৪. কোথায় খুঁজি তারে
কলকাতা, ২০২७
যাদবপুর থানার অফিসার ইন চার্জের সামনে বসে চোখের জল সামলাতে পারছিলেন না অজন্তার মা। অফিসার কেসব কিছু খুলে বলার পাশাপাশি স্ত্রীকেও সান্ত্বনা দিতে হচ্ছিল অজন্তার বাবাকে।
পুরো ব্যাপারটা শোনার পরে অফিসার একটু ভাবলেন। তার পরে বললেন, “এই ভাবে এর আগে রাতে কখনও বাইরে থেকেছে আপনার মেয়ে?”
মা এ বার ডুকরে উঠলেন, “কখনও না অফিসার। আমাদের না বলে মেয়ে কখনও আগে এই ভাবে বাড়ির বাইরে থাকেনি। আর এত রাতে তো নয়ই।” ঘড়ির কাটা তখন রাত এগারোটা ছাড়িয়ে গিয়েছে। অজন্তার মোবাইল সুইচড অফ দেখাচ্ছে।
অফিসার মোটামুটি ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলেন। অত্যন্ত বিত্তশালী পরিবার। বাবা-মা উচ্চশিক্ষিত। মেয়েও তাই। কোনও খারাপ নেশা নেই। ১৭ বছরের মেয়ে। এই বয়সের কোনও মেয়েকে রাস্তা থেকে জোর করে তুলে নিয়ে গেলে ব্যাপারটা কারও না কারও চোখে ঠিক পড়ে যেত। তা হলে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটা হল, মেয়েটা নিজের ইচ্ছের কোথাও গিয়েছে। বাবা-মায়েদের কাছে ব্যাপারটা যতই অসম্ভব লাগুক না কেন, এই ধরনের কেস আকছারই হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে বাবা-মা সমাজের যে স্তরে বিচরণ করে, তাতে কেসটা নিয়ে জলঘোলা হতেই পারে। অফিসার সাবধানে অগ্রসর হবেন বলে ঠিক করলেন।
“আপনার মেয়ে পড়তে যাবে বলে বেরিয়েছিল?”
মা মাথা নাড়লেন।
“সেই বন্ধুটির সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে?”
“হ্যাঁ। ও আমাকে জানাল, মিতুল ছ’টা নাগাদ বেরিয়ে গিয়েছে পড়া শেষ করে। তার পরে আমরা অনেক জায়গায় খোঁজ করেছি। কিন্তু কোথাও মেয়েটার হদিশ পাইনি।”
অফিসার একটু ভাবলেন। তাঁকে এফআইআরটা দাখিল করতে হবে। আইন অনুযায়ী, কগনিজবল অফেন্সের ক্ষেত্রে এফআইআর হয়, নন কগনিজবল তাফেন্সের ক্ষেত্রে জেনারেল ডায়েরি। যে-কেসে কোনও ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার করা যায়, সেগুলোকেই কগনিজবল অফেন্স বলে। সাধারণত, ঘৃণ্য অপরাধই এই ধরনের তাফেন্সের আওতায় পড়ে।
একটি মেয়েকে কিছু ঘণ্টা হল পাওয়া যাচ্ছে না, এটা ঠিক ঘৃণ্য অপরাধের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু ২০১১ সালের ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া বনাম বচপন বাঁচাও আন্দোলন মামলার পরে সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ কিছু নির্দেশ দেয়। যে- নির্দেশ অনুযায়ী, কোনও ‘মাইনর’ যদি হারিয়ে যায়, তখন পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য থাকবে।
অফিসার এ বার সামনে বসা দম্পতির দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঠিক আছে। আমি আপনাদের রিপোর্ট লিখিয়ে নিচ্ছি। আপনার মেয়ের ছবি লাগবে আমাদের। আর ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের তালিকা। আমরা আপনাদের মেয়ের মোবাইল ফোনটা ট্র্যাক করার চেষ্টা করব। দেখতে হবে, লাস্ট লোকেশনটা কোথায় দেখায়।”
.
পরের দিন দুপুর বারোটার মধ্যে ছবিটা মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে গেল তদন্তকারী অফিসারের কাছে। জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট (২০১৫) অনুযায়ী, আঠারো বছরের কমবয়সি কিশোর-কিশোরী-শিশু হারিয়ে গেলে তদন্তের দায়িত্বে থাকবে এক জন জুভেনাইল ওয়েলফেয়ার অফিসার। যে-অফিসার পদমর্যাদায় এক জন সাব ইন্সপেক্টরের কম হবে না। এখানেও তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন সে- রকমই এক জন জুভেনাইল বা চাইল্ড ওয়েলফেয়ার অফিসার।
তদন্তকারী অফিসার প্রথমেই চলে যান অজন্তার বন্ধুর কাছে। মেয়েটা মিথ্যা কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, এটা তিনি আন্দাজ করেছিলেন। যে- বন্ধুটির কাছে পড়তে যাবে বলেছিল, তাকে একটু চাপ দিতেই সে সব বলে দেয়।
“অজন্তা আমাকে ফোন করে বলে একটু বেরোবে। কিন্তু বাড়িতে বলে যাবে, আমার কাছে পড়তে আসছে। ওর মা যদি ফোন করে, তা হলে যেন আমি ওই কথাটা বলে দিই। বন্ধুকে বাঁচাতে আমি সে কাজটাই করেছি।” পোড় খাওয়া অফিসার বুঝে গেলেন, এই মেয়েটি সত্যি কথাই বলছে।
এর পরে স্বাভাবিক ভাবেই যে-প্রশ্নটা ওঠে, তা হল, কেন অজন্তা এই ভাবে মিথ্যে কথা বলল? কেন বেরিয়েছিল সে? বিশেষ কারও সঙ্গে দেখা করতে কি? ১৭ বছরের একটি মেয়ে এই সব ক্ষেত্রে এক জনের সঙ্গেই দেখা করতে যায়। তার বয়ফ্রেন্ড।
এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে বার করতেও বেশি বেগ পেতে হল না পুলিশকে। প্রথম মেয়েটা একটা ইঙ্গিত দিয়েছিল। আর বলেছিল, স্কুলে অজন্তার খুব কাছের দু’-এক জন বন্ধু আছে। তারা আরও ভাল বলতে পারবে।
সেই বন্ধুদের সঙ্গেও কথা বলে নিতে পুলিশের সমস্যা হয়নি। আর তার পরেই আরও পরিষ্কার হয়ে গেল ছবিটা।
অজন্তার এক জন ইনস্টাগ্রাম-বন্ধু আছে। বিশেষ বন্ধু। যার নাম রাজা। যে-মুম্বইয়ে থাকে। সেই রাজা নাকি এর আগেএক বার কলকাতায় এসে অজন্তার সঙ্গে দেখা করে গিয়েছিল। সেই ছেলেটার সঙ্গে দেখা করার জন্য বেরোতে পারে অজন্তা। আর কোনও ঘনিষ্ঠ ছেলে বন্ধু অজন্তার আছে কি না, তা তার বন্ধুরা জানে না।
এই খবরে অজন্তার বাবা-মা আকাশ থেকে পড়লেও পুলিশ পড়ল না। একটা মেয়েকে খাঁচার মধ্যে ক্রমাগত আটকে রাখলে সে মুক্তি পাওয়ার জন্য ডানা ঝাঁপটাবেই। আর যখনই দেখবে দরজাটা একটু খোলা, তখনই সে উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।
এ ক্ষেত্রে সমস্যাটা হল, মেয়েটার বয়স আঠারোর কম। ফলে সে এখনও মাইনর। আর তাই পুলিশের কাছে এই কেসটার গুরুত্বও বেড়ে যাচ্ছে।
পুলিশের পরের স্টেপটা ছিল রাজা ছেলেটা কে, সেটা খুঁজে দেখা। অজন্তার বন্ধুরা জানিয়ে দিয়েছিল, ইনস্টাগ্রামের মারফতই আলাপ দু’জনের। অজন্তার বেস্ট ফ্রেন্ড শ্রেয়া আরও জানায়, সে ছেলেটার ছবিও দেখেছে ইনস্টাগ্রামে। অ্যাকাউন্ট নামটা সম্ভবত আই-অ্যাম-রাজা গোছের কিছু হবে। অজন্তা বিরক্ত হতে পারে ভেবে সে আর ছেলেটার ইনস্টা-অ্যাকাউন্ট ফলো করেনি।
যাদবপুর থানার অফিসার জানতেন, এই সব কেসে তাঁকে বিশেষ বিশেষ বিভাগের সাহায্য নিতে হবে। প্রথমত, মোবাইল ট্র্যাক করতে আর দ্বিতীয়ত, ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে কাউকে খুঁজে বার করতে।
বন্ধুদের থেকে অজন্তার ইনস্টাগ্রাম আইডি জানার পরে সেই আইডি-তে ঢুকে রাজা নামের ছেলেটাকে খুঁজতে চেষ্টা করেছিল পুলিশ। কিন্তু সেই নামে কোনও প্রোফাইল খুঁজে পাওয়া গেল না। এর পরে শ্রেয়াকে বলা হয়, ভাল করে দেখতে, ওই ধরনের কোনও ছেলের ছবি খুঁজে পায় কি না সে। অনেক খুঁজেও রাজার কোনও প্রোফাইল দেখতে পায়নি শ্রেয়া। রাজা নামের কোনও ফলোয়ার নেই অজন্তার। এমনকি, ওই রকম দেখতে কোনও ছেলের ছবিও অজন্তার ইনস্টা-অ্যাকাউন্টে আর দেখা গেল না।
পুলিশ অফিসার বুঝতে পারছিলেন ব্যাপারটা ক্রমে জটিল হয়ে উঠছে। ছেলেটা সম্ভবত নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দিয়েছে। এর অর্থ একটাই। মেয়েটাকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে।
সন্ধ্যার মধ্যে আরও একটা খবর চলে এল যাদবপুরের তদন্তকারী অফিসারের কাছে। অজন্তার মোবাইলের লাস্ট লোকেশনটা ট্র্যাক করা গিয়েছে। জায়গাটা দমদম এয়ারপোর্ট।
একটা অচেনা ছেলে, যে-কি না মুম্বইয়ে থাকে। একটা সুন্দরী কিশোরী মেয়ে, যাকে পাওয়া যাচ্ছে না। যার মোবাইল শেষ বার অন হয়েছিল দমদম বিমানবন্দর অঞ্চলে।
নিজের টেবিলে বসে অফিসার অঙ্কটা করে নিলেন। আর সেই অঙ্কের ফলটা তাঁর মোটেও ভাল লাগল না। এই রকম শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী মেয়ে কয়েক মাসের আলাপে একটা ছেলেকে বিয়ে করার জন্য পালাবে, এটা একটু কষ্টকল্পিত লাগছে। মনে তো হচ্ছে, মেয়েটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে পাচার করে দিয়েছে। কেসটা কি তা হলে মিসিং পার্সন থেকে হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের দিকে চলে যাচ্ছে?
আর সেটা যদি হয়, তা হলে মেয়েটা এত ক্ষণে মুম্বই পৌঁছে গিয়েছে।
অফিসার এখানে একটু ভুল করে ফেললেন। ট্রেনটা তখনও মুম্বই পৌঁছয়নি।
অজন্তা নিরুদ্দেশ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টারও বেশি কেটে গিয়েছে।
.
চোখটা মেলতে তখনও কষ্ট হচ্ছিল অজন্তার। কী রকম একটা ঘোরের মধ্যে সে রয়েছে। কোথায় রয়েছে, কী করছে, কিছুই বুঝতে পারছে না। শরীরটা যেন পালকের মতো হাল্কা লাগছে।
ইন্দ্রিয়গুলো তখনও পুরোপুরি কাজ করতে শুরু করেনি অজন্তার। গত ৪৮ ঘণ্টায় দু’দুবার তার শরীরে ইঞ্জেকশন মারফত কেটামিন ড্রাগ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ড্রাগের প্রভাব কাটিয়ে বেরিয়ে আসতে সময় লাগবেই।
ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে বসেও কোনও ঝুঁকি নেয়নি অজন্তার অপহরণকারীরা। পরের দিন সকালে মেয়েটার হুঁশ ফিরছে দেখে অজন্তাকে আবার কেটামিন ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। অ্যাডাল্ট ডায়াপার পরিয়ে রাখার ফলে বাথরুমে যাওয়ারও প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু দু’টো মেয়েই যে-হেতু একই রকম বোরখা পরেছিল, আর দু’জনের শারীরিক গঠনও প্রায় এক, ট্রেনের কেয়ারটেকাররা বুঝতেও পারেনি যে-বার বার একটি মেয়েই ওয়াশরুম ব্যবহার করছে। দ্বিতীয় মেয়েটা শুয়েই আছে ট্রেনের বিছানায়।
.
যাত্রা শুরুর পরের পরের দিন ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ মুম্বই সেন্ট্রালে পৌঁছে গেল ট্রেন। সেখান থেকেনবি মুম্বইয়ের একটা বিশেষ জায়গায় পৌঁছতে অজস্তাদের আরও ঘণ্টাখানেক সময় লাগল। তবে সেই টিমের সঙ্গে রাজা ছিল না। সে স্টেশন থেকেই তার নিজের আড্ডার দিকে পা বাড়ায়।
অজন্তাকে অপহরণ করার পরে দ্রুত একটা কাজ করেছিল রাজা। নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটা ডিলিট করে দিয়েছিল। আবার তাকে এই রকম একটা অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে পরে। ভিপিএন ব্যবহার করে। ফেক অ্যাকাউন্ট, কিন্তু ছবিগুলো তারই হতে হবে। না হলে যখন সামনাসামনি হবে বা ভিডিয়ো কলে কথা বলবে, মেয়েটা তার উদ্দেশ ধরে ফেলতে পারে। এই ঝুঁকিটা শিকারিদের নিতেই হয়। কিছু করার নেই। প্রোফেশনাল হ্যাজার্ড।
.
অজন্তা ধীরে ধীরে চোখটা খুলতে পারল। কিন্তু তার মাথাটা যেন এখনও পালকের মতো হাল্কা লাগছে। তবে এই অনুভূতিটা একটা আনন্দও দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, সে উড়ছে। কতটা সময়, সে জানে না। কিন্তু এই রকম একটা অনুভূতি তার আগে হয়নি। সুখের সাগরে সে ভেসে চলেছে। এই সাগর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছিল না অজন্তা। ডেট রেপ ড্রাগের প্রভাব তখনও কাটেনি।
.
অক্টোবর মাসে মুম্বই বেশ গরমই। এসি তার কাজ করে যাচ্ছিল নিঃশব্দে। ঘরের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রিতে রেখে দিয়ে।
তিন মূর্তির মধ্যে এক জন যে-ডাক্তার, তা তার হাবভাবেই বোঝা যাচ্ছিল। অজন্তার প্রেসার মাপা থেকে শুরু করে, হার্টবিট পরীক্ষা, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রার হিসেব, সব কিছুই দেখে নিল লোকটা। এক বার অজন্তার দু’টো চোখের পাতা টেনেও পরীক্ষা করে দেখল। চোখের মণিতে এখনও অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
লোকটা এ বার ফিরল তার দুই সঙ্গীর দিকে। এক জন স্থূলকায় মহিলা, দ্বিতীয় জন কমবয়সি এক তরুণী।
“ড্রাগের প্রভাবটা ওর শরীরে এখনও ভাল মতোই আছে। দু’বার ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে। ব্যাপারটা মোটেও ঠিক হয়নি। এখন যে-ওষুধগুলো আমি দিয়েছি, সে সব নিয়মমাফিক চলুক। পুরো হুঁশ পেতে মেয়েটার আরও সময় লাগবে।” ডাক্তার একটু থামল। তার পরে অল্প বয়সি মেয়েটার দিকে ফিরে বলল, “স্যালাইন আবার চালু করে দাও। আজকের দিনটা স্যালাইনই চলুক। পুরো হুঁশ ফিরলে সলিড ফুডের ব্যবস্থা করা যাবে।”
কথা শেষ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ডাক্তার। বয়স্ক মহিলাটি এ বার তরুণীর দিকে ফিরে কড়া গলায় বলল, “মেয়েটার দিকে খুব ভাল করে নজর রাখবি। ডাক্তারের নির্দেশের যেন কোনও গোলমাল না হয়। এই মেয়েটার সামান্য ক্ষতি হলে আমাদের সবাইকে মরতে হবে। কথাটা মাথায় রাখিস।”
.
স্থূলকায় চেহারার মহিলা এ বার দ্রুত নেমে গেল এক তলায়। সেখানে ডাক্তারের সঙ্গে অপেক্ষা করে আছে আরও এক জন লোক। মহিলার মনে পড়ে গেল, দিন তিনেক আগে তাদের তিন জনকে একটি বিশেষ জায়গায় ডাকা হয়েছিল। আর সেখানে তাদের ভাল করে একটা ব্যাপার বুঝিয়ে দেওয়া হয়। একটা নতুন মেয়েকে তাদের ডেরায় তোলা হবে। এই মেয়েটা বাকিদের চেয়ে আলাদা। একে প্রায় রানির হালে রাখতে হবে। কোনও ভাবেই যেন মেয়েটির ক্ষতি না-হয়। শরীরে কোনও দাগ না পড়ে। গায়ে হাত তোলা চলবে না। যা করতে হবে, বুঝিয়েসুজিয়ে।
এর আগেও বেশ কয়েকটি মেয়েকে এই ডেরায় তুলে আনা হয়েছিল। সাধারণত, একটু পয়সাওয়ালা ঘরের মেয়ে হলে তাদের আগে এখানে তোলা হয়। কিন্তু তাদের এই রকম রানির হালে রাখা হয়নি। বরং উল্টোটা।
এখানে মেয়েগুলোকে আগে ‘ভাঙা’ হয়। শরীরের সঙ্গে তাদের মনটাকেও দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়া হয়। মন আর শরীরে এমন ক্ষত সৃষ্টি করে কিছু নরপশু, যাতে এই মেয়েরা নিজেরাই বাড়ি ফেরার কথা ভুলে যায়। তার পরে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় কোনও কোঠিতে বা বিদেশে। যেখানে তাদের একমাত্র কাজ হয় ক্লায়েন্টদের মনোরঞ্জন।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অন্য রকম। এর গায়ে কিছুতেই হাত তোলা যাবে না। তা হলে এই মেয়েটা বেয়াদপি করলে একে শায়েস্তা করা হবে কী করে! স্থূলকায় মহিলাটি সমস্যা পড়ে গিয়েছিল। তার পরে এক তরুণী নার্সের ব্যবস্থা করা হয়। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, কী করতে হবে।
.
বসের সঙ্গে দুবাইয়ের ওই বিশেষ মিটিং সেরে পরের দিনই মুম্বইয়ে ফিরে এসেছিলেন ডক্টর ডেভিল। যতটা খুশি মনে তিনি মিটিংয়ে গিয়েছিলেন, ততটা খুশি মনে ফিরতে পারেননি। নেপালি মেয়েটা যে-ওই ভাবে তাদের হাত থেকে বেরিয়ে যাবে, সেটা ভাবতেও পারেননি ডক্টর। বেশ কয়েকটা দিন কেটে গিয়েছে। এখনও মেয়েটার হদিশ পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর আশা, ঠিক ধরা পড়ে যাবে। এই জাল কেটে পালানো প্রায় অসম্ভব।
এর মধ্যেই অবশ্য একটা ভাল খবর পেয়ে গিয়েছেন তিনি। বাঙালি মেয়েটা তাদের জালে ধরা পড়ে গিয়েছে। মেয়েটা মুম্বই পৌঁছেও গিয়েছে। যদিও এখনও তিনি মেয়েটিকে দেখেননি। তবে পরিষ্কার নির্দেশ পাঠিয়ে দিয়েছেন, এই মেয়েটার গায়ে, থুড়ি চামড়ায়, যেন একটুও আঁচ না পড়ে। যে-রকমটা তিনি শুনেছেন, সে-রকম হলে এর স্কিন স্যাম্পলটা দ্রুত আমেরিকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেবেন। গ্রোপিয়াসকে দলে লাগবেই লাগবে। ডক্টর ঠিক করে নিলেন, পরের দিনই মেয়েটাকে দেখতে যাবেন। পছন্দ হলেই অল্প করে চামড়া তুলে নেবেন। ডক্টর ডেভিল আর অপেক্ষা করতে চাইছিলেন না।
.
কলকাতায় তখন…
নিজেদের বিশাল ড্রয়িংরুমে শূন্য চোখে বসে ছিলেন অজন্তার মা। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে। বার বার দোষ দিচ্ছিলেন নিজেকে কেন তিনি মেয়েকে আর একটু স্বাধীনতা দিলেন না? কেন তিনি মেয়ের আর একটু কাছে আসতে পারলেন না? স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই নিজেদের জগতে এতটাই বুঁদ হয়ে গিয়েছিলেন যে, মেয়েকে প্রায় অবহেলাই করতে শুরু করেছিলেন। ভেবেছিলেন, গন্ডা ছয়েক মাস্টার রেখে দিলেই বোধ হয় মেয়ের সুষম বিকাশ হবে। কিন্তু পরীক্ষার খাতায় ঔজ্জ্বল্য বাড়লেও মেয়ের মানসিক জগতে অন্ধকার নেমে এসেছিল। তার খোঁজও তাঁরা পাননি। অজন্তার বাবা এসে মায়ের পাশে বসলেন। দু’জনেই বুঝতে পারছিলেন, তাঁদের সামনে এখন নরক যন্ত্রণা অপেক্ষা করে আছে।
পুলিশ তদন্ত করে চলেছে রাজা নামক ছেলেটাকে খুঁজে বার করার জন্য। এয়ারপোর্টের সিসিটিভি-তে ওই দিন দুপুর বেলা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অজন্তার চেহারার কোনও মেয়েকে দেখা যায়নি। পরের দিনের সিসিটিভি ফুটেজেও নয়। পুলিশ এ বার ভাবতে শুরু করেছে, তা হলে কি অন্য কোনও রাস্তা দিয়ে মেয়েটাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল? মুম্বই নয়, পাশের কোন রাজ্যে? পুলিশ এইটুকু বুঝতে পারছিল, যত সময় যাবে, মেয়েটা ততই হারিয়ে যাবে অন্ধকার গহ্বরে। কীভাবে মেয়েদের ‘ভাঙা’ হয়, সে ব্যাপারে পুলিশের ভালই ধারণা আছে।
বাবার দিকে তাকিয়ে অজন্তার মা ভাঙা গলায় বলে উঠলেন, “আর কোনও দিন কি মেয়েটাকে ফিরে পাব? আমাদের দোষেই ও চলে গেল এই ভাবে! কেন আমরা ওর মনের কথা বুঝতে পারিনি এত কাছে থেকেও!”
বাবা কী বলবেন, ভেবে উঠতে পারছিলেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন দেওয়ালে টাঙানো মেয়ের ছবিটার দিকে।
.
কৃষ্ণেন্দু প্রথমে খবরটা শুনল তার বন্ধু সঞ্জয়ের কাছ থেকে।
“কী রে তুই খবরটা শুনেছিস? খবরটা তো আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।”
সামনে পুজো এসে পড়েছে। কিন্তু কৃষ্ণেন্দুর মনটা ভাল নেই। নিজেকে ঘরের মধ্যেই আটকে রেখে দিয়েছে। স্কুলও এখন বন্ধ। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তার বিশেষ গতিবিধি নেই। তাই কোনও খবরই এসে পৌঁছয়নি।
“কেন কী হয়েছে? কোন খবরের কথা বলছিস তুই?” প্রায় আকাশ থেকেই পড়ল কৃষ্ণেন্দু।
সঞ্জয় একটা গালাগালি দিয়ে বলে উঠল, “দু’দিন হয়ে গিয়েছে অজন্তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের স্কুলের কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশ। যারা অজন্তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সন্দেহ করা হচ্ছে, অজন্তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে।”
কৃষ্ণেন্দুর মুখের কথা আটকে গেল। সে রীতিমতো কাঁপতে লাগল। সঞ্জয়ের কথার কোনও জবাব না দিয়ে নামিয়ে রাখল মোবাইলটা।
তার মাথায় তখন একটা ছবিই ঘুরছে। দিন দুয়েক আগে এইট বি বাসস্ট্যান্ডের সামনের সেই দৃশ্য। অজন্তা একটা সাদা স্করপিও গাড়িতে উঠছে। গাড়িটার নম্বর জে এইচ ০১….।
কৃষ্ণেন্দুর জানা ছিল না, নম্বর প্লেটটা ঝাড়খণ্ডের। আর ০১ মানে গাড়িটা রাঁচির।
তার কাঁপুনিটা তখনও কমেনি। সেই অবস্থায় উঠে গিয়ে বুকশেল্ফ থেকে একটা বড় ফাইল নামিয়ে আনল ছেলেটা।
সময়-অসময়ে সে নানা ছবি আঁকে। আর সেই আঁকাগুলো লুকিয়ে রাখে এই ফাইলটার মধ্যে। মোটামুটি এক বার কারও মুখ দেখলে বেশ কিছু দিন সে মনে রেখে দিতে পারে। পরে স্মৃতি থেকে ছবি নামিয়েও দিতে পারে।
ফাইল থেকে একটা বিশেষ স্কেচ বার করে আনল কৃষ্ণেন্দু। এই ছবিতে যে-দু’জন রয়েছে, তাদের মুখ কোনও দিন ভুলবে না সে। এক দৃষ্টিতে কৃষেন্দু তাকিয়ে রইল ছবির দু’টো মুখের দিকে।
বাঁ-দিকে রয়েছে অজন্তা। ডান দিকে রাজা বলে ছেলেটা!
