৮. তোমারই ছবি আঁকি… বেদনারই তুলিতে
দক্ষিণ কলকাতার বিলাসবহুল বহুতল, ২০২৩
বিশাল জানলাটার পর্দা সরিয়ে দিলে উন্মুক্ত আকাশটা খুব ভাল করে নজরে আসে। যে-আকাশে চোখ রেখে নানা রংয়ের খেলা দেখতে দেখতে মাঝেমধ্যে হারিয়ে যায় অজন্তা। কোথায় সে হারিয়ে যায়, নিজেই জানে না।
বাবা-মা সব সময় তার চোখের সামনে যে-স্বপ্নটাকে ফুটিয়ে তুলতে চায়, তা এই নীল আকাশের দিকে তাকালে আর খুঁজে পায় না মেয়েটা। বাড়ি- গাড়ি-ফরেন ট্রিপের আলো ঝলমল করা দুনিয়ার পাশে ফুটে ওঠে আরও একটা ছোট্ট পৃথিবী। যেখানে কখনও পাখিরা ডানা মেলে উড়ে যায় কোনও অচিন দেশে, কখনও রামধনু ইঙ্গিত দেয় এক গুপ্তধনের কলসির, যা অপেক্ষা করে আছে যাত্রাপথের শেষে। কিন্তু সেই রাস্তায় কি অজন্তা কোনও দিন হাঁটতে পারবে?
“মিতুল, কী করছিস ওখানে বসে? তোর ফিজিক্স টিউটরের আসার সময় গিয়েছে। সব কিছু তৈরি আছে তো?” মায়ের ডাকে আবার বাস্তবের দুনিয়ায় ফিরে এল অজন্তা। আজ স্কুল নেই। সকালেই বাড়িতে চলে আসবেন প্রাইভেট টিউটর। অফিসে যাওয়ার আগে মা তাই সব দেখেশুনে নিতে চান।
মায়ের মুখে ওই মিতুল নামটা শুনতে তার এখনও ভাল লাগে। ওই ডাকনামটার মধ্যে এখনও যেন খুব ছোটবেলার স্পর্শ খুঁজে পায় সে। নামটার মধ্যে এখনও ফিরে পায় মায়ের শরীরের হারানো ঘ্রাণ। না হলে সদাব্যস্ত বাবা- মাকে কখন আর সে কাছে পায়। সপ্তাহে এক বার দেখা হয়। আর বাকিটা ঘড়ির হিসেব মেনে বড়জোর ঘণ্টা দু’য়েকের জন্য। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার পাঠ্যপুস্তকের জগতে ডুব দিল অজন্তা।
সে একটু ইন্ট্রোভার্ট টাইপের। অন্তর্মুখী। কারও সঙ্গে সে ভাবে মিশতে পারে না। তার যে-দু’-এক জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে, তারা বলে, টপারেরা ও-রকমই হয়। বাকিদের থেকে আলাদা। নিজেদের একটা নিজস্ব বৃত্তের মধ্যে আটকে রাখে। অজন্তা মনে মনে জানে, ব্যাপারটা ঠিক সে রকম নয়। তার এই বহুতল আবাসনের কাছে স্কুলের সে-রকম কেউ থাকে না, যার সঙ্গে সে খোলামনে মিশতে পারবে। যার বাড়ি গিয়ে গল্প করে সময় কাটাতে পারবে। যত সে একাকিত্বের অন্ধকার অনুভব করে, তত সে নিজেকে গুটিয়ে নেয় এই বৃত্তের মধ্যে। তত ডুবে যেতে চায় পাঠ্যপুস্তকের জগতে। তত নিজেকে মনে করাতে থাকে বাবা-মায়ের শেখানো মন্ত্রটা, জীবনে বড় হতে হবে। অনেক কিছু করতে হবে।
.
বহুতল থেকে এক কিলোমিটার দূরে একটা ছেলেও ক্রমাগত একাকিত্বের শিকার হচ্ছিল। সেই একাকিত্ব ছিল অসহ্য যন্ত্রণার। সেই যন্ত্রণা সামলাতে না পেরে এক দিন হঠাৎ দুম করে দুঃসাহসিক একটা কাজ করে বসল কৃষ্ণেন্দু। তার মতো শান্তশিষ্ট ছেলে যে-এতটা সাহস দেখাতে পারবে, কে জানত! পুজো আসছে। তখন কয়েকটা দিন স্কুল ছুটি। অজন্তাকে দেখতে না পেয়ে সে ক্রমে পাগল হয়ে যাচ্ছিল। কারও কাছে যে-মনের কথাটা বলে কষ্ট লাঘব করবে, তারও উপায় ছিল না। নিজের ওপর ক্রমে বাড়তে থাকা একটা মানসিক চাপ তাকে অতলে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। মায়ের চোখেও ব্যাপারটা ধরা পড়েছিল। বেশ কয়েক বার জিজ্ঞেস করে বসেন, “কী রে, মুখ গোমড়া করে বসে আছিস কেন? পড়াশোনাতেও দেখছি সে ভাবে মন লাগাচ্ছিস না! পরের বছরই তো বোর্ড এক্সাম। জয়েন্টের পরীক্ষাও আছে। কী যে-করিস!”
কী যে-করবে, তা ঠিকই করে উঠতে পারছিল না কৃষ্ণেন্দু! সে যেন পাগল হয়ে যাচ্ছিল। তার পরে সে ঠিক করে ফেলল, কী করবে!
সে দিন দুপুরে ছেলেকে হঠাৎ বেরোতে দেখে মা জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে, এই অবেলায় কোথায় যাচ্ছিস? আড়াইটে বাজে। একটু বিশ্রাম করে বই নিয়ে বসলে তো পারতিস।”
“আমার বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি। ওখানে পড়াশোনা-করে নেব।”
ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে দুরদার করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল কৃষ্ণেন্দু। মাকে আগে এই ভাবে মিথ্যা বলেনি সে। মনের মধ্যে তাই তীব্র একটা অপরাধবোধ জন্ম নিচ্ছিল। কিন্তু যে-ঝড়টা এখন চলছে তার মনে, তার তুমুল আবেগের কাছে সেই অপরাধবোধ খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। তাদের বাড়ির যাদবপুর থানার কাছাকাছি। সেখান থেকে জায়গাটা এক কিলোমিটারের মধ্যে। এই রাস্তাটুকু প্রায় দৌড়ে পার হয়ে গেল কৃষ্ণেন্দু। কিন্তু গন্তব্যস্থলের সামনে এসে তার পা দু’টো জমে গেল। আর নড়তে পারছিল না ছেলেটা।
উল্টো দিকের রাস্তায় তখন দাঁড়িয়ে অজন্তা। কোনও কারণে বহুতল আবাসনের বাইরে এসেছে মেয়েটা। এ দিক-ও দিক তাকাচ্ছে।
কৃষ্ণেন্দু এক বার ভেবে নিল, রাস্তাটা পার হয়ে চলে যাবে মেয়েটার কাছে। গিয়ে বলবে, “আরে, কী করছিস এখানে?” যেন জানেই না, অজন্তা এখানে থাকে। কিন্তু কিছুতেই পা দু’টোকে টেনে নিয়ে যেতে পারছিল না রাস্তার ও’পাশে। সে মোটেই অত স্মার্ট নয় যে, ও-রকম এক জন মেয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারবে। তার মধ্যবিত্ত মানসিকতা ভীষণভাবে একটা প্রাচীর খাড়া করে দিল কৃষ্ণেন্দুর সামনে। সে কিছুতেই নিজেকে টেনে নিয়ে যেতে পারছিল না প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের ও পাশটাতে।
অজন্তা আরও কিছু সময় অপেক্ষা করল। কাউকে যেন খুঁজছিল মেয়েটা! তার পরে আবার আবাসনের বিশাল গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। কৃষ্ণেন্দু হাঁ করে দাঁড়িয়েই রইল। ছেলেটার আর রাস্তা পার হওয়া হল না…
.
গত এক মাস ধরে অজন্তার জীবনেও একটা পরিবর্তন আসছিল। তার একাকিত্বের অন্ধকার কাটানোর জন্য ধীরে ধীরে একটা আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছিল মেয়েটা। সেই যে-দিন তার প্রিয় বন্ধু মোবাইলটা নিয়ে একটা অ্যাপ ইনস্টল করে দিল ফোনে। আর তার পরে বলল, “তুই লেখাপড়ায় দারুণ হতে পারিস, ফার্স্ট গার্ল হতে পারিস, কিন্তু আধুনিক যুগ সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। তোর হাতের স্মার্টফোনটা দিয়ে ফোন করা ছাড়াও যে-আরও অনেক কিছু করা যায়, সেটা জানিস কি?”
অজন্তা সত্যিই বিশেষ কিছু জানত না বা জানার ইচ্ছে দেখায়নি। লেখাপড়ার জন্য যতটুকু ফোনের সাহায্য নেওয়া যায়, ততটাই নিত। আর দু’- এক জন বন্ধুবান্ধবকে ফোন করা, ব্যস। তার মোবাইলের জগৎ বলতে এটাই ছিল। কিন্তু সে দিনের পর থেকে সেই জগৎ বিস্তৃত হতে শুরু করল। অজন্তাও ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ল ইনস্টাগ্রাম অ্যাপের মায়াবী দুনিয়ায়।
অ্যাকাউন্ট খোলা, তার পরে দু’-এক জন পরিচিত বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। এমনই এক বন্ধু তার অ্যাকাউন্ট দেখে এক দিন বলে বসল, “তুই কী মেয়ে রে! নিজের একটাও ছবি দিসনি কেন! তুই এত সুন্দর দেখতে, তোর স্কিন কমপ্লেক্সন তো বলিউড হিরোইনদের মতো। ছবি দে, দেখবি, তোর ফলোয়ারের সংখ্যা কত বেড়ে যায়।”
অজন্তা প্রথমে একেবারেই রাজি হয়নি। তার বাবা-মা বার বার করে বলে দিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় যেন কোনও ছবি আপলোড না-করে। যে- কারণে ফেসবুকে সে একদমই ছবি দেয় না। কিন্তু এই ইনস্টাগ্রাম তো মূলত ছবিরই অ্যাপ। এখানে তো সবাই ছবিই দেয়। অনেক কিন্তু কিন্তু করে, মনে সাহস জুগিয়ে সে নিজের একটা ছবি দিল ইনস্টাগ্রামে।
আর সত্যিই তার বন্ধুর কথা হুবহু মিলে গেল। তার ফলোয়ারের সংখ্যা বাড়তে লাগল। যে-তালিকায় ছেলেদের সংখ্যাই একটু বেশি। প্রত্যেকটা ছেলের মুখে তার কী প্রশংসা। অজন্তা সেই সব মেসেজ পড়তে পড়তে একটু লজ্জাই পেয়ে গেল! কিন্তু তার ভালও লাগছে। মনের মধ্যে একটা অন্য রকম অনুভূতি হচ্ছে। সে আজীবন কো-এডুকেশন স্কুলে পড়েছে। প্রথম থেকেই ছেলেদের সান্নিধ্য পেয়েছে। কিন্তু স্কুল জীবনে ছেলেদের সঙ্গে সে ভাল করে মিশতেও পারেনি। ছেলেগুলোও কী রকম ক্যাবলা গোছের। ওদের সঙ্গে মিশতেও ভাল লাগত না অজন্তার। কিন্তু ইনস্টাগ্রামের ব্যাপারটা অন্য। যত দেখছে, তত যেন মজে যাচ্ছে সে।
দিন চার-পাঁচেক পরে আবার কয়েকটা ছবি পোস্ট করল সে। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে। নিজের ঘরে বসে। খুব সাবধানে। তবে এত সাবধান হওয়ার কিছু ছিল না। তার বাবা-মা বেশ রাত করে বাড়ি ফিরবেন ক্লান্ত শরীরে। বাড়িতে থাকা কাজের দিদি অজন্তার ঘরে বিশেষ আসে না। তবুও ঘরের দরজাটা বন্ধই রাখে অজন্তা। আর ডুবে যায় অন্য এক জগতে।
নতুন ছবিগুলোর মধ্যে এক-আধটা বেশ সাহসী ছবি। মানে অজন্তার হিসেব মতো সাহসী আর কী! যেখানে সে স্লিভলেস টপ পরে আছে। হাঁটু পর্যন্ত ক্যাপ্রি। সে জানে, তার ত্বকটা অত্যন্ত আকর্ষক। তার বান্ধবীরা তো বলে থাকে, মাখন দিয়ে যেন তৈরি শরীর। তাই ওইটুকু ত্বক দেখানো আর কী!
ছবিগুলো পোস্ট করার পর থেকে তার ফলোয়ারের সংখ্যা আরও বেড়ে যেতে থাকে। এর মধ্যে একটা ছেলে একটু অন্য রকম। মুম্বইয়ে থাকে। ছেলেটার মধ্যে একটা অন্য রকমের আকর্ষণ আছে। দেখতেও বেশ নায়ক, নায়ক। মেসেজগুলোও খুব স্মার্টলি করে। ছেলেটার সঙ্গে কয়েকটা দিন মেসেজ আদান-প্রদান করে অজন্তার বেশ ভালই লেগেছিল। তার পরে এক দিন দুঃসাহসিক কাজ করে বসে সে।
ছেলেটা বার বার অনুরোধ করেছিল, এক বার যদি ইনস্টাগ্রামে কল করে। মোবাইল নম্বর দেওয়ার কোনও দরকার নেই। শুধু একটু কথা বলবে। পাঁচ মিনিট হলেই যথেষ্ট। এক দিন অজন্তা স্কুলে যায়নি। বাবা-মা অফিসে। নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে সেই প্রথম কোনও অপরিচিত একটি ছেলের কল ধরল মেয়েটা। ছেলেটার গলাও যথেষ্ট আকর্ষক। ইংরেজি আর হিন্দি, দু’টো ভাষাতেই চোস্ত। ফোনে কথা বলতে বলতে অজন্তা ধীরে ধীরে ডুবে গেল সম্পূর্ণ অচেনা এক জগতে।
.
… আরও কয়েক বার এ-দিক ও-দিক তাকাল মেয়েটা। আরও এক বার দেখে নিল চারপাশে। একটু যেন হতাশও হল। তার পরে মিলিয়ে গেল বহুতলের ভিতরে। অজন্তা দেখতেও পেল না, ক্লাসের এক সহপাঠী রাস্তার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। দু’চোখ দিয়ে যেন নীরবে পুজো করে চলেছে তাকে।
অজন্তা এটাও দেখতে পেল না, উল্টো দিকের রাস্তার একটা দোকানের আড়াল থেকে অন্য দু’জোড়া চোখ তাকে দেখে চলেছে নীরবে।
