প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

১. আতঙ্কের বেলাভূমি

১. আতঙ্কের বেলাভূমি

ডুমাস সমুদ্রসৈকত, সুরাট, ২০২৩

“বড্ড ঝুঁকি হয়ে যাচ্ছে না ব্যাপারটা? আমার কিন্তু ভয় করছে।

পুরো সমুদ্রসৈকতকে তখন গ্রাস করেছে অন্ধকার। বৈদ্যুতিক আলোর চিহ্ন কোথাও নেই। দূরের রাস্তায় টিমটিম করে কয়েকটা স্ট্রিট ল্যাম্প জ্বলছে। কিন্তু সেই আলো এখানে এসে পৌঁছয় না। আকাশে চাঁদ আর তারার স্বল্প আলো সৃষ্টি করেছে একটা অদ্ভুতুড়ে পরিবেশ। সামনেও প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কাদাতে তাদের পা বসে যাচ্ছে অনেকটা।

“ভয় পাচ্ছিস কেন? চল না আর একটু এগিয়ে দেখি, সত্যিই কিছু আছে কি না।” কাঁপা কাঁপা গলায় বন্ধুকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করল দ্বিতীয় ছেলেটি।

কিন্তু তাদের দু’জনের মনেই প্রশ্নটা তখন বড় হয়ে উঠেছে। এই গভীর রাতে ভূতুড়ে বিচটায় এসে কি ঠিক করল তারা?

ডুমাস বিচ। বলা হয়ে থাকে, বিশ্বের হন্টেড বিচগুলোর তালিকায় খুব উপরেই থাকবে গুজরাটের এই সমুদ্রসৈকত। ভারতের কুখ্যাত সৈকতগুলোর মধ্যে বোধ হয় শীর্ষে। সুরাট শহর থেকে ২১-২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই সৈকত কিন্তু দিনের বেলায় বেশ জমজমাট। উট আছে, ঘোড়া আছে। সমুদ্রের তীরে বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন রাইডের ব্যবস্থা আছে। মনোরঞ্জনের কমতি নেই। শহর থেকে লোকে গাড়ি নিয়ে চলে আসে এই সৈকতে।

কিন্তু সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা বদলাতে থাকে। তখনই পুলিশ এসে নির্দেশ দেবে, সৈকত ফাঁকা করে দিতে। বেলাভূমিতে যে-সব অস্থায়ী দোকানপাট গজিয়ে উঠেছে, সে সবও তখন তড়িঘড়ি গুটিয়ে নিয়ে স্থানীয় মানুষজন রওনা দেয় গ্রামের দিকে। দোকানিদের সঙ্গে গ্রাম থেকে রোজ চলে আসে বেশ কয়েকটি কুকুর। কিন্তু সন্ধ্যা নামলে তারাও আর থাকে না এই সৈকতে। কালো বালির সৈকত আর ঘন অন্ধকার তখন মিলেমিশে এক অতিপ্রাকৃত পরিবেশ তৈরি করে দেয়। অন্তত মানুষের মনে তো বটেই।

এই কালো বালির পিছনেও একটা কাহিনি আছে। ডুমাস সৈকত থেকে একটু দূরেই রয়েছে ছোট একটা শশ্মান। স্থানীয় লোকেরা বলে, এই শশ্মানের চিতাভস্ম উড়ে এসে মিশে যেত বালির সঙ্গে। আর তাতেই নাকি বালির রংটা পুরো কালো হয়ে গিয়েছে।

আর সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে আর একটা কাহিনিটা। অন্ধকার নামলেই এই সৈকতে ঘুরে বেড়ায় অন্য জগতের অতৃপ্ত সব আত্মা। কান পাতলে শোনা যায় তাদের কান্না। তারা ঘুরে বেড়ায় শিকারের সন্ধানে। জীবিত থাকাকালীন তাদের প্রতি যে-অবিচার হয়েছে, তার শোধ তুলতেই অন্য ভুবন থেকে নেমে আসে তারা। কথিত আছে, রাতে কেউ ওখানে পা রাখলে পরের দিন থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

মাঝেমধ্যেই দেখা যায় সমুদ্র থেকে ভেসে আসছে মৃতদেহ। কখনও কখনও ভেসে আসে অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েদের দেহ। বিশেষ করে মেয়েদের। কখনও কখনও বয়স্ক পুরুষদের। কেউ আত্মহত্যা করেছে, কেউ নাকি অশরীরী আত্মার হিংসার বলি। পুলিশ এসে মরদেহগুলোকে নিয়ে চলে যায়। কিন্তু সেই সব কেসের কোনও নিষ্পত্তি হয় না। দিন চলে যায়। মানুষ ভুলে যায়, কারা হারিয়ে গিয়েছে চিরতরে। ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্কের কাহিনি। রাতের বেলায় যেও না ডুমাস বিচে!

এই সমুদ্রসৈকতের একটা অংশে তো দিনের বেলাতেও লোকজনকে যেতে দেওয়া হয় না। স্থানীয়রা বলে, ওই দিকটায় নাকি জাহাজ আসে মাঝেমধ্যে। যে-অংশে যেতে দেওয়া হয়, সেটাও খালি করে দেওয়া হয় সূর্যাস্তের পরে। আবার পরের দিন দোকানিরা চলে আসে সকাল সাতটা-আটটা নাগাদ। চেয়ার পেতে, ত্রিপল টাঙিয়ে নেমে পড়ে ভুট্টা, ম্যাগি থেকে শুরু করে নানাবিধ খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করতে।

এই সমুদ্রসৈকতের আরও একটা বৈশিষ্ট্য আছে। জোয়ার এলে জল অনেকটা কাছে চলে আসে। প্রধানত গভীর রাতের দিকেই জলটা চলে আসে কাছে। না-হলে জল থাকে অনেক দূরে। যেখানে পৌঁছতে গেলে বেশ খানিকটা কাদা-জমি পার করে যেতে হবে। জল যখন কাছে চলে আসে, তখন ছোট নৌকা ব্যবহার করে গভীর জলে চলে যাওয়া যায়। স্থানীয়রা বলে, ১০-১৫ দিন অন্তর অন্তর বড় জাহাজ দেখা যায় দূরের সমুদ্রে। তার পরে তারা মিলিয়ে যায় দিগন্তে। ছেলে দু’টো যখন ডুমাস বিচে পা রেখেছিল, তখন দূরে-কাছে কিছুই প্ৰায় দেখা যাচ্ছিল না। দু’জনেই এসেছে সুরাট শহর থেকে। নিশ আর যশ, ক্লাস টুয়েলভের ছাত্র। ইউটিউবে ব্লগ বানানোটা নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে দু’জনের কাছে। যে-কারণে এই ডুমানে আসা। এক বার যদি রাতের ডুমাসকে তুলে ধরা যায়, তা হলে আর দেখতে হবে না। ভিউ দারুণ ভাবে বেড়ে যাবে।

দু’জনের হাতেই আছে মোবাইল আর সেলফি-স্টিক। কিন্তু এই অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দূরে সমুদ্রের ঢেউয়ের বিচ্ছুরণের আভা টের পাওয়া যাচ্ছে আর কানে এসে লাগছে ঢেউ ভাঙার শব্দ। যশ প্রথম দিকে সাহস জোগাচ্ছিল বন্ধুকে। কিন্তু এ বার তারও বুকটা দুরুদুরু করতে লাগল। বন্ধুর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, “এখানে থেকে তো ভিডিয়ো বানানো যাবে না দেখছি। আকাশের চাঁদ ছাড়া লোককে আর কী দেখাব। অন্ধকারের মধ্যে আমাদের মুখ দেখে লোকে কতটা কী বিশ্বাস করবে? জলও কিন্তু বাড়তে থাকবে এর পরে। চল, বেরিয়ে যাই।”

নিশও সে কথাটাই ভাবছিল। কিন্তু কিছু বলার আগে চোখটা আটকে গেল দূরের সমুদ্রে। বন্ধুর কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে বলল, “দূরে দ্যাখ। আলো দেখতে পাচ্ছিস?”

যশও ভাল করে এক বার তাকিয়ে দেখল। হ্যাঁ, দূরের সমুদ্রে একটা আলো দেখা যাচ্ছে। কোনও ছোট নৌকা হবে কি? আলোটা অনেক দূরে। কিন্তু জল বাড়তে থাকলে এই দিকেও চলে আসতে পারে!

চাপা স্বরে যশ প্রশ্ন করল, “ব্যাপারটা কী বল তো? কোনও নৌকা আসছে নাকি এ দিকে?”

দু’জনেই তাকিয়ে রইল সমুদ্রের দিকে। তার পরে হঠাৎ চমকে উঠল নিশ। একটা আওয়াজ শোনা গেল না কোথাও! এ দিকটায় বালির চেয়ে কাদা বেশি। একটা যেন ছপছপ শব্দ কানে এল। নিশ এক বার চট করে ঘুরে পিছনে তাকাল। অন্ধকারে কাউকে দেখা সম্ভব নয়, দেখাও গেল না।

যশের হাতটা চেপে ধরে নিশ কোনও মতে বলল, “একটা শব্দ শুনলি নাকি?”

যশ অন্ধকারেই মাথাটা নেড়ে বলল, “সে-রকমই তো লাগল। আমার মনে হয়, আর এখানে থাকাটা ঠিক হবে না।”

দু’জনেই এ বার ফেরার রাস্তাটা ধরল। চোখটা এখন একটু সয়ে এসেছে। আকাশে চাঁদের আবছা আলোটাও সৈকতে এসে পড়েছে। নিশের হঠাৎ মনে হল, সামনের জমাট বাঁধা অন্ধকারের মধ্যে যেন বিভিন্ন আকৃতির আদল দেখা যাচ্ছে। নিশের মনোযোগ এতটাই ওই দিকে ছিল যে, খেয়াল করেনি ডান হাতে ধরা মোবাইলের সুইচে আঙুলের চাপ বাড়ছে। হঠাৎ করে অন হয়ে গেল মোবাইল!

আলোটা বেশি জোরালো নয়। কিন্তু ওই ভয়ানক অন্ধকারকে চিরে ফেলতে যথেষ্ট। আবছা আলোয় সামনে দেখা গেল কয়েকটা ছায়ামূর্তি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে আছে।

আতঙ্কে গলা থেকে আওয়াজ বেরিয়ে এসেছিল ছেলে দু’টোর। কিন্তু সেই আওয়াজ চিৎকারে পরিণত হওয়ার আগেই থেমে গেল। দু’জনেই বুঝতে পারল সৈকতে পড়ে থাকা কয়েকটা বড় পাথরের আড়াল থেকে কারা যেন বেরিয়ে আসছে। ছপছপ শব্দগুলো আরও কাছে আসতে থাকল।

.

শহরের সঙ্গে এই সৈকতের যোগাযোগকারী রাস্তার নামটা হল সুরাট- ডুমাস রোড। প্রধান রাস্তার আশেপাশে আরও নানা ছোট ছোট রাস্তা গজিয়ে উঠেছে। যা চলে গিয়েছে কয়েকটা গ্রামের মধ্য দিয়ে। এ রকমই একটা গ্রামে, ছোট্ট একটা টিনের বাড়িতে বসে ছিল চার মূর্তি। গুজরাট ‘ড্রাই স্টেট’ হলেও প্রয়োজনে পানীয় সংগ্রহ করা বিশেষ সমস্যা নয়। সামনে রাখা টেবিলে দেখা যাচ্ছিল চারটে গ্লাস আর দু’টো রামের বোতল।

পান্ডা গোছের লোকটা গ্লাসে চুমুক দিয়ে মুখ খুলল, “ক’টা মাল আসছে?” “দু’জনকে পাঠাবে রাতে। আমাদের গিয়ে নৌকায় তুলে দিতে হবে। তা হলে এ বারের ডেলিভারিটা হয়ে যাবে।”

“এখানে এনে কি ইঞ্জেকশন দেওয়ার কোনও ব্যাপার আছে, না সেই ঝামেলা নেই?”

লিডারের প্রশ্নে তার সঙ্গী জবাব দিল, “হরমোনের ইঞ্জেকশন দেওয়া থাকবে। ওই নিয়ে আমাদের ঝামেলা পোয়াতে হবে না। আমাদের দেখতে হবে, বড় বোটে তোলার আগে পর্যন্ত মেয়েগুলো যেন অজ্ঞান অবস্থায় থাকে।”

লিডার মাথা নাড়ল। হরমোনের ইঞ্জেকশন যে-তাদের দিতে হবে না, সেটা সে বুঝতে পেরেছিল। ওগুলো ডাক্তাররা নির্দিষ্ট রুটিন মতো মেয়েগুলোকে দিয়ে থাকে।

.

গোরু, ভেড়া, পাঁঠা ইত্যাদি প্রাণীকে আরও তাগড়াই বানাতে, প্ৰজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে অনেক ক্ষেত্রেই বেশ কয়েক ধরনের স্টেরয়েড ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। স্বাভাবিক ভাবে উৎপন্ন হরমোন, যেমন এস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন, টেস্টোস্টেরন ইত্যাদি আইনত ব্যবহার করার ছাড় আছে এই প্রাণীদের উপরে। কিন্তু আইনের বাইরেও অনেক প্রাণীর উপরে গ্রোথ হরমোনের প্রয়োগ করা হয় তাদের বড়সড়, নাদুশনুদুশ বানানোর জন্য। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পোলট্রির পণ্যদের ক্ষেত্রে দেদার গ্রোথ হরমোন ব্যবহার করা হয়ে চলেছে। মুরগিদের মোটা করে ওজন বাড়ানোর জন্য।

.

ঠিক একই ভাবে কোনও কোনও ক্ষেত্রে মানুষের বাচ্চার উপরেও প্রয়োগ করা হয় এই গ্রোথ হরমোন। চিকিৎসাবিদ্যার পরিভাষায় যাকে বলা হয়, হিউম্যান গ্রোথ হরমোন বা এইচ জি এইচ। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার কাজেও এইচ জি এইচ ব্যবহার করা হয়। এই ধরনের গ্রোথ হরমোন ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা যায়। চিকিৎসকেরা যদি বোঝেন কোনও কোনও বাচ্চার বৃদ্ধি তার বয়স অনুপাতে অনেকই কম হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে তারা এইচ জি এইচ ইঞ্জেকশন নেওয়ার কথা বলেন। যার উপরে এই ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করা হয়, তাকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা থেকে শরীরে কী কী পরিবর্তন হচ্ছে, তার উপরে তীক্ষ্ণ নজর রাখা প্রয়োজন। তার পরে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলে ইঞ্জেকশনের ডোজ।

কিন্তু বেআইনি ভাবে যাদের শরীরে এই ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়, তাদের ক্ষেত্রে কোনও-রকম সতর্কতাই গ্রহণ করা হয় না। পাচারকারীদের কাছে এই মেয়েগুলো যে-এক একটা গোরু-ছাগল-মুরগির চেয়ে বেশি কিছু নয়।

এই ধরনের গ্রোথ হরমোন ব্যবহার করার বিশেষ কারণ থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই সাত-দশ বছরের মেয়েদের তুলে আনে পাচারকারীরা। কোনও কোনও ক্ষেত্রে মা, বাবা-ই অভাবের তাড়নায় বিক্রি করে দেয় বাচ্চাদের। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়। তখন সমস্যা দেখা দেয়, শারীরিক গঠন নিয়ে। দেখা যায়, বেশির ভাগ মেয়ের শরীরের বৃদ্ধি অনেক কম থাকে। কিন্তু তাদের পতিতালয়ে পাচার করতে গেলে সেটা হলে চলবে না। তাই সাহায্য নেওয়া হয় গ্রোথ হরমোনের। বিদেশে পাচার করার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। অনেক ক্লায়েন্টই কমবয়সি ছেলে-মেয়ে পছন্দ করে। কিন্তু তা বলে শারীরিক গঠন তো একেবারে রুগ্ন হলে সমস্যা। তার অবশ্য সমাধানও আছে! ডাক্তার আছে, গ্রোথ হরমোন আছে। হাজার পঁচিশেক টাকার বিনিময়ে এক একটা মেয়েকে ডোজ দিয়ে দেওয়া যায়।

দীর্ঘদিন ধরেই বেআইনি ভাবে এই গ্রোথ হরমোনের ইঞ্জেকশন ব্যবহার করে আসা হচ্ছে পাচার হয়ে যাওয়া শিশুদের উপরে। যা প্রথমে সাধারণের নজরে আসে ২০১৮ সালের অগস্ট মাস নাগাদ। যখন তেলেঙ্গনার মন্দির শহর বলে পরিচিত ইয়াদাগিরিগুট্টা থেকে এগারো জন মেয়েকে উদ্ধার করা হয়। যাদের মধ্যে সাত বছরের কম একটি বাচ্চাও ছিল। পুলিশের কাছে পাচারকারীরা স্বীকার করে, নিয়মিত গ্রোথ হরমোনের ইঞ্জেকশন দেওয়া হত এই বাচ্চাদের। যে-ডাক্তার এই কাজটা করত, সে মেয়ে-প্রতি ২৫ হাজার টাকা নিত।

যে সব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই পাচার হয়ে যাওয়া বাচ্চাদের উদ্ধারকার্যের সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রতিনিধিরা অনেক বার একটা কথাই বলে এসেছেন। বেশির ভাগ সময়ই তাঁরা এমন সব বাচ্চা মেয়েকে উদ্ধার করেছেন, যাদের উপরে প্রতিনিয়ত এই গ্রোথ হরমোন প্রয়োগ করা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের রিপোর্টে ব্যাপারটা উল্লেখ করেই ছেড়ে দেয়। এই নিয়ে বিশদে তদন্ত করে না।

২০১৮ পার হয়ে সময়টা ২০২৩ সালে এসে দাঁড়িয়েছে। কমা তো দূরের কথা, বাচ্চা মেয়েদের উপরে এই ধরনের ড্রাগ ব্যবহারের ঘটনা নিত্যদিন বেড়েই চলেছে। কখনও কখনও তো দিনে বেশ কয়েক বার এই গ্রোথ হরমোনের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়ে থাকে।

.

এ বারের লটে মোট চারটে মেয়েকে নিয়ে আসা হয়েছে মুম্বই থেকে জলপথে। ছোট ছোট ফিশিং বোটগুলো এই কাজ করে থাকে। বড় বড় ড্রামে উপরের অংশে মাছ রাখা হয়। তার পরে একটা টিনের আস্তরণ গোছের রেখে নীচের অংশটা আলাদা করে দেওয়া হয়। যেখানে বাচ্চাদের গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। অবশ্যই অজ্ঞান করে। কয়েকটা ছোট ছোট ছিদ্রের সাহায্যে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের কাজটা চলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশের নজর এড়িয়েই এই সব ফিশিং বোট মুম্বই থেকে চলে আসে দমনে। দমন শহরে সে ভাবে কোনও জেটি নেই। জাহাজ বা বড় বোট এখানে আসে না। রাতের অন্ধকারে বাচ্চাদের নিয়ে ছোট বোটগুলো ভিড়ে যায় দমনের চরে। সেখান থেকে সড়কপথে সুরাট পৌঁছতে ঘণ্টা দুয়েক। বেশির ভাগ সময় পুলিশ উল্টো দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েক বার ধরা পড়লেও কিছু যায় আসে না। ব্যাঙ্ক যেমন লোন দেওয়ার সময় ধরেই নেয় তার কিছু শতাংশ লোন ফেরত পাওয়া যাবে না, এ ক্ষেত্রেও হিসেবটা সে-রকম করেই কষা থাকে! পুলিশকেও তো কাজ দেখাতে হবে নাকি!

ছোট ছোট বাচ্চাদের এই ভাবেই এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় পাচার করা হয়। তার পরে তাদের বড়সড় বানাতে গ্রোথ হরমোন তো আছেই। কয়েকটা বাচ্চা মরে গেলে ক্ষতি নেই। ওগুলোও হিসেবে ধরাই থাকে।

.

লিডার গোছের লোকটা এ বার একটা ব্যাপারে খুশি হয়েছে। চারটে মালই ঠিকমতো তাদের সুরাটের ডেরায় ডেলিভারি হয়ে গিয়েছিল সপ্তাহখানেক আগে। সেখানে চলেছে গ্রোথ হরমোনের ট্রিটমেন্ট। এ বার বলা হয়েছিল, দু’খেপে মাল দেশের বাইরে যাবে। চারটে মেয়েই যাবে বিদেশে। আরব দুনিয়ার দু’টো দেশে। প্রথম লট এসে যাবে আর একটু অন্ধকার নামলেই। রাত দেড়টা নাগাদ তারা পৌঁছে যাবে ডুমাস বিচে। জনশূন্য ওই সৈকতে তাদের জন্য একটা ছোট নৌকা অপেক্ষা করে থাকবে। সেই নৌকা শিকারদের পৌঁছে দেবে গভীর জলে থাকা আর একটা বড় বোটে। সেখান থেকে মাল ডেলিভারি হয়ে যাবে জাহাজে। এ বার অবশ্য আর একটা বাড়তি কাজ আছে। একটা ছোট কন্টেনার পাঠানো হয়েছে তাদের কাছে। প্রথম দু’টো মেয়ের সঙ্গে এই বিশেষ কন্টেনারটিও তুলে দিতে হবে বোটে। সম্ভবত এই কন্টেনারটিও চলে যাবে বিদেশে। লিডার আন্দাজ করছিল, এর মধ্যে হয়তো চামড়ার টুকরো আছে। না- হলে আর এই ছোট্ট বাক্সে কী-ই বা থাকতে পারে!

এই রুটে সমস্যা বিশেষ হয় না। ডুমাস বিচের কাহিনি আর পুলিশের তৎপরতায় রাতের দিকে কেউ এ দিকে আসতে সাহস পায় না। তাও দু’-এক জন যারা আসে তারা আর ফিরে যায় না। তবে মাঝেমধ্যে একটা সমস্যা হয়। কখনও নৌকায় তোলার পরে দেখা যায় এক-আধটা বাচ্চা মরে গিয়েছে। তখন গভীর সমুদ্রে গিয়ে তাদের লাশটা জলে ফেলে দেওয়া হয়। পরে সমুদ্র আবার সেই শরীর ফিরিয়ে দেয় সভ্য সমাজকে। শুধু বাচ্চা কেন, কিশোরীদের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপার দেখা গিয়েছে।

কথাটা মনে পড়তে লিডারের মুখে একটু হাসিই ফুটল। এই রকম দু’- চারটে লাশ মাঝেমধ্যে লোকের চোখে পড়া ভাল। ডুমাস বিচ নিয়ে আতঙ্কটা তা হলে আরও বেশি করে ছড়াবে।

রাত নেমেছে। দশটা নাগাদ ব্যবস্থামতো দু’টো মেয়েও চলে এসেছে তাদের হাতে। মেয়ে দু’টো ঘুমন্ত অবস্থাতেই আছে। প্রয়োজনে আরও এক বার ঘুমের ইঞ্জেকশন দেওয়া হবে।

রাত একটা নাগাদ দু’টো সাইকেল ভ্যানে মেয়ে দু’টোকে চাপিয়ে চার জন হাজির হয়ে গেল ডুমাস বিচে। আর একটু পরে জল কাছে চলে আসবে। তখন ছোট নৌকা নিয়ে দূরে যাওয়া যাবে। ওপর থেকে ২০ মিটার মতো হেঁটে নীচে নামতে হয়। অন্ধকারে চোখটা সইয়ে ছোটখাটো চেহারার মেয়ে দু’টোকে কাঁধে চাপিয়ে চার জনে নেমে আসতে লাগল সমুদ্রসৈকতে। এখানে তারা সাধারণত আলো জ্বালাতে চায় না।

অর্ধেক পথ নেমেই থেমে গেল চার মূর্তি। নীচে কারও গলার স্বর পাওয়া যাচ্ছে। লিডারের ইশারায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল বাকিরা। মিনিটখানেক অপেক্ষা করে আওয়াজটা কোথা থেকে আসছে বুঝে নিল লিডার। তার পরে বাকিদের নিয়ে চলে এল সৈকতের প্রান্তে। ছড়ানো ছিটানো পাথরগুলোর আড়ালে নামিয়ে রাখা হল মেয়ে দু’টোকে। তার পরে দু’জন সঙ্গীকে নিয়ে লিডার লোকটা সরে গেল আর একটু দূরে। যে-দিক থেকে গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। মিনিট পাঁচেক ভাল করে পরিস্থিতিটা বুঝে নিল সে। মনে হচ্ছে, দু’টো ছেলে আছে। নিশ্চয়ই অন্ধকারে অ্যাডভেঞ্চারের লোভে এসে হাজির হয়েছে। ছেলে দু’টোর আরও কাছে এগিয়ে এল লোক তিনটে। একটা পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করে সামনে ভাল ভাবে লক্ষ করতেই অন্ধকারে দু’টো শরীরের আদল অস্পষ্ট ভাবে দেখা যেতে লাগল। একটু দূরেই রাখা আছে মেয়ে দু’টোকে। আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।

অপেক্ষা করার সময়ও আর হল না। একটা ছেলের হাতের মোবাইলটা হঠাৎ অন হয়ে গেল। অন্ধকার চিরে ফুটে উঠল আলোর রেখা। পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল তিনটে শরীর।

.

দিন দুয়েক পরে।

“মা, মা। তাড়াতাড়ি দেখে যাও এ দিকে!” তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল বছর দশেকের বাচ্চাটা।

চেঁচানি শুনেই মা-বাবা বুঝে গিয়েছিলেন, কী ঘটেছে। এই অভিজ্ঞতা তো তাঁদের আগেও হয়েছে। তবু দ্রুত দৌড়ে গেলেন সেই দিকে। যা সন্দেহ করেছিলেন, ঠিক তাই। সমুদ্রসৈকতে পড়ে আছে একটা ছেলের দেহ। একটু দূরে আরও চিৎকার-চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। ওখানেও পাওয়া গিয়েছে আর একটা ছেলের লাশ। সমুদ্রে ভেসে এসেছে।

বাবা-মা নিজের বাচ্চাকে টেনে সরিয়ে আনলেন ওখান থেকে। আজ আবার ঝামেলা আছে। পুলিশ আসবে। লোকজনকে ঢুকতে দেওয়া হবে না অনেকটা সময়। তাদের দোকান খুলতেও দেরি হয়ে যাবে। কেন যে-এই ছেলেগুলো মরতে রাতের দিকে এ দিকে আসে!

এরা শহুরে ছেলে। এদের কে বোঝাবে, রাতে এই বেলাভূমিতে শয়তান বিচরণ করে। শয়তানের সাঙ্গোপাঙ্গেরা ঘুরে বেড়ায়। জীবিত মানুষ দেখলেই ঘাড় মটকে বা জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলে!

আরও দু’টো ছেলে মরল। আরও দু’টো অতৃপ্ত আত্মা এই ডুমাস বিচে ঘুরে বেড়াবে। কী যে-হবে, ঈশ্বরই জানেন। মনে মনে মহাকালকে স্মরণ করে নিজেদের দোকানের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন পাশের গ্রাম থেকে আসা ওই দম্পতি।

শয়তান তখন মুম্বইয়ে তার বিশাল বাংলোয় মর্নিং কফিতে চুমুক দিচ্ছে। হাতে কিউবান সিগার!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *