প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৫. দ্য অ্যাম্বুল্যান্স

৫. দ্য অ্যাম্বুল্যান্স

বান্দ্রা, মুম্বই, ২০২৩

হয়তো চোখটা একটু বুজে এসেছিল। হয়তো ওই মুহূর্তে চোখে একটু ঝাপসা দেখছিল। ঠিক কী হয়েছিল, নবীন বলতে পারবে না। একেবারে শেষ মুহূর্তে ওয়াটার ট্যাঙ্কারটাকে দেখতে পেয়েছিল ছেলেটা। রাস্তার এক ধারে দাঁড়ানো মুম্বই পুরসভার জলের বিরাট একটা গাড়ি। দেখা মাত্রই যত জোরে সম্ভব ব্রেক প্যাডেলের উপরে চাপ দিয়েছিল নবীন। কিন্তু তাতেও সংঘর্ষটা পুরো এড়ানো গেল না। অ্যাম্বুল্যান্সের গতি কমলেও জলের ট্যাঙ্কারে গিয়ে ঠিকই ধাক্কা খেল গাড়িটা।

নবীন প্রথমেই বুকে খুব জোরে একটা ব্যথা টের পেল। তার বুকটা গিয়ে লেগেছে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে। পাশে বসা আর একটা ছেলের মাথা সজোরে ঠুকে গিয়েছে গাড়ির জানলায়। এতটা জোরে, যে-কাঁচটায় চিড় ধরে গিয়েছে, ছেলেটার মাথা থেকেও রক্ত বেরোতে শুরু করেছে। গাড়ির পিছন থেকেও চিৎকার ভেসে এল।

অ্যাম্বুল্যান্সটার ইঞ্জিন তখন কয়েক বার ঘরঘর আওয়াজ করে থেমে গিয়েছে। গাড়ির সামনের বনেট কিছুটা দুমড়ে গিয়েছে।

প্রথমে হুঁশ ফিরল নবীনের। রাত তিনটে বাজে। এই মুহূর্তে রাস্তাটা ফাঁকা আছে। কিন্তু যে-কোনও মুহূর্তে অন্য গাড়ি চলে আসতে পারে। মুম্বই বলে কথা। পাশের ছেলেটাকে একটা ধাক্কা দিয়ে নবীন বলল, “এখনই গাড়ি থেকে নাম। আমাদের দ্রুত হাওয়া হয়ে যেতে হবে। না-হলে কপালে দুঃখ আছে।”

দু’জনেই দ্রুত নেমে চলে গেল গাড়ির পিছনে। তার পরে পিছনের দরজাটা খুলে ভিতরে উঁকি মারল। ভিতরে বসা দু’টো ছেলেই কাঁধ ডলছিল। কিন্তু চোট খুব একটা লাগেনি। দু’জনেই পরিস্থিতি বুঝে তাড়াতাড়ি চলে এল গাড়ির বাইরে। এ বার চার জনই তাকাল অ্যাম্বুল্যান্সের ভিতরে।

স্ট্রেচারটা একটু সরে গিয়েছে। কিন্তু মেয়েটার শরীর স্ট্র্যাপ দিয়ে বাঁধা ছিল বলে ছিটকে পড়ে যায়নি। তবে ব্যান্ডেজ বাঁধা মুখটা থেকে গোঙানির আওয়াজটা বেড়েই চলেছে। নবীন বাকিদের দিকে ফিরে বলল, “এখনই আমাদের কেটে পড়তে হবে। পুলিশ এল বলে।” অন্য আর একটি ছেলে একটু ইতস্তত করে প্রশ্ন করল, “এই মেয়েটার কী হবে? এখানে ফেলে রেখে গেলে তো পুলিশের হাতে পড়ে যাবে।”

নবীন চট করে উল্টো দিকে হাঁটা দিতে দিতে জবাব দিল, “কিছু করার নেই। মেয়েটাকে এখন বার করা যাবে না। আমরা ধরা পড়ে গেলে কেস খুব ঝামেলার হয়ে যাবে।” বাকিরাও আর দেরি করল না। চারটে মূর্তিই মিশে গেল অন্ধকার রাস্তায়। নবীন অবশ্য তার মধ্যে একটা কাজ করেছিল। দুর্ঘটনার খবরটা জানিয়ে দিয়েছিল একটা বিশেষ নম্বরে।

দুর্ঘটনা ঘটে বান্দ্রা রিক্লেমেশন রোডের উপরে। ইউ ব্রিজটার খুব কাছে। মিনিট দশেকের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় মুম্বই পুলিশ। আর তার পরে তাদের যা করণীয়, সেটাই করে। উদ্ধার হওয়া একমাত্র ব্যক্তিকে পাঠিয়ে দেয় স্থানীয় ভাবা মিউনিসিপাল হাসপাতালে। নাটক শুরু হয় তার পর থেকে।

দুর্ঘটনার কেস বলে ভর্তি হওয়ার মিনিট দশেক পরে দু’জন জুনিয়র ডাক্তার আসেন এক বার দেখতে। দু’জনেরই একটু খটকা লাগে মাথা-মুখের ব্যান্ডেজটা দেখে।

“এই মেয়েটির কি আগেই কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছিল? ব্যান্ডেজটা দেখে তো সে-রকমই মনে হচ্ছে!” প্রথম ডাক্তারের প্রশ্নে রুগিকে আর এক বার খুঁটিয়ে দেখল দ্বিতীয় জন।

“ও যে-গাউনটা পরে আছে, সেটা দেখো। হাসপাতালে ভর্তি হলে সাধারণত এই ধরনের গাউন পরে থাকে। বিশেষ করে অপারেশনের সময়।” দু’জনেই দু’জনের দিকে তাকাল এক বার। তার পরে প্রথম জন জানতে চাইল, “এর সঙ্গে কেউ নেই? গাড়িতে তো মেয়েটা একা থাকতে পারে না!” দ্বিতীয় জন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, “পুলিশ কাউকে পায়নি। সম্ভবত দায় এড়াতে সবাই পালিয়েছে।”

দু’জনেই দু’জনের মুখের দিকে অল্প সময় তাকিয়ে রইল। তার পরে একটু ভেবে প্রথম ডাক্তার বলল, “মেয়েটাকে আগে ব্যথা কমানোর আর ঘুমের একটা হাল্কা ইঞ্জেকশন দিতে বল। তার পরে ব্যান্ডেজটটা এক বার খুলে দেখব। মাথায় চোট লেগেছে কি না, বুঝতে হবে তো।”

মিনিট দশেকের মধ্যেই ইঞ্জেকশন মারফত দু’টো ওষুধ চলে গেল মেয়েটার শরীরে। আরও মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পরে এক জন নার্সের সাহায্যে মেয়েটার মুখের ব্যান্ডেজ সরানোর কাজটা শুরু হল। কিন্তু ব্যান্ডেজটা পুরো খোলা হল না। ডান দিকের অংশটা খোলার পরে নার্সের হাত নিজের অজানতেই থেমে গেল। তার মুখটা আতঙ্কে সাদা হয়ে গিয়েছে। জুনিয়র ডাক্তার দু’জন বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল সামনে শায়িত মেয়েটার মুখের দিকে। তাদের অভিজ্ঞ চোখ আর মস্তিষ্ক বলে দিচ্ছে, এই মেয়েটার মুখের চামড়ার একটা অংশ কেটে তুলে নেওয়া হয়েছে।

প্রথম জন আর দেরি না-করে নার্সের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “দিদি, আর সময় নষ্ট কোরো না। মুখটায় আবার ব্যান্ডেজ করে দাও।” তার পরে সহকর্মীর দিকে ফিরে ফিসফিস করে বলল, “এখনই সিনিয়র কাউকে ডেকে আনতে হবে। এই কেসে অনেক দূর জলঘোলা হবে।” সেটা যে-হবে, তা নিয়ে দ্বিতীয় জনের মনেও কোনও সন্দেহ ছিল না। তারা এই ব্যাপারটা শুনেছে বটে, কিন্তু চোখে দেখল এই প্রথম। দু’জনেরই হাত কাঁপছে।

.

হাসপাতালে মেয়েটার মুখের ব্যান্ডেজ খোলার ঘণ্টা দুয়েক আগেই নবীনের ফোনটা চলে গিয়েছিল ওই বিশেষ নম্বরে। ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে তিনটে। সেখান থেকে ফোন যায় আরও এক জনের কাছে। ফোনটা রাখার পরে যথেষ্ট চিন্তিত লাগছিল লম্বা মতো লোকটাকে। তবে সে তার কর্তব্য জানে। কাল খুব ভোরেই অ্যাম্বুল্যান্স চুরি হওয়ার একটা ডায়েরি করতে হবে স্থানীয় থানায়। তারিখটা অবশ্যই দিন চারেক আগের হতে হবে। সেটা সমস্যার নয়। একটা খামের বিনিময়ে সেই কাজটা হয়ে যাবে। সমস্যাটা হল, মেয়েটাকে নিয়ে। ওকে পুলিশ নিয়ে গিয়েছে। দ্রুত একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। মেয়েটা মুখ খুললে বিপদ আছে। তার চেয়েও বেশি হল, এই মেয়েটার মূল্য। লোকটা জানে ডক্টর ডেভিল আর তার সংগঠনের কাছে এই মুহূর্তে মেয়েটা ভীষণই মূল্যবান। তারা সহজে হাতছাড়া হতে দেবে না শিকারকে। কিন্তু তার চেয়েও যেটা কঠিন কাজ, সেটা হল, এদের খবরটা জানানো। এই খবর শোনার পরে কোপটা যে প্রথমে কার ঘাড়ে পড়বে, কে জানে!

পরের দিন সকাল ন’টা নাগাদ ভাবা হসপিটালের সুপারের কেবিনে বসে ছিলেন স্থানীয় থানার স্টেশন হাউস অফিসার (এসএইচও) এবং তাঁর সহকারী। দুই পুলিশকর্মীর দিকে তাকিয়ে সুপার বলে উঠলেন, “মেয়েটাকে আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি। এমনিতে কোনও চোট লাগেনি। কিন্তু ভয়ঙ্কর মেন্টাল ট্রমার মধ্যে আছে। মানসিক ভাবে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।” একটু থেমে চিকিৎসক ভদ্রলোক টেবিলে রাখা পেপারওয়েটটা তুলে নিলেন। বার কয়েক হাতে ঘুরিয়ে দুই পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন,

“আর সেটা হওয়াই স্বাভাবিক। মেয়েটার মুখের একটা অংশের চামড়া কেউ বা কারা ছাড়িয়ে নিয়েছে! সেই সময় ওর জ্ঞান ছিল কি না, কে জানে।”

দুই পুলিশ অফিসার একে অপরের দিকে তাকিয়ে নিলেন এক বার। তার পরে সিনিয়র অফিসার বললেন, “আপনি তা হলে কী করতে বলেন এখন?”

“দেখুন, মেয়েটার ক্ষত আমরা পরিষ্কার করে যা করার করে দিয়েছি। সপ্তাহ দুয়েক সময় লাগবে ওখানে নতুন চামড়া তৈরি হতে। এ ছাড়া শারীরিক ভাবে ওর কোনও সমস্যা নেই। এই অবস্থায় ওকে এই হাসপাতালে আর বেশি সময় রাখা সম্ভব নয়। আপনাদের এ বার যা করার করতে হবে।”

উঠে দাঁড়ালেন দুই পুলিশ অফিসার। আবার কথা বললেন সিনিয়র ভদ্রলোক, “ঠিক আছে। আমি একটু উপরমহলের সঙ্গে কথা বলে নিই। মেয়েটাকে আপাতত কোনও একটা রেসকিউ হোমে নিয়ে যাওয়া হবে। তার পরে দেখা যাক, কী করা যায়।”

পুলিশ অফিসার দু’জন বেরিয়ে যাওয়ার পরে গম্ভীর মুখে বসে রইলেন ডাক্তার ভদ্রলোক। এ রকম ঘটনার কথা তাঁর কানে আগেও এসেছে। এমন কয়েক জন ভিকটিম পাওয়া গিয়েছে, যাদের শরীরের বিভিন্ন অংশের চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মুখের। আর মুখের চামড়া যাদের নেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে একটা মিল বিশেষ করে দেখা গিয়েছে! ভাবতে ভাবতে ডাক্তার নিজেও কেঁপে উঠলেন। এখন তো আর কেউই নিরাপদ নয়!

চেয়ার ছেড়ে রাউন্ডে যাওয়ার জন্য উঠে পড়লেন ভদ্রলোক। কেবিন থেকে বেরোনোর আগে হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে এক বার মাথাটা নাড়লেন তিনি। ভয়ঙ্কর এক সময়ের দিকে ক্রমশ এগিয়ে চলেছেন তাঁরা। এই ভবিতব্যকে ঠেকানোর ক্ষমতা তাঁর নেই। কারও আছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। বিলিয়ন ডলারের এই ইন্ডাস্ট্রিকে কে থামাবে। থামানোর ইচ্ছে কি আদৌ কারও আছে!

.

দিন দু’য়েকের মধ্যে সরকারি মহল থেকে নির্দেশ চলে এল পুলিশের কাছে। মেয়েটিকে একটি বিশেষ হোমে পাঠিয়ে দিতে হবে। পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই থাকবে সে।

তার পরেই পুলিশি নিরাপত্তায় মেয়েটির স্থান হল একটি বিশেষ সরকারি হোমে। মেয়েটি হোমে জায়গা পাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে দু’টো ফোন গেল শহরের দু’প্রান্তে।

লম্বা লোকটা ফোন রেখে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার পরে উল্টো দিকে বসে থাকা গাঁট্টাগোট্টা চেহারার একটা লোকের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, “শিকার খাঁচায় ঢুকে গিয়েছে। রাজু এই মাত্র ফোন করে জানাল।”

“কবে তুলে আনব খাঁচা থেকে?” ভাবলেশহীন মুখে প্রশ্নটা করল গাঁট্টাগোট্টা চেহারার লোকটা।

“দিন দুয়েক যেতে দাও। পুলিশ এখনই তাড়াহুড়ো করবে না কথা বার করার জন্য। একটু আবহাওয়া ঠান্ডা হলে মালটাকে তুলে আনবে।”

গাঁট্টাগোট্টা লোকটা এ বার উঠে পড়ল চেয়ার থেকে, “ঠিক আছে। আমাকে বলে দিয়ো। কাজ হয়ে যাবে।” ঘর ফাঁকা হতে লম্বা লোকটা আবার ফোনটা তুলে নিল। মুম্বইয়ে ছড়ানো ছেটানো যৌনপল্লীতে আরও এ রকম কয়েকটা মেয়ে আছে। পতিতাবৃত্তি করানোর পাশাপাশি মাঝেমধ্যে যাদের শরীর থেকে চামড়াও তুলে নেওয়া হয়। এই মেয়েগুলোকে চোখে চোখে রাখতে হবে। কোনও মেয়ে পালিয়েছে শুনলে এদের মনেও পালানোর ইচ্ছে জেগে উঠতে পারে।

দ্বিতীয় ফোনটা আরও আধ ঘণ্টা পরে গেল গোরেগাওয়ের গোকুলধামে। এখানে লোকজনের বসতি বেশি হলেও বেশ কয়েকটা অফিসও আছে। সেই অফিসেরই কারও এক জনের মোবাইলটা বেজে উঠল।

উল্টো দিকের ব্যক্তি খুব চাপা স্বরে দ্রুত কয়েকটা কথা বলে ফোনটা কেটে দিল—“ম্যাডাম, নতুন এক জনকে হোমে নিয়ে আসা হয়েছে। যা খবর পেলাম, এটা কিন্তু স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের কেস।”

ফোনটা কেটে যাওয়ার পরে মিনিট কয়েক মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন পাঞ্চালী রায়। তাঁর মনের মধ্যেও ঝড় বইতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত তা হলে ভয়ঙ্কর এক সত্যের মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে।

স্কিন ট্র্যাফিকিং। সভ্য সমাজের নতুন এক অভিশাপ। যার হাত থেকে গরিব, ধনী, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ কারও মুক্তি নেই। ৮-১০ বছর বয়স থেকে ৩০-৩৫ বছর, যে-কেউ এই ভয়ঙ্কর চক্রের শিকার হতে পারে। পথশিশু থেকে বনেদি বাড়ির বৌ, রেহাই নেই কারও।

নিজের অজানতেই শিউরে উঠলেন পাঞ্চালী। চোয়ালটা কঠিন হয়ে গেল তাঁর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *