কখনও এক জনের দ্বারা, কখনও বা একাধিক ব্যক্তি এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে চলে যায়। হুঁশ ফেরার পরেও মেয়েটির সব সময় মনে থাকে না, তার সঙ্গে কী হয়েছে। কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণা থেকে তো আর নিস্তার নেই।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই ড্রাগটি প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল ষাটের দশকে। সাধারণত চিকিৎসক এবং পশু চিকিৎসকরা কেটামিন ব্যবহার করেন কাউকে অচৈতন্য করার জন্য। এ ছাড়াও বিভিন্ন চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ড্রাগটি ব্যবহার করা হত। কিন্তু তার পরে দেখা গেল, কেটামিন আর চিকিৎসা জগতের মধ্যে আটকে নেই। কমবয়সি ছেলে-মেয়েরা এই ড্রাগ ব্যবহার করতে শুরু করেছে। প্রচুর পার্টিতে দেখা গেল কেটামিনের অপব্যবহার। প্রথম দিকে এই ড্রাগ পাওয়াটা মোটেই কঠিন ছিল না। মেডিক্যাল স্টোরে সহজেই পাওয়া যেত। একশো টাকায় এক ভায়াল হাতে চলে আসতে কোনও সমস্যাই হত না। তার পরে সেটা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হত।

আস্তে আস্তে টনক নড়ে দেশের সরকারের। কড়া নজরদারি শুরু হয় এই ড্রাগের উপরে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি কেটামিনকে। কিন্তু নন-মেডিক্যাল ক্ষেত্রে এই ড্রাগের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। নার্কোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর (এনসিবি) কাজ হল এই ড্রাগের উপরে নজরদারি রাখা। কিন্তু সেই নজরদারি এড়িয়ে খুব সহজেই কেটামিন চলে আসে খরিদ্দারের কাছে। শুধু যোগাযোগটা থাকতে হয়।

কেটামিন কাজ শুরু করার পরে শিকারের মনে হবে সে এক অন্য জগতে রয়েছে। নিজের উপরে কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। কাউকে বাধা দিতে পারবে না। তাকে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যেতে কোনও সমস্যা হবে না। একটু ধরে নিয়ে গেলেই হল। প্রাথমিক ঘোরটা হয়তো ঘণ্টাখানেকের মধ্যে কমে আসতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টাও লেগে যায়। সব কিছুই নির্ভর করে শিকারের শারীরিক ক্ষমতার উপরে।

.

প্রথম লোকটা অল্প হাসি হেসে বলল, “তা হলে এ বার বুঝতে পারছেন তো কীভাবে অপারেশনটা হবে? প্রয়োজনে দু’বার ইঞ্জেকশন দিতে হবে। তাতে মেয়েটার কোনও ক্ষতি হলে হবে। আমাদের দরকার তো শুধু চামড়াটা।”

লোকটা একটু থামল। তার পরে বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলে চলল, “ঝুঁকি তো একটা থাকবেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের ঝুঁকিটা নিতেই হবে। কিছু করার নেই। নেপালি মেয়েটা হাতছাড়া হওয়ার পরে সমস্যা হয়ে গিয়েছে। ডক্টরের এই মেয়েটাকেই পছন্দ হয়েছে। একে না পেলে আমাদের পক্ষে ব্যাপারটা আরও ঝুঁকির হয়ে যাবে। পুলিশের বিপদটা সে তুলনায় কিছুই নয়।”

বাকি দু’জন চুপ করে রইল। তারা জানে, কথাটা পুরোপুরি ঠিক চশমা পরা লোকটা আবার বলল, “এই মেয়েটা তো বাঙালি। আমি শুনেছি, বাঙালি মেয়েদের চামড়া খুব ভাল হয়। মাছ খায় তো, সে জন্য!”

তিন জনই এ বার হেসে উঠল। গুমোট ভাবটা এত ক্ষণে অনেকটা কেটে গিয়েছে।

.

পরের দিন অজন্তাও তৈরি হচ্ছিল সকাল থেকে। অফিস যাওয়ার আগে মাকে এক বার বলে নিল গ্রুপ স্টাডির ব্যাপারটা। মা একটু দোনোমোনো করেও রাজি হয়ে গেলেন। সব বিষয়ে মেয়ের সামনে বাধা হয়ে উঠতে চাইছিলেন না তিনি। তা ছাড়া আগেও তো এই ভাবে বন্ধুর বাড়ি পড়তে গিয়েছে।

এর পরে কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে যাদবপুর এইট বি বাসস্ট্যান্ডের সামনে একটা নাগাদ গিয়ে দাঁড়াল অজন্তা। বেশি ক্ষণ নয়, মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই একটা সাদা স্করপিও গাড়ি এসে থামল অজন্তার সামনে। সামনের সিট থেকে রাজা বলে উঠল, “পিছনে উঠে পড়ো। আমার বৌদি আর দাদা আছে।”

গাড়ির মাঝের দরজাটা এ বার খুলে গেল। অজন্তা পা রাখল স্করপিওর ভিতরে। এই জায়গাটায় যে-কোনও সিসিটিভি নেই, তা আগেই দেখে নিয়েছিল রাজারা।

সিসিটিভি না থাকলেও অন্য কিছু ছিল সেখানে। বাড়ির থেকে খুব বেশি দূরে নয়। কৃষ্ণেন্দু মাঝেমধ্যেই আসে এই দিকটায়। সে দিন দুপুরেও এসেছিল। আর হতবাক হয়ে গিয়েছিল বাসস্ট্যান্ডের কাছে অজন্তাকে দেখে। ঠিকই করে নিল, আজ যা হয় হবে, কিন্তু এগিয়ে গিয়ে কথা বলতেই হবে তাকে। সাহস সঞ্চয় করে কয়েক পা এগিয়েও গিয়েছিল কৃষ্ণেন্দু। কিন্তু তার পরেই থেমে গেল। একটা সাদা স্করপিও এসে থেমেছে অজন্তার সামনে। আর মেয়েটা সেই গাড়িতেই উঠে গেল। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কৃষ্ণেন্দু। মিনিট পাঁচেক পরেও তার মাথার মধ্যে একটা দৃশ্যই খেলা করতে লাগল। সাদা একটা স্করপিও গাড়ির মধ্যে উঠে চলে গেল অজন্তা। যে-গাড়িটার নম্বর জে এইচ ০১…।

.

গাড়ির সিটে বসেই পাশের মেয়েটির দিকে তাকাল অজন্তা। অপরূপ সুন্দরী। বয়স ২৫-২৬ হবে। মেয়েটি হেসে বলে উঠল, “আরে বাহ, তুমি তো দারুণ সুন্দরী। রাজার ভাগ্য ভাল, তোমার মতো বন্ধু পেয়েছে।”

অজন্তা লাজুক মুখে হেসে ফেলল। মেয়েটা বলে চলল, “তোমার সঙ্গে আলাপ হয়ে খুব ভাল লাগল।” তার পরে গাড়ির পিছনের সিটের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “এই যে-আমার স্বামী। রাজার দাদা।”

অজন্তা পিছনে ফিরে তাকিয়ে নমস্কার করল। এই ছেলেটার বয়স একটু বেশি। মনে হয় তিরিশের আশেপাশে হবে। রাজার দাদাও বেশ হাসিখুশি। গাড়ি ছুটতে লাগল বাইপাসের দিকে। রাজার বৌদি বলছিল, “কলকাতায় এই প্রথম এলাম। এই দিকটা বেশ ভালই করেছে। আমাদের একটা ভাল রেস্তরাঁয় নিয়ে চল। ওখানে খুব খাওয়াদাওয়া করব।”

অজন্তা জবাব দিল, “বাইপাসের দিকে বেশ কিছু ভাল রেস্তরাঁ আছে। তবে বেশি সময় আমি কিন্তু বাইরে থাকতে পারব না।”

বৌদি হাসিমুখে অজন্তার গালটা টিপে দিয়ে বলল, “পাগল নাকি। তোমাকে বেশি সময় বাইরে রাখার প্রশ্নই নেই। যা করার আমরা খুব তাড়াতাড়ি করব।” তার পরে কালো কাঁচের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, “এই রাস্তা দিয়ে তো আমরা কাল এসেছি। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে যাওয়ার রাস্তা এটা।”

“হ্যাঁ, এই রাস্তা দিয়ে এয়ারপোর্ট চলে যাওয়া যায়।” জবাব দিল অজন্তা। তার পরে সামনে বসা রাজার দিকে আড়চোখে তাকাল। রাজা কোনও কথা বলছে না। সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। গাড়ি বেশ দ্রুত গতিতেই ছুটে চলেছে এয়ারপোর্টের দিকে। অজন্তার হঠাৎ খেয়াল হল, রাজার বৌদির নামটা জানা হয়নি। সে বৌদির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “আপনার নামটা কিন্তু বলেননি এখনও।”

মেয়েটা হাসল। তার পরে খুব আস্তে করে কী একটা বলল। শোনার চেষ্টায় অজন্তা মাথাটা ঝুঁকিয়ে দিল বৌদির দিকে। তার পরেই টের পেল পিছন থেকে একজোড়া লোহার মতো হাত তার মুখটা চেপে ধরেছে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও অজন্তা বুঝতে পারছিল, পিছনের সিটে বসা রাজার দাদা তার মুখে একটা রুমাল চেপে ধরেছে। ছটফট করে হাতটা সরাতে গেল অজন্তা। কিন্তু তার শরীর তখন ঝিমিয়ে আসছে। একটা নাম না জানা আতঙ্ক তাকে গ্রাস করতে লাগল। মিনিট খানেকের মধ্যে চেতনাহীন অজন্তার শরীরটা ঢলে পড়ল সিটের গায়ে।

মহিলা ধীরেসুস্থে অজন্তার মোবাইলটা হাতে নিয়ে এগিয়ে দিল পিছনের সিটে বসে থাকা তার ‘স্বামী’র দিকে। লোকটা মোবাইলটা সুইচ অফ করে সিমটা বার করে নিল। কাজ শেষ করে জিজ্ঞেস করল, “জলদি ঘুম ভাঙবে না তো?”

মহিলা হেসে জবাব দিল, “কোনও চিন্তা নেই। ঘণ্টা দুয়েক বেহুঁশ হয়ে থাকবে।”

লোকটাও হাসল, “যথেষ্ট। ওর মধ্যেই পাখি খাঁচায় ঢুকে যাবে। এই খাঁচায় এক বার ঢুকে গেলে পালানো প্রায় অসম্ভব।”

.

মুম্বই থেকে প্রায় দু’শো কিলোমিটার দূরে পুণের বালেওয়ারির এক বাড়িতে বসে সমীর আর অপরাজিতা একটা অসম্ভব স্বপ্ন দেখছিল তখন। খাঁচা থেকে পালিয়ে উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন। চিরতরে উড়ে যাওয়া। পাশে বসা অপরাজিতার দিকে এক বার আড়চোখে তাকাল সমীর। মেয়েটার মাথায় কমলা রংয়ের সিঁদুর। সেটা অবশ্য সে নিজে পরায়নি। অপরাজিতা নিজেই সিঁথিতে লাগিয়ে নিয়েছিল পরিচয় গোপন করার জন্য। সমীর অবশ্য স্বপ্ন দেখছে, সে নিজেই এক দিন অপরাজিতার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিতে পারবে।

“আমরা এ বার কী করব?” অপরাজিতা চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল। এই বন্ধুর বাড়িতে তারা প্রায় দিন পাঁচেক কাটিয়ে দিয়েছে। কেউ কোনও অপ্রীতিকর প্রশ্ন করেনি। শুধু আড়চোখে অপরাজিতার বাঁ গালে লাগানো ব্যান্ডেজটার দিকে কেউ কেউ তাকিয়েছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তবে সমীর বুঝতে পারছিল, এ বার তাদের এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।

অপরাজিতার চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল সমীর, “আমরা এ বার নেপালের রাস্তা ধরব। তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তবে আমার ছুটি।”

অপরাজিতা হাসল। মুক্তি পাওয়ার হাসি। সত্যিকারের ভালবাসা খুঁজে পাওয়ার হাসি।

.

অজন্তাকে নিয়ে সাদা স্করপিওটা এ বার রাস্তা বদলে আবার শহরের দিকে ফিরতে লাগল। ঘড়িতে তখন দু’টো বাজতে চলেছে। মোবাইলের লোকেশন ট্র্যাক করলে সেটা থেমে যাবে বাইপাসের রাস্তায়। যে-রাস্তা চলে যায় এয়ারপোর্টের দিকে। রাজা এবং ওর দাদা জানে ওই মোবাইলটা আরও একবার সুইচ অন হবে। সন্ধ্যার দিকে তাদেরই কোনও লোক এয়ারপোর্টের কাছে গিয়ে মোবাইলটা অন করবে। লাস্ট লোকেশনে চলে আসবে দমদম বিমানবন্দর। তার পরে চিরতরে সুইচ অফ হয়ে যাবে অজন্তার মোবাইল। পুলিশকে ভুল পথে ঠেলে দিতে এই কাজটা করতে হবে। অজন্তাকে নিয়ে ট্রেন তত ক্ষণে চলে যাবে গন্তব্যস্থলের আরও কাছে।

গাড়িটা এ বার তিলজলার দিকের রাস্তা ধরল। যেখানে আপাতত কয়েকটা ঘণ্টা রাখা হবে অজন্তাকে। সেখানেই প্রথমে দেওয়া হবে কেটামিন ইঞ্জেকশন। তার পরে বিকেল নাগাদ আর একটা গাড়িতে চার জন রওনা হবে হাওড়া স্টেশনের দিকে। গাড়িতে থাকবে দু’জন পুরুষ। আর বোরখা পরা দু’জন নারী।

সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ স্করপিওটা ঢুকে গেল হাওড়া স্টেশনে। গাড়ি থেকে নেমে চার জন এগিয়ে গেল নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের দিকে। যেখানে অপেক্ষা করে আছে হাওড়া-ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাল মেল। সন্ধ্যা সাতটা চল্লিশে ছেড়ে যে-ট্রেন এক দিন পরে ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ গিয়ে পৌঁছবে মুম্বই।

প্ল্যাটফর্মে বসে-দাঁড়িয়ে থাকা নরনারী, পুলিশকর্মীদের সামনে দিয়েই চার মূর্তি গিয়ে উঠল নির্দিষ্ট বগিতে। একটু নজর করে দেখলে বোঝা যেত, বোরখা পরা এক মূর্তিকে ধরে নিয়ে আসছে অপর জন। তার আর এক পাশে রয়েছে একটি কমবয়সি ছেলে। কিন্তু কেউ খেয়াল করল না। বা খেয়াল করলেও কেউ তা নিয়ে ভাবেনি।

চার বার্থের কেবিন এফ-এর সামনে গিয়ে দাঁড়াল চার জন। তার পরে একে একে ভিতরে ঢুকে গেল। করিডরে এক বার চোখ বুলিয়ে রাজার দাদা ধীরেসুস্থে কেবিনের দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল। মিনিট পনেরোর মধ্যে ট্রেন রওনা দিল মুম্বইয়ের পথে। কারও কাছে যে-শহর স্বপ্নের নগরী, কারও কাছে দুঃস্বপ্নের।

.

সাড়ে সাতটা নাগাদ বাড়ি ফিরলেন অজন্তার বাবা-মা। মেয়ে তখনও ফেরেনি। অজন্তার মা আরও মিনিট দশেক অপেক্ষা করলেন। তার পরে ফোনটা করলেন মেয়েকে। উল্টো দিক থেকে জবাব এল, যে-মোবাইল ফোনটির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছেন, সেটি এখন সুইচড অফ আছে।

অজন্তার মা বসে পড়লেন খাটে। দুশ্চিন্তা ক্রমে গ্রাস করতে শুরু করেছে তাকে।

এর পরে ফোনটা করলেন অজন্তার সেই বন্ধুকে। মেয়েটি একটু ইতস্তত করে জানাল, অজন্তা পড়তে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু ছ’টা নাগাদ বেরিয়ে গিয়েছে! মিথ্যে কথাটা বলে চিন্তিত হয়ে পড়ল অজন্তার বন্ধুও। কোথায় গেল অজন্তা!

ঘড়ির কাটা ছুটতে লাগল। পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল বাবা-মায়ের টেনশন। যেখানে যেখানে অজন্তার যাওয়া সম্ভব, তাদের ফোন করতে লাগলেন এক এক করে। রাত দশটা নাগাদ দু’জনে ঠিক করলেন, অনেক হয়েছে এ বার পুলিশের সাহায্য নিতেই হবে।

রাতের অন্ধকার চিরে ট্রেন তখন ছুটে চলেছে টাটানগরের দিকে। চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল, মায়ানগরী মুম্বই!

(প্রথম পর্ব সমাপ্ত)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *