প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৯. ফ্ল্যাশব্যাক: ব্ল্যাকওয়াটার স্ক্যান্ডাল

৯. ফ্ল্যাশব্যাক: ব্ল্যাকওয়াটার স্ক্যান্ডাল

ইরাক, ২০০৭

প্রথম গুলিটা কে ছুড়েছিল, সে প্রশ্নের জবাব কোনও দিন পাওয়া যায়নি। ইরাকিরা বলে থাকে, গুলি ছুড়েছিল আমেরিকার কন্ট্রাক্টররা। আর সেই বেসরকারি কন্ট্রাক্টরদের দাবি ছিল, একটা সরু রাস্তায় মার্কিন দূতাবাসের গাড়ি প্রথমে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার পরে সেই গাড়ি এবং কনভয়ের উপরে হামলা হয়। যার জবাব আগ্নেয়াস্ত্রের সাহায্যেই দিতে হয়েছে। কোনও বেআইনি কাজ করা হয়নি।

এক বার গুলি ছোড়া শুরু হয়ে যাওয়ার পরে আর তা থামানো যায়নি। দূতাবাসের গাড়ির সঙ্গে যে-কনভয় যাচ্ছিল, তার তিন নম্বর গাড়িতে ছিল এডওয়ার্ডস। সে-ও ঠিক বুঝতে পারেনি, গুলিটা প্রথম কোথা থেকে এসেছে। কিন্তু এক বার ‘ফায়ার’ অর্ডারটা কানে আসা মাত্র আর দেরি করেনি প্রাক্তন নেভি সিল কমান্ডো। প্রথমে গাড়ির জানলা থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিবৃষ্টি শেষ করে, দরজা খুলে শরীরটা বাইরে নিয়ে আসে। তার হাতে তত ক্ষণে এসে গিয়েছে আরপিজি- রকেট প্রপেলড গ্রেনেড লঞ্চার। দু’পাশের বাড়ির ছাদ থেকে তখন ইরাকি বাহিনীও গুলি ছুড়তে শুরু করেছে। সে দিক লক্ষ্য করে এডওয়ার্ডস তার আরপিজি-র ট্রিগারে চাপ দিল।

মিনিট কুড়ি লড়াইটা চলেছিল। দু’পক্ষের গুলির লড়াইয়ে মারা গিয়েছিল বেশ কিছু সাধারণ মানুষ। যে-গাড়িটার জন্য দূতাবাসের গাড়ির গতি কমে যায়, সেটা তখন পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। ভিতরের আরোহী সমেত। গাড়িতে ছিল এক দম্পতি এবং তাদের সন্তান। দম্পতি গুলিতে মারা গেলেও বাচ্চাটা যায়নি। পরে জানা যায়, মায়ের শরীরের সঙ্গে লেপটে থাকা অবস্থায় বাচ্চাটা জীবন্ত পুড়ে মারা গিয়েছে।

যারা সে দিন গাড়িটার কাছে যেতে পেরেছিল, তারা দেখেছিল সেই দৃশ্যটা। মায়ের শরীরের সঙ্গে লেপ্টে রয়েছে একটা বাচ্চার পুড়ে যাওয়া শরীর। কতটা যন্ত্রণা পেয়ে, অসহায়ের মতো শিশুটিকে মরতে হয়েছে, তা কল্পনাও করা যায় না। এই রকম একটা দৃশ্য পাথরও গলিয়ে দিতে পারে। ব্ল্যাকওয়াটারের এজেন্টরা চোখের পলক না ফেলে মানুষ মারতে পারে ঠিকই, কিন্তু ওই রকম একটা মর্মান্তিক দৃশ্য তাদের কাউকে কাউকে টলিয়ে দিয়েছিল সে দিন।

এই খবরটা জানাজানি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুমুল হইচই পড়ে যায়। বেসরকারি নিরাপত্তা এজেন্সির নাম ছিল ব্ল্যাকওয়াটার। সংবাদমাধ্যমে ইরাকের এই ঘটনাকে বলা হতে থাকে, ব্ল্যাকওয়াটার স্ক্যান্ডাল। ইরাকি সরকার উঠে পড়ে লাগে ব্ল্যাকওয়াটারের লাইসেন্স বাতিল করার জন্য। আমেরিকারই বেসরকারি নিরাপত্তা এজেন্সি ব্ল্যাকওয়াটারের সঙ্গে মার্কিন সরকারের তখন একটা চুক্তি ছিল। বিশাল অর্থের বিনিময়ে বিদেশের মাটিতে থাকা মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করত এই প্রাইভেট সিকিয়োরিটি কনট্র্যাক্টর।

ইরাকি কেলেঙ্কারির পরে ব্ল্যাকওয়াটারকেও কিছুটা ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামতে হয়। তাদের বেশ কিছু অপারেটিভকে ইরাক থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হয়। যাদের মধ্যে ছিল এডওয়ার্ডসও।

সেই ঘটনার মাসখানেক পরে ভার্জিনিয়ার রেস্টনে কোম্পানির হেড অফিসে ডাক পড়ল এডওয়ার্ডসের। কেবিনে যে-ভদ্রলোকটি বসে ছিলেন, তিনি বড় বস না-হলেও যে-প্রভূত ক্ষমতাশালী, তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। সঙ্গে আরও এক জন লম্বা মতো লোককে দেখতে পেল এডওয়ার্ডস। সে বসে নেই, ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটিকে দেখতে পেয়েই সচেতন হয়ে উঠল এডওয়ার্ডসের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। তার মন বলছে, লোকটা সহজসরল নয়।

চেয়ারে বসে থাকা ব্ল্যাকওয়াটারের কর্তাটি কয়েক মিনিট জরিপ করে নিলেন এডওয়ার্ডসকে। তার পরে বললেন, “তুমি খুব ভাল কাজ করেছ শেষ কয়েক বছর ধরে। ইরাকেও তোমার কাজে আমরা খুশি। তোমাকে এ বার একটা বিশেষ প্রোগ্রামের জন্য তৈরি করা হবে। তুমি বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করো। সময়মতো ব্রিফ করে দেওয়া হবে।”

এডওয়ার্ডস ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় লোকটিকে আর এক বার দেখে নিল। কালো সানগ্লাসে ঢাকা চোখ দু’টো যে-তাকেও মেপে নিচ্ছে, এটা বুঝতে প্রাক্তন কমান্ডোর সমস্যা হল না।

এডওয়ার্ডস বেরিয়ে যাওয়ার পরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটি এ বার চেয়ারে এসে বসল। তার পরে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল, “এর কথাই বলছিলে কি?” উল্টো দিকের ব্যক্তি ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাথাটা নাড়ালেন, “হ্যাঁ, তুমি যে-রকম চাইছ, ছেলেটা সে-রকমই। কিলিং মেশিন। হাইলি ট্রেনড। বিনা বাক্যব্যয়ে হুকুম তামিল করে। আমাদের প্রোগ্রামের জন্য আদর্শ অ্যাসেট হয়ে উঠবে।”

“ঠিক আছে। তোমার কথা মতো তা হলে দেখে নিচ্ছি ছেলেটাকে।” একটু থেমে বলল, “ছেলেটার চামড়ার রংটা বেশ তামাটে। দেখলে এশিয়া বা মেক্সিকোর মানুষ মনে হতে পারে।”

“সেটা স্বাভাবিক। ওর পূর্বপুরুষরা মেক্সিকো থেকে এই দেশে এসেছে।” শুনে একটু হাসল লম্বা লোকটা। এই এডওয়ার্ডসকে কোথায় কাজে লাগানো যায়, সেটা তার মাথায় চলে এসেছে।

দু’জনে বাইরে চলে এল। একটু দূরে বসে ছিল এডওয়ার্ডস। তার সামনে গিয়ে লম্বা লোকটিকে দেখিয়ে ব্ল্যাকওয়াটারের প্রতিনিধি বললেন, “আজ থেকে তুমি ওর সঙ্গে কাজ করবে। ব্ল্যাকওয়াটার এবং সিআইএ মিলে একসঙ্গে অপারেশন করছে বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। তুমি সেই অপারেশনের অংশ হবে। তার জন্য তোমাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এখন থেকে তোমার বস হল মিস্টার স্মিথ। স্পেশাল এজেন্ট, সিআইএ।”

.

এই ঘটনার দু’বছর পরে আসল কেলেঙ্কারিটি প্রকাশ্যে চলে এল মিডিয়ার দৌলতে। জানা যায়, সেই ২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ একটা বিশেষ নির্দেশ দিয়েছিলেন সিআইএ-কে। একটা টপ সিক্রেট অ্যাসাসিনেশন স্কোয়াড তৈরি করতে হবে। সেই ঘাতক বাহিনীর কাজই হবে আল কায়দার এজেন্টদের খুঁজে বার করে হত্যা করা। তার জন্য যা করা দরকার, সেটা করার ছাড়পত্র দেওয়া হয় মার্কিন গুপ্তচর সংস্থাকে।

এই নির্দেশ পাওয়ার পরে একটা উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন সিআইএ-র কর্তারা। প্রথমেই ঠিক হয়, সিআইএ-র এজেন্টরা সরাসরি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে না। কোনও বেসরকারি সংস্থার হাতে এই অ্যাসাসিনেশন স্কোয়াড তৈরি করার দায়িত্ব দেওয়া হবে। এর বড় কারণ হল, সে ক্ষেত্রে সিআইএ ওই স্কোয়াড মারফত যাকে খুশি তুলে আনতে পারবে, অত্যাচার করতে পারবে, হত্যা করতে পারবে। যার জন্য তাদের জবাবদিহিও করতে হবে না। সিআইএ-র এই প্রস্তাবটা মার্কিন সরকারেরও খারাপ লাগেনি। বেসরকারি হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া মানে সরকারের কেউ আর সরাসরি কোনও ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকল না। কোনও কেলেঙ্কারি হলে কেউ আর দায়ী থাকবে না।

দ্রুত সবুজ সঙ্কেত চলে এল উপর মহল থেকে। আর তৈরি হয়ে গেল সিআইএ পরিচালিত প্রথম বেসরকারি কোভার্ট অ্যাসাসিনেশন স্কোয়াড। আর যে- বেসরকারি সংস্থাকে বেছে নেওয়া হল এই অ্যাসাসিনেশন স্কোয়াড তৈরি করার জন্য, তার নাম ছিল ব্ল্যাকওয়াটার!

আট বছর ধরে বিশ্বের নানা প্রান্তে অভিযান চালায় ব্ল্যাকওয়াটারের এই ডেথ স্কোয়াড। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে। ২০০৮ সাল থেকে এই ডেথ স্কোয়াডের বিশেষ বিচরণ ভূমি হয়ে ওঠে আফগানিস্তানও। মিডিয়া জানতে পারে, এই ডেথ স্কোয়াডের সঙ্গে যুক্ত আছে অনেক প্রাক্তন স্পেশাল ফোর্সের সৈন্য। মিডিয়ার কাছে ভুল খবর ছিল না। তবে পুরো খবরটা ছিল না।

স্পেশাল ফোর্সের কাউকে কাউকে আবার আলাদা করে বেছে নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। সেই প্রশিক্ষণের অঙ্গ ছিল, সিভিলিয়ান কিলিং। অর্থাৎ, প্রয়োজনে সমাজের অন্য স্তরের মানুষকেও হত্যা করতে হবে। যে- তালিকায় ছিল বড় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সমাজসেবী, ফিল্মস্টার— সবাই। যে- হত্যাকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখাতে হত দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা হিসেবে। বেআইনি এই কার্যকলাপ বিশাল অর্থের বিনিময়ে করার জন্য স্পেশাল ফোর্সের কিছু এজেন্টকে ট্রেনিং দিয়ে বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রফেশনাল কিলার।

সিআইএ-ব্ল্যাকওয়াটার চুক্তি সামনে চলে আসার পরে তুমুল হইচই শুরু হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে পিছু হটে সিআইএ। চুক্তিও বাতিল হয়ে যায়। ব্ল্যাকওয়াটারও নিজেদের কোম্পানির নাম বদলে নতুন ভাবে কাজ শুরু করে। আর তাদের তৈরি ডেথ স্কোয়াডের অনেকেই ছিটকে যায় বিভিন্ন দিকে।

.

বছর ছয়েক পরে এক সন্ধ্যায় লস অ্যাঞ্জেলেসের এক অভিজাত রেস্তরাঁয় নৈশভোজে মিলিত হয়েছেন দুই ভদ্রলোক। এক জন, জার্মানি থেকে এসে জাঁকিয়ে বসেছেন এই শহরে। ক্রমে নিজের ব্যবসা যে-রকম ছড়িয়ে দিচ্ছেন, সে-রকমই পা রেখেছেন হলিউডের জগতেও। দ্বিতীয় জন, সিআইএ-র ইন্টেলিজেন্স বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টরের খুবই ঘনিষ্ঠ এক এজেন্ট।

প্রথমে মুখ খুললেন জার্মান ভদ্রলোক, “আমার ব্যবসায় যে-শত্রুর অভাব নেই, তা তো তুমি ভালই করে জানো। জার্মানিতে এ সব আমি সামলে নিতে পারতাম। কিন্তু এখানে একটু ধীরে চলতে চাই। এখনই কোনও বড় ঝামেলায় জড়াতে চাই না।”

সিআইএ এজেন্ট একটু ভাবল। তার পরে বলল, “আমি এক জনের সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দেব। এক্স নেভি সিল, ট্রেনড অ্যাসাসিন। খুব সহজে হত্যাকে আত্মহত্যায় বা দুর্ঘটনায় বদলে দিতে পারে। আদর্শ প্রফেশনার কিলার। তোমার পছন্দ হবেই হবে।”

“বিশ্বাসযোগ্য কি? আমাদের লাইনে ওই গুণটা সবার আগে দরকার।” “অবশ্যই। দীর্ঘদিন ব্ল্যাকওয়াটারের ডেথ স্কোয়াডের অংশ ছিল। ইউরোপ-এশিয়ায় অনেক অপারেশন সামলেছে। ওকে পাওয়া মানে একটা বুলডগ পেয়ে গেলে, এটা ধরে নিতে পারো।”

ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস একটু ভাবলেন। তার পরে বললেন, “কী নাম ছেলেটার?”

“দ্য পেন্টার।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *