প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

২. প্রস্তাব

২. প্রস্তাব

বেল-এয়ার, লস অ্যাঞ্জেলেস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ২০২৩

কয়েক মাস আগের ঘটনা।

একটা অভ্যাস আছে ডক্টর ডেভিলের। সব সময় নিজেকে কেতাদুরস্ত দেখতে পছন্দ করেন তিনি। ভাল পোশাক, ভাল পারফিউম, এই জিনিসগুলো না- হলে তাঁর চলে না। ও হ্যাঁ, আর একটু ভাল ওয়াইন। এই ব্যাপারটার সঙ্গেও তিনি সমঝোতা করেন না।

ডাউনটাউন লস অ্যাঞ্জেলেসের কনরাড নামের যে-হোটেলে তিনি উঠেছেন, তাদের ওয়াইন লিস্টটা বেশ ভালই। গত কাল চেক-ইন করার পরে শ্যাতো শেভাল ব্লঁ ১৯৪৭’ ওয়াইনটি ডক্টরের মনে ধরেছিল। তাই ডিনারের পরে সময়টা মন্দ যায়নি। এর মধ্যে অ্যাপয়েন্টমেন্টের নির্দিষ্ট সময়টাও ঠিক হয়ে যায়।

সেই অ্যাপয়েন্টমেন্টে যাওয়ার আগে নিজেকে আরও এক বার আয়নায় দেখে নিলেন ডক্টর। সব কিছু ঠিকই আছে। প্রথমেই একটু ইমপ্রেশন জমাতে হবে তো! তাঁর বস একটা কথা বলে দিয়েছে। এই মার্কিন ধনকুবেরকে দলে পাওয়াটা খুবই জরুরি। শুধু তো বড় অর্থের বিনিয়োগই নয়, এই লোকটা তাঁদের সঙ্গে হাত মেলালে আমেরিকা-ইউরোপে ব্যবসা দারুণ ভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এর হাত অনেক লম্বা। তাই যে-করেই হোক, একে দলে টানতেই হবে। লস অ্যাঞ্জেলেসের প্লেনের টিকিট কাটার আগে এই ব্যাপারটা ডক্টর ডেভিলকে খুব ভাল ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে বস।

সেই মিটিংয়ের সময় এসে পড়ল। বেজে উঠল ডক্টরের ঘরের ফোনটা। লবি থেকে রিসেপশনিস্ট ফোন করেছে। তাঁকে নিতে গাড়ি চলে এসেছে।

আরও এক বার আয়নায় নিজেকে দেখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন ডক্টর ডেভিল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই দ্রুতগতির এলিভেটর তাঁকে পৌঁছে দিল লবিতে। সেখানেই অপেক্ষা করে ছিল ধনকুবেরের প্রতিনিধি। ডক্টরকে নিজের পরিচয় দিতে হল না। তার আগেই বছর তিরিশেকের লোকটি এগিয়ে এসে বলল, “আপনার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন স্যার। আপনাকে বেল-এয়ারে নিয়ে যেতে।”

বেল-এয়ার। লস অ্যাঞ্জেলেসের সব চেয়ে দামি জায়গার মধ্যে একেবারে শীর্ষে এই বেল-এয়ার। সানসেট বুলেভার্ডের ঠিক উল্টো দিকে অবস্থিত এই অঞ্চলে বাংলো কিনতে হলে মোটামুটি সাড়ে চার মিলিয়ন ডলার পকেট থেকে খসাতে হবে। ডলার থেকে টাকায় আর সংখ্যাটা বদল করার রাস্তায় গেলেন না ডক্টর। বড্ড বেশি শূন্য বসাতে হবে।

মার্সিডিজটা তাঁকে যে-বাংলোর সামনে এনে নামিয়ে দিল, তার মূল্য যে আরও বেশি, তা বুঝতে সমস্যা হল না ডক্টরের। গাড়ি থেকে নেমে একটা লম্বা শ্বাস নিলেন তিনি।

তার পরে ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াসের অসম্ভব বিলাসবহুল বাংলোয় পা রাখলেন ডক্টর ডেভিল।

.

গ্রোপিয়াস সমাজের যে-স্তরে বিচরণ করেন, সেখানে পৌঁছনোর মতো ক্ষমতা ডক্টর ডেভিলের নেই। এই যোগাযোগটা এসেছে তাঁর বসের মাধ্যমে। সব শুনে আগ্রহ দেখিয়েছেন গ্রোপিয়াস। তাঁর মনে হয়েছে, এই ব্যবসা ভবিষ্যতে ভাল অর্থ এনে দিতে পারে। আরও একটা কথা বুঝেছিলেন হলিউডের বিখ্যাত প্রোডিউসার আর প্রাক্তন আর্মস ডিলার। এই ব্যবসায় মন্দা সম্ভবত আসবে না। তা নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ ক্র্যাশ করলেও। গ্রেট ডিপ্রেশনের মতো কিছু যদি হয়, তা হলে তো তাঁকে প্রস্তুত থাকতে হবে।

গ্রোপিয়াসের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল দু’টো শব্দ। স্কিন ট্র্যাফিকিং। হিউম্যান ট্র্যাফিকিং সম্পর্কে তাঁর পরিষ্কার ধারণা আছে। অর্গ্যান ট্র্যাফিকিং ব্যাপারটাও ভালই জানেন। যদিও তিনি কখনও এর সঙ্গে আগে জড়াননি। কিন্তু স্কিন ট্র্যাফিকিং। এই ব্যাপারটা নতুন। ইনভেস্ট করার আগে তাঁকে আরও কিছু ব্যাপার ভাল করে জানতে হবে। যে-কারণে এমন এক জন মানুষের সঙ্গে গ্রোপিয়াস দেখা করতে চেয়েছিলেন, যে-তাঁকে পুরো ব্যাপারটা ভাল মতো বোঝাতে পারবে।

যে-কারণে আজ গ্রোপিয়াসের বাংলোয় পা রাখতে হয়েছে ডক্টর ডেভিলকে।

.

যে মুহূর্তে ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস লিভিংরুমে পা রাখলেন, ডক্টরের মনে তাঁর বসের ছবিটা ভেসে উঠল। সেই একই রকম দৃপ্ত ভঙ্গি। সেই একই রকম দুনিয়াকে কেয়ার না করা ভাব। সেই একই রকম আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। খুব খুব সফল মানুষরা বোধ হয় এ রকমই হয়।

গ্রোপিয়াসের সঙ্গে করমর্দনের পরে আরও একটা ব্যাপার বুঝে গেলেন ডক্টর ডেভিল। তাঁর বসের মতো এই লোকটির কাছেও একটা সেকেন্ড মানে একটা ডলার। সময় নষ্ট করতে এরা জানে না।

“ডক্টর, খুব দ্রুত একটা জিনিস আমাকে বোঝান। কেন আমি এই স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ে অর্থ ঢালব? এর ভবিষ্যৎটা কী?”

ডক্টর লম্বা শ্বাস নিয়ে শুরু করলেন, “এটা বোধ হয় আপনি চার দিকে তাকালেই ভাল বুঝতে পারবেন। ধনকুবেররা কি আর সহজে বৃদ্ধ হতে চায়?”

গ্রোপিয়াস চুপ করে রইলেন। কথাটা ঠিক। কে আর বুড়ো হতে চায়। নিজের চেহারা নিয়ে তাঁর এখনও অত মাতামাতি নেই। কিন্তু তাঁর বৌ?

ডক্টর বলে চললেন, “নতুন তাজা চামড়া দু’ভাবে ব্যবহার করা হয় বেশি। প্রথমটি হল, স্তনের আকৃতি ঠিক রাখার জন্য।”

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মহিলাদের স্তনের আকৃতি বদলে যাচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার স্কিন নেক্রোসিসের শিকার হতে হয় কাউকে কাউকে। যখন শরীরের কোনও অংশে রক্ত, অক্সিজেন পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছতে পারে না, তখন সেখানকার টিসুগুলো মরে যেতে থাকে। কালো হয়ে যেতে থাকে জায়গাটা। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়ে পড়ে চামড়া বদলানোর।

অনেক ক্ষেত্রে স্তনের আকৃতি বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে তাজা, নতুন চামড়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আর সেই চামড়া আসবে কোথা থেকে? চামড়া হল শরীরের সব চেয়ে বড় অর্গ্যান। চিকিৎসকরা এক জন ব্যক্তিকে ‘ব্রেন ডেড’ ঘোষণা করার পরেই তার শরীর থেকে চামড়া নেওয়া যেতে পারে। তাও যদি সেই ব্যক্তি অর্গ্যান ডোনেশনে সম্মতি দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া নিকট আত্মীয়রাও বিপদের সময় মাঝেমধ্যে অর্গ্যান ডোনেট করে থাকেন, কিন্তু সেটা ওই পারিবারিক বৃত্তে আটকে থাকে। তার বাইরে যায় না।

কিন্তু এই মুহূর্তে দেশে-বিদেশে যে-ভাবে কসমেটিক সার্জারির চাহিদা বাড়ছে, তাতে করে এত অল্প স্কিনে কিছু হবে না। প্রয়োজন প্রচুর চামড়ার।

ধনকুবের বয়স্ক মহিলারা যেমন নিজেদের সুন্দর দেখানোর জন্য নানা পন্থা অবলম্বন করে থাকেন, সে-রকম অনেক পুরুষেরই শরীর নিয়ে একটা বিশেষ চাহিদা থেকে যায়। সেটা হল, পুরুষাঙ্গ বৃদ্ধি।

কখনও সংক্রমণ, কখনও ক্যানসার, কখনও আঘাতজনিত কারণে দেখা যায় পুরুষাঙ্গের চামড়া সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। এ সব ক্ষেত্রে স্কিন গ্রাফ্টিংয়ের প্রয়োজন পড়ে। অর্থাৎ, অন্য জায়গার চামড়া কেটে পুরুষাঙ্গে লাগিয়ে দেওয়া হয়। আইনি পদ্ধতি অবলম্বন করলে, নিজের শরীরের কোনও কোনও অংশের চামড়া কেটে এই কাজে ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু লোলচর্ম হয়ে পড়া বৃদ্ধ ধনকুবেরদের ক্ষেত্রে কী হবে? তাদের অর্থের কমতি নেই। কমতি নেই যৌন চাহিদায়। বরং বলা যেতে পারে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সেই যৌন চাহিদা আরও বেড়ে যায়। তাদের খামতি অন্য জায়গায়। পুরুষাঙ্গ আর সঙ্গ দিতে চায় না। তার জন্য যেমন ওষুধ আছে, সে-রকম ‘পেনিস এনলার্জমেন্ট সার্জারি’ও আছে। সেই সার্জারির ক্ষেত্রে নিজের চামড়া তারা আর ব্যবহার করতে চায় না। তাই প্রয়োজন অন্য চামড়ার।

তবে ডক্টর নিজে জানেন, এই পেনিস এনলার্জমেন্ট সার্জারি করলেও কাজের কাজ কিছু হয় না। কিন্তু তাতে কী! এ সব কথা তো তিনি আর সেই সব ধনকুবেরকে বলতে যাচ্ছেন না। এখনও তো কোনও কোনও দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, গন্ডারের খড়া গুঁড়ো করে খেলে যৌবন ধরে রাখা যায়। এই ভয়ঙ্কর এক ভুল ধারণার জেরে বেচারা গন্ডারেরা প্রায় লুপ্ত হতে চলল!

এ ছাড়া আরও ব্যাপার আছে। এক জনের চামড়া অন্য জনের শরীরে লাগালে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তখন প্রয়োজন হয় হাই ডোজের ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট। পাশাপাশি বায়োলজিক্যাল স্কিন সাবস্টিটিউটের পাশাপাশি পোসাইন স্কিন সাবস্টিউটও ব্যবহার করা হয় কোনও কোনও ক্ষেত্রে। যে-পোসাইন স্কিন তৈরি করা হয় শুয়োরের শরীর থেকে। কিন্তু তার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন আছে।

কিন্তু এত সব কথা এখানে বলার কোনও মানে হয় না। সবাই জানে, গন্ডারের খঙ্গের কোনও উপকারিতা নেই। কিন্তু তাও চিন, ভিয়েতনামের মতো দেশে এর চাহিদা কম নেই। তাদের ধারণা, যৌবন ধরে রাখা, ক্যানসারের মতো মারণরোগ এবং আরও অনেক কিছু নাকি সারিয়ে দিতে পারে গন্ডারের খড়্গা। এই ‘মিথ’-কে কাজে লাগিয়েই কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চলে দুনিয়া জুড়ে। স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের ব্যাপারটাও তাই। কিছুটা সত্য আর বেশ কিছুটা কাহিনি মিশে এই ব্যবসাকে ক্রমে বাড়িয়ে তুলেছে। যাদের হাতে অগাধ অর্থ, তারা সত্যটা ভুলে কাহিনিকেই বেশি বিশ্বাস করতে চায়।

গন্ডারদের এখন নানা ভাবে রক্ষা করা হয়। আফ্রিকার অনেক জায়গায় অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী পাহারা দেয় তাদের। তাই সেই ব্যবসায় কিছুটা ভাঁটা পড়েছে।

স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের ক্ষেত্রে সে সব চিন্তা নেই। সাপ্লাইয়ের কোনও কমতি হবে না। ডিমান্ডও যে-বাড়তে থাকবে, সেটা ডক্টর জানেন। মানুষকে আর কে রক্ষা করবে। মানুষ তো বিলুপ্ত প্রজাতির প্রাণী হয়ে ওঠেনি এখনও!

দ্বিতীয় কারণটির কথাও এক বার মনে করিয়ে দিলেন ডক্টর।

“আপনাদের এখানে যে-সব হিউম্যান স্কিন প্রোডাক্ট তৈরি করা হয়, তার চামড়াটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আসে ভারত থেকে। আর আইনমাফিক পদ্ধতিতে সে সব চামড়া আসে না। স্কিন ব্যাঙ্ক থেকে নিয়ে চামড়া চালান দিতে গেলে বেশ কিছু কোম্পানি অনেক আগে উঠে যেত।”

সার্কেল অব ইভিল। শয়তানের বৃত্ত। ভারত-নেপালের মতো দেশ থেকে শিকার খুঁজে বার করে তাদের চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়ার পরে সেই সব চামড়া চলে আসে আমেরিকার মতো দেশগুলোয়। সেখানে অনেক মার্কিন কোম্পানিতে তৈরি হয় নানা স্কিন প্রোডাক্ট। যা কাজে লাগে মূলত কসমেটিক সার্জারিতে। সেই প্রোডাক্ট আবার চলে যায় ভারতে। এ বার বৈধ ভাবে। বৃত্তটা চলতেই থাকে।

যে-প্রোডাক্টটার নাম সব চেয়ে বেশি শোনা যায়, সেটি হল, অ্যালোডার্ম। মানুষের চামড়া থেকে তৈরি হয় এই বিশেষ বস্তুটি। এই চামড়ায় কোনও জীবিত কোষ রাখা হয় না। সব সরিয়ে দেওয়া হয়। শুকনো আমসত্ত্বের মতো ব্যাপারটা দাঁড়ায় খানিকটা। এই অ্যালোডার্ম এর পরে মানুষের শরীরের বিশেষ বিশেষ জায়গায় প্রতিস্থাপন করা হয়, অস্থায়ী পদক্ষেপ হিসেবে। স্তনের আকৃতি ঠিক করার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহার হয় অ্যালোডার্ম। আর এই অ্যালোডার্ম তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রাথমিক ‘র মেটেরিয়াল’ লাগে চামড়া। মানুষের চামড়া! নিয়মমাফিক মৃত মানুষের চামড়া ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু নিয়ম মানলে অনেকেরই যে-চলবে না।

এর পাশাপাশি আছে আগুনে পুড়ে যাওয়া রোগীর চিকিৎসা। যেখানে প্লাস্টিক বা রিকনস্ট্রাক্টিভ সার্জারির ক্ষেত্রে ক্যাডাভেরিক স্কিনের প্রয়োজন আছে। সোজা কথায়, মানুষের চামড়ার প্রয়োজন আছে।

ডক্টর একটু হাসলেন, “বৈধ প্রোডাক্ট তৈরি করতে কিন্তু অবৈধ ভাবে পাওয়া চামড়ার প্রয়োজন হবে। আর এই চামড়াটা আমরা জোগান দেব। আপনি শুধু এখানে রাস্তাটা পরিষ্কার করে দেবেন। কনট্র্যাক্ট পাইয়ে দেবেন। বা আপনি নিজেও এই ধরনের কোনও কোম্পানি খুলে ফেলতে পারেন।”

শেষ কথাটা মনে ধরল গ্রোপিয়াসের। স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের প্রস্তাবটা তিনি যখন পেয়েছিলেন, তখনই তাঁর মাথায় ব্যাপারটা খেলা করছিল। মেডিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির এখন দারুণ সময় যাচ্ছে। কোভিডের পরে ‘বুম’ এসেছে এই ব্যবসায়। তা ছাড়া কসমেটিক সার্জারিতে মানুষ এখন প্রচুর অর্থ ঢালছে। তাঁর টিম খোঁজ নিয়ে জানিয়েছে, কোভিডের পরে কসমেটিক সার্জারি করানো মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে। কারণটা নাকি, কোভিডের জন্য দেশ-বিদেশে ঘুরতে না গিয়ে প্রচুর অর্থ বাঁচানো গিয়েছে। তাই এই অর্থ এ বার নিজেকে সুন্দর করে তোলার কাজে ব্যবহার করতে চায় ধনকুবেররা।

তা সে নিজেরা সুন্দর হতে গিয়ে যদি কোনও অল্পবয়সি মেয়ের গা থেকে চামড়া তুলে আনতে হয় তো সমস্যা কোথায়! আমরা কি মাংস খাওয়ার সময় কোন গোরু-পাঁঠা-মুরগিকে মারা হয়েছে, তার খবর রাখি? বা তাকে কতটা কষ্ট দেওয়া হয়েছে? ব্যাপারটা একই রকমের। এ ক্ষেত্রে মানুষ আর পশুর মধ্যে কোনও তফাত নেই।

ডক্টরের কথা যত শুনছিলেন গ্ৰোপিয়াস, তত তাঁর সামনে অর্থলাভের আর একটা দরজা খুলে যাচ্ছিল। “যদি র মেটেরিয়াল পেতে সমস্যা হয়? যদি স্কিন আপনারা চালান দিতে না পারেন?”

এ বার ডক্টর একটু হাসলেন। খোলামেলা হাসি। এত ক্ষণে তাঁর টেনশনটা কমল।

“ওই ব্যাপারটা আপনি আমাদের হাতে ছেড়ে দিন। ভারত-নেপাল- বাংলাদেশ থেকে দিনে কত মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে, তা কল্পনাও করতে পারবেন না। কেউ নজর রাখে না। হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইজ আ বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি। অ্যান্ড ইট উইল কিপ গ্রোয়িং।”

গ্রোপিয়াস মাথা নাড়লেন। ক্লায়েন্টকে আর একটু ইমপ্রেস করার সুযোগ ছাড়তে চাইলেন না ডক্টর। বলে চললেন, “১৩০ কোটির বেশি মানুষ আমাদের দেশে। সংখ্যাটা বেড়েই যাবে। এর মধ্যে বছরে কয়েক কোটি নিখোঁজ হয়ে গেলে কেউ খোঁজ করবে না। না দেশের সরকার, না পুলিশ, না মন্ত্রী, না সাধারণ মানুষ। কেউ এই সব নিয়ে চিন্তিত নয়। তাই হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়বে। কেউ থামাতে পারবে না এই ব্যবসাকে।”

গ্রোপিয়াসের দিকে তাকিয়ে রইলেন ডক্টর। বুঝতে চেষ্টা করলেন কতটা প্রভাবিত করতে পারলেন ক্লায়েন্টকে। তার পরে শেষ তাসটা ফেললেন, “আপনি ধারণাও করতে পারবেন না উপর মহলের কোন পর্যায়ের লোকেরা এই হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। বড় ব্যবসায়ী, সরকারি আমলা, মন্ত্রী, সোশ্যাল সেলিব্রিটি, আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়, নায়ক, নায়িকা— কে নেই। সবাই টাকা ঢালছে এই ব্যবসায়। চোখ-ধাঁধানো রিটার্ন পাচ্ছে যে! দেশ-বিদেশের প্রচুর মানুষ রয়েছে আমাদের সঙ্গে। আপনি কেন দূরে থাকবেন?”

.

না, দূরে থাকতে চাইছেনও না গ্রোপিয়াস। তিনি একটা উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। আর্মস স্মাগলিং থেকে শুরু করে হলিউড শাসন করছেন তিনি। এ বার মেডিক্যাল দুনিয়ায় পা রাখলে মন্দ হয় না। তাঁর খিদেটা যে-অসম্ভব বেশি। ষাট ছুইছুই হলেও সর্বভুক খিদেটা তাঁর যায়নি। বরং যেন বেড়েই চলেছে। অর্থের খিদে, ক্ষমতার খিদে। সবাইকে পায়ের নীচে দেখতে চাওয়ার খিদে। তবু আর একটু ভাবতে হবে।

.

সিটি অব অ্যাঞ্জেলেসে যা ফান্ড রেইজিং পার্টি হয়, তা বোধ হয় বিশ্বের খুব কম শহরেই হয়। এই ফান্ড রেইজিং পার্টির খুব উপর দিকেই থাকবে ক্যারোসেল অব হোপ বল। আমেরিকার চিলড্রেন্স ডায়বেটিস ফাউন্ডেশনকে সাহায্য করতে আয়োজন করা হয় এই চ্যারিটি পার্টির। জেমি কক্স, ইডিনা মেনজেলের মতো তারকারা ঘুরে গিয়েছেন এই পার্টি থেকে।

এ বারের পার্টিটা হচ্ছে কলোরাডোর ডেনভারে। এ বারও নামকরা সব সেলিব্রিটিকে দেখা যাচ্ছে এই পার্টিতে। তাঁদের এক জনই নিজে থেকে এগিয়ে এলেন সোফিয়াকে দেখতে পেয়ে।

“হ্যালো ম্যাডাম, আপনাকে দারুণ দেখাচ্ছে। ইউ আর গ্লোয়িং লাইক এনিথিং। হোয়াট ইজ ইয়োর সিক্রেট? সৌন্দর্য ধরে রাখার গোপন মন্ত্রটা আমাদেরও একটু বলুন।” সুন্দরী সেলিব্রিটির প্রশ্নের জবাবে সোফিয়া হেসে জবাব দিল, “ওহ, নাথিং মাচ। আই হ্যাভ সোল্ড মাই সোল টু দ্য ডেভিল। শয়তানের কাছে নিজের আত্মাকে বিক্রি করে দিয়েছি তো! তাই শয়তান আমার দেখভাল করছে।

উত্তরদাতা এবং প্রশ্নকর্তা, দু’জনেই হেসে গড়িয়ে পড়লেন। মিনিটখানেক পরে একটু একা হতে ঈর্ষান্বিত দৃষ্টিতে ওই সেলিব্রিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন সোফিয়া। মেয়েটার বয়স কত হবে। বছর তিরিশেক। যৌবন ঝরে পড়ছে শরীরে। ওই রকম আওয়ার গ্লাস ফিগার। ওই রকম স্তন। সোফিয়ার মনে সন্দেহটা উঁকি দিল, ব্রেস্ট ট্রান্সপ্লান্ট করায়নি তো? এখন তো কসমেটিক সার্জারিরই বাজার।

আরও মিনিট দশেক পরে, মহিলাদের ওয়াশরুমের বিশাল আয়নাটায় নিজেকে দেখতে দেখতে মনটা একটু বিষণ্ণ হয়ে পড়ল সোফিয়ার। পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গিয়েছে তাঁর বয়স। শরীরের চামড়া একটু বেশিই ঝুলে পড়েছে। স্তনের আকৃতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চোখের কোণে ডার্ক সার্কেল ঢেকে রাখতে হচ্ছে চড়া মেকঅ্যাপের সাহায্যে। তাঁর প্রতি পুরুষদের আগ্রহ যে-ক্রমে কমছে, সেটা বুঝতে পারেন সোফিয়া।

.

দু’দিন পরে রাতে স্বামীর পাশে শুয়ে সোফিয়া একটা কথা ভাবছিলেন। স্বামীকে কি তিনি এখনও আকৃষ্ট করতে পারেন? দেখা যাক। নিজের শরীরটা স্বামীর গায়ের পাশে নিয়ে তাঁর হাতটা টেনে নিলেন সোফিয়া। তার পরে রেখে দিলেন নিজের উন্মুক্ত স্তনে। কিন্তু সেই শিরশিরানিটা জাগল না তো! মনে হল, একটা পুতুলের হাত যেন নিজের বুকের উপরে রেখেছেন। স্বামীর চেহারাতেও কোনও বিকার লক্ষ করলেন না তিনি। দুম করে হাতটা ঠেলে দিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়লেন সোফিয়া।

স্বামী এ বার বুঝতে পারলেন, কিছু একটা গোলমাল হয়ে গিয়েছে।

স্ত্রীকে কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আরে কী হল, মেজাজ বিগড়ে গেল কেন?”

“আমার প্রতি তোমার তো কোনও আকর্ষণই নেই দেখছি। আগে যে- বুকের স্পর্শ পেলে পাগল হয়ে যেতে, এখন সেখানে হাত পড়লেও তোমার কোনও ভাবান্তর নেই।”

স্বামী আমতা আমতা করে একটু সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বুঝতে পারলেন, ব্যাপারটা যুতসই হচ্ছে না।

মিনিটখানেক চুপ করে শুয়ে রইলেন সোফিয়া। তার পরে স্বামীর দিকে ফিরে বললেন, “আচ্ছা এখন তো কসমেটিক সার্জারির দৌলতে অনেক কিছু বদলে ফেলা যায়। স্তনের আকৃতি ঠিক করা যায়। মুখের চামড়া বদলে ফেলা যায়। ডার্ক সার্কেল ঠিক করা যায়। সে-রকম কিছু করতে পারি না আমি।”

চমকে উঠলেন স্বামী। তার পরে স্ত্রীকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “তুমি আমার কাছে এমনিতেই খুব সুন্দর।”

.

পরের দিন ব্রেকফাস্ট টেবিলে তিন জন বসে ছিলেন। সোফিয়া, স্বামী ভদ্রলোক এবং, তাঁদের আঠারো বছরের মেয়ে ক্যাটরিনা। বাকি দু’জনের দিকে একটু সময় তাকিয়ে রইলেন ভদ্রলোক। এই দু’জনকে তিনি বড্ড ভালবাসেন। এঁদের দু’জনের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি যত দূর যাওয়া সম্ভব যেতে রাজি।

.

নিজের স্টুডিওর চেম্বার থেকে এর পরে ভারতে এক বিশেষ ব্যক্তিকে ফোনটা করলেন ভদ্রলোক।

“আপনাদের প্রস্তাবটা খারাপ নয়। তবে আমি নিজে একটা ব্যাপার পরীক্ষা করে দেখতে চাই। আমাকে আপনাদের সেরা স্কিন স্যাম্পলটা পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। মানে যে-স্কিন আমেরিকান কোনও শ্বেতাঙ্গ মহিলার সঙ্গে ম্যাচ করবে। অবশ্যই অল্প বয়সি কোনও মেয়ের চামড়া হতে হবে। প্রয়োজন হলে আরও বেশি চামড়া লাগবে।” একটু থামলেন তিনি। তার পরে বললেন, “দেখি, আপনারা কী স্যাম্পল পাঠান আর কী ভাবে পাঠান। তার পরে আমি বিজনেস ডিন চূড়ান্ত করব।

স্ত্রী এবং মেয়ের জন্য সব কিছুই করতে পারেন ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস।

কলকাতায় তখন পুজোর মরসুম এগিয়ে আসছে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *