প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

১২. প্রত্যাঘাত

১২. প্রত্যাঘাত

মুম্বইয়ের নানা রাস্তায়, ২০২৩

যা আশঙ্কা করেছিল সমীর, সেটাই হল। ফোনটা তার কাছেই এল। মুম্বইয়ের একটা বিশেষ জায়গায় দেখা করতে বলা হল তাকে।

ঘণ্টাখানেক পরে যে-গাঁট্টাগোট্টা লোকটার সামনে বসে ছিল সমীর, তাকে দেখলে মনটা এমনিতেই কেঁপে ওঠে। আনোয়ার নামের লোকটার কুখ্যাতি মুম্বইয়ের অন্ধকার মহলে যথেষ্ট ছড়িয়ে পড়েছে। সমীরের দিকে একটু ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থেকে লোকটা বলল, “তোকে আবার কাজে নামতে হবে মাছ তোলার জন্য। মাল পেয়ে যাবি ভালই।”

সমীর কিছু বলতে সাহস পেল না। সে যে-কিছু জানে, তা না বলাই ভাল। সমীর অপেক্ষা করতে লাগল পরের নির্দেশের জন্য। দ্রুতই চলে এল সেই নির্দেশ—

“এই মেয়েটাকে তুই চিনিস। ক্লিনিকে দেখেছিস। নেপালি মেয়েটা। বুঝেছিস তো?”

সমীর দ্রুত মাথা নাড়ল। আনোয়ার বলে চলল, “সাধারণত শিকারের পরিচিত কাউকে দিয়ে এই কাজ করানো হয় না। কিন্তু শুনলাম, মেয়েটা নাকি তোকে একটু পছন্দ করে।” ঠান্ডা চোখে চেয়ে রইল লোকটা।

সমীর এক বার ঢোক গিলে নিল। রতন তার সম্পর্কে কী কী বলেছে, সেটা বুঝতে পারছিল না। খুব সাবধানে মুখ খুলতে হবে। ঠোঁটটা চেটে নিয়ে সমীর বলল, “সেটা ঠিক বলতে পারব না। আমি কখনও কথা বলিনি মেয়েটার সঙ্গে।”

“তাই বুঝি! শোন, আমার অত জানার দরকার নেই। এই কাজে বাইরের লোককে জড়াতে চাইছি না। মেয়েটা আমাদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। এই মেয়েটার কথা যত কম লোকে জানে, ততই ভাল। সে জন্যই তোকে দায়িত্ব দেওয়া। রতন সাহায্য করবে। মেয়েটা কোথায় আছে, সেটা জেনে যাবি। তোরা গিয়ে ঠিক সময়ে মেয়েটাকে তুলে আনবি। বুঝতে পারলি?”

সমীর দ্রুত মাথা নাড়ল। মাথা না নাড়লে মাথাটাই থাকত না তার! সমীর যখন উঠে আসছে, আনোয়ার নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। রতন এই ছেলেটার কথা বলেছে তাকে। বলেছে, মেয়েটাকে চুপচাপ, ভুলিয়ে- ভালিয়ে কেউ যদি ফিরিয়ে আনতে পারে, সেটা সমীরই পারবে। রতনের কথামতোই ছেলেটাকে এই কাজে লাগাল আনোয়ার। কিছু ভুলচুক হলে রতনের ঘাড়ে আগে কোপ পড়বে।

পরের ফোনটা এল রতনের কাছ থেকে। কোনও-রকম ভণিতা না-করে রতন বলে দিল, “কাজ এসেছে হাতে। তোকে তো সব জানানো হয়েছে। সামনাসামনি বসে এ বার পুরো ব্যাপারটা ছকে ফেলতে হবে।”

“ঠিক আছে, কোথায় দেখা করব বল?”

রতন একটু ভেবে বলল, “তুই দুপুর দু’টো নাগাদ করিম চাচার হোটেলটায় চলে আয়। জানিস তো, যেখানে আমি দুপুরের খাবারটা খাই? ওখানে দেখা করে নেব।”

পওয়াই অঞ্চলের ওই হোটেলটা সমীর ভালই চিনত। দু’টোয় দেখা হবে বলে কলটা কেটে দিল সে। তার মনে তখন ঝড় উঠেছে। আলো আর অন্ধকারের মাঝের এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সে। বা বলা যায়, জীবন আর মৃত্যুর মোড়ে। কোন রাস্তায় হাঁটবে সে? একটা রাস্তার শেষে অপেক্ষা করে আছে আলো আর মৃত্যু। অন্য রাস্তা তাকে নিয়ে যাবে অন্ধকারের দিকে, কিন্তু হয়তো মৃত্যুকে এড়াতে পারবে সে।

দুপুর দু’টোয় যখন রতনের উল্টো দিকের টেবিলে এসে বসল সমীর, তখন সে অনেকটাই শান্ত হয়েছে। পরিকল্পনাটাও মনে মনে গুছিয়ে নিয়েছে।

“আয়, কী খাবি বল। এখানকার চিকেন কষাটা কিন্তু বেশ ভাল। খাবি?”

“তুমি যা খাওয়াবে, তাই খাব,” বলে একটু হাসল সমীর। সে কোনও- রকম টেনশন চাইছিল না। পরিবেশ যতটা হাল্কা রাখা যায়, তত ভাল।

মিনিট দশেক পরে চিকেন কষার ঝোলে রুটির টুকরোটা ভিজিয়ে মুখে দিয়ে রতন কথা বলল, “তোকে তো সব কিছু বলা হয়েছে। মেয়েটাকে আবার তুলে আনতে হবে। তুই মেয়েটাকে চিনিস।”

সমীর এ বার পাল্টা প্রশ্নটা করে বসল, “সেটা তো সমস্যা হয়ে যেতে পারে। মেয়েটা জানে আমি কী করি, আমার সঙ্গে আসবে কেন?”

রতন এ বার হাসল, “আমার দেখে মনে হয়েছে, মেয়েটা তোকে একটু পছন্দ করে। সেটা অবশ্য ভুলও হতে পারে। কিন্তু যদি মেয়েটা না আসতে চায়, তা হলে জোর খাটাতে হবে। অজ্ঞান করে নিয়ে চলে আসবি।” আবার মাংসের ঝোলে রুটিটা ডোবাতে মন দিল রতন। তার পরে বলল, “চিন্তা করছিস কেন। আমিও থাকব। দু’জনে মিলে গাড়িতে তুলে নিতে পারলেই খেল খতম।”

সমীর এই রকম কাজ আগেও করেছে। তবে সে সব ক্ষেত্রে অন্য রকম একটা অনুভূতি কাজ করত। একটা চাপা উত্তেজনা, একটা টেনশন। কিন্তু এ বারে মনের মধ্যে যে-আবেগটা মাথা তুলছে, তার সঙ্গে আগে পরিচয় ছিল না সমীরের। সে ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছে না, কী করবে। কিন্তু এইটুকু বুঝতে পারছিল, কিছু একটা করতেই হবে। না-হলে সব দিকেই ভরাডুবি হবে।

“তা হলে এখন কী করতে হবে?”

কয়েক মুহূর্ত ভাবল রতন। তার পরে বলল, “প্রথমে দেখতে হবে কোন হোমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মেয়েটাকে। নজর রাখতে হবে। তার পরে প্ল্যান অব অ্যাকশন।”

“কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে মেয়েটাকে, কিছু জানো?”

রতন সামনে রাখা খাবারের প্লেটের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “তুই খাবারটা আগে শেষ কর। তার পরে এখান থেকে বেরোব। যা বলার পরে বলছি।”

দু’জনে চুপ করে প্লেট খালি করায় মন দিল।

মিনিট পনেরো পরে খাওয়া শেষ করে দু’জনে বেরিয়ে এল হোটেল থেকে। সমীর কোনও কথা না বলে হাঁটছিল রতনের পাশে পাশে। তার এখন শোনার পালা।

রতনই কথা শুরু করল, “এই মেয়েটার ক্ষেত্রে আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে। তুই তো জানিস, ওই ডক্টর ডেভিল জিনিসটা কী রকম। এই মেয়েটা ওর কাছে ভীষণ দামি। কাজেই ভুলচুক করলে আমাদের লাশ আরব সাগরের বুকে ভাসিয়ে দেবে।” সমীর মাথা নাড়ল।

রতন গলা নামিয়ে বলে চলল, “যে অঞ্চলে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেই এলাকার স্থানীয় থানায় আমার পরিচিত দু’-এক জন আছে। আমি খবর জোগাড় করার চেষ্টা করছি। তুই একটু দাঁড়া।”

সমীরকে পাশের পানের দোকান থেকে দু’টো পান কেনার কথা বলে মোবাইলটা কানে লাগিয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল রতন। বেশি সময় অবশ্য নিল না। মিনিট পাঁচেক পরে এসে দাঁড়াল দোকানের সামনে। পানের দাম মিটিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল সমীর।

রতন একেবারে সমীরের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে একটা নাম বলল। “আন্ধেরি অঞ্চলে আছে ওই হোমটা। মেয়েটা এখনও হাসপাতালে। কাল ওই হোমে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এই অঞ্চলে যে-সব মেয়েকে উদ্ধার করা হয়, তাদের ওখানেই পাঠানো হয়।”

সমীর চুপ করে শুনে যেতে লাগল। গলাটা একটুও না তুলে রতন বলল, “আর একটা কথা। ওই হোমের সিকিয়োরিটি গার্ড এখন রঞ্জিত। তুই তো চিনিস ছেলেটাকে।

সমীর মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে আগে দেখেছি ওকে।” এর আগে বার দুয়েক রঞ্জিতকে দেখেছে সে। কিন্তু আলাপ ছিল না। একটু থেমে সমীর জানতে চাইল, “আমরা কীভাবে কাজটা করব?”

“আমি প্রথমে উপরে একটু কথা বলে নিই। তুই তার মধ্যে একটা কাজ কর। ওই হোমটায় গিয়ে নজর রাখ। তবে দেখিস, তোকে যেন মেয়েটা কোনও ভাবেই দেখে না ফেলে। আর কারও সঙ্গে এখনই কথা বলার দরকারই নেই।”

.

পরের দিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা হোমটার বাইরেই চক্কর লাগাল সমীর। ক্লিনিকের কাজ রোজ থাকে না। আর এখন তো বন্ধই আছে। হোমের সামনে একটা চায়ের দোকান। সেখানেও অনেকটা সময় কাটাল সমীর। হোমের গেট দিয়ে ভিতরে বেশ কয়েকটা মেয়েকে দেখতে পেল ছেলেটা। কিন্তু কোনও মেয়েই তার পরিচিত নয়। রঞ্জিতকে এই দিন আর দেখতে পেল না। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামল। আপাতত ক্লিনিকের ডিউটি নেই। কিন্তু এখানে আর বেশি সময় কাটাতে সাহস পেল না সমীর। এই সব জায়গায় অচেনা ছেলে বেশি ঘোরাঘুরি করলে নজরে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পুলিশের খোচর থাকে, নানা গ্যাংয়ের নজর থাকে এই সব হোমের উপরে। সে ঝামেলায় পড়ে যেতে পারে। সমীর আর অপেক্ষা করল না। কাল এক বার চেষ্টা করে দেখবে। সে বুঝতে পারছিল, তার হাতে একদম সময় নেই।

.

রাতে রতনের ফোনটা আবার এল। পুরো পরিকল্পনাটা এ বার খুলে বলল সমীরের সহকর্মী। “শোন, সব কথা হয়ে গিয়েছে। আমরা গভীর রাতে অ্যাকশনে যাব। একটা গাড়ি নিয়ে আমরা দু’জন যাব। গাড়িটা হোমের সামনে রেখে তুই ভিতরে চলে যাবি। আমি গাড়িতে অপেক্ষা করব। বাইরে আমাদের আরও দু’জন ছেলে থাকবে বাইক নিয়ে। তুই যদি ভুলিয়ে ভালিয়ে মেয়েটাকে বার করে আনতে পারিস, তা হলে তো কথাই নেই। না-হলে অজ্ঞান করে নিয়ে আসবি। রঞ্জিত থাকবে।”

সমীরের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। সে শুনে যেতে লাগল। উল্টো দিক থেকে রতন বলে চলল, “তুই কাল দুপুরের দিকে হোমে চলে যা। এক বার রঞ্জিতের সঙ্গে কথা বলে নে। আমি বলে রেখেছি, তুই যাবি। অপারেশনের সময়টা ফাইনাল করে নিস। সামনের চায়ের দোকানটায় অপেক্ষা করিস।”

আশ্চর্যজনক ভাবে সেই রাতে আর ভয়ঙ্কর স্বপ্নটা দেখল না সমীর। ঘুমটাও ভালই হল। পরের দিন সকালে উঠেই সে বস্তির ঘর ছেড়ে বেরোল না। বেলা বাড়ুক আর একটু। সকাল থেকেই হোমের সামনে ঘুরলে চোখে পড়ে যেতে পারে। তা ছাড়া কোনও ফোন আসে কি না এর মধ্যে, সেটাও দেখতে হবে।

যত বেলা বাড়ছিল, সমীরের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনিটাও পাল্লা দিয়ে দ্রুত হচ্ছিল। গত কালের পর থেকে তার মোবাইলে কোনও কল আসেনি। এক বার রতনকে ফোন করবে কি না, ভাবছিল সমীর। নতুন কিছু জানা যায় কি না মেয়েটাকে নিয়ে। তার পরে ভাবল, অতি উৎসাহ দেখলে হয়তো রতনের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

বেলা বারোটা নাগাদ আবার সেই হোমের সামনে এসে দাঁড়াল সমীর। আজ অন্য একটা জামা পরে এসেছে সে। চুলটাও একটু অন্য ভাবে আঁচড়েছে। গত কাল সানগ্লাস ছিল না চোখে। আজ আছে। যতটা নিজের চেহারা ঢাকা যায়, আর কী।

সেই একই দৃশ্য। কয়েকটা মেয়ে বাইরে ঘুরছে। গোটা দুই মহিলা ওয়ার্ডেনকে দেখা গেল। পরিচিত মুখটা চোখেই পড়ছে না। রতন কি আদৌ ঠিক খবর দিল? সমীর চিন্তায় পড়ে যাচ্ছিল। রঞ্জিতটাই বা কোথায়!

বেলা দু’টো নাগাদ রঞ্জিতকে দেখতে পেল সমীর। কারও দিকে না তাকিয়ে সোজা এসে চায়ের দোকানের একটা টেবিল দখল করে বসে গেল হোমের সিকিয়োরিটি গার্ড। সমীর আর দেরি করল না। এক বার ভগবানের নাম নিয়ে পা রাখল চায়ের দোকানটার ভিতরে।

ছেলেটার উল্টো দিকের টেবিলে গিয়ে বসল সমীর। তার পরে দোকানের এক কর্মচারীর দিকে তাকিয়ে বলল, “এক কাপ চা আর এক প্লেট পাওভাজি।” কর্মচারীটি মাথা নাড়িয়ে উল্টো দিকের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল, “কি রঞ্জিত, আজ রাতের ডিউটি নাকি?” ছেলেটা মাথা নাড়ল। কর্মচারীটি আর কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোল। সে জানে, রঞ্জিত এখন কী খাবে।

সমীরের হাতের তালু তত ক্ষণে ঘেমে উঠেছে। এক জন বয় এসে চায়ের কাপ আর পাওভাজির প্লেটটা সামনে নামিয়ে রেখে চলে গেল। শুকনো গলা ভেজানোর জন্য প্রথমেই চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক লাগাল সমীর রঞ্জিত তত ক্ষণে দিনের খবরের কাগজটা খুলে খেলার পাতায় চোখ বোলাচ্ছে। তাকাচ্ছেই না তার দিকে।

সমীর কাপটা নামিয়ে রেখে একটা লম্বা শ্বাস নিল। তার পরে নিজের প্লেটটার দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বলল, “রঞ্জিত, আমাকে রতন পাঠিয়েছে।”

ছেলেটা কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে নির্নিমেষে তাকিয়ে রইল সমীরের দিকে। যেন চেনেই না। তার পরে জানতে চাইল, “কোন রতন?”

সমীর বুঝতে পারছিল, রঞ্জিত ঘাঘু মাল। সে কোনও রকম ইঙ্গিতই দেবে না।

“যে রতন ক্লিনিকে কাজ করে। একটা বিশেষ কাজের জন্য ও তোমার সঙ্গে দেখা করতে বলেছে।”

এ বারও কোনও কথা বলল না রঞ্জিত। সে শুধু তাকিয়ে রইল।

মনের যাবতীয় শক্তি সঞ্চয় করে সমীর বলে যেতে লাগল, “আমরা খবর পেয়েছি, পুলিশ নতুন একটা মেয়েকে গত কাল তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে। মেয়েটা দু’দিন আগে অ্যাম্বুল্যান্স দুর্ঘটনায় পড়ে।” রঞ্জিত এ বারও কিছু বলল না। তার ভাবলেশহীন মুখের দিকে তাকিয়ে সমীর কথা শেষ করল,

“ওই মেয়েটাকে আমাদের চাই।”

দোকানের কর্মচারীটি এসে রঞ্জিতের সামনে একটা বড় চায়ের গ্লাস নামিয়ে রাখল। কোনও কথা না বলে সেটায় চুমুক দিতে লাগল হোমের সিকিয়োরিটি গার্ড। মিনিট পাঁচেক এই ভাবেই কাটল। সমীরও অপেক্ষা করতে লাগল রঞ্জিতের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার।

চা-টা পুরো শেষ করল রঞ্জিত। তার পরে নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বলল, “আমি বিকেল পাঁচটা নাগাদ রাস্তার মোড়ের সামনে থাকব। তখন এসে কথা বোলো আমার সঙ্গে।” একটা দশ টাকার নোট টেবিলে রেখে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে গেল ছেলেটা।

সামনের প্লেটে রাখা পাওটা কোনও মতে মুখে পুরে চিবোতে লাগল সমীর। তার গলা শুকিয়ে এসেছে। রঞ্জিত এ বার কী করবে? নিশ্চয়ই রতনের

সঙ্গে এক বার কথা বলে নেবে।

রঞ্জিত ঠিক সেটাই করল। হোমে ঢোকার আগে রতনকে এক বার ফোনটা করে নিল। “ছেলেটা এসেছে। তুমি যার কথা বলেছিলে। আমি তো ওকে আগে দেখেছি।”

“ঠিক আছে। ওর সঙ্গে কথা বলে সময় আর তারিখটা ঠিক করে নাও। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।” রঞ্জিত নিশ্চিন্ত হয়ে ফোনটা রেখে দিল। আরও একটা শিকার তুলতে সাহায্য করবে সে। মাল ঠিকমতো ডেলিভারি হওয়ার এক দিনের মধ্যেই তার কাছে একটা মোটা খাম চলে আসবে, এই ব্যাপারে নিশ্চিত রঞ্জিত। তাদের দুনিয়ায় লিখিত চুক্তি হয় না। বিশ্বাসটাই এখানে আসল। আর কেউ সহজে বিশ্বাসভঙ্গ করে না। করলে তার মূল্য চোকাতে হয়।

একটু পরে সমীরও ফোন করল রতনকে। “রঞ্জিতের সঙ্গে কথা হয়ে গিয়েছে। বিকেল পাঁচটায় গিয়ে ফাইনাল ডিল করে নেব। আজই তুলবে তো? দেরি করা ঠিক হবে না।”

রতনও তাই চাইছিল। যত তাড়াতাড়ি ঝামেলা মেটানো যায়। বলল, “ঠিক আছে। রাত দু’টো নাগাদ অপারেশনে যাব। তুই বিকেলে গিয়ে রঞ্জিতের সঙ্গে ফাইনাল কথাটা বলে রাখ।” একটু থেমে রতন কথা শেষ করল, “সব ঠিক হয়ে যাওয়ার পরে রাত একটা নাগাদ চাচার হোটেলে দেখা করিস। ওখান থেকে আমরা অপারেশনে যাব।”

.

বিকেল পাঁচটা। সমীর এসে দাঁড়াল আন্ধেরির ওই বিশেষ রাস্তাটার মোড়ে। পাঁচটা পাঁচ মিনিটে সামনের রাস্তাটা দিয়ে আসতে দেখা গেল হোমের সিকিয়োরিটি গার্ডকে। এখন সে ইউনিফর্ম পরে নিয়েছে। ধীরে সুস্থে এসে সামনের পানের দোকান থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট কিনল রঞ্জিত। তার পরে সিগারেটটা ধরিয়ে এক পাশে সরে দাঁড়াল। সামান্য ইতস্তত করে রঞ্জিতের পাশে এসে দাঁড়াল সমীর।

“মেয়েটা আমাদের এখানেই আছে। তুমি ঠিক কী করতে চাইছ?”

একটা লম্বা শ্বাস ফেলে জবাব দিল সমীর, “মেয়েটা আমাকে চেনে, বিশ্বাস করে। রাতে এসে আমি মেয়েটার সঙ্গে দেখা করতে চাই। ও আমার সঙ্গে যেতে রাজি হবে বলে মনে হয়। আমরা এই নিয়ে কোনও ঝামেলা চাইছি না। মেয়েটা চুপচাপ চলে এলেই ভাল। যে-কারণে আমাকেই পাঠানো হয়েছে। আমি নিশ্চিত, মেয়েটা আমার সঙ্গে যেতে রাজি হয়ে যাবে।” একটু থেমে কথা শেষ করল সমীর, “হোমের বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকবে। ওই গাড়িতে এক বার তুলতে পারলেই কাজ শেষ। তুমি তোমার হিস্যা ঠিক সময়ে পেয়ে যাবে।”

রঞ্জিত আবার একটু সময় ভাবল। তার পরে জবাব দিল, “ঠিক আছে। কটার সময় আসতে চাইছ?”

উত্তেজনাটা সামলে সমীর জবাব দিল, “ঠিক রাত বারোটায় আসব। ওই সময় তৈরি থেকো।”

“ঠিক আছে। গাড়িটা রাস্তার মোড়ে রেখো। হোমের গেটের সামনে এনো না। তুমি চলে এসো গেটের সামনে। তোমাকে আমি ভিতরে নিয়ে যাব।”

সিগারেটের টুকরোটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে কাউন্টারটা নিভিয়ে আবার হোমের দিকে রওনা দিল রঞ্জিত। সমীর তখন ভেবে চলেছে, সত্যিই এই সব ঘটনা ঘটছে, না সে স্বপ্ন দেখছে! ঘোর কাটিয়ে দ্রুত বাস্তবে ফিরে এল সে। এ বার এক বন্ধুর সাহায্য নিতে হবে তাকে। যে-বন্ধু ‘ক্যাব’ চালায় একটা বেসরকারি কোম্পানিতে। ওর গাড়িটা লাগবে। সঙ্গে ওকেও। তবে তার আগে রতনকে শেষ ফোনটা করল সমীর। “রতনদা, সব কথা হয়ে গিয়েছে। আমরা রাত দু’টোর সময় হোমে যাব। ওখান থেকে মেয়েটাকে তুলে নেব।”

.

রাত বারোটা পাঁচ। বলা হয়ে থাকে, মুম্বই শহর কখনও ঘুমোয় না। আন্ধেরির এই রাস্তাটা না ঘুমোলেও যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। লাইটপোস্টের ম্রিয়মাণ আলো হোমের গেটের সামনে একটা বিভ্রম সৃষ্টি করছিল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে একটু উঁকি দিল সমীর। সে এখন ভয়-ভাবনার ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছে।

আরও মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করার পরে গেটের দিকে একটি ছায়ামূর্তিকে আসতে দেখল সমীর। গেটের তালাটা খুলে তাকে ভিতরে আসতে ইশারা করল রঞ্জিত।

চট করে ভিতরে ঢুকে রঞ্জিতের পাশে হাঁটতে হাঁটতে সমীর খুব চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এখানে সিসিটিভি নেই?” সে-রকমই চাপা স্বরে রঞ্জিত জবাব দিল, “একটা আছে। কিন্তু সেটা দিন কয়েক হল খারাপ হয়ে আছে। তোমাকে ওই নিয়ে ভাবতে হবে না।”

সমীর বুঝতে পারল, রঞ্জিত কাঁচা কাজ করার ছেলে নয়। চারদিকটা শুনশান, আর কোনও গার্ডকেও দেখা যাচ্ছে না। দ্রুত সমীরকে নিয়ে বারান্দায় উঠে এল রঞ্জিত, তার পরে গিয়ে থামল একটা ঘরের সামনে।

“এই ঘরেই মেয়েটা আছে। দরজা খোলা আছে। খুব সাবধানে আমাদের ভিতরে ঢুকে দেখে নিতে হবে, এই মেয়েটাই সেই মেয়েটা কি না।”

রঞ্জিতের আলতো ঠেলায় কোনও শব্দ না-করে দরজাটা খুলে গেল। ঘরে খুব হাল্কা একটা আলো জ্বলছে। সেই আলোয় মেয়েটাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখল সমীর। এই আধো-অন্ধকারেও মেয়েটার চেহারা চিনতে ভুল হল না তার। কাঁপতে লাগল সমীরের শরীর।

রঞ্জিত তত ক্ষণে এগিয়ে গিয়েছে বিছানার পাশে। মেয়েটা হঠাৎ যেন কিছু বুঝতে পারল। ধড়মড় করে উঠে বসল বিছনায়। কিন্তু আওয়াজ করার আগেই রঞ্জিতের হাতটা এসে চেপে ধরল মেয়েটার মুখ।

সমীর আর দেরি করল না। সুইচবোর্ডটা দেখা যাচ্ছিল। আন্দাজে একটা সুইচ টিপে দিতেই ঘরের বড় লাইটটা জ্বলে উঠল।

এ বার অপরাজিতা দেখতে পেল দ্বিতীয় মানুষটার মুখ। তার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল।

সমীর এগিয়ে এসে অপরাজিতার হাতটা ধরল। তার পরে হাসল।

এমন হাসি অপরাজিতা আগে দেখিনি। এই হাসি যেন নতুন কোনও স্বপ্নের সন্ধান দেয়। এই হাসি যেন নতুন করে বাঁচতে শেখায়। এই হাসি যেন বলে—আমি সারা জীবন তোমার পাশেই থাকব।

অপরাজিতার মাথাটা ঘুরতে লাগল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *