প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৬. মুছে যাওয়া

৬. মুছে যাওয়া

পদচিহ্ন কলকাতা-মুম্বই, ২০২৩

যাদবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসারের উল্টো দিকে বসে ছিলেন অজন্তা অন্তর্ধান মামলার দায়িত্বে থাকা জুভেনাইল অফিসার মির আহমেদ।

এই সব তদন্তে নেমে তাঁরা পর পর যে-পদক্ষেপগুলো করে থাকেন, অজন্তার কেসেও সেই একই ভাবে এগিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হল অভিযুক্তের মতো অজন্তার মোবাইলও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে ওই মোবাইলে রাজার কোনও ছবি আছে কি না, সেটা বোঝা যাচ্ছে না।

অফিসার এর পরে কল রেকর্ডিংগুলো জোগাড়ের চেষ্টায় নেমে পড়েন। মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডাররা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই কল রেকর্ডিংগুলো রেখে দেয়। অজন্তার কেসে অফিসার শেষ পর্যন্ত যে-কল রেকর্ডিংগুলো হাতে পেলেন, তাতে মুম্বই থেকে আসা কোনও ফোন কল ছিল না। বেশির ভাগই মামুলি কল। অজন্তা ওর বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে। আলোচনা বেশিটাই আসন্ন পরীক্ষা এবং পড়াশোনা নিয়ে। এই কল রেকর্ডিংগুলোর মধ্যে কোথাও রাজা নামের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। অফিসার বুঝতে পারছিলেন, অজন্তা অত্যন্ত চাপা স্বভাবের মেয়ে। তার ভাললাগার ছেলেটিকে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কোনও কথাই বলেনি।

সব চেয়ে যে-ব্যাপারটি অফিসারকে অবাক করেছে, সেটা হল, অজন্তার হারিয়ে যাওয়ার দিনে মেয়েটির কাছে মোবাইল লাইনে কোনও ফোন আসেনি। তা হলে রাজা যোগাযোগ করল কীভাবে? রাস্তা তো একটাই।

সামনে বসা থানা ইনচার্জের দিকে তাকিয়ে সাব ইনস্পেক্টর মির বললেন, “ছেলেটা একেবারে চৌখস খেলোয়াড়। আমার তো মনে হচ্ছে, যাবতীয় কথাবার্তা হত হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম বা ওই ধরনের কোনও অ্যাপের মাধ্যমে। যাতে কোনও ফুটপ্রিন্ট থেকে না যায়।”

অফিসার মাথা নাড়লেন। “এটা একটা ছেলের কাজ নয়। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার ব্যাপারও মনে হচ্ছে না। খুব হিসেব কষেই মাঠে নামা হয়েছে। মনে হচ্ছে, একটা গ্যাং কাজ করছে এই অপহরণের পিছনে।”

দু’জনেই কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তার পরে অফিসার প্রশ্ন করলেন, “ইনস্টাগ্রামের ওই মুছে ফেলা অ্যাকাউন্টটা ট্রেস করার ব্যাপারে আমরা কত দূর কী করলাম?”

“স্যার, কোর্টের কাছে আমরা আবেদন করেছি নির্দেশটা দেওয়ার জন্য। ওই নির্দেশ ছাড়া এই বিদেশি কোম্পানিগুলো সামান্য সাহায্যও পুলিশকে করবে না, সেটা তো আপনি ভালই জানেন।”

অফিসার ভালই জানতেন ব্যাপারটা। ভারতের মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডারদের কাছ থেকে যত সহজে তথ্য বার করা যায়, হোয়াটসঅ্যাপ হোক কী ইনস্টাগ্রামের মতো বিদেশি সংস্থাগুলো কিছুতেই পুলিশকে আগাম সাহায্য করতে চায় না। আদালতের নির্দেশ ছাড়া এরা এক পাও নড়বে না।

আদালত এই সব ক্ষেত্রে দ্রুত আদেশ জারি করে দেয়। কারণ, বিচারপতিদেরও জানা আছে, সাইবার ক্রাইমের তদন্তের ক্ষেত্রে সামান্য দেরি মানেই প্রমাণ একেবারে লোপাট হয়ে যাবে।

কিন্তু আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পরেও ব্যাপারটা সুষ্ঠু ভাবে এগোয় না। বিদেশি সংস্থাগুলো গড়িমসি করেই যায় তথ্য প্রকাশ করার ব্যাপারে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে যে, আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়নি। তখন পুলিশকে আবার আবেদন করতে হয়েছে আদালতে। এই সব করতে গিয়ে যে-সময় চলে যায়, তার মধ্যে অপরাধী তার অপরাধের যাবতীয় প্রমাণ লোপাট করে ফেলে। শিকারি তার শিকার নিয়ে হাওয়া হয়ে যায়। যারা হারিয়ে যায়, তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ভারতীয় পুলিশ ভাল করেই জানে, এই সব বিদেশি সংস্থা তাদের পাত্তাই দিতে চায় না। ওরা নিজেদেরকে ভারতীয় আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে। যার ফলে প্রচুর কেস এই ভাবে ঝুলেই থাকে। নিষ্পত্তি আর হয় না।

অজন্তার কেসটা সেই দিকে এগোলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইতিমধ্যেই ওপরমহল থেকে চাপ আসা শুরু করেছে। মিডিয়াও ব্যাপারটার সন্ধান পেয়ে গিয়েছে। কাগজ-টিভি-সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে এখন অজন্তার কেসটা নিয়ে প্রচুর মাতামাতি চলছে। এই কেস বেশি ফেলে রাখলে চরম ভোগান্তি আছে, সেটা দুই পুলিশ অফিসারই বুঝতে পারছিলেন।

অল্প ঠান্ডার মধ্যেও মির এক বার রুমাল বার করে কপালের ঘামটা মুছে নিলেন। তার পরে বললেন, “এর পরে তো ভি পি এনের ঝামেলাটা আছেই।”

ভি পি এন। ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক। সাইবার ক্রাইমের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অক্ষর। অপরাধীদের ক্ষেত্রে এই ভি পি এন যেমন একটা বড় ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, সে-রকম তদন্তকারী অফিসারদের ক্ষেত্রে একটা বড় প্রাচীর। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যে-প্রাচীর লঙ্ঘন করা তদন্তকারী অফিসারদের ক্ষেত্রে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

ভারতে বেশ কিছু ভি পি এন প্রোভাইডার আছে। যারা অর্থের বিনিময়ে ক্লায়েন্টদের এই ভার্চুয়াল জগতে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। এরা জনপ্রিয় মোবাইল সার্ভিস প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে কাজ করে। যারা এই ভি পি এন ব্যবহার করছে, তারা মেঘনাদের মতো মেঘের আড়ালে থেকে বাণ চালায়। এই মেঘটা তৈরি করে দেয় ভি পি এন। অন্তর্জাল জগতে এই ভি পি এন ব্যবহারকারীরা কী করছে, তা বহির্বিশ্ব জানতে পারে না। ভি পি এন সার্ভিস প্রোভাইডারদের তরফে বলেই দেওয়া হয়, ওয়েবসাইটে লগইন করে কী দেখা হচ্ছে, কী ডাউনলোড করা হচ্ছে, কোথায় কী চ্যাট করা হচ্ছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোথায় কী ফোন করা হচ্ছে এবং কোন আই পি অ্যাডড্রেস থেকে এই কীর্তিগুলো সম্পন্ন হচ্ছে, তা পুরোপুরি গোপন রাখা হবে। এই গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্যই টাকা নিচ্ছে ভি পি এন সার্ভিস প্রোভাইডাররা। এরা থোরাই কেয়ার করে ভারতীয় পুলিশ কী চাইছে বা চাইছে না, তা নিয়ে। খুব উঁচু মহল থেকে চাপ না এলে কোনও তথ্যই দেওয়া হয় না ভি পি এন সার্ভিস প্রোভাইডারদের তরফে। দেখা যায়, একশোরও বেশি দেশে বেশ কয়েক হাজার সার্ভার আছে এই ভি পি এন কোম্পানিগুলোর। কোন দেশের কল কোন দেশের সার্ভার দিয়ে চালিত করা হচ্ছে, এটা বোঝা বাইরে থেকে কারও পক্ষে সম্ভবই নয়।

অন্তর্জাল জগতে এই ভি পি এন হচ্ছে সুইস ব্যাঙ্কের মতো। সারা বিশ্ব থেকে হাজার হাজার কোটি কালো টাকা চালান হয়ে চলে আসে সুইস ব্যাঙ্কে। কারা এই টাকা আনছে, কাদের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছে, কত টাকা ঢুকছে, সব কিছুই গোপন রাখা হয় ব্যাঙ্কগুলোর পক্ষ থেকে। অন্য দেশের আইন সুইৎজারল্যান্ডে কিছু করতে পারে না। একমাত্র সে দেশের সরকারের উপরে বিশাল কোনও চাপ তৈরি করা হলে, সুইস ব্যাঙ্কের লকার খোলা সম্ভব হতে পারে।

অন্তর্জাল জগতে ভি পি এন হল সুইস ব্যাঙ্কের লকার! যা সাইবার ক্রাইমের দুনিয়ায় এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে। অনেক ভি পি এন কোম্পানি আবার ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড আইনের আওতায় পড়ে। যে-আইনকে বলা হয়ে থাকে খুবই ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ আইন! মানে, ভি পি এন সরবরাহকারী এবং তাদের ক্লায়েন্টদের জন্য, পুলিশের জন্য নয়।

তদন্তকারী অফিসাররা এই সব ভালই জানেন। কিন্তু বাইরে থেকে কেউ বুঝবে না, কতটা প্রতিবন্ধকতা সামলে এই ধরনের তদন্ত করতে হয়। বাইরে থেকে চাপ আসতেই থাকবে। আর সেটা যদি হাই প্রোফাইল কোনও কেস হয়, তা হলে তো কথাই নেই। ফলে আর একটা সহজ রাস্তা নেওয়া হয় এই সব ক্ষেত্রে। ব্যাপারটা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে অন্য কারও ঘাড়ে কেসটা চাপিয়ে দেওয়া।

মিরের দিকে তাকিয়ে অফিসার ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন, “আপনার কি মনে হয়, ব্যাপারটা ট্র্যাফিকিংয়ের দিকে যাচ্ছে?”

“স্যার, প্রেমঘটিত ব্যাপারটা বাদ রাখলে দু’টো মোটিভের কথা মাথায় আসবে। এক, টাকার জন্য কিডন্যাপিং। কিন্তু দিন চারেক হয়ে গেল। এখনও মুক্তিপণ চেয়ে কোনও ফোন আসেনি। এত দেরি এরা করে না। প্রথমেই ফোন করে পরিবারকে জানিয়ে দেওয়া হয়, ব্যাপারটা নিয়ে জলঘোলা না করতে।”

অফিসার জানতেন, দ্বিতীয় মোটিভটা কী। তবু তাঁর জুনিয়র অফিসারের মুখ থেকে শুনতে চাইলেন।

মির বলে চললেন, “আর একটা হচ্ছে ট্র্যাফিকিং। তবে ট্র্যাফিকাররা সাধারণত খুব হাই প্রোফাইল টার্গেট বেছে নেয় না। এতে জলঘোলা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। টার্গেট তোলারও অনেক ঝক্কি আছে। এরা তো গ্রামের গরিব মেয়ে নয়, যে-লোভ দেখিয়ে, বিয়ের কথা বলে ফুসলিয়ে অন্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়া যাবে।”

অফিসার মাথা নাড়লেন। তার পরে প্রশ্ন করলেন, “তা হলে তুমি এখন কী করতে চাও?”

“স্যার, আমি আরও কয়েকটা দিন তদন্তটা চালাতে চাই। দেখি, এই বিদেশি অ্যাপ কোম্পানিগুলো কোনও-রকম সাহায্য করে কি না। তা ছাড়া মুম্বইয়ে আমার কনট্যাক্টদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। দেখি কী জানা যায়।” একটু থেমে মির তাঁর কথা শেষ করলেন, “ট্র্যাফিকিংয়ের বিষয়টা সামনে আনার আগে আমাদের হাতে তথ্যপ্রমাণ বা ভাল কিছু কারণ আসতে হবে। না-হলে উপরওয়ালার প্রশ্নই হবে, কেন ট্র্যাফিকিংয়ের কেস বলা হবে এটাকে।”

কোনও রাজ্য বা কোনও পুলিশ ডিপার্টমেন্ট চায় না, তাদের এলাকায় ট্র্যাফিকিং কেসের সংখ্যা বাড়ুক। ২০২১ সালের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্যঅনুযায়ী, সে বছর ট্র্যাফিকিং কেসের সংখ্যা ছিল ২১৮১। ২০২২ সালের তৈরি রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে হিউম্যান ট্র্যাফিকিং কেসের সংখ্যা ছিল ৬৭!

যাঁরা এই অপরাধ থামাতে নিয়ন্তর লড়াই করে চলেছেন, তাঁদের কাছে এনসিআরবি-র পরিসংখ্যান স্রেফ করুণামিশ্রিত হাসি উদ্রেকের একটা কারণ মাত্র। পুলিশ থেকে সমাজকর্মী, পাচারকারী থেকে দেশের সরকার, সবাই জানে কত হাজার হাজার শিশু-কিশোর-কিশোরী নিয়মিত পাচার হয়ে যাচ্ছে, তার ঠিক নেই। কিন্তু থানায় গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই সব মামলা রুজু করা হয় মিসিং পার্সন কেস হিসেবে। নিরুদ্দেশের প্রায় কোনও কেসকেই ট্র্যাফিকিংয়ের আওতায় আনা হয় না। খাতায় কলমে পাচার হওয়া ছেলে-মেয়ের সংখ্যা তাই রোজই কমছে। আর বাস্তবে সেই সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

মির উঠে পড়লেন চেয়ার ছেড়ে। তাঁকে এখন বেশ কিছু তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে হবে। বা কোনও সলিড কারণ। না-হলে কেসটা সিআইডি-র অ্যান্টি হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইউনিট (এএইচটিইউ)-এর কাছে পাঠানো যাবে না। মির আরও একটা কথা বুঝে গিয়েছিলেন। অজন্তাকে যদি বাঁচাতে হয়, তা হলে দ্রুত অ্যান্টি হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইউনিটকে কাজে নামতে হবে। তাঁর সন্দেহ হচ্ছিল, ইতিমধ্যেই না অনেক দেরি হয়ে গিয়ে থাকে।

.

নবি মুম্বইয়ের এই অঞ্চলে ডক্টর ডেভিল কোনও দিন আসেননি। কিন্তু সমস্যা হল, মেয়েটাকে বাইরেও আনা ঝুঁকির হয়ে যাচ্ছে। ড্রাগের ঘোরটা আস্তে আস্তে কাটছে। কিন্তু ডক্টর ডেভিলের হাতেও সময় কমে আসছে। দ্রুত একটা স্কিন স্যাম্পল প্রয়োজন। তার পরে সেটাকে তৈরি করতে হবে বিদেশে পাচারের জন্য। পুরো প্রসেসটার একটু সময় লাগবে। ডক্টর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। নবি মুম্বইয়ের ওই বাড়িতে তাঁর যাওয়াটা ঝুঁকির হয়ে যাবে। সেই ঝুঁকি তিনি নিতে পারবেন না। মেয়েটাকেই নিয়ে আসতে হবে।

তাঁর ক্লিনিকে!

যে দু’জন আর্দালি এত দিন ক্লিনিকের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারা আর কেউ নেই এখন। একটা তো বিশ্বাসঘাকতা করে আগের মেয়েটাকে নিয়ে ভেগেছে। অন্যটা খুন হয়ে গিয়েছে। প্রথমটাও তাড়াতাড়ি উপরে যাবে।

সে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিলেন না ডক্টর। তাঁর সমস্যা ছিল অন্য। ক্লিনিকের কাজের জন্য আরও কয়েক জনকে চাই। যারা হবে খুবই বিশ্বাসী। আগের বার তাঁর সহকারীদের হাতে এই লোকগুলোকে বাছার কাজটা ছেড়ে দিয়েছিলেন ডক্টর। এ বার তিনি নিজের পছন্দের কয়েক জনকে কাজে লাগাতে চান।

ডক্টর জানেন, এই প্রোফেশনে নিজের পরিচয়টা গোপন রাখা কতটা জরুরি। মুখ না দেখলেও সমস্যা হতেই পারে। যে-কারণে নিজের এই গোপন কাজটা খুব কম লোকের সামনেই করেন তিনি। ক্লিনিকের ছেলেদু’টো অনেক দিন ধরেই কাজ করছিল তার সঙ্গে। তাই ধাক্কাটা বেশি খেয়েছেন ডক্টর। এ বার আরও বেছে বেছে লোক নিতে হবে।

অনেক কাঠখড় পুরিয়ে এই জায়গায় পৌঁছেছেন ডক্টর ডেভিল। যখন এই লাইনে পা রাখেন, তখন বুঝেছিলেন, এগিয়ে চলার রাস্তায় এমন কিছু লোককে তৈরি করে নিতে হবে, যারা তাঁর প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত আর অনুগত হবে। যারা তাঁর জন্য সব কিছু করতে তৈরি থাকবে। এই রকম লোকের সংখ্যা তাঁর হাতে এখন কম নয়। তাদের মধ্যে থেকেই এ বার কয়েক জনকে বেছে নিয়েছেন ডক্টর। লাগিয়ে দিয়েছেন ক্লিনিকের কাজে। যেখানে আবার রুগি আসছে। যাদের বিশেষ বিশেষ অর্গ্যান কেটে নেওয়া হচ্ছে। সেই সব অপারেশন অবশ্য ডক্টর করেন না। তাঁর জন্য অন্য চিকিৎসক আছে। তাঁর বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। নেপালি মেয়েটি পালিয়ে যাওয়ার পরে ডক্টর নিজের হাতযশ আর দেখাতে পারেননি। চামড়া তোলার অপারেশন এখনও বন্ধই আছে। কিন্তু আর নয়। আবার চালু হওয়ার সময় এসেছে। ডক্টর নির্দেশ দিয়েই দিলেন।

মেয়েটাকে কাল ক্লিনিকে নিয়ে এসো।

.

অজন্তার ঘোর এখন অনেকটাই কেটেছে। মুম্বইয়ে আসার পরে তিনটে দিন কেটে গিয়েছে। অজন্তা এখন বুঝতে পারছে, কোন ভয়ঙ্কর ফাঁদে সে পা দিয়েছে। আতঙ্কে প্রায় বোবা হয়ে গিয়েছে মেয়েটা। তাঁর এই ১৭ বছরের জীবনে এই রকম ভয়ঙ্কর সময় কখনও আসেনি। কখনও আসবে বলে কল্পনাও করতে পারেনি অজন্তা। তবে বাঁচোয়া এইটুকুই যে, তার সঙ্গে এখানে সবাই খুব ভাল ব্যবহার করছে। বিশেষ করে যে মেয়েটা তার সঙ্গে প্রায় ২৪ ঘণ্টা থাকছে।

সেই মেয়েটাই সকালে এসে বলল, “শোনো, চট করে এই মিল্ক চকোলেটটা খেয়ে নাও তো। না-হলে দুর্বল হয়ে পড়বে।”

অজন্তা কী বলবে, ভাবতে পারছিল না। তার মানসিক প্রতিরোধের ক্ষমতা যেন ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। সে যে-বড় হয়েছে নরমসরম এক জগতে! সুন্দর এক স্বপ্নীল পরিবেশে। সে লড়াই করতে শেখেনি। ধীরে ধীরে হাতটা বাড়িয়ে গ্লাসটা নিয়ে নিল মেয়েটা।

মিনিট পনেরো পরে এসে নার্সটি দেখে গেল অজন্তাকে। মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে। ওষুধ কাজ শুরু করেছে।

আরও মিনিট পনেরো পরে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল বাড়িটার সামনে। দু’টো লোক অজন্তাকে ধরে তুলে নিল গাড়িটায়। মুম্বইয়ে সূর্যাস্ত হয়ে গিয়েছে বেশ কিছু সময় আগে। নেমেছে অন্ধকার।

প্রায় ঘণ্টাখানেক লেগে গেল ক্লিনিকে পৌঁছতে। আবার সেই একই ভাবে মেয়েটাকে তোলা হল ক্লিনিকে। এই অঞ্চলটা লোকগুলোর পরিচিত। এখানে আশেপাশে তাদের পরিচিত মানুষজনই থাকে। ফলে কেউ কিছু দেখলে ভ্রু কোঁচকায় না। এই ক্লিনিক সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত সাধারণের জন্য খোলা থাকে। বেশ কয়েক জন চিকিৎসক এসে বসে। আশেপাশের মানুষ এসে সুলভে চিকিৎসা করান। ওষুধ নেন। তাঁরা অন্য কিছু কেন দেখতে যাবেন! আর পুলিশের মুখ তো মোটা মাসোহারা দিয়ে বন্ধ করে রাখাই আছে।

ঠিক সন্ধ্যা ছ’টার সময় সাধারণের জন্য বন্ধ হয়ে যায় ক্লিনিক। খুলে যায় অন্য একটা দরজা।

অজন্তাকে যখন টেবিলে শুইয়ে দেওয়া হল, তখনও ডক্টর এসে পৌঁছননি।

তিনি এলেন মিনিট পনেরো পরে। ঢোকার সময় মাস্কটা পরে নিতে ভোলেননি। যতই তাঁর চেনা লোক থাকুক না কেন, সতর্কতা অবলম্বন করাটা একটা অভ্যাস। এটা মাসল মেমোরিতে ঢুকে যাওয়া উচিত। এক বার অভ্যাসটা নষ্ট হয়ে গেলে যে-কোনও সময় চরম ভুল হয়ে যেতে পারে। ডক্টর এই অভ্যাসটা নষ্ট করতে চান না।

অজন্তার শায়িত শরীরটার দিকে যখন ডক্টর ডেভিল এগিয়ে এলেন, অ্যানাস্থেসিয়া প্রয়োগ করা হয়ে গিয়েছে অজন্তার উপরে। আধো ঘুমের মধ্যেই।

ডক্টর তাকিয়ে থাকলেন মেয়েটার দিকে। মেয়েটাকে অ্যাপ্রন পরানো হয়নি। একটা হাফহাতা সালোয়ার পরে আছে। মেয়েটার হাতটা তুলে নিলেন ডক্টর। সত্যি, এই রকম উজ্জ্বল চামড়া কমই দেখা যায়। ডক্টরের পেশাদার চোখ জরিপ করে নিল সামনে শুয়ে থাকা প্রোডাক্টটাকে। কোয়ালিটি খুবই ভাল। এমনকি, নেপালি মেয়েটার থেকেও। এই মেয়েটাকে যে-করে হোক বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। অনেক দিন সার্ভিস দিতে পারবে তা হলে।

ডক্টর এ বার মুখ তুলে তাকালেন নতুন দু’জন সহকারীর দিকে। এদের উপরে ভরসা রাখতে পারেন তিনি।

ডক্টরের চোখ চলে গেল ছোট টেবিলে রাখা স্কালপেল, গ্লাভস এবং তাঁর প্রিয় ডার্মাটোমটার উপরে। উফ, কত দিন যে-ওই যন্ত্রটা কাজে লাগাননি তিনি। ধীরে ধীরে যন্ত্রটা হাতে তুলে নিলেন। তার পরে ডক্টর ডেভিল ঝুঁকে এলেন অজন্তার দিকে।

.

অজন্তার জ্ঞান যখন অল্প অল্প ফিরে আসতে লাগল, গাড়িটা তাকে নিয়ে নবি মুম্বইয়ের ওই বাড়িটার খুব কাছেই চলে এসেছে। মেয়েটা বুঝতে পারছিল না, সে ঠিক কোথায় আছে। কিন্তু গলার মধ্যে একটা দলা পাকানো অনুভূতি। শরীরটা খারাপ লাগছে। নিজেকে আর সামলাতে পারল না অজন্তা। গাড়ির মধ্যেই হড়হড় করে বমি করে ফেলল।

আরও আধ ঘণ্টা পরে নিজের বিছানায় শুয়ে একটু ধাতস্ত হল অজন্তা। ওই চকোলেট মিল্কটা খাওয়ার পরে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিছানায় শোওয়া অবস্থায় আবছা আবছা কিছু দৃশ্য যেন ভেসে উঠে মিলিয়ে যেত লাগল।

সে এটুকু বুঝতে পেরেছিল, তাকে ঘরে নিয়ে আসার পরে পরিষ্কার করে দিয়ে ওই নার্সটি পোশাক বদলে দিয়েছে। নতুন একটা পোশাক পরে সে এখন শুয়ে আছে পরিচিত বিছানাটায়। হঠাৎ ডান হাতের উপরে নজর চলে গেল তার। একটা বড়সড় ব্যান্ডেজ বাঁধা। এক বার দেখার চেষ্টা করতেই পাশে বসা নার্সটি বলে উঠল, “না, না। ওটা নিয়ে ঘাটাঘাটি কোরো না। তোমার হাতটা একটু কেটে গিয়েছিল। ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে।”

অজন্তা তাকিয়ে রইল তার ব্যান্ডেজ করা হাতটার দিকে।

সে জানতেও পারল না, তার চামড়ার একটা অংশ, বিশেষ একটি কন্টেনার করে, সুরাট থেকে দুবাই ঘুরে আমেরিকার পথ ধরবে খুব শীঘ্রই!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *