প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৪. দ্য প্রোডিউসার

৪. দ্য প্রোডিউসার

দ্য ভ্যালি, লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি, ক্যালিফোর্নিয়া

স্থানীয় লোকজনের কাছে ‘দ্য ভ্যালি’ বলে পরিচিত হলেও জায়গাটার পোশাকি নাম হল স্যান ফার্নান্দো ভ্যালি। ৬৭০ স্কোয়ার কিলোমিটার জায়গা জুড়ে এই উপত্যকা খুব বিশাল আকৃতির কিছু নয়। এর বিশালত্ব অন্য জায়গায়। এখানে কেউ ঘুরতে এলে তাদের চোখে নিশ্চিত ভাবে ধরা দেবে কিছু বিশেষ ল্যান্ডমার্ক। যার কোনওটার গায়ে লেখা আছে ওয়ার্নার ব্রাদার্স স্টুডিয়োস, কোনওটার গায়ে খোদাই করা ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিয়োস।

এ ছাড়াও আছে নামীদামি হলিউড ফিল্ম প্রোডিউসারদের কিছু অফিস। এমনই একটা অফিসে নিজের কেবিনের আরামদায়ক চেয়ারটায় গা এলিয়ে বসে ছিলেন ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস। চুরুটে একটা লম্বা টান দিয়ে নিজের মনেই হাসলেন গ্রোপিয়াস। তাঁর মনটা খুশি খুশি রয়েছে। একটা ছোট উপদ্রব এসে জুটেছিল। সেই উপদ্রবকে সামলানো গিয়েছে। এখন তাঁর সামনে আর কোনও বাধাই নেই।

এই উপদ্রবটা মাথা চাড়া দেওয়ার নেপথ্যে অবশ্য এক জন সাংবাদিক। মাস চারেক আগে দুম করে তাঁকে নিয়ে একটা আর্টিকেল ছাপিয়ে দেয় কাগজে। যার পর থেকেই ঝামেলা শুরু। সেই কাগজটা এখনও পড়ে আছে গ্রোপিয়াসের টেবিলে। ধীরে ধীরে আর্টিকেলটায় আরও এক বার চোখ বোলালেন হলিউডের অন্যতম খ্যাতনামা ফিল্ম প্রোডিউসার। আর্টিকেলটার শিরোনাম এ রকম—

‘হলিউড বস অর জার্মান স্পাই?’

লেখায় ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াসের এক সময়কার জীবন কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। যে-জীবন তিনি অনেক দিন হল পিছনে ফেলে এসেছেন। কিন্তু গ্রোপিয়াসকেও মানতে হল, সেই জীবনের ছায়া থেকে এখনও বার হয়ে আসতে পারেননি তিনি। কাগজটা টেবিলে নামিয়ে রেখে চোখ বন্ধ করে অতীতে ডুব দিলেন ফার্দিনান্দ গোপিয়াস।

বুন্দেশনাখরিটেন্দিস্ট! সারা দুনিয়ার কাছে যার পরিচিতি ‘বিএনডি’ নামে। সোজা কথায়, জার্মান ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস। অল্প বয়সে জার্মান আর্মিতে যোগ দেওয়ার পরে সেখান থেকে তাঁকে বেছে নেওয়া হয় বিএনডি-র জন্য। তার পর থেকেই বদলে যায় গ্রোপিয়াসের জীবন। সিক্রেট সার্ভিসের দুনিয়া তাঁকে এনে দেয় এমন সব লোকের সংস্পর্শে, যাদের কাছে নিজের স্বপ্নপূরণের পথের হদিশ পেয়ে যান গ্রোপিয়াস। অর্থাৎ কোটি কোটি টাকা রোজগারের পথ। আজও গ্রোপিয়াসকে চালিয়ে নিয়ে যায় ওই একটা আকাঙ্ক্ষা— অর্থ রোজগার। গোপিয়াস জানেন, অর্থের সঙ্গেই আসে ক্ষমতা। আজ তিনি বিলিয়োনিয়ার। গোটা পৃথিবী প্রায় হাতের মুঠোয়। কিন্তু খিদেটা আজও কমেনি ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াসের।

সিক্রেট সার্ভিসের দুনিয়া তাঁকে পরিচিত করায় আরও একটা জগতের সঙ্গে। ব্ল্যাক মার্কেট আর্মস ডিলিংস। ঠান্ডা মাথার নৃশংস মানুষ হওয়ার পাশাপাশি একটা বিশেষ গুণ ছিল গ্রোপিয়াসের। প্রচণ্ড ধূর্ত ছিলেন তিনি। প্রতিকূল পৃথিবীতে কীভাবে ঠিক লোকটার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে গেলে তাঁর লাভ হবে, সেটা গ্রোপিয়াস খুব ভালই বুঝতে পারতেন। আরও একটা ব্যাপার গ্রোপিয়াসের পক্ষে গিয়েছিল। তাঁর উত্থানের সময় থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর জার্মানির সম্পর্কটা ভাল হতে থাকে। এই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে সিক্রেট সার্ভিসের দুনিয়া থেকে বার হয়ে পা রাখেন অন্য এক পৃথিবীতে। যে-পৃথিবীর নাম ব্ল্যাক মার্কেট আর্মস ডিলিংস। অবশ্যই অন্য এক পরিচয়ে।

গ্রোপিয়াস একটা কথা খুব দ্রুত বুঝে গিয়েছিলেন। তাঁর অর্থলিপ্সা পূর্ণ হতে পারে বিশেষ একটা দেশে পা রাখতে পারলে। আমেরিকা। তাই জার্মান সরকারের একটা অংশের সঙ্গে যেমন সুসম্পর্ক রেখেছিলেন, সে-রকম মার্কিন সরকারের একটা গ্রুপের সঙ্গেও তাঁর লেনদেন অন্য রকম ছিল। যে-রকম ছিল সিআইএ-র সঙ্গেও। আর্মস ডিলার হওয়ার ফলে এমন সব খবর তিনি সিআইএ- র কাছে পাঠাতে পেরেছিলেন, যা মার্কিন গুপ্তচর সংস্থার পক্ষেও জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। আর ইউরোপে বিশেষ বিশেষ অপারেশনের জন্য আর্মস সাপ্লাই তো ছিলই। সম্পর্কের বাঁধনটা তখন থেকেই মজবুত হতে শুরু করে।

পঁচিশ বছর আগে ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস জার্মানি ছেড়ে মার্কিন মুলুকে পা রাখার সিদ্ধান্ত নেন। কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন লস অ্যাঞ্জেলেসকে। তাঁকে এমপ্লয়মেন্ট বেসড ভিসা দিতে ঝামেলা করেনি মার্কিন সরকার। সেই ভিসার মেয়াদ নিয়মমতো বেড়ে গিয়েছে। সুযোগ থাকলেও মার্কিন নাগরিকত্ব নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি গ্রোপিয়াস। তবে মাস চারেক আগে ঘটনা যে-ভাবে গড়াতে শুরু করেছিল, তাতে তাঁর মনে হয়েছিল নাগরিকত্বটা নিয়ে রাখলেই ভাল হত…

তাঁকে নিয়ে যে-আর্টিকেলটা প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে শুধু তাঁর গুপ্তচরবৃত্তির অতীত নিয়েই সাংবাদিক প্রশ্ন তোলেননি, আলোকপাত করেছেন আর্মস চোরাচালান নিয়েও। গ্রোপিয়াসের অফিস থেকে যথারীতি আর্মস চোরাচালানোর অভিযোগটা অস্বীকার করা হয়েছে। বিএনডি-র ব্যাপারটা পুরো অস্বীকার করা যায়নি। কিন্তু তাতে কোনও সমস্যা হবে বলে মনে করেননি এই হলিউড বস। তাঁর প্রোডাকশন হাউস একটার পর একটা হিট সিনেমা দিয়েছে। শুধু হলিউডের মধ্যেই নয়, মার্কিন রাজনৈতিক মহলেও গ্রোপিয়াসের প্রভাব এখন অনেক সুদূরপ্রসারী। এই রকম প্রবন্ধ তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত হওয়ার পরেও তাই বিশেষ চিন্তিত ছিলেন না গ্রোপিয়াস।

চিন্তা বাড়িয়ে দিল একটা ফোন। যা এসেছিল ইউ এস কংগ্রেসের এক বন্ধুর কাছ থেকে।

“তোমার ব্যাপারটা নিয়ে কিন্তু জলঘোলা হতে শুরু করেছে। এক সেনেটর রীতিমতো ঝড় তুলছে। কেন তোমাকে মার্কিন ভিসা দেওয়া হবে? তোমার অতীত নিয়ে কেন তদন্ত করে দেখা হবে না? এই সব প্রশ্ন কিন্তু মাথা চাড়া দিতে শুরু করেছে।”

একটু ভাবলেন গ্রোপিয়াস। তার পরে বললেন, “এর পিছনে কেউ আছে বলে তোমার মনে হয়?”

ফোনের উল্টো দিকে থাকা ব্যক্তি সামান্য ভাবল। তার পরে জবাব দিল, “থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল, তুমি কীভাবে ঝামেলার হাত থেকে বাঁচবে? সেনেটর ভদ্রলোক কিন্তু দাবি তুলেছেন, তোমার ভিসা বাতিল করে তোমাকে দেশে ফেরত পাঠানো হোক। এটা হাল্কা ভাবে নেওয়া ঠিক হবে না।”

তিরিশ সেকেন্ড মতো ভাবলেন গ্রোপিয়াস। সামনে রাখা পেনটা হাতে নিয়ে ঘোরাতে লাগলেন। তার পরে জবাব দিলেন, “তোমাকে ধন্যবাদ খবরটা দেওয়ার জন্য। কোনও চিন্তা কোরো না। যা করার আমি করছি।”

ফোনটা রেখে মিনিটখানেক চিন্তা করলেন হলিউড ফিল্ম প্রোডিউসার। এই মুহূর্তে মার্কিন-জার্মান সম্পর্কটা দারুণ জায়গায় আছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ছিল জার্মানির সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ট্রেডিং পার্টনার। মার্কিন মুলুকে যতগুলো বিদেশি কোম্পানি সে দেশের লোকেদের চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে, তাদের মধ্যে জার্মান কোম্পানিগুলোর স্থান তিন নম্বরে। গত এক বছর ধরে আরও একটা ব্যাপার দু’দেশকে কাছাকাছি এনে দিয়েছে। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পরে তিরিশ হাজারেরও বেশি মার্কিন সৈন্য এখন ঘাঁটি গেড়ে আছে জার্মানিতে। নেটোর (নর্থ অ্যাটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন) সঙ্গে হাত মিলিয়ে যাদের কাজ হল, ইউরোপের নিরাপত্তা দেখা। এর পরে মার্কিন বায়ুসেনাও ঘাঁটি তৈরি করবে জার্মানিতে।

গ্রোপিয়াস আবার ফোনটা তুলে নিলেন। এ বার কলটা গেল জার্মানিতে এক ক্ষমতাবান ভদ্রমহিলার কাছে। গ্রোপিয়াস ভালই জানতেন, ভদ্রমহিলা পাল্টা ফোন করবেন মার্কিন বিদেশসচিব বা সমগোত্রীয় কাউকে। আর তার পরেই ঝামেলা মিটে যাবে। ইউরোপে এই মুহূর্তে যা চলছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এই ছোট্ট ঘটনা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না। এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনও ভাবেই জার্মানির সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করবে না। তা-ই হল। সপ্তাহখানেক পরে আবার সেই কংগ্রেসের বন্ধু ফোন করে খবরটা দিলেন-

“আর চিন্তা নেই। একেবারে উপরমহলের খবর হল, তোমার ভিসার মেয়াদ যে-ভাবে বাড়ছে, সে ভাবেই বাড়বে।”

গ্রোপিয়াস আবার তাঁর ঠান্ডা হাসিটা হাসলেন। সমস্যা হওয়ার কথাই নয়। তাঁর নাম ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস। এর থেকে অনেক বড় সমস্যা তিনি জীবনে সামলে এসেছেন। তিনি যা চান, তাই পেয়ে এসেছেন এত দিন। যে-বাধাই এসেছে, নির্দয় ভাবে সরিয়ে দিয়েছেন। গ্রোপিয়াস জানেন, তাঁকে থামানোর মতো কেউ নেই।

কিন্তু একটা কাঁটা তাঁর মনে খচখচ করছিল। ওই সাংবাদিক আর ওই সেনেটর। দু’জনেই তাঁর গায়ে কাঁদা ছিটিয়েছে। গ্রোপিয়াস জানেন, এখনই সাংবাদিকের কিছু হলে নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেটা দুর্ঘটনা হলেও। সাংবাদিকের হিসেবটা পরে মেটানো যাবে। কিন্তু সেনেটরের ব্যাপারটা অন্য। এই লোকটা ভবিষ্যতেও জলঘোলা করতে পারে।

নিজের কেবিনের সেফ লাইনের ল্যান্ডফোনটা এ বার হাতে তুলে নিলেন গ্রোপিয়াস। অন্য প্রান্তে ‘হ্যালো’ শুনতেই বললেন, “দেখা করতে হবে। কাজ আছে।”

মাসখানেক আগে তাঁদের সেই মিটিংটা হয়েছিল। তার পরে আর কোনও কথা হয়নি দু’জনের। গত কাল বেলা একটা নাগাদ মোবাইলে মেসেজটা পেয়েছেন তিনি। আর তার পর থেকেই মেজাজটা ভাল হয়ে গিয়েছে। ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস কারও হিসেব বাকি রাখেন না। এই জীবনেই সব মিটিয়ে দিয়ে যান। মেসেজটার দিকে আরও এক বার তাকালেন হলিউডের অন্যতম খ্যাতনামা প্রোডিউসার। মেসেজে চারটে শব্দ লেখা আছে—

‘পেন্টিং হ্যাজ বিন ফিনিশড।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *